ধাওয়া – ৬

ছয়

সন্ধ্যা হয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি, শহরের বেশিরভাগ লোকজন এরই মধ্যে বাড়ি ফিরে গেছে। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। প্রধান সড়ক এড়িয়ে গলিঘুঁজি ধরে বন্দিকে নিয়ে বোর্ডিঙ হাউসের দিকে চলল জো মিলার্ড। কিছুক্ষণের মধ্যেই কারও চোখে না পড়েই পৌছে গেল বোর্ডিঙ হাউসের পেছন দরজায়। হিচরেইলে ঘোড়া বেঁধে স্যাডল হর্ন থেকে ম্যাকেনলির হ্যাণ্ডকাফ খুলল সে, আটকে নিল নিজের কব্জিতে।

কিচেনে ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সাপার প্লেট পরিষ্কারে ব্যস্ত মেরিয়ানের। দু’জনের চেহারার দুরবস্থা আর হ্যাণ্ডকাফ দেখে অস্ফুট একটা আওয়াজ বেরল ওর মুখ থেকে। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে, জো? কোথাও লাগেনি তো?’

‘কিচ্ছু হয়নি, মেরি। অবশ্য তোমাকে সাপার খাওয়ানোর ব্যাপারটা কয়েকদিন পিছিয়ে দিতে হবে।’

মেরিয়ানকে শুধু আউট-লর নাম জানাল মিলার্ড, অতীত সম্বন্ধে বা হাতে বেড়ি কেন সে ব্যাপারে একটা কথাও বলল না। মাথা থেকে হ্যাট নামিয়ে যতদূর সম্ভব ঝুঁকে বাউ করল ম্যাকেনলি, মিষ্টি হেসে বলল, ‘পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম, ম্যাম। এখন বুঝতে পারছি শহরে ফিরে আসার জন্য মিলার্ড এত তাড়াহুড়া করছিল কেন।’

উষ্ণ হাসিতে ঝলসে উঠল মেরিয়ানের চেহারা। কড়া চোখে ম্যাকেনলিকে দেখে নিয়ে মিলার্ড বলল, ‘তোমার অসুবিধা না হলে যদি একটু পানি গরম করতে, মেরি, গোসল করতে পারতাম আমরা। টিউবওয়েল থেকে আমিই পানি তুলে আনব, শুধু একটু কষ্ট করে…’

হাসিমুখে চুলো দেখাল মেরিয়ান। ওখানে আগুনের ওপরে বড় ডেকচিতে ফুটছে উত্তপ্ত পানি। বলল, ‘জানতাম রাতে ফিরে এলে হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার হতে চাইবে তুমি। এই পানিতে দু’জনের না হলেও অসুবিধা নেই, রেঞ্জ রিজার্ভয়ারও গরম পানিতে ভর্তি আছে।’

ম্যাকেনলি প্রথমে গোসল করল। কাছেই সর্বক্ষণ সিক্সগান হাতে দাঁড়িয়ে থাকল মিলার্ড। নিজের পালা এলে একটা চেয়ারে বসিয়ে হাতলের সঙ্গে ম্যাকেনলির হাত হ্যাণ্ডকাফে আটকে দ্রুত গোসল সেরে নিল সে। মিনিট দশেক পর সভ্য মানুষ মনে হলো ওদের দু’জনকে দেখে।

ঝেড়ে ধুলোবালি দূর করে জামা কাপড় দিয়ে গেল মেরিয়ান। বলে গেল মিলার্ডরা ইচ্ছে করলে ওর পার্লারে গিয়ে বসতে পারে। মিলার্ড জানে এটা একটা বিরল সম্মান, নিয়মিত বোর্ডারদের কখনোই ওই ঘরে ঢুকতে দেয় না মেরি। আজ হঠাৎ ওর উপর সদয় হয়ে উঠল, না ম্যাকেনলির ব্যবহারে খুশি হয়েছে?

পার্লারে এসে ওদের সামনের ছোট্ট টেবিলটাতে হাতের ট্রে নামিয়ে রাখল মেরিয়ান। কফি আর বিশাল আকৃতির, দু’টুকরো পাই ট্রের ওপর। ফায়ার প্লেসের সামনে একটা গদী মোড়া আরামদায়ক চেয়ারে বসেছে মিলার্ড, ম্যাকেনলিকে শুকনো খটখটে একটা কাঠের চেয়ারে বসিয়ে হাতলের সঙ্গে হ্যাণ্ডকাফ আটকে দিয়েছে।

মেরিয়ানকে দেখে সাহায্য করতে উঠেছিল ম্যাকেনলি, হ্যাণ্ডকাফের কারণে ট্রের দিকে হাত বাড়াতে পারেনি। লজ্জিত চেহারায় হেসে আবার চেয়ারে বসে পড়ল সে। ওরও সাহায্য করা উচিত বুঝতে পেরে উঠতে যাচ্ছিল মিলার্ড, তার আগেই ট্রে নামিয়ে রেখেছে মেরিয়ান। বিরক্তির ভাব ওর চেহারায় গোপন থাকেনি।

শীতল চোখে মিলার্ডকে দেখে নিয়ে সে বলল, ‘ভাবতে ভাল লাগছে যে আমার বাসায় অন্তত একজন ভদ্রলোক আছে।’ হ্যাণ্ডকাফ দেখিয়ে বলল, ‘ওই জঘন্য জিনিসগুলো খুলে দিলে কি খুব অসুবিধা হবে, জো?’

‘হ্যাঁ, হবে,’ চেয়ারে নড়েচড়ে হেলান দিল মিলার্ড। দেখল ম্যাকেনলি মেরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসছে। রাগে গা জ্বলে উঠল ওর। মনে মনে বলল, ‘ব্যাটা ভোঁদর!’

‘আমার জন্য ভেবেছ সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম, ম্যাম,’ গলায় আবেগ ঢেলে বলল ম্যাকেনলি।

চেহারা দেখে মনে হলো আউট-লর কষ্ট বুঝতে পেরেছে মেরিয়ান, প্লেটে খাবার তুলে ম্যাকেনলির দিকে বাড়িয়ে ধরল সে। মিলার্ডের রাগ চড়তে থাকল বিপজ্জনক গতিতে, ওর মনে হচ্ছে শয়তানটার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করছে মেরি। দু’এক মুহূর্ত পর অধৈর্য হয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে, নিজের প্লেটে পাই তুলে আবার বসল চেয়ারে। ইচ্ছে করেই কফিপট ম্যাকেনলির নাগালের বাইরে সরিয়ে রাখল।

এক কামড় পাই খেয়ে আকাশের উদ্দেশে চোখ তুলল ম্যাকেনলি, প্রশংসা ভরে বলল, ‘মিথ্যে বললে আমার মাথায় বাজ পড়ুক, এত চমৎকার পাই জীবনে খাইনি।’

প্রশংসা পেয়ে দু’গাল লাল হয়ে উঠল মেরিয়ানের। জানতে চাইল, ‘মিসেস ম্যাকেনলির পাইয়ের চেয়েও ভাল হয়েছে?’

কথা শুনে কফি আরেকটু হলেই মিলার্ডের গলায় আটকে যাচ্ছিল, কোনমতে ঢোক গিলে সে বলল, ‘মিসেস ম্যাকেনলি? পাগল নাকি! কোন্ মেয়ে ওর মত একটা মিথ্যুক, ভবঘুরে বদমাশকে বিয়ে করবে!’

ঘুরে দাঁড়িয়ে রাগী চোখে ওর দিকে তাকাল মেরিয়ান। ‘জো মিলার্ড, তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করিনি। বাজে কথা বলতে হলে অন্য কোথাও বলবে, এখানে নয়। মিস্টার ম্যাকেনলি যতক্ষণ আমার অতিথি ততক্ষণ ওর সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলবে।’

‘ভদ্রভাবে?’ রাগে চেঁচাল মিলার্ড। ‘একটা চোর, বাটপাড়, শয়তানের সঙ্গে…’

‘মিলার্ড!’ মেরিয়ানের ধমক বাঘা মার্শালের রাগ পানি করে দিল। বিড়বিড় করে কী যেন বলল মিলার্ড, কিছু বোঝা গেল না। হাসিতে উদ্ভাসিত ম্যাকেনলির দিকে লজ্জিত চেহারায় তাকাল মেরিয়ান। ‘মার্শালের বাজে ব্যবহারে আমার হাত ছিল না, মিস্টার ম্যাকেনলি; আমি দুঃখিত।’

‘না, না, দুঃখিত হবার কী আছে! আমি বাজে লোকের খারাপ কথা গায়ে মাখি না, ওরা নিজের মাপকাঠিতে সবাইকে মাপে। আমার অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার সুযোগই দিই না ওদের। এই যেমন মার্শাল তখন…’ কথা শেষ না করে মিলার্ডকে ইঙ্গিতে দেখিয়ে চুপ হয়ে গেল ম্যাকেনলি।

‘তুমি সত্যিই ভদ্রলোক, অনেকের অনেক কিছু শেখার আছে তোমার কাছ থেকে,’ মিলার্ডকে খোঁচানোর উদ্দেশ্যে বলল মেরিয়ান। ‘আমি ঘুমাতে যাচ্ছি, মিস্টার ম্যাকেনলি। কোনও দরকার পড়লে ডাক দিতে দ্বিধা কোরো না।’

মেরিয়ান চলে যাবার পর চেয়ারে হেলান দিল ম্যাকেনলি, হাসল রাগে লাল হয়ে যাওয়া মিলার্ডের দিকে চেয়ে। তারপর নীরবতা নামল ঘরে। দীর্ঘ নীরবতা। আগুনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অনেকক্ষণ পর নিচু গলায় আউট-ল বলল, ‘এক সময় সত্যি একজন মিসেস ম্যাকেনলি হয়েছিল।’

‘অবশ্যই,’ মাথা ঝাঁকাল মিলার্ড। ‘আমিও তা হলে মরমন ধর্মযাজক ছিলাম, বউ ছিল সাতাশিজন। চাপা ঝেড়ে লাভ নেই, বিগ জিম। আমি মেরি না- মার্শাল মিলার্ড। তোমাকে ভালমত চেনা আছে আমার।’

আউট-লর গম্ভীর চেহারায় একটুকরো হাসি ফুটল। ‘তুমি বিশ্বাস করো আর না করো, সত্যি বিয়ে করেছিলাম আমি।’ বড় করে শ্বাস টানল ম্যাকেনলি, তারপর বলল, ‘রেড রিভারে আহত হবার পর এক ডাক্তার আমাকে বাঁচায়। কয়েকমাস বিশ্রাম নিয়ে আমি কানাডায় গেলাম।’

‘মানে আইনের হাত থেকে পালালে?’

টিটকারির সুরে বলা কথাটা গায়ে মাখল না ম্যাকেনলি। ‘আইন নয়, মিলার্ড, আমি পালাচ্ছিলাম নিজের কাছ থেকে। দলের সবাই মারা গেছে, বোধহয় আমিই দায়ী- এই বোধটা বুকের মধ্যে ভাঙচুর শুরু করেছিল। বুলেটের ক্ষতের মত দ্রুত শুকায় না মনের ক্ষত, আমার তখন পাগলের মত অবস্থা। উদ্‌ভ্রান্ত; কী করা উচিত বুঝতে পারছি না। কানাডায় দেখা হলো ওর সঙ্গে। অসাধারণ মেয়ে, অন্যদের মত না…। থাক বলে আর কী হবে।’

‘অন্যদের মত না মানে? কেমন অসাধারণ?’ কৌতূহলী হয়ে উঠেছে মিলার্ড, চেয়ারে ঝুঁকে বসল।

চুপ করে থাকল চিন্তামগ্ন ম্যাকেনলি, যেন প্রশ্ন শুনতেই পায়নি। খানিক পরে বলল, ‘আমার সবকিছু নিয়ে চলে গেছে ও দু’দিনের জ্বরে ভুগে। আমি আবার একা হয়ে গেছি পৃথিবীতে।’

সন্দেহের শেষ কণাও দূর হয়ে গেল মিলার্ডের মন থেকে। জানতে চাইল, ‘কোনও ছেলেমেয়ে হয়নি?’

‘একজন- ছেলে। পাঁচ বছর আগে ওকে শেষ দেখেছি।’ গলা খাঁকারি দিয়ে মুখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকাল ম্যাকেনলি। কষ্ট লুকাতে চাইছে। খানিক পরে বলল, ‘আমার ছেলের বয়স এখন তা হলে এগারো! এখনই সময়, যদি পারতাম ওকে নিয়ে ঘোড়ায় করে ঘুরতাম বা মাছ ধরতে নিয়ে যেতাম।’ একটুক্ষণ চুপ করে সে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বিয়ে করোনি?’

‘নাহ্, করাটা আর হয়ে ওঠেনি,’ বিষাদের ছায়া ঘনাল মিলার্ডের চোখে। ‘হবে কী করে, আমি ওকে বলার জন্যে তৈরি হবার আগেই তো…’ চুপ হয়ে গেল মিলার্ড।

উপলব্ধি করতে পারছে এমন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল বিগ জিম ম্যাকেনলি। চেহারায় সহানুভূতি ফুটে উঠল।

প্রায় সারারাত অতীতের গল্প করল ওরা। ঘোরের মধ্যে কেটে গেল সময়, দু’জনেই ফিরে গেল বিশ বছর আগের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে। পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব সময় ভিন্ন ছিল, তারপরও নিজেদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, রুচি-অরুচিতে মিল খুঁজে পেয়ে অবাক হলো ওরা। ম্যাকেনলিকে আর স্বল্প পরিচিত, দুর্বিনীত এক আউট-ল মনে হচ্ছে না মিলার্ডের। ম্যাকেনলিও জানত না নিরস মার্শালের ভেতরে সহজ, সরল, সাহসী একজন মানুষ বাস করে।

ভোরের আগ দিয়ে টয়লেটে যেতে চাইল ম্যাকেনলি। আপত্তি করল না মিলার্ড। সারারাত গল্পের ফাঁকে দু’জনে এক বোতল হুইস্কি গলা দিয়ে নামিয়েছে, কাজেই প্রকৃতির ডাক আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হ্যাণ্ডকাফ খুলে আউট-লকে টয়লেট দেখিয়ে দিল মিলার্ড, ফিরে এসে আবার বসল চেয়ারে। কিছুক্ষণ সতর্ক নজর রাখল টয়লেটের দরজায়, তারপর তলিয়ে গেল ভাবনায়। একা সে ব্যাংক ডাকাতদের ঠেকাবে কি করে? চাকরিচ্যুত মার্শালের কথা বিশ্বাস করে লোকজন কি সতর্ক হবে? যদি না হয়, তা হলে? ম্যাকেনলিকে কার কাছে সোপর্দ করবে, ভীতু উইলকার কী দায়িত্ব নিতে রাজি হবে? ম্যাকেনলিকে আটকে রাখার ক্ষমতা আছে উইলকারের?

ম্যাকেনলির কথা মনে আসায় চটকা ভাঙল মিলার্ডের। টয়লেট থেকে কোনও সাড়াশব্দ আসছে না। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। নিচু গলায় গাল বকছে একটানা। একহাতে হ্যাণ্ডকাফ অন্যহাতে কক্ করা সিক্সগান ধরে দ্রুত পায়ে এগোল টয়লেটের দরজা লক্ষ্য করে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *