চাঁদের তাঁবু  – ৯

তাঁবুতে এসেও শেষ রাতটুকু আর ঘুমোতে পারলাম না৷ দাদাকে জাগিয়ে রাতের ঘটনাটা বললাম৷ পাছে আমি ভুলে যাই, তাই মরুভূমি থেকে বেরোবার পথ আমাকে যেমন বোঝানো হয়েছিল হুবহু সেটাই দাদাকে বোঝালাম৷

দাদা লাফিয়ে উঠে প্রথমেই খাটিয়ার তলা থেকে আমাদের দু-জনের জুতো বের করে আমার জুতো জোড়া আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে নিজেরটার বালি পরিষ্কার করতে লেগে গেল৷ জুতোর বাইরে-ভেতরে বালি সেঁটে আছে৷ প্রত্যেকটা খাঁজে, সেলাইয়ের ভাঁজে বালি৷ হাঁটতে গেলে পা ছড়ে কেটে জ্বালা করে, দু-পায়েই ফোসকা পড়ে এমন দশা হয়েছে যে, এই তাঁবুতে আশ্রয় পেয়েই আমরা জুতো তুলে রেখেছিলাম৷

এখানকার প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমেই আমরা গেলাম ফুলে রাঙা মরূদ্যানের সেই গ্রামে৷ দাদাকে তারা আগে দেখেনি, কিন্তু আমার মুখ দেখেই হয়তো বুঝেছে যে আমরা মরুভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷ বড়ো মোটা মনসাপাতায় তিলবাটার মিঠাই আমাদের দু-ভাইকেই খেতে দিল৷

যে বউটি তার কোলের ছেলের জন্য আমার আংটি চেয়ে নিয়েছিল, সেও আমাদের খবর পেয়ে তার বাচ্চাকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে আমাকে দেখেই আনন্দে মুখ ভরে হাসল৷ কুয়োর জল নেবার জন্য আমরা একটা ভিস্তি চাইতেই তার মুখের ভাব বদলে গেল, চোখ ক্রমশ জলে ঝাপসা হয়ে এল, বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ধরে সে অদ্ভুত শব্দে কেঁদে উঠল৷ যে জল তুলে ভিস্তিতে ভরে দিচ্ছে সেও মাঝে মাঝে তার সাদা পোশাকের কোণ তুলে ধরে চোখ মুছছে দেখে আমারও চোখ ভিজে উঠল৷ এদের কাছ থেকে এভাবেই বিদায় নিতে হল৷

জলভরা ভিস্তির ওজন খুব কম নয়৷ ঠিক হল আমরা দু-জনে ভাগাভাগি করে বইব৷

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরম হাওয়াও বাড়তে লাগল৷ হঠাৎ হঠাৎ হাওয়ার তোড়ে একজায়গার বালি আরেক জায়গায় টিলা বানাচ্ছে৷ দূর থেকে মনে হয় বিরাট বিরাট ঢেউ জমে গেছে৷

হাঁটতে হাঁটতে একজায়গায় দাদা বালির ওপর বসে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্যঁাসফেঁসে গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘সূর্য কতবার উঠল আর কতবার ডুবল বলতে পারিস?’

আমিও বসে পড়েই বললাম, ‘সে কী! আমি তো গুনিনি৷ তুমি তো সব সময় সব কিছুই গুণে রাখো৷’

এতক্ষণেও বালির মধ্যে মাথা তুলে রাখা প্রাচীন দুর্গ দেখতে না পেয়ে দু-জনের মনেই খুব উদ্বেগ৷ চারদিকে বড়ো বড়ো বালির ঢেউ দেখে ভয় হল, সেই পোড়োবাড়ি বালিতে ঢাকা পড়ে যায়নি তো!

শুধু হেঁটে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর উপায়ও নেই৷ মরি-বাঁচি, সামনের দিকে এগিয়ে যেতে তো হবেই৷

একদিন সূর্যাস্তের বেশ কয়েক ঘণ্টা পর দূর থেকে আকাশে রঙের হিল্লোল দেখতে পেয়ে নতুন করে আশায় আমাদের মন চাঙা হয়ে উঠল৷ সামনেই বালির ঢেউ ভেঙে মাথা তুলে আছে পাথরের দুর্গচূড়া৷

শেষ পর্যন্ত ছেলেটার কথা এভাবে মিলে গেল দেখে সাহসে ভর করে এবার আমরা ডান দিকের পথ ধরলাম৷ এই পথের শেষেই আমাদের দেশের পথ৷ দেশে ফেরার নিশ্চয়তা পেয়েও কেন আমার মন হ্রদের খোঁজে চলে যাওয়া ছেলেটার জন্য টনটন করে উঠল কে জানে৷

হঠাৎ মনে পড়ল ছেলেটার নামই আমার জানা হয়নি৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *