১
মায়ের কাছে শুনেছি আমার যখন দু-বছর বয়েস, দাদার দশ, তখন আমাদের বাবা একদিন মেদিনীপুর থেকে অনেক দূরে কাশ্মীর বলে একটা পাহাড় ঘেরা রাজ্য আছে, সেখানে যুদ্ধে গেলেন আর ফিরলেন না৷
ফিরল খুব লম্বা একটা মুখবন্ধ কাঠের বাক্স৷ পাড়ার সবাই বলল, এটাই আমাদের বাবা৷
দাদার কাছে শুনেছি আমার যখন সাত বছর বয়েস, দাদার পনেরো, তখন একদিন মা পৌষ-সংক্রান্তিতে কনকনে ঠান্ডায় গঙ্গাসাগরে ডুব দেবার জন্য সেই যে গেলেন আর ফিরলেন না৷
মায়ের সঙ্গীরা ফিরে এসে সবাই একমুখে বলল, মা নাকি সাগরে ডুব দিতে গিয়ে জোয়ারে ভেসে স্বর্গে চলে গেছেন৷
এরপরও অনেক কাল বর্ষার দিনে বুক-কাঁপানো বাজের শব্দে আগের মতোই আমি ভয়ে চমকে উঠে যেন মাকে জাপটে ধরতে গেছি!
বিদ্যুতের চোখ-ধাঁধানো আলো আর তার ঠিক পরই পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে বাজ পড়ার শব্দ থেকে বাঁচাতে মা-ই দৌড়ে এসে আমাকে বুকে চেপে ধরতেন৷
আমার এখন তেরো বছর, দাদার একুশ, একদিন দাদা এসে বলল, ‘আমেরিকা যাবি?’
‘আমেরিকা? সেই যেখানে খুব বরফের ঝড় হয়? বন্যায় শহর ডুবে যায়?’
‘দূর, সে কি সারা বছর হয় নাকি? সারা দেশে হয় নাকি? কখনো হয়তো কোনো একটা অঞ্চলে এমন হয়ে থাকে৷’
‘বরফের ঝড়ে আমরা যদি শীতে কাঁপতে কাঁপতে উড়ে যাই!’
‘বরফের ঝড় না রে পাগলা, বরফকুচির ঝড়৷ তুষারঝড় বলাই ঠিক৷ এবছরও কোথায় যেন তুষারঝড়ে ঘরবাড়ি গাড়িঘোড়া চাপা পড়বার জোগাড় হয়েছিল৷’
দাদা আমেরিকায় বিনা পয়সায় কী একটা বিষয়ে অনেক অনেক পড়াশোনার বৃত্তি পেয়েছে, ক-দিন ধরে দেখছি প্রায়ই গুনগুন করে গান গায়৷ একদিন দুপুর রোদে ঘেমে বাড়ি ফিরে, আমাকে দেখেই পিঠে দুম করে একটা কিল মেরে বলল, ‘কলকাতা থেকে দুবাই, দুবাই থেকে সোজা নিউ ইয়র্ক৷ তার মধ্যে দুবাইয়ে মরুভূমিতে সন্ধ্যে বেলা আরব দেশের গানবাজনার সঙ্গে এলাহি ডিনার৷ একদম ফ্রি! সবটাই বিমান কোম্পানির ব্যবস্থা৷’
পিঠে কিল খেয়ে আমার দম প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল, তবু জানতে চাইলাম, ‘তা কী করে হবে?’
‘আমরা যাতে আর কোনো বিমানে না গিয়ে এদের বিমানেই যাই, তাই এই ফ্রি ডিনার-টিনার৷ তোর মাথায় এসব ঢুকবে না৷’
‘দাদা মরুভূমিতে কি আমরা উটে চড়ে যাব?’
‘আরে না না৷ ওরাই ওদের গাড়ি করে নিয়ে যাবে, আবার রাতের মতো হোটেলে ফিরিয়েও আনবে৷’
‘উট ছাড়া মরুভূমিতে যাওয়া যায় নাকি?’
‘তোকে ওসব ভাবতে হবে না৷ তুই বরং চট করে খেয়ে নিয়ে একটু আগে আগে ঘুমিয়ে পড় তো৷ কাল আবার রাত-টাত জাগতে হতে পারে হয়তো৷’
