৭
অনেকক্ষণ ধরে জল বয়ে যাবার ছলছল শুনতে পাচ্ছি৷ হঠাৎই জোর ছলাচ্ছল শব্দ শুনে চমকে গেলাম৷ শেষ পর্যন্ত তাহলে এখানে জল পাওয়া গেছে! আনন্দে খাটিয়া থেকে নেমে তাঁবুর বাইরে এসে দেখি-কোথায় জল! যেখানে কুয়ো খোঁড়া হচ্ছিল, সেখানেও শুধু বালির পৃথিবী৷ স্বপ্নে জলের শব্দ শুনে মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল! সত্যি, মানুষ ইচ্ছে মতন ভালো ভালো স্বপ্ন দেখার উপায় বের করতে পারলে, জীবন কত আনন্দের হত!
তাঁবুর বাইরে শীত বেশ৷ ভালো করে আলোও ফোটেনি৷ ভেতরে এসে প্রথমেই চোখে পড়ল, আমার পাশের খাটিয়া শূন্য৷ ছেলেটা কখন উঠে চলে গেছে, ঘুমের মধ্যে জানতেই পারিনি৷
তখনই আবার তাঁবুর বাইরে এলাম৷ অন্য দুটো তাঁবুর মানুষজন যে-যার দিনের কাজে লেগে পড়েছে৷ একটা মেয়ে ছাগলের দুধ দুইতে দুইতে ছাগলটার সঙ্গে অনর্গল কথা বলে চলেছে৷ তাঁবুর পুব দিকে তিনটে উট কাঁটাঝোপ মুখ দিয়ে ছিঁড়ে একভাবে চিবোচ্ছে৷ দূর থেকে একজনকে এই তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মনে হল ছেলেটা নিশ্চয়ই ফিরে আসছে৷
চোখ সরু করে সেদিকে চেয়ে আছি, হঠাৎ আরও কাছে এসে ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘ছোটু! পমপম! তুই বেঁচে আছিস?’
এ তো দাদা! আমার পুরো নাম অনুপম কখনো বলে না৷ ডাকে পমপম বলে৷ আদর করে ‘ছোটু’ও বলে৷ আমাকে দেখতে পেয়ে দাদা তো দৌড়োচ্ছেই, আমিও দৌড়ে গিয়ে দাদার গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম৷
আমি যে এখানে আছি দাদা জানল কী করে?
দাদার উত্তর, ‘আমি জানব কেন, একটা ছেলেই তো আমাকে এদিকে নিয়ে এসে এই তাঁবুর পথ বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে গেল৷ বলল, সোজা গিয়ে মাঝের তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের নাম ধরে ডাকতে হবে৷ বলেই আরেক দিকে হনহন করে সে চলে গেল৷’
আমি কী করে বেঁচে আছি, এই অসীম মরুভূমিতে আশ্রয় পেলাম কী করে, শোনবার জন্য দাদার আর তর সয় না৷ দাদাকে নিয়ে আমারও মনের অবস্থা একই৷ শেষে দাদাই বলল, ‘আমি দস্যুদের হাতে ধরা পড়েছিলাম৷ এই ছেলেটা কী করে আমাকে আজ উদ্ধার করল সেও এক রহস্য৷ শেষ পর্যন্ত আমরা যে নিজেদের ফিরে পেয়েছি সেটাই জগতের নবম আশ্চর্য! এ নিয়ে সারা বছর ধরে আমাদের কথা হবে৷ এখন সবচেয়ে আগে দরকার দেশে ফেরার একটা উপায় বের করা৷ সেই ছেলেটাই হয়তো সাহায্য করতে পারত, কিন্তু ওর নিজেরই খুব বিপদ মনে হল৷ উটের পিঠে একটা লোক এসে ছেলেটাকে কী যে একটা বলে গেল, ছেলেটাও আমাকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে এদিকে এসে তাঁবুর পথ দেখিয়েই উলটো দিকে দৌড় লাগাল৷’
সকাল থেকে আবার কুয়োর জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে৷ আমি দাদাকে বললাম, ‘এরা আমাদের জন্য কী না করেছে! দলের সর্দার ছেলেটা না থাকলে আমিও এখানে এমন আশ্রয় পেতাম না, তোমাকেও এভাবে ফিরে পেতাম না৷ চলো, ওদের সঙ্গে আমরাও হাত লাগাই৷ ওরা বালি খুঁড়ে জল বের করতে চায়৷’
‘মরুভূমিতে কুয়ো? সে কি সম্ভব?’
‘কেন, আমরা তো দুবাইয়ে আছি৷ এখানকার মরুভূমি তো পারস্য উপসাগরের কাছেই৷’
দাদা আমার মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘দুবাইয়ে নেমেছি বলে আমরা কি এখনও সেখানেই আছি? অনেক অনেক দূরে অসীম মরুভূমির গভীরে আমরা চলে এসেছি৷ দুবাই যে-দেশের রাজধানী সেই আরব আমিরশাহী থেকেও অনেক দূরে অন্য কোনো মরুভূমিও হতে পারে এটা৷ দস্যুরা তো আমাকে প্রথমে উটের পিঠে চড়িয়েই দিনের পর দিন ঘুরিয়েছে৷ প্রথম যে আস্তানায় আমাকে এনে রাখল সেটাই সাতাশ দিনের রাস্তা, যেতে যেতে আমি এক-একটা দিন গুনতাম আর মুখস্থ করে রাখতাম৷ যদি কখনো কোনো রক্ষীবাহিনী আসে আমাকে উদ্ধার করতে, তখন ওই দিনের হিসেবটা দূরত্ব বোঝাতে কাজে লাগবে৷’
দাদার কথা শুধু ওইটুকু শুনেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘আমার সবটাই পায়ে হেঁটে৷ তবে তুমি যেমন দস্যুর হাতে পড়েছিলে, আমাকে তেমনই উদ্ধার করেছে এমন একজন যাকে তুমি পীর বা ফকির বা দেবতাও বলতে পারো৷’
‘তাঁকে আর পাওয়া যায় না?’
‘শুধু পূর্ণিমায় তাঁকে পাওয়া যায়৷ পূর্ণিমার দু-দিন আগে আর দু-দিন পরেও তাঁকে চাঁদের তাঁবুতে পেতে পারি৷’
‘চাঁদের তাঁবু? মানে?’
‘তিনি বলেন, পূর্ণিমায় চাঁদ সারা রাত আকাশ পরিক্রমা করে ওই তাঁবুতে এসে জিরিয়ে নেয়৷’
‘দূর! তা আবার হয় নাকি?’ দাদা এক কথায় উড়িয়ে দিল৷
আমি মনের দুঃখ সয়েও বললাম, ‘দাদা, তুমিও এবার বড়োদের মতো কাউকে না জেনে না বুঝে চট করে তার বিচার করে ফেলছ!’
‘তাই বলে উদ্ভট আজগুবি অদ্ভুতুড়ে গালগল্পও বিশ্বাস করতে হবে? তার চেয়ে চল, বরং ওদের কুয়ো-কুয়ো খেলায় আমরাও ঢুকে পড়ি৷’
দাদার কি আর আমেরিকা যাওয়া হবে? সেখানে আমার স্কুলে ভরতি হবারই বা কী হবে? কুয়োর দিকে যেতে যেতে কথাটা তুলতে দাদার চটপট উত্তর, ‘তোকে ফিরে পেলাম, এর পর ওসব আর কে ভাবছে! তা ছাড়া এ বছরের তো সেমেস্টার শুরু হয়ে গেছে৷ আবার সামনের বছর দেখা যাবে৷’
সন্ধ্যে পর্যন্ত কুয়োর কাজ চলল৷ গোড়ায় আমাদের অসুবিধে হলেও অল্প সময়েই স্তূপের মতো বালি সাজিয়ে রাখার দক্ষতা এসে গেল৷ বালির পাহাড়ের নীচেই এরকম বেশ কয়েকটা বালির স্তূপে বিকেলের নরম রোদ পড়ে অনেকরকম ছবি ফুটে উঠছে৷ সেইসব ছবি দেখে বালি বয়ে আনার কাজটা আমার ভালো লাগতে লাগল৷ একসময় দেখলাম মরুভূমিতে বালির ঢেউয়ে লেগে থাকা গোধূলিবেলার আলো মুছতে মুছতে সূর্য অস্ত যাচ্ছে৷
