চাঁদের তাঁবু  – ৮

সারাদিন এই বালির জগতে, বালি খোঁড়ার কাজে আমাদের দিন কাটে৷ আকাশ রাঙিয়ে সূর্য ওঠে, মরুবালু জ্বালিয়ে সূর্য মাথার ওপর চড়ে, মরুভূমিতে রং ঢেলে সূর্য ডোবে৷ দাদা আর আমি তাঁবুতে শুয়ে মরুভূমি থেকে বেরোবার উপায় খুঁজতে থাকি৷

একদিন ভোর না হতেই দু-জনে খাটিয়ায় উঠে বসে দিকচিহ্নহীন মরুভূমি পার হবার পথ নিয়ে কথা বলছি, তাঁবুর দরজা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, দাদা কথা থামিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল, ‘কে একজন এদিকেই আসছে না?’

দু-জনে একই চাদর জড়িয়ে তাঁবুর বাইরে এসে দূরের আগন্তুককে লক্ষ করতে লাগলাম৷ খানিকটা কাছে আসতে দাদা বলে উঠল, ‘আরে! ও-ই তো আমাকে এই তাঁবুর পথ বাতলে দিয়েছিল৷ ঠিক এগারো দিন পর আবার এখানেই আসছে৷’

আমিও চিনেছি৷ এ-ই নিজের তাঁবুতে আমার থাকার ব্যবস্থা করেছিল৷ এখানকার ছেলেদের সর্দার৷ দাদার চাদর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমি দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরলাম৷ দুয়েক মুহূর্ত পরই বুঝলাম কান্না চাপবার চেষ্টা করতে গিয়ে সে ফোঁপাচ্ছে৷ হঠাৎ হু-হু কান্নার মধ্যে সে বলল, ‘আব্বাকে বালির নীচে শুইয়ে এলাম৷’

‘সে কী! বালির নীচে কেন?’

বুক ভাঙা কান্নার মধ্যে শোনা গেল-‘কবর দিয়ে এলাম৷ সেই ঘোড়ার মূর্তির পাশেই৷ কাল পূর্ণিমায় কবরের বালির ওপর জ্যোৎস্নাও বোধ হয় কান্নায় লুটোপুটি খেয়েছে!’

দাদা আমার পাশে এসে আমার মতোই কথা হারিয়ে ফেলেছে৷ দু-জনে দু-কারণে নির্বাক৷ তার আব্বা কে বুঝে, আমি আমার চেয়ে বয়েসে বড়ো ছেলেটার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কোনোরকমে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছিল?’

‘অসময়ে ভিস্তি ভরে জল আনতে গিয়ে রাক্ষসী পাখির সঙ্গে লড়াই করে তাঁর জীবন শেষ হয়ে গেল৷’

তাঁবুর দিকে এগোতে এগোতে চোখ মুছে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে ছেলেটা আবার বলল, ‘চলো, এই কুয়ো আমরা সবাই মিলে খুঁড়বই৷ আমার সামনে এখন অনেক কাজ৷’

দাদা এতক্ষণে শুধু বলতে পারল, ‘তোমার কাছে আমাদের দু-ভাইয়ের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই৷ যতক্ষণ পারি কুয়ো খোঁড়ার কাজে আমরাও হাত লাগাব৷ তারপর তুমি আমাদের মরুভূমি থেকে বেরোবার উপায় বের করে দিয়ো ভাই!’

‘তা তো করবই৷ তার আগে, অনেক দূরে পাহাড়ের মাথায় একটা হ্রদের কথা আব্বা বলে গেছে, শীতকালে জমে বরফ হয়ে থাকে, সেই হ্রদ থেকে মরুভূমিতে জল আনা যায় কি না দেখতে হবে৷’

দূরে মিলিয়ে যাবার আগে যতক্ষণ তাকে দেখা গেল, ততক্ষণ দাদা সেদিকে চেয়ে রইল৷ তারপর বলল, ‘পাহাড়ের মাথায় হ্রদ! সেখান থেকে খাল কাটার স্বপ্ন দেখছে? এ তো বদ্ধ পাগল রে, পমপম! আমাদের কি তাহলে এই মরুভূমিতেই জীবন কাটবে?’

আমি আর বললাম না যে ওর বাবাও এরকম ছিল৷ তার তাঁবুতে চাঁদ জিরোতে আসত৷ গা ঝাড়া দিয়ে তাঁবু ভরে চন্দ্রকান্তমণি ঝরাত৷ শুধু বললাম, ‘মনে হয় ও ফিরে এসে আমাদের ফেরার উপায় করে দেবে৷’

সেদিন থেকেই দাদার আবার দিন গোনা শুরু হল৷

আমি আর কী করি! সারা দিন বালি বয়ে বয়ে একজায়গায় জড়ো করি, যেন বালির পাহাড় বানাচ্ছি আর দিনের শেষে তাঁবুতে বসে ছবি আঁকি৷ মরুভূমিতে যা-যা দেখেছি তার মধ্যে যেগুলো কোনোদিন ভুলব না সেগুলো আঁকবার চেষ্টা করি৷ শেয়ালকাঁটা আর ফণিমনসার ফুল ঘষে রং বের করে তা দিয়ে যতটুকু যা পারি আঁকি৷ মরূদ্যানের ঘাস-ফুলের গ্রামে গিয়ে ফুল এনে তা থেকে রং বানাই৷ মরা মনসার গোড়া পুড়িয়ে কালো রংও আমি তৈরি করতে শিখেছি৷

এদের খাবারও আর আমাদের কাছে আগের মতো খারাপ লাগে না৷ দাদা আমি দু-জনেই মোট মোটা বজরার রুটি মিষ্টি খরমুজের রসে ভিজিয়ে দিব্যি খেয়ে নিই৷ ফণিমনসার পাতার তরকারি জিভে একটু হড়হড়ে লাগলেও খেয়ে ফেলি৷ তা ছাড়া মাঝে মাঝে প্রচুর বেদানার দানা মেশানো মুরগি বা কী-একটা পাখির ঝোল বা আর-কিছুর মাংসের কোর্মাও আজকাল অভ্যেস হয়ে গেছে৷

রাতে পাশাপাশি দুটো খাটিয়ায় শুয়ে মরুভূমিতে দস্যুদের হাতে বন্দি দাদার দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতার গল্প শুনি৷ দাদা এমনভাবে বলে যায় যেন বই থেকে কারও অভিযান-কাহিনি পড়ে শোনাচ্ছে৷ বালির নীচে সুড়ঙ্গের কথা কখনো কোথাও শুনিনি, কিন্তু দাদার ধারণা তাকে নাকি দস্যুরা বালির অনেক নীচে খুব লম্বা একটা সুড়ঙ্গে অনেকদিন আটকে রেখেছিল৷ খুব ঠান্ডা সেখানে৷ মরুভূমির ওপরে দুপুরের তাতে যখন গা পুড়ে যায়, নীচের সুড়ঙ্গে তখন নাকি মেদিনীপুরের মাঘের শীত৷

একদিন এরকম দাদার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছি, কে একজন তাঁবুতে ঢুকে চুপিচুপি আমার ঘুম ভাঙাল৷ হাতের ইশারায় আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘এখান থেকে সোজা সামনের দিকে হেঁটে যাবে৷ দু-বার সূর্যাস্ত না দেখা অবধি সোজাসুজি এগোতে থাকবে৷ পর দিন কাছে বা দূরে সূর্যোদয়ের সময় একজায়গায় খুব পুরোনো একটা দুর্গ দেখতে পাবে৷ পাথরে তৈরি প্রাচীনকালের সেই দুর্গের মাথার দিকটা শুধু বালির ওপর জেগে আছে৷ সেদিকেই মরুভূমি থেকে তোমাদের বেরোবার পথ৷’

আমি উত্তেজনা চেপে বললাম, ‘দাঁড়াও, দাদাকে ডেকে আনি৷’

‘না৷ আমার বন্ধু বলে দিয়েছে তোমার দাদার বিরাট কিছুতেই বিশ্বাস নেই৷ অসম্ভবকেও যে সম্ভব করা যায় সে তা বিশ্বাসই করে না৷ পথের কথাও তাই শুধু তোমাকেই বলতে বলেছে৷’

‘তোমার বন্ধু এখন কোথায়?’

‘পাহাড়ের মাথায় হ্রদের খোঁজে গেছে৷ ফিরতে যদি খুব দেরি হয়ে যায় তাই পথের কথা তোমাকে জানাবার জন্য আমাকে পাঠাল৷’

ছোটোবেলায় বাজ পড়ার শব্দে যেমন আমার বুক খালি হয়ে যেত, ছেলেটার কথা শুনে ঠিক তেমনই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল৷ কোনোরকমে বললাম, ‘তার সঙ্গে আর কি আমার দেখা হবে না?’

দেখা হবে, না কি হবে না-ঠিক কী বলে সে চলে গেল, অন্ধকার দমকা হাওয়ায় সেকথা শোনা গেল না৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *