২
সারা রাত আকাশের অনেক উঁচু দিয়ে উড়তে উড়তে একবারও না ঘুমিয়ে ভোর বেলা নামলাম মরুভূমির দেশে৷ এয়ারপোর্টে প্লেন থেমে যাবার পরও দাদার নাক ডেকেই চলেছে৷
সেদিন সন্ধ্যে বেলা হোটেলের এয়ারকন্ডিশন্ড ছোটো একটা বাসে মরুভূমির মধ্যে আমাদের নিয়ে খানিক এগোতেই পিছনের ঘরবাড়ি সব দৃষ্টির বাইরে চলে গেল৷ যেদিকে যত দূর চোখ যায়, শুধু বালি আর বালি৷ আরও এগিয়ে হঠাৎই থেমে গিয়ে বাসটা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে লাগল৷ সামনের দু-চাকাই নাকি বালিতে ডেবে গেছে৷ বাসটা একটুখানি পিছিয়ে এসে খুব জোরে বালির গাড্ডা থেকে যত বার উঠতে যাচ্ছে, তত বারই শুধু বিকট গোঁ গোঁ শব্দ৷ এক ফুটও এগোতে পারছে না৷
ড্রাইভার ও তার সহকারী বাদে বাসে যাত্রী বলতে, আমি, আমার দাদা আর তিনজন জাপানি দিদি৷ চাকার গোঁ গোঁ শুনতে শুনতে হঠাৎ বাজ পড়ার মতো ড্রাইভারদের গলা কানে যেতে সকলেই চমকে উঠেছে৷ বোঝা গেল দু-জনে প্রচণ্ড ঝগড়া করছে৷ ভাষা জানি না বলে কী নিয়ে ঝগড়া ঠিক বুঝতে পারছি না৷ শেষমেশ ওরা আমাদের সকলকে বাস থেকে নামিয়ে হাঁটিয়ে মরুভূমির আরও ভেতরের দিকে নিয়ে চলল৷
বাইরে আসতেই আগুনের প্রচণ্ড তাপ যেন আমাদের গায়ে মুখে আছড়ে পড়ল৷ আকাশ থমথমে৷ আমাদের দু-পাশ দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পোশাকে ঢাকা কয়েকজন লোক আমাদের পার হয়ে বালির ওপর দিয়ে হনহন করে দূরের দিকে চলে গেল৷ তাদের পায়ের ধাক্কায় বালি ছিটকে ছিটকে উঠছে৷ ড্রাইভারের তাড়ায় আমরাও পা চালিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছি৷ একে তো গরমে পুড়ছি, তার ওপর বালিতে হাঁটা!
‘এরা কোথায় নিয়ে চলল রে! সামনে না এগিয়ে যদি ফেরার পথ ধরত তাহলে হয়তো একসময় হোটেলে ফিরে যেতে পারতাম!’
দাদার গলার গুনগুন বাসেও বার কতক শুনেছি, এখন ভয় মেশানো গলা শুনে আমিও ভয় পেয়ে গেলাম৷ কেউ কারও ভাষা বুঝি না বলে ভয় যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে৷ আরবি, জাপানি আর বাংলা-হায়, কোনো ভাষার সঙ্গে কোনো ভাষারই মিল নেই!
দাদা ইংরেজিতে নানা ভাবে চেষ্টা করেও কিছু বুঝতে বা বোঝাতে পারল না৷
জাপানি দিদিরা শুধু খুব টেনে টেনে গলা দিয়ে হাউমাউ-জাতীয় শব্দ করে কিছু বোঝাতে চাইছে, আর আরবি দু-জন অন্যদের সমস্যায় পড়তে দেখেও বোবা কালা ও অন্ধ সেজে আছে৷
পিছন থেকে ‘হঠ যাও’ ‘হঠ যাও’-য়ের মতো আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটা লোক একটা বাচ্চা উটকে গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই গায়ের জোরে উড়ু-উড়ু বালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল৷ দূর থেকে দেখলাম উট বালিতে প্রত্যেক বার পা তোলবার আগে খুর সেঁটে রাখবার চেষ্টা করেও পারছে না৷
পিছন থেকে এসে একসঙ্গে কয়েকজন করে লোকের হনহনিয়ে আমাদের পার হয়ে চলে যাওয়া বেড়েই চলল৷ সব দলেই নানা বয়েসের মানুষ৷ বোরখা পরা মহিলাও আছে৷
হাওয়ার জোর ক্রমেই বাড়ছে৷ এক-একবার হাওয়া উঠে বালির পাতলা চাদর উড়িয়ে নিয়ে কাছেই বিছিয়ে দিচ্ছে৷ আমাদের মেদিনীপুরের বড়াইখালে জেলেদের হাতজাল ছোড়ার মতো এই বালির পাতলা চাদর আছড়ে পড়া দেখে তখনও বুঝিনি কী সাংঘাতিক ঝড় আসছে৷ হাঁটা তো দূরের কথা, চোখ-মুখে হাজার হাজার ছুঁচ ফোঁটার যন্ত্রণাই অসহ্য হয়ে উঠল৷ বাতাস যেন আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাবে! দাদা আমার সামনে এসে আমার একটা হাত শক্ত করে ধরতেই আমিও গায়ের জোরে দাদার হাত ধরে থাকলাম৷
বাসের কাউকেই কোথাও দেখা যাচ্ছে না৷ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷
মরুভূমির সাংঘাতিক ঝড়ে দু-জনে দু-জনকে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি৷ এগোবার বা পেছোবার কথা ভাবতেও পারছি না৷
হাওয়া যেন রাগে গর্জন করতে করতে আমাদের ধাক্কা মারতে লাগল৷ একসময় হাওয়ার বিরাট একটা ঝাপটায় ছিটকে গিয়ে কে কোথায় উড়ে গেলাম৷
চোখ খুলে দেখার উপায় নেই, সারা মুখে ঝাঁক ঝাঁক ছুঁচ ফুটছে, নাক দিয়ে শ্বাস টানাও অসম্ভব৷ হাওয়ার কিল-ঘুসি থেকে বাঁচবার শেষ চেষ্টায় দু-হাতে কান-চোখ ঢেকে উটের মতোই হাঁটু গেড়ে উট পাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে ভাবতে লাগলাম দাদাকে কোথায় পাব?
অনেক পরে দাদা দু-কাঁধ ধরে আমাকে উঠিয়ে বলল, ‘একটু পা চালিয়ে চলো, রাত শেষ হবার আগেই আমাদের কুয়োর কাছে পৌঁছোতে হবে৷’ বিপদে পড়লে দাদা আমাকে ‘তুমি’ বলে৷ গলার স্বর ভয়ে যেন বদলে গেছে৷
এমন স্বর শুনেই অবাক হয়েছিলাম, চোখ খুলে দেখলাম কোথায় আমার দাদা, এ তো সাদা পোশাকে পা অবধি ঢাকা শীর্ণ চেহারার একটা লোক৷ ধপধপে সাদা চুল-দাড়ির ফাঁক দিয়ে মুখের যেটুকু দেখা যাচ্ছে-কুচকুচে কালো লোকটা আমার হাত ধরে আছে৷ কুয়োর কথা শোনামাত্র তৃষ্ণায় আমার মুখের তেতো ভাব বেড়ে গেল, গলা অনেকক্ষণ থেকেই শুকিয়ে কাঠ৷
লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে ভরসা পেলাম, জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার দাদা কোথায়? দাদা হয়তো কাছেই কোথাও পড়ে আছে!’
‘এখানে তুমি একাই ছিলে৷ আর কেউ নেই৷ এখন চলো, আগে কুয়োর কাছে যেতে হবে৷’
লোকটার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতেই বললাম, ‘কুয়োয় জল আছে?’
‘কুয়ো ভরা জল৷ জল না বলে উটের দুধও বলতে পারো৷’
কথা বলতে কষ্ট হয়, তবু না বলে পারলাম না, ‘উটের দুধ? কুয়োর মধ্যে? সে কীরকম?’
‘পরে শুনলেও চলবে৷ এ হল সেই পৌরাণিক যুগের কুয়ো৷ যখন এখানে ঘন জঙ্গল ছিল৷ এখন পা চালাও৷ সূর্য ওঠার আগেই তোমাকে পৌঁছোতে হবে৷’
‘সূর্য উঠে গেলে কি জল গরম হয়ে যাবে?’
লোকটা বোধ হয় মনের উদ্বেগ চেপে কথা বলল, ‘সে কথা নয়৷ এ জল সব সময়ই ঠান্ডা৷ কিন্তু রাক্ষসী পাখি এসে গেলে আর কেউ কুয়োর ধারে-কাছে যেতে পারে না৷ গেলে রাক্ষসী পাখি তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে হাজার টুকরো করে বালিতে ছড়িয়ে দেবে৷ বালিতেই তা ঢাকা পড়ে যায়৷ ভোর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ওই রাক্ষসী পাখি বালির ঢেউয়ে শরীর পেতে কুয়োর পাড়ে গলা উঁচিয়ে দুই ডানায় মরুভূমি ঢেকে ঝিমোয় আর প্রহরে প্রহরে শুধু জল খায়৷’
ঝড় থেমে গেছে৷ চারদিক শান্ত, কোথাও কোনোরকম শব্দ নেই৷ মাঝে মাঝে ঠান্ডায় গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷
হাঁটতে হাঁটতে গতি হয়তো একটু কমে এসেছিল, লোকটা আমার হাত টেনে ধরে বলল, ‘ছুটতে পারবে?’
‘জোরে হাঁটার চেষ্টা করছি৷ দেরি হলে কি জল নীচে নেমে যাবে?’
‘সূর্য উঠে গেলে আর সেখানে যাওয়া যাবে না৷ সারা রাত ধরে চেনা-অচেনা জন্তুর দল জলের জন্য কুয়োর চারপাশে ভিড় করে, তারাও এতক্ষণে হয়তো পালাতে শুরু করেছে৷ দূর থেকে রাক্ষসী পাখির ডানার দেখা পাওয়া বা ডানার আওয়াজ শোনার আগেই তারা জল খাওয়া শেষ করে, বা না করে দৌড় লাগাবে৷’
ভাগ্য ভালো, পাখিটা আসবার আগেই আমরা উঁচু-নীচু বালির ঢেউ পেরিয়ে কুয়োর কাছে পৌঁছে গেলাম৷ চারদিকে বহু দূর পর্যন্ত বালির টিলায় ঘেরা পাথরের কুয়ো৷ মরুভূমিতে জল থাকে না অথচ এই কুয়ো ভরা জল৷ লোকটা ঠিকই বলেছিল, জল-মেশানো দুধের মতো পাতলা টলটলে৷
তখনও কুয়ো ঘিরে কুকুর বা শেয়ালের মতো দেখতে জন্তুর পালের পাতলা ভিড়৷ তার মধ্যেই কুয়োর পাড়ে বাঁ-হাতে ভর দিয়ে মুখ নামিয়ে আমি যতক্ষণ পারলাম ডান হাতের আঁজলা ভরে জল খেলাম৷ বুড়োটা কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে হাড়ের তৈরি দেড়-দু-ফুট লম্বা একটা নল বের করে একটুও না ঝুঁকে সেই নল দিয়ে কুয়ো থেকে জল খেল৷ আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে ঢোলা জোব্বার হাতায় মুখ মুছে নিয়ে বলল, ‘উটের পায়ের হাড় থেকে বানানো এই নল আমাদের অনেক কাজে লাগে৷ আর এই কুয়োর জলকে আমরা মরুভূমির লোকেরা কেন উটের দুধ বলি জানো? শুধু হালকা সাদা রঙের জন্য নয়, মিঠে স্বাদের জন্যও৷ এমন মিঠে জল আর তুমি কোথায় পাবে!’
জল খাওয়া শেষ করে বালির একটা উঁচু স্তূপের ছায়ায় বসে দাদার কথা ভাবছি, ভাবছি এত বড়ো মরুভূমিতে দাদাকে কোথায় খুঁজব, তা ছাড়া দুবাইয়ে এক রাতের যাত্রাবিরতিতে হোটেলে ঘুমিয়ে নেবার যে ব্যবস্থা ছিল, বালির বুকে রাতের ভোজের মতো সেটাও পণ্ড৷ এখন আমাদের আমেরিকা যাবারই বা কী হবে? ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না৷ এখানে বসে বসে শুধুই সময় নষ্ট৷
আমি উঠে দাঁড়াতেই লোকটা আমার হাত টেনে বসিয়ে দিল৷ আমাকে রাক্ষসী পাখি দেখাবে বলে বালির স্তূপের আড়াল থেকে সে কুয়োর ওপরের আকাশে চোখে রেখে বসে আছে৷
প্রথমে দূর থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ, তারপর বিরাট চেহারার পাখিটাকে দেখতে পেলাম৷ মরুভূমিতে বালির ঝড় তুলে যখন কুয়োর ওপরে এসে পৌঁছেছে তখন তার দুই ডানায় আকাশ অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে৷ পাখি এত বড়ো? দেখে ভয় লাগে৷ যেসব কুকুর বা শেয়াল-জাতীয় জন্তুর পাল ভিড় করে আমাদের আগে থেকেই জল খাচ্ছিল ততক্ষণে তারা সবাই অদৃশ্য হয়ে গেছে৷
‘ভয় পেয়ো না৷ নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়৷ রাক্ষসী পাখিও তোমাকে চিনিয়ে দিলাম৷’ একথা বলে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে যে দিকে পাখি তার উলটো দিকে চলে গেল৷
