৫
তাঁবুর কাছাকাছি আসবার আগে, বেশ কিছুটা দূর থেকে তাঁবুর মাথা দেখা যায়৷ আরেকটু এগিয়ে তাঁবুর সামনে অনেক মানুষের ভিড় দেখে আমি আমার সঙ্গীর মুখের দিকে তাকালাম৷
‘পূর্ণিমার পরের ক-টা দিন চন্দ্রকান্তমণি নিতে ভোর বেলাতেই এমন গরিব মানুষের ভিড় হয়৷ একটু পা চালিয়ে, ভাই৷’
ভোরের এই সময়টা এখানে রাতের মতোই ঠান্ডা৷ কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের গায়ের ছেঁড়া চট বা কাপড়ের ফালি জড়ানো৷
তাঁবুর ভেতরে জমাটবাঁধা বালির মেঝেয় তখনও অনেক পাথরকুচি ছড়ানো৷ এক কোণে পাথরকুচির স্তূপ থেকে হালকা জ্যোৎস্নার আভা বেরোচ্ছে৷
সেদিনের মতো চাঁদের পাথর বিলানো শেষ হলে তাঁবুর মালিক আমাকে বলল, ‘তুমি এখানেই জিরিয়ে নাও৷ এই খরমুজা আর খেজুর রইল, যত খুশি খেয়ো৷ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মরুভূমির তাপও বাড়বে৷ বেলা শেষে সূর্য কিছুটা শান্ত হলে আমি এসে তোমাকে ডাকব৷’
যাবার আগে লোকটা তাঁবুর পাশের ঘোড়াটার কপালে হাত রেখে বিড়বিড় করে কিছু বলছে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ঘোড়াটা কি সত্যিকার ঘোড়া, না ঘোড়ার মূর্তি? প্রথম দিন যেভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, আজও সেই একভাবে দাঁড়িয়ে আছে৷’
লোকটা ঘোড়ার কপালে হাত রেখেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল৷ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমার ছেলের ঘোড়া৷’
আবার খানিকক্ষণ চুপ৷ আমিও আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না৷
একটু পরে লোকটা নিজেই বলে গেল, ‘ছেলেটা যেমন ঘোড়াটাকে ভালোবাসত, ঘোড়াটাও তেমনই ছেলেটাকে৷ একদিন, কে জানে কীসের খোঁজে, ছেলে আমার কোথায় চলে গেল৷ দিন কেটে গেল, রাত কেটে গেল আর ফিরল না৷ মরুভূমির এদিক-সেদিক কতদিকে কত খুঁজলাম তাকে আর কোথাও পেলাম না৷
‘ঘোড়াটা এক জায়গায় একভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ প্রথম প্রথম সারা দিন সারা রাত আকাশে মুখ তুলে চিহিঁহিঁ করে ছেলেটাকে খুব ডাকাডাকি করত৷ তারপর ক্রমশ চুপ হয়ে গেল৷ তাঁবুর যে দিকটায় আমার ছেলে রাতে ঘুমোত, সেই দিকে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত৷ দানাপানি সামনে দেখেও একবারের জন্য একটা দানা কি এক ফোঁটা পানি মুখে দিত না৷
‘একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সে একদিন মারা গেল৷ ছেলের স্মৃতি তো রেখে দেবার মতো কিছুই নেই, তার ভালোবাসার ঘোড়াটার মূর্তিই তাই গড়ে রেখেছি৷ যদি কোনো দিন সে ফিরে আসে, তার ঘোড়াকে সে অবিকল আগের মতোই দেখতে পাবে৷’
যাকে সাধারণ একটা ঘোড়া বলে ভেবেছিলাম, তারও যে এমন জীবনকাহিনি আছে না শুনলে জানাই হত না৷ যে মানুষটির দয়ায় আমি এখনও বেঁচে আছি তার মনেও কত দুঃখ, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই৷ সব শুনে আমি না জিজ্ঞেস করে পারলাম না, ‘ছেলে কেন ফিরে আসেনি বলে মনে হয়? কোথায় গেছে জানো?’
‘মাঝে মাঝেই এরকম কীসের খোঁজে কোথায় চলে যায়৷ কোথায় যায় কেউ জানে না৷ দিনের শেষে আবার ফিরেও আসে৷ কখনো হয়তো ফিরতে দুয়েক দিন দেরি হয়েছে, কিন্তু ফিরেছে ঠিকই৷’
একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘এবার আর ফিরল না৷ রোজ ভোরে যারা চন্দ্রকান্তমণির টানে তাঁবুতে আসে, তাদের একজন একবার বলেছিল, ছেলেটাকে নাকি লুটের হাটে সে দেখেছে৷’
মরুভূমিতে উটের হাট আগে শুনেছি, কিন্তু লুটের হাট কী? জিজ্ঞেস করতে লোকটা বলল, ‘যেখানে লুটের জিনিস কেনাবেচা হয়৷ জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে মানুষকেও সেখানে বেচে দেয়৷ পরদেশিরা সেই লুটের হাটের বড়ো খদ্দের৷’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটু চুপ করে থেকে যোগ করল, ‘যে গ্রামে তুমি গিয়েছিলে, সেখানকার সবুজ ঘাস আর রঙিন ফুল গাছ আমার ছেলের হাতে তৈরি৷ কখন কোথা থেকে কীসের বীজ এনে মরুভূমির বুকে কী উপায়ে ঘাস গজাল, ফুল ফোটাল, মুখ ফুটে কখনো কাউকে বলেনি৷’
ওর ছেলে এসব করেছে শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম৷ তা দেখে লোকটা যোগ করল, ‘ও যখন খুব ছোটো তখন একবার ওকে নিয়ে আমি একটা রঙিন ফুলের দেশে গিয়েছিলাম৷ সেখানে আকাশ ঢেকে ছোটো-বড়ো ফুলের গাছে শুধু রঙিন ফুল৷ সব দেখে আমার ছেলের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ এখানে ঘাস-ফুল সৃষ্টির ইচ্ছা তখনই ওর মনে বাসা বেঁধেছিল৷
