চাঁদের তাঁবু  – ৩

সকালে বালির স্তূপের ছায়া যেমন লম্বা শুয়ে পড়েছিল, সূর্যাস্তের আগে আবার তেমনই লম্বা ছায়া, এবার স্তূপের অন্যদিকে৷ দুঃখে, খিদেয়, ক্লান্তিতে দিশেহারা হয়ে বালির স্তূপের আড়ালে শুয়ে শুয়েই দিনটা কেটে গেল৷ সূর্য ডোবার সঙ্গে পাখিটা তার বাসায় ফিরে যাবে৷ তখন আবার পেট পুরে জল খেয়ে দাদার খোঁজে যতদূর যেতে হয় যাব৷

দূরে সূর্য পুরোপুরি বালিতে মিশে যাবার আগে থেকেই পুব আকাশে গোল চাঁদ চোখে পড়ল৷ আমিও বালি থেকে উঠে যেদিকে চোখ যায় হাঁটতে লাগলাম৷

হাঁটতে হাঁটতে রাত কত হল জানি না, হয়তো প্রায় শেষ হয়ে আসছে৷ অথবা পূর্ণিমার আলোয় মরুভূমিতে সেভাবে রাতের অন্ধকার নামেনি৷ একসময় দূরে একটা বিরাট তাঁবু দেখতে পেয়ে সেদিকে এগোতে লাগলাম৷

সাদা ধপধপে তাঁবুর পাশেই একটা কালো ঘোড়া৷ মস্ত বড়ো তাঁবুর ঠিক পিছনে বিরাট একটা গোল চাঁদ৷ প্রায় তাঁবুর মাথায় এসে বসেছে৷ এই চাঁদই আমি সন্ধ্যে নামার আগে প্রথমে পুব আকাশে দেখেছি৷

‘এখানে আসবে আমি জানতাম৷’ বলতে বলতে তাঁবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই বুড়ো লোকটা৷ কাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত যে আমার শুধুই উপকার করে গেছে৷

মরুভূমির মধ্যে আশপাশে আর কোথাও এত বড়ো তাঁবু আমি দেখিনি৷ বিশেষ করে এত উঁচু তাঁবু৷ তাঁবুর মালিক নিজে কিন্তু খুব লম্বা নয়৷ এখানেও পা থেকে গলা পর্যন্ত সাদা পোশাকে ঢাকা শরীরের মুখটুকু শুধু বেরিয়ে আছে৷ সাদা চুলদাড়ির ফাঁকে সেই পালিশ করা কুচকুচে কালো কাঠের মতো মুখ৷

এত বড়ো একটা তাঁবুতে লোকটার বাসা! খুব অবাক হয়েছি দেখে লোকটা আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বলল, ‘আমি মালিক নই, তাঁবুটা আসলে চাঁদের৷ পূর্ণিমায় চাঁদ সারা আকাশ ঘুরে শেষরাতে এই তাঁবুর পিছনে এসে বিশ্রাম করে৷ রোদ না ফোটা অবধি৷ তারপর নিজের জগতে চলে যায়৷’

মালিক নয়, তাহলে ইনি কে? তাঁবুতেই বা কী করছেন?

আমি তার মুখের দিকে চেয়ে আছি বুঝতে পেরে তিনি কাছে এসে আমাকে ডেকে নিলেন-‘এত দূর এসেছ যখন, তাঁবুতে দু-দণ্ড বসে যাও৷’

তাঁবুর ভেতরে পা দিয়ে দেখি মেঝেময় নুড়ি পাথরের ছড়াছড়ি৷ অনেকটা মুক্তোর মতো, তবে মুক্তোর চেয়ে বড়ো৷ অসংখ্য নুড়ি তাঁবুর এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত ছড়ানো৷ অথচ তাঁবুর বাইরে আদিগন্ত শুধু বালি৷

আকাশে তখনও সূর্যোদয়ের ছোঁয়া লাগেনি, এদিকে জ্যোৎস্নাও ফিকে হয়ে এসেছে, তাহলে চারদিক বন্ধ তাঁবুর ভেতরে এমন জ্যোৎস্নার মতো আলো কী করে হয়?

আমি খেজুর গাছের কাটা গুঁড়ির ওপর বসে এসব ভাবছি, লোকটা বড়ো একটা পাথরের গেলাস এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘খেয়ে তেষ্টা মেটাও৷ এ হল খরমুজার রস৷ যেমন ঠান্ডা তেমনই মিষ্টি৷’ সত্যিই তাই৷ কয়েক চুমুকে রস শেষ করে মরুপথের ক্লান্তি কেটে গেল৷

আমার সামনেই আরেকটা খেজুর গাছের কাটা গুঁড়ি৷ ঘষে ঘষে মসৃণ করা৷ লোকটা তার ওপর এবার খেজুর পাতায় বোনা থালায় একগাদা খেজুর রেখে বলল, ‘খাও৷ এমন মিষ্টি আর কোনো ফলে তুমি পাবে না৷’

এ হল মরূদ্যানের বড়ো বড়ো খেজুর, মিষ্টি তো বটেই, তন্দুরি রুটির মাখা-আটার মতো নরম৷ দানাও বেশ সরু৷

কালো মুখের হাসিও বড়ো মিষ্টি, তার ওপর যখন মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল তখন তার প্রত্যেকটা কথাই মনে হল সত্যি৷

লোকটা বলল, ‘সারা রাত আকাশ ঘুরে এসে চাঁদ স্বয়ং এই তাঁবুতে বিশ্রাম করছে৷’

অবিশ্বাস করব কী, আমি চমকে গিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালাম৷ লোকটার মতোই ফিসফিস করে বললাম, ‘চাঁদ? এই তাঁবুর ভেতর? কই, দেখছি না তো!’

‘চাঁদের মাপ জানো? এই তাঁবু তো ছাড়, গোটা মরুভূমিটার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বড়ো৷ চাঁদ নামে পৃথিবীর এই উপগ্রহ দেখতে অনেকটা সোনার থালার মতো জানো নিশ্চয়ই? একটা থালাকে লক্ষ কোটি গুণ বড়ো করলেও চাঁদের মাপের তুমি নাগাল পাবে না৷ সেই চাঁদকে এত কাছে এসে দেখা যায় নাকি! আকাশে যে চাঁদ দেখো, সেটা কোটি কোটি মাইল দূর থেকে দেখো বলেই দেখতে পাও৷ তাঁবুর ঠিক পিছনেই মস্ত বড়ো চাঁদ দেখোনি তুমি? তাঁবুর টানে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে এসে বিশ্রাম নিচ্ছে৷’

বিজ্ঞানের দিক থেকে কথাটা নিয়ে আমি ভাবছি দেখে লোকটা আবার বলল, ‘তুমি তো এখন পৃথিবীতেই আছ, গোলাকার পৃথিবীটা কি তুমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছ? পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মাইল দূরের কোনো গ্রহ থেকে যদি পৃথিবীর দিকে তাকাও, আকাশে ঠিক চাঁদের মতোই পৃথিবীকেও দেখতে পাবে৷’

কিছুই বুঝতে না পেরে বললাম, ‘এই নুড়ি পাথরের মতো এখানে এগুলো কী?’

‘সবই চাঁদের পাথর৷ চন্দ্রকান্তমণি৷ এই রত্নপাথর রোজই চাঁদের গা থেকে খসে পড়ে৷ চাঁদ নিজেই গা ঝাড়া দিয়ে এগুলো ঝরায়৷ কেন জানো?’

জিজ্ঞেস করেই লোকটা চুপ করে গেল৷ কারণটা জানি না তাই আমিও চুপ৷ একসময় ধীরে ধীরে লোকটা আবার মুখ খুলল-‘এই মরুভূমিতে ভীষণ গরিব যত লোক আছে তাদের দেবার জন্য, যাতে দূর শহরে গিয়ে তারা এগুলো বেচে পেটের খিদে মেটাবার রুটি, আর রাতে শীতের কামড় থেকে বাঁচবার কম্বল জোটাতে পারে৷’

কথা শেষ করে লোকটা এত জোরে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যে সামনের দশ-বারো হাত বালিও যেন ছটফট করে উঠল৷

‘এতে যদি তারা খেতে-পরতে পায় তাহলে তোমার এই দীর্ঘশ্বাস কেন?’

লোকটা এ বারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘চাঁদই যদি না বাঁচে, তাহলে চাঁদের পাথর আর পাব কী করে?’

চাঁদের আবার মৃত্যু হয় নাকি? আমি এতই অবাক হয়ে গেলাম যে, চাঁদ কেন আর নাও বাঁচতে পারে বলে তার মনে হচ্ছে, তা জিজ্ঞেস করতে পারলাম না৷

লোকটা নিজের মনেই বলে চলল, ‘চাঁদকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যাবে কি না কেউ জানে না৷ পৃথিবীটাই বা কত দিন বাঁচবে! চাঁদ-পৃথিবীর ওপর রাক্ষসদের লোভ তো আজকের নয়, সেই প্রাচীন কাল থেকে৷’

এ হয়তো কোনো পৌরাণিক কাহিনির কথা৷ আমার ক্লান্ত মাথায় ঢুকবে না৷ শেষ অবধি মানুষটার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে এসে দেখি, চাঁদ তাঁবুর মাথায় বসে আছে৷ এত কাছ থেকে এমন বিরাট চাঁদ কোথাও আমি দেখিনি৷

পৃথিবীর যেখানেই যাও সেখানেই চাঁদ দেখা যায়৷ মনে হবে তোমার সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে৷ অথচ দাদা এই মরুভূমিরই কোথাও হারিয়ে আছে, আমার সঙ্গে দেখাই হচ্ছে না৷

চাঁদ আকাশ থেকে সবাইকে দেখতে পায়, আমার দাদাকেও দেখতে পাচ্ছে, তবু আমি দাদাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?

উদ্ভট সব চিন্তা করতে করতে যেদিকে পারি সেদিকে চলেছি, মরুভূমিও সকালের রোদে গরম হতে শুরু করেছে৷

এর মধ্যে কয়েক জায়গায় মরীচিকা দেখেছি৷ দূর থেকে মনে হয় সামনেই খাল বা হ্রদ৷ কোথাও দিঘির জল চিকচিক করছে৷ যতই কাছে যাই, জল ততই দূরে সরে যায়৷

অনেক দূরে একটা তাল-খেজুর গাছের জটলার মতো দেখে মনে হল এও বুঝি মরুভূমির কোনো মরীচিকা৷

আরও এগিয়ে চোখে পড়ল কয়েকটা খেজুর গাছ৷ রঙিন ফুলে রাঙা ঝোপও চোখে পড়ল৷ কাছেই কয়েকটা ঘরবাড়িও দেখা যাচ্ছে৷ মনে হয় কোনো গ্রাম৷ কিন্তু এ কখনো সম্ভব? ধুধু মরুভূমিতে প্রচণ্ড রোদে নিশ্চয়ই আমি জেগে স্বপ্ন দেখছি৷

আরও কাছে গিয়ে বুঝলাম, স্বপ্ন নয়, রঙের মরীচিকা নয়, সত্যিই একটা আস্ত গ্রাম৷ ছোট্ট মরূদ্যান৷ কিন্তু মরূদ্যানের যেসব ছবি দেখেছি, তাতে কোথাও রঙিন ফুলের মেলা দেখেছি কি?

বোরখার মতো লম্বা ঢোলা পোশাক পরা একজন মহিলা ঘরের সামনেই একটা কুয়োয় বালতি নামাতে নামাতে অচেনা বিদেশি আমাকে আসতে দেখে আমার মুখের দিকে চেয়ে আমাকে বুঝতে চাইছে মনে হল৷ তার মুখ কিন্তু খোলা৷ আর বোরখার রংও কালো নয়, সাদা৷

যখন কুয়োর সামনে এলাম, ততক্ষণে মহিলা কুয়ো থেকে জলভরা বালতি টেনে তুলেছে৷ চামড়ার বালতি৷ পুরু চামড়া, মোটা সুতোর মতো কিছু দিয়ে সেলাই করা৷ কুয়োর পাড় পাথরের চাঙর দিয়ে বাঁধানো৷

ঘরের সামনেই আমাকে বসতে দিয়ে বড়ো খেজুর পাতার থালা-ভরতি খেজুর আর খরখরে ভারী পাথরের গ্লাসে জল এগিয়ে দিল৷ অদ্ভুত তৃপ্তিতে আর শান্তিতে আমার মন ভরে গেল৷ আমার ভয়, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা কয়েক মুহূর্তের জন্য মন থেকে মুছে গেছে৷ নরম মিষ্টি খেজুরে খিদে মিটিয়ে কুয়োর ঠান্ডা জলে তৃষ্ণা দূর করে ভাবছি আমি এদের কী দিতে পারি, এমন সময় ঘর থেকে আরেকজন মহিলা কোলে ছ-আট মাসের একটা ফুটফুটে ছেলে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল৷ এখানকার মহিলারা সবাই দেখছি বোরখার মতোই ঢিলে-ঢালা পোশাক-পরা, তবে বোরখার রং সাদা, মুখেও ঢাকনা নেই৷ মহিলা আমার হাতের আঙুলের সোনার আংটি দেখিয়ে তার ছেলের জন্য চাইল৷ দুর্বোধ্য ভাষায় আকারে-ইঙ্গিতে বোঝাল, ছেলেটা আমার মতো বড়ো হয়ে এই আংটি পরবে, আর তা দেখে ওদের আমার কথা মনে পড়বে৷

এই আংটি আমার উপনয়নের সময় দাদু আমাকে দিয়েছিলেন৷ আংটিটা খুলে ওই শিশুর হাতের মুঠোয় দিয়ে দিলাম৷ সে কিছু না বুঝেই গালভরা হাসি হাসল৷

ঘরের পিছনেই দিগন্ত পর্যন্ত খোলা প্রান্তর৷ তার ওপর দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ভয়ানক চেহারার একটা লোক ঘরবাড়ি প্রায় আড়াল করে আমার সামনে এসে দাঁড়াল৷ জোরে একটা হাঁক পেড়ে আমাকেই বলল, ‘ওরে মাল-বওয়া খোঁড়া উটের বাচ্চা! আমার হাঁটুর কাছে এসে দাঁড়া দেখি, দেখ তো তোর মাথা আমার হাঁটু ছাড়াতে পেরেছে কি না৷’

লোকটার চোখ-মুখ সাংঘাতিক, তার চেয়ে সাংঘাতিক তার দেহের উচ্চতা৷ মাথা প্রায় আকাশে গিয়ে ঠেকছে৷ আর তেমনি পেশীবহুল চেহারা৷

আমার মাথা লোকটার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছোতেই পারেনি শুনে সে মহাখুশি হয়ে বলল, ‘চাঁদ কি আমার চেয়েও উঁচুতে ঘুরে বেড়ায়?’

তার প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, ‘পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হল তিন লক্ষ চুরাশি হাজার চার-শো তিন কিলোমিটার৷’

লোকটা আমার কথা বুঝল বা বিশ্বাস করল বলে মনে হল না৷ দূর থেকে চাঁদের তাঁবুর মালিককে আসতে দেখে বলল, ‘ওই তো, ওর তাঁবুর মাথায় নাকি পূর্ণিমার চাঁদ নামে, ওকেই জিজ্ঞেস করব৷ তবে ও আবার আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না৷ ওর ধারণা আমি নাকি রাতকানা, রাতের আকাশে চাঁদ দেখা আমার কম্ম নয়৷’

তাঁবুর মালিক সোজা আমার কাছে এসে আমার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘চলো, তোমাকে এই মরুরাজ্যের এক অদ্ভুত রাজার কাছে নিয়ে যাব৷’

কথাটা শুনেই লম্বা লোকটা চিৎকারে চারপাশ কাঁপিয়ে বলল, ‘কোত্থাও যেতে পারবে না! আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও৷ মরুভূমির সবচেয়ে লম্বা মানুষের চেয়েও চাঁদ উঁচুতে থাকে কী করে?’

‘তুমি রাতকানা বলে রাতে কি একেবারেই দেখতে পাও না?’

কথাটা কানে না তুলে লম্বা লোকটা এবার গর্জে উঠে বলল, ‘আমার কথার জবাব দাও৷ পূর্ণিমার শেষ রাতে চাঁদ কি সত্যিই তোমার তাঁবুতে এসে জিরোয়?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *