চাঁদের তাঁবু  – ৪

আমার দাদা কোথায় কীভাবে আছে জানি না৷ তাকে কোথায় কোন দিকে খুঁজব?

লোকটার কাছ থেকে তাঁবুর মালিক ছাড়া পেতেই আমি বললাম, ‘অদ্ভুত কোন রাজার কাছে নিয়ে যাবে বললে? সে কোন দিকে, কোথায়? সেখানে কি আমার দাদার দেখা পাব?’

‘এখান থেকে তিন দিনের পথ৷ এদের কাছ থেকে ঠান্ডা জল আর এক থলে খেজুর সঙ্গে নিই৷’

‘জল কী করে নেবে?’

‘কেন, ভিস্তিতে করে৷ চামড়ার এই ভিস্তি তুমি আগে দেখোনি?’ বলে সে কুয়ো থেকে জল তুলে সঙ্গের ভিস্তিতে ভরতে লাগল৷ অনেকটা উটের পেটের মতো ধূসর রঙের চামড়ার ভিস্তি৷

ভিস্তিতে জল ঢালতে ঢালতেই বলল, ‘লম্বুটার ঘাড় একদিক বেঁকে আছে লক্ষ করেছ? শেষরাতের চাঁদ দেখার আশায় মাঝরাত থেকেই আকাশের অনেক উঁচুতে চোখ মেলে দাঁড়িয়ে থাকে৷ ওর ঘাড়টা তাতেই বেঁকে গেছে৷ শেষ রাতে চাঁদ যখন তাঁবুর গায়ে, তখনও ও অনেক উঁচুতে চাঁদ খোঁজে৷’

ঘাড় বাঁকা কি না আমার মনে পড়ল না, আমি শুধু ভাবছি তিন দিনের পথ মানে খুবই দীর্ঘ পথ৷ এতটা পথ যেতে যেতে কোথাও হয়তো দাদার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে৷

জলভরা ভিস্তি আর থলেভরা খেজুর নিয়ে লোকটা আমাকে নিয়ে রওনা হল৷ বেশ কিছুটা দূরে এসে বলল, ‘যেখানে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি সেটা প্রাচীনকালের এক রাজার প্রাসাদ৷’ একটু থেমে আবার বলল, ‘বড়োরা দেখবে সবসময় বড়ো বড়ো কিছু পেতে চায়, আবার সেজন্য অনেক আসল জিনিস তাদের হারাতেও হয়৷ সেই প্রাচীনকালেও এরকমই ছিল৷ তখনকার এমনই একটা ভয়ংকর ঘটনা তোমাকে দেখাতে চাই৷ কেন জানো? সেই রাজাকে আমি যতবারই দেখি, দুঃখে আমার বুক ফেটে যায়৷ সেই দুঃখ আমি কাউকে বোঝাতে পারি না৷ তুমি ঠিক বুঝবে৷’

হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ব্যথা করতে লাগল, তবু দাদার কোনো চিহ্নই কোথাও দেখা গেল না৷ শেষপর্যন্ত কথাটা তাঁবুর মালিককে না বলে পারলাম না৷ বালিতে আমাদের বাসের চাকা আটকে গিয়ে বালির ঢেউয়ে কী করে নেমে পড়তে হল, তারপর সাংঘাতিক মরুঝড়ে দু-ভাই কে কোথায় হারিয়ে গেলাম, যতটা পারি বুঝিয়ে বললাম৷

তাঁবুওলা আমার সব কথা মন দিয়ে শুনল৷ তারপর বলল, ‘মরুভূমিতে যেকোনো জিনিস অনেক দূর থেকেও দেখা যায়৷ আমি তোমাকে প্রথম যেখানে দেখেছিলাম সেখান থেকেই কি তোমাদের দু-জনের ছাড়াছাড়ি?’

‘হাওয়ার ঝাপটায় আমি ওখানেই এসে মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম৷ বালির তোড়ে চোখ খুলে দেখবার সুযোগ পাইনি৷’

শুনে লোকটা চিন্তায় ডুবে গেল৷ হাঁটতে হাঁটতে একবার শুধু দূর থেকে ঝাপসা মতো একটা উটপালককে দেখতে পেয়ে বলল, ‘দাঁড়াও, যদি তোমাকে উটে চড়িয়ে বাকি পথটা নিয়ে যেতে পারি!’

উটপালক কাছে আসতেই তাঁবুর মালিক তাকে থামিয়ে নিজেদের ভাষায় কী বলাবলি করে আমাকে বলল, ‘ওকে আর ওর উটকে এখনই পেট ভরে জল খেতে দিলে ও তোমাকে উটের পিঠে চড়িয়ে রাজার কাছে পৌঁছে দেবে৷’

উট ও তার পালকের জলপান হয়ে গেলে উটটাকে হাঁটু গেড়ে বসানো হল, আমি যাতে সহজে পিঠে উঠতে পারি৷ কাছে গিয়ে চিনতে পারলাম এ তো সেই কয়েকদিন আগের দেখা লোকটা, যে একটা বাচ্চা উটকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল৷

আমার উপকারী সঙ্গীকে সে কথা বললাম৷ জানালাম যে মরুঝড়ের ঠিক আগেই একে দেখেছিলাম৷ খুব নিষ্ঠুর লোক৷ এর উটে আমি চড়ব না৷

আমার সঙ্গী বলল, ‘উটের হাট থেকে সস্তায় উট কিনে কোরবানির জন্য বেশি দামে বেচে দেওয়াই ওর পেশা৷ উট পাঠায় মরুভূমির বাইরের দেশে৷’

একসময় পশ্চিম আকাশ কমলা রঙে ছোপানো হচ্ছে দেখে বুঝলাম আজকের মতনও সূর্য ডুবে যাচ্ছে৷ সন্ধ্যে হবার আগে আমার সঙ্গী আমাকে একটা মস্ত উঁচু সোনালি প্রাসাদের লাগোয়া বড়ো পাথরের দেওয়ালের সামনে তিনটে মূর্তির কাছে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই সেই মরুরাজ্যের যুদ্ধবাজ রাজা৷’

মনে হয় রাজা-রানি আর রাজপুত্র ওঁরা৷ তিনজনেরই মাথায় মুকুট৷ রাজা-রানির সুন্দর চোখ থেকে আমার দৃষ্টি নেমে এল রাজপুত্রের চোখে৷ চোখের জায়গায় কালো দুটো গর্ত৷ জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছেলেটার চোখ নেই কেন?’

‘রাজার মুকুটে গাঁথা নীল চোখের মণি তুমি দেখতে পাচ্ছ না?’

‘মানুষের চোখ মুকুটে গাঁথা! রাজা হোক, যে-ই হোক, কারও চোখ অন্যের মুকুটে গাঁথা হবে কেন?’

কোনো উত্তর নেই৷ চোখ দেখে মনে হয় অনেক দূরের কিছুর মধ্যে সে হারিয়ে গেছে৷

পশ্চিম থেকে একটা হালকা ঝড়ের হাওয়ায় উড়ে এসে পাতলা একটা বালির চাদর আমাদের সামনেই বালির বুকে ছড়িয়ে পড়ল৷ আঁকা ছবির মতো সেই স্থির বালির ঢেউ থেকে দৃষ্টি তুলে লোকটা বলল, ‘অনেক কাল আগের কথা৷ এখানে একটা বিশাল রাজ্য ছিল৷ ডাইনে রাজপুত্র আর বাঁয়ে রানির মাঝখানে ইনিই সে-রাজ্যের রাজা৷ মরুরাজ্যকে পুবে-পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে বাড়িয়ে চলা ছিল তাঁর নেশা৷ চারদিকে ছোটো ছোটো রাজ্যগুলো ভয়ে ভয়ে থাকত৷ সাংঘাতিক হিংস্র দস্যুদলের মতো রাজা আজ কোন রাজ্যে হানা দেবেন, পালে পালে উট সেনা নিয়ে বালির ঝড়ে আকাশ ঢেকে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, তা ভেবে কাছে-দূরে অনেক দেশই উদ্বেগে দিন কাটাত! ছোটো ছোটো রাজ্যগুলোও সে যুগে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ মারামারি করে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে এই রাজা অনায়াসে তাদের রাজ্য একটার পর একটা জয় করে নিতেন৷ মাইলের পর মাইল মরুভূমির বালিও তিনি রক্তে ভিজিয়ে দিতেন৷’

আমার প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে বললাম, ‘কিন্তু রাজার মুকুটে নীল চোখের মণি গাঁথা কেন?’

‘এটা আসলে একটা হরিণের চোখ৷ এই মরুরাজ্য থেকে অনেক দূরে, একটা বনজঙ্গলের দেশ ছিল৷ দেশজুড়ে নীল জলের হ্রদ আর সবুজ তৃণভূমির ছড়াছড়ি৷ সেখানকার হরিণের চোখের মণি নীল৷ দেশেরও নাম তাই নীলচক্ষু হরিণের দেশ৷ সে দেশের কথা এখনও অনেকেই জানে৷ রাজকুমার একবার রাজার সঙ্গে সে-দেশে গিয়ে সেখানকার নীলচোখ হরিণের মায়ায় বাঁধা পড়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু মরুরাজ্যের রাজা সে-দেশ জয় করে ফেরার সময় সুন্দর শিংওলা একটা হরিণ মেরে তার চোখের নীল মণি সঙ্গে নিয়ে এলেন৷ সেই নীল মণিই নিজের মুকুটে বসিয়েছেন৷ দেখে তো রাজকুমার রাগে-দুঃখে নিজের দু-চোখ উপড়ে ফেললেন৷ ছেলের চোখের গর্তের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রানিও অন্ধ হয়ে গেলেন, মারাও গেলেন কিছু দিনের মধ্যে৷’

ইশ! কী মারাত্মক! রাজপুত্রের চোখ উপড়োনোর যন্ত্রণায় আমার নিজের চোখ কনকন করে উঠল৷ দু-হাতে চোখ ঢেকে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার পর বললাম, ‘মুকুটে চোখ বসাবার জন্য একটা হরিণ মারলেন! আমাদের দেশের রাজা হর্ষবর্ধন মেলায় গিয়ে নিজের সব কিছু সবাইকে দান করে দেবার পর মণি-মুক্তো হিরে-জহরত বসানো গায়ের পোশাকও খুলে দিয়ে নিজে গামছা পরে প্রাসাদে ফিরতেন৷’

মরুভূমিতে আমার এই প্রাণরক্ষক মানুষটি হাঁটা থামিয়ে বলল, ‘তোমাদের রাজা এখনও বেঁচে আছেন?’

‘না, না, এসব বারো-শো বছরের আগের কথা৷ আমাদের ইতিহাস বইয়ে আছে৷’

‘ইতিহাস বই কী?’

‘ইতিহাস বই মানে যে-বইয়ে অতীত যুগের রাজা-রাজড়ার কথা লেখা থাকে, তাঁদের দেশ শাসনের কথা লেখা থাকে৷’

‘বই কী?’

‘বই? যা পড়ে একজনের জ্ঞানের কথা সবাই জানতে পারে৷ এই পৃথিবীর কথা, এক-একটা দেশের কথা, এক-একটা যুগের কথা বই পড়ে জানা যায়৷ মানুষের ভাবনা-চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, জীবনের পাপ-পুণ্য, আনন্দ-বেদনা, সব তো বই পড়েই আমরা জানি৷ তুমি যে পৃথিবীর কথা বললে-কোটি কোটি মাইল দূর থেকে যাকে চাঁদের মতো দেখা যাবে, সে-ও তো বইয়েই লেখা থাকে৷ এসব কথা তুমি নিশ্চয়ই বই পড়েই জেনেছ৷’

লোকটা এবার ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘না, না, আমি তো সবই দেখে শিখেছি৷ চাঁদ পৃথিবী সবই আমি দেখে শিখেছি৷ যারা লম্বুর মতো রাতকানা, কিংবা কী দেখতে কোন দিকে চোখ রাখতে হবে বোঝে না, তারাই ঠিকমতো দেখতে পায় না৷ বিরাট কিছুকে খুব কাছ থেকে পুরো দেখা যায় না, পুরোটা দেখতে হলে অনেক দূরে গিয়ে দেখতে হয়, বলেছিলাম না? এমন তো মরুভূমিতে আমরা রোজই দেখি৷’

দু-জনে চুপ করে হাঁটছি, লোকটা হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘একদিন তুমি চলে যাবে ভেবে আমার চোখে এখনই কেন জল আসছে তা কি আমি জানি? তা কি তুমি জানো?’

একটু চুপ৷ তারপরই বড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস৷ তারও পর বলল, ‘মরুভূমির আকাশে আর বালিতে আমি অনেক খুঁজেছি, এ প্রশ্নের উত্তর আমি আজও জানতে পারিনি৷’

আমি ভাবছি৷ এই মরুভূমি থেকে সত্যিই কি বেরতে পারব কোনোদিন? কে আমাকে বলে দেবে?

লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেই যে চুপ করল তারপর সারারাত আর একবারের জন্যও মুখ খোলেনি৷

ভোর হবার আগে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমিই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কথা বলছ না কেন? এত কম কথা বলে থাকো কী করে? আমাদের দেশে তো লোকেরা সব সময় কথা বলে!’

‘অন্যকে বলবার মতো কথা বেশি খুঁজে পাই না৷ কথা বলি মনে মনে৷’

‘মনে মনে কী বলো?’

‘কী জানি!’

‘আমি তো দেখছি আমি কিছু জিজ্ঞেস না করলে তুমি কিছুই বলো না৷’

একটু ভেবে নিয়ে লোকটা বলল, ‘জিজ্ঞেস করলেও কি আর সব সময় বলতে পারি! এবার আরও জোরে পা চালাতে হবে৷ ভোরের আগেই তাঁবুতে ফেরা দরকার৷’

‘পূর্ণিমা তো এ মাসের মতো চলে গেছে, আজ তো চাঁদ নামবে না, তাহলে এত তাড়া কেন?’

এবার আর আমার কথার উত্তর না দিয়ে কী একটা ভেবে বলল, ‘আচ্ছা, লোকে এত কথা বলে কেন?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *