চাঁদের তাঁবু  – ৬

এ ক-দিনে মরুভূমির কোন দিকে গেছি আর কোন দিকে যাওয়াই হয়নি, ভেবে কূলকিনারা পাই না৷ সবটাই যেন একটা ধাঁধা৷ অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না৷

তাঁবুর মালিকের কাছ থেকে শেষ বারের মতো বিদায় নিয়ে যেদিন যেদিকে পারছি দাদাকে খুঁজে বেড়াই৷ মনে ভয়, দাদাকেও কেউ লুঠের হাটে বেচে দেয়নি তো! কোনো পথিক বা উটওলাকে দেখলে দাদার চেহারার বর্ণনা দিয়ে তাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকি৷ সকলেই দেখেছি বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে ভাবে, তারপর দু-দিকে মাথা নেড়ে জানায় যে, এমন কাউকে তারা দেখেনি৷

দূর থেকে বেদুইনদের তাঁবু দেখলে জোরে পা চালিয়েও সেখানে পৌঁছোতে দু-তিন ঘণ্টা লেগে যায়৷ এভাবে কয়েকদিন শুধু বেদুইনদের এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে খুঁজলাম-এরই কোনোটায় যদি দাদা আশ্রয় পেয়ে থাকে৷

একদিন বহু দূরে তিনটে ছাতার মতো দেখতে পেয়ে সেদিকে এগোতে লাগলাম৷ খানিকটা কাছাকাছি হতে বুঝলাম ছাতার মতো ওগুলো তাঁবু, আর সেই তাঁবুগুলো ঘিরে অনেক লোকের ভিড়৷

মাঝের তাঁবুটার কাছে পৌঁছোতেই একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এসে ভালো করে আমাকে দেখতে লাগল৷ এরও লম্বা ঢিলেঢালা সাদা পোশাক৷ বয়েসে আমার চেয়ে পাঁচ-ছ বছরের বড়োই হবে৷

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর জিজ্ঞেস করল, ‘কোন দেশের ছেলে তুমি?’

‘ভারতের৷’

‘খুব বড়ো দেশ? আর অনেক নদী?’

‘হ্যাঁ, সাগর থেকে হিমালয় পর্বত পর্যন্ত বড়ো৷ নদীও শত শত৷ গঙ্গা যমুনা নর্মদা কাবেরী ব্রহ্মপুত্র-আমাদের দেশের নদীর শেষ নেই৷’

‘তাহলে আমাদের মরুভূমিতে কেউ নদী আনতে পারল না কেন?’

‘নদী কি ইচ্ছে করলেই আনা যায়! নদী তো জন্মায়৷ এই মরুভূমির দেশে তেমন হিমবাহ বা হ্রদ পাবে কোথায়?’

কথার মাঝখানেই ছেলেটা হঠাৎ তাঁবুর ভেতরে গিয়ে একটা আস্ত খরমুজ আর একটা ছুরি এনে আমাকে দিয়ে বলল, ‘আগে এটা খেয়ে নাও৷’

দরকারে পড়লে মানুষ করতে পারে না এমন কাজ নেই৷ আমারও তাই হল৷ বালির ওপর বিরাট আকারের খরমুজটা রেখে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে খেয়ে একসঙ্গে তৃষ্ণা ও খিদে মিটল৷ খরমুজের চারপাশে কয়েক হাত বালি রসে ভিজে গেছে৷

‘বালির অনেক নীচেও এরকম জলে ভেজা বালি আছে৷ ডান দিকের তাঁবুর নীচেই তেমন আছে বলে আমার ধারণা৷ সেই ভেজা বালির নীচে নিশ্চয়ই জল আছে৷ তাই এখানেই আমরা কুয়ো খুঁড়ে চলেছি৷ তাঁবুর পিছনে ওই যে দেখছ বালির পাহাড়, ওসব কুয়ো খোঁড়া বালি৷ এসো, তুমিও আমাদের সঙ্গে হাত লাগাও৷’

‘আমার দাদা এই মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে, আমি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি৷ সে-কাজ ফেলে তোমাদের এই কাল্পনিক জলের খোঁজে আমি লাগব কী করে?’

‘কাল্পনিক? তুমি রাক্ষসী পাখির কুয়োর কথা শোনোনি? সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে মরুভূমির সবাইকে ঠান্ডা জল জোগাচ্ছে৷’

‘সেই মিঠে জল আমিও খেয়েছি৷’

‘কুয়োর কথা তুমি জানলে কী করে? সাদা চুলদাড়িতে মুখ-মাথা ঢাকা এক বৃদ্ধ কি তোমাকে সেখানে নিয়ে গেছেন?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু তুমি জানলে কী করে? তুমি কি তাকে চেনো?’

‘ভালো করেই চিনি৷ কিন্তু বিদেশিকে ওই কুয়োর সন্ধান দেওয়া নিষিদ্ধ জেনেও তিনি এ-কাজ কেন করলেন?’

‘মরুঝড়ে পথ হারিয়ে মরতে বসেছিলাম, তখন তিনিই আমাকে উদ্ধার করেন৷’

ছেলেটা এবার চাপা রাগের স্বরে বলল, ‘তাহলে তো আর কথাই নেই৷ দয়ার অবতার, দয়ার মরূদ্যান! দয়া করবার জন্য সব সময় পা বাড়িয়ে আছেন!’

দয়ালু কারও কথা শুনলে কার না ভালো লাগে! আমিও তাই খুব উৎসাহ করে বললাম, ‘চাঁদের তাঁবুতে যত গরিব লোক আসে সবাইকে দেখলাম তিনি চন্দ্রকান্তমণি বিলোচ্ছেন৷’

‘পাগল, পাগল৷ একেবারে বদ্ধ উন্মাদ! তাঁবুর গায়ে চাঁদ এসে বসে আছে তোমাকে বলেননি? চাঁদের গা ঝাড়ার গল্প শোনাননি? গা ঝাড়া দিয়ে ঝুরিঝুরি চাঁদের কণা ফেলছে তাঁবুর মধ্যে-তোমাকে দেখাননি? ওই তুমি যাকে চন্দ্রকান্তমণি বলে শুনেছ, দেখাননি?’

ওইরকম দয়াবান মানুষ সম্পর্কে এমন ব্যঙ্গবিদ্রূপ আমার ভালো লাগল না৷ আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ছেলেটা আবার মুখ খুলল, ‘কত বেশি লোককে দয়া করা যায়, কার কত উপকার করা যায়-সব সময় এইসব ভাবতে ভাবতে মানুষটা এখন সত্যিই পাগল হয়ে গেছেন৷ বালির বড়ো বড়ো দানা তাঁবুতে জড়ো করে ভাবেন চন্দ্রকান্তমণি! ওরকম বালি ওই অঞ্চলে এক-এক জায়গায় খুব দেখা যায়, জ্যোৎস্নায় চিকচিক করে৷ তার হারানো ছেলের কথা ভেবেই হয়তো তার এসব পাগলামি বেড়ে গেছে৷’

আমি এতক্ষণে বলতে পারলাম, ‘সেই ছেলের প্রিয় ঘোড়া যেখানে প্রভুর অপেক্ষায় অনাহারে আমৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকত, ঠিক সেখানেই ঘোড়ার অবিকল একটা মূর্তি গড়ে রেখেছেন, ছেলে ফিরে এলে যাতে তার ঘোড়াকে দেখতে পায়৷’

কথাটা শুনেই ছেলেটা দুয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল, তারপর হঠাৎই আমাকে জড়িয়ে ধরে গলায় অদ্ভুত শব্দ করে কেঁদে উঠল৷

অল্পক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে তাঁবুর পিছনে বালির পাহাড়ের দিকে সে আমার হাত ধরে নিয়ে চলল৷ সবচেয়ে ডান দিকের ওই তাঁবুটাই সবচেয়ে বড়ো৷ তাঁবুর উত্তর-পশ্চিম দিকে কুড়ি-পঁচিশ হাতের মধ্যে কুয়োর জন্য গর্ত খোঁড়া হচ্ছে৷ তিন মাসে নাকি ন-মানুষ সমান খোঁড়া হয়েছে, জল না ওঠা পর্যন্ত খুঁড়ে যাওয়া হবে৷

এইসব বিবরণ শুনিয়ে ছেলেটা এবার আমার একটা হাত জোরে ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তুমি নদীর দেশের ছেলে, তুমিও হাত লাগাও!’

দাদাকে খোঁজার কথাটা আমাকে আবার বলতেই হল৷ শুনে ছেলেটা এবার আমার দু-হাত ধরে বিরাট একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘আমরাই তোমার দাদাকে খুঁজব৷ কীরকম গায়ের রং, চুল কোঁকড়ানো, না লম্বা, না খুলির ওপর বালির আস্তরণ, চোখ কটা না কালো, নাক টিকালো, না ভোঁতা, মাথায় লম্বা, না বেঁটে, না মাঝারি-সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলো৷’

যা কিছু জানতে চাইল, তার বাইরেও দাদার চেহারার কয়েকটা চিহ্ন বর্ণনা করে বললাম, ‘গত বেশ কিছু দিন ধরে আমি নানা দিকে গেছি, বেদুইনদের তাঁবুতে ঘুরেছি, কেউ যদি কোথাও দয়া করে আমার দাদাকে থাকতে দিয়ে থাকে!’

ছেলের দল মনে হয় নিজেদের মধ্যে আমার দাদাকে খোঁজার ব্যাপারেই আলোচনা করতে লাগল৷

তার মধ্যেই মাঝের তাঁবু থেকে একটা মেয়ে পুরু মনসাপাতায় ঘন ক্ষীরের মতো বাটা তিলের মিঠাই এনে আমার সামনে ধরাল৷ সঙ্গে কুচকুচে কালো আস্ত একটা তরমুজ৷ তার গায়ে ছোট্ট একটা ফুটোর নীচে কোটের বোতামের মতো বড়ো আরেকটা ফুটো৷ মেয়েটা মুখে কিছু না বলে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল বড়ো ফুটোয় মুখ লাগিয়ে তরমুজ পান করতে হবে৷ ভেতরের সব শাঁস নাকি কী একটা কৌশলে ঘেঁটে রসে রূপান্তরিত করা হয়েছে৷ নির্দেশমতো তরমুজের ফুটোয় মুখ লাগিয়ে চুমুক দিচ্ছি, সর্দার ছেলেটা বলল, ‘কুয়ো খোঁড়ার কাজ আরও খানিকটা এগিয়ে নিয়ে দু-একদিনের মধ্যে তোমার দাদার খোঁজে বেরোব৷’

সন্ধ্যে না নামা পর্যন্ত কুয়ো খোঁড়ার কাজ চলতে লাগল৷ তলার বালি কিছুটা দলাপাকানো ও আঁটোসাটো৷ হাতে নিয়ে দেখলাম বেশ ঠান্ডা৷

সূর্যাস্ত এখানে অনেকক্ষণ ধরে হয়৷ তখন আকাশ ভরে মরুভূমি জুড়ে শুধু রঙের ঢেউ৷ সেই রঙে চান করে ফণিমনসার ঝোপ৷ অতীত যুগের মরা গাছের গুঁড়িতে শোকের ছায়া পড়ে৷ দূর দেশ থেকে এসে পাখির ঝাঁক আরেক দূর দেশের দিকে উড়ে যায়৷

রাতে আমার শোবার ব্যবস্থা হল প্রথম তাঁবুতে, শুনলাম ছেলের দলের সর্দারও ওই তাঁবুতে থাকে৷

আমার পাশের খাটিয়া থেকে যখন ছেলেটা এখানে জল পাওয়া গেলে সবুজ ঘাস আর রঙিন ফুলে জায়গাটা কীরকম সুন্দর করে তুলবে, তার বিস্তারিত বর্ণনা শোনাচ্ছে ঠিক তখনই তাঁবুর খোলা দরজা দিয়ে চোখে পড়ল আকাশ থেকে আতসবাজির মতো আগুনের গুঁড়ো ঝরে পড়ছে৷ অনেকটা জায়গা জুড়ে এমন ঝাঁক ঝাঁক আগুনের ফুলকি ঝরতে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এগুলো কী?’

‘তারার টুকরো খসে পড়ছে৷ মরা তারাও বলতে পারো৷ সেই দয়ালু বৃদ্ধ দেখলে বড়ো বড়ো মনসাপাতায় ওই আগুনের ফুলকি কুড়িয়ে নেবার জন্য দৌড়োদৌড়ি শুরু করতেন৷ এ নাকি আল্লার করুণার গুঁড়ো, গায়ে ছোঁয়ালে মানুষের রোগব্যাধি সেরে যায়৷ মানুষের কীসে উপকার সেটাই তো তাঁর সব সময়ের ভাবনা, তাই খুব সাধারণ জিনিসকেও খুব মূল্যবান ভাবেন, সেইমতো জুৎসই একটা গল্পও কল্পনা করে নেন৷’

কথার শেষে তার বড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস কেন পড়ল জানি না৷

খাটিয়ায় শুয়ে শুয়েই কিছুটা দূরে একটামাত্র খেজুর গাছ দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ দেশে খেজুর গাছ থেকে রস হয় না? আমাদের বাংলায় শীতকালে খেজুর গাছের বুক ছুলে নিয়ে সেখানে কলসি ঝুলিয়ে রাখলে সারা রাত ধরে কলসিতে রস জমা হয়৷ সেই রস জ্বাল দিয়ে পাতলা মিষ্টি গুড়ও হয়৷’

‘জল পাই না, তার ওপর আবার রস! আমাদের জল চাই৷’

‘কুয়োয় জল পেতে আর কত দিন বালি খুঁড়বে?’

‘যতদিন জল না দেখা যায়৷ একদিন এখানে জলও ছিল, জঙ্গলও ছিল, এখন সব মরে শুকিয়ে শুধু বালি৷ আমাদের দেশের যেখানে শেষ, অন্য দেশের শুরু, সেখানে এক পীর আছেন, তিনি বলেন, সারা পৃথিবীই একদিন মরুভূমি হয়ে যাবে৷’

‘আমাদের দেশে তা হবে না৷ সেখানে অসংখ্য নদী আর প্রচুর জঙ্গল৷’

ছেলেটা এক ঝটকায় উঠে বসে বলল, ‘ওই পীর কী বলেন জানো? বলেন, মানুষই একদিন সব জল জঙ্গল খেয়ে ফেলবে৷ শোনা যায়, পীর নাকি একবার তোমাদের দেশেও গিয়েছিলেন৷’

‘আমাদের বাংলায়ও গিয়েছিলেন? সেখানে প্রচুর আম জাম জামরুলের বাগান৷ বাড়ির উঠোনে কাঁঠাল গাছ৷ বট অশত্থ নিম তেঁতুল গাছ তো সব জায়গায়৷ নদী-নালা খাল-বিলও অগুনতি৷ বড়োদের কাছে শুনেছি এতরকম ফল আর এতরকম জল পৃথিবীর আর কোথাও নেই!’

‘পীর তোমাদের দেশের কোন দিকে কোথায় গিয়েছিলেন জানি না৷ তবে পীরের একটা কথা খুব ছোটোবেলায় আমি সেই চাঁদের তাঁবুর মালিকের মুখে শুনতাম৷ কথাটা হল, বড়োরা যদি মনের গভীরে পীর বা ফকির না হয় তাহলে তারা মানুষের কোনো কাজে লাগে না৷ আমাদের দেশের বড়ো মানুষদের প্রায় কেউই মনে মনে পীরও না, ফকিরও না, আমাদের দুঃখেরও তাই শেষ নেই৷’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *