উত্তম পুরুষ – ৭

সাত

অথচ এই স্কুলে ভর্তি হবার জন্যই আমার কি অস্থিরতা। আমি যখন স্কুলে ভর্তি হই তখন বেশ বয়স হয়েছে; কিন্তু আমার লেখাপড়ার দিকে স্বতন্ত্রভাবে কারো নজর পড়ে নি। প্রথম দুই ছেলের লেখাপড়া নিয়েই ভাবনাচিন্তা আর বোধ করি সামর্থ্যেরও সবটুকুই শেষ হয়েছে। আমি নেপথ্যে সকলের দৃষ্টির অগোচরে থেকে এক পা এক পা করে ক্লাস সিক্সের বইয়ের দোরগোড়া পর্যন্ত এগিয়ে এসেছি।

বড় ভাই একদিন আমার ইংরেজি রচনা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। খাতাটা টেবিলের ওপর পড়ে ছিল। অমন কত দিনই তো থাকে; কিন্তু সেদিন কি মনে হলো, তিনি খাতাটা খুলে দেখলেন। ইউনিভার্সিটি যাবার জন্য বড় ভাই তৈরি হচ্ছিলেন। আম্মাকে বললেন :

“শাকেরটা তো বেশ বড় হয়ে উঠেছে। ওকে এবার স্কুলে দিতে হয়।’ কথাটা যে আম্মার আগে মনে হয় নি তা নয়। কিন্তু বড় দুই ছেলে কলেজ চলে যাবার পর বাড়িটা একেবারে খাঁ-খাঁ করে। তখন বড্ড একা আর অসহায় মনে হয়। আমি কাছে থাকি বলে দুপুরবেলাটা তা-ও কেটে যায়।

স্কুলের ছেলে বলে পরিচিত হবার জন্য আমাকে মাঝে মাঝে এক অস্থির আকুলতা পেয়ে বসত বটে; কিন্তু বাসায় থাকতেও মোটের ওপর মন্দ লাগত না। আম্মা কুলোতে করে কুল আর বড়ি রোদে দিতেন, হয়তো আচার তৈরি করাই উদ্দেশ্য। আমি অকাজে-অকারণে এদিক- ওদিক ঘুরে বেড়াতাম, আর রৌদ্রতাপিত কুলগুলো নিষিদ্ধ ফলের মতোই আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। প্রলুব্ধ মনকে শতভাবে শাসন করতাম; কিন্তু কুলগুলোও সংখ্যায় একটি করে কমতে থাকত। হয়তো তাই পরবর্তী জীবনে অনেক দুঃখকষ্ট পেতে হয়েছে।

আম্মা জবাব দিলেন :

—বেশ তো। তোমার আব্বা বড় দিনের ছুটিতে আসছেন। তোমরা সবাই মিলে যা ভালো মনে কর তাই হবে।

সেদিন খুব ভোরে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আজ আমি স্কুলে ভর্তি হবো। সমবয়স্ক সব ছেলেই যখন স্কুলে যায়, তখন বাড়িতে বসে থাকতেই-বা কেমন লাগে। পাশের বাড়ি থেকেই মফিজ স্কুলে যায়, তাকে আমার চোখে ভারি কাজের ছেলে বলে মনে হয়।

রোজ সকাল সাড়ে ন’টার সময় ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকা আমার চাই-ই, কোনোদিন এর কামাই নেই। এই সময়টায় স্কুলের ছেলেরা দল বেঁধে স্কুলে যেত। বেশ লাগত। কেউ পান চিবোতে থাকে, কেউ বিড়ি ফোঁকে। কেউ-বা জুতো দিয়ে পাথরে ঠোকর মারতে মারতে অগ্রসর হয়। কারো-বা নগ্ন পা। অনেকে আবার পথের পাশ দিয়ে মাথা হেঁট করে আনমনে চলতে থাকে। কেউ-বা পথের ঠিক মাঝ দিয়ে কলরব করে এগুতে থাকে।

ঐটুকুন ছেলেদের মুখে বিড়ি দেখে আমার সারাটা গা কেমন শিরশির করে উঠত। আমি এক অজ্ঞাত আশঙ্কায় বারবার পিছনের দিকে দেখতাম। অভিভাবকরা কেউ দেখেছেন কিনা। অপরাধটা যেন আমারই।

কিন্তু মোটের ওপর এই স্কুলযাত্রী ছেলেদের শোভাযাত্রা দেখাই ছিল আমার জীবনের সবচাইতে বড় আনন্দ।

আরো একবার ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতাম। বিকেল সাড়ে চারটার সময়। এইটে ছেলেদের বাড়ি ফেরার সময়। স্কুলটিও কাছেই। অনেক দিন ছুটির ঘণ্টাও শুনতে পেতাম। এই আওয়াজটা কানে এমন মধুর হয়েই বাজত। যেখানেই থাকি না কেন এই সময়টায় কোনো প্রলোভনই আমাকে ঘরে বেঁধে রাখতে পারত না।

স্কুলে যাবার সময় তবু ছেলেদের একটা সংযত সুশৃঙ্খল ভাব থাকে; কিন্তু ফিরবার বেলা একেবারে বেপরোয়া। করপোরেশনের রাস্তায় হোস পাইপ দিয়ে পানি দেয়া হয়। রামধনুর মতো অর্ধ গোলাকার হয়ে পানি পড়তে থাকে। মাথাটা নিচু করে ছেলেরা তারই তলা দিয়ে হুস করে বেরিয়ে আসে। গায়ে এক ফোঁটাও পানি পড়ে না। কেউ কারো চুল ধরে টানে, কেউ মারে ল্যাং, কেউ-বা কারো কোঁচা দেয় খুলে। কোনোদিন হয়তো এই সময়টায় নাস্তা খেতে বসি। এমন সময় কানে আসে সমবেত কণ্ঠের আওয়াজ :

হল্লা করে ছুটির পরে
ঐ যে যারা যাচ্ছে পথে
হালকা হাসি হাসছে কেবল
ভাসছে যেন আল্গা স্রোতে—

হয়তো আর একদিন শুনতে পাই কবি গোলাম মোস্তফার চরণ :

আমরা নূতন আমরা কুঁড়ি
নিখিল মানব নন্দনে–

আর দেখে কে। নাস্তা ফেলে উল্কার মতো ছুট। একেবারে গেটের সামনে।

সেই স্কুলে ভর্তি হতে চলেছি। আব্বা ‘ওয়াসেল মোল্লার’ দোকান থেকে এক জোড়া নতুন হাফ শার্ট আর হাফ প্যান্ট কিনে এনে দিয়েছেন। সকাল সকাল গা ধুয়ে নিয়েছি। সুজির হালুয়া আর হাতে বেলা রুটি দিয়ে আম্মা নাস্তা করতে দিয়েছেন, সঙ্গে আলু ভাজিও আছে। আজ যেন ঈদ! নাস্তা করে উঠেছি, দেখি সামনেই আব্বা আর আম্মা দাঁড়িয়ে আছেন। আম্মা দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিলেন। এমন সময় বড় ভাই আর মেজ ভাইও সেখানে উপস্থিত। সকলেই আজ আমাকে একটা বিশেষ চোখে দেখছেন। আজকের দিনটি খোদা যেন আমার জন্যই তৈরি করেছেন। কারো মুখে কথা নেই; কিন্তু সকলের চোখ দিয়েই এক অব্যক্ত আশীর্বচন ঝরে পড়ছে।

আমি মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার এই ভঙ্গিটি সকলেরই পরিচিত। আব্বা জিগ্যেস করলেন :

—কি রে! কিছু বলবি?

আমি কোনো কথা বলি না। ইশারা করে আমার কোমরটা দেখিয়ে দিই। বেল্‌টা কেনা হয় নি। কোমরে একটা পুরানো টাই বাঁধা আছে।

—তাই তো। ভারি ভুল হয়ে গেছে। ছোট সাহেবের জন্য বেল্ট্ কেনা হয় নি। মেজ ভাই সহাস্যে বলে উঠলেন।

আমি ছুটে পালালাম।

বড় ভাই আমার সঙ্গে চললেন। গলির মোড়েই খানকাহ্-পাক। দু’ভাই সিঁড়ির ওপর সিজদা দিলাম। তারপর চললাম স্কুলে ভর্তি হতে।

হলদে রঙের দোতলা বাড়ি। সামনে প্রকাণ্ড লোহার গেট। তখনো ঘণ্টা পড়ে নি। বিভিন্ন বয়সের ছেলেরা বিভিন্ন দিকে ছুটোছুটি করে হয়রান হচ্ছে। আমার বুক ভয়ে ঢিপঢিপ করতে লাগল।

স্কুল প্রাঙ্গণের দুই পাশে দুই ফেরিঅলার প্রতিযোগিতা চলছে। একদিকে চটপটি, আলুর দম, কাবলি ভাজা আর ফাকোড়ি বিক্রি হচ্ছে; বিপরীত পার্শ্বে লাল নীল হলুদ বর্ণের সিরাপ দেয়া গুঁড়ো বরফ বিক্রি হচ্ছে। ছেলেরা এইমাত্র খাওয়া-দাওয়া করেই স্কুলে এসেছে। তবু খদ্দের কোনোখানেই কম নয়।

এমন সময় ছেলেদের মধ্যে হঠাৎ “পালা-পালা” রব পড়ে গেল। চোখের নিমেষে অতগুলো ছেলে যে কোথায় অদৃশ্য হলো, আল্লাহ মালুম। দোতলা থেকে মোটাসোটা বেঁটেপনা এক ফর্সা ভদ্রলোক নেবে আসছেন। মাথাটা একেবারে ন্যাড়া; শুধু পিছনের দিকে একটা মস্ত টিকি মরূদ্যানে তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি, পরনে মোটা খদ্দরের ধুতি হাঁটু পর্যন্ত কোনোমতে নেবে এসেছে। ফতুয়ার বোতাম খোলা; নগ্ন বুকের ওপর তেল কুচকুচে পৈতে শোভা পাচ্ছে। কাঠের সিঁড়ি তাঁর পদভারে পটাস পটাস শব্দ করে চতুর্দিক সচকিত করে তুলল। এমন গম্ভীর মানুষ আমি জীবনে দেখি নি। নিচে নেবেই এক হুঙ্কার। গলার আওয়াজ শুনে পিলে চমকে ওঠে।

—দেওকী। আরে ও দেওকী। তোকে কতবার মানা করেছি না— ফেরিঅলাগুলোকে স্কুলের ভিতর ঢুকতে দিবি না। মনে থাকে যেন, আমার একটি ছেলেরও যদি অসুখ করেছে তো তোমাকেই আমি আস্ত রাখব না।

দেওকী স্কুলের দারোয়ান। এইভাবে একবার তুই আর একবার তুমি সম্ভাষণে সম্ভাষিত হয়ে তার নেশা ভুলে গেল। বেচারা গেটের কাছে একটা টুলের ওপর বসে ঝিমোচ্ছিল, আর যখন ঝিমোচ্ছিল না তখন খইনি টিপছিল। কিন্তু তুইয়ের পর তুমি সম্ভাষণের সম্মান লাভ করে সত্যিই তার নেশা ছুটে গেল।

–কি করব পণ্ডিত মশাই। শালারা কিছুতেই শোনে না।

বলেই দেওকী এত বড় জিব কাটল।

—চোপরাও উল্লুক। কত পয়সা খেয়েছিস বল্‌।

উত্তরে দেওকী তার রাত্রি জাগরণ-ক্লান্ত আর খইনির নেশায় রঙিন রক্তচক্ষু দুটি মুদে আর একবার জিব কাটল।

এই রকম স্বতঃস্ফূর্ত অবলীলায় পণ্ডিত মশাই আদেশ দিতেন। হুকুম দেয়ার জন্য যেন তাঁর জন্ম। কে কর্তৃপক্ষ আর কে ইতরপক্ষ, পণ্ডিত মশাইয়ের বেলা সে প্রশ্নই ওঠে না। দারোয়ান থেকে শুরু করে হেডমাস্টার পর্যন্ত স্কুলের প্রতিটি লোক পণ্ডিত মশাইয়ের ভয়ে তটস্থ। তার একমাত্র কারণ এই যে, হেডমাস্টার তাঁর ছাত্র ছিলেন। আর তিনি এইমাত্র যে বললেন “আমার একটি ছেলেরও যদি অসুখ করেছে” তার সত্যকার অর্থ পরে বুঝেছিলাম। সত্যিই তিনি প্রতিটি ছাত্রকেই নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসতেন।

বড় ভাই আমার হাত ধরে এক পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এতক্ষণে তাঁর ওপর পণ্ডিত মশাইয়ের চোখ পড়ল।

—আব্বাস তুমি! কি খবর?

—স্যার, আমার ছোট ভাইটিকে ভর্তি করতে এসেছি।

—বেশ বেশ। তুমি এখন কি করছ? সেই ইংরেজি সাহিত্য নিশ্চয়ই। তোমাদের বংশটাই রাজ-ভক্ত হে!

পণ্ডিত মশাই হেসে ফেললেন। বড় ভাইও হাসলেন।

–তোমার মেজ ভাই কি করছে।

–সে বি এ পড়ছে।

—সেই গুড ওল্ড ইংলিশ অনার্স?

বড় ভাই আবার হাসলেন, কেমন যেন অপরাধীর মতো। বস্তুত পণ্ডিত মশাইয়ের অনুমানই ঠিক। তিনি আবার বললেন :

—ছেলেটা কিন্তু বাংলাও লিখত ভালো। কিন্তু বাংলা শিখে কি হবে! কি বলো?

—না স্যার, ঠিক তা নয়।

পণ্ডিত মশাই সে কথা শুনলেনও না। এবার বড় ভাইকে ছেড়ে আমার ওপর নজর দিলেন। ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে গেল।

একবার আমাকে তিনি ভালো করে দেখে নিলেন; কিন্তু কোনো কথা বললেন না। আমরা অফিস রুমের দিকে হাঁটতে লাগলাম। পণ্ডিত মশাই একটি হাত দিয়ে আমার কোমরের টাই ধরে এগুচ্ছিলেন।

এমন সময় এক কাণ্ড হলো।

পণ্ডিত মশাইয়ের হাতের টানে আমার কোমরের টাই আলগা হয়ে খুলে গেল। প্যান্ট কোমর থেকে খসে পড়ল। ঠিক সেই সময় দোতলার বারান্দার একদল ছেলে সমস্বরে সজোরে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দ ইট-পাটকেলের মতো আমার মাথায়-গায়ে এসে পড়তে লাগল। কান্নার ঢেউ চোখের কাছে এসে আছাড় খেতে লাগল।

জীবনে বহুবার বহুভাবে লজ্জা পেয়েছি; কিন্তু সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কাছে সবকিছুই তুচ্ছ। আবার সেই গগনবিদারি হুঙ্কার :

—কে রে!

চোখের নিমেষে আবার চারদিক নিঝুম।

পণ্ডিত মশাই এবার আমাকে বললেন :

—শোন! তোকে যদি কেউ বিরক্ত করে, আমাকে বলিস। চাবকে পিঠের ছাল তুলে দেব। সামনের ছেলেদের দেখে বললেন :

—তোরাও শুনে রাখ্।

যাবার আগে বড় ভাই বলে গেলেন :

—স্যার একটু চোখ রাখবেন।

—সে তোমাকে বলতে হবে না। চোখ না রাখলে তুমিও এত বড়টা হতে না।

আর কিছু না বলে পণ্ডিত মশাই আর একদিকে চলে গেলেন।

আমি ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *