বৃশ্চিক – পিয়া সরকার
Brishchik – Piya Sarkar
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৫
.
উৎসর্গ-
দর্শনা বোসের অনুরাগী পাঠকদের উদ্দেশে
.
সব গল্পেরই একটা অতীত থাকে তাই!
জানুয়ারি ২০০২
শীতকালের সকাল। সবে সাড়ে ছটা বাজে। চন্দননগর স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মটায় লোকের ভিড় খুবই কম। দূরে প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিচ্ছে রামশরণ। কজন হকার সকালবেলার পসরা সাজাচ্ছে খুব যত্নে। ছটা পঁয়ত্রিশের হাওড়া বর্ধমান লোকাল অ্যানাউন্স করতে দেরি হচ্ছে আজ। সামনেই সেমিস্টার পরীক্ষা। কাল রাতে তমালের বাড়িতে থেকে প্রোজেক্টটা নামিয়েছে শতদল। চন্দননগর স্টেশনে সকালে নামিয়ে দিয়েছে তমাল। ওর বাড়িটা চন্দননগর আর মানকুন্ডুর মাঝামাঝি। এখান থেকেই শতদল ট্রেন ধরবে আজ। বাড়িতে বলে আসা হয়নি যে আজ ও তমালের বাড়ি থেকে সোজা কলেজ যাবে। যাকগে, পরে ফোন করে দেবে। এত সকালে সবাই ঘুমাচ্ছে। আর দাদার যা ডিউটি! আজকে কী শিফট কে জানে? এখন ফোন করলে ভীষণ বিরক্ত হবে। হাতঘড়িটায় চিন্তিতভাবে তাকায় শতদল। ফার্স্ট ক্লাসটা ফ্লুয়িড মেকানিক্সের। ক্লাসটা মিস হবে আজ।
পাবলিক অ্যাড্রেসাল সিস্টেমের যান্ত্রিক মহিলা কন্ঠ লাউডস্পিকারে বলে ওঠে–ইয়োর কাইন্ড অ্যাটেনশন–প্লিজ 22387 আপ হাওড়া-ধানবাদ ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ইজ কামিং অন প্ল্যাটফর্ম নম্বর টু। দ্য ট্রেন ইস এ থ্রু ট্রেন। কাইন্ডলি মেইনটেন এ সেফ ডিসট্যান্স।
ধুস! বিরক্ত লাগে শতদলের। বর্ধমান লোকালটার কী হল! পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে রিমঝিমের ল্যান্ডলাইন নম্বরটা ডায়াল করে কানে লাগায় শতদল। এই মহার্ঘ্য জিনিসটি জেদ করে দাদার কাছ থেকে বাগিয়েছে সে। কলকাতা শহরেই এ জিনিস হাতে গোনা কজনের কাছে, সেখানে মফস্বলে তো ব্যাপারটা রীতিমত স্ট্যাটাস সিম্বল! দাদা অবশ্য একবার বলাতেই কিনে দিয়েছে। শতদলকে অদেয় কিছুই নেই তাঁর।
ফোনটা তুলতে দেরি হচ্ছে রিমঝিমের। তিন চার পা এগিয়ে একটু ঝুঁকে এক নম্বর প্লাটফর্মের শেষ মাথাটায় চোখ রাখে শতদল। ফোনের পিঁপি আওয়াজটা বন্ধ হয়েছে। ফোন তুলেছে রিমঝিম।
“ট্রেনে ওঠেছিস?” প্রশ্ন করে রিমঝিম।
“না, এখনও চন্দননগরে। ট্রেনটা লেট আজ। তুই আজ ওয়েট করিস না। অটোতে ওঠে পড়িস। পিকেবি’র ক্লাসটা মিস হবে নাহলে। তোর থেকে নোট নেব।” আরও কটা কথা বলতে যাবে শতদল, হঠাৎ কতগুলো লোকের চিৎকারে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতে গেল ও। সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার প্রবল একটা ঝাপটা এগিয়ে এল ওর দিকে। একটা অদৃশ্য স্রোত এসে ওকে যেন ওপরের দিকে ঠেলে দিলো, তারপরেই মাটির দিকে পড়তে গিয়েই আবার একটা হাওয়ার স্রোতের মুখে পড়ল শতদল। বাঁদিকে কোথায় যেন ছিটকে গেল ও… প্রচণ্ড জোরে একটা ধাতব শব্দ হল। প্ল্যাটফর্মে কারা যেন হই-হই করে উঠল
পাশ দিয়ে নব্বই কিমি প্রতি ঘন্টা গতিবেগে ছুটে বেরিয়ে গেল 22387 আপ হাওড়া-ধানবাদ ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের শম্ভুর চায়ের দোকানের সামনের টিনটা দুমড়ে গেছে ততক্ষণে। সামনেই উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা শতদলের নিথর শরীরের দিকে ছুটে গেল কিছু লোক। ততক্ষণে মাথার খুলি ফেটে বেরিয়ে এসেছে ক্ষীণ রক্তধারা।
ঝাঁট দেওয়া বন্ধ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রামশরণ। একটু আগে মাইকে অ্যানাউন্স করল দুনম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে থ্রু ট্রেন যাবে। আর গেল এক নম্বর দিয়ে?! ছোটবাবুর এতবড় ভুল হল কীভাবে? নাকি ও শুনতে ভুল করল?! দৌড়ে রামশরণ এগোল ছেলেটার দিকে। ততক্ষণে নিথর শরীরটাকে চিত করেছে পাবলিক। মুখটা দেখে চমকায় রামশরণ… ভীষণ চেনা মুখখানা।





Please upload লাইটস ক্যামেরা মাডার্স by Arpita Sarkar