স্মৃতির বিমর্ষ কিনার জুড়ে শুধুই শকুনের ভিড়

স্মৃতির বিমর্ষ কিনার জুড়ে শুধুই শকুনের ভিড়

ডি.এস.পি. স্যার প্রথম দিনেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন এই পেশা বেছে নিলাম কেন। খুব নাটকীয়ভাবে বলতে পারতাম, আমি নয়, এই পেশাটাই বেছে নিয়েছে আমাকে। আমার করার মতো আর বিশেষ কিছু ছিল না। আমি পুলিশের মেয়ে কিনা!

কিন্তু এসব কিছুই বলিনি, বদলে একটা গল্প শুনিয়েছিলাম। সেই গল্পটা আমাকে ছোটবেলায় আমার মা শুনিয়েছিল। এখনও পর্যন্ত এই বত্রিশ বছরের জীবনে, মায়ের বলা ওই গল্পটা আমার শোনা অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প।

গল্পটা এরকম। দিল্লীর মসনদে তখন আলাউদ্দিন খলজি। তাঁর রাজত্বে প্রথমবার তিনি ভারতবর্ষের বাজারে পুলিশ নিয়োগ করলেন। পুলিশকর্তার নাম দিলেন শাহান-ই-মণ্ডি। সেই মণ্ডির নিয়মকানুন ছিল ভয়ঙ্কর। কেউ মাপটাপে ফাঁকি দিলে শাহান-ই-মণ্ডি তার শরীর থেকে সমান মাপের মাংস কেটে নিতেন। একবার শাহান-ই-মন্ডির ছেলের নামে অভিযোগ এল, যে সে বাপের ক্ষমতার প্রভাবে মাপে ফাঁকি দিয়েছে। সকলে ছেলেকে ধরে বেঁধে নিয়ে এল শাহান-ই-মণ্ডির কাছে। নিজের নামের অপব্যবহার করার জন্য ছেলের ওপর প্রচণ্ড রেগে তাকে মেরেই ফেললেন সেই পুলিশ কর্তা। খবরটা সুলতান অবধি গড়ালো। তিনি তদন্ত করে বার করলেন, শাহান-ই-মণ্ডির ছেলের আসলে কোনো দোষই ছিল না। কোনো এক ধুরন্ধর ব্যবসায়ী নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ছেলেটাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল। শাহান-ই-মণ্ডি কান্নায় ভেঙে পড়ল শুনে। কিন্তু আলাউদ্দিন একটা ‘ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিলেন এবার, তিনি জনসমক্ষে শাহান-ই-মণ্ডিকে শূলে চড়ালেন। এই অবধি বলে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “সুলতান কেন এমন করেছিলেন বল তো?”

আমি বলতে পারিনি।

মা মাথা নাড়িয়ে বলেছিল, “আসলে হয়েছিল কী, লোকটার আবেগের কাছে তার যুক্তি হার মেনেছিল। সে তদন্ত করে সত্যি মিথ্যে বিচার করার চেষ্টা করেনি। আর খলজির কাছে সেটাই ছিল কর্তব্যের বিরাট অবহেলা, লোকটার আর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার ছিল না সুলতানের কাছে।”

“আর সেই ব্যবসায়ী?”

“তার কোনো খোঁজ নেই ইতিহাসের কাছে।” মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন।

“ইনকমপ্লিট জাস্টিস ইজ অলসো জাস্টিস ডিনায়েড। গল্পটার মোরাল কি এরকমই দাঁড়ায় না?” ডি.এস.পি. স্যারকে প্রশ্ন করেছিলাম। স্যার উত্তর দেননি।

বর্ধমানের যে ভাড়াবাড়িটায় এখন থাকছি, তার গ্রিলের গেট খুলে একটা বিরাট উঠোন, তার বাঁদিকে কুয়োতলা, আর কুয়োর পিছনে একটা হৃষ্টপুষ্ট শিউলি গাছ। বর্ধমান ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে বদলি হয়ে আসার পর যখন বাড়ি খুঁজছিলাম তখন শিউলি গাছওয়ালা এই বাড়িটার দিকে চোখ পড়ে গেল। আমারও দু-একটা শিউলি কুড়ানো ভোরবেলা ছিল, হঠাৎ মনে পড়ে গেল।

লাল সিমেন্টের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আলতা পরতে পরতে মা বলত, “দাশু, যা কটা ফুল কুড়িয়ে আন, পুজোয় লাগবে। শিউলি ছাড়া কী দুর্গাপুজোর অঞ্জলি হয়!” তারপর বনফুলের বই থেকে রূপকথা শোনাতে শোনাতে বলত,

“শিউলিরা আসলে বনকুমারী, তারাদের স্বপ্নে ওরা ফুল হয়ে ফুটে থাকে। ওদের পরনে সাদা চোলি, কমলা ঘাঘরা… দুর্গামায়ের প্রিয় সহচরী ওরা। মা যখন সোনার রথে চেপে আকাশগঙ্গা পেরিয়ে আমাদের মর্ত্যলোকে আসেন, তখন তারাদের স্বপ্ন থেকে ওরা টুপটাপ খসে পড়ে। তারপর পুজো সাঙ্গ হলে তারাদের স্বপ্নে যখন ফিরে যায়, পৃথিবীতে পড়ে থাকে ওদের খোলসটুকু।”

মায়েরও খোলসটুকু পড়ে আছে। কোন তারার স্বপ্নে মা এখন শিউলিফুল হয়ে ফুটে আছে, তা তো জানি না! ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মায়ের ছবিটার দিকে তাকালাম।

এখানে আমি একাই থাকি। একা একাই দাশু থেকে বড় হয়ে কখন দর্শনা হয়ে গিয়েছি, মনে নেই। সুকুমারের দাশুর যেমন একটা নিজস্ব জগৎ ছিল, আমিও একটা গড়ে নিতে পেরেছি নিজের চেষ্টায়। উপায় ছিল না। মা যখন মারা গেল, তখন শোকে কদিন পাথর হয়ে ছিলাম। তারপর যখন হুঁশ এল, দেখলাম রাস্তায় বেরোলে লোকে টিটকারি দেয়, বন্ধুরা দেখে রুমাল চাপা দিয়ে আড়ালে হাসে, স্কুলের দিদিরা গম্ভীর চোখে তাকান। সবাই যেন মনে মনে একটা ফয়সালা করেছে দাশুর বিরুদ্ধে, যেটা দাশুর অজানা, দাশু হয় সেটা হাতড়িয়ে খুঁজবে, বা অবহেলা, অবজ্ঞা, টিটকিরির গ্লানিতে মুখ লুকিয়ে বেড়াবে।

আমার কাছে প্রথমটা সহজতর অপশন ছিল।

আমি খুঁজেছিলাম, খুঁজে পেয়েওছিলাম।

২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমার মায়ের নিথর শরীরটা তারই বেডরুমের বিছানায় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আবিষ্কার হয়। রিজেন্ট পার্কের পুলিশ কোয়ার্টারে, টালিগঞ্জ থানার ওসির বাড়িতে রক্তাক্ত, পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে মাথায় গুলি করা হয়েছিল তাঁর স্ত্রীকে। বিছানার নিচে মেঝেতে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়েছিল আরেকটা ডেড বডি। পুলিশ বলল, তার হাতে যে রিভলভার, সেই একই রিভলবার ব্যবহার করে সে মেরেছে আমার মাকে আর তারপরে… নিজেকে। আমার ষোল বছরের স্মৃতি বলে লোকটাকে আমি এর আগে কোনোদিন দেখিনি। তবুও, একাধিক সাক্ষী ছিল। অনেকে বলল, মা নিজেই দরজা খুলে লোকটিকে ঢুকিয়েছেন। পাশের বাড়ির কাকিমা বলল, দেড়টা নাগাদ মাকে ডাকতে আসায় মা ব্যস্ত আছেন বলে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দেন। লোকটিকে চিহ্নিত করেছিলেন অনেকেই। অতএব, সহজবোধ্য সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে দীর্ঘদিন ধরেই বাবার আর আমার অনুপস্থিতিতে লোকটির সঙ্গে অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত ছিলেন আমার মা। তারপর ঘটনার দিন কোনো মতভেদ, তার থেকে তর্কাতর্কি, তার থেকে খুনোখুনি। আমাদের ছোট সরকারি পুলিশ কোয়াটারের বাইরে সেদিন প্রচুর ভিড়, প্রতিবেশীদের, সাংবাদিকদের, চিত্রগ্রাহকদের। তবু আজ থেকে বিশ বছর আগের ব্যাপার তো, মিডিয়ার হয়ত কিছুটা দয়া হয়েছিল, স্কুল ফেরত মেয়েটাকে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বার করে কেউ প্রশ্ন করেনি। বাবার পুলিশ সহকর্মীরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল বটে, কিন্তু সেরকম কিছু বলার অবস্থায় ছিলাম না।

সেইসময়ে গণেশদাকে পাশে পেয়েছিলাম— বাবার পাশে, আমার পাশে। গণেশদার সঙ্গে বাবার কীভাবে পরিচয় হয়েছিল জানতাম না তখন, শুধু যে অসম্ভব ধৈর্য নিয়ে লোকটা আমাদের সামলেছিল তা দেখে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যেতাম।

বাবার কষ্টটা বুঝতে সময় লেগেছিল। মদ খেয়ে এসে বেশিরভাগ দিনই পড়ে থাকত বিছানায়। কোনো কোনো দিন এসে আমাকে চটাস চটাস করে চড় মেরে চিৎকার করে বলত, “দ্য বিচ হ্যাজ ফাকড মাই লাইফ!” যখন বলত, আমি পরিষ্কার বুঝতাম আমার চামড়ার নিচে বইতে থাকা সেই ‘বিচ’ এর রক্তের প্রতি বাবার তীব্র ঘৃণা হচ্ছে। হয়ত বাকি পঞ্চাশভাগ নিজের রক্ত বলেই প্রাণে ধরে ছেড়ে যেতে পারেনি।

বিবাহিতা স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক, বিছানায় নগ্নিকা স্ত্রীর শরীর, মেঝেতে পড়ে থাকা স্ত্রীর প্রেমিকের নিথর দেহ… বাবা ধীরে ধীরে অর্থব হয়ে গেল। আর আমি আমার ষোল বছর বয়স থেকে শুরু করে এই বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত বাবার মানসিক টানাপোড়েনকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে গেলাম। মায়ের প্রতি আমার ভরসা এত গভীর ছিল, যে বাবার রাগের ঠিকঠাক জাস্টিফিকেশন করতে পারিনি কোনোদিন। শুধু জানতাম, কোথায় যেন কিছু বুঝতে ভুল হয়েছে। অস্বীকার করি না, ছোটবেলায় পাড়াপড়শির ব্যাঁকা বাক্য শুনে যখন মনে মনে কষ্ট পেতাম, চোখ বন্ধ করে যখন মনে মনে ভেবেছি, মা আমাদের অবর্তমানে ওই বিছানাটায়, যেটায় কিনা ছুটির দিনে আমাকে থাবড়ে ঘুম পাড়াত, সেখানে অন্য কোনো পুরুষকে ছুঁচ্ছে, আমি ঘুমাতে পারতাম না। কিন্তু তারপরেই মায়ের হাসিমুখ মনে পড়ত, মনে হতো মা আড়ালে আবডালে গোপনে কোনো সম্পর্ক লালন করতে পারে না।

বাবা আছে এখনও। কলকাতায় এক সিনিয়র কেয়ারে, ছুটিতে গেলে দেখা করি। যেদিন গণেশদার কেসটা শুনে তড়িঘড়ি বর্ধমান চলে এলাম, সেদিন আর যেতে পারিনি। ফোনে কথা হল।

কেমন আছ জিজ্ঞাসা করায় ক্যাজুয়ালি বলল, “আছি।”

বাবা এখনও ষোল বছর আগে, নিজের বিছানার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। হতভম্ব! হতবাক!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *