১. দ্য কেস

১. দ্য কেস

“তুই যদি কোনোদিন লন্ডনে যাস, দেখবি ফোর্টনাম অ্যাণ্ড মেসন বলে একটা ফেমাস মুদির দোকান আছে, ওখানে নাকি চকোলেট কোটিং দেওয়া পিঁপড়ের ডিম পাওয়া যায়।” সুমন্ত খাবারটা আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে বলছিল।

“হ্যাঁ, তো?”

“আরে আমার জন্য এনে দিতে বলছি, গিফট হিসাবে।” ঢক করে ঢেঁকুর তুলে সুমন্ত পিঠ হেলিয়ে দিলো বেঞ্চটায়। এর পরে কী করবে সেটা আমি জানি, পকেট থেকে একটা চিটে রুমাল বার করে মুখটা মুছবে যত্ন করে।

“পিঁপড়ের ডিম, গিফট!”

“আরে লোকে বেকার চীনা লোকগুলোকে দোষ দেয় বুঝলি, ফ্রেঞ্চগুলো পর্যন্ত ব্যাঙের ঠ্যাঙভাজা খায়!” সুমন্ত উত্তেজিত স্বরে বলল। “পিঁপড়ের ডিম, ব্যাঙের ঠ্যাঙ, শামুকের নাদি… আহা! আমাদের দেশে যে কবে এসব পাওয়া যাবে!”

“তা, তোর কেন মনে হল আমি তোর জন্য লন্ডন থেকে গিফট আনব?” খুব বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম সুমন্তকে।

“আনবি না?” সুমন্ত আঁতকে ওঠে জিজ্ঞাসা করল। “এমন একটা বিশাল চাকরি করছিস, এতদিনের পার্টনারকে কিচ্ছু গিফ্টাবি না? তা, আমার জন্য না হোক, গণেশদার জন্য আনবি। গুরুদক্ষিণা!” সুমন্ত এক চোখ টিপল।

ক্যাটাপল এজেন্সির মালিক গণেশদার জন্য আমরা দুজনেই অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের তিনজনের বহুদিনের ঠেকে। গড়িয়াহাট থেকে গোলপার্কের দিকে যেতে একটা বাড়ির গ্যারেজে এই দোকানটায় আমরা টানা তিন বছর ধরে দেখা করতাম, আড্ডা মারতাম, বাপুজি কেকের ওপর মোমবাতি জ্বেলে জন্মদিন সেলিব্রেট করতাম। মাঝের এই দুবছর শুধু বিরতি গেছে।

ক্যাটাপল এজেন্সি যখন জয়েন করেছিলাম, তখন কলেজ থেকে সবে বেরিয়েছি। মনেপ্রাণে বিধ্বস্ত। বিধ্বস্ত অবস্থায় মানুষ তো পারিবারিক বন্ধুর কাছেই আশ্রয়স্থল খোঁজে! গড়িয়ার সেদিনের সেই ঘুপচি ঘরটায়, সানমাইকার চলটা ওঠা টেবিলটায় রাখা হাজারো কাগজের স্তূপের পিছনে বসা বিশালবপু চেহারার লোকটাকে দেখে আমি কোনো কিছু বলতেই দ্বিধা করিনি। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, জীবনের উচ্চাশা সবটাই খুলে বলেছিলাম।

ক্যাটাপল তখন বিশ বছরের পুরোনো এজেন্সি। ক্যাটারিং ব্যবসা, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের ব্যবসা, একটা এস.টি.ডি – আই.এস.ডি বুথ সবই এক ছাতার তলায়। তখন মোবাইলের জমানা নয়, গুছিয়ে ব্যবসা করেছিল ক্যাটাপল। আর সেই এজেন্সির অন্তরালে চলছিল অন্য আরেক ব্যবসা, লোকে যাকে অনেক নামে ডাকে। খবরি-খোঁচর-ইনফর্মার। রমরমিয়ে, একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করছিল গণেশদা। অবশ্য শুরুটা শুনলে মাখনের বদলে মরিচের কথা মনে পড়বে। এমন ঝাঁঝ যাতে শুধুই চোখ জ্বলে।

বর্ধমান জেলার গণেশ বলে একটা বছর বাইশের ছেলে থামস-আপের দোকান দিতে গিয়েছিল নবীনা সিনেমার সামনে। এডভান্সের বাইশ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর টাকাটা চোট হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে গিয়েছিল ছেলেটা। আর তখনই আমার, বলা ভালো আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল গণেশ হুঁই। বাবা তখন যাদবপুর থানায়। কেসটা নিজে তদন্ত করেছিলেন। কিন্তু সিনিয়র অফিসারেরা বলেই দিয়েছিলেন, টাকাটা নিয়েছে প্রোমোটার প্রদীপ সরখেলের ডান হাত দীপঙ্কর রাউত। ওই একই দোকান হাতবদল হয়ে বিক্রি হয়েছে বার ছয়েক। টাকা আর ফেরত পাবে না গণেশ। সর্বস্বান্ত, বুক ফাটিয়ে কাঁদতে থাকা গণেশের জন্য সেদিন কিছু করতে পারেননি বাবা। তবে একটা পথ বাতলে দিয়েছিলেন। প্রতিবাদ, প্রতিশোধের নয়, নেহাতই বেঁচে থাকার। আরও বছর দশেক পর শহরের বিভিন্ন জায়গায় হাত পাকিয়ে গণেশ যখন ক্যাটাপল এজেন্সি খুলে বসল, তখন তার নাম ডিসি সাউথ থেকে শুরু করে সিপি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

গণেশদার নেটওয়ার্ক এখন ছড়িয়ে রয়েছে কলকাতা শহর ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র। এই লাইনে, যেখানে একটা লোকের দেবরাজ ইন্দ্রের মতো সহস্রচক্ষু হয়ে ওঠা দরকার সেখানে বিশ্বস্ততার দাম খুব বেশি। সুমন্ত গণেশদার বিশ্বস্ত শাগরেদ। আর আমি ক্যাটাপলের অফিসিয়াল কাজগুলো সামলাতাম। ধীরে ধীরে এ লাইনের সব প্যাঁচ শিখছিলাম। ভেবেছিলাম, যতদিন না লক্ষ্যভেদ করছি, ততদিন এভাবেই চালাব। কিন্তু এজেন্সিতে কাজ করার ঠিক তিন বছরের মাথায় রেজাল্টটা বেরোল।

“কী ব্যাপার বল তো দর্শনা! দেড়টা বাজে! লোকটা গেল কই? একটা ফোন কর না!” সুমন্ত আমাকে খোঁচাল। ওর হাতের নখগুলো বিশ্রি বড় বড়। কাটেও না সময়ে, ময়লা জমে আছে ভেতরে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। অফিস থেকে জরুরি তলব এসেছে। আর দুঘন্টার মধ্যে শিয়ালদা ঢুকব, নাহলে ট্রেনটা মিস হবে। গেল কোথায় গণেশদা!

এই গ্যারেজটার বাইরে গলিটায় গড়িয়াহাট গড়িয়া রুটের অটোর লম্বা লাইন পড়ে, রাতে যেটা গ্যারেজ ছাড়িয়ে আরও আধা কিলোমিটার এগিয়ে যায়। মুখ বাড়িয়ে গড়িয়াহাট রোডের দিকে তাকাতেই চেহারাটা নজরে পড়ল। রুমালে ঘন ঘন মুখ মুছতে মুছতে বিরাট চেহারাটা এদিকে এগিয়ে আসছিল। ঘামে ভিজে ঘিয়ে রঙের শার্টটা গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। পায়ের স্যান্ডেলটার ঠিক করে স্ট্র্যাপ আটকানো নেই, ফলে জোরে হাঁটতে গিয়ে পা থেকে বারবার খুলে আসছে। গ্যারেজে ঢুকেই, বড় বেঞ্চটায় থপ করে বসে পড়ল গণেশদা। চোখের কোণে রাতজাগা কালি জমেছে, চুলগুলো ঘামে ভিজে মাথার খুলির সঙ্গে লেপ্টে আছে, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল লোকটাকে। হাত বাড়িয়ে পানির জগটা থেকে ঢকঢক করে পানি ঢালল মুখে, মুখের বদলে পানি চলকে গিয়ে পড়ল বুকের ওপর।

খানিকক্ষণ দম নিয়ে গণেশদা পকেট থেকে টেপা ফোনটা বার করে কাকে যেন ফোন করল, তারপর না পেয়ে বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বিধান অ্যারেস্টেড। গত রাতে। খুব চেষ্টা করলাম, জামিন করাতে পারিনি ম্যাজিস্ট্রেট জুডিশিয়াল কাস্টডিতে দিয়েছে। আঠারো বছরের একটা মেয়ে খুন হয়েছে পরশু রাতে। ওকে সেই চার্জে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। বর্ধমান ডিডি হ্যান্ডওভার নিয়ে নিয়েছে। একটু দেখ, প্লিজ!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *