০৮. স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে হুমায়ূন আহমেদ

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে হুমায়ূন আহমেদ

২৬ মার্চ সোমবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশন ও কনস্যুলেটের যৌথ আয়োজিত ৪১তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে হুমায়ূন আহমেদ যোগ দেন। জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নিয়োগ হওয়ার পর একমাত্র সেদিনই তিনি কোনো অনুষ্ঠানে বা বাংলাদেশ মিশনে প্রথমবারের মতো উপস্থিত হন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিবৃন্দের উপস্থিতি সত্ত্বেও অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন উপস্থিত সকলের প্রধান আকর্ষণ। হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের সাথে ঐ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া রুমা সাহা বলেন, হুমায়ূন আহমেদ এলিভেটর দিয়ে অনুষ্ঠানে পৌঁছার পর প্রথমে অনেকে তাকে চিনতে পারেননি। এরপর অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছার পর অভ্যাগত বাঙালিরা যখন জানতে পারলেন হুমায়ূন আহমেদ এসেছেন, তখনি হুমায়ূন আহমেদই অনুষ্ঠানের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়েন। শুধু বাঙালিরা নয় বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দও তার সাথে ছবি তুলতে শুরু করেন। কোট, প্যান্ট ও টুপিপরা হুমায়ূন আহমেদ পুরো সন্ধ্যা আনন্দে কাটিয়েছেন। অনুষ্ঠানে তিনি সেদিন বাংলাদেশ মিশন ও কনস্যুলেটের জন্য দুটি ছবি যথাক্রমে স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং কনসাল জেনারেল সাব্বির আহমেদের কাছে উপহার দেন। নিউইয়র্কে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে ইত্তেফাঁকের বিশেষ প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে বলেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর এই প্রথম তিনি প্রকাশ্য কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের পাঠানো বার্তায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন দর্শন হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। জাতিসংঘ মহাসচিবের বাণী পাঠ করেন সেভ দি কেবিনেটের প্রধান বিজয় নামবিয়া। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নাসের আব্দুল আজিজ বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের সকল সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বাংলাদেশ সফরকালীন বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আব্দুল মোমেন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, যে জাতি স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারে সে জাতি একদিন বিশ্ব জয় করবেই। তিনি বলেন, বাঙালির অন্তর্নিহিত চেতনার উন্মেষ সকল সঙ্কটে আগ্নেয়গিরির সুপ্ত লাভার মতো বিকশিত হয়েছে। অতিক্রম করেছে সকল সঙ্কট। বাধা বিপত্তি, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালিরা চিরকালই সোচ্চার। স্বাধীনতার পর বাঙালির এখন আরাধ্য দিক-দিগন্ত জয়। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকেলে বিপুলসংখ্যক বিদেশি রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘের পদস্থ কর্মকর্তা, প্রবাসী বাঙালিদের উপস্থিতিতে দুদফা কেক কাটা হয়। বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ লিখিতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে তাদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও অগ্রগতির ওপর ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল সাব্বির আহমেদ চৌধুরী। সেই দিনের অনুষ্ঠান সম্পর্কে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সুস্থবোধ করায় ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সস্ত্রীক। সে সময় কথা হয় তার সাথে। পাঠক, ভক্ত-অনুরক্তদের কারণে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেননি তিনি। সে সময় পাশেই ছিলেন তার স্ত্রী বিশিষ্ট অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। তিনি বলেন, গত ২৫ মার্চও তার শরীর খুব ভালো ছিলো না। আজ কিছুটা ভালো অনুভব করায় এখানে আসতে পেরেছেন। শাওন উল্লেখ করেন, লেখক সব সময় তার ভক্ত পাঠকের কথা ভাবেন। পাঠকের কারণেই তার লেখালেখি অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসার জন্যে নিউইয়র্কে আসার পর হুমায়ূন আহমেদের সাথে সাপ্তাহিক ঠিকানার পক্ষ থেকে সেদিন নির্বাহী সম্পাদক লাবলু আনসারের আলাপচারিতা এখানে উপস্থাপন করা হলো।

প্রশ্ন: কেমন আছেন?

উত্তর: দেখতেই পাচ্ছেন। ভালো বলেই তো এসেছি।

প্রশ্ন: স্বাধীনতার ৪১ বছর অতিবাহিত হলো। যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে তার কতটা অর্জিত হয়েছে বলে মনে করেন?

উত্তর: অনেককিছুই অর্জিত হয়েছে। আরো বহুদূরে যেতে হবে।

প্রশ্ন: অর্জন যা হয়েছে তার উল্লেখযোগ্য কিছু বলবেন কি?

উত্তর: শীঘ্রই আমাদের দেশ দারিদ্র মুক্ত হতে যাচ্ছে। এটি অনেক বড় ব্যাপার। শিক্ষা ক্ষেত্রেও আমরা বহুদূর এগিয়েছি।

প্রশ্ন: একাত্তরের মানবতাবিরোধী বিচার সম্পর্কে কিছু বলবেন?

উত্তর: বিচার হচ্ছে, এটি বড় সত্য।

প্রশ্ন: আপনার কী মনে হয় যে বর্তমান সরকার সঠিক ট্র্যাকে দেশ চালাচ্ছে?

উত্তর: এটি সরকার ভালো বলতে পারবে। আমি তো সরকারের লোক নই।

প্রশ্ন: দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সরকারের কাজকর্ম কীভাবে দেখছেন?

উত্তর: সবার মাঝেই কিছু ভুলভ্রান্তি থাকে। তাদেরও হয়তো কিছুটা রয়েছে। তবে তারা আন্তরিক অর্থে চেষ্টা করে যাচ্ছে ঠিকমতো দেশ চালাতে–এটি মনে হয় আমার কাছে।

প্রশ্ন: চিকিৎসা কতদিন চলবে?

উত্তর: আমি কিছুই বলতে পাচ্ছি না। সবটাই চিকিৎসকরা জানেন।

প্রশ্ন: আগের চেয়ে এখন আপনি অনেকটা ভালো আছেন?

উত্তর: আগেও এমনই ছিলাম।

প্রশ্ন: আগে নিউইয়র্কে আসতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে। এখন রয়েছেন চিকিৎসার জন্যে। প্রবাসীরা এখন আপনার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক বলে মনে করেন? আপনার কী মনে হয় যে অসুস্থ বিধায় প্রবাসীদের আন্তরিকতা অনেক বেড়েছে আপনার ব্যাপারে।

উত্তর: আমি আসলে তাদেরকে খোঁজ-খবর দিচ্ছি না। আমি লুকিয়ে থাকছি। চিকিৎসার প্রয়োজনে এটি করতে হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনার সান্নিধ্য পাবার জন্যে অসংখ্য প্রবাসী চেষ্টা করেন। আপনি কী জানেন।

উত্তর: আমি তা জানি। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না।

প্রশ্ন: লেখালেখি সম্পর্কে বলুন।

উত্তর: চলছি একইভাবে।

প্রশ্ন: আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

উত্তর: আপনাকেও। প্রবাসীদের আমার স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা দেবেন।

.

পাদটীকা গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশ মিশন আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে হুমায়ূন আহমেদ প্রথম ও শেষবারের জন্য যোগ দেন। এছাড়া গত ৯ মাসে কখনো তিনি ঘরে বসে থাকেননি। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকাসহ বাঙালি গ্রোসারি, ডাক্তারখানা ও রেস্টুরেন্টেও তিনি গিয়েছিলেন। সাধারণ নাগরিকের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। শত ব্যথায়, শত কষ্টে তিনি থাকতেন প্রাণবন্ত। ব্যথিত হতো সঙ্গী-সাথীরাও। কষ্ট হলেও প্রকাশ করতেন না অনেক কিছু। ২৫ মার্চ শরীর খারাপ থাকার পরও ২৬ মার্চ ভালো বোধ করায় হুমায়ূন আহমেদ উপস্থিত হয়েছিলেন ৪১তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠান হয়ে গেল জীবদ্দশায় আমেরিকায় যোগ দেওয়া হুমায়ূন আহমেদের শেষ অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মিশন থেকে পাঠানো গাড়িতে হুমায়ূন আহমেদ, মেহের আফরোজ শাওন, রুমা সাহা এবং গাজী কাশেম যোগ দেন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *