১. মুর্শিদিগান
গুরুর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে রচিত সুরসাহিত্যই মুর্শিদি নামে পরিচিত। ভক্তিবাদই এই গানের মূল বিষয়বস্তু। মুর্শিদভক্তরা মনে করে গুরুর কৃপায় অজানাকে জানা যায় এবং তিনি আধ্যাত্মিক জগতের পথ প্রদর্শক। তারা গুরুর চরণে ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য সবকিছু সপে দেন। গুরুস্তুতি গান মুর্শিদভক্তরা আসর সাজিয়ে গেয়ে থাকেন। প্রেমজুড়ি, করতাল, ঢোল, সারিন্দা, একতারা এসব বাদ্যযন্ত্র এই মুর্শিদগানে ব্যবহার হতে দেখা যায়। একজন মুর্শিদভক্ত জেন্নাত বাউল (৫৪) এই গানের তাৎপর্য এভাবে তুলে ধরলেন—‘এই মুর্শিদ গানের মাধ্যমে হৃদয়ে ভক্তি আসে, শ্রদ্ধা আসে। মা- বাবা ও গুরুজনদের নির্দেশিত পথ এ পোড়া মন মেনে নেওয়ার শিক্ষা পায়। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য, এই আসরে আমরা হিন্দু-মুসলমান সবাই যোগদান করি। জাতি ভেদাভেদ এখানে থাকে না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এটি একটি সুন্দর নিদর্শন।’ মুর্শিদগানের আয়োজনে ব্যয়বহুল কিছুই নেই। যে যার সাধ্যমতো এই গানের আয়োজন করতে পারেন।
সংগৃহীত মুর্শিদিগান
১.
ব্ৰহ্ম আদি জ্ঞান না হলে
কি হবে তোর মালা নিয়ে
গুরু ভজন হবে না
তোর স্বভাব না গেলে।
গুরুকে ভজিবি যদি
জপ ওই নাম নিরবধি, দুইজনে মিলে
তোর দুই দেহ এক না হলে
কি লাভ হবে মালা নিলে।
গুরু ভজন কি মুখের কথা
যার অন্তরে আছে গাঁথা
সে জানতে পারে
তোর ব্রহ্ম আদি জ্ঞান হলে
পাবি দেখা মনে হলে।[১]
২.
আহা রে কাঙালের গুরু
কোথায় গিয়া লুকালি লুকালি,
লুকালি রে তুই
দেহ ছাড়িয়া কই লুকালি
আর কোনো দুঃখ থাকে যদি
তাই আমারে দিতে বলি।
নবরঙ্গ ভাব সাগরে
আমায় ক্যান ভাসালি
দেশ ছাড়া বেশ পরাইয়া
জগতের লোক হাসালি।[২]
৩.
দিনে দিনে দিন ফুরাল
সেই দিনের খবর কর না
থাকতে দিন ও ভাই মোমিন
গুরুর চরণ ধর না।
গুরুর বাক্য বীজ রোপণে
ধ্যান করগ্যা রূপের ধ্যানে
দেখতে পাবি বর্তমানে
রূপের ঘরে কি কারখানা।
খুঁটি কর গুরুর চরণ-
মন রশি দিয়া কর বন্ধন
জ্বরা মৃত্যু হবে দমন
কাল শমনের ভয় রবে না।
দেহে আছে ছ’টি পাগল
দিবা নিশি বাধাইছে গোল
ফকির হাজার বলে
আমিনের মন ঠিক হলো না।[৩]
৪.
আমার ভবের খাটনি শেষ হলো না
ধান থুইয়ে তুষ ভারা-ভানা
উপায় কি বল না
গুরু উপায় কি বল না।
অকাঠা মান্দারের তরী
জলের বাড়ি সয় না
আবার কাঁটা খালে খেয়া দিলে
তিন খেয়ার বেশি টেকে না
সাধ ছিল মোর মালামতের
টাকায় তো কুলায় না
আমি ধার করিয়া আনতে পারি
দিতে মনে লয় না।[৪]
৫.
মন তোর ভাবনা কিসে
গুরুর রূপ-ধ্যানে থাক না বসে
খোল তবল বেহালা জুড়ি
বাদ্য কর কি কারণে
দেহের তার সারিন্দা করে
বাজাও বসে রাত্র দিনে।
খাসি বকরি দুম্বকাদি
জবাই কর কি কারণে
দেহের ছয় ষোলো নিয়া
বলি দাও গুরুর শ্রীচরণে।
টাকা পয়সা ব্যয় করিয়া
মক্কা যাও কি কারণে
পাইতে পার মক্কার
ছোয়াব পড় গুরুর শ্রীচরণে।
৬.
আমি সদা ডাকি গুরু বলে
কি দুষি হইলাম চরণে
গুরু ডানে তুমি বামে গো তুমি
হৃদয় মাঝে আছ তুমি
তবু মোরে বল দুষি
এ দোষ আমায় গেলো না রে।
মনে বড় সাধো রে ছিল
ওই চরণে হব দাসী
আমি হব দাসি যাব কাশী
এই বাসনা আমার মনে।
৭.
দয়াল কি দিয়া ভজিব তোমারে
হারে বান্ধব কি দিয়া ভজিব তোমারে।
আমায় দিয়া ভিক্ষার ঝুলি
সকল ধন কাড়িয়া নিলি
আর কোনো ধন নাই রে আমার ভাণ্ডারে
ছিল হরিশ্চন্দ্র রায়
স্ত্রী পুত্র বিক্রি করে গুরুর দক্ষিণায়-
ছিল দাতাকর্ণ সে যে দানেতে ধন্য
পুত্র কেটে মাংস নিয়ে দেয় তারে।
ছিল প্রহ্লাদ ভক্ত
দেহ পরাণ সপে দিল জনমের মতো
নিশি মনের দুঃখে কয়
এ দেহ বাঁচলে কি লাভ হয়
দেহ প্রাণ বিসর্জন করে দেয় তারে।
হাজার তুমি চক্রধারী
কি চক্ৰ শিখাইয়া মোরে করলি দেশান্তরি
আমার দিক বিদিক আর নাই
কোনো শান্তি নাইরে আমার অন্তরে।[৭]
৮.
কি দিয়া ভজিব রে মুর্শিদ তোমারে
দীনহীন কাঙাল আমি এ দাসীরে রেখ মনে।
আমার বাড়ির সবরি কলা পাকতে বসেছে
বনের পাখি মুখ না দিয়া রয়েছে বসে
ও গো আমার ফল যেন বিফল হয় না
মুর্শিদ এ মিনতি চরণে।
বনফুলের গাঁথা মালা হতেছে বাসি
নয়ন জলে তাজা রাখি দয়াল সে ফুল রাশি
পূর্বের ভাণু বসেছে পাটে
হায় রে পলক নাই রে আমার নয়নে।
আঁধার রাতে হৃদ আকাশে মুর্শিদের শশি
একা একা দেখব রে আমি নির্জনে বসি
থাক যদি বদন ঘুরে আমি মুছব আঁখি বসনে।[৮]
৯.
যে যা বলে বলুক রে মন
তাতে কিছু আসে যায় না
মুর্শিদ যেমন যার মন যেমন
জ্ঞান বিহনে মাপা যায় না।
পানি যদি রাখে কেহ রঙিন পাত্রের পরে
পাত্রের রঙের রঙটি তখন ওই পানিতে ধরে-
তেমনি মুর্শিদ ভক্তের ঘরে
সাধক বিনে জানতে পায় না।
দুষি খোঁজে অপরের দোষ জ্ঞানী খোঁজে গুণ
নিজের দোষে নিজেই দুষি শেষে লাগায় আগুন
সে আগুনে পুড়ে মরে
মালিক তখন ফিরে চায় না।
জাহেরী এলেমে হয় না, বাতেনে বিচার
সিনায় এলেম সিনায় সিনায় প্রকাশ পায় যাহার
দুধে ধুইলে পোড়া আঙার
জিন্নাত কয় তার রূপ ভোলে না।[৯]
