ছ. রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
জন্ম. টুঙ্গিপাড়া গ্রাম, গোপালগঞ্জ, ১৭ মার্চ ১৯২০। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও রাষ্ট্রনায়ক। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন জোতদার ও গোপালগঞ্জ আদালতের নাজির। মাতা সায়রা খাতুন। চার বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর বয়স যখন দশ বছর তখন তিন বছর বয়স্কা জ্ঞাতিভগ্নী ফজিলাতুন্নেসা (রেনু) সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ১৯৪১-এ মেট্রিক, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৪-এ আই.এ. এবং একই কলেজ থেকে ১৯৪৬-এ বি.এ. পাস। স্কুলজীবনে গোপালগঞ্জ সফরে এলে বাংলার তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নজরে পড়েন। ইসলামিয়া কলেজে আই.এ. ক্লাসে ভর্তি হওয়ার পর পর এই সম্পর্ক গাঢ় হয়। সে সময় থেকে সোহরাওয়ার্দীর একজন অনুসারী হিসেবে কলকাতায় মুসলিম ছাত্র আন্দোলন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের আবুল হাশিম নেতৃত্বাধীন বামপন্থি গ্রুপের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ। ‘নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন’, নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ ও ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের’ কাউন্সিলার এবং ‘গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম লীগের’ সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত। ১৯৪৬-এ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। সিলেটের গণভোট অনুষ্ঠানকালে (৬ ও ৭ জুলাই-১৯৪৭) মুসলিম লীগের পাঁচশত কর্মী তাঁর নেতৃত্বে কাজ করে। এই গণভোটে মুসলিম লীগের বিরাট সাফল্য অর্জনের পশ্চাতে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার দরিদ্র মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৪ আগস্ট-১৯৪৭) পর কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকায় আগমন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ল’ ক্লাসে ভর্তি। মুসলিম লীগ সরকার জনকল্যাণমূলক আর্থ-সামাজিক, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ না করার প্রতিবাদে এ সময় মুসলিম লীগ ত্যাগ। সরকারের জনস্বার্থবিরোধী স্বৈরাচারী নীতির বিরোধিতা ও পূর্ব বাংলার স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৪৮- এ ৪ জানুয়ারি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ’ গঠিত। তিনি ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। একই বছর ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত (২ মার্চ-১৯৪৮) হলে এর সঙ্গে যুক্ত। এবছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালনের সময়ে ঢাকায় গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ। ‘বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে সুপারিশ করে পূর্ববঙ্গ পরিষদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে’ এ মর্মে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের নাজিমুদ্দীন সরকার চুক্তিবদ্ধ হলে জেল থেকে মুক্তিলাভ (১৫ মার্চ ১৯৪৮)। ১৯৪৯-এর মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি দাবির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত ও গ্রেফতার। একই বছর ২৩ জুন (১৯৪৯) পুরনো ঢাকার রোজগার্ডেনে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হলে কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় এর যুগ্ম- সম্পাদকের পদ লাভ। খাদ্য সংকটের ব্যাপারে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে ১৯৪৯-এর অক্টোবর মাসে আর একবার গ্রেফতার। বন্দীদশায় বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ফরিদপুর কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন (১৬-২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। ২৮ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) মুক্তি লাভ। ১৯৫৩-তে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। ১৯৫৪-র মার্চের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে গোপালগঞ্জ এলাকা থেকে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত। অতপর শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রী নিযুক্ত (৪ মে ১৯৫৪)। একই বছর ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকার ৯২-ক ধারা প্রয়োগ করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ববঙ্গে গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করলে গ্রেফতার হন। একই বছর ডিসেম্বর মাসে মুক্তি লাভ। ১৯৫৫-র জুন মাসে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্যদের ভোটে পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত। একই বছর ২২ অক্টোবর কাউন্সিল সভায়, ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলকে অসাম্প্রদায়িক করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন। ১৯৫৬-র ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত ‘পুর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের’ শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও দুর্নীতি দমন দফতরের মন্ত্রী নিযুক্ত। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে গড়ে তোলার উদ্দেশে দলের কাউন্সিল সবার প্রস্তাব অনুসারে ১৯৫৭-র জুলাই মাসে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ। ১৯৫৮-র ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি করা হলে কারারুদ্ধ ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত। সামরিক সরকার কর্তৃক বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা দায়ের। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সব মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ। ১৯৫৯-এর ডিসেম্বর মাসে জেল থেকে মুক্তি লাভ করলেও গৃহে অন্তরীণ অবস্থায় বছর দুয়েক দিনযাপন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারকে (৩০ জানুয়ারি ১৯৬২) কেন্দ্র করে ১৯৬২-র ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-বিক্ষেভ শুরু হলে পুনরায় গ্রেফতার। ১৯৬২-১৯৬৩-তে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এনডিএফ (ন্যাশনাল জেমোক্রিটিক ফ্রন্ট) দেশব্যাপী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন চালালে তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ। সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুতে (৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩) এনডিএফ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে দেশকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে উদ্ধারকল্পে ১৯৬৪-র ২৫ জানুয়ারি তৎকর্তৃক আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবন। একই বছর ২৫ জুলাই (১৯৬৪) ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ (কপ) গঠন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন এবং আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের প্রথায় অনুষ্ঠিত (২ জানুয়ারি ১৯৬৫) দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নার নির্বাচনী প্রচার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন। ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধ (৬-২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫) সমাপ্তির পর উভয় দেশের মধ্যে ‘তাসখন্দ চুক্তি’ স্বাক্ষরের (১০ জানুয়ারি ১৯৬৬) পটভূমিকায় ১৯৬৬-র ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের এক সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে ৬ দফা কর্মসূচি পেশ। সর্বজনীন ভোটাধিকা, ফেডারেল পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার, কেন্দ্র ও প্রদেশের জন্য পৃথক মুদ্রা (দুই মুদ্রা) ব্যবস্থা, প্রাদেশিক সরকারকে কর ও শুল্ক ধার্যের ক্ষমতা প্রদান, প্রাদেশিক সরকারকে বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি প্রেরণের ও বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা অর্পণ এবং প্রদেশগুলোকে আঞ্চলিক বাহিনী সংরক্ষণের অধিকার দেওয়ার দাবি ৬ দফায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই বছর ২০ মার্চ (১৯৬৬) আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত। অতঃপর ৬ দফার পক্ষে জনমত সংগ্রহের জন্য প্রচার অভিযান শুরু। এ কর্মসূচির ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন এবং তা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে মূল দাবি হিসেবে ধরা দেয়। ১৯৬৬-র ৮ মে সরকার কর্তৃক নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার। তাঁর মুক্তি ও ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ৭ জুন (১৯৬৬) আওয়ামী লীগের ডাকে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত। ১৯৬৮-র ১৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভ। কিন্তু একই রাতে পুনরায় জেলগেট থেকে গ্রেফতার করে তাঁকে ঢাকা ক্যান্টমেন্ট স্থানান্তরিত করা হয়। তাঁকে প্রধান আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ (১৯ জুন ১৯৬৮-২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯) সূত্রপাত। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল : ‘অভিযুক্তরা ভারতীয় অর্থ ও অস্ত্রের সাহায্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটিয়ে কেন্দ্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র করেছিলেন।’ ৬৯-এর জানুয়ারি-মার্চের গণ-অভ্যুত্থানের চাপে আইয়ুব সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার করে তাঁকে মুক্তি দেয়। ২৩ ফ্রেব্রুয়ারি (১৯৬৯) ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক ঢাকার তঃকালীন রেসকোর্স ময়দানে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত। দেশের বিবাদমান রাজনৈতিক সংকট মীমাংসাকল্পে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কর্তৃক রাওয়ালপিণ্ডিতে আহূত গোলটেবিল বৈঠকে (২৫ ফেব্রুয়ারি, ১০-১২ মার্চ ১৯৬৯) যোগদান। গোলটেবিল বৈঠকে শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেব (ক) প্রাপ্তকয়স্কদের ভোটাধিকার, (খ) ফেডারেল পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার, (গ) ৬ দফার ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন, (ঘ) জনসংখ্যার ভিত্তিতে জাতীয় পরিষদে প্রদেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব, (ঙ) পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ব্যবস্থা বাতিল— এ পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন। পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার ও প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার এই দুই দফা দাবি ব্যতীত অবশিষ্ট তিন দফা দাবি নাকচ করা হলে বৈঠক ত্যাগ। অতঃপর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গ্রহণ। বাঙালির জাতিসত্তাকে শাণিত করার লক্ষ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উদ্ভাবন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলো ভাষাভিত্তিক আঞ্চলিক জাতিসত্তার ভিত্তিতে পাঞ্জাবি, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ নামে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পটভূমিকায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। জাতীয় নির্বাচনকে (১৯৭০) সামনে রেখে ‘গণতান্ত্রিক সমাজবাদ’ (গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতন্ত্র কায়েম) প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি উপস্থাপন। ১৯৭০-এর ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তাঁর নেতৃত্বে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের একক বিজয় অর্জন। নিজে তিনটি আসন (ঢাকা-৮, ঢাকা-৯ ও ফরিদপুর-৫) থেকে নির্বাচিত। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০ আসনের অধিকারী) দলের নেতা হিসেবে তাঁর সরকার গঠনের কথা। সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ১৯৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান। ১ মার্চ (১৯৭১) ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোঘণা। ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক। ৩ মার্চ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। ৭ মার্চ তৎকালীন ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান। তিনি ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের পটভূমিকায় ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত (২২-২৫ মার্চ ১৯৭১)। এই আলোচনা ব্যর্থ হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী কর্তৃক বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু। একই রাতে ঢাকার ধানমন্ডিস্থ স্বীয় বাসভবন থেকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেফতারবরণ এবং গ্রেফতারের আগে (২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। গ্রেফতারের পর পশ্চিম পাকিস্তানে প্রেরণ। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং এম.এ.জি. ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি করে মুজিবনগরে (বৈদ্যনাথতলা গ্রাম, মেহেরপুর) স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত। এ সরকারের নেতৃত্বে নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চলার পর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১)। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি ঢাকায় প্রত্যাবর্তন। ১২ জানুয়ারি বাংলদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক অস্ত্র সমর্পণ (জানুয়ারি ১৯৭২) ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগ (১৫ মার্চ ১৯৭২)। তাঁর শাসনামলে রাশিয়া, ইটালি, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মান, বেলজিয়াম, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইরাক, ইরানসহ ১০৪টি দেশ কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান এবং তাঁর নেতৃত্বের ফলে কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামিক সংস্থায় বাংলাদেশের সদস্য পদ লাভ। লাহোরে ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) এবং এর অব্যবহিত পূর্বে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান (২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)। তাঁর নেতৃত্বে গণপরিষদের (১৯৭২) সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘শাসনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটি’ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে স্বল্প সময়ে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের’ সংবিধান রচনা করে এবং ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক সংবিধান গৃহীত। ১৬ ডিসেম্বর (১৯৭২) উক্ত সংবিধান চালু। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকার প্রবর্তিত। এই শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৭৩-এর ৭ মার্চ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত। চারটি আসন (ঢাকা-১২, ঢাকা-১৫, ফরিদপুর-১১ ও বাখরগঞ্জ-৪) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে ১৬ মার্চ (১৯৭৩) দ্বিতীয়বার সরকার গঠন। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী গৃহীত। এই সংশোধনীর বলে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত। একই দিন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ। ২৪ ফেব্রুয়ারি (১৯৭৫) দেশের রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দিয়ে তাঁর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে একক জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন। ৭ জুন (১৯৭৫) বাকশালের সাংগঠনিক কমিটি গঠন। জেলার শাসনব্যবস্থায় গভর্নর পদ্ধতির প্রবর্তন ও বহুমুখী গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে দেশের কৃষি-অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল বাকশালের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি প্রদান। শিল্প-কারখানা ব্যাংক, বিমা ইত্যাদি জাতীয়করণ, রক্ষী বাহিনী গঠন, সামরিক একাডেমী প্রতিষ্ঠা, ঢাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ, শহীদ পরিবারকে অনুদান ও ভাতা প্রদান, যুদ্ধবিধস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দান, বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স (১৯৭৩) ও জাতীয় বেতন স্কেল চালু ইত্যাদি তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য কাজ। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পঁচিশ বছর মেয়াদি ‘বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি’ (১৯৭২), গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত অস্থায়ী ‘ফারাক্কা চুক্তি’ (১৯৭৪) সম্পাদন। ‘বিশ্ব শান্তি পরিষদ’ প্রদত্ত ‘জুলিও কুরী পদক’ লাভ। ১৯৭৩-এর ২৩ মে ‘বিশ্ব শান্তি পরিষদের’ সেক্রেটারি জেনারেল রমেশচন্দ্র কর্তৃক ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পদক প্রদান। তিনি প্রথম বাঙালি যিনি ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। পূর্ব বাংলার (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীকার আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা এবং তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা পালন করায় এবং এর ভিত্তিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তিনি ‘জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত। ২০১২-এ তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মৃত্যু, ঢাকার ধানমন্ডিস্থ স্বীয় বাসভবনে সামরিক বাহিনীর স্বাধীনতা-বিরোধী একটি চক্রের হাতে সপরিবার নিহত, ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সাল।
লোকজসংস্কৃতি বিকাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
লোকজসংস্কৃতি লোকজীবনেরই প্রবহমান ধারা। কোন জনগোষ্ঠির ( Group) যাপিত জীবনের অংশীদারমূলক (Shared) নান্দনিক কর্মকাণ্ডের (Artistic Communication) সদাপ্রবহমান ধারাই আমাদের লোকজসংস্কৃতি। লোক সংস্কৃতি মুলত Group Earning. এই সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনমূলক জাতীয় উদ্যোগের অভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশিষ্ট অবদান রয়েছে।
গোপালগঞ্জ মহকুমা শহর হলেও পরিবেশ ছিল গ্রামের মতো। মধুমতী পাড়ের এই শহরে স্থায়ী বাসিন্দা বলতে সরকারি কর্মচারী ও পরিবার-পরিজনদের বোঝাতো। একটি কথা না বললেই নয়- পুরো জেলাটি প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত। প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। হিন্দুদের বারো মাসে তেরো পার্বণ তখন লেগেই থাকতো। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শহরে হয়নি। টুঙ্গীপাড়ার জলেডোবা খাল-বিল আর সবুজ ধান-পাটের মাঠে কেটেছে তাঁর কৈশোর। সে সময় পল্লিবাংলার সংস্কৃতিতে যাত্রাপালা, রয়ানী, গাজীর গীত, পূজা-পার্বণ, হালখাতা, গার্সি, নৌকাবাইচ, নবান্ন, কবির লড়াই, লাঠিখেলা, সারিগান ও গরুর লড়াইয়ের প্রাধান্য ছিল। বঙ্গবন্ধু গ্রামে থেকেই এসব বিনোদন উপভোগ করেছেন।
গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব মেলা। গোপালগঞ্জে প্রায় প্রতিটি গ্রামে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এসব মেলা দেখেই তিনি বড় হয়েছেন। অন্যদিকে কালিপূজা, লক্ষ্মীপূজা ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে খাল-বিল-নদীর দেশ গোপালগঞ্জের ঘাঘর, মধুমতী ও বাঘিয়ার বিলের নৌকাবাইচ তিনি দেখেছেন বাবার বড়ো পানসী নৌকায়।
বঙ্গবন্ধুর প্রিয়জন ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষ। আর সাধারণ মানুষের লোকাচার ও লোকাচারণ এবং লোকজসংস্কৃতির প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। লোকজসংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ পাই রাজনৈতিক জীবনের সভা-সমাবেশ ও অনুষ্ঠান এবং উৎসবে। সেকালে রাজনৈতিক সভার কাজ শুরুর পূর্বে মঞ্চে গান পরিবেশনের রেওয়াজ ছিল। শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর জনসভায় প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ গান গাইতেন। বঙ্গবন্ধুর জনসভায়ও এমনটি হতো। সুনামগঞ্জের লোকশিল্পী শাহ আবদুল করিম বঙ্গবন্ধুর সভায় গান গাইতেন। তাঁকে তিনি ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর কাগমারী সম্মেলনে নিয়ে যান। একবার কোটালীপাড়ার জনসভায় এক কিশোরের গান শুনে তিনি বিমুগ্ধ হন এবং সেই কিশোর ছেলেটিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। সেই কিশোর ছেলেটিই আজকের গীতিকার ও সংগীতশিল্পী কেএম চাঁদ মিয়া। গান লোকজসংস্কৃতির আদি উপকরণ। যেকোনো ধরনের গান তিনি পছন্দ করতেন। তবে লোকজসংগীতের প্রতি ছিল ভীষণ টান। তাঁর আজীবন সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দেশ পাক- হানাদারমুক্ত হলে তাঁর উদ্যোগে ১৯৭৩ সালে ঢাকার বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগস্থ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয় ৭ দিনের লোকজ উৎসব। এই উৎসব উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। একদিনের উৎসবে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু।
উত্তরাগণভবনে একবার তিনি শিল্পী আবদুল লতিফ ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে লোকগানের আসর বসান। শুধু তাই নয়, উত্তরবঙ্গের গম্ভীরা গানের প্রখ্যাত শিল্পী কুতুবুল আলম, রকিবুদ্দীনকে এনে গম্ভীরা গান শোনেন। গ্রামবাংলার লোকজসংস্কৃতির বিকাশ ও লালনের লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগেই লোকশিল্প জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি এবং ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে সুনামগঞ্জে হাসন রাজার জন্মোৎসব পালন করা হয়। এই উৎসবের পূর্বে হাসন রাজা স্মৃতি পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন এবং উৎসব উদ্বোধনের অনুরোধ জানান। হাসন রাজা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয় এক শিষ্য, লোক কবি এবং মরমী গায়ক। তিনি ঐ উৎসবে যোগদান করেননি ঠিকই, কিন্তু হাসন রাজার গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, লোকজসংস্কৃতি তথা লোকসাহিত্য গবেষণা করার জন্য উৎসব কমিটিকে নগদ চব্বিশ হাজার টাকা প্রদান করেন। লোকজসংস্কৃতির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর এমন দরদের কথা আমরা অনেকেই জানি না। গ্রামবাংলায় বেড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু আজীবন লোকজসংস্কৃতি বিকাশে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে পরামর্শ করে বাংলাদেশের সংবিধানের পুস্তানিতে নকশি কাথা ব্যবহার করে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার যে সমন্বয় ঘটান যা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা
শেখ ফজিলাতুন্নেসা ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ জহুরুল হক এবং মাতার নাম শেখ হোসনে আরা বেগম। তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
শেখ ফজিলাতুন্নেসা
অল্প বয়সে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালীন তিনি মামলা পরিচালনা করা, দলকে সংগঠিত করা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী হিসেবে সবসময় তাঁর পাশে থেকে তাঁকে অনুপ্রেরণা দান করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ জাতির জনকের গ্রেফতারের সময় তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গৃহবন্দি হন। ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এলে তিনিও বঙ্গবন্ধুর সাথে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বিশেষ করে নির্যাতিতা মা-বোনদের সহযোগিতা ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশ ও জাতির সেবা করে যান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল কতিপয় সামরিক ঘাতকের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। তাঁর নামে, গোপালগঞ্জ শহরে বেগম ফজিলাতুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা। তিনি ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মায়ের নাম শহিদ ফজিলাতুন্নেসা। শেখ হাসিনা শিক্ষাজীবন শুরু করেন টুঙ্গীপাড়ার এক পাঠশালায়। পরবর্তীতে ঢাকায় ১৯৫৬ সালে তিনি ভর্তি হন টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৬৫ সালে আজিমপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৭ সালে ঢাকার বকশী বাজারে পূর্বতন ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১১-দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এ গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের দখলদার বাহিনী তাঁকে তাঁর স্বামী, মা, বোন ও ছোট ভাই শেখ রাসেলের সাথে বন্দি করে রাখে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই শেখ হাসিনা গৃহবন্দি অবস্থায় তাঁর প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় জন্মলাভ করে। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট তিনি এবং তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় খুনিদের হাত থেকে রেহাই পান।
শেখ হাসিনা
নির্বাসিত জীবনে শেখ হাসিনা জাতির পিতার হত্যার বিচার, সামরিক শাসনের অবসান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ছুটে বেড়িয়েছেন দেশে দেশে আর নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে। ১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁকে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। দেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেবার প্রত্যয় নিয়ে সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ও লড়াকু ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৯১-এর নির্বাচনে তাঁর দল ভোট বেশি পেয়েও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে ব্যর্থ হয়। এ সময় তিনি দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে তাঁর দল জয়ী হয় এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর সরকারের আমলেই ভারতের সাথে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। সম্পাদিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। বাংলাদেশ অর্জন করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। ২০০১ সালের নির্বাচনে সূক্ষ্ম ভোট কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা হয়। হাওয়া ভবনের নীলনকশায় ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো হয় পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা। গুরুতরভাবে আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। তবে এই হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান সহ নিহত হয় ২৪ জন নেতা-কর্মী। চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান অসংখ্য নেতা-কর্মী। বিএনপি-জামাতের প্রত্যক্ষ মদদে ধর্মীয় জঙ্গি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে পরিণত করা হয মৃত্যু উপত্যকায়। এই অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান অকুতোভয় শেখ হাসিনা, রাজপথে নেমে আসে বাংলার আপামর মানুষ। ২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবর বিএনপি- জামাত জোট সরকারের অপশাসনের অবসান ঘটান। তারপর তথাকথিত কেয়ারটেকার সরকার ও সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার দু’বছর দেশ শাসন করে। এই সময় তিনি বন্দি হন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট বিপুলভাবে জয়লাভ করে। এককভাবে আওয়ামী লীগই লাভ করে তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসন। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। গঠিত হয় মহাজোট সরকার। শুরু হয় রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের কাজ। তার শাসনামলে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, আশ্রয়ন প্রকল্প, একটি বাড়ি, একটি খামার, ঘরে ফেরা কার্যক্রম, দুঃস্থ ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীয় কার্যক্রম প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ় অঙ্গীকারের ফলেই একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধেী গনহত্যার নায়কদের বিচার হচ্ছে এবং বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে সাড়ে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল জুড়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে।
একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইতোমধ্যে শান্তি, গণতন্ত্র, দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়নের জন্য বহু পদক ও সম্মামনা পেয়েছেন তিনি। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য : সম্মানসূচক ডক্টর অব ল, ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় ( জাপান), দেশিকোত্তম, বিশ্বভারতী (ভারত), সম্মানসূচক ডক্টর অব ল, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় (অস্ট্রেলিয়া), সম্মানসূচক ডক্টর অব হিউমেন লেটার্স, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাজ্য), ইউনেস্কোর ফেলিক্স হোফে বোইনি শান্তি পুরস্কার, পার্ল এস বাক পদক, ম্যাকন উইমেনস কলেজ, (যুক্তরাষ্ট্র), মাদার তেরেসা পদক, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার, ১২ জানুয়ারি, ২০১০, সেরক পদক, জাতিসংঘ খাদ্য সংস্থা (এফএও), মহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কার, মহাত্ম গান্ধী ফাউন্ডেশন, শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনায় এমডিজি পুরস্কার, জাতিসংঘ, ২০১০ সাল স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী অর্জনের জন্য সাউথ-সাউথ পুরস্কার, ২০১১ সাল। তিনি গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালনের জন্য দেশরত্ন উপাধিতে ভূষিত হন।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা তথা সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক লেখালেখি করে থাকেন। এ পর্যন্ত তাঁর অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কিছু উপায়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, ডেভেলপমেন্ট অব দ্য সেকেন্ড ঢাকা, পিপল অ্যান্ড ডেমোক্রেসি, বিপন্ন গণতন্ত্র, লাঞ্ছিত মানবতা, সহেনা মানবতার অবমাননা, লিভিং ইন টিয়ার্স, আমার স্বপ্ন আমার সংগ্রাম (সম্পাদনা) বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে শেখ মুজিবুর রহমান (সম্পাদনা) এবং বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সম্পাদনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশে বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছেন।
মোল্লা জালালউদ্দিন আহমদ
মোল্লা জালালউদ্দিন আহমদ
মোল্লা জালালউদ্দিন আহমদ রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী। তিনি ১৯২৬ সালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বড়ফা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ এবং ১৯৫৩ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিনি ছিলেন খুব স্নেহধন্য। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭৩- এর উপনির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে বন, মৎস্য ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করেন। তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর অন্যতম কৌসুলী ছিলেন। ১৯৭৯ সালে মোল্লা জালাল উদ্দীন পরলোক গমন করেন।
শেখ ফজলুল হক মণি
শেখ ফজলুল হক মণি
শেখ ফজলুল হক মণি গোপালগঞ্জ জেলার কৃতী সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তিনি ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ নুরুল হক, মায়ের নাম আছিয়া বেগম। ঢাকার নবকুমার স্কুল থেকে ১৯৫৬-তে এসএসসি, ১৯৫৮-তে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে এইসএসসি, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯৬০-এ বিএ এবং ১৯৬২-তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ও আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬২-তে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়ে গ্রেফতার হন এবং ছয়মাস বিনা বিচারে কারাভোগ করেন।
১৯৬১ সালে শেখ মনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৪’র এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের সমাবর্তন উৎসবে চ্যান্সেলর ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোমেন খানের কাছ থেকে সনদপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন এবং সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে সমাবর্তন বর্জন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এজন্য তাঁর ডিগ্রি কেড়ে নেয়া হয়। ১৯৬৫-তে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার হয়ে দেড় বছর কারাভোগ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত।
৬ দফা আন্দেলনে (১৯৬৬) বিশেষ ভূমিকা পালন করায় তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয় এবং ১৯৬৬-র জুলাই মাসে কারারুদ্ধ হন। এ পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাজানো অভিযোগে আটটি মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯-এর জানুয়ারি-মার্চের গণআন্দোলনের চাপে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৭০’-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারের অন্যতম প্রণেতা। ১৯৭১’-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা ‘মুজিব বাহিনী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা, কুমিল্লা নোয়াখালী, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্বয়ে গঠিত পূর্বাঞ্চল সেক্টরে মুজিব বাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) পর ১৯৭২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’ দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৩-এর ২৩ আগস্ট তাঁর প্রচেষ্টায় সাপ্তাহিক ‘সিনেমা’ প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৪-এর ৭ জুন তাঁর সম্পাদনায় দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫-এ বাকশাল প্রতিষ্ঠিত করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজনে অবদান রাখেন। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি সাহিত্য চর্চাও করতেন। গীতারায় নামে তাঁর একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সামরিক বাহিনীর স্বাধীনতা-বিরোধী একটি চক্রের হাতে ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট ঢাকায় নিহত।
মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী
মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী শুধু গোপালগঞ্জেই নয়, বাংলাদেশসহ দেশের বাইরেও তিনি একজন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে সুপরিচিত। অনেকের কাছে তিনি ‘সদরসাব হুজুর’ নামেও সমাদৃত। সদরসাব হুজুর ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলাধীন গওহরডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত শহিদ সৈয়দ আহমেদ। সৈয়দ আহমেদ ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন।
ঐতিহ্যবাহী সংগ্রামী পরিবারের সন্তান ইসলামকে সম্যক ও প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করার মানসে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং তখনই তিনি হযরত আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর দরবারে যান এবং তাঁরই উপদেশে প্রথমে মাজাহির-আল উলুম- সাহারানপুর ও দেওবন্দের দার-উলুম-এ শিক্ষা গ্রহণ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৩৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ৫ বছর এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ঢাকার আশরাফ-আল-উলুম মাদ্রাসায় হাদিস শাস্ত্রে অধ্যপনা করেন। মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চার জন্য বহু ইসলামি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন। সমাজের সার্বিক সংস্কারের লক্ষে তিনি গঠন করেন খাদিম আল-ইসলাম নামে একটি সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠা করেন বহু ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ। ঢাকার লালবাগসহ খাদিম আল ইসলাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ইসলামি গ্রন্থ প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রকাশনী সংস্থা খাদিম আল ইসলাম জামাত।
তাঁর রচিত ও অনূদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো—তাফসীরুল কুরআন, তাবলীগে দ্বীন, বেহেশতী জেওর, বেদাআত ও ইজতেহাদ, ব্রিটিশ শাসনের বি…ফল, চরিত্রগঠন, জেহাদের ফজিলত, বিশ্ব কল্যাণ, বাংলা ফরায়েজ, মানুষের পরিচয় ও তাছাউফ তত্ত্ব। ১৯৬৮ সালে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী মৃত্যুবরণ করেন।
শেখ কামাল
শেখ কামাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়াপ্রেমী এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সৈনিক ছিলেন। শেখ কামাল গোপালগঞ্জ তথা টুঙ্গীপাড়ার কৃতীসন্তান। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় তিনি ছায়ানটে ভর্তি হয়ে সেতার বাদনে ডিগ্রি নেন এবং সংগীত শিল্পীদের নিয়ে গঠন করে স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন ক্রীড়ামোদী ও ক্রীড়াবিদ।
শেখ কামাল
১৯৭১ সালের ২৫মে মার্চের পরে মা-বোন ও ভাইদের সাথে বন্দি হন। কিন্তু পাকসেনাদের ফাঁকি দিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ছিলেন মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর এডিসি।
আবাহনী ক্রীড়াচক্রের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা থিয়েটারেরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সকলের কাছে প্রিয় মানুষ। বঙ্গবন্ধুর ছেলে হিসেবে তাঁর কোনো গর্ব বা অহমিকা ছিল না। শেখ কামাল পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট কালরাত্তিরে মা-বাবা-ভাই-চাচা, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং নিজের স্ত্রীর সাথে একদল কুলাঙ্গারের হাতে নিহত হন। তাঁকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল করিম সেলিম গোপালগঞ্জ জেলার কৃতী সন্তান। তিনি ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্র এবং রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি পরিচিত নাম। তিনি ১৯৬৩ সালে এসএসসি, ১৯৬৫ সালে এইচএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক, আওয়ামী যুব লীগের প্রচার সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি গোপালগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৮০, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি জাতীয় সংসদের বহু কমিটির সভাপতি ও সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম
শেখ ফজলুল করিম সেলিম একজন খ্যাতিমান সম্পাদক। তাঁর সংসদের প্রদত্ত বক্তৃতার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলার বাণী-র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
শেখ শহীদুল ইসলাম
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও রাজনীতিক শেখ শহীদুল ইসলাম ১৯৪৩ সালের ২রা জানুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ মো. মুসা। তিনি রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি ১৯৭৪ সালে ‘ল’ পাস করেন। তার ছাত্র জীবন নানা ঘটনায় উজ্জ্বল। তিনি ১৯৬২’র শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা
রাখেন। ‘৬৬-এর ৬ দফা ও ৬৯’-এর ১১ দফা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৭২ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী এবং ১৯৮৮ সালে পূর্তমন্ত্রী ও পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি সাপ্তাহিক পদক্ষেপ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং নিজেই সম্পাদনা করেন। প্রখর জ্ঞানের অধিকারী শেখ শহীদুল ইসলাম অমায়িক ও সদালাপী হিসেবে সর্বজন প্রিয়। বর্তমানে তিনি জাতীয় পার্টি (জেপি)র মহাসচিব।
শেখ শহীদুল ইসলাম
কাজী ফিরোজ রশিদ
কাজী ফিরোজ রশিদ
কাজী ফিরোজ রশিদ ১৯৪৮ সালে কোটালীপাড়ার কুরপালা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী- মোজাফফর হোসন। কাজী ফিরোজ রশিদ ছাত্রাবস্থায়ই রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে তিনি কারা বরণ করেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১ বছর কারা বরণ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের ভি.পি নির্বাচিত হন। কাজী ফিরোজ রশিদ আইনের ছাত্র থাকাকালীন সময় জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদে ১৯৭০- ৭৩ সাল পর্যন্ত জিএস এবং ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। কাজী ফিরোজ রশিদ একসময়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৮৯ সালে ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
মুহাম্মদ ফারুক খান
মুহাম্মদ ফারুক খান
মুহাম্মদ ফারুক খান ১৯৫১ সালে মুকসুদপুর উপজেলায় বেজড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত খান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন। অতপর পাকিস্তান সামরিক একাডেমী থেকে গ্র্যাজুয়েশন এবং ১৯৯৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিফেন্স স্টাডিজে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ২৬ বছর সেনা বাহিনীতে চাকরি করার পর ১৯৯৫ সালে লে. কর্ণেল পদে দায়িত্বরত অবস্থায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি মহাজোট সরকারের পর্যটন ও বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
