জ. বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, গায়ক ও কবিয়ালের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
মধুসূদন সরস্বতী
সংস্কৃত পণ্ডিত ও দার্শনিক। কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা প্রমোদ পুরন্দর আচার্য ছিলেন একজন সংস্কৃত পণ্ডিত। মধুসূদনের প্রকৃত নাম ছিল কমল জয়নয়ন। প্রথম জীবনে সংসার ত্যাগ করে তিনি গুরু বিশ্বেশ্বর সরস্বতীর কাছে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং তখন তাঁর নাম হয় মধুসূদন। শৈশবে তিনি পিতার কাছে শিক্ষা লাভ করেন। তারপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি নবদ্বীপ যান। সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক হরিরাম তর্কবাগীশ ও মথুরানাথ তর্কবাগীশ ছিলেন তাঁর শিক্ষক; গদাধর চক্রবর্তী সতীর্থ এবং পরবর্তীকালে পুরুষোত্তম সরস্বতী তাঁর ছাত্র। মধুসূদন সরস্বতী ১৫২৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মৃতুবরণ করেন। মোগল সম্রাট তাঁকে সম্মাননা প্রদান করেন।
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর
মানবকল্যাণে যুগে যুগে যেসকল পুরুষোত্তম ও মহামানব ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন তাদের মধ্যে হরিচাঁদ ঠাকুর অন্যতম। ঠাকুরের আদিপুরুষ রামদাস ছিলেন রাঢ় দেশবাসী। তাঁর পূর্বপুরুষগণ বংশ পরম্পরায় বৃন্দাবন, নবদ্বীপ বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে পর্যটন করতো।
কালক্রমে তাঁরা নড়াইল জেলার লক্ষ্মীপাশায় নবগঙ্গা নদীর তীরে জয়পুরে বসতি স্থাপন করেন। পরে সেখান থেকে চলে আসেন কাশিয়ানী উপজেলায় শাফলীডাঙা গ্রামে। এই শাফলীডাঙায় ১২১৮ বঙ্গাব্দে হরিচাঁদ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা যশোমন্ত ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। মা অন্নপূর্ণাদেবীও ধর্মপরায়ণা ছিলেন। ঠাকুর ব্রজ, নান্টু, বিশ্বনাথ ও অন্যান্য খেলার সাথীদের নিয়ে মাঠে ধেনুচরাতেন। খেলার সাথীরা উপলব্ধি করতেন ঠাকুর ঠিক যেন বৃন্দাবনে ব্রজের রাখাল। অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে ঐশ্বরিক শক্তি বিকশিত হতে থাকে।
ঠাকুরের অলৌকিক শক্তি দেখে সকলে বিস্মিত হতেন। কৈশোরে পা দিয়েই তিনি বাইরের দুনিয়ায় দৃষ্টিপাত করলেন। দেখতে পান নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অধিকার হারা মানুষ অন্ধকূপে তলিয়ে যাচ্ছে। ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাধারা ও অন্ধধর্মের জালে জড়িয়ে পড়ছে। কুসংস্কারে তারা নিমজ্জিত হয়ে আছে। ঠাকুর বুঝতে পারলেন এই দিশেহারা জাতিকে অন্ধকার মায়াজাল থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এগিয়ে এলেন তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে। ধর্মীয় আন্দোলনের ভিত্তিতে আধ্যাত্মিক চেতনায় জাগিয়ে না তুললে এ জাতি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। নিজেদের মধ্যে যে অমিয় শক্তি লুকানো রয়েছে এই উপলব্ধি জাগিয়ে দিলে এরা বুঝতে পারবে শৌর্যে, বীর্যে, শক্তিতে, সামর্থে আমরা মোটেই পিছিয়ে নেই। ঘুমন্ত জাতিকে মাতিয়ে তুলতে তাই মতুয়াবাদের সৃষ্টি। মতুয়াবাদের মতাদর্শে নিহিত আছে ঘুম ভাঙানোর বৈশিষ্ট্য। এ আদর্শে পশ্চাৎপদের শিক্ষা নেই। অগ্রগতির ভাবাদর্শে পতিত জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার এটি একটি কালজয়ী সনদ। অন্ধ ধর্মবিশ্বাস থেকে মুক্ত রাখতে এই আদর্শ খুবই সহায়ক। শ্রাদ্ধ তর্পণে ব্রাহ্মণ্যবাদের রহিতকরণের বিধান এতে বিদ্যমান। মানব দরদি সমাজ গঠন এই আদর্শের একটি অন্যতম দিক। তন্ত্রমন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা এই নীতিমালায় অনুপস্থিত। এতে বাস্তবতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মানুষকে ভালোবাসাই জীবের শ্রেষ্ঠ উপাসনা বলে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। তাই তিনি বলতেন-
‘জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা
এই ভিন্ন অন্যসব ক্রিয়া কর্ম ভ্রস্টা।’
এই মতাদর্শে নারী-পুরুষের সমাধিকার রক্ষিত হয়েছে। সন্ন্যাস গ্রহণ না করে গার্হস্থ্য জীবনে সুখ, সৌন্দর্য ও শান্তি বজায় রাখাই এর মহান আদর্শ। গার্হস্থ্য ধর্ম বর্জন করে অন্য-আদর্শ বাঞ্ছনীয় নয়। তাই ঠাকুর বলেছেন-
‘করিবে সংসার ধর্ম লয়ে নিজ নারী
(হবে) গৃহে থেকে সন্ন্যাসী বান প্রস্থ্য ব্রহ্মচারী।’
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ এই মতুয়া আদর্শ অনুসরণ করতে পারে। এতে ধার্মীকতার ভান বা কোনো বাগাড়ম্বর স্থান পায়নি। কেবলমাত্র কয়েকটি উপদেশ পালন করার বিধান রাখা হয়েছে, যাকে দ্বাদশ আজ্ঞা নামে অভিহিত করা হয়। একমাত্র হরিচাঁদ ঠাকুর ভিন্ন অন্যকোনো পুরুষোত্তম বা মহামানব নমশূদ্র কুলে জন্মগ্রহণ করেননি।
তিনিই একমাত্র ও অদ্বিতীয় যিনি ‘মতুয়া’ সমাজের পতাকাতলে সবাইকে একীভূত করতে সক্ষম হয়েছেন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের পথ দেখিয়েছেন। মতুয়া মহাসংঘের সংঘাধিপতি হরিচাঁদ ঠাকুরের পঞ্চম পুরুষ শ্রী হিমাংশুপতি ঠাকুর জানান ‘তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শোষিত মানুষ মূলত দুটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে। প্রথমত, হরিচাঁদ ঠাকুরের ধর্ম আন্দোলন; দ্বিতীয়ত, তারই সুযোগ্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলন। গুরুচাঁদ ঠাকুর এ জাতিকে জাগিয়ে তুলতে যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন তা অবিস্মরণীয়।’ হরিচাঁদ ঠাকুর ১২৮৪ সনের ২৩ শে ফাল্গুন বুধবার পরলোক গমন করেন।
এ জেড খান
মোগল আমলের সময় উপমহাদেশের পরগণাগুলো ভেঙে জেলা ও মহকুমায় বিভাজন করা হয়। ব্রিটিশ আমলে অনেকেই গোপালগঞ্জ মহকুমার এসডিওর দায়িত্ব পালন করেছেন। এঁদের মধ্যে এ জেড খান ছিলেন অন্যতম। এ জেড খানের প্রকৃত নাম খান বাহাদুর আকরামুজ্জামান খান। তাঁর স্থায়ী নিবাস ছিল মানিকগঞ্জ জেলাধীন হরিরামপুর উপজেলার দাদরোখী গ্রামে।
মহকুমা প্রশাসক হিসেবে সেকালে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। তাঁর নামে তখন গোপালগঞ্জে ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘এ জেড খান শিল্ড’ চালু ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলে পড়ার সময় এই শিল্ডের শেষ খেলায় অংশ নেন। তখন তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল বঙ্গবন্ধুর পিতার দল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এই দক্ষ ও জনপ্রিয় মহকুমা প্রশাসকের কথা উল্লেখ করেছেন। মহকুমা প্রশাসক এ জেড খানের তিন পুত্রের মধ্যে আমির-উজ-জামান ও আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু। আমির উজ-জামান খান বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টিভির মহাপরিচালক ছিলেন। তাঁর অপর পুত্র প্রখ্যাত কথাশিল্পী আশরাফ-উজ জামান খান। তিনিও বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক ছিলেন। এ জেড খান গোপালগঞ্জ শহরে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। উল্লেখ্য, তাঁর ভাইপোর ছেলে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, ফোকলোরবিদ এবং শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
সেন্ট মথুরানাথ বোস
সেকালে গোপালগঞ্জ শহর এবং শহরের আশপাশ এলাকায় শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সেন্ট মথুরানাথ বোস। গোপালগঞ্জ শহরে সরকারি বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে তাঁর স্মৃতিসৌধ বিদ্যমান। নতুন প্রজন্মের কাছে এই সাধু পুরুষের জীবন ও কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মথুরানাথ ইনস্টিটিউশন (মিশন স্কুল) থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গোপালগঞ্জ শহরের এসএম মডেল স্কুল। ১৯৪৭ সালে মথুরানাথ ইনস্টিটিউটে কায়েদ-ই-আজম কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন স্কুলটি স্থানান্তর করা হয় বর্তমানের এসএম মডেল স্কুলের জায়গায়। ওই জায়গাটি ছিল জনৈক সীতানাথ বাবুর। সীতানাথ বাবু জায়গা দেওয়ার কারণে তাঁর এবং মথুরানাথের নাম সংযুক্ত করে স্কুলটির নতুন নামকরণ করা হয় সীতানাথ মথুরানাথ মডেল হাই স্কুল, সংক্ষেপে এস এম মডেল হাই স্কুল।
সেন্ট মথুরানাথ বোস
সেন্ট মথুরানাথ বোস ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে যশোর জেলার কোটচাঁদপুরে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সদানন্দ বসু। শৈশবে নিজগৃহে, কৈশোরে যশোর জেলা স্কুল, কলকাতার স্কটল্যান্ড মিশনারীদের প্রতিষ্ঠিত ডাক কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে বিএ পাসের পর আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পরে ওকালতি বাদ দিয়ে ১৮৬৫ সালে ভবানীপুর মিশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। নয় বছর শিক্ষকতা করার পর রাজগঞ্জের হাটে (গোপালগঞ্জে) মিশনারির কাজে চলে আসেন। এরমধ্যেই স্বধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।
গোপালগঞ্জ শহরে এসে তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গোপালগঞ্জ আদালতের প্রথম বিচারক নিযুক্ত হন। পাশাপাশি শিক্ষা ও মিশনারির কাজে অগ্রদূতের ভূমিকা রাখেন। মথুরানাথ ছিলেন উদার ব্যক্তি। সারাজীবন তিনি গোপালগঞ্জে থেকেছেন। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পরলোক গমণ করেন।
ফটিক গোঁসাই
গোপালগঞ্জের মাইচকান্দি গ্রামে ১৮৪২ সালে ফটিক গোঁসাই জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সে তিনি সংসার ত্যাগী হন। গোপালগঞ্জ শহরের কাছে মালিবাতা গ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি আশ্রম আছে। এই জনপদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ফটিক গোঁসাইয়ের গান শোনা যায়। তিনি বাউল সাধক, লোক কবি ও সাধক হিসেবে সমধিক পরিচিত। ১৯৫৭ সালে ফটিক গোঁসাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কবিয়াল হরিবর সরকার
চারণ কবি হরিবর সরকার ১৮৬৯ সালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চারণ মহাকবি তারক সরকারের মতো হরিবর সরকারও বেশি লেখাপড়া জানতেন না। এই দুইজন প্রতিভাবান চারণ কবি হরিচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের আশীর্বাদে কবি খ্যাতির শীর্ষে পৌছান। এতে তাঁরা দৈব্য শক্তির বলে বিভিন্ন ধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থ সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্য লাভ করেন। কবি হরিবর শ্রীশ্রী হরি লীলামৃত রচনা করার সময় কবি রসরাজ তারক সরকারকে সার্বিকভাবে সহায়তা করেছিলেন। হরিবর সরকার বিভিন্ন জায়গায় কবি গান গাইতে গিয়ে নানা প্রকার উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন যেমন-কবিরত্ন, কবিরঞ্জন, কবি চুড়ামণি ইত্যাদি। তিনি মহাসংকীর্ত্তন নামে একখানা পুস্তক সম্পাদনা করেন। তাঁর গানের রূপ রস ছিল উচ্চস্তরের। যেমন :
ব্রহ্ম, ইন্দ্র, পশুপতি
ভেবে পায় না দিবারাতি
পদারবিন্দ যার
জীবনের ভাগ্য বসে সেজন এসে
হরিনাম করেছে প্রচার।
এলো গোলক ত্যাজে
ভবপারের কর্ণধার
তরবি যদি ভব নদী
ওড়াকান্দি চল এবার।
বাংলায় কবিয়ালদের মধ্যে হরিবর সরকার অন্যতম। খুলনা জেলার চুনখোলা গ্রামে বাংলার আরেক কালজয়ী কবিয়াল রাজেন্দ্রনাথ সরকার। তিনি হরিবর সরকারের ভাগ্নে।
কবিয়াল মনোহর সরকার
আনুমানিক ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হরিবর সরকার ও মনোহর সরকার একই বাড়িতে একই বংশোদ্ভূত ‘মনোহর সরকার ও জটাধর সরকার এঁরা দুই ভাই। পিতা নাগর চাঁদ সরকার। মনোহর সরকারের গুরু স্বরূপ গোঁসাই। গণেশ পাগলকে সরকার মহাশয় মামা বলে সম্বোধন করতেন। চারণ কবি সম্রাট বিজয়কৃষ্ণ অধিকারি মনোহর সরকারের বাড়িতে কাজ করতেন। কবি রসরাজ শ্রীমৎ তারকচন্দ্র সরকার ও মনোহর সরকার ছিলেন তৎকালীন কবিগানের খুব জনপ্রিয় জুটি।’ দক্ষিণ বাংলায় বিখ্যাত কবিগান রচয়িতা ও সু-গায়ক হিসেবে তাঁর খ্যাতি আজও লোকের মুখে শোনা যায়। এমনও কিংবদন্তি আছে, ‘মনোহর সরকারের গান শুনে জলের কুমির ডাঙায় উঠে যেত। অনেক কবিয়াল তাঁর কাছে কবিগান শিক্ষা করে অশেষ সুনাম কুড়িয়েছেন। দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসএম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মালিবাতার ফটিক গোঁসাই, কাটরবাড়ির ফেলারাম পাগল, দুর্গাপুরের হরিবর সরকার ও মনোহর সরকার আমাদের গর্ব। আমি মনে করি এই মাটি ধন্য হয়েছে। এলাকার আরও ঐতিহ্যের মধ্যে এই দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌষ সংক্রান্তির মেলা হয়। এই লোকউৎসবকে আমরা বাংলার কৃষ্টি হিসেবে লালন করে আসছি
কাজী দীন মোহাম্মদ
গোপালগঞ্জ জেলার একজন নামজাদা সাহিত্যিক কাজী দীন মোহাম্মদ। তিনি ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ শহরের সেকালের সীতানাথ একাডেমী থেকে প্রবেশিকা এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএ ও বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। বিটি পাশের পর তিনি যশোর জেলা স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন সময়ে বঙ্গীয় সরকার ও পূর্ববঙ্গ সরকারের অধীনে চাকরি করেন।
১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। ব্যঙ্গ সাহিত্য রচনায় কৃতিত্ব প্রদর্শনে তিনি অসাধারণ। তাঁর গোপালগঞ্জের আত্মকথা একখানি উল্লেখযোগ্য বঙ্গশ্রয়ী সাহিত্যকীর্তি। কৌতুক ও পরিহাসের সুরে সামাজিক অনাচার ও দুর্নীতির চিত্রাঙ্কনে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। মননশীল প্রবন্ধ ও শিশুতোষ গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবেও পরিচিত কেনাই ডাকু (১৯৪১) ও ভিজা বিড়াল (১৩৬৮) তাঁর শিশুপাঠ গ্রন্থ
মহামহোপাধ্যায় রামনাথ সিদ্ধান্ত পঞ্চানন
১২২৬ বঙ্গাব্দে কোটালীপাড়া উপজেলার পশ্চিমপাড় গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্যই নয় একজন উচ্চমানের সিদ্ধসাধকরূপে এবং একজন মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হিসেবে তিনি ভারত বিখ্যাত হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য, সিদ্ধান্ত পঞ্চাননের উপাধি অনুসারে পশ্চিমপাড় মেলার নাম হয় সিদ্ধান্ত মেলা। এখানে জিভের মধ্যে বান ফোড়া, পিঠে বড়শী ফোড়া ও চড়কে ঘোরানো হতো যা এখনও প্রতি বছর মেলার সময় হয়ে থাকে। উনশিয়া গ্রামে ‘দুর্গাধন ন্যায় ভূষণ’ মহাশয়ের প্রচেষ্টায় তাঁর বহির্বাটিতে আর্য বিদ্যালয় নামে যে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রবীণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মহামহোপাধ্যায় রামনাথ সিদ্ধান্ত পঞ্চানন্দ মহাশয়।
ড. শ্রীযুক্ত কালিপদ তর্কাচার্য
ড. কালিপদ তর্কাচার্য ১৮১০ শতাব্দে কোটালীপাড়া উপজেলার উনশিয়া জন্মগ্রহণ করেন। মহামহোপাধ্যায় ড. কালিপদ তর্কতীর্থ প্রায় অর্ধ শতাব্দীব্যাপী তাঁর বিদ্যা, বুদ্ধি, পাণ্ডিত্য ও অধ্যাপনার জন্য সমাদৃত হয়ে এসেছেন। ন্যায় ও অন্যান্য শাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে ঋষিকল্প পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় শিবচন্দ্র সর্বভৌম তাঁকে ‘তর্কাচার্য’কাশীর ভারত মহামণ্ডল বিদ্যানিধি শৃঙ্গারি মঠের শঙ্করাচার্য, তর্কলঙ্কার এবং হাওড়া সংস্কৃত সাহিত্য পরিষদ ‘মহাকবি’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
তাঁকে বলা হতো নব্য বাংলার কালিদাস। তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য ভারত সরকার তাঁকে মহামহোপাধ্যায় উপাধিতে ভূষিত করে এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আজীবন বার্ষিক ৩ হাজার টাকা সম্মানী ধার্য করা হয়। ১৩৭৮ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় হতে তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট খেতাবে ভূষিত করা হয়। সংস্কৃত কাব্য নাটক ও ন্যায় শাস্ত্র বিষয়ক মোট ১৬ খানি এবং নিজ সম্পাদিত ৭ খানি গ্রন্থ তাঁর শিল্প সাধনার ফল। কোটালীপাড়ার এ কৃতী সন্তান ১৯৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
সতু সেন
১৯০২ সালের ৪ জুন গোয়ালংক গ্রামে বাংলা নাট্যমঞ্চের জ্যেষ্ঠতম প্রয়োগবিদ সতু সেন জন্মগ্রহণ করেন। কাশি হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ২য় বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য নিউইয়র্কে যান। নিউইয়র্ক যাত্রার পথে কায়রোতে যাত্রা বিরতি করেন। সেখানে মস্কো প্রত্যাগত বাগেশ্বরী অধ্যাপক হাসান শহিদ সুয়ার্দীর সাথে সাক্ষাতের ফলে তাঁর জীবনের গতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়। তিনি সতু সেনের নাটক ও নাট্যমঞ্চের অপরিমিত উৎসাহ দেখে মঞ্চশিপ নিয়ে ফলিত শিক্ষা গ্রহণের অনুরোধ করেন এবং আমেরিকার ল্যাবরেটরি থিয়েটারের বিশ্ববিখ্যাত অধ্যক্ষ রিচার্ড বাশ্লাভস্কির নিকট একটি পত্র লিখে সতু সেনের নিকট দেন। সতু সেন নিউইয়র্ক থেকে পিটার্সবার্গে, ওখান হতে কার্নেগি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে নাটক ও মঞ্চ বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি নিউইয়র্ক এসে বিনা বেতনে ল্যাবরেটরি থিয়েটারে অধ্যয়নের সুযোগ পান।
তাঁর দক্ষতা বলে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই থিয়েটার কর্তৃপক্ষের আস্থাভাজন হন। মাত্র ১ বছর শিক্ষার পর মঞ্চ প্রয়োগবিদ জার্মান বেন সেন্ডেসের অধীনে সহকারী মঞ্চ নির্দেশক নিযুক্ত হন। ১৯২৮ সালের গোড়ার দিকে ওই থিয়েটারের মঞ্চ ও আলোকসম্পাত বিভাগের প্রধান এবং সহকারী পরিচালক মনোনীত হন। তাঁর নির্দেশনায় শেক্সপিয়ার, মার্লো, মলিয়ের, শেখভ, তলস্তয়, ইয়মেন প্রমুখ রচয়িতার নাটক পরিবেশিত হয়। ১৯২৯ সালে হলিউডে রিচার্ড হলি শায়ভস্কি মিকাডো চলচ্চিত্রটির পরিচালনা করেন। সতু সেন তার সহকারী পরিচালক ছিলেন। এই মহাপ্রাণ ব্যক্তি ১৯৭১ সালের ৭ই আগস্ট পরলোক গমন করেন।
চিন্তাহরণ চক্রবর্ত্তী
উনশিয়া গ্রামে চিন্তাহরণ চক্রবর্ত্তীর জন্ম। কোটালীপাড়ার খ্যাতনামা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কোলকাতা Presidency College-এর অধ্যাপক হিসাবে অবসর নেন। তিনি জীবনে অধ্যাপনার সাথে জড়িত থাকার পরও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও এশিয়াটিক সোসাইটির একজন সদস্য ছিলেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পত্রিকাধাক্ষে ও এশিয়াটিক সোসাইটির সম্পাদক ছিলেন।
রাজেন্দ্র চন্দ্র সেন
১৮৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে গোয়ালংক গ্রামে রাজেন্দ্র চন্দ্র সেন জন্মগ্রহণ করেন। কলিকাতা সিটি কলেজ হতে অনার্স নিয়ে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি আইন পাস করে আলিপুর কোর্টে ওকালতি করেন। কয়েক বছর ওকালতির পরে ১৯২০ সালের মে মাসে Bengal Judicial Civil Service- এ মুন্সেফ পদে যোগদান করেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় বরিশালে বালিকা বিদ্যালয়টিকে মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন। ১৯৩৫ সালে সিলেটের হবীগঞ্জে থাকাকালে আসাম সরকার তাঁকে Special Officer করে নিয়ে যান। ওই সময়ে আসাম ঈড়হপরষ-এ তিনি সিলেট ঞবহধহবু ইরষষ এর নিয়ম কানুন তৈরি করার জন্য নিযুক্ত হন। এই আইন প্রণয়নে আসাম সরকার তাকে M.IC হিসেবে মনোনীত করেন। ১৯৩৬ সালে আসাম সরকার তাঁকে ‘রায় সাহেব’ খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি একমাত্র মুন্সেফ যিনি এই খেতাব পান। আসাম হতে নারায়ণগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের অনন্য স্বাক্ষর বহন করে। বালিয়াভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনি ছিলেন একজন কর্ণধার। ১৯৪৯ সালে ২৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
হেমায়েত উদ্দীন
হেমায়েত উদ্দীনের জন্ম ১৯৪৩ সালে কোটালীপাড়া উপজেলার টুকুরিয়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই দেশ সেবায় প্রবল ইচ্ছা ছিল বলে ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ভর্তি হন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন এবং প্রথমদিকে সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল সফিউল্লাহর নেতৃত্বে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। হেমায়েত উদ্দীন নিজ নামে কোটালীপাড়ায় এসে গড়ে তোলেন হেমায়েত বাহিনী। শপথ নেন দেশমুক্তির। কোটালীপাড়া, টুঙ্গীপাড়া, কালকিনি, শিবচর, গোসাইরহাট, ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ, গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, উজিরপুর, নাজিরপুর, মুলাদী, বাবুগঞ্জ, শিকারপুর, মোল্লারহাট, বাগেরহাটের অংশে ছিল হেমায়েত বাহিনীর যুদ্ধ তৎপরতা। ১৪ জুলাই ‘৭১ হেমায়েত উদ্দীন রামশীলে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে মুখে গুলি লেগে মারাত্মকভাবে আহত হন। ৩ ডিসেম্বর ‘৭১ কোটালীপাড়া পাক হানাদারমুক্ত হয়। সে কি বিজয় আনন্দ উল্লাস! স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সরকার তাঁকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করেন। সে থেকে তিনি সকলের নিকট বীর বিক্রম হেমায়েত উদ্দীন নামে পরিচিত হন। ১৯৭১ সালে ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর জলিল তাঁকে সুবেদার পদে পদোন্নতি দেন।
ধীরেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত
ধীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত কলকাতার একজন নামজাদা সাংবাদিক। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতুতে লিখতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ফ্রি প্রেস অব ইন্ডিয়া এবং ইউনাইটেড প্রেস অব ইন্ডিয়াতে কাজ করেন। ধীরেন্দ্র নাথ সেনগুপ্তের বাড়ি কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে লেখা কমরেড মুজাফফর আহমদের স্মৃতি কথায় উল্লেখিত তথ্যটুকু পাওয়া গেছে।
কেষ্ট ক্ষ্যাপা গণেশ পাগল
বাংলা ১২৫৫ সনের ১১ মাঘ শুক্রবার কোটালীপাড়া উপজেলার পোলশার গ্রামে গণেশ পাগল জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শিরমণী বৈরাগী এবং মাতা নারায়ণী দেবী। গণেশ পাগল একজন সাধক পুরুষ। তিনি কবিগান বড় ভালোবাসতেন। তাঁর আশীর্বাদে অল্প শিক্ষিত চারণ কবি সম্রাট বিজয় কৃষ্ণ অধিকারী এই উপমহাদেশে বিখ্যাত কবিয়াল হয়ে ওঠেন। দুর্গাপুরের আরেক প্রতিভাধর চারণ কবি মনোহর সরকারের কাছে ভক্তি ডোরে বদ্ধ হয়ে তিনি বাকি জীবন দুর্গাপুরে কাটিয়েছেন। সমগ্র গোপালগঞ্জে যেসব ঐতিহাসিক মেলা আজঅব্দি বয়ে আসছে তারমধ্যে গণেশ পাগলের লীলাভূমি কদম বাড়ির মেলা অন্যতম। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে এ মেলা বসে। কুম্ভের মেলা নামে এটি খ্যাত। অসংখ্য ভক্ত দেশ-বিদেশ থেকে এসে যোগদান করে এই কুম্ভের মেলায়। গণেশ পাগলের বহু অলৌকিক ঘটনা মানুষের মুখে মুখে আজও বয়ে চলেছে। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে দোল পূর্ণিমা তিথিতে এই দ্রষ্টা পুরুষ নিত্যধামে গমণ করেন।
চন্দ্ৰনাথ বসু
চন্দ্রনাথ বসু কাশিয়ানী উপজেলায় রামদিয়া গ্রামে ১৮৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। জনকল্যাণে বিশেষ করে শিক্ষা বিস্তারে তিনি যে অক্ষয় কীর্তি রেখে গেছেন তা অবিস্মরণীয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি। ১৯/২০ বছর বয়সে তাঁর মধ্যে বহুমুখী কর্মধারার পরিচয় ফুটে উঠতে থাকে। বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদা মিটাতে অঞ্চলে অঞ্চলে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে নিরাপদ পুষ্করিণী ও জলাশয়ের ব্যবস্থা করেন। রামদিয়া-তিলছড়া, শাফলীডাঙ্গা, কুমুরিয়া, নড়াইল, জ্যোৎকুরা, পুইশুর বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ১৫-১৬টি পুকুর খনন করেন। কৃষি কাজের সুবিধার্থে জল নিষ্কাশন করতে যথাযথ স্থানে অনেক খালও খনন করেছেন। এই জনপদটি ছিল শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর। তাই তাঁর সহযোগিতায় বহুস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ৭টি কলেজ ও প্রায় শতাধিক বিদ্যালয় তাঁরই নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। রামাদিয়া শ্রীকৃষ্ণ কলেজ, পশ্চিমবঙ্গের বগুলায় শ্রীকৃষ্ণ কলেজ তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য। রামাদিয়া বাজারেরও তিনি প্রতিষ্ঠাতা। ফরিদপুরের গান্ধীজী বলে জনগণ তাঁকে জানতেন। সমাজকর্মী এই মনীষী ১৯৭৯ সালের ২রা জুন কলকাতায় দেহ ত্যাগ করেন।
অবিনাশ ব্রহ্মচারী
অবিনাশ ব্রহ্মচারীর জন্ম ১৯৩৪ সালে। তিনি কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়ায় আশ্ৰম তৈরি করে ধর্ম চর্চা করছেন। সাহিত্যেও তিনি বিশেষ পারদর্শী। প্রভাতী নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। অনুবাদেও তিনি সিদ্ধ হস্ত। তাঁর অনুবাদ ইউরোপে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। দক্ষ অভিনেতা ও সুকণ্ঠ গায়ক হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, কাব্য পরিচয়, বাতায়ন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামমোহন চরিত উল্লেখযোগ্য।
লাঠিয়াল অক্ষয় চন্দ্ৰ সেন
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে অক্ষয় কুমার সেন কাশিয়ানীতে জন্মগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট লাঠিয়াল ও বাঘ শিকারি হিসেবে তিনি পরিচিত। তিনি ছিলেন দুর্বার সাহসী লাঠিয়াল | অনেক কাজিয়ায় চুক্তিভিত্তিক লাঠিয়ালগিরি করেছেন। তিনি দেশীয় অস্ত্র দ্বারা বাঘ শিকার করতেন। মানুষ খেকো বহু বাঘ শিকার করে অক্ষয় সেন বহু নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন। তাঁর বীরত্ব ও সাহস দেখে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে একটি বন্ধুক উপহার দেন। আজও এলাকায় তিনি অক্ষয় শিকারী বলে খ্যাত।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার
প্রখ্যাত বাঙালি ঐতিহাসিক ও শিক্ষাবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের জন্ম ১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর মুকসুদপুর উপজেলার খান্দারপাড়া গ্রামে। ১৯০৯ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯১১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অধীনে ইতিহাসের ওপর গবেষণা শুরু করেন। ১৯২২ সালে রমেশ চন্দ্ৰ ‘অন্ধ্র-কুষাণ কাল ‘ নামে অভিসন্দর্ভের জন্য প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবনের শুরু ১৯১৩ সালে ঢাকা টিচার ট্রেনিং কলেজে। ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক নিযুক্ত হন। ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি ইতিহাস বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনায় ব্রত হন। ১৯২৪ সালে Early History of Bengal নামে তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৭২ সালে প্রকাশ করেন Ancient India নামে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি ফারসি ও ডাচ ভাষা শেখেন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা করার পর তিনি প্রকাশ করেন ভিয়েত নাম অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর গবেষণামূলক গ্রন্থ চম্পা, যা ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার
১৯২৮ সালে তিনি লন্ডনের British Museum, লেইডেনের Kern Institute, প্যারিসের Biblio the que national-এ পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি বেলজিয়াম, ইতালি জার্মানি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত এলাকা ভ্রমণ করে ৫ খণ্ডে প্রামাণিক গ্রন্থ রচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা কালে ৩ খণ্ডে প্রাচীন বাংলার প্রায় পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করে তিনি বিশ্বখ্যাত হন। ১৯৩৬ সালে ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ভারতীয় বিদ্যাভবন সিরিজের ১২ খণ্ডে History and Culture of the Indian people রচনায় তিনি বিশেষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। এই সিরিজের অর্ধেক রচনাই তাঁর লেখা। ১৯৫০ সালে তিনি ইন্ডোলজি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত থাকেন। এরপর তিনি The Sepoy Mutiny and Revolt of 1857 (১৯৫৭), History of Freedom Movement in India (three vol, 1962-63)-এর মতো গবেষণামূলক গ্রন্থগুলো রচনা করেন। ১৯৫৫ সালে ড. মজুমদার নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডোলজি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। তিনি তাঁর কর্মময় জীবনে এশিয়াটিক সোসাইটি (১৯৬৬- ৬৮) ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (১৯৬৮-৬৯)-এর সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। তিনি কিছুদিনের জন্য কলকাতার শেরিফ (sheriff)-এর দায়িত্বও পালন করেন। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক Endowment lecture প্রদান করেন। এই প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে লোকান্তরিত হন।
নরেন বিশ্বাস
নরের বিশ্বাস ১৯৪৫ সালে মুকসুদপুর উপজেলায় মাঝিগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখাপড়া শুরু হয় গ্রাম্য পাঠশালায়, শেষ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভের মাধ্যমে। কর্মজীবন অধ্যাপনার মাধ্যমে শুরু হলেও পরে নাট্যকার ও অভিনেতা হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। তার লেখা নাটকের মধ্যে মা, নিহত কুশীলব, রৌদ্রদিন, তামসীর ফাঁসি, ক্রুশবিদ্ধ যীশু উল্লেখযোগ্য। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা পেশায় নিযুক্ত হন। বাংলা ভাষার উপর তাঁর বিশেষ অবদান : বাংলা উচ্চারণ অভিধান, প্রসঙ্গ বাংলা ভাষা, কাব্যতত্ত্ব অন্বেষা, অলঙ্কার অন্বেষা এই সুগ্রন্থিত বইগুলো। ম্যাক্সিম গোর্কির মা নাটকের অনুবাদ নরেন বিশ্বাসের অসামান্য অবদান। তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের জন্য দেশবাসী তাকে বাক-শিল্পাচার্য বলে মানতেন। ১৯৯৮ সালে তিনি ঢাকায় পরলোক গমন করেন।
আব্দুস সালাম খান
মুকসুদপুর উপজেলায় বেজড়া গ্রামে ১৯০৬ সালে আব্দুস সালাম খান জন্মগ্রহণ করেন। আইনজীবী, রাজনীতিক, মন্ত্রী ও সাহিত্যিক। ১৯২৯ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ এবং ১৯৩১ সালে আইন পাস করেন। ১৯৪৫ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হয়ে পূর্ব বাংলার আইন সভার সদস্য নির্বাচিত এবং যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী সভায় পূর্ত ও যোগাযোগ মন্ত্রী হন। আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রধান কৌসুলী ছিলেন। ১৯৭২ সালে আব্দুস সালাম খান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ভবানী শংকর বিশ্বাস
ভবানী শংকর বিশ্বাস ১৯২৬ সালে মুকসুদপুর উপজেলায় মাঝিগাতী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ওড়াকান্দি মিড হাই স্কুল, নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ, চাখার ফজলুল হক কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৫৪ ও ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে তিনি মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের সংযুক্ত সদস্য থাকাকালে শ্রম, সমাজকল্যাণ, বুনিয়াদী গণতন্ত্র, স্থানীয় সরকার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
নির্মল সেন
১৯৩০ সালে নির্মল সেন গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার পিঞ্জুরী ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। বরিশাল জেলার কলসকাঠি হাইস্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়াশোনাকালীন অবস্থায় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ছাড় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং পর পর ১৬ দিন স্কুলে ধর্মঘট করেন। ১৯৪৪ সালে প্রবেশিকা পাস করেন।
১৯৪৬ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পরীক্ষার উত্তীর্ণ হন। এবং ব্রজমোহন কলেজে কেমিস্ট্রি-তে আনার্স নিয়ে বিএসসি-তে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন বরিশাল শহরে গেলে তার সফরকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হলে মুসলিম লীগের আব্দুল মালেক নিহত হয়। ফলে আবার নির্মল সেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। দীর্ঘদিন আগোপনের পর যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করার পরে কলেজে ফিরে আসলেও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ হয়নি।
যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। হুলিয়া মামলা নিয়ে তাকে পালিয়ে এসে নাম বদল করে এক হোটেলে আত্মগোপন করে থাকতে হয়। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রীসভা গঠিত হলে মামলা প্রত্যাহর করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ডিগ্রী ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়, এবং জেলে যাওয়ার আশংকায় ঢাকা সিটিনাইট কলেজে বিএ ক্লাশে ভর্তি হন।
১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তোলপাড় হয়। ফলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। জুলাই মাসে ভাইস চ্যান্সেলরের নির্দেশে তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে দেয়া হয় এবং আর্টস বিল্ডিংয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। চ্যান্সেলরের নির্দেশ অমান্য করে ২৫ আক্টোবর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে প্রবেশ করেন। ওই রাতে নিরাপত্তা আইনে আবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। জেল থেকে ১৯৬১ সালে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬২ সালে জেলখানা থেকে এমএ প্রথম পর্ব পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা পরীক্ষা বর্জন করে ফলে জুন মাসে তিনি মুক্তিলাভ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করতে অস্বীকার করে। ভাইস চ্যান্সেলর ড. মাহমুদ হোসেনের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন।
১৯৭১ সালের পর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি কোটালীপাড়া টুঙ্গীপাড়া নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং পরাজিত হন। নির্মল সেন চিরকুমার। তিনি ২০১৩ সালে ৮ই জানুয়ারি পরলোক গমণ করেন।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক শেখ সেকেন্দার আলী
শেখ সেকেন্দার আলী, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী একটি সংগ্রামী নাম। ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও বরিশাল অঞ্চলে নেতাজী’ নামে সুপরিচিত। ১৯৩৪ সালে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার না শেখ মফিজ উদ্দিন।
নিঃস্বার্থ শেখ সেকেন্দার আলী ছিলেন এসব অঞ্চলের অতি জনপ্রিয় মানুষ এবং কোটালীপাড়া তথা গোপালগঞ্জের কৃতি সন্তান। কৈশোরেই তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সহচার্য লাভ করেন এবং তার আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আপনজন। নিজের সন্তানদের মতো বঙ্গবন্ধু তাকে ভালোবাসতেন। ঘর-সংসার, বাবার সম্পত্তির মোহত্যাগ করে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন দুঃখী মানুষের জন্য। ‘৬৬-এর ৬ দফা ‘৬৮-এর ১১ দফা এবং ‘৬৯-এর গণআন্দোলনে তিনি রাজপথের সৈনিক ছিলেন। ‘৭০-এর নির্বাচনের সময় দলীয় প্রচারণায় তার ভূমিকা অনন্য। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শে গোপালগঞ্জ মাদারীপুর, বাগেরহাট ও বরিশালের উত্তরাঞ্চলে হেমায়েত উদ্দীন বীর বিক্রম হেমায়েত বাহিনী গড়ে তোলেন। পুরো নয়টি মাস তিনি এই বাহিনীর সঙ্গে থেকে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে শেখ সেকেন্দার আলী স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ভয় ভীতি উপেক্ষা করে ছুটে যান টুঙ্গীপাড়া। বঙ্গবন্ধুর কবর আগলে ছিলেন প্রায় ২০ বছর। বঙ্গবন্ধুর একখানি ছবি আয়নার বাধিয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়ান মাঠ প্রান্তর। সুদীর্ঘ ২৩ বছর তিনি এভাবে কাটিয়েছেন। পরনের কোনো আলাদা কাপড় ছিল না। এক কাপড়ে থাকতেন তিনি।
১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সুচিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়। তিনি কিছুদিন সেখানে অবস্থান করে আবার কোটালীপাড়া চলে যান। তিনি ২০০১ সালের ৩১শে জানুয়ারি মারা যান।
অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
প্রাচীন ঐতিহ্যের গোপালগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় রামনাথ সিদ্ধান্ত পঞ্চানন, সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দুর্গাসাধন ন্যায়ভূষণ, পণ্ডিত হরিদাস তর্কতীর্থ, আকাশবাণীর ভাষ্যকার সুধীর সমাজপতি, ডেপুটি জজ উমাচরণ রায় চৌধুরী, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ধীরেন সেন, বিচারপতি রাজেন্দ্র সেন, সংগীতজ্ঞ তারাপদ চক্রবর্তী, কবিরাজ মথুরানাথ সেন গুপ্ত, দুর্গ প্রশান্ত কর, সংস্কৃত কবি কৃষ্ণনাথ, ফুটবল খেলোয়াড় বলাই দে; ওস্তাদ সুধীন লাল চক্রবর্তী, ফার্সি ভাষার পণ্ডিত আব্দুর রহমান, ভাষাবিদ পণ্ডিত পঞ্জিকা বিশারদ অনন্ত বিশারদ কলকাতা কটন মিলের প্রতিষ্ঠাতা সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য, রায়চরণ চক্রবর্তী, পণ্ডিত লোকনাথ রায় চৌধুরী, খান বাহাদুর হেমায়েত উদ্দীন চৌধুরী, মাতৃভক্ত নিশিকান্ত বিশ্বাস, নানু মিয়া, দেবী প্রসন্ন রায় চৌধুরী, পৃথ্বীশ চন্দ্র রায়, সৈয়দ আহমেদ বেগ, খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, হাজী ছক্কু মিয়া, ধীরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, কাজী বিলায়েত হোসেন, সতীশ চন্দ্র হালদার, কাজী আকরাম উদ্দীন আহমদ, হরিদাস সিদ্ধান বাগীস, গীতিকার কে এম চাঁদ মিয়া, শেখ পরশউল্লাহ, সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, ফনিভূষণ মজুমদার, ওয়ালিউর রহমান লেবু, কমলেশ বেদজ্ঞ, ইসমত কাদির গামা, সাবেক গণপরিষদ সদস্য এম এ খায়ের, কাশেম রেজা, অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, মো. সাইদুর রহমান (চানমিয়া মোক্তার), লৎফুল হক চৌধুরী, মরহুম বজলুর রহমান তালকুদার, কাজী আবদুর রশিদসহ আরও অনেকে।
.
তথ্যসহায়ক
১. ড. নীহার রঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস।
২. মাসুদ সিদ্দিকী, টুঙ্গীপাড়ার প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
৩. মো. লুৎফর রহমান চুন্নু, পিতা : মো. সিরাজ উদ্দিন, গচাপাড়া, গোপালগঞ্জ।
৪. দিলীপ কুমার ঠাকুর, রামধন ঠাকুর, গ্রাম : হরিনাহাটি, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।
৫. ইব্রাহীম শিকদার (মসজিদের খাদেম), বহলতলী, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।
৬. সুজন হালদার, সুকান্ত লাইব্রেরি কাম অডিটোরিয়াম, উনশিয়া, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।
৭. আবুল ফজল খন্দকার, গ্রাম : নারিকেল বাড়ি, কোটালীপাড়া, ও মতিলাল দাস, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, নারকেল বাড়ি হাই স্কুল, কোটালীপাড়া।
৮. মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, গ্রাম : ভূয়ারপাড়া, কোটালীপাড়া।
৯. আকফাতুর রহমান, চিত্রাপাড়া, কোটালীপাড়া।
১০. স্বপন কুমার কীৰ্ত্তনীয়া, বয়স : ৫১ বছর, পেশা : গ্রাম্য ডাক্তার, চেম্বার-কাশিয়ানী, থানা ও গ্রাম : কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১১. কৃষ্ণপদ সরকার, বয়স-৬০, কাশিয়ানী। পেশা : (অব.) শিক্ষক, গ্রাম : বিদ্যাধর, উপজেলা :
১২. ভক্ত প্রবন কৃষ্ণ বিশ্বাস, গ্রাম : নড়াইল, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১৩. আবদুল সত্তার, বয়স-৭৩, পেশা : (অব.) মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক, গ্রাম : জ্যোৎকুরা, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১৪. মো. ইদ্রিস আলী মিয়া (বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা), গ্রাম : ছোট বাহিরবাক, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১৫. অজিত কুমার বর, পেশা : চাকরিজীবী, গ্রাম : লক্ষ্মীপুর, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১৬. মাইনউদ্দিন, প্রাক্তন শিক্ষক, এস এম মডেল হাই স্কুল, গোপালগঞ্জ।
১৭. শ্যামল ভৌমিক, বয়স : ৫১, পেশা : ইউপি সদস্য (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান), গ্রাম : রামদিয়া, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১৮. মো. ইদ্রিস আলী মিয়া, যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনী কমান্ডার, গ্রাম : ছোট বাহিরবাগ, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।
১৯. মো. লিয়াকত আলী মোল্লা (মুক্তিযোদ্ধা), গ্রাম : সোনাটিয়া, কোটালীপাড়া।
২০. বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, জুন ২০১১
২১. ফরজা কবির সেতু, গোপালগঞ্জ সদর।
২২. মিহিস্কেল বালা, বেদগ্রাম, গোপালগঞ্জ।
২৩. মো. জুলফিকার আলী, টুঙ্গীপাড়া সদর।
২৪. মো. মনির তালুকদার, পিতা : মো. বেলায়েত হোসেন, কোটালীপাড়া।
২৫. গঙ্গাধর প্রসাদ, গ্রাম : বান্ধাবাড়ি, কোটালীপাড়া।
২৬. মনোজিৎকুমার দাস, ভারত বিচিত্রা, পৃষ্ঠা-৪৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।
২৭. মোঃ আবদুর রাজ্জক মোল্লা, সিতাইকুণ্ড, কোটালীপাড়া।
২৮. ফয়সাল হোসেন তালুকদার, উত্তরপাড়া, কোটালীপাড়া।
