চ. মুক্তিযুদ্ধ
ফুকরা গ্রাম ও ভাটিয়াপাড়া মুক্তিযুদ্ধ
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পতন হলো। কিন্তু পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে রেহাই পেল না বাঙালি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে শহিদ হলো রফিক, সফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। তৎকালীন ছাত্রসমাজ রাজপথে মিছিল করে পাকিস্তান সরকারের প্রতিবাদ করলো, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিতসমাজ প্রতিবাদে সাড়া দিল। ‘৫২- এর পর থেকে প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে সারাদেশে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহিদ দিবস পালিত হতে থাকে। সাথে সাথে পাকিস্তান সরকার শহিদ দিবস পালনে বাঁধা সৃষ্টি করে। ফলশ্রুতিতে জনগণের সমর্থন গড়িয়ে পড়ে ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে সমস্ত রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হয়। ১৯৬৬ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে সকল বিরোধী দলের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা প্রস্তাব বাঙালির মুক্তির সনদ পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন ঢাকায়, বিমান বন্দরে তরুণ নেতারা এবং ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধুকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানায়। স্লোগানে স্লোগানে বিমানবন্দর মুখরিত হলো। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ৬ দফা দাবিকে গ্রাম-গঞ্জে সাধারণ মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছে দিলো। আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হলো। সে মাত্রা স্বাধীনতার নতুন আন্দোলন। গ্রেফতার করা হলো বঙ্গবন্ধুসহ অনেক রাজনীতিবিদকে। গ্রেফতার করা হলো ছাত্রলীগের প্রথম কাতারের নেতৃবৃন্দকে। আন্দোলন সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জনতা একাকার হয়ে গর্জে উঠল। ১৯৬৮ সালে ৬ দফার সাথে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা যোগ হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কেন্দ্রীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ আহুত ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহম্মদের সভাপতিত্বে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২৪শে জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান ঘটে 1 বঙ্গবন্ধুর দাবি নির্বাচন দিতে হবে। জেনারেল ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর দাবি মেনে নিলো। ১৯৭০ সালের অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো। দেশব্যাপী নির্বাচনের প্রস্তুতি, ছাত্র-সংগ্রামের নতুন নতুন স্লোগান জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। সমগ্র পাকিস্তানে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রমাদ গুণতে শুরু করল, কি করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা যায়। ১লা মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসার কথা ছিল, হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দিলেন অনির্দিষ্টকালের জন্য সংসদ অধিবেশন বন্ধ থাকবে। ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হলো। স্লোগান উঠল বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ভাষণে বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দীর্ঘ এই ভাষণের মধ্যদিয়ে জাতি পেল দিক নির্দেশনা। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতি প্রমাণ করলো বঙ্গবন্ধুই জাতির অবিসংবাদিত নেতা এবং আলোর দিশারী ও স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। ৮ই মার্চ থেকে শুরু করে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এই সময় আন্দোলন এবং মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণে অনেকে শহিদ হন। ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হলো।
১৯৭০ সালে যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ইদ্রিস আলী মিয়া ছিলেন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র এবং পরীক্ষার্থী। তখন তিনি সকল ছাত্রকে ডেকে একটা থানা কমিটি করলেন। ২৬শে মার্চের বর্বরোচিত হামলার খবর সারদেশে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ল। কমিটি গঠন করার উদ্দেশ্য ছিল যাতে সারা থানায় স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে পারে। এপ্রিল মাসের ১-২ তারিখে খুলনা পুলিশ এবং বিডিআরের সঙ্গে পাকিস্তানি আর্মির যুদ্ধের খবর পেয়ে তাদের জন্য চিড়া, গুড় ও নগদ টাকা নিয়ে সাইকেলে করে খুলনার দিকে রওনা হন ইদ্রিস আলী মিয়া। পথে সেনহাটি এক বাড়িতে ওঠেন। ঐ বাড়িতে ছিল পুলিশের ওয়ারলেস সেট। সারারাত বসে বসে ওয়ারলেস সেটে আসা যুদ্ধের খবর শুনছিলেন। সকালে উঠে নদীর পাড়ে যেতেই দেখেন শত শত মানুষের লাশ রূপসা নদীতে ভাসছে। খুলনা থেকে ফিরে এলেন তিনি। এসে নুরুলকাদির জুন্নুর সাথে দেখা করেন। জুন্নু বললেন এভাবে আর বসে থাকা যায় না। কারণ মুসলীম লীগের লোকেরা পিস কমিটি গঠন করছে, রাজাকাররা ট্রেনিং নিয়ে আসবে ইত্যাদি। জুনু ইদ্রিস মিয়াকে বললেন, গোপালগঞ্জ থেকে পাওয়া ৬টা রাইফেল আমার কাছে আছে। রাইফেলগুলো আজ রাতেই নিয়ে তোমার কাছে রাখবা এবং প্রয়োজনে কাজে লাগাবা। রাইফেলগুলো তিনি নিয়ে এলেন বাড়িতে এভাবে কয়েকদিন কেটে গেলো, এপ্রিল পার হলো, রজাকাররা গ্রামে আসতে শুরু করেছে। মে মাসের প্রথম দিকে এলাকার একদল ছেলে নিয়ে রওনা হলেন ভারতের উদ্দেশ্যে। মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস মিয়ার সঙ্গে ছিলেন রামদিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রধান ড. আব্দুল জলিল মিয়া, ডা. আবুল খায়ের (বাচ্চু), গাজী বেলায়েত হোসেন, মোল্লা আবুল খায়ের (রতন), আবু বকর সিকদার, হাচান গাজী, মজিবর রহমান মোল্লা, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা ও আরো অনেকে। মোট সঙ্গীসাথীর সংখ্যা ছিল ২২ জন। বাগদা বর্ডারের কাছে পৌছাতেই দেখেন প্রায় ৫ হাজার শরণার্থীকে রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরা আটক করেছে। টাকা দিয়ে ছাড়া পেতে হবে। দলের লোকেরাও বাদ পড়লেন না টাকা দেওয়া থেকে। পথ চলছেন, হঠাৎ বর্ডারের উভয় পাশ থেকে আরম্ভ হয় বোমবিং, থর থর করে কাঁপল মাটি। যে যেদিকে পারে দৌড়ে বর্ডার পার হলো। কিন্তু কর্তব্যপরায়ণ এই ইদ্রিস মিয়া ড. আব্দুল জলিলকে সঙ্গে নিয়েই পার হতে লাগলেন। একটু এগিয়ে দেখেন একটা ফুটফুটে ছেলে কাত হয়ে পড়ে আছে। কোনো কান্না নেই তার। স্যারকে বলে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলেন। সীমান্তের কাছে যেতেই বাচ্চাটার মা বাচ্চাটাকে চিনতে পেরে দৌড়ে এসে তাঁকেসহ বচ্চাটাকে জাড়িয়ে ধরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিছু সময় পর তারা জ্ঞান ফিরে পায়। মা তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ছেলে হারানোর বেদনা এবং হারানো ছেলে ফিরে পাওয়ার আনন্দ এই দুয়ে মিলে অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
এরপর তিনি বাসে করে (তার সঙ্গীদের নিয়ে) বনগাঁ বাজারে এসে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেন এবং সেখানে থাকেন। পরের দিন সকালে টালীখোলা ক্যাম্পে এসে সকলকে ভর্তি করে দিলেন। স্যার আব্দুল জলিলকে সঙ্গে নিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কলকাতা যান এবং আইডিয়াল হোটেলে ওঠেন। হঠাৎ দেখা হয় পূর্বপরিচিত ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক ভিপি আফজালের সঙ্গে। তিনি বলেলন আর কোনো ছেলে আছে কিনা। আরও বলেলন ছাত্রলীগের মেট্রিক পাস করেছে এমন ছেলেদের নামের তালিকা তৈরি করতে হবে। টালীখোলা ক্যাম্পে ফিরে এসে এলাকার সমস্ত ছেলেদের নিয়ে মোট ৬৩ জনের নাম তালিকাভুক্ত করেন এবং আফজালের কথামতো তোফায়েল আহমদের সাথে দেখা করেন। তোফায়েল সাহেব বললেন আগামীকাল শিয়ালদা ট্রেন স্টেশনে এসে আমার সাথে দেখা করবা এবং উত্তর প্রদেশে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য যেতে হবে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী মিয়া তার ৬৩ জনকে নিয়ে শিয়ালদা এসেই তোফায়েল সাহেব এবং সিরাজুল আলমের দেখা পান। হাচান ভাই এবং সিরাজ ভাইকেও যোগ করলেন ঐ দলে। রাত ১০টায় ট্রেনে করে সকাল ৭টায় শিলিগুড়িতে পৌঁছান। এখানে রেট ক্যাম্পে দুইদিন থাকার পর সকলে কার্গো প্লেনে করে সাহারানপুর আর্মি বিমান ঘাঁটিতে পৌছান। এখান থেকে আবার ট্রাকে করে পাহাড়ের ঢালু বেয়ে দেরাদুনের তান্দুয়া ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছান। সেখানে শুরু হলো ট্রেনিং। প্রায় দুইমাস প্রশিক্ষণ শেষে একদিন প্রশিক্ষণে সকালের পি.ডি প্রায় ১ ঘণ্টা অতিরিক্ত করানোর কারণে সকালে নাস্তা করার সময় হলো না। না খেয়ে ক্লাস করার জন্য দুপুরে তিন ব্যারাকের ছেলেদের নিয়ে অনশন আরম্ভ করেন। ক্যাম্প কমান্ডার জেনারেল উবানের অনুরোধে অনশন ভঙ্গ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই প্রেক্ষাপটে মুজিব বাহিনীর চার নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান এই তান্দুয়া ক্যান্টনমেন্টে পৌছান। তোফায়েল আহমেদ এবং সিরাজুল আলম খান বলেন, পরের দেশে এসে কেন অনশন করলে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস মিয়া তাদের দোষ তুলে ধরতে সক্ষম হলেন।
এর কয়েক দিন পর প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এলেন পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরের রেট ক্যাম্পে। কয়েক দিন থাকার পর তোফায়েল আহম্মদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৯-১০ জন করে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। কাশিয়ানী থানার ছেলে বেশি ছিল বিধায় এখানে দুইটা টিম করে দিলেন। ভারত থেকে আসার সময়টাই ছিল তাদের বিপদ মুহূর্ত। এই বিপদ সংকুল পথের একমাত্র দিশারী ছিলেন সীতারামপুরের মোকছেদ সিকদার এবং ঘোনাপাড়ার রহমান, যাদের কথা স্মরণ করতেই হয়। ভারত থেকে আসার পথে আর্মস চেম্বারে গুলি উঠিয়ে পথ চলতে হয়েছিল। শুধুমাত্র ট্রিগার চাপ দিলেই ফায়ার হবে। কালীগঞ্জের প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণ দিয়ে সিএমবি রাস্তা পার হওয়ার সময় দলের এক অংশ রাস্তা পার হওয়া মাত্র কয়েকটা আর্মির গাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। আর্মস ধারী কেউই অবশ্য রাস্তার উপর ছিল না। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কিছু সময় পরে তারা আবার এক জায়গায় জড় হয়ে শুরু করে পথচলা। প্রায় দুই ঘণ্টা পথচলার পর একটা বাজারে পৌঁছান। তখন সকাল হয়ে যায়। তাড়াহুড়া করে পাশে এক বাড়িতে আশ্রয় নেয় তারা। বাড়িওয়ালা অবশ্য আওয়ামী লীগের লোক ছিলেন। তারই চেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধাদের পারের জন্য নৌকা ঠিক করা এবং খাবারের ব্যবস্থা হয়। অস্ত্রধারীদের গায়ের কাঁদা ধোয়ার সময় হঠাৎ ফায়ার হয় খালেকের অস্ত্রে। আহত হয় নিজগার আকবর আলী, মতিয়ার রহমান, আর একজন ঐ বাড়ির ১০-১২ বছর বয়সী একটা ছেলে। তারা প্রত্যেকেই ভালো হয়। ওখানে খাবার খাওয়া হয় না তাদের। কেননা মাত্র তিন মাইল দূরেই ছিল পাক আর্মি ক্যাম্প। পুরো দুই দিন পরে রাত ১১টার সময় ছাইফুর রহমান ছাইফু ভাইয়ের বাড়িতে খাবার খায় তারা। পরের দিন সকাল হতে না হতেই নূরুল কাদীর, জুনুমিয়া এবং ডা. আব্দুস সামাদ মুক্তিযোদ্ধাদের এনে ঘৃতকান্দী গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করেন। এখানে ইদ্রিস মিয়া এবং বেলায়েত ছাড়া আরো একটা দল জগলুল কাদির জুলু ভাইয়ের। এই সময় জুন্নু ভাইয়ের নেতৃত্বে একটা সিভিল প্রশাসন গড়ে তোলা হয়। আওয়ামী লীগের যারা দেশে ছিলেন তাদের নিয়ে এই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। পরে এই সিভিল প্রশাসন বৃহত্তর ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা পর্ষদ নামে পরিচিত হয়। তখন এর অফিস হয় ওড়াকান্দিতে। অক্টোবরের শেষের দিকে ক্যাপ্টেন বাবুল সাহেব আসেন এখানে। এই সময় ডা. সালেক সাহেবও এসে এই ওড়াকান্দিতে যোগ দেন। জুন্নু ভাইয়ের নিরলস প্রচেষ্টার ফসলই ওড়াকান্দি মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল এই ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্থা করতো এই সিভিল প্রশাসন। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন জুন্নু ভাই, যে ব্যক্তিটি বার বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আরও ছিলেন ডা. আব্দুস সামাদ, চেয়ারম্যান, পুইশুর ইউ.পি, আব্দুস সালাম সরদার, চেয়ারম্যান, ওড়াকান্দি, টেপুমিয়া, চেয়ারম্যান, মাহমুদপুর ইউ.পি, এবং আরো অনেকে। ১৯৭১ সালের ডায়েরি হারিয়ে যাওয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস মিয়া তারিখ দিতে ব্যর্থ হলেও মাস-সপ্তাহ ঠিক আছে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে দেশে আসেন সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। এসেই তিনি উপরের নির্দেশ মতো বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং সেন্টার খুলে ছেলেদেরকে ট্রেনিং দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধারা ভাটিয়াপাড়া আক্রমণ করে। তুমুল যুদ্ধ হয় সেখানে।
মুক্তিযোদ্ধারা ২০ রাউন্ড গুলি ছুড়লে শত্রুপক্ষ ছাড়ে কম করে দুই হাজার রাউন্ড। এভাবেই শত্রু পক্ষকে বিব্রত করত মুক্তিযোদ্ধারা যাতে করে শত্রুপক্ষ গ্রামে ঢুকে লুট- পাট, জ্বালাও-পোড়াও না করতে পারে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ঘৃতকান্দি থাকা অবস্থায় খবর পেলেন ফুকরায় পাক আর্মি আসছে। সঙ্গে সঙ্গে ইদ্রিস মিয়ার যোদ্ধা এবং বেলায়েত গাজীর বিশ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ফুকরা গ্রামে আসেন এবং দেখেন তারা নদীর ঘাটে লঞ্চ ভিড়িয়ে ট্রেনিং দিচ্ছে। তখন ইদ্রিস মিয়া তার এবং চান সরদার সাহেবের সকল সহযোদ্ধাদেরকে জঙ্গলের মধ্য গিয়ে পজিশান নিয়ে পরামর্শ করেন—প্রথম আক্রমণ কি পদ্ধতিতে করলে শত্রুদেরকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে। ঠিক এমন সময় একটা মিস ফায়ার হয়। সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় শুরু হলো। যুদ্ধ চলল প্রায় এক ঘণ্টা। পরে আস্তে আস্তে উভয় পক্ষের গোলাবর্ষণ থেমে যায়। দেখা গেলো পরের দিন পাকআর্মি আর গ্রামে অত্যাচার করতে নামেনি।
উক্ত ঘটনার একসপ্তাহ পরে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সন্ধ্যার সময় খবর এলো ফুকরাতে পাক আর্মি আবার এসেছে। যোদ্ধারা বুঝতে পারল আগামী দিনে পাকআর্মি বা রাজাকাররা গ্রামে নেমে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে গুলি করে হত্যা করা থেকে শুরু করে কোনো প্রকার অত্যাচার করতে আর বাকি রাখবে না। খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইদ্রিস মিয়ার টিমের এবং বেলায়েত গাজীর টিমের সকলকে নিয়ে ফুকরাতে পৌঁছালেন। যেয়ে দেখলেন আর্মিদের লঞ্চ ভিড়ছে দক্ষিণ ফুকরার পুরাতন লঞ্চ ঘাটে এবং লঞ্চের উপর ও নীচে টর্চ জ্বালিয়ে সেন্টি পাহারা দিচ্ছে। নদী তখন কানায় কানায় ভরপুর। নদীর কূল বেয়ে গ্রামে ঢোকার সুযোগ নেই বললেই চলে। ঢোকার রাস্তা মাত্র একটা। সবকিছু দেখে শুনে এ্যাম্বুশের ব্যবস্থা করলেন। এলএমজি কভারিংয়ে রেখে একটা শক্তবুশ তৈরি করলেন। রাস্তায় ছিল একটা বাঁশের সাঁকো হিটিং পয়েন্টে রাখলাম, ওরা বাঁশের সাঁকো পার হলেই হিট করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক করতে প্রায় ৪টা বেজে গেলো। আর্মিদের আসার রাস্তার দুই পাশেই পানি ছিল। আস্তে আস্তে সময় পার হতে লাগল। পূর্ব আকাশে লাল সূর্য টকটক করে উপরে উঠছে, এমন সময় সহযোদ্ধাদের নির্দেশ দেওয়া হলো-ওরা বাঁশের সাঁকো পার হলেই আক্রমণ করতে হবে। বলতে না বলতেই পাকআর্মি ও রাজাকাররা বাঁশের সাঁকো পার হলো। সঙ্গে সঙ্গে ফায়ারও ওপেন করা হলো। মুক্তিযোদ্ধারা আমগাছে ভরা একটা পুকুর পাড়ে পজিশন নিয়েছিল। আম গাছের দূরত্ব রাস্তা থেকে মাত্র ২৫ গজ হবে। ইদ্রিস মিয়ার সঙ্গে ছিল ফরিদ আহমেদ মোল্যা, সিরাজুল ইসলাম তিলছাড়া, মোরতোজ আলী মৃধা, জোনাসুর ও আয়ুল হক শরীফ বাহিরবাগ। ফরিদ গুলি করার সাথে সাথে বলে উঠল ভাইজান আমার গুলিতে একজন পড়ে গেছে। কমান্ডারের নিষেধ সত্ত্বেও জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে দেয়। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে তুমুল যুদ্ধ চলল। কমান্ডার ইদ্রিস মিয়ার কাভারিংয়ে ছিল গাজী বেলায়েত হোসেন, আবুল খায়ের রতন, মজিবর রহমান মোল্যা, আজিবর রহমান, গোলাম মোস্তফাসহ আরো অনেকে। পাকআর্মি ও রাজাকাররা রাস্তার আড় নিয়ে তীব্রভাবে গুলি করছে ও এগুচ্ছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর পজিশনটা এমন একটা জায়গায় ছিল, যেখান থেকে সরে আসতে হলে ওদের থেকে ১০ গজের ভিতর দিয়ে আসতে হবে। মুক্তিবাহিনীর পিছনে ছিল বর্ষার পানি। প্রথমে ভাবতেই পারেনি যে মুক্তিবাহিনীদের পিছু হটতে হবে। এমনভাবে কভারিংটা সাজানো ছিল যে, ওরা রাস্তায় আড় নিলেই মুক্তিবাহিনীর পক্ষে কভারিং ফায়ার দিলেই ওদের একটা সৈনিকও ফিরে যেতে পারবে না। ওদের হেলমেট দেখা যাচ্ছে যে ওরা এগুচ্ছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় মুক্তিবাহিনীর কভারিং থেকে কোনো ফায়ার আসছে না। তখন ইদ্রিস মিয়া দেখলেন আমরা আটকা পড়ে গেছি। কিন্তু আমাদের পাঁচজনের মৃত্যু জেনেও ওদের সামনা-সামনি ১০ গজের মধ্যে ক্রোলিং করে গুলি করতে করতে পিছু হটতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা। আল্লাহর অশেষ রহমত কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই প্রাণে বেঁচে গেলো তারা। এদিনও পাকআর্মি গ্রামে কোনো অত্যাচার করেনি। সম্ভবত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে শেখ শহিদ ভাই খবর দিলেন দুজন বিদেশি সাংবাদিক এবং আমাদের দেশের একজন দোভাষী কমান্ডার ইদ্রিস মিয়ার কাছে যাবে। ঐ সাংবাদিকদেরকে ভারতীয় কোনো আর্মস দেখানো যাবে না। ওদের দেখাতে হবে যা বাংলাদেশের ভিতর থেকে জোগাড় করা হয়েছে। ঠিক সেইভাবেই তাদের সাথে কাজ হলো।
তারা জানতে চাইল মুক্তিবাহিনীরা পাকআর্মি ও রাজাকারদের সঙ্গে কি কি ভাবে যুদ্ধ করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা বলল আমরা দিনের বেলায় ভাটিয়াপাড়ায়, আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করলে সঙ্গে সঙ্গে ওদের যুদ্ধবিমান এসে গুলিবর্ষণ করবে। সাংবাদিকরা তখন এই অবস্থান স্বচক্ষে দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল। তখন কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া ১৫ জন সহযোদ্ধা নিয়ে ভাটিয়াপাড়া আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করার ব্যবস্থা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে যুদ্ধ বিমান এসে আকাশ থেকে ড্রাইভ দিয়ে নীচে এসে এলএমজি দিয়ে গুলিবর্ষণ করতে করতে উপরে উঠে যায়। বার বার এভাবে গুলি করতে থাকে। সাংবাদিকরা সব ছবি তুলে নিতে সক্ষম হলেন। কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া সারাদিন তাদের সঙ্গে কাটালেন। সম্ভবত অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ দক্ষিণ ফুকরা লঞ্চঘাটে পাকআর্মি ও রাজাকাররা তিনটা লঞ্চে এসে ফুকরা গ্রামে নেমে বাড়িঘর পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় এবং পরে লঞ্চে করে তারা ভাটিয়াপাড়ার দিকে চলে যায়। তখন ঐ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা যারা ছিল, সকল দলের কমান্ডাররা ফুকরা স্কুলে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয় পাক আর্মিরা ভাটিয়াপাড়া থেকে ফেরার পথে তাদেরকে আক্রমণ করতে হবে। সিদ্ধান্ত মোতবেক মুক্তিবাহিনীরা মধুমতীর কূল ঘেষে প্রায় ২ কিলোমিটার নিয়ে পরিখা খনন করে পজিশন নিয়ে নেয়। মরিচা গ্রামবাসী মুক্তিবাহিনীকে পরিখা খনন থেকে শুরু করে খাবারের ব্যবস্থা করে দিবে। সর্বোপরি গ্রামবাসীর মনে আনন্দ আর ধরে না। তাদের ধারণা পাকআর্মিদের সাথে যুদ্ধ হবে আর তারা পরাজিত হবে। বাড়িঘর জ্বালানোর চরম প্রতিশোধ নিতে পারবে বলে তাদের উল্লাস। পাকআর্মিরা ২ দিন পরে সম্ভবত ৩১শে অক্টোবর দক্ষিণ ফুকরা লঞ্চঘাট সোজা এলে মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে লঞ্চকে লক্ষ্য করে প্রথমে এনেগা গ্রেনেট ফায়ার করে। শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে চলেছে। পাকআর্মিরা সামনা-সামনি নদীর পাড়ে উঠতে পারছে না। পাকহানাদার বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা অগণিত। উভয়পক্ষের গোলাবর্ষণে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। মুক্তিবাহিনীর বিজয় সুনিশ্চিত প্রায়। ঘণ্টা খানেক পরে উত্তর পাশ থেকে একদল হানাদার বাহিনী ক্রোলিং করে মুক্তিবাহিনীর অতি সন্নিকটে এসে ফায়ার শুরু করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং লঞ্চের সামনে যারা মরিচায় ছিল তারা আর মরিচা থেকে উঠে আসার সুযোগ পায়নি। এই যুদ্ধের শেষের দিকে শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। পরে হানাদার বাহিনী গ্রামে ঢুকে ১২৫ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। পাকহানাদার বাহিনীর গুলিতে মুক্তিবাহিনীর ১৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে শহিদ হন। যারা বীরত্বের সাথে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য হাসিমুখে আত্মাহুতি দিয়েছেন এই ফুকরা রণাঙ্গনে, পরম শ্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করে এলাকাবাসী। এ যুদ্ধে শহিদ হন-
১. শহিদ আলী আকবর সরদার, পিতা- মহিদুল সরদার, গ্রাম : ফুকরা
২. শহিদ রেজাউল কারিগর, পিতা- ছারেন উদ্দিন কারিগর, গ্রাম- দঃ ফুকরা
৩. শহিদ আবু কারিগর, পিতা- কানাই কারিগর, গ্রাম- দঃ ফুকরা
৪. শহিদ রবিউল সিকদার, পিতা- মোকসেদ সিকদার, গ্রাম- দঃ ফুকরা
৫. শহিদ ইমাম হোসেন মিয়া, পিতা- মোকছেদ মিয়া, গ্রাম-ছোট বাহিরবাগ
৬. শহিদ হাবিবুর রহমান সরদার, গ্রাম- ছোট বাহিরবাগ
৭. শহিদ আবুল হোসেন, গ্রাম- সাতাকিয়া
৮. শহিদ আব্দুল মান্নান, গ্রাম- দহিসারা
৯. শহিদ চাঁন মোল্লা, পিতা- মজিদ মোল্লা, গ্রাম : খাগাইল।
১০. শহিদ নূরু মিয়া প্রমুখ।
বৃষ্টি শেষে সন্ধ্যা নেমে এলো। শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন সহযোদ্ধারা। সারা এলাকায় নেমে এলো শোকের ছায়া। সহযোদ্ধারা ভাই হারানোর ব্যথায় ভেঙে পড়ে তারা একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ নিস্তব্ধতা বড় করুণ নিস্তব্ধতা। কতটা মর্মাহত ছিল ভাষা দিয়ে তা বোঝানো যায় না। হাজার হাজার মানুষ শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের দেখতে এসেছে, মুখে কোনো শব্দ নেই। সবারই চোখে জল। সে কি নিদারুণ ব্যথা। শোকাহত মানুষ। এ দৃশ্য সেদিন যে দেখেছে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তার এ ব্যথার স্মৃতি জাগ্রত থাকবে। অক্টোবর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা করে ফরিদপুর থেকে যাতে আর্মি না আসতে পারে সেজন্য ঘোড়াখালির ট্রেন ব্রিজ ভেঙ্গে দিতে হবে। ইসমত কাদির গামাসহ ১৫ জন ব্রিজের দিকে রওনা হয়। গোপালগঞ্জ থেকে আনা হয় Explosive-এর কাজের জন্য জয়ন্ত সরকারকে। প্রথমে আবু জাফর সিদ্দিকির সঙ্গে যোগাযোগ করায় তিনি বিরক্ত বোধ করলেন। পরে ব্রিজের পশ্চিম পাশে এক মাস্টারের সাথে, সে আমাদের ৪ খানা সাবল আধা ঘণ্টার মধ্যে ব্রিজের কাছে পৌঁছে দিলেন। সবাইকে নিয়ে ব্রিজের কাছে গিয়ে আমরা Explosive-এর কাজ শুরু করলাম। প্রেসার চার্জ বসাতে প্রায় শেষ রাত্রি হয়ে গেলো। চার্জ বাস্ট করানো হলো, রেলের ব্রিজের কোনো চিহ্ন রইল না। কাজ সম্পন্ন করার আনন্দ ছিল পৃথিবী জয় করার মতো। এ কাজের সঙ্গে আমি নিজে, ইসমত কাদির গামা, গোপালগঞ্জের জয়ন্ত সরকারসহ আরো ১২-১৪ জন যুক্ত ছিলাম। এরপর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প রামদিয়াতে স্থানান্তরিত করা হয়। রামদিয়াতে পাক-আর্মি আক্রমণ করতে পারে এই ভেবে রামদিয়ার দক্ষিণ পাশে নড়াইল গ্রামে খাল পাড়ের নাপিত বাড়িতে সেন্ট্রির ব্যবস্থা করলাম। হঠাৎ একদিন সেন্ট্রির চোখ ফাঁকি দিয়ে পাকরা রামাদিয়া চলে আসে। মুক্তিবাহিনী তখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, পজিশন নেওয়ার আর কোনো সময় থাকে না। শুধুমাত্র অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে পালাতে বাধ্য হলো। বাকি যা পড়ে ছিল আর্মিরা তা সব তছনছ করে দিলো। কয়েকদিন যাওয়ার পর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প রাতৈল স্থানান্তরিত করা হয়। এই রাতৈল থেকে ভাটিয়াপাড়া আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করার সাথে সাথে শুরু হলো তুমুল গোলাগুলি। বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্নভাবে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী। কোনো কোনো দিন মুক্তিবাহিনীরা ওদের বের হবার পথে অ্যামবুশ পাতে, কারণ অ্যাম্বুশের ভিতর খুব সহজে পাক-আর্মিদের ঘায়েল করা যাবে।
একদিন খুব ক্লোজে গিয়ে অ্যামবুশ পাতেন কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া। অ্যামবুশ থেকে উঠে আসার সময় আমার এক সহযোদ্ধা আর্মি ক্যাম্পকে লক্ষ করে ২ রাউন্ড ফায়ার করে। সারা নভেম্বর মাস ধরে ভাটিয়াপাড়া আর্মি ক্যাম্পে নিয়মিত অ্যামবুশ আক্রমণ চলে। একদিন নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে ইসমত কাদির গামা নিজেই তার লোকজন নিয়ে ডিফেন্সে যান। ভোর হয়ে আসছে, পরক্ষণে ভাটিয়াপাড়ার দিকে লঞ্চের শব্দ শোনা গেলো। আমি তাড়াহুড়া করে আমার সহযোদ্ধাদের রেডি করে গন্তব্যস্থলে হাজির হয়ে ইসমত কাদির ভাইয়ের অবস্থান দেখে আমার সহযোদ্ধাদের পজিশনে দিয়ে দাঁড়িয়েছি। এ জায়গা ছিল রাজাকার রউফ মৌলভীর বাড়ির উত্তর পাশে রাস্তার ধারে। হঠাৎ পাক- আর্মিরা রাস্তায় নেমে আসে। ইসমত কাদির গামার কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি ফায়ার ওপেন করা। তখন দৌড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আমি তখন আমার সহযোদ্ধাদের নির্দেশ দিলাম ফায়ার করার। সেই সাথে ইসমত কাদির গামাসহ সকলেই বেঁচে যায়। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে একটি রাত্রিও বাদ যায়নি ভাটিয়াপাড়া অ্যাম্বুশ ও গোলাবর্ষণ থেকে। ক্রমেই মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ জোরদার হচ্ছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ আক্রমণ আরো জোরদার হয়। কেননা ভাটিয়াপাড়া আর্মি ক্যাম্পে গোলাবারুদ আসার কোনো সুযোগ থাকে না। এক কমান্ডারের সহযোদ্ধা ও অন্য কমান্ডারের সহযোদ্ধারা এক হয়ে গেছে। ফলে দলও বেড়ে গেছে, যুদ্ধের গতিও বেড়ে গেছে। সম্ভবত ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ১৩ তারিখ তিন টিমের মুক্তিযোদ্ধা একত্রে ভাটিয়াপাড়ার আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করে। ১৬ই ডিসেম্বর সারাদেশে পাক আর্মি আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু ভাটিয়াপাড়ার পাক-আর্মিরা আত্মসমর্পণ করছিল না। তখন এলাকার সকল মুক্তিযোদ্ধা এক হয়ে বিরামহীনভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ২ দিন অবিরাম গুলিবর্ষণের পর তৃতীয় দিনে ১৯শে ডিসেম্বর ১০টার দিকে মাইকে বলা হলো তোমরা আত্মসমর্পণ কর। এ ছাড়াও প্রায় দেড় মাস পূর্বে সাব্বির খান নামে এক পাকআর্মির নায়েক অ্যাম্বুশের গুলি খেয়ে ধরা পড়ে। তাকে দিয়ে ওদের ভাষায় বলানো হয় এবং সকল আর্মি আত্মসমর্পণ করেছে এটা জানানো হয়। তাদের মেরে ফেলানো হবে না এ আশ্বাস দেওয়া হয়। এমনকি কুরান শপথে এ কথা বলা হয়। তখন পাকআর্মিরা আত্মসমর্পণ করতে স্বীকার করে।
কথা অনুযায়ী কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত হলো কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া একা পাক আর্মিদের ক্যাম্পের ভিতর ঢুকবে। ইদ্রিস মিয়া ঢুকে দেখেন ওরা তখন বিড় বিড় করে সুরা কালাম পড়ছে। ভিতরে গিয়ে ইদ্রিস মিয়া তাদের অস্ত্র ও গুলি ক্লোজ করেন। একজন বেলুচ সৈন্য ঘরের সিঁড়িতে তার হাতে থাকা একটা চাইনিজ স্টেনগান পেটে ঠেকিয়ে পা দিয়ে ট্রিগার চাপ দিল। ওদের সকলকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে অন্যান্য রাজাকার আলবদর এবং পুলিশ দারোগাকে অন্য লাইনে দাঁড় করিয়ে চোখ এবং হাত বেঁধে ফেলা হলো। পরের দিন সকাল ১০টার সময় পাক আর্মিদের সঙ্গে করে ইসমত কাদির গামা ও কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া আরো ১৫-১৬ জন সহযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে যশোরে ওদেরকে এবং ওদের আর্মসগুলো জমা দিয়ে আসে। তখন যশোরে দায়িত্বে ছিলেন ২ জন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা।
এমন একটি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাকে কখনও কোনো লেখক বা কোনো ঐতিহাসিক লিপিবদ্ধ করেননি। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বলেও এলাকাবাসী এর কোনো সদুত্তর বা ব্যবস্থা পায়নি বিধায় তাদের স্বজন হারানোর ব্যথা গুমরে গুমরে ফিরছে। স্বজন হারানোর বেদনা আজও তারা চেপে রাখতে পারে না। তাদের মনের প্রবল ইচ্ছা এই ফুকরা গ্রামে সরকারিভাবে একটা শহিদ মিনার হোক। যাতে করে তারা প্রতিবছর অন্তত একবার দোয়া মাহফিলের ব্যবস্থা করতে পারে এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধে কোটালীপাড়া
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে কোটালীপাড়ায় ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। পাকহানাদার বাহিনীর পৈশাচিক নির্যাতনে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় ভারতে। অসংখ্য মানুষ নিহত হন পাক দস্যুদের হামলায়। সেনাবাহিনীর বীর সৈনিক হেমায়েত উদ্দীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় পুরো ৯টি মাস কোটালীপাড়া মুক্ত থাকলেও হানাদার বাহিনী প্রায়ই হানা দিয়ে শত শত বাঙালি সন্তানকে গুলি করে হত্যা করেছে। এসব শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মো. ইব্রাহীম, মো. গোলাম আলী, মো. মোক্তার হোসেন, আবুল বাসার হাওলাদার, আবুল খায়ের খান, মোতাহার খান, আকবর গাজী, মোক্তার হোসেন, আবু তালেব আলী, বেলায়েত হোসেন শেখ, শ্রী রতন কুমার, ওসমান শেখ, বেলায়েত হোসেন, মকবুল হোসেন, আব্দুস সালাম তালুকদার, আব্দুস সাত্তার মৃধা, আবুল বাশার খান, সেকেন্দার আলী, নূরু বেপারী, পরিমল শীল, জহিরুল হক ফকিরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কোটালীপাড়ার হেমায়েত বাহিনীর স্মৃতি ফলকে শহিদদের তালিকা
কোটালীপাড়ার মুক্তিযুদ্ধের বিমান বাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার শেখ জাবেদ আলী, কাজী আশরাফ উদ্দীন আহমেদ, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুল গফুর পাইক, চিত্তরঞ্জন গাইন, নোমান খন্দকার, শেখ আবদুল আজিজ ছোট, মো. লিয়াকত আলী মোল্লা, শেখ হাবীবুর রহমান, কমলেশ বেদজ্ঞ ও আশালতা বৈদ্য বিশেষ অবদান রাখেন। মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রথমে কোটালীপাড়া কলেজ, পরে কুমরিয়া ও জহরের কান্দিতে ট্রেনিং সেন্টার খোলা হয়। ট্রেনিং সেন্টারের মূল দায়িত্ব পালন করেন হেমায়েত উদ্দীন বীর বিক্রম ও শেখ জাবেদ আলী। কোটালীপাড়া থানা প্রথম অপারেশনে হেমায়েত উদ্দীনের নেতৃত্বে মুজিবুর রহমান, তৈয়াবুর রহমান, মতিয়ার রহমান ও ইব্রাহিম প্রমুখ অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর (অব.) জলিল কমান্ডার হেমায়েত উদ্দীনকে সুবেদার পদে উন্নীত করেন।
