ঘ. ঐতিহাসিক স্থাপনা ও অন্যান্য

ঘ. ঐতিহাসিক স্থাপনা ও অন্যান্য

প্রাচীন জনপদ

বাংলাদেশে যেসব অঞ্চলে পুরাকীর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে তারমধ্যে মহাস্থানগড়, বিক্রমপুর, উয়ারী বটেশ্বরী, ফরিদপুর ও কোটালীপাড়া উল্লেখযোগ্য। এসবের গোপালগঞ্জ জেলায় কোটালীপাড়ার ‘চন্দ্রবর্মন কোট’ দুর্গটি সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে পারে। কোটালীপাড়ায় যে বহুপূর্বে নগর সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তা সেখানকার বেশ কয়েকটি প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনে ফুটে উঠেছে। এখানে ষষ্ঠ শতকে প্রাপ্ত একটি লিপিতে ‘চন্দ্রবর্মন কোট’ বলে একটি দুর্গের আছে যা কিনা সামরিক প্রয়োজনে নির্মিত হয়েছিল। ধর্মাদিত্যের রাজত্বকালে এখানে একটি শহর গড়ে উঠেছিল বলে অনেক গবেষক মনে করে থাকেন। কোট বা দুর্গ হতে কোটালীপাড়া নামের উৎপত্তি বলে অনেকের বিশ্বাস। এটি এই জনপদের একটি প্রধান আকর্ষণ। দুর্গটির উচ্চতা ১৫ হতে ৩০ ফুট। দৈর্ঘ্য প্রস্থে আড়াই মাইল। পূর্ববঙ্গে বৃহত্তর দুর্গ বলে এটি পরিচিত। দুর্গটির অল্প দক্ষিণে গুয়াখোলা গ্রামে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ও স্কন্ধগুপ্তের সময়ের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। দুর্গটির অল্প দূরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ১৯৯৮ সালে ঘাঘরহাটি গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে ‘ঘাঘরহাটি তাম্রপাত্র’। তাছাড়া সোনাকান্দুরি মাঠের মধ্যে গুপ্ত সম্রাটদের নামাঙ্কিত ‘সুবর্ণ মুদ্রা’ পাওয়া গেছে। কোটালীপাড়া থেকে এক মাইল পূর্বে পাওয়া গেছে ঘাঘর নামে জনৈক এক অজ্ঞাত রাজার একটি স্বর্ণমুদ্রা। দুর্গের দক্ষিণ পশ্চিম সীমানা সংলগ্ন পিঞ্জুরী গ্রামের কাছে মদনপাড়া গ্রামে সেন রাজবংশীয় বিশ্বরূপের তাম্রপাত্রে সম্পাদিত এক দানপত্র পাওয়া যায়। এরই আলোকে বলা যায় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় কোনো এক সময় এই বিস্তীর্ণ জনপদের রাজকার্য সম্পাদিত হতো।

একসময় এই কোটালীপাড়াকে বলা হতো ভারতের দ্বিতীয় ‘নৈমিষারণ্য’। এই এলাকাটি ছিল তপস্যা, শাস্ত্রজ্ঞ ও ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত। পশ্চিমবঙ্গে যেমন ভাটপাড়া ও নবদ্বীপ পূর্ববঙ্গে তেমনি বিক্রমপুর ও কোটালীপাড়া। তন্মধ্যে কোটালীপাড়া সমধিক প্রসিদ্ধ। ভূ-প্রকৃতির দিক থেকে বাংলাদেশকে সুস্পষ্ট চার ভাগে ভাগ করা যায়। পশ্চিমে সুবৃহৎ অংশ হলো পুরাভূমি। পূর্ববাংলা নবভূমি। এটি পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা ও মেঘনা দ্বারা সৃষ্ট। বাকি প্রায় সমস্ত অঞ্চল জলীয় সমতল ভূমি বা নবগঠিত ভূমি, এতে আবার দুটি অংশ সুস্পষ্ট। ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, ত্রিপুরা ও শ্রীহট্টের গঠন পুরাতন, এবং খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী ও সমতল চট্টগ্রাম নতুন। প্রায় খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর পূর্বে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়ার নাম ছিল ‘নব্যাবকাশিকা’। নদ-নদী দ্বারা ভাঙা গড়ার ইতিহাস এ অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই অঞ্চলটি কখনও জলাময় আবার কখনও নদীগর্ভে। তাই কোটালীপাড়ার ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করা দুষ্কর। কোটালীপাড়ার নামকরণ কবে থেকে প্রচলন হয়েছে তাও সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। এখানে ষষ্ঠ শতকে প্রাপ্ত একটি লিপিতে চন্দ্রবর্মন কোট বলে একটি দুর্গের উল্লেখ আছে। সামরিক প্রয়োজনে এই দুর্গটি গড়ে উঠেছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। সেই কোট হতে কোটালীপাড়া নাম করণ হতে পারে বলে অনেকে ধারণা করেন। (কোট = দুর্গ, আলি = শ্রেণি, পাড়া তৎসংলগ্ন জমিতে বসতি বা লোকালয়)। কোটালীপাড়া নামকরণ সম্পর্কে বেদগ্রামের মাঈনউদ্দীন যে মতামত দিয়েছেন তা এরকম – ‘পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধ আকবর ও শেরশাহের ভ্রাতুষ্পুত্রের মধ্যে সংঘটিত হয়। আকবরের অভিভাবক ছিলেন বৈরাম খাঁ। এ যুদ্ধে মোগলরা জয়লাভ করে। সেই থেকে ভারতবর্ষে মোগলদের ভিত পাকাপোক্ত হয়। পরাজিত পাঠানরা মোগলদের ভয়ে ভীত হয়ে দলে দলে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। পাঠানদের বড় একটি দল উত্তরবঙ্গে যমুনা নদীর তীরে বসতি গড়ে তোলে। সেখান থেকে তারা নিজেদেরকে বিশ গাঁ পাঠান বলে পরিচয় দিত। বাকি আরেকটি ক্ষুদ্র দল পালাতে পালাতে পূর্ব দিকে এমন এক স্থানে আশ্রয় নেয় যেখানে জনমানবের খুবই কম সাড়া মিলতো। যেহেতু তারা যুদ্ধ বিগ্রহ করে পরাজয় বরণ করেছে সেহেতু তাদের কাছে ছিল অস্ত্র। সব সময় তো অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ান সম্ভব নয়। তাই তারা একটি অস্ত্রাগার তৈরি করে সেখানে অস্ত্র রাখার ব্যবস্থা করে। অস্ত্রাগারকে ফার্সি ভাষায় কোত বলে। বিতাড়িত পাঠানরা স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে থাকে। তারা জলের চাহিদা মিটানোর জন্য বড় দিঘি খনন করে। তার একধারে কোত বা অস্ত্রাগার তৈরি করল। দিঘির উঁচু কিনারকে পাড় বা আইল বলা হয়। কোত, আইল এবং পাড় শব্দত্রয় কোতাইলপাড়ে রূপ নিল। তা কালক্রমে কোটালীপাড়া হিসেবে পরিগণিত হয়।

কোটালীপাড়ার দুর্গটি পূর্ববঙ্গের বৃহত্তম দুর্গ বলে চিহ্নিত। ইংরেজ আমলে গোপালগঞ্জের এই কোটালীপাড়াটি কখনও খুলনা জেলার সহিত, কখনও বরিশালের সহিত, আবার কখনও ফরিদপুরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোটালীপাড়ার ‘চন্দ্রবর্মণকোট’ ইতিবৃত্তের দৃষ্টিকোণে খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক এতে খুঁজে পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, ‘দুর্গটি চন্দ্রবর্মণের এই রূপ উল্লেখটি সমাচারদেবের তাম্রপত্রের সহিত শেষ যোগসূত্র। এই চন্দ্রবর্মন কে ছিলেন? যিনি কোটালীপাড়া দুর্গের জন্য সমাচারদেবের সময় পর্যন্ত স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছেন? এই দুর্গটির আয়তন দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে আড়াই মাইল। ইহা বাংলাদেশের বৃহত্তম মৃত্তিকা-নির্মিত দুর্গ বলে পরিচিত। ‘মহাস্থান দুর্গটি আকারে ইহার পরবর্তী স্থান পাইতে পারে। ইহার আয়তন মাত্র ১০০০-১৫০০ গজ। এই মহাপরাক্রমশালী চন্দ্রবর্মন কে ছিলেন—যিনি নিম্নভূমিতে এই রিবাট দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিলেন—যাহার প্রাঙ্গণ হইতে গুপ্ত সম্রাটদের মুদ্রাগুলো ক্রমশ আবিষ্কৃত হইতেছে? ইহা আমাদের ‘মেহারুল’ স্তম্ভে খোদিত চন্দ্রের কথা তৎক্ষণাৎ মনে করাইয়া দেয় যে, চন্দ্র তাহার সম্মিলিত শত্রুর বিরুদ্ধে বঙ্গদেশে যুদ্ধ করিয়াছিলেন এবং যাহারা তাহার তরবারি দ্বারা তাহার যশ ঘোষিত করিয়াছিল। এই লিপির প্রাচীনত্ব সমন্ধে Fleet জোর দিয়াছেন, অথচ তাহার কোনো তারিখ দেন নাই এবং Allan তাহার স্বাভাবিক অন্তর্দৃষ্টির সহিত এই চন্দ্রই যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত—এই মতবাদটি অগ্রাহ্য করিয়াছেন। অবশেষে মহামহোপাধ্যায় হর প্রসাদশাস্ত্রী বলিয়াছেন যে, ‘সুসুনিয়া পর্বতে খোদিত পুষ্ককরণ-এর সিংহ বর্মার পুত্র চন্দ্রবর্মণই এই চন্দ্র-যে চন্দ্রবর্মণকে সমুদ্রগুপ্ত চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দের তৃতীয় দশকে বঙ্গদেশ হইতে বিতাড়িত করেন। যখন আমরা দেখি যে, প্রাচীনবঙ্গের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এক বিরাট দুর্গের আকারে এক অপরূপ স্মৃতিসৌধ এবং ষষ্ঠ শতাব্দীতেও চন্দ্রবর্মার নাম হইতে উল্লেখিত হইয়াছে—তখন আমরা সেই বিদ্বান ব্যক্তিদের মতবাদ বিশ্বাস করিতে পারি। তাহারা বলিয়াছেন যে, ‘মেহারুল’ স্তম্ভে নামাঙ্কিত চন্দ্র এবং চন্দ্র একই ব্যক্তি। চন্দ্রবর্মার বঙ্গদেশে আগমন এবং তাহার এই দুর্গের আরম্ভের তারিখ মোটামুটিভাবে ৩১৫ খ্রিষ্টাব্দ বলা যায়।

স্বাভাবিকভাবেই মনে এই প্রশ্ন উদিত হয়—এই নিম্ন এবং জলাভূমিতে এই বিরাট দুর্গ কিরূপে নির্মাণ হইল? ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী মহাশয় এই প্রশ্নটি উপলদ্ধি করিয়াছেন এবং তাহার একটি ব্যাখাও দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে বর্তমানে কোটালীপাড়া বহু মাইল বিস্তৃত জলাভূমি দ্বারা বেষ্টিত; কিন্তু ইহা চিন্তা করা যায় না যে, একজন স্থির মস্তিষ্ক মানুষ এইরূপ স্থানে রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পরিকল্পনা করিবেন; কিন্তু এই বৃহদাকার দুর্গটি সেখানে রহিয়াছে এবং এই জলাভূমিতে প্রায়ই ইস্টক নির্মিত গৃহাদির ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যাইতেছে। Pargiter এবং অন্যান্যরা অনুমান করিতেছেন—এই নিম্ন জলাভূমি ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট হইয়াছে। এই ভূমিকম্পের সময় সম্বন্ধে অনুমান করা যায় যে, ধর্মাদিত্যের রাজত্বকালে একটি নতুন শহর গড়িয়া উঠিতেছিল; কিন্তু ইহা তাহার রাজত্বের তৃতীয় বৎসরে বিদ্যমান ছিল বলিয়া মনে হয় না। লেখক এখানে ‘ঘাঘরহাটি তাম্রপত্রে উল্লেখিত ‘নব্যকশিক’ অথবা প্রাদেশিক রাজধানীর কথা বলিয়াছেন। কিন্তু তিনি অনুমানে ধর্মাদিত্যের একটি সময় নির্দেশ করিয়া বলিতেছেন যে, ধর্মাদিত্যের রাজত্বের পঞ্চম বা ষষ্ঠ বর্ষে একটি ভূমিকম্প হয়। বিগত আড়াই শতাব্দীর রাজ পরিবারের বাসস্থানের চতুর্দিক জলাভূমিতে পরিণত হইতে লাগিল এবং শাসন দপ্তরের প্রধান বিভাগগুলো অন্যান্য নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত করিবার প্রয়োজনীয়তা উপস্থিত হইল। কোটালীপাড়া অবশ্য ‘ডিস্ট্রিক্ট’ হেড কোয়ার্টস হিসেবেই রহিল; কিন্তু ইহার জমির মূল্য এইরূপ কমিয়া গেলো যে, প্রায় সমগ্র গ্রামটি এক ব্রাহ্মণকে দান করা হইল। সমাচারদেবের তাম্রপত্রে এই গ্রাম সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, এই গ্রামে নিম্ন জলাভূমি আছে।’

বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ

জাতির পিতার কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা অনেক পূর্ব থেকেই জাতির পিতার সমাধিস্থল সংস্কারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যে স্থানে বঙ্গবন্ধুর স্নেহশীল পিতা মরহুম শেখ লুৎফর রহমান ও রত্নগর্ভা মাতা মরহুমা সায়রা খাতুন-এর সমাধিস্থল তার পাশেই বঙ্গবন্ধুকে সমাহিত করা হয়। পূর্বে অযত্ন ও অবহেলার এক নিদর্শন ছিল এ স্থানটি। এ স্থানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমাধিসৌধ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর একক উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি ট্রাস্ট’। ট্রাস্টের মাধ্যমে ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাছাড়া এ সময় টুঙ্গীপাড়ায় সমাধিস্থলে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থানে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে উল্লিখিত প্রকল্পগুলো প্রথমে সম্পূর্ণ বেসরকারি পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে এ পরিকল্পনাগুলো প্রথমবারের মতো সরকারি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালের ২৫ নভেম্বর ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমাধিসৌধ’ নামে একটি বিশেষ প্রকল্প ‘একনেক’ (ECNEC)-এ অনুমোদিত হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে টুঙ্গীপাড়ার শান্ত, সমাহিত প্রকৃতি ও পরিবেশকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৯৯ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিনে এই প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়নকালে টুঙ্গীপাড়ার শোভাময়, শাশ্বত গ্রামীণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে কোনো জমকালো, উঁচু ইমারত গড়া হয়নি। সাধারণ মানুষ যেন স্বাচ্ছন্দ্যে নির্বিঘ্নে ঘুরে ফিরে সমাধি কমপ্লেক্স এলাকা ‘দেখতে পারে তার দিকে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাছাড়া শব্দ দূষণ থেকে সমাধিস্থলকে মুক্ত রাখার জন্য পূর্বের খাল বরাবর গ্রামীণ রাস্তার পরিবর্তে টুঙ্গীপাড়া উপজেলা থেকে পাটগাতী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত একটি বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করা হয়।

সমাধিসৌধটি নির্মাণের জন্য সর্বমোট ৩৮.৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১৭১১.৮৮ লক্ষ টাকা। ঠিকাচুক্তি অনুযায়ী এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। তফসিল মোতাবেক কাজ সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২০০১ সালের ১৭ মার্চ।

সমাধিসৌধটি দুটি সমাবেশ অঙ্গন সমন্বয়ে বিন্যস্ত। এর একটি প্রার্থনা ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। আর অন্যটি জনসমাবেশ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। এ দুটি এলাকাকে একটি সংযোগ সড়ক দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে। সংযোগ সড়কের দু’পাশে আবহমান গ্রামীণ পরিবেশ বজায় রাখা হয়। এমনকি পুরোনো বাড়ি ও হিজলগাছ এখনও সেখানে দৃশ্যমান।

(ক) সমাধিসৌধ অঙ্গন : মূল সমাধিকে মাঝখানে রেখে সমাধিসৌধ প্রাঙ্গণটি নিম্নোক্তভাবে নির্মাণ করা হয় :

১. বঙ্গবন্ধু ও তাঁর বাবা-মায়ের সমাধি সমন্বয়ে মূল সমাধিসৌধ।

২. মূল সমাধিসৌধ ঘিরে উন্মুক্ত চত্বর। এখানে একসঙ্গে শত শত লোক একত্র হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন।

৩. উন্মুক্ত চত্বরের চারদিক ঘিরে প্রাচীর এবং আগত দর্শনার্থীদের জন্য প্রার্থনা ও বিশ্রামের নিমিত্ত প্রাচীর-সংলগ্ন ছাউনি।

৪. দ্বিতল-বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন। এর প্রথম তলায় দর্শনার্থীদের বিশ্রাম স্থান। দ্বিতীয় তলায় সমাধি কমপ্লেক্সের অফিস।

৫. দ্বিতল বঙ্গবন্ধু ভবন। মূলত যা এখন বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে।

(খ) জনসমাবেশ অঙ্গন : এ অঙ্গনটি নিম্নে বর্ণিত কাঠামোসমূহের সমন্বয়ে গঠিত-

১. সমগ্র অঙ্গনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রধান ফটক। এটি জনসমাবেশ অঙ্গনের মধ্য দিয়ে সমাধিসৌধ অঙ্গনে যাওয়ার জন্য প্রধান প্রবেশ পথ।

২. সমাধিসৌধ অঙ্গনের সকল তথ্য সম্বলিত একটি তথ্য কেন্দ্র। এর পাশে আছে একটি গার্ডরুম। যা পুরো এলাকার নিরাপত্তা প্রহরীদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

৩. একটি স্যুভেনির কর্নার। যেখানে দর্শনার্থীদের জন্য দেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন রাখা হয়েছে।

৪. প্রসাধনী ও সাজসজ্জা সম্বলিত একটি উন্মুক্ত মঞ্চ (Amphi Theatre )।-এর গ্যালারিতে প্রায় ৪০০ লোকের স্থান সংকুলান হচ্ছে।

৫. একটি গবেষণা কেন্দ্র। যা একটি পাঠাগার এবং একটি অস্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষ নিয়ে গঠিত।

৬. একটি মসজিদ (পাকা প্রাঙ্গণসহ) যেখানে আনুমানিক ৭০০ লোক এক সঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন।

৭. একটি ক্যাফেটেরিয়া। এখানে দর্শনার্থীরা তাদের আহারাদির সুবিধা পাবেন। ক্যাফেটেরিয়া-সংলগ্ন একটি প্রসাধনী কক্ষ। এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

৮. জনসমাবেশ অঙ্গনের মাঝখানে একটি ২০০ ফুট ২০০ ফুট উন্মুক্ত চত্বর। এটি বৃহৎ আকারের জনসমাবেশের জন্য এখন ব্যবহার করা হয়।

(গ) অন্যান্য সুবিধাদি : ১. সমাধিসৌধ অঙ্গনটি একটি ৪০ ফুট প্রস্থ এবং ৬০০ ফুট দীর্ঘ পায়ে হাঁটাপথ দ্বারা জনসমাবেশ অঙ্গনের সঙ্গে সংযুক্ত। হাঁটাপথটি সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এ পথে হাঁটলে দর্শনার্থীদের মাঝে একটি ছায়া-সুনিবিড় গ্রামীণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে হাঁটার অনুভূতি জাগে। ২. মূল ফটকের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ৭০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ দৃষ্টিনন্দন সমাধিসৌধের মূল পরিকল্পনাবিদ ও কাণ্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তিনি জানতেন। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ সমাপ্তি পর্যন্ত এসব কিছুর মূল অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনার ধ্রুবতারা ছিলেন তিনি। বস্তুত তার দৃঢ় প্রত্যয় ও সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের কারণেই আজ আমরা বাঙালি জাতির বীরত্ব-গাঁথার অনন্য প্রতীক হিসেবে এই সমাধিসৌধের বাস্তবায়ন দেখেছি। সমাধিসৌধকে কেন্দ্র করে জাতির পিতার অনন্য জীবন ও ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরার একটি অসামান্য আবহ তৈরি করা হয়েছে।

এ সমাধিসৌধ বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও দেশপ্রেমের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এ সমাধিসৌধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশা, সাহস ও চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

এ প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষক কর্তৃপক্ষ (Sponsor) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়নকারী সংস্থা ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ মল্লিকের নেতৃত্বে মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার্স সার্ভিসেস। এ প্রকল্পের উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান ভিত্তি স্থপতি বৃন্দ লি.। প্রধান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট বিল্ডার্স লি.-সহ আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠান। জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব পালন করে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের উদ্বোধনি অনুষ্ঠান হয় ১০ জানুয়ারি ২০০১ সালে। উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সুন্দর পৃথিবীতে মহান স্রষ্টা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রেরণ করেছেন সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য। মহান আল্লাহ তার অশেষ অনুগ্রহ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ আমাদের উপহার দিয়েছেন। টুঙ্গীপাড়ার এক টগবগে, দীর্ঘদেহী, দুরন্ত বালককে দিয়ে স্রষ্টা তার পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন এটাই অতি স্বাভাবিক।

১০ জানুয়ারি ২০০১ সালে সমাধিসৌধের এম্পিথিয়েটারে উদ্বোধনি অনুষ্ঠান হয়। সেদিন টুঙ্গীপাড়ার সুনীল আকাশ ছিল এ অনুষ্ঠান দেখার জন্য আনত। সজল মাটি ও সবুজ প্রকৃতিতে তখন পিন-পতন নীরবতা। অতিথিরা সকলে আসন গ্রহণ করেছেন। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক একজন কবির অবিনাশী পক্তি বলে অনুষ্ঠান শুরু করলেন :

‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;
তাঁরই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি
চোখে নীলাকাশ বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।’

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র এক জায়গায় লিখেছেন তিনি একবার আগ্রার সেকেন্দ্রায় চিরনিদ্রায় শায়িত সম্রাট আকবরের সমাধি দেখতে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘এই সমাধিস্থান তিনি নিজেই ঠিক করে গিয়েছিলেন। দিল্লি থেকে শুরু করে অনেক রাজা-বাদশার সমাধি আমি দেখেছি, কিন্তু সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধির ভাবগম্ভীর ও সাদাসিধে পরিবেশটা আমার ভালো লেগেছিল। সমস্ত জায়গাটা জুড়ে অনেক রকমের গাছপালায় ভরা, ফল ও ফুলের গাছ। সমাধিটা সাদা পাথরের তৈরি।’ এ জগৎ বিচিত্র ও রহস্যময়। বাদশাহ আকবরের সমাধির ভাব গম্ভীর ও সাদাসিধে পরিবেশ দেখে বঙ্গবন্ধু মুগ্ধ হয়েছিলেন। শাহাদাতের অমরলোক থেকে বঙ্গবন্ধুও দেখবেন তার সুযোগ্য কন্যা পিতার জন্য যে সমাধি করেছেন তার সামগ্রিক পরিবেশটি ভাবগম্ভীর ও সাদাসিধে। সমস্ত অঙ্গন জুড়ে নানা রকমের গাছপালা ও ফল-ফুলের মেলা। আর সাদা পাথরে বাঙালি জাতির অশ্রুজল।

কোর্ট মসজিদ

জেলা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে কোর্ট মসজিদ অবস্থিত। ১৯৮৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর খাজা নাজিমউদ্দিন মসজিদটির শুভ উদ্বোধন করেন। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক কাজী গোলাম আহাদের উদ্যোগে মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদটিতে আছে সুউচ্চ একটি মিনার। আরও আছে বৃহৎ আকারের প্রবেশ গেটসহ একটি সুদৃশ্য বড় গম্বুজ ও দুটি ছোট গম্বুজ।

বঙ্গবন্ধুর সমাধির স্মৃতিফলক জেলা শহরে সার্বজনীন কালীমন্দিরটি অবস্থিত। স্থাপিত ১৯১৮ সালে। নব্বই দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত কালীপূজা উপলক্ষে একমাসব্যাপী মেলা হতো। এই ঐতিহাসিক মেলাটি এখন আর হয় না। সার্কাস ও যাত্রাগান ছিল মেলাটির প্রধান আকর্ষণ। প্রাক্তন উপজেলা চেয়ারম্যান ধীরেন্দ্রনাথ বাগচীর যাত্রার দল ছিল তার মধ্যে অন্যতম। মন্দিরটিতে অন্যান্য দেব-দেবীর বিগ্রহও রক্ষিত আছে। গোপালগঞ্জ জেলায় এটি কেন্দ্রীয় মন্দিরের মর্যাদা লাভ করেছে।

থানাপাড়া মসজিদ

থানাপাড়া মসজিদটি জেলা শহরের প্রথম মসজিদ। খেলাফত আন্দোলন, অসযোগ আন্দোলন ও ‘৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এই মসজিদটি ছিল অত্র এলাকার মুসলমানদের একটি মিলন কেন্দ্ৰ। মিছিল শেষে শত শত মুসলমান এই মসজিদটিতে সমবেত হতেন। বক্তৃতা ও অনুষ্ঠান শেষে মাটির গ্লাসে ঘোল ও চিনির সরবত দিয়ে প্রত্যেককে আপ্যায়ন করা হতো।

মাতৃতীর্থ

১৩৭১ বঙ্গাব্দে মাতৃভক্ত নিশিকান্ত বিশ্বাস মায়ের স্মৃতিচারণে ‘মাতৃতীর্থ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার নিজ গ্রাম গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার করপাড়ায় এটি অবস্থিত। প্রতিবছর ২২, ২৩ ও ২৪শে পৌষ সেখানে কবিগান হয়। কবিগানের অনুষ্ঠানে অসংখ্য হিন্দু-মুসলমান ভক্ত যোগদান করে পিতামাতাকে শ্রদ্ধাভক্তি করার শিক্ষা পেয়ে থাকে। এই আসরেই বাউল কবি বিজয় সরকারকে চারণ কবি সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত সাম্প্রতিক কালের একজন প্রখ্যাত চারণ কবি ও লেখক নিশিকান্ত সরকার, সাং- আট্টাকি, উপজেলা-ফকিরহাই, জেলা-বাগেরহাট। তিনি জানান, ‘দেশ বিদেশ বিভিন্ন জায়গায় কবিগান গেয়ে বেড়াই। কিন্তু করপাড়ার এই ‘মাতৃতীর্থ’ আসরের মতো আর হয় না। কারণ এই মাতৃতীর্থে পড়েছে মহামানব ও অধ্যাত্মবাদী চারণ কবিদের পদরেণু। সর্বোপরি এটা যে একজন মাতৃভক্ত সন্তানের রচিত আসর। একি মন্দ হতে পারে? আমি আসরটিতে প্রায় ৩৮ বছর কবিগান গেয়ে যাচ্ছি। আমিও গর্বিত। এই ‘মাতৃতীর্থ’ কবিগানের আসরটি এলাকাবাসীর কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে থাকবে।’

বানিয়ারচরের ক্যাথলিক চার্চ

গোপালগঞ্জ জেলায় দু’টি বিখ্যাত চার্চ রয়েছে। একটি মুকসুদপুর উপজেলা বানিয়ার চরে। অপরটি কোটালীপাড়া উপজেলায় নারিকেল বাড়িতে। চার্চ দুটিতে যথারীতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি ও জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে ফাদার তাবেজ্জা সর্বপ্রথম গোয়ালন্দ থেকে বানিয়ার চরে আসেন। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে কয়েকটি পরিবার ক্যাথলিক মণ্ডলীভুক্ত হয়। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র পরিত্রাতার গির্জা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে জেভিরিয়ান ফাদারগণ ধর্মপল্লির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ফাদার মারিও ভেরোনেসি সেন্ট মাইকেল জুনিয়র হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান গির্জার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ৩ জুন রবিবার দিন পবিত্র আত্মার পর্ব দিনে খ্রিস্টযোগ চলাকালীন সময়ে বোমা বিস্ফোরণে ১০ জন খ্রিস্টান ভক্তের মৃত্যু হয়। এখানে উপধর্ম পল্লির সংখ্যা রয়েছে ৫টি। কর্মরত ধর্ম সংঘ এসএমআরএ। শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেন্ট মাইকেল জুনিয়র হাইস্কুল, ছেলেদের হোস্টেল ও ডিসপেন্সারি উল্লেখযোগ্য।’ চার্চের বর্তমান ফাদার জন গোপাল বিশ্বাস ও ফাদার কমল খাঁ।

সিদ্ধান্ত বাড়ি শিবমন্দির

কোটালীপাড়া উপজেলায় সিদ্ধান্ত বাড়ি নামক স্থানে এই শিবমন্দিরটি অবস্থিত। লোকদের কাছে এটি ‘বুড়া ঠাকুর’ মন্দির নামে পরিচিত ছিল। প্রায় দু’শ বছর ধরে চৈত্র মাসের ২৯ তারিখে এখানে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে আসছে।

৭১-এর বধ্যভূমি

মহান মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জের রয়েছে অবিস্মরণীয় অবদান। অগণিত মানুষ প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করে গেছে তাদের বীরগাথা। হানাদার বাহিনী গোপালগঞ্জে তৎকালীন থানা পরিষদে (সিও অফিসে) তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। এটি ক্যান্টনমেন্ট নামে পরিচিত ছিল। জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে তারা এখানে হত্যা করত। সেই ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন পুকুরের পাড় ছিল তাদের কসাইখানা। পুকুরটি বাংলা পুকুর নামে পরিচিত। নাম জানা-অজানা বহু মুক্তিযোদ্ধার গণকবর রয়েছে পুকুরটির আশে-পাশে। পরবর্তীকালে পুকুরটি ভরাট করে শহিদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। গোপালগঞ্জ জেলার এটিই ‘৭১-এর বধ্যভূমি।

অন্যান্য প্রাচীন নিদর্শন : গোপালগঞ্জের অন্যান্য প্রাচীন নিদর্শনের মধ্যে কোটালীপাড়া চন্দ্রভর্মা কোট (কোটাল দুর্গ), দক্ষিণা কালীবাড়ি, বহলতলী মসজিদ, মথুরানাথ এজি চার্চ, ধর্ম রায়ের বাড়ি, ওড়াকান্দি শ্রীহরি মন্দির আড়ুয়াকংশুর কালী মন্দির, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ঐতিহাসিক ঘটনাবলি : ঘাঘর নদীর তীরে মোগল সম্রাট আকবরের সঙ্গে বাংলার সুলতান নুসরত শাহর যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের প্রথমদিকে এ অঞ্চলে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ হয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে কোটালীপাড়ার বান্দাবাড়ি গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস শহিদ হন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে শহিদ হন জলিরপাড় গ্রামের মহানন্দ বিশ্বাস।

মনসা মন্দির

কোটালীপাড়ার সবচেয়ে বড় মনসা মন্দিরটি গচাপাড়া গ্রামে। গ্রামের মাঝখানে প্রায় ৩০০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল মনসা মন্দির। কালের আবর্তে মন্দিরটি একাত্তর সালে প্রায় ধ্বংস হয়ে পড়ে। সাতচল্লিশে উপমহাদেশ বিভক্তির সময়ে ধনী হিন্দু পরিবারগুলো কলকাতায় চলে যাবার কারণে মন্দিরটি শ্রীহীন হয়ে পড়ে। পুরোনো ইটের তৈরি মন্দিরটি তখন কেউই মেরামতের জন্য এগিয়ে আসেনি। তবুও ক্ষয়ে যাওয়া মন্দিরটিতে প্রতি বছর সর্পদেবী মনসার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা উপলক্ষে সেকালে দেবীর নামে ওই স্থানটিতে বসতো মনসা মেলা। এই মেলায় হিন্দুরা ছাড়াও অন্যধর্মের লোকেরা আসতো। অনেকে মনসা দেবীকে তুষ্ট রাখার জন্য ঘট ভরে দুধ-কলা নিয়ে আসতো। মনসার শক্তি সাপ। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি বহুল প্রচারিত থাকায়, সাধারণত সাপের ভয়ে মনসাকে দুধ-কলা দিয়ে খুশি রাখার ব্যবস্থা করতো। মনসা পূজা উপলক্ষে মন্দিরের সামনে আটচালা টিনের ঘরে অনুষ্ঠিত হতো বেহুলা-লখিন্দরের পালা। সাতটি পালা সাত রাতে শেষ হতো। পুরোনো মন্দিরটি ছিল বেশ বড়। কিন্তু বেশ ক’বছর আগে এটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বসে পড়েছে। বর্তমানে এই মন্দিরটির পশ্চিম পাশেই একটি আধাপাকা ঘরে স্থাপন করা হয়েছে মনসা দেবীকে। এটিই এখন মনসা মন্দির। এখানে প্রতিদিন ভক্তরা দুধ-কলা দিয়ে মনসাকে প্রণাম জানায়।

হরিনাহাটি জমিদার বাড়ি

কোটালীপাড়ার একটি অন্যতম গ্রাম হরিনাহাটি। উপজেলা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই গ্রামটি। এই গ্রামটির দক্ষিণ পাশে বয়ে গেছে একটি খাল ও হালে তৈরি করা পাকা সড়ক।

এই গ্রামটির ইতিহাস ঐতিহ্য অনেকের অজানা। গ্রামের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়টি সচ্চিদানন্দ ইনস্টিটিউশন নামে জেলায় সুপরিচিত হলেও এটি যে এককালে জমিদার বাড়ি ছিল, তা এই প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন এই গ্রামেরই ধনী ব্যক্তি সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য। সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য বাড়ি নির্মাণকালে কলকাতায় ঠিকাদারির ব্যবসা করতেন।

ব্যবসার অর্থেই তিনি স্বগ্রামে পুকুর-দিঘিসহ দালান-কোঠা নির্মাণ করেন। একপর্যায়ে তিনি বান্ধাবাড়ি ও হরিনাহাটি মৌজায় জমিদারি ক্রয় করে জমিদার বনে যান। তার বিপুল অর্থ সম্পদ উপার্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস। তিনি অ্যান্ট্রাস পাস করে শূন্য হাতে কলকাতায় যান এবং সেখানে ময়মনসিংহের অসিত রায় চৌধুরীর সহকারী হিসেবে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি অসিত রায় চৌধুরীর কলকাতার বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন এবং মিলের ১/৪ শতাংশ মালিকানা লাভ করেন। এরপর থেকেই তার অর্থলাভের দুয়ার খুলে যায়। প্রথমেই তিনি গ্রামে প্রাসাদের মতো বাড়ি নির্মাণ করেন এবং জমিদারি ক্রয় করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্যের বাবা প্রসন্নকুমার ভট্টাচার্য ছিলেন একজন পণ্ডিত মানুষ। বেদান্ত-তীর্থ খ্যাতি ছিল। হরিনাহাটি ছিল তাঁর শ্বশুর বাড়ি। মূল বাড়ি উপজেলা সদরের কাছে ফেরদারা গ্রামে। এ গ্রামে তিনি বিয়ে করে একটি সংস্কৃতির টোল খোলেন। ৪৭- এ উপমহাদেশ বিভক্ত হলে সচ্চিদানন্দ পরিবার দালান বাড়ি ও বাড়ি সংলগ্ন বিপুল জমি রেখে কলকাতায় স্থায়ী হন এবং অল ইন্ডিয়া টেক্সটাইলের সভাপতি নির্বাচিত হন। আর এরই মাঝে পিতা প্রসন্ন কুমার ভট্টাচার্যের স্মৃতি রক্ষায় মূল বাড়িটিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সবকিছু দান করে দেন। স্থানীয় জনগণের ইচ্ছায় তার নামেই সচ্চিদানন্দ ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠিত হয়। সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য ছিলেন জনদরদি, দানশীল ব্যক্তি ও অসাম্প্রদায়িক। শত বছর হলেও গোপালগঞ্জের মানুষ তাকে ভুলে যায়নি।

বহলতলী পাঁচশো বছরের মসজিদ

প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ কোটালীপাড়া। এক সময়ের জলাভূমি কালের আবর্তে স্থলভূমিতে পরিণত হয়। রাজা চন্দ্রবর্মন কোটালীপাড়ায় দুর্গ নির্মাণ করে রাজধানী স্থাপন করেন।

বহলতলীর ফতেশাহ নির্মিত মসজিদ

আগে থেকেই কোটালীপাড়া হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। বাংলায় ইসলাম ধর্ম ও শাসন বিস্তারের ফলে এর প্রভাব পড়ে কোটালীপাড়ায়। কথিত আছে, সেকালে ৩৮১জন আউলিয়ার বাংলায় আসার ফলে ইসলাম বিস্তার ঘটে। আর এরই ধারাবাহিকতায় কোটালীপাড়া গমন করেন আউলিয়া ফতেশাহ মাহমুদ। তিনি কোটালীপাড়ার মূলকেন্দ্র বাণিজ্যস্থান ঘাঘর ছেড়ে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে বহলতলী গ্রামে একটি অজগাঁয়ে আস্তানা গাড়েন এবং এই গ্রামেই ১৫৪৩ অথবা ১৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনগম্বুজ বিশিষ্ট একটি লাল ইটের মসজিদ নির্মাণ করেন। গত ৪ থেকে ৫ শত বছর ধরে এই মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিল ফতেশাহ মাহমুদের উত্তরাধিকারীগণ। বর্তমানে এই গ্রামে যারা শিকদার পদবী ধারণ করে আছেন, তারাই ফতেশাহ’র বংশধর। দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটি জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দেশের পুরাকীর্তিসমূহ সংরক্ষণ করলেও এই মসজিদটির প্রতি দৃষ্টি দেয়নি। এহেন অবস্থায় কিছুদিন পূর্বে গ্রামবাসী নিজেদের বিবেচনায় বাংলার প্রাচীন সম্পদ বা পুরোনো কীর্তি এই মসজিদটিকে ভেঙে ফেলেন এবং ওই স্থানে একটি সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেন। পাঁচশো বছরের মসজিদটির স্মৃতি এখন ছবিতে দৃশ্যমান।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পিতৃভিটা

সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি। তিনি ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন। আমাদের অনেকেই জানেন না সুকান্ত ভট্টাচার্যের পিতা নিবারণ চন্দ্র ভট্টাচার্য এবং তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি কোটালীপাড়ার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম উনশিয়ায়।

আনুমানিক ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে সুকান্ত ভট্টাচার্যের পিতা ও কাকারা মাদারীপুরে চলে যান এবং সেখানে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পূজার সময় তারা গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসতেন। ঘর-বাড়ি-পুকুর তখন তাদেরই দখলে ছিল। উপমহাদেশে

সুকান্তের পিতুভিটায় নির্মিত গ্রন্থাগার ও মিলনায়তন

আন্দোলন শুরু হলে নিবারণ চন্দ্র ভট্টাচার্য ভাইবোনদের নিয়ে মাদারীপুর ত্যাগ করে আনুমানিক ১৯২০ সালে কলকাতায় পাড়ি জমান এবং সেখানে বই ব্যবসা শুরু করেন সারস্বত প্রকাশনী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর উনশিয়ায় তারা ফিরে আসেননি কিংবা কারও কাছে জমি ও বাড়ি বিক্রি করেননি। কয়েক বছর পর বাড়ি ও পুকুর খাস জমিতে পরিণত হয়। ‘৪৭ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাড়ি ও পুকুর বিভিন্নজন দখলে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। একজন তো সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাবা- কাকার স্বাক্ষর জাল করে জমি ক্রয় করেন এবং ঘরবাড়ি উঠিয়ে বসবাস শুরু করেন। এভাবে চলে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এ নিয়ে লেখালেখি হলেও বাড়িটি দখলমুক্ত করা যায়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাড়িটি দখলমুক্ত করা হয়। অবৈধদের ঘর ছাড়া করা হয়। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ছিয়ানব্বইয়ে অবৈধদের তাড়ানো হলেও সেখানে সুকান্তদের পরিবারের নামে কোনো কিছু করা সম্ভব হয়নি। প্রায় ৭-৮ বছর বাড়িটি উন্মুক্ত থাকে। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সুকান্ত ভট্টাচার্যের পূর্বসূরিদের স্মৃতি রক্ষায় একটি প্রকল্প গৃহীত হয়। এই প্রকল্পের অধীনে মূল ভিটায় সুকান্ত লাইব্রেরি কাম অডিটোরিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এটি জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত। জেলা পরিষদের নিয়োজিত একজন তত্ত্বাবধায়ক এটি দেখাশোনা করছেন। সুকান্তের নামে গ্রন্থাগার ও মিলনায়তনটি উপজেলা সদর থেকে উনশিয়ার একদম ভেতরে অবস্থিত। পশ্চিমপাড়া শেখ লুৎফর রহমান সরকারি কলেজ হয়ে অথবা সিকির বাজার হয়ে অতি সহজেই পাকা সড়কে এটি প্রদর্শন করা যায়।

নারিকেলবাড়ি সাধ্বী তেরেজা ক্যাথলিক মিশন

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত গৌরনদী ক্যাথলিক মিশন থেকে পরিচালনা করা হতো বর্তমানে কোটালীপাড়ার নারিকেল বাড়িতে অবস্থিত স্বাধ্বী তেরেজা ক্যাথলিক মিশনটি। তখন কানাডিয়ান ফাদার হ্যারোল সিএসসি, ফাদার ডেরোসি, ফাদার ল্যারোস সিএসসি পর্যায়ক্রমে মিশন পরিচালনা করেন। এরপর আনুমানিক ১৯২০ সাল থেকে স্থানীয় কয়েকজন খ্রিস্টান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় মিশনটি স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে থাকে।

খ্রিস্টের বাণী প্রচার করার উদ্দেশ্যে চার্চের ফাদাররা প্রতি রবিবার সাপ্তাহিক প্রার্থনা পরিচালনা করেন। খ্রিস্টের ঐশী বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। নারিকেল বাড়ি মিশন হাই স্কুলটি সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। এ-ছাড়া শুরু থেকেই দাতব্য চিকিৎসা বিশেষ করে মা ও শিশু পুষ্টির কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। ‘সাধ্বী তেরেজা মাতৃসদন’ নামে ক্লিনিকটি ধাত্রী সেবায় সুপরিচিত। অসহায় ও দুঃস্থদের সেবায় বিশেষ করে দুর্যোগ পরবর্তী সাহায্যে মিশনটির সুনাম রয়েছে।

নারিকেলবাড়ি সাধ্বী তেরেজা ক্যাথলিক মিশন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এখান থেকে ‘আগুন’ নামে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা বিশেষ পত্রিকা বের করা হয়। আগস্টের ২১ তারিখে পাক হানাদাররা রাজাকারদের সহায়তায় মিশনটির উপর হামলা করে। হানাদাররা মনে করতো মিশন মুক্তিবাহিনীর আশ্রয়দাতা ও সংগঠক। তখনকার মিশন পরিচালক ফাদার ডেমার্স সিএসসি এবং বিশপ যোয়াকিম হানাদারদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বড় দিন এখানে আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে ২৫শে ডিসেম্বর যিশু খ্রিস্টের জন্ম হয় মানব জাতির মুক্তির উদ্দেশ্যে। এই দিনটি ‘বড় দিন’ হিসেবে পালন করে খ্রিস্টানরা। এ-ছাড়া প্রতি রোববার খ্রিস্ট ভক্তগণ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে। বর্তমানে মিশনটি ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংগঠন পরিচালনা করছে। নারিকেল বাড়ি খ্রিস্টান ক্রেডিট ইউনিয়ন তার মধ্যে একটি।

শান্তি কুটির

কোটালীপাড়ার দুটি খ্রিস্টীয় মিশন গত দেড়শো বছর ধরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এরমধ্যে ভুয়ার পাড়ের শান্তি কুটির ও নারিকেলবাড়ির সাধ্বী তেরেজা ক্যাথলিক মিশন অন্যতম। শান্তি কুটিরটি ব্যাপটিস্ট মিশনারী। খ্রিস্টীয় ধর্মের মহান বাণী প্রচারের পাশাপাশি এই মিশনটি দেড় শতাধিক বছর ধরে জনকল্যাণমূলক নানা ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

মিশনটি সম্ভবত ১৯১২ সালে বাংলা গদ্যের জনক উইলিয়াম ক্যারির অনুরাগী জনৈক পাদ্রী প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিশনটি একটি মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত। একটি বড় পুকুরের চারপাশে দাতব্য চিকিৎসালয়, প্রার্থনালয় ও অন্যান্য দপ্তর। মিশনটি পরিচালনা করেন একজন পালক। এটি তত্ত্বাবধান করে গোপালগঞ্জ মাদারীপুর আঞ্চলিক ব্যাপিস্ট চার্চ সংঘ। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমানসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষ এই মিশনটি থেকে নানা ধরনের সেবা পেয়ে আসছে।

রজনীর আস্তানা

রজনী ছিলেন কোটালীপাড়ার চিত্রাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি গত হয়েছেন প্রায় ৫০ বছর হলো। কিন্তু তার আস্তানাটি এখনও টিকে আছে। বাড়ির উঠোনেই আস্তানাটি 1 এখনও প্রতিদিন সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানো হয়। আস্তানাটি একসময় দেখাশোনা করতেন তার স্ত্রী ও ছেলেরা। এখন নাতি-পুতিরা। এরা হলেন-সোনা মিয়া, আবদুর রহমান। আবদুর রহমান রজনীর নাতি। এই আস্তানায় প্রতিবছর ৯ চৈত্র উরশ অনুষ্ঠিত হয়। সারারাত গান বাজনার আয়োজন করা হয়। ধলপহরে আগতদের খাওয়ানো হয়। এ উপলক্ষে বাড়ির পাশে ছোটখাটো মেলা বসে। উল্লেখ্য, এই আস্তানার খাদেমরা ঢাকার নবাবগঞ্জের প্রখ্যাত দরবেশ শাহ লাল (রহ.)-এর অনুসারী।

রজনীর আস্তানায় গানের আসর

ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি

কাশিয়ানী উপজেলায় ওড়াকান্দি গ্রামে হরিচাঁদ ঠাকুরের লীলাভূমি ‘ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি’ নামে পরিচিত। হিন্দুদের কাছে এটি অন্যতম একটি তীর্থস্থান।

ঠাকুরবাড়ি

প্রতিবছর চৈত্র মাসে মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে ঠাকুরের জন্ম তিথিতে অসংখ্য হরি ভক্ত মতুয়া নাম ধারণ করে যোগদান করে। হরি মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে যে পুকুরটি আছে সেটি কামনা সাগর নামে পরিচিত। এই যোগতিথিতে মতুয়া ভক্তরা কামনা সাগরে স্নান করে পুণ্য লাভ করে। এটি মহাবারুণী মেলা নামে খ্যাত। প্রায় সপ্তাহব্যাপী চলে এই বারুণীর মেলা।

কাশিয়ানী থানার মহাশ্মশান

কাশীয়ানী গ্রাম নিবাসী স্বর্গীয় বাবু সখীচরণ রায় মহাশয় নিজ গ্রামে শ্মশান প্রতিষ্ঠার জন্য ১৮৮৫ সালে ৮৫ শতাংশ জমি দান করেন। সেই জমির উপর ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্মশানটি। এখানে শবদাহ করার সুবিধার্থে ইট নির্মিত ও লোহার পাত্রের বেদি আছে। প্রায় ২০-৩০টি গ্রামের হিন্দুরা শব দাহ করার কাজে ব্যবহার করে থাকে এই শ্মশানটি। এমনকি নিকটতম বোয়ালমারি থানার হিন্দুরাও শব দাহ করে এই শ্মশানে। চিতাভষ্ম যাতে নিকটবর্তী নদী বারসিয়াতে চলে যেতে পারে সে মতো ব্যবস্থা আছে শ্মশানে।

এখানে প্রতিষ্ঠিত আছে দুর্গামন্দির, কালীমন্দির, গোবিন্দমন্দির ও বারোয়ারি মন্দির। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ছাড়াও রথ যাত্রার মেলা, জন্মাষ্টমীর উৎসব হয়। প্রতি বৃহস্পতিবারে পালিত হয় হরি বাসর উৎসব। এখানে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ৫ দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় নাচ-গানের অনুষ্ঠান। এই পাঁচ দিনই চলে ভক্তদের খাবারের ব্যবস্থা। চাউল ব্যয় হয় কম করে ৪০ থেকে ৫০ মন। সমস্ত ব্যয় বহন করে পোনা, পিঙ্গুলীয়া, কাশিয়ানী গ্রামবাসী ও কাশিয়ানী উপজেলা বাজার কমিটি।

শ্মশানের যাবতীয় কাজ পরিচালনার জন্য ২১ সদস্য বিশিষ্ট শ্মশান কমিটি আছে। যার নাম মহাশ্মশান কমিটি। কমিটির সভাপতি নিযুক্ত আছেন উত্তম কুমার রায় এবং সম্পাদক আছেন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস।

বিদ্যাধর গ্রামের নামকরণ

বিদ্যা+আধার=বিদ্যাধর। এখানে পূর্বে বহু শিক্ষিত লোকের বাস ছিল। যেমন-ষষ্টিচরণ কীৰ্ত্তনীয়া। যিনি পণ্ডিত মহাশয় নামে খ্যাত। আরও ছিলেন রাজেন্দ্র পণ্ডিত, কুঞ্জু পণ্ডিত প্রমুখ। এদের মধ্যে ষষ্টিচরণ পণ্ডিত তৎকালীন সময়ে বরিশাল থেকে মাইনর পাস করেন। অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালানোর লক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে পাঠশালা তৈরি করেন। নিজ গ্রামেও শিক্ষার জন্য পাঠশালা খোলেন। ষষ্টিচরণ কীৰ্ত্তনীয়া সভা, সমিতি, মিলিয়া পরগণার সভায় সভাপতিত্ব করতেন বিধায় ব্রিটিশ সরকার ষষ্টিচরণ কীৰ্ত্তনীয়াকে সরকার উপাধি দেন। সেখানে থেকে এই কীৰ্ত্তনীয়া বংশ সরকার বংশ নামে খ্যাত হয়। যখন এ অঞ্চলে কোনো শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না, কোনো অক্ষরজ্ঞান ছিল না তখন এই গ্রামেই বাস করতেন গোটা কয়েকজন শিক্ষিত লোক। তাই ব্রিটিশ সরকার এই গ্রামের নাম দেন বিদ্যাধর

বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ভজন কুটির

১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ বাংলা ১২৪৮ সনের শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন যাত্রা। এই পবিত্র রজনীর প্রত্যুষে প্রভুপাদ শ্রীশ্রী বিজয়কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আনন্দ চন্দ্ৰ গোস্বামী, মাতা স্বর্ণময়ী দেবী। ‘স্বর্ণময়ী দেবী বলেছেন, ‘বিজয়, আমার অন্য ছেলের মত জন্মায়নি। সে যখন আমার গর্ভস্থ হয়, তখন তার পিতা আমাকে বীর্যদান করেননি। তিনি কেবল ইচ্ছা করেছিলেন আমার গর্ভসঞ্চার হোক। তাঁর এই ইচ্ছাশক্তির প্রভাবেই আমি গর্ভধারণ করেছিলাম। বিজয় যখন আমার গর্ভে ছিল, সূর্যের রশ্মির মতো আমি রাধা-কৃষ্ণ দর্শন করতাম।’ মহাপুরুষগণ প্ৰয়োজনেই পৃথিবীতে আসেন। আবার কর্ম সমাপন করে চলে যান। পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), ভগবান রামচন্দ্র, শ্রীচৈতন্য, মহাত্মা যিশু, শংকরচার্য, গুরু নানক প্রমুখ সকলেই সংকটকালে পৃথিবীতে আগমন করে ধর্ম পিপাসু নর-নারী উদ্ধার করে গেছেন। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী কঠোর তপস্যা করেছেন বনে- জঙ্গলে। আবার সংসারও করেছেন তিনি। কঠোর-তপস্যা বলে তিনি সন্ধান পেয়েছেন পরম ব্রহ্মের। এই মহান পুরুষের শিষ্যত্ব লাভ করেছেন হাজার হাজার জনগণ। তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে, তাঁর কৃপায় ধন্য হয়েছেন তারা। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী, কিরণচাঁদ দরবেশ ও জগবন্ধু গোস্বামী। বিজয়কৃষ্ণের কৃপায় ধন্য কিরণচাঁদ দরবেশজী ১৯৩০ সালের শ্রাবণ মাসে ঝুলন পূর্ণিমা ও রটন্তিকা কালীপূজার দিন (ঐ সালে) জ্যোৎকুরা গ্রামে আশুতোষ বিশ্বাস মহাশয়ের বাড়িতে আগমন করেন।

বলা প্রয়োজন যে, এই আশুতোষ বিশ্বাস পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিয়েছিলেন ওকালতি ব্যবসা। ওকালতিতে প্রতিপক্ষকে ঠকাতে বিভিন্ন অপকৌশল ও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় মর্মে নিজেকে ধিক্কার দেন এবং ওকালতি ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন।

শত শত জনগণ কিরণচাঁদ দরবেশজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালে এই হৃদয়বান নিজ বাড়িস্থ ৬ শতাংশ জায়গা যেখানে কিরণচাঁদ দরবেশজী বসেছিলেন, সেখানেই নির্মাণ করেন কৃষ্ণ ভজন কুটির। অবশ্য গুরুর কথামতো বিজয়কৃষ্ণ ভজন কুটির নামকরণ করেন। এখানে প্রশ্ন যে কিরণচাঁদ দরবেশজী নামকরণ কেন হলো?

কিরণচাঁদের পিতা ছিলেন বড় জমিদার। এই মহান মনের অধিকারী ও মহান পুরুষ তাঁর পিতার নিকট থেকে প্রাপ্ত সমস্ত জমিদারি জনগণের মধ্যে বিতরণ করে প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী সর্বত্যাগী কিরণচাঁদের নামের শেষে দরবেশ যোগ করে দেন। সেখান থেকেই তিনি কিরণচাঁদ দরবেশজী নামে খ্যাত।

পরবর্তীকালে কিরণচাঁদ দরবেশজীর কৃপাধন্য ও আশীর্বাদপুষ্ট অসীমানন্দ স্বরসতী প্রভু নিজ গুরুদেবের পদচারণ ভূমি জ্যোৎকুরা গ্রামে আশুতোষ বিশ্বাস মহাশয়ের বাড়িতে আসেন এবং এই বাড়িটিকে নতুন আর এক তীর্থস্থান বলে ঘোষণা দেন। পরে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভুর আশ্রিত আশীর্বাদপুষ্ট বাবাজীর শিষ্য সতীপ্রসন্ন সেন এবং আশীর্বাদধন্য অনাদি জ্ঞান সরকারের শিষ্যত্ববরণ করেন। কিরণচাঁদ দরবেশজী, অসীমানন্দ স্বরসতী, কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী ও অনাদী জ্ঞান সরকারের বহু শিষ্য এখানে আছেন। তাদের সদ্ইচ্ছায় ও গুরুর প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিবেদনে আশুতোষ বিশ্বাস মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ভজন কুটির আঙ্গিনায় প্রতিবছর শ্রাবণী পূর্ণিমায় ও রটন্তিকা কালীপূজার সময় নাচ-গান, গুরুর জীবনাদর্শ ও উপদেশবাণী আলোচনা করা হয়। সারাদিন মহোৎসবের অনুষ্ঠান করে থাকেন ভক্তরা।

খলিশাখালী সাধনকেন্দ্ৰ

খলিশাখালী সাধন কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কাশিকৃষ্ণ ঠাকুর। আদি নিবাস ছিল গোপালগঞ্জ সদর অন্তর্গত রাউৎখামার গ্রাম। পেশায় ছিলেন কৃষিজীবী। ছেলেমেয়ে প্রত্যেকের সংসার প্রত্যেককে বুঝিয়ে দিয়ে লোকটি বেরিয়ে পড়েন অসীমের সন্ধানে। তিনি কালীর সাধক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরনে থকতো দুইটা গামছা। একটা পরিধানের, অন্যটা গায়ে। হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর; সিঁদুরের চিহ্নটি ছিল নাকের থেকে চুল পর্যন্ত প্রায় এক ইঞ্চি চওড়া করে। ঘুরেছেন দেশে-দেশে, হিন্দু-মুসলমান সকলেই ভালোবাসতো এই গৃহত্যাগী ঠাকুরকে। শেষ পর্যন্ত তিনি আস্তানা করলেন কাশিয়ানীর খলিশাখালীতে। জড় হতে থাকে আরও সন্ন্যাসী। আশ্রমের যাবতীয় খরচ চলে কালেকশনের মাধ্যমে। সব সম্প্রদায়ের লোকেরা সাহায্য করে এই আশ্রমে। প্রথমেই তৈরি হয়েছে পূজা মন্দির। মন্দিরটি ইটের তৈরি অর্ধ পাকা। একই আকারের এরকম আরও মন্দির করা হয়েছে। যেমন বাসুদেব মন্দির, কালী মন্দির ও দুর্গা মন্দির। নিয়মিত পূজা হয় এখানে। ঠাকুররা এবং দূরের লোকজন থাকেন আলাদা ভবনে। আর একটা দালান আছে অনাথ আশ্রম নামে। মেধাবী গরীব ছাত্রদের আশ্রমের খরচে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। সকাল সন্ধ্যা নাম চলে এখানে। একটি মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ফলকও আছে। এই গৃহত্যাগী মানুষটি ১১১ বছর বয়সে গত ২৩-০২-১২ তারিখে নিত্যধামে গমন করেন। বর্তমানে গ্রাম কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আশ্রমটি পরিচালিত হচ্ছে।

জ্যোকুরা জামে মসজিদ

‘জ্যোৎকুরা পূর্বপাড়া জামে মসজিদ প্রায় ৩৫০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তীকালে এখানে অনেক মসজিদ তৈরি হয়েও ম্লান করতে পারেনি এই মসজিদটিকে। দশ জনের সাহায্যেই চলে মসজিদটির ব্যয় নির্বাহ। বহুপূর্ব থেকেই এই গ্রামে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই বাস করে। গ্রামে প্রায় ৪০০ গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রিপ্রাপ্ত লোক আছে। তাদের মধ্যে বহু লোক বহির্বিশ্বে কাজে নিয়োজিত আছেন। গ্রামে উভয় সম্প্রদায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। গ্রামের মসজিদে ছাত্রদের পড়ার জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা আছে। জমজমাটভাবেই মসজিদটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামে একটি কালীমন্দিরও আছে। মাঘ মাসে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা শেষে কবিগান হয়ে থাকে। পূর্বে এখানে খুব নামকরা চারণ কবিরা গান গেয়েছেন। যেমন-নিশিকান্ত সরকার, নকুল সরকার, পাগল বিজয় সরকার, অনাদি জ্ঞান সরকার, রসিক সরকার প্রমুখ। মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণে মুসলমানরা সচেষ্ট থাকেন।

ছোট বাহির বাকপুরান মসজিদ

ছোট বাহিরবাক শরিফ বাড়িতে প্রায় দুইশত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটি। গ্রামের ধনাঢ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তির ঘাটতি নেই। পাশেই ছিল জমিদার শ্রেণির তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। তাদের বদৌলতেই গড়ে উঠেছে এ গ্রামের কৃষ্টি-কালচার। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, পূর্ব-পুরুষ প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটি যেন দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধবেশে লাঠি ভর করে। সে যেন তাকিয়ে আছে বর্তমান প্রজন্মের দিকে। গ্রীষ্মের রোদে পুড়ে যেন খাঁক হয়ে গেছে। তার গায়ে কিছু দেওয়ার নেই। যে যুগে মানুষ চাউল পুড়িয়ে, কালি বানিয়ে লিখতো সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত এই ইট নির্মিত মসজিদটি। এর কি কেউ নেই। অবশ্য মো. ইদ্রিস আলী মিয়া উদ্যোগী হয়েছেন মসজিদটির সংস্কারের দিকে। হাত বাড়াচ্ছেন তিনি প্রত্যেকের সহযোগিতা পেতে। আশ্চর্যের বিষয় আজও এখানে বহু মানুষ নামাজ আদায় করে। জুম্মার নামাজ হয় এখানে। হয় প্রতি বছরের সেই ওয়াজ- মাহফিলও। হাজার হাজার মুসল্লি যোগ দেয় ওয়াজ শুনতে। হিন্দুরাও আসে এখানে। তারা জানে মাহফিলে ভালো কথাই আলোচনা হয় যা শিক্ষণীয় সবার জন্য।

লক্ষ্মীপুর কালী মন্দির

জনশ্রুতি আছে যে, এই লক্ষ্মীপুর গ্রামে লক্ষ্মী দিঘা ধান প্রচুর হতো। জমির ধরন লক্ষ্মী দিঘা ধান হওয়ার উপযুক্ত। কোনো অভাব এখানে থাকতো না। ঘরে ঘরে হতো লক্ষ্মীপূজা জমজমাটভাবে। লক্ষ্মীপূজার সময় তৎকালীন এক জমিদার দেখতে আসেন এই গ্রামটিকে। তিনি এসে দেখলেন প্রতিঘরে লক্ষ্মীপূজা হচ্ছে। তখন জমিদার বলে ওঠলেন এ যে লক্ষ্মিতে ভরপুর। তিনি এলাকাটির নামকরণ করেন লক্ষ্মীপুর। সেখান থেকে গ্রামের নাম হয় লক্ষ্মীপুর।

এই গ্রামে আছে একটি কালীমন্দির। ১০ শতাংশ জমির উপর মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দির কমিটির প্রধান নিখিল চন্দ্র বর এবং সুবোধ দাস। গ্রাম থেকে হার তুলে পূজা করা হয়। মাঘ মাসের ১৫ তারিখের পর যে মঙ্গলবার, সেই মঙ্গলবারে পূজা হয়। ধান মৌসুমে গ্রাম থেকে ধান সংগ্রহ করা হয় মন্দিরের উন্নয়নের জন্য। পূজা শেষে এখানে মেলা মেলে। মন্দিরের দক্ষিণ পাশের বাড়িতে হরিচাঁদ ঠাকুর নিজ হাতে একটি তমাল গাছ রোপণ করেন। এখনও গাছটি আছে। আওয়ামী লীগ নেতা মুকুল বোস গাছের গোড়া পাকা করে বাঁধাই করে দিয়েছেন। মাঘ মাসে মহোৎসব হয়। অগনতি লোকের সমাগম হয় এখানে।

সার্বজনীন কালী মান্দির

রামাদিয়া সার্বজনীন কালী মন্দিরটি দুইশত বছর পূর্বে ১১ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত, যার বর্তমান দাগ নং ৩৭০। বহু ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি। শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পোহাতে হয়েছে বেশ কয়েকবার এই মন্দিরটিকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় রাজাকার কর্তৃক ধ্বংস হয় মন্দিরটি। হিন্দুরা দেশে ফিরে আবার প্রতিষ্ঠিত করে এটিকে। এরপরেও একবার মন্দিরের গায়ে আগুন লাগানো হয়। কিন্তু আগুনও যেন সম্মান দেখালো মন্দিরটিকে। আগুন ধরেনি সেদিন। আজও সে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন এর অবস্থা খুবই ভালো। কোনো ঝামেলা নেই। প্রত্যেকেই যেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। চোখে পড়লেই মন কেড়ে নেয়। প্রতি বছর মাঘ মাসের দ্বিতীয় শনিবারে পূজা হয় এখানে। মন্দিরে বিগ্রহ আছে রক্ষা চণ্ডী, শীতলা দেবীর।

সীতারামপুর কালীমন্দির

প্রায় ২৫০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এই কালীমন্দিরটি। মন্দিরের কেবলই পূর্ব পাশে চন্দ্ৰ বালা নামে এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম টিন দ্বারা মন্দিরটি তৈরি করেন।

মন্দিরের চতুর্পার্শ্বে এখন মুসলমানদের বাস। মন্দিরের নিকট কোনো হিন্দু নেই। যারা আছে তারা মন্দির থেকে অনেক দূরে। কিন্তু এই গ্রামে মুসলমানরা বেশি নজর রাখে মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও পূজা পরিচালনার দিকে। প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম শনিবারে বাৎসরিক পূজা হয়। এখানে পূজার দিন রাতে বা সকালে উভয় সম্প্রদায়ের লোকই উপস্থিত হয়। দেখা যায় মুসলমানরাও মানত শোধ করে। পূজা শেষে আরম্ভ হয় কবিগান। দুইদিন ব্যাপী চলে এই অনুষ্ঠান।