ক. নামকরণ ও প্রতিষ্ঠা
গোপালগঞ্জের নামকরণ নিয়ে একাধিক কিংবদন্তি আছে। যার নামে এই গোপালগঞ্জ জেলা গড়ে উঠেছে তা জানার কৌতূহল সবার মনে সাড়া দেয়। ষষ্ঠ শতকে গোপচন্দ্ৰ নামে এক রাজা এই জনপদে রাজত্ব করতেন। তার রাজধানী ছিল বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলায়। এই গোপচন্দ্রের নামে যে গোপালগঞ্জের নামকরণের সূত্রপাত হয় এই কিংবদন্তিতে অনেকের সংশয় আছে।
অন্য আর একটি জনশ্রুতি থেকে অবগত হওয়া যায়, বহুপূর্বে এই জনপদের নাম ছিল ‘রাজগঞ্জ’। এই রাজগঞ্জ ছিল প্রমত্ত মধুমতী নদীর একটি পারঘাটা। নদীটির এপার ওপারের লোকজন এই পারঘাটায় যাতায়াত করতো, এবং জড়ো হতো। বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট সৃষ্টি হতে থাকে এই পারঘাটায়। কোনো এক সময় তা পরিণত হলো গঞ্জে। সে থেকে এর নাম হয় ‘রাজগঞ্জ’। এই অঞ্চলটি ছিল জলময়। শাপলা, শালুক, পদ্মফুলে ঢাকা থাকতো বিলঝিল। তার মাঝে মধুমতী নদীতে প্রবল স্রোত। প্রাকৃতিক পরিবেশের এ এক অপূর্ব লীলাভূমি। বিলেঝিলে মিলে অসংখ্য মাছ। এই কারণে এখানকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকাংশ ছিল মৎস্যজীবী। গোপাল নাম হতে যে গোপালগঞ্জের নামকরণ হয়েছে এই মতের সমর্থক বেশি। কিন্তু কে সেই গোপাল? মকিমপুর পরগণার জমিদারিত্বের দায়িত্বে ছিলেন রানি রাসমণি। তিনি বাস করতেন কলকাতায়। জমিদারি দেখাশোনা করার জন্য প্রায়ই তিনি এই জলময় অঞ্চলে ছুটে আসতেন। একদা তিনি তার আদরের নাতি গোপালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। গোপাল কলকাতায় শহুরে সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছে। নদী বহুল ও জলময় এই পূর্ববঙ্গ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। রাজগঞ্জ পারঘাটায় পানসি থেকে নেমে সে দেখতে পেল এক নতুন জগৎ। আনন্দে আত্মহারা হলো। যেদিকে তাকায় কেবলই জল থৈ থৈ দৃশ্য। বিলময় ফুটে আছে শাপলা, পদ্ম। সবমিলিয়ে গোপালের খুবই পছন্দ হলো এই রাজগঞ্জটি। রানি রাসমণি তার সেই প্রিয় নাতির ভালোবাসার জায়গাটাকে স্মৃতির পাতায় অক্ষত রাখার জন্য রাজগঞ্জের ‘রাজ’-এর পরিবর্তে ‘গোপাল’ শব্দটা যুক্ত করে করলেন ‘গোপালগঞ্জ’।
অন্যমতে, ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে তুর্কি আক্রমণের প্রাক্কালে কতিপয় হিন্দু প্রাণ ভয়ে এবং ধর্মান্তরিত হওয়ার আশঙ্কায় ভারতের বিহার প্রদেশের গোপালগঞ্জ জেলা থেকে গৌড় দেশ হয়ে বঙ্গদেশের খরস্রোতা নদী মধুমতীর পূর্ব তীরে নল-নটা জলভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। কালক্রমে সেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তাদের আদিনিবাস গোপালগঞ্জকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এ অঞ্চলের নামকরণ করে গোপালগঞ্জ। আরেক তথ্য অনুযায়ী, ১৭৫৭ সালে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করার সময় বাংলার নবাব সিরাজদৌলা ইংরেজদের একেবারে কোণঠাসা করেন। তারা কলকাতা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপর ১৮৫৭ সালে ব্যারাকপুর সেনানিবাসে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়। উত্তর প্রদেশের মিরাট থেকে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। মোগল সম্রাটের দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, তাতিয়া টোপী প্রমুখ নেতৃত্বে থাকেন। এই বিদ্রোহে মঙ্গল পাণ্ডে প্রথম শহিদ হন। একদল ইংরেজ বণিক মগধ, গৌড়দেশ, নদীয়া পেরিয়ে প্রাণের ভয়ে আরও পূর্বদিকে ঢুকে পড়ে। পূর্বাঞ্চল ছিল জলময় নল-নটার দেশ। কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের লোকেরা সংখ্যায় ছিল বেশি। তারা আশ্রয় নেয় এসব নিভৃত অঞ্চলে। এলাকার কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের লোকেরা ওই বণিকদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করতে থাকে। বণিকরা প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তার করে কোনো এক সময় তাদেরকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কিছু প্রতিদান গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাদের ভিতর ছিল না কোনো শিক্ষার আলো। চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই বলে তারা জানিয়ে দেয়। ঐ কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের ভিতর একজন নারী ছিল খুবই বুদ্ধিমতী। নাম রানি রাসমণি। সবাই বলল, যদি কিছু দিতে ইচ্ছা হয় তবে ওই রাসমণিকেই দিয়ে যান। বণিকেরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রানি রাসমণিকে খড়িয়াল, মোকিমপুর, বেলকুলা, নদ্দী তেলিহাটি, মিঠাপুর ও সাহাপুর পরগণার জমিদারিত্ব দান করেন। রানি রাসমণির এক নায়েব ছিল। নায়েবের প্রতি ছিল রানি রাসমণির অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা। ওই নায়েবের এক প্রোপৌত্রের নাম নব গোপাল। রানি রাসমণি নব গোপালের নৈতিকতা ও অসাধারণ প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন। আগে এলাকাটির নাম ছিল ‘রাজগঞ্জ’। তিনি নব গোপালের নামটি স্মৃতির পাতায় অক্ষত রাখার জন্য রাজগঞ্জের পরিবর্তে গোপালগঞ্জ নামকরণ করেন। গোপালগঞ্জের যাত্রা সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে বলে কথিত।
আয়তন : প্রায় ১৪৮৯.৯২ বর্গ কি.মি.।
জনসংখ্যা : গোপালগঞ্জের সর্বমোট জনসংখ্যা ১১৪৯০০০, পুরুষ ৪৯.২৬%, মহিলা ৫০.৬৫%; মুসলমান ৬৩.৬১%, হিন্দু ৩৬.১৩%, খ্রিস্টান ১.২০%, বৌদ্ধ ০.৫২% ও অন্যান্য ০.০৩%। শিক্ষার হার ৪৬%।
১৯৭২ সালে ৯টি ওয়ার্ড ও ৪৯টি মহল্লা নিয়ে এই পৌরসভা গঠিত হয়। আয়তন ৮.৫৯ বর্গ কি.মি.।
জেলা সৃষ্টি ১৯৮৪ সালে। উপজেলা ৫টি। যথা : গোপালগঞ্জ সদর, কাশিয়ানী, মুকসুদপুর, টুঙ্গীপাড়া ও কোটালীপাড়া। জাতীয় সংসদে আসন ৩টি। পৌরসভা ৪টি, ইউনিয়ন ৬৮, গ্রাম ৮৮০, ওয়ার্ড ৩৬, মহল্লা ৮৫ ও মৌজা ৬১৮টি।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে বঙ্গদেশের কথা বলতে গেলে ১১৯৪ খ্রিষ্টাব্দের পৃথ্বিরাজের পরাজয়ের পর মুসলমানদের কনোজ রাজ্য অধিকারের কথা স্মরণ করে দেয়। মগধ জয় করার পর মুসলমানগণ ১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গরাজ্য আক্রমণ করে। বঙ্গদেশের বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলাটি আগে ছিল ফরিদপুরের অংশ বিশেষ। সংগত কারণে বৃহত্তর ফরিদপুরের ইতিবৃত্তও এই জেলার ইতিবৃত্তেরই অবয়ব।
অধুনা ফরিদপুর জেলা নিয়ে এমনও জনশ্রুতি আছে যে, এই এলাকাটি জলমগ্ন ছিল। নল-নটায় থাকত আচ্ছন্ন। বসবাসের জন্য তা ছিল একেবারে অনুপযুক্ত। ফতেহ আলী নামে একজন মুসলমান অনেক কষ্ট ক্লেশ করে এটিকে বাসযোগ্য করে তোলেন। সে থেকে এর নাম হয় ফতেয়াবাদ। এই ফতেয়াবাদই ফরিদপুর নামে পরিচিত। অন্যমতে, ফরিদপুর নাম ফরিদ খাঁ নামের এক ফকিরের নাম থেকে হয়েছে বলে কথিত। চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে ফরিদপুর জেলা পূর্ব বাংলার অন্যান্য অংশের সাথে মুসলমানদের অধীন হয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাসের নিদর্শন এখনও এই জেলায় দেখা যায়, যথা-কেদার রায়ের কীর্তি পরিখা বেষ্টিত কেদারবাড়ি এবং ভূষণা থানার কেল্লা বাড়িতে সীতারাম রায়ের দুর্গের ধ্বংসাবশেষ।
ইংরেজ আমলে ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর একটি স্বতন্ত্র জেলা হয়ে ওঠে। মূলত তিনটি জেলার সমন্বয়ে ফরিদপুর জেলার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। ঢাকা জেলার যেসকল অংশ · বিচ্ছিন্ন হয়ে ফরিদপুরের সাথে মিশেছে তা বিক্রমপুরের দক্ষিণাংশ। যশোর জেলার যেসকল অংশ এসেছে তা ভূষণা ও ফতেয়াবাদ। আর বাকরগঞ্জ (বর্তমান বরিশাল) জেলা থেকে যে অংশ এসে মিশেছে তা কতক জলময় সদৃশ। জেলা সৃষ্টির আগে বঙ্গদেশে ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে যখন রাজস্ব নির্ধারণ করা হয় তখন তার নাম ছিল ‘আমল তুমার জুমা’। এটি চালু করেন বাদশা আকবর। তিনি সমগ্র বঙ্গদেশকে ১৯টি সরকারে বিভক্ত করেন। প্রত্যেকটি গঠিত হয় কয়েকটি পরগণা নিয়ে। তখন বঙ্গদেশে মোট পরগণার সংখ্যা ছিল ৬৮২টি। এরমধ্যে গোপালগঞ্জের সাহাপুর পরগণার নাম ছিল না। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ সমগ্র বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশে জেলা পদ্ধতি চালু হয়। সেসময়ে জেলার সংখ্যা ছিল মাত্র ২৩টি। ওই সময় বর্তমানের ঢাকা, বরিশাল ও ফরিদপুরের অধিকাংশ স্থান ঢাকা-জালালপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে জনগণের কল্যাণ ও প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ঢাকা- জালালপুর জেলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। দক্ষিণ অংশের নাম বাকরগঞ্জ। এর অব্যবহিত পরে বর্তমান গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে থানা সৃষ্টি হয়। এ সময় গোপালগঞ্জ ও তার পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণাংশের বহুগ্রাম যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মধুমতীর তীরে অবস্থিত গোপীনাথপুর ও চন্দ্রদিঘলিয়া ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। গোপীনাথপুর একটি থানা সৃষ্টি হয়। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জে একটি সাবডিভিশন স্থাপিত হয়। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ডিসেম্বর কলকাতা গেজেটের ৩৭০০ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন অনুসারে তৎকালীন মধুমতী নদীর পূর্বতীরে অবস্থিত গোপালগঞ্জের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে যে সমস্ত গ্রাম যশোর জেলার মধ্যে ছিল, যথা : কঠি, ভোজরগাতি, কন্দপগাতি, বাঘাজুড়ি, কাঁড়ারগাতি, খানারপাড়, কালা গোপীনাথপুর, কুড়ানটোলা, গোপালপুর খেলনা, ডালিনা, রায়পাশা, কাটরবাড়ি, ভূতিরিয়া, খাগবাড়ি, মানিকহার, দুর্গাপুর, গড়াই গাতি, আড়পাড়া, খাগাইল, বাজুনিয়া, বরইহাটি, মাঝিগাতি, রঘুনাথপুর, শ্রীরামকান্দি, গওহর ডাঙ্গা প্রভৃতি তা বাকরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে মধুমতী নদীকে যশোর জেলার পূর্ব সীমানা স্থির করে দেওয়ায় গোপালগঞ্জ বাকরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সময়ে রেভিনিউ সার্ভে শেষ হয়। রেভিনিউ সার্ভেয়ারগণ ফরিদপুর ও বাকরগঞ্জ জেলার একটি নতুন সীমানার লাইন ঠিক করে দেন। তা গভর্নমেন্ট কর্তৃক গৃহীত হয়ে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা গেজেটে প্রকাশিত হয়। এরফলে বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার যে সমস্ত গ্রাম বাকরগঞ্জ জেলার মধ্যে ছিল তা ফরিদপুরের অন্তর্ভুক্ত হয়। সাহাপুর পরগণাও ফরিদপুরের মধ্যে এলো। কিন্তু গোপালগঞ্জে তখনও থানা সৃষ্টি হয়নি। এই স্থানসমূহ গোপীনাথপুর থানার অন্তর্ভুক্ত হলো। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমানা এভাবে ভাঙা-গড়ার মাধ্যমে এগিয়ে চলতে থাকে। তাই গোপালগঞ্জ জেলা সৃষ্টির পেছনে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৮৭০ দশকের পরের ইতিবৃত্ত পর্যায়ক্রমে গোপালগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক সীমানার ভীতকে শক্ত করে তোলে। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে গোপীনাথপুর থানা গোপালগঞ্জে আনা হয়। এই সময়ে ফরিদপুর জেলা ২টি সাব-ডিভিশনে বিভক্ত হয়; একটি সদর ও অপরটি গোয়ালন্দ। সাহাপুর পরগণা (গোপালগঞ্জ থানার সাথে) ফরিদপুর সদর সাব- ডিভিশনের অধীনে থাকে।
১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে বাকরগঞ্জ জেলার মাদারীপুর সাবডিভিশনের গৌরনদী থানা বাদে অবশিষ্ট অংশ ফরিদপুর জেলাভুক্ত করা হয়। এ পর্যন্ত ফরিদপুর জেলার কোনো জজ ছিল না। ঢাকার জজই ফরিদপুর জেলার জজের কাজ করতেন। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নমেন্ট হতে ঢাকার এডিশনাল জজ ফরিদপুরে এসে কোর্ট করবার আদেশ হয়। পরের বছর ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ ফরিদপুর স্বতন্ত্র জজ হয়। ওই বছর (১১ আগস্ট ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) গোপালগঞ্জ থানা মাদারীপুর সাব-ডিভিশন ও মুন্সেফির অধীন. হয়। কয়েক বছর পরে গোপালগঞ্জে প্রথমত রেগুলার (Regular), পরে ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ইন্ডিপেন্ডেন্ট (Indpendent) বেঞ্চ নামে অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটের বেঞ্চকোর্ট স্থাপিত হয়। এইভাবে অনেক বছর চলার পর ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ নভেম্বর তারিখে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী থানা নিয়ে গোপালগঞ্জে ফৌজদারি কোর্ট ও মহকুমা হয়; কিন্তু মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী থানার মুন্সেফ কোর্ট ভাঙাতে এবং কোটালীপাড়া ও গোপালগঞ্জের মুন্সেফি মাদারীপুরেই থাকে। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ সৃষ্ট হলে ঢাকাতে রাজধানী ও স্বতন্ত্র রেভিনিউ বোর্ড স্থাপিত হয়। ওই সময় হতে ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই স্থান ওই প্রদেশের মধ্যে ছিল।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে গোপালঞ্জে মুন্সেফ কোর্ট স্থাপিত হয়। তখন থেকে সাহাপুর পরগণায় দেওয়ানি মোকদ্দমা গোপালগঞ্জ মুন্সেফ কোর্টে হচ্ছিল। এই পরগনার অধিবাসীগণ বিভিন্ন সময়ে এই রূপ বিভিন্ন থানা, মহকুমা, মুন্সেফি, জেলা ও রেভিনিউ বোর্ডের অধীনে বাস করেছে। পূর্বকালে যাতায়াতের যেরূপ অসুবিধা ছিল তাতে দূরবর্তী স্থানে মহকুমা ও মুন্সেফ কোর্ট, জজকোর্ট থাকায় তাদের বহুকষ্ট ও অসুবিধা ভোগ করতে হয়েছে।
এতদূর পথ পরিক্রমার পর অবশেষে ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
জনবসতির পরিচয়
এই ব-দ্বীপ সদৃশ সমতট বঙ্গের দক্ষিণাংশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করলে দেখা যায় এটি ছিল একদা জলধির অংশ বিশেষ। এই বিস্তৃত ভূ-ভাগ দিয়ে সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হতো। উত্তর থেকে বয়ে আসা বিভিন্ন জলরেখা এসে মিশেছে সমুদ্র গর্ভে। সেসব নদী বাহিত পলি কাকড় জমে দক্ষিণ বঙ্গের সুবিস্তৃত অঞ্চল হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে। ভাগীরথী ও পদ্মার প্রবাহ পথ কর্তৃক একূল ভাঙার ও ওকূল গড়ার ইতিহাসের ছোঁয়া লেগেছে এই জনপদটিতে কখনও অরণ্য, কখনও জনপদ আবার কখনও নদীগর্ভে বিলীন। এই ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়েও বাসযোগ্য ভূ-খণ্ড গড়ে তোলার প্রয়াস কখনও থেমে থাকেনি। এই জনপদ নিয়ে পণ্ডিতেরা ধারণা করে থাকেন, ভাঙা-গড়ার পথ মাড়িয়েও প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে থেকে এই জনপদে মানুষ বসবাস করতে শুরু করে। কেউ কেউ মনে করেন তারও বহু বছর আগে এখানে মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভূমিকম্পের ফলে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ক্রমে তা ভরাট হয়ে কোথাও কোথাও স্থলভূমে রূপ নেয় এবং নিচু জলময় অংশ বিল, ঝিল, হ্রদ নামে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এটি কোনো এক সময় মানুষের বাসযোগ্য ভূমি ছিল এমন নমুনা মেলে। যেমন যেখানে কোটালীপাড়া দুর্গ আছে সেই জলময় স্থানে প্রায়ই ইটের তৈরি গৃহাদির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া গোপালগঞ্জ সদর উপজেলাধীন নিজড়া গ্রামের সিদ্দিক মীনা বললেন—’নিজড়া বড় মীনা বাড়িতে আমরা বসবাস করি। এই বাড়ির উত্তর ধারে মাটি কাটতে গিয়ে পোড়ামাটির নিদর্শন ও একটি পুকুর ঘাটের নমুনা পাওয়া গেছে।’ এ বিষয়ে আরও ব্যাপক পরিসরে গবেষণা চালিয়ে গেলে যুক্তিনির্ভর ও তথ্যনির্ভর প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা
আয়তন : ৪১৩.৭৫ বর্গ কি.মি.। উত্তরে মুকসুদপুর, কাশিয়ানী, ও লোহাগড়া। দক্ষিণে টুঙ্গীপাড়া, মোল্লারহাট, পূর্বে কোটালীপাড়া ও রাজৈর, পশ্চিমে মোল্লারহাট, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলা।
প্রধান নদী : মধুমতী ও মাদারীপুর বিলরুট ক্যানাল।
উপজেলা শহর : পৌরসভা সৃষ্টি ১৯৭২ সালে। ৯টি ওয়ার্ড ও ৪৯টি মহল্লা নিয়ে গঠিত | আয়তন : ৮.৫৯ বর্গ কি.মি.।
জনসংখ্যা : মোট ৪০৯৮৭ জন। পুরুষ ৫৩.২৭%, মহিলা ৪৬.৭৩%।
শিক্ষার হার : ৬৬.৯%।
প্রশাসন : সদর থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ সালে। ইউনিয়ন-২০, পৌরসভা ১, ওয়ার্ড ৯, গ্রাম ১৯৬, মৌজা ১২৭টি।
টুঙ্গীপাড়া উপজেলা
আয়তন : ১২৭.২৫ বর্গ কি.মি.। উত্তরে গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া উপজেলা, দক্ষিণে মোল্লারহাট ও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা।
জনসংখ্যা : মোট ৩০৭৪৭ জন। পুরুষ ৫১.০৯%, মহিলা ৪৮.৯১%। জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০১২ জন। শিক্ষার হার ৩৬.১%। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার এ শহরে অবস্থিত।
প্রশাসন : টুঙ্গীপাড়া থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৯৫ সালে। পৌরসভা ১, ইউনিয়ন ৫, গ্রাম ৬৭, মৌজা ৩৪টি।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান : মসজিদ ১৫৫, মন্দির ৫০, গির্জা ১, মাজার ১টি। জনসংখ্যা মোট ৮৮১০২ জন, এরমধ্যে পুরুষ ৫১.২৫%, মহিলা ৪৮.৭৫%। মুসলমান ৬৫.০৫%, হিন্দু ৩৪.৭৪% ও অন্যান্য ০.২১%।
শিক্ষার হার : ৩৩.৩%।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান : পাবলিক লাইব্রেরি ১টি, গ্রামীণ ক্লাব ২৭টি, সিনেমা হলো ১টি, বঙ্গবন্ধু পাঠাগার ১টি, সাহিত্য সমিতি ১টি, পর্যটন মোটেল ১টি, বঙ্গবন্ধু স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্স ১টি।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলি : বাংলা ১৩৬৮ সনে বৌলতলী ইউনিয়নের করপাড়া, বলাকৈড়, তাড়গ্রাম এলাকায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় বহু হিন্দু-মুসলমান নিহত হয়।
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় উফী ইউনিয়নের শসাবাড়িয়ায় মুক্তিবাহিনী এবং পাকবাহিনীর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধে ১০/১২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। পাইককান্দি গ্রামে শান্তি কমিটির সহযোগিতায় পাকবাহিনী প্রায় দেড়শ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন : বধ্যভূমি ১টি।
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব : বীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস (সমাজসেবক), কবিয়াল হরিবর সরকার, কবিয়াল মনোহর সরকার, জ্ঞানেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, নিশিকান্ত বিশ্বাস (মাতৃভক্ত), নারদ বিশ্বাস (ভারতীয় কূটনীতিক)।
জনসংখ্যা : ২,৯১,৪০১ জন। পুরুষ ৫০.৭৩%, মহিলা ৪৯.২৭%। মুসলমান ৬৬.৪৫%, হিন্দু ৩২.৭৫%, খ্রিস্টান ০.৪২%, বৌদ্ধ ০.৪২%, অন্যান্য ০.৩৪%। দৈনিক পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী : দৈনিক যুগকথা, দৈনিক ভোরের বাণী, দৈনিক শিরীন, দৈনিক বাংলার সংকেত, দৈনিক বিশ্বদর্পন; সাপ্তাহিক জনপদের কথা, গোপালগঞ্জ বার্তা (অবলুপ্ত), গোপালগঞ্জ সাহিত্য পত্র, আলোর দিশারী; ও মাসিক মধুমতী (অবলুপ্ত)। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান : ক্লাব-১৫, পাবলিক লাইব্রেরি-১, সিনেমা হল-২, শিশু একাডেমী কমপ্লেক্স-১, শিল্পকলা একাডেমী -১, স্টেডিয়াম – ২টি।
কোটালীপাড়া উপজেলা
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে যেকয়টি স্থানের নাম আমরা খুঁজে পাই তার মধ্যে রাজশাহীর পাহাড়পুর, বগুড়ার মহাস্থানগড় ও কুমিল্লার ময়নামতি সকলের কাছে পরিচিত। কিন্তু এসব স্থানের চেয়েও অতি প্রাচীন জনপদ হচ্ছে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া। ষোলো শ’ বছর আগে অর্থাৎ খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের তৃতীয়পাদে গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত স্থানীয় মহরাজা সিংহবর্মার পুত্র চন্দ্রবর্মাকে যুদ্ধে পরাজিত করে কোটালীপাড়াকে তার সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। চন্দ্রবর্মা তার রাজ্যকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য কোটালীপাড়ায় একটি দুর্গ স্থাপন করেন। দুর্গটির নামকরণ করেন চন্দ্রবর্মা কোট।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে এবং তাম্রশাসন ও স্বর্ণমুদ্রায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। আর এসব তথ্য প্রকাশিত হতে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমে। অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা এই যে, কোটালীপাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন জনপদ হওয়া সত্ত্বেও অদ্যাবধি কোনো সুষ্ঠু গবেষণা ও পুরাকীর্তির অনুসন্ধান করা হয়নি। তাই ইতিহাসের প্রাচীন সভ্যতা মাটিচাপা পড়ে আছে বিল-বাওড়ে ঘেরা কোটালীপাড়া। কোটালীপাড়ায় প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসনের শিলালেখ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা রিভিউ সম্মেলন ও এপিয়াফিয়া ইন্ডিয়া পত্রিকায়। তাম্রশাসনের শিলালেখ উদ্ধার করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী। ড. ভট্টশালী উদ্ধারকৃত তাম্রশাসনটির নাম, সমাচার দেব ঘাগরাহাটী (ঘাঘর হাটী) তাম্রশাসন। এটি প্রকাশিত হলে ঐতিহাসিক মহলে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় তার বাঙ্গালার ইতিহাস গ্রন্থে লেখেন : ‘তাম্রশাসন খানি ফরিদপুর জেলার ঘাগরাহাটী গ্রামে আবিষ্কৃত হইয়াছিল এবং উহা এখন ঢাকার চিত্রশালায় রক্ষিত আছে। ইহা হইতে জানিতে পারা যায় যে, মহারাজাধিরাজ শ্রীসমাচার দেবের রাজ্যকালে নব্যবকাশিকার অন্তরঙ্গ উপরিক শ্রীজীবদত্ত শাসনকর্তা ছিলেন এবং তৎকর্তৃক নিযুক্ত বিষয়পাতি পাবিত্রক বার কমন্তনের শাসনকর্তা ছিলেন এবং এই সময়ে সুপ্রতীকস্বামী নামক এক ব্যক্তি যোদ্ধাধিকরনিক দামুক প্রমুখ বিষয় মহত্তরগণের নিকট একখণ্ড ভূমি ক্রয় করিবার জন্য আবেদন করিয়াছিলেন এবং তদানুসারে তিন কুল্যবাকী পরিমাণ ভূমি তাহাকে বিক্রীত হইয়াছিল। এই তাম্রলিপির উদ্ধার পাঠ বহুবার প্রকাশিত হইয়াছে, তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত পারগিটার (PARGITAR) ও শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত ভট্টশালীর পাঠ অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য।’
কোটালীপাড়ায় প্রাপ্ত অন্যান্য মুদ্রায় গুপ্ত বংশের দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ও স্কন্ধগুপ্তের নাম পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে অর্থাৎ গুপ্তদের পরে গোপাল চন্দ্র দেব, ধর্মাদিত্য ও সমাচার দেবের অধিকারে আসে। যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। পৃথবীর ও সুধন্যদিত্য নামে আরো দুজন নৃপতির নাম বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে অনেকেই মেনে নিয়েছেন যে চন্দ্রবর্মকোট থেকে কোটালীপাড়া নামের উৎপত্তি এবং গোপাল চন্দ্র দেবের নামানুসারে ষষ্ঠ শতকেই গোপালগঞ্জ জেলার নামকরণ করা হয়েছিল। তখন কোটালীপাড়া ছিল বঙ্গের রাজধানী। এ সময় কোটালীপাড়া ছিল নব্যবকাশিকা অঞ্চল অর্থাৎ ‘নতুন জেগে ওঠা ভূমি’ যা সৃষ্টি হয়েছে জলাভূমি থেকে। ড. নীহাররঞ্জন তাই কোটালীপাড়া জনপদকে বলেছেন নৌগামী ব্যবসা বাণিজ্যের সমৃদ্ধ কেন্দ্র। সেন এবং সুলতানি ও মোগল আমলে কোটালীপাড়া জনপদের অস্তিত্ব আগের মতোই ছিল।
বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জেগে উঠেছে বিল বাওড়ের জলাভূমি। দু’শো বছর শাসনকর্তারা থেকেছেন পশ্চিমে, কখনও ঢাকায়, কখনও দিল্লিতে। তারা খাজনা নিয়েই খুশি ছিল। যোগাযোগের কারণেই তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে বার বার। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার পতন ঘটে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে ১৭৬৫ সালে। তখন কোটালীপাড়া রাজশাহীর জমিদারিভুক্ত হয়। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে গোপালগঞ্জের কিছু অংশ ও গোয়ালন্দ পার্শ্ববর্তী যশোর জেলার অধীন হয়। ১৮৫৪ সালে বরিশাল জেলার অধীনে মাদারীপুর মহকুমার সৃষ্টি হয়। ১৮৭৩ সালে বাখরগঞ্জ থেকে মাদারীপুরকে বিচ্ছিন্ন করে ফরিদপুরের অধীনে আনা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ১৮৫৪ সালে মাদারীপুর মহকুমা সৃষ্টির সময় গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়াকে মাদারীপুরের অধীন করা হয়। জেলা হয় বরিশাল। ১৯০৯ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমার সৃষ্টি হয়। কোটালীপাড়া ও মুকসুদপুর এই মহকুমার অধীনে চলে আসে। পরে কাশিয়ানী থানা গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের পরে টুঙ্গীপাড়া থানার সৃষ্টি। এভাবেই বর্তমান গোপালগঞ্জের পরিধি বিস্তৃত।’
আয়তন : ৩৬২.৫০ বর্গ কি.মি.। উত্তরে রাজৈর ও মাদারীপুর সদর উপজেলা, দক্ষিণে নাজিরপুর ও উজিরপুর উপজেলা, পূর্বে আগৈলঝারা, গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলা, পশ্চিমে গোপালগঞ্জ সদর ও টুঙ্গীপাড়া উপজেলা।
উপজেলা শহর : ৫টি মৌজা, ৯টি ওয়ার্ড ও ৮টি মহল্লা নিয়ে গঠিত। পৌরসভা সৃষ্টি ১৯৯৭ সালে। আয়তন ৫.১২ বর্গ কি.মি.। জনসংখ্যা ৪৮২৪ জন, পুরুষ ৫০.৯৫%, মহিলা ৪৯.৫০%। জনসংখ্যার ঘনত্ব ৯৪২ জন। শিক্ষার হার ৩৯.৪%। ডাকবাংলো ১। প্রশাসন : ইউনিয়ন-১২, মৌজা-১০০, গ্রাম-১৯৬।
প্রাচীন নিদর্শন ও প্রত্নসম্পদ : কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (১৮৯৮), বহাতলী সিকদার বাড়ি মসজিদ (৫০০ বছরের পুরাতন)।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলি : রামশীল ইউনিয়নে ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে হেমায়েত বাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে কৃতিত্বের জন্য হেমায়েত উদ্দিনকে বীরবিক্রম উপাধি দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন স্মৃতিস্তম্ভ-১ (১৬ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে)।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান : মসজিদ ১৮৯, মন্দির ২২৫, গির্জা ৩৯, মাজার ১, তীর্থস্থান ২। জনসংখ্যা : ২০৬১ জন, পুরুষ ৫০.৪৮%, মহিলা ৪৯.৫২%। মুসলমান ৪৩.৭০%, হিন্দু ৫৩.০১%, খ্রিস্টান ৩.২৬%, বৌদ্ধ ০.০২%, অন্যান্য ০.০১%।
শিক্ষার হার : ৩৪.৮%। পুরুষ ৪২.২%, মহিলা ২৭.৩%।
কলেজ ও বিদ্যালয় : সরকারি কলেজ ১, বেসরকারি কলেজ ৩, হাইস্কুল ২৯, জুনিয়র হাইস্কুল ৮, প্রাথমিক বিদ্যালয় ১০৪, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪৮, প্রশিক্ষণ কেন্দ্ৰ ১।
কাশিয়ানী উপজেলা
আয়তন : ২৯৯.৬৪ বর্গ কি.মি.। উত্তরে বোয়ালমারী উপজেলা, দক্ষিণে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা, পূর্বে মুকসুদপুর ও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা। পশ্চিমে লোহাগড়া ও আলফাডাঙ্গা উপজেলা।
উপজেলা শহর একটি মৌজা নিয়ে গঠিত। আয়তন ১.৬২ বর্গ কি.মি.। জনসংখ্যা ৪০৩৩ জন, পুরুষ ৫২.৬৯%, মহিলা ৪৭.৩১%। জনসংখ্যার ঘনত্ব ২৪৯ জন। শিক্ষার হার ৫২%। ডাক বাংলো-২, প্রশাসন থানা সৃষ্টি ১৯৩৬ সালে। ইউনিয়ন ১৪টি, মৌজা ১৫১, গ্রাম ১৬১টি।
কাশিয়ানী থানায় গ্রামের সংখ্যা ১৫৪টি। ইউনিয়ন ১৩টি, আয়তন ১০৯ বর্গ মাইল। কালুখালি ও ভাটিয়াপাড়ার সঙ্গে এর রয়েছে রেল সংযোগ। মধুমতী ও বারাসিয়া চলাচলের প্রধান নদী। লোকশ্রুতি থেকে জানা যায় নবাব আলীবর্দী খানের আমলে কাশিয়ানী ইউনিয়নের অন্তর্গত কাশিয়ানী গ্রামের বাসিন্দা বাবু দর্পনারায়ণ সেন কাশিনাথ দেবের পাঁচটি মূর্তি নির্মাণ করেন ও গ্রামের পাঁচটি বাড়িতে স্থাপন করেন। সেই থেকেই এই গ্রাম কাশিয়ানী নামে পরিচিত
বিভিন্ন বর্ণের ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন-নমশূদ্র, বৈদ্য, ব্রাহ্মণ, কায়স্ত, সাহা, বণিক এখানে বাস করত। তন্মধ্যে বৈদ্যরাই ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী, শিক্ষিত ও সংস্কৃতি সম্পন্ন। ব্রিটিশ আমলে বৈদ্যনাথ সেন জজ নিযুক্ত হয়েছিলেন। কবিরাজ কৈলাশ চন্দ্র সেন ছিলেন বিখ্যাত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। তার একজন যোগ্যতম উত্তরসূরি জমিদার গিরিশচন্দ্র সেন ১৯০২ সালে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বিদ্যালয়টির নাম জিমি হাই স্কুল। বিত্তশালী সাহা সম্প্রদায় দেশ বিভাজনের সময় বাড়িঘর ফেলে ভারতে চলে যায়। এই এলাকায় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি | তবে অঞ্চলটি ধান, পাট ও রবিশস্যের জন্য বিখ্যাত। এ থানার অন্তর্গত ওড়াকান্দি গ্রাম সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাপটিস্ট মিশনের একটি শাখা আছে। এলাকাটিতে কোনো এক সময় বহু শিক্ষিত হিন্দু বাস করত। রামদিয়া, রাজপাট ব্যবসায়িক সুবিখ্যাত স্থান।
মুকসুদপুর উপজেলা
আয়তন : ৩০৯.৬৩ বর্গ কি.মি.। উত্তরে নগরকান্দা ও ভাঙা উপজেলা, দক্ষিণে গোপালগঞ্জ সদর ও কাশিয়ানী উপজেলা, পশ্চিমে কাশিয়ানী ও বোয়ালমারী উপজেলা। উপজেলা শহর ৯টি ওয়ার্ড ও ১৫টি মহল্লা নিয়ে গঠিত। পৌরসভা সৃষ্টি হয় ২০০০ সালে। আয়তন ২.৭২ বর্গ কি.মি.। জনসংখ্যা ১৮১১৬ জন। পুরুষ ৪৮.৭৫% ও মহিলা ৫১.২৫%। জনসংখ্যার ঘনত্ব ৬৬৬ জন। শিক্ষার হার ৫৭.৮%। ডাক বাংলো ২টি। প্রশাসন থানা সৃষ্টি ১৯১৪ সালে। বর্তমানে এটি উপজেলা। ইউনিয়ন ১৭টি, মৌজা ২০৬টি, গ্রাম ২৬০টি।
কথিত আছে, মুকসুদ খাঁ নামক একজন দরবেশ গোপালগঞ্জ সদরের উত্তরে আস্তানা গড়ে তোলেন। অনেক অলৌকিক ঘটনা সেই দরবেশ দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল বলে অনেকে আজও বলে থাকেন। এই মুকসুদ খাঁর নামানুসারে এলাকাটির নাম মুকসুদপুর হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
