২০. ভীমের সহিত যুদ্ধে দুর্য্যোধনের দশ ভ্রাতার মৃত্যু

মুনি বলে, শুন রাজা অপূর্ব্ব কথন।
হেনমতে শিনি-পৌত্র করে মহারণ।।
হেথা রাজা যুধিষ্ঠির সচিন্তিত মন।
অনুক্ষণ করিছেন পার্থের চিন্তন।।
তৃতীয় প্রহর বেলা হৈল আসি প্রায়।
নাহি জানি পার্থ করে কেমন উপায়।।
প্রতিজ্ঞা করিল বীর বড়ই দুষ্কর।
জয়দ্রথে না মারিয়া না আসিবে ঘর।।
সাত্যকিরে পাঠাইনু উদ্দেশ কারণ।
নাহি জানি কোথা গেল সত্যক-নন্দন।।
তত্ত্ব জানিবারে তবে পাঠাই সাত্যকি।
প্রহর পর্য্যন্ত হৈল, তারে নাহি দেখি।।
এই সব ভাবি মম মন নহে স্থির।
এত বলি বৃকোদরে ডাকে যুধিষ্ঠির।।
যুধিষ্ঠির আজ্ঞা শুনি বীর বৃকোদর।
রণ ত্যজি সেইক্ষণে আসিল সত্বর।।
রাজার অগ্রেতে রহে করি যোড়কর।
ভীমে দেখি কহিলেন ধর্ম্ম-নৃপবর।।
অর্জ্জুনের তত্ত্ব ভাই নাহি পাওয়া গেল।
সাত্যকিরে পাঠাইনু, সেই নাহি এল।।
একা বিপক্ষের মাঝে গেল পার্থবীর।
তারে না দেখিয়া মম বিকল শরীর।।
এ হেতু তোমারে ডাকি ভাই বৃকোদর।
অর্জ্জুনের তত্ত্ব জানি আইস সত্বর।।
ভীম বলে, মহারাজ করি নিবেদন।
অর্জ্জুনের হেতু কেন করহ চিন্তন।।
ত্রিদশ-ঈশ্বর কৃষ্ণ যাহার সারথি।
তার জন্য চিন্তা কেন কর নরপতি।।
আপনি আসিয়া ব্রহ্মা যদি করে রণ।
তথাপি অর্জ্জুনে নাহি জিনে কদাচন।।
যুধিষ্ঠির বলে, ভাই কহিলে প্রমাণ।
জানি শুনি তবু স্থির নহে মম প্রাণ।।
পুনরপি কহে ভীম রাজারে চাহিয়া।
কিমতে যাইব আমি তোমারে ছাড়িয়া।।
অনুক্ষণ দ্রোণ আসে তোমারে ধরিতে।
আমি গেলে কে যুঝিবে তাঁহার সহিতে।।
রাজা কহিলেন, চিন্তা নাহিক তোমার।
তুমি আন গিয়া অর্জ্জুনের সমাচার।।
এত শুনি ধৃষ্টদ্যুম্নে ডাকি বৃকোদর।
প্রত্যক্ষে কহিল যত রাজার উত্তর।।
অর্জ্জুনের তত্ত্বে আমি যাইব ত্বরিত।
রাজারে রাখিবে সবে করি সাবহিত।।
ধৃষ্টদ্যুম্ন বলে, চিন্তা নাহিক তোমার।
রাজারে রাখিতে ভার রহিল আমার।।
দ্রোণপুত্র আসুক, আপনি দ্রোণ আসে।
এক বাণে পাঠাইব যমের আবাসে।।
এত শুনি ভীম হৈল হরিষ অন্তর।
বিশোকে বলিল রথ সাজাহ সত্বর।।
বিশোক সারথি সেই অতি বিচক্ষণ।
রথের উপরে তোলে নানা প্রহরণ।।
শত শত ধনু তোলে গদা বহুতর।
শেল শূল কোটি কোটি ভূষণ্ডী তোমর।।
শ্রীহরি স্মরিয়া বীর চড়ে গিয়া রথে।
দুর্জ্জয় ধনুক তুলিয়া লইল হাতে।।
ধনুকে টঙ্কার দিয়া ছাড়ে হুহুঙ্কার।
পর্ব্বত পড়য়ে শব্দে হইয়া বিদার।।
প্রমত্ত কেশরী সম রণমত্ত বীর।
সংগ্রামে কাহার শক্তি আগে হয় স্থির।।
সারথি সমীর জিনি চালাইল হয়।
উত্তরিল ব্যূহমধ্যে পবন-তনয়।।
বাণ হানে ক্ষিপ্রহস্তে, রিপু করে নাশ।
বিপক্ষ পড়য়ে লক্ষ গণিয়া হুতাশ।।
সিংহে দেখি শিবা যেন হৈল সৈন্যগণ।
ভয়েতে আকুল মন, কম্পে ঘনে ঘন।।
কেহ বলে, কার মুখ চাহি আসে ভীমা।
মৃত্যুপতি-মূর্ত্তি হয়েআসে কালনিমা।।
পলাইলে বধে প্রাণে গোড়াইয়া পাছে।
নির্দ্দয় নিষ্ঠুর হেন কে কোথায় আছে।।
দন্তে কূটা করি যেবা মাগে পরিহার।
সকল এড়িয়া করে তাহারে সংহার।।
পলাইলে কি হইবে, না বাঁচিব তায়।
প্রাণপণে কর যুদ্ধ নিজ ভরসায়।।
মরিব ভীমের হাতে, নাহিক এড়ান।
যা থাকে কর্ম্মের ফল, কে করিবে আন।।
চিন্তিয়া সাহসে ভর করি সেনাগণ।
চতুর্দ্দিকে বেড়ি অস্ত্র করে বরিষণ।।
সিংহের সম্মুখে কিবা শিবার গণনা।
হুহুঙ্কার ছাড়ে ভীম, পড়ে ঝন্ঝনা।।
লক্ষ লক্ষ বিপক্ষ নাশয়ে বাণাঘাতে।
বড় বড় হস্তী পাড়ে প্রহারি গদাতে।।
একেরে মারিতে আর পড়ে মূর্চ্ছা হয়ে।
পলাইলে প্রাণ তার আগে বধে গিয়া।।
পড়িল ভীমের রণে রথ অশ্ব হাতী।
ধ্বজ ছত্র পতাকায় ঢাকে বসুমতী।।
ভীমের সমর দেখি দ্রোণবীর রোষে।
দ্বার আগুলিয়া বীর কহে ক্রোধাবেশে।।
মোরে না জিনিয়া ভীম যাইবে কেমেন।
এত বলি বাণ যোড়ে ধনুকরে গুণে।।
গর্জ্জিয়া কহিল ভীম যেন মেঘধ্বনি।
অপরাধ হয় পাছে, এই ভয় মানি।।
উপরোধ রক্ষা কর, দেহ পথ ছাড়ি।
নহে চূর্ণ করি দিব মারি গদাবাড়ি।।
শুনিয়া হইল গুরু ক্রোধে হুতাশন।
ভীমের উপরে করে বাণ বরিষণ।।
বৃষ্টির পশলা যেন বরিষার কালে।
ঢাকিল ভীমের রথ-পথ শরজালে।।
দারুণ কুপিল ভীম যেন কালসাপ।
রথ হৈতে ভূমে পড়ে দিয়া এক লাফ।।
সাপটিয়া আচার্য্যের রথখান ধরে।
টান দিয়া ফেলে রথ যোজন অন্তরে।।
তাহার চাপনে সৈন্য তল যায় কত।
সারথি হইল নাশ, অশ্গণ হত।।
ধ্বজ ভাঙ্গে, রথ নেড়ামুড়া হয়ে রয়।
লাফ দিয়া পলাইল দ্রোণ মহাশয়।।
পশ্চাৎ করিয়া দ্রোণে বীর বৃকোদর।
অতিবেগে প্রবেশিল ব্যূহের ভিতর।।
গদা হাতে গর্জ্জে বীর, অতি দীর্ঘপদে।
প্রকাণ্ড পর্ব্বত তনু মত্ত বীরমদে।।
সমরে প্রচণ্ড শূর চুর করে যায়।
গদাঘাতে রথ রথী পদাতি লোটায়।।
বিশোক চালায় বায়ুবেগে অশ্বগণ।
উত্তরিল ব্যূহমধ্যে পবন-নন্দন।।
দেখিয়া সৈন্যের ক্ষয় রবির নন্দন।
আগুলিল ভীমে আসি অতি ক্রুদ্ধমন।।
কর্ণেরে দেখিয়া ভীম মহাক্রুদ্ধ হৈল।
ধনুর্গুণ টঙ্কারিয়া নিজ অস্ত্র নিল।।
কর্ণ বলে, ভীম আজি দেহ মোরে রণ।
অবশ্য পাঠাব তোমা যমের সদন।।
এত শুনি বৃকোদর ক্রোধে হুতাশন।
কর্ণেরে চাহিয়া বলে করিয়া তর্জ্জন।।
কৌরব-কিঙ্কর তোর গৌরব যে জানি।
জানিয়া তোমারে পাপী পোষে কালফণী।।
কুমন্ত্রণা দিয়া কুরু করিলি বিনাশ।
নিকট হইল মৃত্যু, বিফল প্রয়াস।।
ওরে মূঢ়মতি এত গর্ব্ব যে তোমার।
এমত প্রতিজ্ঞা কর অগ্রেতে আমার।।
আজি তোরে বাণে আমি করিব সংহার।
কহিনু জানিহ বাক্য স্বরূপ আমার।।
এত বলি বৃকোদর এড়ে অস্ত্রগণ।
গগন ছাইয়া করে বাণ বরিষণ।।
যত বাণ এড়ে ভীম কাটে কর্ণবীর।
দেখি বৃকোদর বীর কম্পিত শরীর।।
আকর্ণ পূরিয়া বীর মারে দশ বাণ।
দুই বাণে চারি অশ্ব কাটিল সত্বর।।
চারি বাণে সারথিরে দিল যমঘর।
সারথি পড়িল, রথ হৈল অচল।।
লাফ দিয়া পলাইল কর্ণ মহাবল।
কর্ণ পালাইল দেখি বীর বৃকোদর।
মহাক্রোদ বাণ এড়ে সৈন্যের উপর।।
পড়িল অনেক সৈন্য পৃথিবী আচ্ছাদি।
লক্ষ লক্ষ সেনা পড়ে, রক্তে বহে নদী।।
দেখিয়া আকুল বড় রাজা দুর্য্যোধন।
সহোদরগণে ডাক দিল সেইক্ষণ।।
দশ জন যুঝিবারে হৈল আগুয়ান।
অযুতের হস্তী আসে মহাবলবান।।
মুষল মুদগর বান্ধা শুণ্ডে সবাকার।
ঈষা সম দন্ত হস্তী পর্ব্বত আকার।।
হস্তিগণে দেখি ভীম ত্যজে ধনুঃশর।
হাতে গদা করিনামে সংগ্রাম ভিতর।।
শতমণ লৌহ দিয়া গড়া গদাখান।
মহাভয়ঙ্কর দেখি কালের সমান।।
হেন গদা লয়ে বীর ধাইল সত্বর।
নিমিষেতে মারে দশ-সহস্র কুঞ্জর।।
গদার প্রহার যেন বজ্রের সোসর।
শত শত একবারে মারে বৃকোদর।।
ধৃতরাষ্ট্র পুত্রগণ আসে দশজন।
ভীমের উপরে করে অস্ত্র বরিষণ।।
লাফ দিয়া লঙ্ঘে ভীম যোজনেক বীট।
পলাইতে কুরুর পড়িয়া মরে ঠাট।।
তবে ক্রোধে বৃকোদর গদা লয়ে ধায়।
রথ অশ্ব সহ বীর চূর্ণ করি যায়।।
দশজনে মারে বীর গদার প্রহারে।
দেখি দুর্য্যোধন বীর হাহাকার করে।।
সঞ্জয় কহেন ধৃতরাষ্ট্রে সমাচার।
দশ পুত্র রাজা তব হইল সংহার।।
গদার প্রহারে মারে বীর বৃকোদর।
অযুতেক হস্তী পড়ে মহাভয়ঙ্কর।।
ইহা শুনি ধৃতরাষ্ট্র হৈল অচেতন।
বহু বিলাপিয়া অন্ধ করয়ে রোদন।।
ক্ষণেক থাকিয়া বলে শুনহ সঞ্জয়।
বড়ই দারুণ ভীম নির্দ্দয় হৃদয়।।
একবারে দশ পুত্রে করিল সংহার।
এতেক বলিয়া অন্ধ করে হাহাকার।।
সঞ্জয় বলিল, কেন করহ রোদন।
পূর্ব্বে যত কহিলাম, না কৈলে শ্রবণ।।
অধর্ম্ম করিলে, নহে ভদ্র আপনার।
যতেক করিলে, জান সব সমাচার।।
বিদুর প্রভৃতি কত বলিল তোমারে।
কারো বাক্য না শুনিলে তুমি অহঙ্কারে।।
ধৃতরাষ্ট্র বলে, কহ আমারে সঞ্জয়।
কভু না শুনিনু পাণ্ডবের পরাজয়।।
যতেক শুনি যে পড়ে মোর সেনাগণ।
বিশেষিয়া কহ মোরে ইহার কারণ।।
সঞ্জয় বলিল, রাজা শুন সাবধানে।
পাণ্ডবের দলে কৃষ্ণ আছেন আপনে।।
যথা কৃষ্ণ তথা ধর্ম্ম জানিহ রাজন।
যথা ধর্ম্ম তথা জয় বেদের বচন।।
পুত্র সম স্নেহ নাহি, দৈব সম বল।
বিদ্যা সম বন্ধু নাহি, ব্যাধি সম খল।।
সর্ব্বকাল দৈববল আছে ধর্ম্মসুতে।
বিরোধ তাহার সঙ্গে আপনা খাইতে।।
দূত হয় ত্রিভুবনপতি যার বোলে।
বিপদে করেন পার করি নিজ কোলে।।
জানিয়া না জানি, যে শুনিয়া না শুনি।
ধরিয়া আনিল পাশাকালে যাজ্ঞসেনী।।
সভায় তাহার বস্ত্র হরে তব সুত।
আপনি তাহার কর্ম্ম শুনিলে অদ্ভুত।।
হরিতে বাড়িল বাস, নহে অবসান।
অনুকূল হয়ে লজ্জা রাখে ভগবান।।
এখন পার্থের কৃষ্ণ হইলা সারথি।
তাহারে জিনিবে হেন কাহার শকতি।।
ভদ্র নাহি আর তব শুন মহীপাল।
নিশ্চয় কুরুর বংশ গ্রাসিবেক কাল।।
ধৃতরাষ্ট্র বলে, শুন দৈব বলবান।
নিরর্থক পুরুষার্থ, করহ বাখান।।
দ্রোণপর্ব্বে পুণ্যকথা জয়দ্রথ-বধে।
কাশীরাম দাস কহে গোবিন্দের পদে।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *