১৭. রাজসূয়-যজ্ঞ আরম্ভ

পাইয়া রাজার আজ্ঞা মদ্রসুতা-সুত।
আনাইল শিল্পিগণ পাঠাইয়া দূত।।
নানারত্ন দিল তারে বিরচিতে ঘর।
কোটি কোটি শিল্পীগণ গড়ে নিরন্তর।।
দেবের মন্দির সম রত্নেতে নির্ম্মিত।
হেম-রত্ন মুকুতায় করিল মণ্ডিত।।
এক এক পুর-মধ্যে শত শত ঘর।
তাহাতে রাখিল ভোজ্য পেয় বহুতর।।
অশন-বসন শয্যা রাখে গৃহে গৃহে।
বাপী কূপ জলপূর্ণ, গন্ধে মন মোহে।।
কনক-রজত-পাত্রে করিতে ভোজন।
এক পুরে দূত নিয়োজিল শত জন।।
লক্ষ লক্ষ গৃহ কৈল মনোহর স্থল।
নানা বৃক্ষ রোপিল সহিত ফুল-ফল।।
ভিন্ন ভিন্ন কৈল গৃহ চারি জাতি-ক্রম।
অপূর্ব্ব নির্ম্মাণ কৈল লোকে অনুপম।।
পেয় ভোজ্য নিয়োজিল ইন্দ্রসেন-আদি।
অষ্ট দিক্ হৈতে দ্রব্য আসে নিরবধি।।
হস্তী উষ্ট্র বৃষভ-শকটে লক্ষ লক্ষ।
বৃষভে নৌকায় আসে যত দ্রব্য ভক্ষ্য।।
রাত্রি দিবা সায়ং প্রাতঃ নাহিক বিশ্রাম।
অনুক্ষণ আসিতেছে দ্রব্য অবিরাম।।
ময়-বিরচিত সভা অপূর্ব্ব-নির্ম্মাণ।
সুরাসুর মুনি করে যাহার বাখান।।
তথিমধ্যে ধর্ম্মরাজ যজ্ঞ আরম্ভিম।
দ্বিজ-মুনিগণ সবে দীক্ষা করাইল।।
আপনি ব্রহ্মত্ব করিলেন দ্বৈপায়ন।
সামগ হইল ধনঞ্জয় তপোধন।।
হইলেন হোতা পৈল আর দ্বিজগণ।
অন্য অন্য কর্ম্মে অন্য মুনি-নিয়োজন।।
নকুলেরে কহিলেন, ধর্ম্ম-নরপতি।
হস্তিনা-নগরে তুমি যাহ শীঘ্রগতি।।
ভীষ্ম দ্রোণ জ্যেষ্ঠতাত বিদুর সহিত।
কৃপ অশ্বত্থামা দুর্য্যোধন সসুহৃদ।।
বাহ্লীক সঞ্জয় ভূরিশ্রবা সোমদত্ত।
শত ভাই কর্ণ সহ রাজা জয়দ্রথ।।
গান্ধারী প্রভৃতি রাজপত্নী সমুদয়।
আর যে আইসে স্নেহ করিয়া আমায়।।
শীঘ্রগতি গিয়া তুমি আনহ সবারে।
চলিল নকুল বীর হস্তিনা-নগরে।।
যজ্ঞের সংবাদ জানাইল সবাকারে।
বাল বৃদ্ধ নারী আদি যত কুরুপুরে।।
হৃষ্টচিত্ত হইয়া চলিল সর্ব্বজন।
দ্বিজ ক্ষত্র বৈশ্য শূদ্র আদি প্রজাগণ।।
রাজসূয়-যজ্ঞ শুনি আনন্দিত হৈয়া।
চলিল সকল লোক হস্তিনা ছাড়িয়া।।
হস্তী রথ অশ্ব পত্তি করিয়া সাজন।
চতুরঙ্গ-দলেতে চলিল কুরুগণ।।
ইন্দ্রপ্রস্থে প্রবেশিল নকুল সহিত।
দেখি যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসেন হিতাহিত।।
ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর বাহ্লীক অন্ধরাজে।
আগুসরি আনিলেন আপন সমাজে।।
সবারে কহেন পার্থ বিনয়-বচনে।
এ কার্য্য ‍তোমার কহেন জনে জনে।।
পিতা মহে বলিলেন ধর্ম্মের তনয়।
আপনি বিধান বুঝি কর মহাশয়।।
যাহা হৈতে যেই কার্য্য হইবে সাধন।
স্থানে স্থানে তাহাদিগে কর নিয়োজন।।
যুধিষ্টির ভীষ্ম সহ করিয়া বিচার।
উপযুক্ত বুঝিয়া দিলেন কর্ম্মভার।।
কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য ভীষ্ম সহ করিয়া বিচার।
উপযুক্ত বুঝিয়া দিলেন কর্ম্মভার।।
কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য ভীষ্ম-দ্রোণে অধিকার।
দুর্য্যোধনে সমর্পিল সকল ভাণ্ডার।।
ভক্ষ্য-ভোজ্য অধিকার দেন দুঃশাসনে।
ব্রাহ্মণ-পূজার ভার গুরুর নন্দনে।।
রাজগণে পূজিবারে দিলেন সঞ্জয়ে।
দ্বিজেরে দক্ষিণা দিতে কৃপ মহাশয়ে।।
দান দিতে দিলেন বিদুরে অধিকার।
আপনি নিলেন কৃষ্ণ পরিচর্য্যা-ভার।।
ধৃতরাষ্ট্র সোমদত্ত প্রতীপ-কোঙর।
তিনজন গৃহকর্ত্তা হৈল সর্ব্বেশ্বর।।
সভা রাখিবারে দ্বারী কৈল নিয়োজন।
পূর্ব্ব-দ্বারে নিয়োজিল মহারথিগণ।।
সহস্র সহস্র রথী সঙ্গে তরবার।
মহাবীর ইন্দ্রসেন রাখে পূর্ব্বদ্বার।।
উত্তর-দ্বারেতে অনিরুদ্ধেনিয়োজিল।
ষাইট-সহস্র যোদ্ধা তার সঙ্গে ছিল।।
সাত্যকি দক্ষিণ-দ্বারে হৈল নিয়োজন।
বিংশতি-সহস্র রথী তাহার ভীড়ন।।
পশ্চিম-দ্বারেতে বীর ধৃতরাষ্ট্র-সুত।
তার সঙ্গে দিল রথী যুগল অযুত।।
হাতেতে নিগড় বেত্র লৈয়ে সর্ব্বজন।
নানা অস্ত্র লৈয়ে করে দ্বারের রক্ষণ।।
বলাবল বুঝিবারে রহে বৃকোদর।
এক লক্ষ রথী সঙ্গে ভ্রমে নিরন্তর।।
রাজগণ-আগমণ জ্ঞাত করিবারে।
অধিকার দিল দুই মাদ্রীর কুমারে।।
এই মত সবাকার করি নিয়োজন।
আরম্ভ করেন যজ্ঞ ধর্ম্মের নন্দন।।
দূত-মুখে নিমন্ত্রণ পেয়ে রাজগণ।
সসৈন্যে করিল তবে তথা আগমন।।
দ্বিজ ক্ষত্র বৈশ্য শূদ্র লয়ে চারি জাতি।
স্ব স্ব রাজ্য হৈতে যত আসে নরপতি।।
নানাবর্ণে নানারত্ন যে রাজ্যে যে হয়।
পাণ্ডবের প্রীতি হেতু সঙ্গে করি লয়।।
কেহ কেহ নিল রত্ন পৌরুষ কারণ।
ধর্ম্মযজ্ঞ বুঝি কেহ নিল বহু ধন।।
হস্তী উষ্ট্র বৃষভ শকট নৌকা পূরি।
নানাবর্ণ কত রত্ন লিখিতে না পারি।।
শ্বেত পীত লোহিত অমূল্য যত শিলা।
মাণিক্য বৈদুর্য্য মণি মরকত নীলা।।
প্রবাল মুকুতা হীরা সুবর্ণ বিশাল।
বিচিত্র বসন কত নানাবর্ণ শাল।।
কীটজ লোমজ নানাবর্ণে বিরচিত।
হস্তী অশ্ব রথ পত্তি গবী অগণিত।।
চতুর্দ্দোল করি নিল ‍দিব্য নারীগণ।
তরুণ-শ্যামল অঙ্গ কুরঙ্গ-লোচন।।
অগুরু-চন্দন-কাষ্ঠ কুঙ্কুম কস্তূরী।
নানাবর্ণ পক্ষী নিল পিঞ্জরেতে পূরি।।
এইমত কর লৈয়া যত রাজগণ।
দূত-মুখে শুনি শাত্র করেন গমন।।
উত্তরে হিমাদ্রি, পূর্ব্বে সমুদ্র অবধি।
দক্ষিণেতে লঙ্কা, পশ্চিমেতে সিন্ধুনদী।।
দিবানিশি পথ বহে না হয় বিরত।
পৃথিবীর সর্ব্বলোক একস্থানে স্থিত।।
হস্তী অশ্ব রথ পত্তি নানা বাদ্যধ্বনি।
ধ্বজ-ছত্র-পতাকায় ঢাকিল মেদিনী।।
জল স্থল উচ্চ নীচ, নাহি দেখি ক্ষিতি।
দিবারাত্রি অবিশ্রাম লোক-গতাগতি।।
চতুর্দ্দিক হৈতে আসে যত ‍রাজগণ।
সভাদ্বারে উপনীত হৈল সর্ব্বজন।।
সবাকারে অভ্যর্থনা করি ধনঞ্জয়।
যথাযোগ্য রহিবারে দিলেন আলয়।।
হিমাদ্রি সমুদ্র-তটে যত দ্বিজ বৈসে।
লিখনে না যায়, কত অহির্নিশি আসে।।
রাজসূয়-যজ্ঞ-বার্ত্তা শুনিয়া শ্রবণে।
দেখিতে আইল কত বিনা নিমন্ত্রণে।।
জলবাসী স্থলবাসী পর্ব্বত-নিবাসী।
লক্ষ লক্ষ যোগী আসে আর সিদ্ধি ঋষি।।
দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা পূজে দ্বিজগণে।
দিব্য গৃহ রহিবারে দিল সর্ব্বজনে।।
এক কোটি দ্বিজ অশ্বত্থামা পরিবার।
দ্বিজগণে পূজে সবে দিয়া উপহার।।
অনেক আইল ক্ষত্র, বহু বৈশাগণ।
অনেক আইল শূদ্র শ্রেষ্ঠ যতজন।।
দুঃশাসন সহ থাকি বহু পরিবার।
রন্ধন করিল কোটি কোটি সূপকার।।
করয়ে পরিবেশন বহু সূপকার।
গৃহে গৃহে স্থানে স্থানে রন্ধন-ব্যাপার।।
স্থানে স্থানে ক্ষণে ক্ষণে ভ্রমে দুঃশাসন।
সামগ্রী যোগায় যত অনুচরগণ।।
পায়স পিষ্টক অন্ন ঘৃত দুগ্ধ দধি।
মনোহর পঞ্চাশ ব্যাঞ্জন যথাবিধি।।
চারি জাতি পৃথক পৃথক সবে ভুঞ্জে।
সুবর্ণের পাত্রে ভুঞ্জে যত নৃপ দ্বিজে।।
খাও খাও, লও লও, একমাত্র শুনি।
কার মুখে নাহি সরে অন্য কোন বাণী।।
বিচিত্র পালঙ্ক শয্যা, বসিতে আসন।
কুঙ্কুম কস্তূরী মাল্য অগুরু চন্দন।।
কর্পূর তাম্বূল আর যার যাহে প্রীত।
কোথা হৈতে কেবা আনি দেয় আচম্বিত।।
স্বর্গে ইন্দ্র-সহ আছে যত দেবগণ।
পাতালে ভুজঙ্গ-রাজ আর বিভীষণ।।
দেব দৈত্য দানব গন্ধর্ব্ব যক্ষ রক্ষ।
সিদ্ধ সাধ্য ভুজঙ্গ পিশাচ প্রেতপক্ষ।।
কিন্নর বানর নর যত বৈসে ক্ষিতি।
যজ্ঞের সদনে সবে আসে দিবারাতি।।
অদ্ভুত দ্বাপর-যুগে যজ্ঞ আরম্ভিল।
না হইবে ক্ষিতি-মাঝে পূর্ব্বে না হইল।।
সময় বুঝিয়া কৃষ্ণ কহেন বচন।
রাজ-অভিষেক-কর্ম্ম কর মুনিগণ।।
কৃষ্ণের বচন শুনি উঠে মুনিগণ।
নানা তীর্থজল লৈয়া ধৌম্য দ্বৈপায়ন।।
অসিত দেবল জামদগ্ন্য পরাশর।
স্নানমন্ত্র পড়ে আর যত দ্বিজবর।।
স্নান করালেন ব্যাস শুভক্ষণ জানি।
অম্লান-বসন দিল চিত্ররথ আনি।।
শিরেতে ধবল ছত্র সাত্যকি ধরিল।
চেদীপতি রতন মুকুট পরাইল।।
বৃকোদর পার্থ দোঁহে করেন ব্যজন।
চামর ঢুলায় দুই মাদ্রীর নন্দন।।
অবন্তীর রাজা চর্ম্ম-পাদুকা লইল।
খড়্গ-ছুরি লৈয়ে শল্য অগ্রে দাণ্ডাইল।।
চিকেতান শর তূণ লইয়া বামেতে।
কাশীর ভূপাল ধনু লৈয়ে দক্ষিণেতে।।
নারদাদি-মুনি-মুখে বেদ-উচ্চারণ।
দ্বিজগণ-স্বস্তি-শব্দ পরশে গগন।।
গন্ধর্ব্বেতে গীত গায়, নাচয়ে অপ্সরী।
পাঞ্চজন্য বাজালেন আপনি শ্রীহরি।।
শঙ্খের নিনাদ গিয়া গগন পূরিল।
সভাতে যতেক ছিল ঢলিয়া পড়িল।।
বাসুদেব পাণ্ডবেরা পাঞ্চাল-নন্দন।
সাত্যকি সহিত এই ছাড়ি অষ্টজন।।
শঙ্খনাদে মোহ হৈয়ে পড়িল ঢলিয়া।
ধর্ম্মপুত্র নিবারণ করেন দেখিয়া।।
দ্বৈপায়ন-আদি মুনি ধৌম-পুরোহিত।
অভিষেক করিলেন বেদের বিহিত।।
সভাপব্বে সুধারস রাজসূয়-কথা।
কাশীরাম দাস কহে, ভারতে এ গাথা।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *