১৩. নিজ রাজ্যে সুশর্ম্মা যাত্রা ও বিরাটের দক্ষিণ গো-গৃহ আক্রমণ

দুর্য্যোধন আজ্ঞা পেয়ে সুশর্ম্মা নৃপতি।
আপন বাহিনী সাজাইল শীঘ্রগতি।।
আষাঢ়ের সিতপক্ষে পঞ্চশী দিবসে।
সুশর্ম্মা নৃপতি চলি গেল মৎস্যদেশে।।
শঙ্খ ভেরী আদি করি নানা বাদ্য বাজে।
বাদ্যের শব্দেতে কম্প হৈল মৎস্যরাজে।।
প্রবেশিয়া মৎস্যদেশে সুশর্ম্মা নৃপতি।
ধরহ গোধনে, আজ্ঞা দিল সৈন্য প্রতি।।
হয় হস্তী গবী আর নানা রত্ন ধন।
লুঠিতে লাগিল চতুর্দ্দিকে সর্ব্ব জন।।
গোধন রক্ষণে যত ছিল গোপগণ।
ধাইয়া রাজারে বার্ত্তা কহিল তখন।।
সভাতে বসিয়াছিল বিরাট নৃপতি।
ঊর্দ্ধশ্বাসে কহে গোপ প্রণমিয়া ক্ষিতি।।
সকল মজিল মৎস্যদেশে নৃপবর।
সকল হরিয়া নিল ত্রিগর্ত্ত-ঈশ্বর।।
রক্ষা করিবেক রাজা যদি আছে মন।
বিলম্ব না কর, শীগ্র চলহ রাজন।।
দূতমুখে হেন বার্ত্তা পাইয়া নৃপতি।
চতুরঙ্গ সেনা লজ্জা করে শীঘ্রগতি।।
শতানীক মদিরাক্ষ দুই সহোদর।
শ্বেত শঙ্খ দুই ভাই রাজার কোঙর।।
পাত্রমিত্রগণ যোদ্ধা সাজিল সকল।
বিবিধ বাজনা বাজে, সৈন্য কোলাহল।।
শতানীকে আজ্ঞা দিল বিরাট নৃপতি।
দিব্য অস্ত্র ধনু দেহ চারি জন প্রতি।।
শ্রীকঙ্ক বল্লব অশ্বপাল ও গোপাল।
মহাবীর্য্যবন্ত যুদ্ধ করিবে বিশাল।।
দেবতার প্রায় সব দেখি সে সাক্ষাতে।
অবশ্য যুদ্ধের কার্য্য হবে সবা হৈতে।।
দিব্য ধনুর্গুণ দিল রথ তুরঙ্গম।
মুকুট কুণ্ডল দিল, কবচ উত্তম।।
পরিলা উত্তম বাস অতি মনোহর।
শরতে উদয় যেন হৈল শশধর।।
সাজিয়া পাণ্ডব রথে করে আরোহ।
স্বর্গ হৈতে আসে যেন দিক্পালগণ।।
চলিল বিরাট রাজা মীনধ্বজ রথে।
চারি ভাই চলিলেন রাজার পশ্চাতে।।
রথ চালাইয়া দিল রথের সারথি।
পশ্চাতে মাহুতগণ চালাইল হাতী।।
পদধূলি ঢালিলেক দেব দিবাকরে।
ঘোর অন্ধকার হৈল দিবস দুপুরে।।
শূণ্য হৈতে পক্ষিগণ ভূমিতে পড়িল।
হেনমতে দুই সৈন্যে ক্রমে দেখা হৈল।।
রথীকে ধাইল রথী, গজ ধায় গজে।
অশ্বারোহী, অশ্বারোহী, পত্তি পত্তি যুঝে।।
মল্লে মল্লে, গজে গজে, ধানুকী ধানুকী।
খড়্গে খড়্গে, শূলে শূলে, তবকী তবকী।।
হইল দারুণ যুদ্ধ মহাভয়ঙ্কর।
পূর্ব্বে যথা দেবাসুরে হইল সমর।।
সিংহনাদ মুহুমুর্হুঃ গর্জ্জে সৈন্যগণ।
ধনুর নির্ঘোষ ঘন, শঙ্খের নিঃস্বন।।
বিবিধ বাদ্যের শব্দ, কর্ণে লাগে তালি।
অন্ধকার হৈল সব, আচ্ছাদিল ধূলি।।
বাণের আগুন মাত্র ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে।
অন্ধকার রাত্রে যেন খদ্যোত উজলে।।
শেল শূল ভল্ল চক্র মুষল মুদগর।
পরশু পট্টিশ জাঠি ভিন্দিপাল শর।।
পড়িল অনেক সৈন্য পৃথিবী আচ্ছাদি।
ধূলি অন্ধকার কৈল, রক্তে বহে নদী।।
মুকুট কুণ্ডল মুণ্ড যায় গড়াগড়ি।
বুকে শেল বাজি কেহ ভূমিতলে পড়ি।।
সব্য হস্ত খড়্গ সহ পড়িল ভূতলে।
পদ কাটা গেল কার গড়াগড়ি বুলে।।
পর্ব্বত-আকার গজ ভূমে দন্ত দিয়া।
পড়িল দুভিতে সৈন্য অনেক দলিয়া।।
হেনমতে যুদ্ধ হৈল দ্বিতীয় প্রহর।
কেহ পরাজিত নহে, একই সোসর।।
ক্রোধে শতানীক বীর সমরে প্রবেশে।
এক শত রথী মারে চক্ষুর নিমিষে।।
মদিরাক্ষ মারিলেক শত সেনাপতি।
শত শত মারে সৈন্য বিরাট নৃপতি।।
বিরাট নৃপতি দেখি সুশর্ম্মা ধাইল।
দুই মত্ত ব্যাঘ্র যেন একত্র মিলিল।।
ক্রোধেতে বিরাট রাজা মারে দশ শর।
চারি অশ্বে চারি, দুই সারথী উপর।।
রথধ্বজে দুই, দুই সুশর্ম্মা উপরে।
সুশর্ম্মা কাটিয়া অস্ত্র ফেলে কত দূরে।।
পঞ্চদশ বাণ মারে বিরাট উপর।
কাটিয়া ফেলিল তাহা মৎস্যের ঈশ্বর।।
দেখিয়া ত্রিগর্ত্তপতি অতি ক্রোধগতি।
লাফ দিয়া ভূমিতলে নামে শীঘ্রগতি।।
হাতে গদা লৈয়া বীর ধায় বায়ুবেগে।
সিংহ যথা ধরিবারে যায় মত্ত মৃগে।।
চারি অশ্ব বিনাশিল মারি গদা বাড়ি।
সারথির কেশে ধরি ভূমিতলে পাড়ি।।
জীবগ্রাহ করিয়া বিরাট নৃপবরে।
ত্বরা করি তুলি লয় নিজ রথোপরে।।
রাজা বন্দী হৈল, সৈন্য হৈল ভঙ্গীয়ান।
চতুর্দ্দিকে পলাইল লয়ে নিজ প্রাণ।।
বড় বড় যোদ্ধাধন ত্যজি ধনুঃশর।
আপনি চালায় রথ পলায় সত্বর।।
ঊর্দ্ধলেজ মত্তগজ গর্জ্জিয়া পলায়।
অশ্বারোহী পদাতিক পাছু নাহি চায়।।
পলাইল সর্ব্ব সৈন্য, কেহ নাহি আর।
রাখিতে না পারে সৈন্য বিরাট কুমার।।
রণজয় করি পরে ত্রিগর্ত্ত নৃপতি।
বিরাটে লইয়া তবে চলে হৃষ্টমতি।।
জয়ধ্বনি বাদ্যধ্বনি হয় অনুক্ষণ।
মৎস্যরাজ সৈন্যমধ্যে উঠিল রোদন।।
সন্ধ্যাকাল হৈল, সূর্য্য ক্রমে অস্ত গেল।
কাহারে না দেখি, কেবা কোথায় রহিল।।
দেখিয়া কহেন ভীম ধর্ম্ম নরবর।
দাণ্ডাইয়া কি দেখহ, ভাই বৃকোদর।।
বহু উপকারী এই বিরাট নৃপতি।
বর্ষেক অজ্ঞাতে গৃহে করিনু বসতি।।
যার যে কামনা মত পাইনু যে স্থান।
তাঁহারে লইয়া যায় আমা বিদ্যমান।।
দাণ্ডাইয়া দেখ ইহা, নহে ক্ষত্রধর্ম্ম।
বিশেষ আমার এই অনুগত কর্ম্ম।।
শীঘ্র কর বিরাটের বন্ধন মোচন।
যাবৎ শত্রুর হাতে না হয় নিধন।।
এত শুনি বলে ভীম যোড় করি ‍পাণি।
পালিব তোমার আজ্ঞা, ওহে নৃপমণি।।
এখন আমার কর্ম্ম দেখ দাণ্ডাইয়া।
বিরাটে আনিয়া দিব সুশর্ম্মা মারিয়া।।
এই যে দেখহ শাল সুদীর্ঘ বিস্তার।
আমার হাতের যোগ্য গদার আকার।।
ওই বৃক্ষাঘাতে আমি বধিব সকল।
নিঃশেষ করিব আজি ত্রিগর্ত্তের দল।।
এত বলি বৃক্ষ উপাড়িতে ধায় বীর।
দেখিয়া কহেন পুনঃ রাজা যুধিষ্ঠির।।
হেন কর্ম্ম না করিহ ভাই বৃকোদর।
লোকে জ্ঞাত হৈবে উপাড়িলে বৃক্ষবর।।
অজ্ঞাত বৎসর যদি পূর্ণ নাহি হয়।
ততদিন হেন কর্ম্ম শোভা নাহি পায়।।
মানব ধনুক অস্ত্র লয়ে কর রণ।
মানুষের মত কর রথে আরোহণ।।
দু-পাশে থাকুক তব দুই সহোদর।
শীঘ্র আন ছাড়াইয়া মৎস্যের ঈশ্বর।।
আমিহ তোমার পাশে সর্ব্বসৈন্য লয়ে।
বিরাট রক্ষার হেতু যাইব চলিয়ে।।
ভীম বলে, নরপতি ইহা কেন কহ।
মুহূর্ত্তেকে বিরাটেরে আনি দিব, লহ।।
আপনি করিবে শ্রম কিসের কারণ।
ত্রিগর্ত্ত সহিত করি সমর বিষম।।
কোন্ হেতু যাবে দুই মাদ্রীর নন্দন।
কি কারণে লব আর বহু সৈন্যগণ।।
বৃক্ষ নিতে নিষেধিলে, বৃক্ষ নাহি লব।
রিক্তহস্তে গিয়া আমি বিরাটে আনিব।।
তৃণ হেন গণি আমি ত্রিগর্ত্ত রাজনে।
সৈন্য সাথী অস্ত্র লৈব কিবা প্রয়োজনে।।
এত বলি বৃকোদর ধায় শীঘ্রগতি।
চলিতে চরণভরে কম্পে বসুমতী।।
রজনী সম্মূখ হৈল, ঘোর অন্ধকার।
বায়ুবেগে ধায় ভীম, বলে মার মার।।
মহাভারতের কথা পুণ্যের কথন।
রচেন ব্যাসদেব শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *