০৮. দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধ

সঞ্জয় বলেন, শুন অন্ধ নরপতি।
রজনী প্রভাতে আজ্ঞা দিল কুরুপতি।।
রাজার বচনে সবে সাজে শীঘ্রগতি।
রথী মহারথী সাজে মহাযোধপতি।।
বিবিধ বাদ্যের শব্দে পূরিল গগন।
ডিমি ডিমি শব্দে বাজে বাদ্য অগণন।।
শঙ্খ ভেরী দুন্দুভি বাজয়ে করতাল।
কতেক লিখিব যত ফুকারে কাহাল।।
মহরী ঝাঝরি নানা বাদ্য সব বাজে।
বাদ্যের শবদে কম্প হৈল সব রাজ্যে।।
ভূমিকম্পে উঠে ঘন পৃথিবী কম্পন।
তবে ভীষ্ম মহাবীর গঙ্গার নন্দন।।
সমুদ্র সদৃশ ব্যূহ করিল রচন।
ব্যূহ-মুখে নিয়োজিল মহাযোদ্ধাগণ।।
বামশৃঙ্গে কৃতবর্ম্মা রাজা দুর্য্যোধনে।
এইরূপে সবে রহে ব্যূহের রক্ষণে।।
দুঃশাসনে আদি ঊনশত সহোদর।
ভূরিশ্রবা সোমদত্ত প্রতীপকুমার।।
দক্ষিণ শৃঙ্গেতে দ্রোণ কৃপ মহামতি।
ত্রিগর্ত্ত সুশর্ম্মা আদি প্রাগজ্যোতিষপতি।।
মধ্যশৃঙ্গে রহিলেন যত বীরগণ।
পশ্চাতে রহিলা তবে মদ্রের নন্দন।।
ব্যূহের অগ্রেতে হৈল ভীষ্ম মহামতি।
দশসহস্র চক্ররক্ষ সঙ্গে মহারথী।।
দশসহস্র নারায়ণী-সেনা বলবান।
রাখিল পশ্চিম শৃঙ্গে রথীর প্রধান।।
কোটি কোটী হস্তী পত্তি অশ্ব অগণন।
সাজিল যতেক সেনা না যায় লিখন।।
এইরূপে ব্যূহ কৈল ভীষ্ম মহামতি।
ব্যূহ-কথা শুনিলেন ধর্ম্ম নরপতি।।
অর্জ্জুনে ডাকিয়া আজ্ঞা দিল ততক্ষণ।
ব্যূহ করি সাজিলেন গঙ্গার নন্দন।।
ইহার বিধান ভাই কর শীঘ্রতর।
সাবধান হৈয়া আজি করিবে সমর।।
শিখণ্ডীরে রাখ রণে বহু যত্ন করি।
মহারথিগণ তবে করিয়া প্রহরী।।
সাবধান হৈয়া কর ব্যূহের রচন।
স্থানে স্থানে বুঝিয়া রাখহ যোদ্ধাগণ।।
আজ্ঞামাত্র ধনঞ্জয় মহাবিচক্ষণ।
রচিল বিচিত্র ব্যূহ না যায় বর্ণন।।
সূচীমুখ-ব্যূহ কৈল বড়ই দুষ্কর।
ব্যূহমুখে নিয়োজিল মহাধনুর্দ্ধর।।
মহাশৃঙ্গে রাখিল সাত্যকি মহামতি।
ভীমসেন সহদেব নকুল প্রভৃতি।।
মধ্যশৃঙ্গে যুধিষ্ঠির ধর্ম্মের কুমার।
দশসহস্র রথী সঙ্গে মহাবলধর।।
দক্ষিণ শৃঙ্গেতে রহে মহা মহারথী।
ধৃষ্টদ্যুন্ন বিরাটাদি কেকয় প্রভৃতি।।
দেখাদেখি বোলাবুলি বাজিল সমর।
ব্যূহের অগ্রেতে পার্থ ইন্দ্রের কুমার।।
মহাবীর ধনঞ্জয় সংগ্রামে প্রচণ্ড।
একেবারে কাটি পাড়ে শত শত মুণ্ড।।
ইন্দ্রদত্ত শিক্ষা যত দিব্য অস্ত্র জানে।
জলধর সম পার্থ করে বরিষণে।।
সহস্র সহস্র বাণ একেবারে এড়ে।
সহস্র সহস্র বীর পড়ে একেবারে।।
ধ্বজচ্ছত্র পতাকায় ঢাকিল মেদিনী।
ক্ষণেকে রক্তের নদী বহাল ফাল্গুনি।।
পার্থের বিক্রমে ত্রাস পাইল কুরুগণ।
সহিতে না পারি ভঙ্গ দিল সর্ব্বজন।।
সৈন্যভঙ্গ দেখি তবে গঙ্গার কুমার।
ক্রোধ করি আগু হৈল করিতে সমর।।
ভীষ্মার্জ্জুন দুইজনে হৈল মহারণ।
দোঁহার বিক্রমেতে কম্পিত বীরগণ।।
মহাবীর বৃকোদর সংগ্রামে প্রখর।
বিন্ধিয়া কৌরব-সৈন্য কৈল জর জর।।
সহস্র সহস্র বীর কৈল খণ্ড খণ্ড।
ক্ষুদ্র মৃগে মারে যেন কেশরী প্রচণ্ড।।
ভীমের বিক্রমেতে কম্পিত কুরুগণ।
ক্রোধ করি আগু হৈল ত্রিগর্ত্ত রাজন।।
ভীমের উপরে করে বাণ বরিষণ।
প্রলয়ের কালে যেন বর্ষে ঘোর ঘন।।
শেল শূল শক্তি জাঠা মুষল মুদগর।
নিরন্তর বৃষ্টি করে ভীমের উপর।।
অস্ত্রে অস্ত্রে কাটি তবে পবন-কুমার।
ত্রিগর্ত্ত উপরে করে অস্ত্র অবতার।।
চারি বাণে চারি অশ্ব কৈল খণ্ড খণ্ড।
দুই বাণে সারথিরে মারিল প্রচণ্ড।।
চারি অশ্ব মারিয়া করিল সিংহনাদ।
কৌরবের দলে হৈল বহুত প্রমাদ।।
বিরথ হইল বীর সংগ্রাম ভিতর।
হাতে গদা করিয়া নামিল ভূমি পর।।
গদা আস্ফালিয়া যায় ভীমে মারিবারে।
ক্রোধ হৈল ভীম তব সংগ্রাম ভিতরে।।
দুই বাণে কাটি তাহা কৈল খণ্ড খণ্ড।
ভল্ল-অস্ত্রে ত্রিগর্ত্তের বিন্ধিল প্রচণ্ড।।
কবচ কাটিয়া অস্ত্র ভেদিল শরীরে।
অস্ত্রাঘাতে অঙ্গে তার রক্ত পড়ে ধারে।।
ত্রিগর্ত্তের বিপাক দেখিয়া শল্য বীর।
আগু হৈয়া রক্ষা কৈল ত্রিগর্ত্ত-শরীর।।
শীঘ্রগতি রথ লৈয়া যোগায় সারথি।
রথে করি লৈল তবে ত্রিগর্ত্ত নৃপতি।।
শল্য ভীমে দোঁহে তবে হৈল মহারণ।
দেখাদেখি দোঁহে কৈল বাণ বরিষণ।।
নারাচ ভৈরব আদি মুষল মুদগর।
নানা অস্ত্র ফেলে দোঁহে দোঁহার উপর।।
তবেত খুরুপা বাণ পূরিল সন্ধান।
ভীমের হাতের ধনু কৈল খান খান।।
আর ধনু লয় বীর নিমেষ ভিতরে।
সেই ধনু কাটে বীর মারি দুই শরে।।
পুনঃ পুনঃ বৃকোদর যত ধনু লয়।
বাণে হানি শল্যবীর ভূমিতে ফেলায়।।
ধনু কাটা গেল বীর হৈল ক্রোধ মন।
শক্তি এক তুলি নিল ভীষণ দর্শন।।
মহাতেজে মারে শক্তি পবন-কুমার।
ইন্দ্রের বজ্রেতে যেন পর্ব্বত বিদার।।
নানা অস্ত্র মারে বীর নিবারিতে নারে।
কবচ ভেদিয়া শক্তি ভেদিল শরীরে।।
মেহি গেল শল্য বীর রক্ত পড়ে ধারে।
হাহাকার শব্দ হৈল যত কুরুবীরে।।
রথী মূর্চ্ছা দেখি রথ ফিরায় সারথি।
সিংহনাদ কৈল বীর ভীম মহামতি।।
অবসর পেয়ে ধনু লৈল বৃকোদর।
ধনুকেতে গুণ তুলি দিলেক সত্বর।।
গুণ দিয়া ধনু বীর টঙ্কারে নির্ঘাত।
এককালে হৈল যেন শত বজ্রাঘাত।।
মহাশব্দে মোহ হৈল যত কুরুগণ।
রুষিল শল্যের ভাই সংগ্রামে দুর্জ্জন।।
আগু হয়ে ভীমসেনে বলেন বচন।
মোর হাতে যাবি আজি যমের সদন।।
এত বলি দিব্য অস্ত্র যুড়িল ধনুকে।
ঝলকে ঝলকে অগ্নি উঠে অস্ত্রমুখে।।
মহাশব্দে আইসে বাণ গগন-মণ্ডলে।
শরতের কালে হেন হংসপংক্তি চলে।।
ভীম এড়িলেন বাণ খুরুপা প্রচণ্ড।
অর্দ্ধপথে অস্ত্র কাটি কৈল খণ্ড খণ্ড।।
তবে তারে ডাকি বলে পবন-কুমার।
এই সে অস্ত্রেতে তোর এত অহঙ্কার।।
এই অর্দ্ধচন্দ্র অস্ত্র অব্যর্থ সন্ধান।
পূর্ব্বে মোরে দ্রোণাচার্য্য গুরু দিল দান।।
সুরাসুর বিজয়ী দুষ্কর এই শর।
এই অস্ত্রে পাঠাইব যমের নগর।।
এত বলি আকর্ণ পূরিয়া শরাসন।
এড়িলেক অস্ত্র যেন মধ্যাহ্ন তপন।।
ঘোর শব্দ কির অস্ত্র আইসে আকাশে।
অস্ত্র দেখি দেবগণ পলায় তরাসে।।
নানা শক্তি করে নিবারিতে নাহি পারে।
পড়িল শল্যের ভাই দারুণ প্রহারে।।
সংগ্রামে পড়িল বীর পূর্ব্বশির হয়ে।
কাঞ্চন পর্ব্বত যেন পড়িল খসিয়ে।।
হাহাকার শব্দ হৈল যত কুরুদলে।
হাতে অস্ত্র বৃকোদর নাচে কুতূহলে।।
ভীমের বিক্রম সহে নাহি হেন বীর।
ভয়ঙ্কর মূর্ত্তি যেন প্রলয়-শরীর।।
ধৃষ্টদ্যুন্ন দ্রোণে তবে হৈল মহারণ।
নানা অস্ত্র দুইজনে করে বরিষণ।।
মহাবীর দ্রোণাচার্য্য বিক্রমে বিশাল।
দশ বাণ ধৃষ্টদ্যুন্নে প্রহার করিল।।
দশগোটা কালসর্প জিনি দশ শর।
মহাশব্দে আইল ধৃষ্টদ্যুম্নের উপর।।
অর্দ্ধচন্দ্র বাণেতে কাটিল ততক্ষণে।
আকাশে প্রশংসা করে যত দেবগণে।।
বাণ ব্যর্থ গেল বীর ক্রোধ হৈল মন।
ভল্লবাণ পুনরপি এড়ে ততক্ষণ।।
আকাশে উঠিল বাণ প্রলয় প্রচণ্ড।
দুই বাণে ধৃষ্টদ্যুন্ন কৈল খণ্ড খণ্ড।।
তবে ধৃষ্টদ্যুন্ন বীর পূরিল সন্ধান।
দ্রোণাচার্য্য উপরে মারিল দশ বাণ।।
আকাশে উঠিল বাণ উলূকা সমান।
বাণে বাণে হানি দ্রোণ কৈল সমাধান।।
তবে গুরু মহাক্রোধ হইল অন্তরে।
একবারে অগণিত যুড়িল তোমরে।।
দশদিক অন্ধকার পূরিল আকাশ।
পবন রুধিল সৈন্যে না চলে বাতাস।।
ধৃষ্টদ্যুন্নে আরোপিল লক্ষ লক্ষ বাণ।
অর্জ্জুন ধাইয়া গিয়া রক্ষা কৈল প্রাণ।।
গুরু শিষ্যে পুনঃ তবে হৈল মহারণ।
দোঁহার যুদ্ধের কথা না যায় লিখন।।
পাঞ্চাল নন্দন তবে সুদক্ষিণ নাম।
সর্ব্বগুণে বিশারদ মহা অনুপাম।।
দ্রোনের উপরে করে বাণ বরিষণ।
বরষা-কালেতে যেন বর্ষে ঘোর ঘন।।
বাণে বাণে কাটি দ্রোণ কৈল খণ্ড খণ্ড।
শক্তি ফেলি সুদক্ষিণে মারিল প্রচণ্ড।।
নানা শক্তি করে বীর নারে নিবারিতে।
বুকেতে বাজিল অস্ত্র পড়িল ভূমিতে।।
রথ হৈতে সুদক্ষিণ পড়ে ভূমিতলে।
হাহাকার শব্দ হৈল পাণ্ডবের দলে।।
যতেক পাঞ্চালগণ হৈল ক্রোধমন।
দ্রোণের উপরে করে বাণ বরিষণ।।
শেল শূল শক্তি জাঠা মুষল মুদগর।
ভৈরব নারাচ আদি নানা অস্ত্রবর।।
নিরন্তর বৃষ্টি করে দ্রোনের উপর।
বরিষার কালে যেন বর্ষে জলধর।।
নানা অস্ত্রে শিক্ষিত আচার্য্য মতিমান।
অস্ত্রে অস্ত্র কাটিয়া করিল খান খান।।
চোখ চোখ বাণ এড়ে বড় বড় বীর।
পাঞ্চাল বংশেতে নাহি অক্ষত শরীর।।
অশ্বত্থামা নকুলের যুদ্ধ অনুপাম।
পূর্ব্বে যুদ্ধ হৈল যেন রাবণ শ্রীরাম।।
মহাবীর অশ্বত্থামা সমরে প্রচণ্ড।
নকুলের রথধ্বজ কৈল খণ্ড খণ্ড।।
ধ্বজ কাটা গেল বীর বড় পাইল লাজ।
শক্তি ফেলি মারিলেক হৃদয়ের মাঝ।।
লাফ দিয়া এড়াইল দ্রোনের নন্দন।
নকুল উপরে করে বাণ বরিষণ।।
বাণে বাণ নকুল করিল নিবারণ।
বায়ুতে উড়ায় যেন জলধরগণ।।
ক্রোধ হৈল নকুলের সংগ্রামে প্রখর।
ষষ্টি বাণ মারি বিন্ধে দ্রোনের কোঙর।।
চারি বাণে চারি অস্ত্র কৈল খণ্ড খণ্ড।
দুই বাণে কাটিলেক সারথির মুণ্ড।।
বিরথ হইল বীর সমর ভিতর।
হাতে গদা করি তবে ধাইল সত্বর।।
মারিল গদার বাড়ি নকুলের রথে।
চারি অশ্ব সারিথি করিল চূর্ণ তাতে।।
সারথি তুরঙ্গ রথ চূর্ণ হয়ে গেল।
সাত্যকি আসিয়া তবে পরিত্রাণ কৈল।।
অশ্বত্থামা সাত্যকিতে যুদ্ধ অনুপাম।
পূর্ব্বে দেবাসুরে যেন হইল সংগ্রাম।।
শত শত বাণ দোঁহে একেবারে এড়ে।
অন্ধকার হইয়া দোঁহার গায়ে পড়ে।।
নারাচ ভূষণ্ডী আর পরিঘ তোমর।
নানা অস্ত্র ফেলে দোঁহে দোঁহার উপর।।
কেহ পরাভব নহে সম দুই জন।
দোঁহাকার অস্ত্র দোঁহে করি নিবারণ।।
নকুলের সনে যুঝে বিকর্ণ কুমার।
দোঁহাকার দোঁহে অস্ত্র করে অবতার।।
শিখণ্ডী সহিত যুঝে বীর দুঃশাসন।
অন্যে অন্যে দোঁহে করে বাণ বরিষণ।।
সংগ্রামেতে প্রচণ্ড শিখণ্ডী মহাবীর।
ষষ্টি বাণে বিন্ধে দুঃশাসনের শরীর।।
দুই বাণে সারথিরে বিন্ধে ততক্ষণ।
চারি বাণে চারি অশ্ব করিল নিধন।।
অষ্ট বাণে ধ্বজচ্ছত্র কৈল খণ্ড খণ্ড।
দুই বাণে দুঃশাসনে কৈল লণ্ডভণ্ড।।
গদা হাতে করি বীর পড়ে ভূমিতলে।
সিংহনাদ করিল শিখণ্ডী মহাবলে।।
হাতে ধনু করি বীর ধায় আগুসারি।
মৃগ মারিবারে যেন আইসে কেশরী।।
চারি অশ্ব মারিল মারিয়া গদাবাড়ি।
কেশে ধরি শিখণ্ডীরে ভূমিতলে পাড়ি।।
ধরাধরি বাহুযুদ্ধ কৈল দুই জন।
সহদেব শিখণ্ডীরে কৈল পরিত্রাণ।।
মহাবীর সহদেব বিক্রমে বিশাল।
দুঃশাসন উপরে করিল শরজাল।।
দুঃশাসনে রথ আনি যোগায় সারথি।
লাফ দিয়া রথেতে উঠিল মহামতি।।
সহদেব দুঃশাসনে হৈল মহারণ।
নানা অস্ত্র দুই জনে কৈল বরিষণ।।
মহাবীর সহদেব পেয়ে অবসর।
শক্তি ফেলি হানে দুঃশাসনের উপর।।
সেই ঘায়ে দুঃশাসন হৈল অচেতন।
রথ লয়ে সারথি বাহুড়ে ততক্ষণ।।
তবে ত শকুনি বীর ক্রোধ হৈল মনে।
নানা অস্ত্র মারি বিন্ধে মাদ্রীর নন্দনে।।
শকুনিরে দেখি বীর কহয়ে কাহিনী।
শুন রে পাপিষ্ঠ দুষ্ট অধম শকুনি।।
পূর্ব্বের প্রতিজ্ঞা মোর জান ভালমতে।
সেই কাল হৈল এই কহিনু তোমাতে।।
পাশাকালে যতেক করিলে অপমান।
তাহার উচিত ফল পাবে মোর স্থান।।
সবংশেতে যমঘর যাবি মোর হাতে।
বিধাতার শক্তি ইহা নারিবি রাখিতে।।
এত বলি আকর্ণ পূরিয়া মারে বাণ।
রথধ্বজ শকুনির কৈল খান খান।।
সারথিরে দুই বাণ করিল প্রহার।
বজ্রেতে পর্ব্বত যেন হইল বিদার।।
চারি বাণে চারি অশ্ব কৈল অষ্টখান।
শকুনির হৃদয়ে মারিল দশ বাণ।।
সর্ব্বাঙ্গে রুধির পড়ে নাহি ভুরূভঙ্গ।
পুষ্পিত কিংশুক যেন শকুনির অঙ্গ।।
তবে ত শকুনি বরি রণে প্রাণ ধরি।
সারথিরে আগু হৈতে কহে ক্রোধ করি।।
শকুনিরে শক্তি ফেলি মারে ততক্ষণ।
সেই ঘায়ে শকুনি হইল অচেতন।।
রথ লয়ে সারথি বাহুড়ে ততক্ষণ।
শকুনি লইয়া গেল যথা দুর্য্যোধন।।
শকুনির ভঙ্গ দেখি শকুনির দল।
পাছে নাহি চাহে কেহ পলায় সকল।।
পলাইয়া লয় সৈন্য ভীষ্মের শরণ।
আশ্বাসিল সর্ব্ব সৈন্যে গঙ্গার-নন্দন।।
দুই দলে সৈন্যের হইল হানাহানি।
লিখনে না যায় যত পড়িল বাহিনী।।
দুই দলে পড়িল অনেক রথিগণ।
ধ্বজচ্ছত্র গজ বাজী পত্তি অগণন।।
কনক রচিত ধ্বজে পৃথিবী পূরিল।
অশোক-কানন যেন বসন্তে ফুটিল।।
ভাদ্রমাসে পাকা তাল পড়ে যেন ঝড়ে।
সারি সারি অশ্ব হস্তী এককালে পড়ে।।
শত শত মুণ্ড পড়ে শুনি দড়বড়ি।
কবচ কুণ্ডল পড়ে অস্ত্রগণ বেড়ি।।
নানা অলঙ্কারেতে ছাইল রণপুরী।
পড়িল অনেক সৈন্য লিখিতে না পারি।।
মহাবীর গঙ্গাসুত সমরে প্রচণ্ড।
পাণ্ডবের সৈন্য কাটি করে খণ্ড খণ্ড।।
কাহার কাটিল হাত ধনুক সহিতে।
মস্তক কাটিয়া কার পাড়িল ভূমিতে।।
মধ্যে মধ্যে কাহারে করিল খণ্ড খণ্ড।
কাহার কাটিয়া পাড়ে ছত্র ধ্বজদণ্ড।।
কাহার কাটিল নাক কাহার শ্রবণ।
মধ্যে মধ্যে চিরিয়া ফেলিল কত জন।।
এইরূপে যুদ্ধ হৈল তৃতীয় প্রহর।
অনেক করিল যুদ্ধ গঙ্গার কোঙর।।
শতসহস্র রথী তবে করিল সংহার।
গজ বাজি পদাতিক মারিল অপার।।
ভীষ্মের বিক্রমে আনন্দিত দুর্য্যোধন।
চিত্তেতে করিল আজি পাণ্ডব নিধন।।
ভীষ্মের বিক্রমেতে ত্রাসিত পাণ্ডুগণ।
সহিতে না পারি ভঙ্গ দিল সর্ব্বজন।।
নানা শক্তি করে পার্থ নিবারিতে নারে।
স্থির নহে সৈন্যগণ পলায় সত্বরে।।
বহু রত্ন করি স্থির কৈল সৈন্যগণ।
আশ্বাসিয়া সৈন্যগণে প্রবেশিল রণ।।
মহাভারতের কথা অমৃত-সমান।
কাহার শকতি তাহা করয়ে বর্ণন।।
মস্তকে বন্দিয়া চন্দ্রচূড় পদদ্বন্দ্ব।
কাশীরাম দাস কহে পাঁচালি-প্রবন্ধ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *