০১. যুধিষ্ঠিরের প্রতি ব্যাসের উপদেশ

জিজ্ঞাসেন জন্মেজয়, কহ তপোধন।
অতঃপর কি করিলা পিতামহগণ।।
কিরূপে বৈভব ভোগ কৈল পঞ্চজন।
কিবা ধর্ম্ম উপার্জ্জিল পালি প্রজাগণ।।
শরশয্যাগত ভীষ্ম গঙ্গার নন্দন।
কি হেতু উত্তরায়ণে ত্যজেন জীবন।।
কিবা যোগধর্ম্ম কহিলেন যুধিষ্ঠিরে।
বিস্তার করিয়া মুনি বলহ আমারে।।
মুনি বলে, অবধান করহ রাজন।
হস্তিনা নগর মাঝে ধর্ম্মের নন্দন।।
মহাধর্ম্মশীল রাজা প্রতাপে তপন।
শীলতায় চন্দ্র যেন, তেজে বৈশ্রবণ।।
সর্ব্বত্র সমান ভাব গুণে গুণধাম।
প্রজার পালনে যেন পূর্ব্বে ছিল রাম।।
নানা বাদ্য বাজে সদা শুনিতে কৌতুক।
হস্তিনা নগরবাসী সবাকার সুখ।।
জ্ঞাতি বন্ধুজন সবে সতত আনন্দ।
মহারাজ বিদ্যাশীল সকলি স্বচ্ছন্দ।।
রাজার প্রসাদে রাজ্যে সর্ব্বলোকে সুখী।
মৌন হয়ে মহারাজ রহে অধোমুখী।।
নাহি রুচে অন্নজল কান্দিয়া ব্যাকুল।
পাত্র মিত্র ভ্রাতা আদি ভাবিয়া আকুল।।
নৃপতির শোকে শোকাতুর সর্ব্বজন।
একদিন ভীম পার্থ মাদ্রীর নন্দন।।
পাত্র মিত্র বন্ধু আর ধৌম্য তপোধন।
নানামতে নৃপে করে প্রবোধ অর্পণ।।
অনেক প্রকারে সবে বুঝায় রাজারে।
যোগমার্গ কথা কহি অনেক প্রকারে।।
না শুনেন কারো বাক্য রাজা যুধিষ্ঠির।
ভীষ্ম পিতামহ-শোকে আপনি অস্থির।।
জলহীন হয় যেন কমলের বন।
বৃহস্পতি বিনা যেন সহস্রলোচন।।
সূর্য্যের অভাবে যেন কমলের দল।
ভীষ্ম দ্রোণ বিনে তেন নৃপতি সকল।।
নিরবধি এই চিতে চিন্তেন রাজন।
চাহেন আপন দেহ করিতে নিধন।।
অনাহারে বিষাদিত ক্ষীণ কলেবর।
জানিয়া রাজার কষ্ট ব্যাস মুনিবর।।
অতি শীঘ্র আসিলেন বাজার সদন।
উচিত বিধানে পূজা করেন রাজান।।
পাদ্য অর্ঘ্য দেন, বসিবারে সিংহাসন।
সুবাসিত জলে করি পাদ প্রক্ষালন।।
সুস্থ হয়ে আসনেতে বসি মহামুনি।
রাজারে বিমনা দেখি জিজ্ঞাসে কাহিনী।।
কি হেতু চিন্তিত রাজা জিজ্ঞাসি তোমারে।
কোন্ সুখে হীন তুমি এই চরাচরে।।
ইন্দ্রের সমান তব চারি সহোদর।
সর্ব্বগুণান্বিত, রণে মহাধনুর্দ্ধর।।
বাহুবলে শত্রুগণে করিয়া সংহার।
হস্তিনাতে অভিষেক করিল তোমার।।
সবে অনুগত তব ভ্রাতা-বন্ধুগণ।
কিঙ্কর সদৃশ সবে করয়ে সেবন।।
সংসারের হর্ত্তা কর্ত্তা দেব জগৎপতি।
আজ্ঞাকারী তব, সদা খ্যাত বসুমতী।।
তেজে যশে বলে ধর্ম্মে প্রজা পালনেতে।
তোমার সদৃশ রাজা নাহি পৃথিবীতে।।
ইহা শুনি প্রণমিয়া কহেন ভূপতি।
আমার দুঃখের কথা শুন মহামতি।।
জগতে না জন্মে পাপী সদৃশ আমার।
রাজ্যলোভে জ্ঞাতি বন্ধু করেছি সংহার।।
কল্পতরু পিতামহ ভীষ্ম কুরুনাথ।
রাজ্যভোগ হেতু তাঁরে করেছি নিপাত।।
দ্রোণ গুরু আদি যত সুহৃদ সুজন।
সংহার করিনু আমি, রাজ্যের কারণ।।
এ তনু রাখিয়া আর কিবা প্রয়োজন।
মহাপাপ করিলাম ভোগের কারণ।।
এই হেতু অনাহারে আপনার কায়।
করিব নিপাত আমি, আছি এ আশায়।।
মুনি বলে, অবধান কর জন্মেজয়।
এত শুনি হাসি বলে ব্যাস মহাশয়।।
ধর্ম্মশাস্ত্রজ্ঞাতা তুমি ধর্ম্মের নন্দন।
জ্ঞানবান হয়ে, হেন কহ কি কারণ।।
অনন্ত প্রকার জ্ঞান বেদের বচন।
তাহা পাসরিলে কেন না বুঝি কারণ।।
অনন্ত প্রকার জ্ঞান বেদের বচন।
তাহা পাসরিলে কেন না বুঝি কারণ।।
জ্ঞান হতে লভে ধর্ম্ম, জ্ঞানে পাপ খণ্ডে।
জ্ঞানের প্রতাপে সবে তরে যমদণ্ডে।।
অনন্ত লোচন জ্ঞান শুন মহাজন।
তোমাতে সে দিব্যজ্ঞান আছে হে রাজন।।
কহিলে যে মহাপাপ কৈলে উপার্জ্জন।
জ্ঞাতিবধ মহাপাপ কহে সর্ব্বজন।।
তার হেতু কহি রাজা শুন দিয়া মন।
ধার্ম্মিক জনের পাপ নহে কদাচন।।
তুলারাশি সম পাপ শুনহ রাজন।
ধর্ম্মের প্রতাপে ভস্ম হয় সেইক্ষণ।।
সংসারের হর্ত্তা কর্ত্তা দেব দামোদর।
যাঁর নাম লৈলে পাপহীন হয় নর।।
যাঁর নাম কীর্ত্তন শ্রবণ দরশনে।
অশেষ পাপীর পাপ খণ্ডে সেইক্ষণে।।
সদাকালে সঙ্গে রাজা সেই নারায়ণ।
কেন যুদ্ধে পাপ-ভয় চিন্তহ রাজন।।
কি হেতু আপন প্রাণ চাহ ছাড়িবারে।
আত্মহত্যা সম পাপ নাহিক সংসারে।।
ব্রহ্মবধ নারীবধ গোহত্যা কারণ।
ইহাতে নিষ্কৃতি আছে বেদের বচন।।
আত্মহত্যা পাপে রাজা নাহিক নিষ্কৃতি।
আগম পুরাণ যত বেদের ভারতী।।
জানিয়া শুনিয়া হেন চিন্তহ রাজন।
যদি বা আছয়ে রাজা ভ্রান্ত তব মন।।
মহাভারতের কথা অমৃত-লহরী।
শুনিলে অধর্ম্ম খণ্ডে, পরলোকে তরি।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *