৪.২ চতুর্থ কাণ্ড। দ্বিতীয় প্রপাঠক

চতুর্থ কাণ্ড। দ্বিতীয় প্রপাঠক  

প্রথম অনুবাক

মন্ত্র- বিষ্ণোঃ ক্রমোহস্যভিমাতিহা গায়ত্ৰং ছন্দ আ রোহ পৃথিবীমনু বি ক্রমস্ব নির্ভক্তঃ স যঃ দ্বিমো বিষ্ণোঃ ক্রমোহস্যভিশস্তিহা ত্রৈভং ছন্দ আ রোহান্ত রিক্ষমনু বি ক্রমস্ব নির্ভক্তঃ স যং দ্বিন্মো বিষ্ণোঃ ক্রমোহস্যরাতীয়তো হস্তা জাগতং ছন্দ আ রোহ দিবমনু ক্রম নির্ভক্তঃ স ষং দ্বিন্মো বিষ্ণোঃ ক্রমোহসি শয়তো হস্তানুষ্ঠুভং ছন্দ আরোহ দিশোহনু বি ক্রমস্ব নির্ভক্তঃ স যং দ্বিঃ। অক্রন্দদগ্নিস্তনয়ন্নিব দ্যৌঃ ক্ষামা রেরিহদ্বীরুধঃ সমঞ্জ। সদ্যৌ জজ্ঞানো বি হীমিদ্ধো অখ্যদা রোদসী ভানুনা ভাত্যন্তঃ। অগ্নেহভ্যাবৰ্ত্তিন্নভি ন আ বৰ্তাইয়ুষা বৰ্চসা সন্যা মেধয়া প্ৰজয়া ধনেন। অগ্নে অঙ্গিরঃ শতং তে সন্ত্রাবৃতঃ সহস্রং ত উপবৃতঃ। তাসাং পোষস্য পোষেণ পুনর্দো নষ্টমা কৃধি পুননৌ রয়িমা কৃষি পুনরুজ্জা নি বৰ্ত্ত পুনরগ্ন ইষাহযুষা। পুনর্নো নষ্টমা কৃধি পুনর্নেী রয়িমা কৃধি পুনরুজ্জা নি বর্ত পুনরগ্ন ইষাহযুষা। পুনর্নঃ পাহি বিশ্বতঃ। সহ রয্যা নি বর্তাগ্নে পিন্বস্ব ধারয়া। বিশ্বপশ্রিয়া বিশ্বম্পরি। উদুত্তমং বরুণ পাশামস্মদবাধমং বি মধমং শ্ৰথায়। অথা বয়মাদিত্য ব্রতে তবানাগসো অদিতয়ে স্যাম। আ ত্বাহহাৰ্যমন্তরভূবস্তিষ্ঠাবিচাচলিঃ। বিশস্থা সৰ্ব্বা ব্যঞ্জস্মিন্ রাষ্ট্রমধি শ্রয়। অগ্নে বৃহষসামূৰ্গো অস্থানির্জন্মিবান্তমসো জ্যোতিষাহগাৎ। অগ্নির্ভানুনা রুশতা স্বঙ্গ আ জাততাবিশ্বা সম্মন্যপ্রাঃ। সীদ ত্বং মাতুরস্যাঃ উপস্থে বিশ্বান্যগ্নে বয়ুনানি বিদ্বান্। মৈনামৰ্টিষা মা তপসাহভি শুশুচোন্তেরস্যাং শুকজ্যোতির্বি ভাহি অন্তরগ্নে রুচা ত্বমুখায়ৈ সদনে স্বে। তস্যাং হরসা তপঞ্জাবেদঃ শিবা ভব। শিবব ভূত্বা মহ্যমগ্নেহথো সীদ শিবস্তু। শিবাঃ কৃত্বা দিশঃ সৰ্ব্বাঃ স্বাং যোনিমিহাহসদঃ। হংসঃ শুচিম্বসুরন্তরিক্ষসদ্বোতা বেদিষদতিথির্দুরোণসৎ। নৃষদ্বরসদৃতসদ্যোমসদা গোজা ঋতজা অদ্রিজা ঋতং বৃহৎ ॥১॥

 [সায়ণাচার্য বলেন–প্রথমানুবক আসন্দ্যাভিমুখাগ্নিস্থাপনং প্রতিপাদ্যতে। অর্থাৎ–এই প্রথম অনুবাকে উখায় অগ্নি স্থাপনের বিষয় প্রতিপাদিত হয়েছে]।

মর্মার্থ- বিষ্ণু অর্থাৎ সর্বব্যাপ্ত দেবতা তাঁর ত্রিপাদিবিক্ষেপে তিন লোক অধিকার করেন। এখানে ত্রিপাদ বিক্ষেপে তিনটি লোক এবং চতুর্থ পাদবিক্ষেপে সর্ব দিকে অধিকার সম্পর্কিত মন্ত্র উধৃত হচ্ছে। ইত্যাদি)।–হে প্রথম পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর পাপঘাতী (বা পাপরূপ শত্রুঘাতী) ক্রম হও; তুমি গায়ত্রী ছন্দ গ্রহণ পূর্বক এই পৃথিবীতে বা ভূদেবতারূপ প্রদেশে আগম করো; যাকে আমরা দ্বেষ করি, সে এই প্রদেশ হতে নিঃসারিত (বহিস্কৃত) হোক। সেইরকম, হে দ্বিতীয় পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর মিথ্যাপবাদঘাতী ক্রম হও; তুমি ত্রিষ্ঠুভ ছন্দ গ্রহণ পূর্বক অন্তরীক্ষলোক প্রাপ্ত হও; যাকে আমরা দ্বেষ করি সে এই প্রদেশ হতে নিঃসারিত হোক। হে তৃতীয় পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর অরাতিঘাতী ক্রম হও; তুমি জগতী ছন্দ গ্রহণ পূর্বক দ্যুলোক প্রাপ্ত হও; যাকে আমরা দ্বেষ করি, সে এই প্রদেশ হতে নিঃসারিত হোক। হে বিষ্ণুর চতুর্থ পাদবিন্যাস! তুমি বিষ্ণুর শহন্তারক ক্রমরূপে অনুষ্টুপ ছন্দ গ্রহণ পূর্বক সকল দিক প্রাপ্ত হও; যাকে আমরা দ্বেষ করি, সে এই প্রদেশসমূহ হতে (অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোক হতে) নিঃসারিত হোক। (এখানে গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দ-অভিমানী দেবতা প্রতিটি ক্রমের অনুগ্ৰাহিকারূপে চিহ্নি)।–যেমন দুলোকস্থায়ী মেঘ শস্যের শোষণভীতি দূর করার নিমিত্ত গর্জন করে, অর্থাৎ দাহ বা তাপের প্রভাব দুর করে বৃক্ষলতা ইত্যাদিকে সমৃদ্ধ করার অনুকূলে সম্যক গর্জন করে, সেইরকম এই অগ্নি আমাদের অনিষ্ট নিবারণের নিমিত্ত গর্জন করুন (গজ)। এই অগ্নি সদ্য উৎপদ্যমান হয়ে দ্যাবাপৃথিবীর অন্তরলোক আপন রশ্মিতে উদ্ভাসিত করে থাকেন। হে অগ্নি! আপনি আমাদের অপমৃত্যুরহিত আয়ু (অর্থাৎ পূর্ণ আয়ু), বর্চ (অর্থাৎ কান্তি বা বল), মেধা (অর্থাৎ শ্রুত বিষয়সমূহকে ধারণশক্তি), প্রজা (পুত্র ইত্যাদি) ও ধন (অর্থাৎ সুবর্ণ) দানের নিমিত্ত আমাদের নিকট আগমন করুন। হে অঙ্গসৌষ্ঠবযুক্ত অগ্নি! আপনার আবর্তনশক্তি শতসংখ্যক হোক, এবং আপনার উপবৃত্তি শক্তি সহস্ৰসংখ্যক হোক। আমাদের প্রতি স্নেহাতিশয় প্রযুক্ত আপনি পুনঃ পুনঃ (অগণিতবার) আগমন করুন এবং আপনার পুরুষ ইত্যাদি ও দ্রব্যসমূহ পুনঃ পুনঃ (অসংখ্যবার) আগত হোক। আপনার পোষণের দ্বারা আমাদের নষ্ট ধন অযুত-লক্ষ ইত্যাদি সংখ্যায় পুনঃ পুনঃ লব্ধ করান এবং পূর্বে অপ্রাপ্ত ধন আমাদের প্রাপ্ত করান। হে অগ্নি! আপনি বলপ্রদ ক্ষীর ইত্যাদি রসের সাথে পুনঃ পুনঃ এখানে আগমন করুন, আপনি আয়ু-বৃদ্ধিকারক অন্নের সাথে পুনঃ পুনঃ এখানে আগমন করুন, এবং আমাদের দ্বারা পুনঃ পুনঃ কৃত সকল অপরাধ হতে রক্ষা করুন। হে অগ্নি! ধনের সাথে আপনি নিবর্তিত (প্রত্যাবর্তিত) হোন। সকলের পেয় (বিশ্বস্ত্রী) বৃষ্টিধারা তৃণধান্য লতা ও পাদপ ইত্যাদির উপরে সিঞ্চন করুন। হে বরুণ! উত্তমাঙ্গে অর্থাৎ মস্তকে স্থাপিত আপনার পাশ আকর্ষণ পূর্বক নমিত করে উৎকৃষ্টভাবে বিনাশ করুন। অধমাঙ্গে অর্থাৎ পাদপ্রদেশে স্থাপিত আপনার পাশ আকর্ষণ পূর্বক বিনাশ করুন। মধ্যদেশে অর্থাৎ দেহের মধ্যভাগে স্থাপিত আপনার পাশ বিচ্ছিন্ন করুন। অনন্তর, অর্থাৎ পাশত্রয় বিনাশের পর, হে আদিত্যসদৃশ বরুণ, আমরা পাপরহিত হয়ে আপনার ব্রতে বা কর্মে অখণ্ডিতভাবে (ছেদহীনরূপে) যোগ্য হবে (যোগ্যা ভবেম)। হে অগ্নি! আপনি আহৃত হয়েছেন (অর্তাৎ আপনাকে আহরণ করা হয়েছে);উখার অভ্যন্তরে চলনরহিত হয়ে অর্থাৎ স্থির হয়ে অবস্থান করুন। সকল প্রজা, আপনাকে বাঞ্ছা করে; আপনি এই যজমানেক অধিপতিরূপে স্থাপন করুন। এই অগ্নি উষাকালে অগ্নি হোত্র ইত্যাদি বোধ্যমান হয়ে উখিত হয়েছেন এবং আপন তেজঃ প্রভাবে তমসা হতে (আলোকের মধ্যে) নির্গত হচ্ছেন। (সেই অগ্নি কিরকম? না,) তিনি তমসার হিংসক, রশ্মির দ্বারা সু-অঙ্গশালী (অর্থাৎ শোভন শরীরধারী), এবং উৎপন্ন হওয়া মাত্র আপন তেজঃপ্রভাবে সকল স্থান: পূর্ণ করেছেন। হে অগ্নি। আপনি মাতৃসমা এই উখার উৎসঙ্গে (ক্রোড়ে) উপবেশন করুন। (উপবেশন করে আপনার করণীয় বা অকরনীয় কি? না, আপনি সর্বজ্ঞানীরূপে সকল উপায় বিদিত আছেন, সুতরাং এই উখাকে অত্যন্ত তাপ দেবেন না। এই উখার অন্তরে আপনার শুক্লজ্যোতির (পবিত্র জ্যোতির) নির্মল প্রকাশে আপনি বিশেষভাবে দীপ্ত হোন।–হে অগ্নি! এই উখার অন্তরে, আপনার নিজস্ব স্থানকে দীপ্তিযুক্ত করুন। হে জাতবেদা! আপনি তেজের দ্বারা দীপ্ত হয়ে এই উখার সুখপ্রদ হোন (ভব)। হে অগ্নি! প্রথমে আমার নিমিত্ত শান্ত হয়ে, অনন্তর সকলের প্রতি শান্ত ভাবাপন্ন হয়ে উপবেশন করুন। সকল দিককে শান্ত করে আপনি আপনার আপন সৃষ্টিস্থান এই উখাতে আগমন পূর্বক উপকেশন করুন। স্বয়ং আহবনীয় ইত্যাদি সম্পন্ন দেশে (অর্থাৎ যে স্থানে যজন বা যজ্ঞসাধন ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, সেই স্থানে) গমন করে যজমানকে স্থাপন পূর্বক এই শত্রুনাশক অগ্নি যজ্ঞক্রিয়া সম্পন্ন করুন। এই অগ্নি অন্তরীক্ষে ধুম্রজ্বালারূপে অবস্থান করেন; তিনি হোতা, অর্থাৎ দেবগণের আহ্বাতা; তিনি বেদিষৎ, অর্থাৎ যজ্ঞসম্বন্ধিনী বেদীতে আসীন; তিনি অতিথিদুরোণসৎ, অর্থাৎ অতিথিসমান হয়ে যজমানে গৃহে অবস্থিত; তিনি নৃষৎ, অর্থাৎ মনুষ্যের মধ্যে জঠরাগ্নিরূপে অবস্থিত; তিনি বরসৎ, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠরূপে শ্রোত্রিয় বা বেদাধ্যায়ী ব্রাহ্মণের গৃহে অবস্থিত; তিনি ঋতসৎ, অর্থাৎ যজ্ঞে যজ্ঞনিম্পাদকরূপে অবস্থিত; তিনি ব্যোমসৎ, অর্থাৎ ব্যোমে বা আকাশে সূর্যরূপে অবস্থিত; তিনি ত্যা, অর্থাৎ বৃষ্টিধারায় বিদ্যুরূপে প্রাদুর্ভূত; তিনি গোজা, অর্থাৎ গো-কার্যে বা ঘৃতে জ্বালারূপে অবস্থিত, (অর্থাৎ অগ্নিতে ঘৃত আহুতি দেওয়ার ফলে শিখা বা জ্বালার উৎপত্তিকারক); তিনি অদ্রিজা, অর্থাৎ পর্বতে দাবনলরূপে জাত। এইরকম প্রৌঢ় অগ্নি চয়নোপেত হয়ে যজ্ঞ নিম্পাদন করুন। এই মন্ত্রগুলির সাথে ৫ম কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥১॥

[সায়ণাচার্য বলেন–তস্যাগ্নেরূপস্থানমুচ্যতে। অর্থাৎ-এই দ্বিতীয় অনুবাকে অগ্নির উপস্থান (উপস্থিতি) সম্পর্কে বলা হয়েছে।]

.

দ্বিতীয় অনুবাক

মন্ত্র- দিবম্পরি প্রথমং যজ্ঞে অগ্নিরস্মদ্বিতীয়ং পরি জাতবেদাঃ। তৃতীয়মসূ নৃমণা অজশ্রমিন্ধান এবং জরতে স্বাধীঃ।। বিরা তে অগ্নে ত্রেধা ত্রয়াণি বিন্না তে সদ্ম বিভূতং পুরুত্ৰা। বিদ্মা তে নাম পরমং গুহা যদ্বিগ্ন মুসংযত আজগন্থ। সমুদ্রে দ্বা নৃমণা অপুস্বচক্ষা ঈধে দিবো অগ্ন উধন। তৃতীয়ে ত্বা রজসি তস্তিবাংসমৃতস্য যোনৌ মহিষা অহিন্বন অক্রন্দদগ্নিঃ স্তনয়ন্নিব দ্যৌঃ ক্ষামা রেরিহদ্বীরুধঃ সমঞ্জন। সদৌ জজ্ঞানো বি হীমিদ্ধো অখ্যদা রোদসী ভানুনা ভাত্যন্ত। উশিপাবকো অরতিঃ সুমেধা মর্তেগ্নিরমৃতো নি ধায়ি। ইয়র্তি ধূমমরুষং ভরিভ্রদুছুক্রেণ শোচি দ্যামিনক্ষৎ। বিশ্বস্য কেতুর্ভূবনস্য গর্ভ আ য়োদসী অপৃণাজ্জায়মানঃ। বীডুং চিদ্রিমভিনৎ পরাযঞ্জনা যদগ্নিময়জন্ত পঞ্চ। শ্ৰীণামুদারো ধরুণো রয়ীণাং মনীষাণাং প্রার্পণঃ সোমগোপাঃ। বসোঃ সূনুঃ সহসসা অ রাজা বি ভ্রাত্যগ্র উষসামিধানঃ। যস্তে অদ্য কৃণবস্তুদ্রশোচেহপূপ দেব ঘৃতবন্তমগ্নে। প্র তং নয় প্রতরাং বমস্যা অচ্ছাভি দ্যুম্নং দেবভক্তং যবিষ্ঠ। আ তং ভজ সৌশবসেম্বগ্ন উথউথ আ ভজ শস্যমানে। প্রিয়ঃ সূর্যে।  প্রিয়ো অগ্না ভবাত্যুজ্জাতেন ভিনদুজ্জনিত্বৈঃ। ত্বমগ্নে যজমানা অনু দ্বান্বিশ্বা বসুনি দধিরে বাৰ্য্যাণি ত্বয়া সহ দ্রবিণমিচ্ছমানা ব্ৰজং গোমমুশিজো বি বঃ। দৃশানো রুক্স উৰ্ব্যা ব্যদৌদুৰ্ম্মমায়ুঃ শ্রিয়ে। রুচানঃ।। অগ্নিরমৃতো অভবদ্বয়োভিৰ্য্যদেনং দৌরজনয়ৎ সুরেতাঃ ॥২॥

মর্মার্থ- অগ্নি প্রথমে দিবস্পরি অর্থাৎ দুলোকের উপরে সূর্যরূপে উৎপন্ন হয়েছেন। তাঁর দ্বিতীয় জন্ম হলো আমাদের এই মনুষ্যলোকে প্রসিদ্ধ জাতবেদা বহ্নিরূপে। সমুদ্রে বড়বানলরূপে উৎপত্তি তার তৃতীয় জন্ম। এই অগ্নি যজমানের প্রতি অনুগ্রহবুদ্ধি সম্পন্ন। পুরোডাশ ইত্যাদির দ্বারা দীপয়ন (উদ্দীপ্ত) করে জরা পর্যন্ত এই হেন অগ্নির পরিচর‍্যা করা হয়ে থাকে।–হে অগ্নি! পূর্ববর্তী মন্ত্রে আদিত্য, অগ্নি ও বড়বানল নামে আপনার যে তিনটি রূপের কথা উক্ত হয়েছে, আমরা সেই তিনটি রূপ জ্ঞাত হতে ইচ্ছা করব। নানা স্থানে আপনার প্রতিপালিত গার্হপত্য, আহবনীয়, অন্বহার্য, পচন, আগ্নীখ্রীয়, শামিত্র ইত্যাদি নামে অবস্থান আছে, আমরা জ্ঞাত হতে ইচ্ছা করব। এবং আপনার যতগুলি পরম উৎকৃষ্ট মন্ত্রপ্রতিপাদ্য গোপন নাম আছে, আমরা তাও বিদিত হতে চাইব। অধিকন্তু বিদ্যুঞ্জপে আগত আপনার উৎসও বিদিত হতে চাইব।–হে অগ্নি! যজমান আমি আপনাকে দীপ্ত করছি। (কিরকম যজমান? না,) নৃমণা, অর্থাৎ কর্মানুষ্ঠানপর মনুষ্য ঋত্বিকগণের মনের অনুসন্ধানকারী; নৃচক্ষা, অর্থাৎ বেদপারগ মনুষ্যগণের মধ্যে মন্ত্র ইত্যাদির স্পষ্ট উচ্চারণকারী। (আপনি কিরকম? না,) আপনি সমুদ্রে বড়বানলরূপে স্থিত, বৃষ্টিধারার মধ্যে বিদ্যুঞ্জপে স্থিত, এবং দুলোকের ঊধ (অর্থাৎ স্তন) স্থানীয় রঞ্জনাত্মক তেজোমণ্ডলে সূর্যরূপে স্থিত। মহিমান্বিত যজমানবৃন্দ যজ্ঞ সম্বন্ধিনী বেদিস্থানে স্থিত আপনাকে (আহুতির দ্বারা) প্রীত করেন। দ্যুলোকস্থ মেঘ যেমন পৃথিবীস্থ শস্যের শেষে বা শুষ্ক হবার ভীতি নিবারণের নিমিত্ত গর্জন করে বৃক্ষ ও পুষ্পলতা ইত্যাদির উপর সম্যক বর্ষণ করে, সেইভাবে আমাদের অনিষ্ট অনিষ্ট নিবারণের নিমিত্ত এই অগ্নি গর্জিত হোন। এই অগ্নি সদ্য উৎপদ্যমান হয়ে দ্যাবাপৃথিবীর অন্তরদেশ আপন রশিপ্রভাবে উদ্ভাসিত করে সবকিছুই প্রকাশ করছেন। আমাদের প্রতি অনুগ্রহকারী, পাবক অর্থাৎ শোধনকারী, অরতি অর্থাৎ যাগরহিত জনের প্রতি প্রীতিরহিত, সুমেধা (শোভম মেধা) অর্থাৎ সেবকগণের অভিপ্রায় ধারণশক্তি সম্পন্ন, অমৃত অর্থাৎ মরণরহিত–এই হেন যে অগ্নি, তিনি এই মর্ত্যলোকে (মনুষ্যগণের মধ্যে) নিহিত রয়েছেন। এই অগ্নি চক্ষু ইত্যাদির উপর উপদ্রবরহিত হয়ে উর্ধ্বে অতিশয় ধূম বিস্তার পূর্বক নির্মল প্রভারূপে দ্যুলোকে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন (ব্যাপ্নোতি)। বিশ্বের কেতু, অর্থাৎ জগতের জ্ঞাতা; ভুবনের গর্ভবৎ অর্থাৎ ভুবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী এই অগ্নি জামাত্র (অর্থাৎ জন্মলাভ মাত্রই) আপন তেজে দ্যাবাপৃথিবী পূর্ণ করছেন। যজমানের সাথে ঋত্বিকরূপী পঞ্চসংখ্যক জন যখন অগ্নির উদ্দেশে যাজ্ঞানুষ্ঠানে রত হন, তখন এই অগ্নি আহুতিরূপে অদিত্যের সমীপে গমনের নিমিত্ত পর্বতসমান মেঘ ভেদ করে থাকেন (বিদারিতবা)। শ্ৰীণাং অর্থাৎ গো অশ্ব ইত্যাদি সম্পদের উৎকর্ষ প্রাপয়িতা (অর্থাৎ যাঁর সহায়তায় ঐ সম্পদের উৎকর্ষতা প্রাপ্তি ঘটে), ধরুণণা রয়ীণাং অর্থাৎ যিনি ধনসমূহ ধারণ বা রক্ষণ করে থাকেন, মনীষাণং প্রাপণঃ অর্থাৎ মনীষীগণের পক্ষে স্বর্গ ইত্যদি ফলের প্রাপয়িতা (অর্থাৎ যার দ্বারা জ্ঞানী ব্যক্তিগণ তাঁদের সুকর্মজনিত শোভন ফল প্রাপ্ত হয়ে থাকেন), সোমগোপা অর্থাৎ যজমানের দ্বারা অনুষ্ঠিত সোমযাগের রক্ষক, বসো অর্থাৎ নিবাসের হেতুস্বরূপ, সৃণু সহসো অর্থাৎ মথনবেগরূপ বলের পুত্র, অসু রাজা অর্থাৎ বৃষ্টিরূপ জলে বিদ্যুত্রপে দীপ্যমান,–এই হেন অগ্নি উষার অগ্রে (প্রাতঃকালে) অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক দীপ্যমান হয়ে বিশেষভাবে রমণীয় হয়ে উঠছেন। হে কল্যাণময় দীপ্তিশালী অগ্নিদেব (ভদ্রশোছে)! যে যজমান অদ্য আপনার নিমিত্ত ঘৃতযুক্ত পিষ্টক অর্থাৎ পুরোডাশ প্রস্তুত করছেন, হে যুবতম! দেবতায় ভক্তিযুত সেই পুরোডাশকারী যজমানের প্রতি তার অভিমত ধন (দ্যুম্ন) প্রকর্ষের সাথে প্রেরণ করুন। (কিরকম দ্যুম্ন? না,) প্রকৃষ্টতর অর্থাৎ অতিশয়ভাবে নিবাসের কারণরূপ দ্যুম্ন। এই যজমান সূর্যের প্রিয় হোন, ইনি অগ্নিরও প্রিয় হোন; এবং জাত পুত্র ও জনিষ্যমান (অর্থাৎ জন্ম হবে, এমন) পৌত্র ইত্যদির দ্বারা এই যজমান বৃদ্ধি লাভ করুন (জনিষ্যমাণৈঃ পৌত্রাদিভিশ্চোনিদ)। হে অগ্নি! প্রতিদিন সকল যজমান আপনার অনুগমন পূর্বক সকল বরণীয় ধন ধারণ করতে সমর্থ হন। আপনার সাথে অবস্থানকারী যজমানগণ পুনরায় অধিক দ্রব্য কাঙ্ক্ষা পূর্বক বহু গাভীযুক্ত ব্ৰজ (গো-নিবাসস্থান গোষ্ঠ) বিশেষভাবে বরণ করেছেন। দৃশানো অর্থাৎ দর্শনীয়, রুক্স অর্থাৎ সুবর্ণসাদৃশ, উবা অর্থাৎ মহৎ দীপ্তিতে বিদ্যোতিত হয়ে অগ্নিদেব অবস্থান করছেন। (কি করবেন? না,) তিনি অন্যের অতিরস্কৃত আয়ু বা জীবন প্রদানের নিমিত্ত অবস্থান করছেন। তথাবিধ এই অগ্নি হবিরূপ অন্নের দ্বারা অমর হয়েছেন এবং স্বর্গবাসী দেবগণের অমরত্বের সাথে যুক্ত হয়েছেন। [এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ১ম অনুবাকের কতিপয় মন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥২॥

[সায়ণাচার্য বলেন–তৃতীয়ে চয়নার্থস্য দেবযজনস্য পরিগ্রহোহভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই তৃতীয় অনুবাকে চয়নের নিমিত্ত বহ্নিকে দেব্যজনস্থানে আনয়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে]

.

তৃতীয় অনুবাক

মন্ত্র- অন্নপতেহস্য নো দেহ্যনমীবস্য শুষ্মিণঃ। প্ৰ প্ৰদাতারং তারি উজ্জং নো ধেহি দ্বিপদে চতুষ্পদে। উদু ত্বা বিশ্বে দেবা অগ্নে ভরন্তু চিত্তিভিঃ। স নো ভব শ্বিবতমঃ সুপ্রতীকো বিভাবসু। প্রেগ্নে জ্যোতিষ্মন্যাহি শিবেভিরভিম। বৃহর্ভিানুভির্ভসম্মা হিংসীন্তনুবা প্রজাঃ। সমিধাহগ্নিং দুবস্যত ঘৃতৈৰ্বোধয়তাতিথি। আ অস্মিনহবা জুহোতেন। প্রয়মগ্নির্ভরতস্য শুথে বি যসূর্যো ন নোচতে বৃহত্তাঃ। অভি যঃ পূরুং পৃতনাসু তন্থেী দীদায় দৈবব্যা অতিথিঃ শিবো নঃ। আপো দেবীঃ প্রতি গৃহীত ভস্মৈতৎ সস্যানে রুণুধ্বং সুরভাবু লোকে। তস্যৈ নমস্তাং জনয়ঃ সুপত্মীৰ্ম্মাতেব পুত্রং বিভৃতা সেন। অপম্বগ্নে সধিষ্টব সৌষধীয়নু রুধ্যমে। গর্ভে সঞ্জায়সে পুনঃ। গর্ভো অস্যোষধীনাং গভর্ভা বনস্পতীনাম। গর্ভো বিশ্বস্য ভূতস্যাগ্নে গর্ভো অমসি। প্রসদ্য ভস্মনা যোনিমপশ্চ পৃথিবীময়ে। সংসৃজ্য মাতৃভিং জ্যোতিন্মান পুনরাংসদঃ। পুনরাসদ্য সদনমপশ্চ পৃথিবীমগ্নে। শেষে মাতুযথোপহেস্তরস্যাং শিবর্তমঃ। পুনরূজ্জা নি বর্ত পুনরগ্ন ইষাইয়ুষা। পুনঃ পাহি বিশ্বতঃ।। সহ রয্যা নি বর্তাগ্নে পিন্বস্ব ধারয়া। বিশ্বপমিয়া বিশ্বতস্পরি।। পুনাহদিত্যা রুদ্ৰা বসবঃ সমিন্ধতাং পুনর্বহ্মাণে বসুনীথ যজ্ঞে। ঘৃতেন ত্বং তনুবো বদ্ধয় সত্যাঃ সন্তু যজমানস্য কামাঃ। বোধা নো অস্য বচসো যবিষ্ঠ মংহিস্য প্রভৃতস্য স্বধাবঃ। পীয়তি তত্বা অনু তো গৃণাতি বারুস্তে তনুবং বন্দে অগ্নে। স বোধি সূরির্মব্য বসুদাবা বসুপতিঃ যুয়োধ্যম্মদন্বেষাংসি৷৩৷৷

মর্মার্থ- হে অন্নপতি অগ্নিদেব! বোগরহিত, বলের হেতুকারক অন্নের প্রাপ্তি আমাদের প্রদান করুন। প্রকর্ষের সাথে হবিসমূহের দাতা যজমানকে প্রকৃষ্টরূপে পাপ হতে উত্তরণ করুন। আমাদের দ্বিপদী মনুষ্যগণকে ও চতুষ্পদী পশুগণকে বলসম্পন্ন করুন। হে অগ্নিদেব! সকল দেবগণ প্রাণস্বরূপ হয়ে কুশলতাযুক্ত বুদ্ধিবৃত্তির সহযোগে আপনাকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করুন। আপনি আমাদের নিকট শান্ততম, সুপ্রতীক বা সুমুখ ও বিভাবসু বা প্রভার বাসয়িতা রূপী হোন। হে অগ্নিদেব। আপনার শান্ত জ্বালা বা শিখার সাথে প্রকাযুক্ত হয়ে অদ্য দেব্যজন (দেবতাগণের যজন বা যজ্ঞ) স্থানে গমন করুন। বৃহৎ বা উজ্জ্বল রশ্মিতে বিভাসিত বা প্রকাশিত হয়ে আপনার দাহক দেহের দ্বারা প্রজাগণের প্রতি হিংসান্বিত হবেন না (প্রজা মা হিংসী)। হে ঋত্বিক ও যজমানবৃন্দ! সমিধকে ঘৃতের দ্বারা সিক্ত করে এই অগ্নির পরিচর‍্যা করুন। (অর্থাৎ ঘৃতের দ্বারা যেমন অতিথিকে আপ্যায়িত করা হয়, সেইমতো ঘৃতসিক্ত সমিধ (ইন্ধন) অর্পণ করে এই অগ্নিকে উদ্দীপিত করুন)। তারপর এই অগ্নিতে হবিঃসমূহ সমর্পণ পূর্বক সমুদায় যাগ নিষ্পন্ন করুন। এই অগ্নি হবির পোষণকারী যজমানের আহ্বান অতি প্রকৃষ্টরূপে শ্রবণ করেন (শৃণোতু)। এই যে অগ্নি, তিনি সূর্যের ন্যায় অধিক দীপ্যমান (ভাসমান) হয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন। যে অগ্নিদেব সংগ্রামে জয়পূর্তি পূর্বক অবস্থান করেন, সেই অগ্নিদেব অতিথিরূপে আমাদের নিকটে আগমন করুন। (সেই অগ্নি কিরকম? না,) সেই অগ্নি দেবতো হিতঃ, অর্থাৎ দেবতাবর্গের হিতকরী; তিনি শিবঃ, অর্থাৎ পরম-মঙ্গলরূপ। হে জলদেবীগণ (আপো দেবীদেব্যা)! আপনারা অগ্নির উপরে সঞ্চিত ভস্ম গ্রহণ করুন এবং ঐ গৃহীত ভস্ম কোন সুখকর সুগন্ধযুক্ত (সুরভাবু) স্থানে স্থাপন করুন। আপনারা সুপত্ন, অর্থাৎ শোভন বরুণের পত্নী এবং অগ্নির জননী। (উল্লেখ্য-বড়বাগ্নি ও বৈদ্যুতাগ্নির জন্ম জলে)। হে জলদেবীগণ! মাতা যেমন পুত্রকে পালন করেন, সেইমতো আপনারা সাবধানে (সুষ্ঠুভাবে) এই অগ্নিকে পালন করুন। হে অগ্নিদেব! আপনার বল ভস্মরূপ জলে বর্তমান আছে; আপনি ওষধীরূপে ব্রীহি যব ইত্যাদিতে বর্তমান, এবং তা জঠরাগ্নিরূপে স্বীকৃত। (অর্থাৎ ব্রীহি যব ইত্যাদিতে যে ওষধী আছে, তা খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের জঠরস্থ হয়ে জঠরাগ্নির সংস্পর্শ লাভ করে)। অরণ্যগর্ভে স্থিত আপনি পুনঃ পুনঃ সম্যভাবে জাত হবেন। ভেষজরূপ ওষধিবিশেষ হতে উৎপদ্যুমান হওয়ার কারণে আপনি ওষধির গর্ভস্বরূপ হন; আবার, অরণী হতে উৎপদ্যমান হওয়ার কারণে আপনি বনস্পতির গৰ্ভরূপ হন। হে অগ্নি! সর্ব প্রাণীজাতের জঠরে বর্তমান হওয়ার কারণে আপনি জঠরাগ্নিরূপে সকল প্রাণীর গর্ভরূপ আবার বড়বা ও বিদ্যুৎরূপেও জলের গৰ্ভরূপ হন। হে অগ্নি! ভস্মের সাথে আপনার কারণভূতা (যোনিভূতা) পৃথিবী ও পৃথিবীর কারণভূতা জলের সাথে মিলিত হয়ে অর্থাৎ একীভূত হয়ে আপনি জ্যোতিষ্মন জ্যোতি সম্পন্ন হোন এবং পরে আপন স্থান উখাতে আসীন হোন। হে অগ্নিদেব! পুনরায় আপনি আপনার নিজ স্থান জল ও পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে উখার মধ্যে সেইভাবে শান্ত হয়ে শয়ন করে আছেন, যেমন কোন শিশু তার মাতার ক্রোড়ে সুখে শায়িত থাকে। হে অগ্নিদেব! আপনি ক্ষীর ইত্যাদি রসের সাথে পুনরায় নিবর্তিত হয়ে এই স্থানে আগত হোন, পুনরায় আয়ুসমূহ সহ এই স্থানে আগত হোন এবং পুনরায় আমাদের কৃত অপরাধ হতে আমাদের রক্ষা করুন। হে অগ্নিদেব! আপনি ধনের সাথে নিবর্তন পূর্বক এই স্থানে আগমন করুন; আপনি সকলের পানযোগ্য বৃষ্টিধারা সকলের উপরে অর্থাৎ তৃণ-শস্য-লতা-বৃক্ষ ইত্যাদি সকলের উপরে সিঞ্চন করন। হে অগ্নি! আপনাকে আদিত্যগণ, রুদ্রসমূহ ও বসুবৃন্দ পুনরায় সন্দীপিত করুন (সন্দীপয়ন্তু)। হে বসুনীথ (অর্থাৎ ধনের প্রাপয়িতা)! ব্রাহ্মণ-ঋত্বিকবর্গ যজ্ঞের নিমিত্তভূত আপনাকে পুনরায় সন্দীপ্ত করুন। আপনি ঘৃতের দ্বারা তুষ্ট হয়ে আমাদের শরীরগুলিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত করান; কারণ আপনি যদি তুষ্ট হন, তবে যজমানের কামনাসমূহ সত্য হবে (অর্থাৎ পূর্ণ হবে)। হে যুবতম (অগ্নি)! আপনি স্বধা (অর্থাৎ পিতৃলোকের উদ্দেশে জলপিণ্ড দানের মন্ত্র) উপলক্ষিত আমাদের অন্নরূপ স্তুতিবাক্যের তাৎপর্য উপলব্ধি করুন (বুধ্যস্ব)। (কিরকম বাক্য? না,) আপনার অভিবৃদ্ধিহেতু প্রকৃষ্ট আদরের দ্বারা সম্পাদিত বাক্য বা মন্ত্র। আপনার স্তুতিকারী যজমানগণের মধ্যে কেউ আপনার যথোচিত প্রশংসায় স্তুতি করেন, কেউ বা উচিত উক্তি উল্লঙ্ঘন করে নিন্দারূপে অতি প্রশংসা করেন; আপনি যজমারূপী আমাদের অভিপ্রায় উপলব্ধি করুন, এই-ই প্রার্থনা করছি।–হে অগ্নি! অভিবন্দনপর এই আমি, আপনার তনুর বন্দনা করছি। হে অগ্নিদেব! আপনি আমাদের অভিপ্রায় বোধিত হোন। (আপনি কিরকম? না,) আপনি সূরি, অর্থাৎ জ্ঞানী বা বিদ্বান; মঘবা, অর্থাৎ অন্নবান; বসুদাবা, অর্থাৎ ধনপ্রদায়ক ও বসুপতি, অর্থাৎ ধনপতি। এই হেন যে দেব আপনি, শত্রুর কৃত দ্বেষ বা হিংসা হতে পৃথক বা মুক্ত করুন। [পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ২য় অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে এই অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৩৷৷

[সায়ণাচার্য বলেন–চতুর্থে গার্হপত্যচয়নমুচ্যতে। অর্থাৎ–এই অনুবাকে গার্হপত্য অগ্নির চয়ন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে]

.

চতুর্থ অনুবাক

মন্ত্র- অপেত বীত বি চ সর্পতো যেহত্র স্থ পুরাণা যে চ নূতনাঃ। অদাদিদং যমোহবসানং পৃথিব্যা অমিমং পিতরো লোকমস্মৈঃ। অগ্নের্ভস্মাস্যশ্নেঃ পুরীষমসি সংজ্ঞানমসি কামধরণং ময়ি তে কামধরণং ভূয়াৎ। সং যা বঃ প্রিন্তনুবঃ সং প্রিয়া হৃদয়ানি বঃ। আত্মা বো অস্তু সংপ্রিয়ঃ সংপ্রিয়ানুবো মম। অয়ং সো অগ্নির্যস্মিন সোমমিঃ সুতম দধে জঠরে বাবশানঃ। সহম্বিয়ং বাজমত্যং ন সপ্তিং সসবাসৎ ভুয়সে জাতবেদঃ। অগ্নে দিবো অর্ণমচ্ছা জগাস্যচ্ছা দেবাং উচিষে ধিষ্ণিয়া যে। যাঃ পরস্তাদ্ৰোচনে সূৰ্য্যসা যাশ্চাবস্তাদুপতিন্ত আপঃ। অগ্নে যত্তে দিবি বর্ডঃ পৃথিব্যাং যদোষধীষু অল্প বা যজত্র। যেনান্তরিক্ষমুৰ্ব্বাতন্থ বেষঃ সে ভানুরর্ণবো নৃচক্ষাঃ। পরীষ্যাসো অগ্নয়ঃ প্রাবণেভিঃ সজোষসঃ। জুষাং হব্যমাহুতমনমীবা ইযো মহীঃ। ইড়াময়ে পুরুংসং সনিং গো শশ্বত্তনং হবমানায় সাধ। স্যান্নঃ সূনুশুনয়ো বিজাবাহগ্নে সা তে সুমতিৰ্ভুত্বশ্মে। অয়ং তে যোনিঋত্বিয়ো যতো জাতো অরোচঃ। তং জান অগ্ন আ রোহাথা নো বর্ধয়া রয়িম। চিদসি তয়া দেবতয়াহঙ্গিরস্ববা সীদ পরিচিদসি তয়া দেবতহঙ্গিরস্বদবা সীদ লোকং পৃণ ছিদ্রং পৃণাথো সীদ শিবা ত্ব। ইন্দ্রাগ্নী ত্বা বৃহস্পতিরম্মিনন্যানাবসীষদ। তা অস্য সুদদোহসঃ সোমং শ্রীণন্তি পৃশ্লয়ঃ। জন্মদেবানাং বিশন্দ্রিম্বা নোচনে দিবঃ ॥৪॥

মর্মার্থ- (যম হলেন সর্বভূমির অধিপতি। সেই নিমিত্ত তার ভৃত্যগণ পৃথিবীর সর্বত্র বিদ্যমান)। হে যমভৃত্যগণ! এইস্থানে অর্থাৎ এই দেবযজনস্থানে পুরাতন ও নূতন তোমরা যারা বর্তমান আছ, তারা সকলেই এই স্থান হতে অপগত হও (অর্থাৎ আমাদের সান্নিধ্য পরিত্যাগ করো)। পৃথিবীর এই স্থানটুকু যম আমাদের প্রদান করেছেন। এবং পিতৃগণ যজমান-কর্মের (যজ্ঞের) নিমিত্ত এই স্থানটিকে ব্যতিক্রমীভাবে চয়নস্থান রূপে পরিচিহ্নিত করেছেন। হে সিকতাস্বরূপ (বালুকার স্বরূপ)! তুমি হও অগ্নির প্রকাশক (অর্থাৎ বালির আধার তাপের প্রভাবে অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে অগ্নির অস্তিত্ব প্রমাণ করে)। অগ্নির অবস্থানের কারণে তুমি পাংসুরূপ (অর্থাৎ শুষ্ক ধূলিসদৃশ) হয়েছে। হে ঊষস্বরূপ (অর্থাৎ ক্ষারময় মৃত্তিকাস্বরূপ) তুমি হও পশুসম্বন্ধি সম্যক জ্ঞান। (অর্থাৎ পশুগণ আঘ্রাণের দ্বারা জ্ঞাত হয়ে উষর-ভূমি লেহন করে থাকে। সেই রকমে তুমি যজ্ঞের মাধ্যমে কামনার ধারক হয়ে থাক; অতএব তোমার যা কর্মর্ধারণের সামর্থ্য তা আমাদের হোক। হে সিকতা ও উষর প্রদেশ! তোমাদের যে প্রিয় তনুদ্বয়, তা পরস্পর সংযুক্ত হোক; তোমাদের যে দুই প্রিয় হৃদয়, তাও পরস্পর সম্মিলিত হোক। তাহলে তোমাদের প্রিয় যে আত্মাযুগল, তাও সম্যকভাবে পরস্পরের প্রিয় হবে। অধিকন্ত আমারও তনু সম্যকভাবে প্রিয় হবো। হে জাতবেদা! আপনি সত্বর গমনকুশল অশ্বের ন্যায় বেগে সহস্ৰসংখ্যক ধনের দ্বারা যজমানকে তুষ্ট করতে আগত হোন। হে ইষ্টকারূপ অগ্নি! আপনি দিবঃ অর্থাৎ দ্যুলোক হতে জলের অভিমুখে দিকে গমন করছেন (অর্থাৎ যজ্ঞের পুষ্টি সম্পাদন করছেন); আসনাসীন দেবতাগণকে হবিঃ স্বীকার করতে বলুন। (অর্থাৎ আপনার দ্বারা আহুত হলে দেবতাগণ আপন স্থান পরিত্যাগ করে এই স্থানে আগমন পূর্বক হবিঃ স্বীকার করবেন)। যে জলদেবীগণ সুর্যের দীপ্তিরূপ মণ্ডলের ঊর্ধপ্রদেশে ও অধোভাগে অবস্থিত আছেন (উপতিষ্ঠন্তে), তারা সকলে এই স্থানে আগমন পূর্বক উপহিত (অর্থাৎ স্থাপিত) হবেন। হে যাগনিস্পাদক (যজত্র) অগ্নি! আপনার যে দীপ্তি দুলোকে সূর্যরূপে ও পৃথিবীতে বহ্নিশিখা বা বহ্নিরূপে বর্তমান, সেইরকমেই আপনার যে তেজঃ ওষধিতে তার ফল পরিপাকের আকরে ও জলে বড়বানলরূপে বর্তমান; এবং আপনার যে দীপ্তি বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষে বিদ্যুত্রপে সর্বতো প্রকাশবান হয়েছে, আপনার সেই সমুদ্ররূপ বিস্তীর্ণ তেজঃসমূহ নৃচক্ষা অর্থাৎ মনুষ্যগণের প্রখ্যাপক। সেইরকম তেজোরূপ ইষ্টকার দ্বারা (ইষ্টক সমূহের দ্বারা) আমি উপধান করছি। ইষ্টকারূপ অগ্নিগণ এই আহুত হব্য ভক্ষণ করুন। (প্রতিটি ইষ্টকই এক একটি অগ্নিরূপ। তাঁরা কিরকম না, তাঁরা পাংসুরূপ (শুষ্ক) মৃত্তিকাতে উৎপন্ন, পরস্পর সমান প্রীতিযুক্ত, অনমীবা অর্থাৎ বোগরহিত, ইযষা অর্থাৎ অভীষ্টপ্রাপ্তির হেতুভূত এবং প্রৌঢ়। আমি সেই হেন (তথাবিধ) অগ্নিরূপা ইষ্টকা সমূহের উপধান করছি। হে অগ্নি! যাগসাধনে প্রবৃত্ত যজমানকে গো ইত্যাদি পশুর দাতা করুন। (কি রকম গো ইত্যাদি পশু? না,) সকলের দ্বারা প্রশংসনীয় এবং অত্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে বর্তমান, অর্থাৎ যেন এই পশুর সরবরাহে কোন ছেদ না পড়ে। অধিকন্তু আপনার প্রসাদে আমরা বিবিধরকম পুত্রের পিতা হবো। (কিরকম পুত্র? না, তনয় বা দত্তক পুত্ৰ ইত্যাদি এবং ঔরস–এই রকম। হে অগ্নিদেব! আমাদের প্রতি আপনার সুমতি-রূপ অনুগ্রহবুদ্ধি সঞ্জাত হোক। হে অগ্নিদেব! এই ইষ্টকারূপ পদার্থ আপনার যোনিরূপ ঋত্বিয় অর্থাৎ উৎপত্তির হেতু ভূত ঋতুকালীন স্ত্রী-পুরুষ সঙ্গমতুল্য। এই ইষ্টকারূপ যোনি হতে উৎপন্ন হয়ে আপনি দীপ্তিমান হয়ে থাকেন–এইরকম বিজ্ঞাত হয়ে আপনি আগমন করুন এবং তারপর আমাদের ধন বর্ধন করুন। হে ইষ্টকা! তুমি হও চৈতন্যস্বরূপা (চিদসি), দেবতাগণের দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে তুমি স্থির হয়ে অবস্থান করো–যেমন অঙ্গিরা ঋষিগণের দ্বারা উপধান প্রাপ্ত হয়ে (অর্থাৎ উপহিত বা স্থাপিত হয়ে) তুমি স্থিরভাবে অবস্থান করেছিলে। তুমি সর্বতোভাবে ভোগ সম্পাদন করো–যেমন দেবতাগণের দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে কিংবা অঙ্গিরা ঋষিগণের দ্বারা উপহিত হয়ে তুমি স্থিরভাবে অবস্থান পূর্বক সর্বতোভাবে ভোগ সম্পাদন করেছিলে। হে ইষ্টকা! গার্হপত্য অগ্নির চয়নস্থানে দুটি ইষ্টকার মধ্যবর্তী ছিদ্র সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ করে তুমি শান্ত হয়ে অবস্থান করো। ইন্দ্র, অগ্নি ও বৃহস্পতি–এই তিন দেবতা এই স্থানে তোমাকে স্থাপন করেছিলেন। স্বর্গের প্রকাশক, যজমানের জন্মের নিমিত্তভূত দেবতাগণ-সম্বন্ধিনি প্রজারূপ গো-সদৃশা অন্নের দোহয়িত্রী এই ইষ্টকা সোম পাক করছে (শ্রীণন্তি)। (অর্থাৎ এই ইষ্টকা প্রাতঃসবন ইত্যাদি তিনটি সবনে নিরন্তর সোমপাকের হেতু)। [পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৩য় অনুবাকের মন্ত্রসমূহের সাথে এই মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৪॥

[সায়ণাচার্য বলেন–পঞ্চমেহনুবাক আহবনীয়চয়নার্থং ভুবঃ কর্ষণমুচ্যতে। অর্থাৎ–এই পঞ্চম অনুবাকে আহবনীয় অগ্নির চয়নের নিমিত্ত কর্ষণের বিষয় উক্ত হয়েছে।]

.

পঞ্চম অনুবাক

মন্ত্র- সমিতং সং কল্পেথাং সম্প্রিয়ৌ রোচিষ্ণু সুমনস্যমানো। ইষমূৰ্জৰ্মভি সম্বসানৌ সং বাং মনাংসি সং ব্ৰতা সমু, চিত্তান্যাহকর। অগ্নে পুরীষ্যাধিপা ভবা ত্বং নঃ। ইষমূৰ্জং যজমানায় ধেহি।। পুরীষ্যমগ্নে রয়িমান পুষ্টিমান অসি। শিবাঃ কৃত্বা দিশঃ সৰ্ব্বাঃ স্বাং যোনিমিহাংসদঃ। ভবতং নঃ সমনসৌ সমোকসৌ অরেপসৌ। মা যজ্ঞং হিংসিস্টং মা যজ্ঞপতিং জাতবেদসৌ শিবৌ ভবতমন্য নঃ। মাতেব পুত্রং পৃথিবী পুরীষ্যমগ্নিং স্বে যোনাবভারুখা। তাং বিশৈবিৰ্দেবৈঋতুভিঃ সম্বিদানঃ প্রজাপতির্বিশ্বকৰ্মা বি মুঞ্চতু। যদস্য পারে রজসঃ শুক্রং জ্যোতিরজায়ত। তন্নঃ পর্ষদতি দ্বিমোহগ্নে বৈশ্বানর স্বাহা। নমঃ সু তে নিঋতে বিশ্বরুপে অয়স্ময়ং বি তা বন্ধমেত।। যমেন ত্বং যম্যা সম্বিদানোমং নাকমধি রোহয়েম। যত্তে দেবী নিঋতিৰবন্ধ দাম গ্রীবাস্ববিচৰ্ত্তম। ইদং তে তদ্বি য্যাম্যায়ুযোন মধ্যাদধা জীবঃ পিতুমদ্ধি প্রমুক্তঃ।। যস্যান্তে অস্যাঃ ক্রুর আসহোম্যেং বন্ধানামবসৰ্জনায়। ভূমিরিতি বা জনা বিদুনিঋতিঃ ইতি ত্বাহহং পরি বেদ বিশ্বতঃ। অসুম্বন্তমযজমানমিচ্ছ স্তেনস্যেত্যাং তস্করস্যান্বেষি। অন্যমম্মদিচ্ছ সাত ইত্যা নমো দেবী নিঋতে তুভ্যমস্তু। দেবীমহং নিঋতিং বন্দমানঃ পিতেব পুত্রং দসয়ে বচোভিঃ। বিশ্বস্য যা জায়মানস্য বেদ শিরঃ শিরঃ প্রতি সূরী বি চষ্টে। নিবেশনঃ সঙ্গমনো বসুনাং বিশ্বা রূপাহভি চষ্টে শচীভিঃ। দেব ই সবিতা সত্যধর্মেন্দ্রো ন তন্থেী সমরে পথীনাম। সং বরত্রা দধাতন নিরাহাবা কৃপোতন। সিঞ্চামহা অবটমুদ্রিণং বয়ং বিশ্বাহহাহদন্তমক্ষিত। নিষ্কতাহাবমবটং সুবরং সুষেচন। উদ্ৰিণং সিঞ্চে অক্ষিত। সীরা যুঞ্জন্তি কবয়ো যুগা বি তন্বতে পৃথক। ধীরা দেবেষু সুম্নয়া। যুক্ত সীরা বি যুগা তনোত কৃতে যোনৌ বপতেই বীজ। গিরা চ ষ্টিঃ সভরা অসমো নেদীয় ইসৃণ্যা পকৃমাহযৎ। লাঙ্গলং পবীরবং সুশেবং সুমতিংসরু। উদিৎ কৃষতি গামবিং প্রফং চ পীবরীম। প্রস্থাবদ্ৰথবাহন। শুনং নঃ ফালা বি তদস্তু ভূমিং শুনং কীনাশা অভি যন্তু বাহা। শুনং পজ্জনন্যা মধূনা পয়োভিঃ শুনাসীরা সুনমস্মাসু ধৰ্তম্। কামং কামদুঘে ধু মিত্রায় বরুণায় চ।। ইন্দ্রায়াগ্নয়ে পুষ্ণ ওষধীভ্যঃ প্রজাভ্যঃ।। ঘৃতেন সীতা মধুনা সমক্তা বিশ্বৈৰ্দেবৈরনুমতা মরুদ্ভিঃ। উজ্জ্বতী পয়সা পিন্বমানাহস্মাৎ সীতে পয়সাহভ্যাবৃত্ত ॥৫৷৷

 মর্মার্থ- পূর্ব অনুবাকে যে গার্হপত্য অগ্নির কথা বলা হয়েছে, সেই গার্হপত্য চিতিতে মুখ্য অগ্নির সন্নিবপনের বেলায় দুটি অগ্নির স্থাপন করা হয়–একটি পূর্বসিদ্ধ অগ্নি, অপরটি পরসিদ্ধ অগ্নি। এই উভপ্রকার অগ্নিকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে–হে অগ্নি (অর্থাৎ অগ্নিদ্বয়)! আপনারা উভয়ে সঙ্গত (অর্থাৎ মিলিত) হোন; এবং সঙ্গত হয়ে সম্যকরূপে যজ্ঞের কল্পনা নিষ্পদন করুন। (কি রকম অগ্নিদ্বয়? না, আপনারা সম্যক্ পরস্পর তুল্যরূপ (প্রতিযুক্তৌ); রোচিষ্ণু, অর্থাৎ দীপ্যমান; ও পরস্পর সমানমনস্ক (সুমনস্যমানৌ)। এই হেন আপনারা এই অন্নের বল ও রস সম্যক্ সম্পাদন করুন। আপনাদের মনঃ সঞ্জাত সঙ্কল্পগুলি আমি সর্বতঃ সঙ্গত করব; সেই রকম কর্মসমূহ এবং কর্মবিষয়ক জ্ঞানমূহ আমি সম্পন্ন করব (সমাকর)। মিলিতভাবে উভয় অগ্নিস্বরূপ হে পাংসুযুক্ত অগ্নি! আপনারা আমাদের পালয়িতা হোন এবং সেই রকমে যজমানের নিমিত্ত অন্ন ও রস সম্পাদন করুন। হে যুগলাত্মক (দ্ব্যাত্মক) অগ্নি! আপনারা শুষ্ক মৃত্তিকাযযাগ্য (পুরীষার্থে), ধনবান (রয়িমান), এবং পুষ্টিমানও। সকল দিক শান্ত করে চিতিদ্বয়রূপ আপনাদের এই নিজস্থানে উপবিষ্ট হোন। আপনাদের মধ্যে যে অগ্নি পুরাতন এবং যে অগ্নি যুবা, সেই আপনারা আমাদের প্রতি সমানমনস্ক, সমাননিবাসস্থানবাসী ও পাপচিত্তরহিত হয়ে এই যজ্ঞ ও যজ্ঞপতির প্রতি হিংসা করবেন না। হে জাতবেদা অগ্নিদ্বয়! অদ্য এই যজ্ঞকর্মে আমাদের প্রতি শান্ত হোন (শাস্তৌ ভবতম)। যেমন লোকজগতে মাতা তাঁর পুত্রকে পালন (বা ভরণ) করেন, সেইরকম পৃথিবীরূপা এই উখা আপন গর্ভস্থানে এই শুষ্কমৃত্তিকারূপ অগ্নিকে ধারণ করছেন (পুরীষ্যমেতমগ্নিমভাবিভর্তি)। প্রজাপতি সেই উখাকে শিক্যপাশ (দড়ির শিকা) হতে মুক্ত করুন। (কিরকম প্রজাপতি? না,) তিনি বিশ্বের সৃষ্টিরূপ কর্মকারী বিশ্বকর্মা, তিনি বিশ্বদেব ও ঋতুদের সাথে একমত হয়ে থাকেন। ধূমের অবসানে অগ্নির যে নির্মল জ্যোতি স্ফুরিত হয়, সেই জ্যোতির প্রতি বিদ্বেষকারীগণকে অতিক্রম করে। আমাদের প্রীত করুন। হে বৈশ্বানর নামে আখ্যাত অগ্নিদেব! আপনার শিক্যকে স্বাহা মন্ত্রে সুষ্ঠুভাবে আহুতি প্রদান করছি। হে (দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের মধ্যবর্তী স্থানের অভিমানিনী দেবতা) নিঋতি! বহুরকম রূপযুক্তা আপনাকে নমস্কার করছি। আপনি লৌহনির্মিত শৃঙ্খলের মতো দৃঢ় বন্ধনরূপ এই স্বর্গপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধক পাপ সমূহকে বিনাশ করুন। আপনি যমরূপ অগ্নি ও যমীরূপা পৃথিবীর সাথে একমত হয়ে যজমানের সর্বসুখখাপেত স্বর্গে অধিরোহণ প্রাপ্তি সম্ভবিত করুন। (অর্থাৎ যাতে তিনি স্বর্গপ্রাপ্ত হতে পারেন তেমন করুন)। হে যজমান! আপনার গ্রীবাদেশে নিঋতিদেবী নিজের যে অবিনাশক দৃঢ় পাশ বন্ধন করেছেন, আপনার গ্রীবাস্থিত সেই পাশ আমি বিমুক্ত করছি। অনন্তর (অর্থাৎ পাশবিমোচনের পর) আপনি চিরজীবীরূপে সকল প্রতিবন্ধকরহিত হবেন এবং পিতৃগণ অন্ন ভক্ষণ করবেন। হে নিঋতি! আপনার ক্রুর বা উগ্ররূপ মুখমধ্যে আহুতির ন্যায় ইষ্টকার উপধান করছি। (কি নিমিত্ত? না,) এর দ্বারা যজমানের পরলোক প্রাপ্তির (অর্থাৎ স্বর্গপ্রাপ্তির) প্রতিবন্ধক পাপসমূহের বিনাশ হবে। আপনার ঊষরভূমিরূপ মুখে আমি এই যে ইষ্টকার উপদান (বা স্থাপন) করছি, তা জন্তুমাত্ররূপী বা শাস্ত্রসংস্কাররহিত জন ভূমি বলে জ্ঞাত; আমি কিন্তু শাস্ত্রাভিজ্ঞ, সুতরাং আপনাকে সর্বৰ্থা নিঋতিদেবী বলে উত্তমভাবে পরিজ্ঞাত আছি (সম্যজানামি)। হে নিঋতি! যে জন সোমযাগ করে না ও যে জন হবির দ্বারা যজ্ঞ করে না এবং সেইরকম অনুচিত কর্মকারী যজমানকে আপনি গ্রহণ করতে ইচ্ছা করুন। অধিকন্তু যারা প্রচ্ছন্নচোর (স্তেন) এবং যারা প্রকটচোর (তস্কর), আপনি তাদের অনুগমন করুন, (অর্থাৎ তাদের গ্রহণ করুন)। সর্বথা সোমযাগকারী ও হবিঃ-যজ্ঞকারী আমাদের ব্যতীত অন্যদের গ্রহণ করতে ইচ্ছা করুন। হে দেবী নিঋতি! আপনাকে নমস্কার করি। দেবী নিঋতিকে আমি স্তুতিরূপ বাক্যের দ্বারা আপন অধীন করছি; যেমন লোকজগতে পিতা তার দুঃশীল বালক পুত্রকে হে তাত, হে বৎস ইত্যাদি লালনমূলক বাক্যে নিজের অধীন করে থাকেন। যে বিদুষী নিঋতি দেবী এক এক করে সকল স্তেন ও তস্করদের মস্তক ধারণ পূর্বক বিশেষভাবে বলেন যে, তিনি তাদের অপরাধ জ্ঞাত আছেন–আমি সেই হেন নিঋতি দেবীকে স্তুতিরূপ ব্যক্যের দ্বারা আপন অধীন করে বন্দনা করছি।–এই অগ্নি যজমানবর্গের আপন আপন গৃহে নিবাসকারী ও প্রজা-পশু ইত্যাদিরূপ দ্রব্যসমূহের প্রাপক। এই অগ্নি আপন শক্তির দ্বারা সর্বরূপকে (সবকিছুকে) প্রকাশ করেন; যেমন সবিতা দেব, অর্থাৎ সূর্য। সর্ব রূপকে প্রকাশ করে থাকেন। (কিরকম অগ্নি? না, তিনি সত্যধর্মা (অর্থাৎ সত্য বা অবশ্যম্ভাবীফলোপেত অগ্নিহোত্র ইত্যাদি লক্ষণযুক্ত ধর্মশালী); ইন্দ্র (অর্থাৎ পরম ঐশ্বর্যবান); এবং সমরে শত্রুগণের সমাগমে স্বয়ং পুরোগামী হলেও তাকে সমরে লিপ্ত হতে হয় না, কারণ শত্রুগণ তাঁর (অগ্নি) নাম শ্রবণ মাত্রই পলায়ন করে থাকে। হে কৃষকগণ (কর্ষকাঃ পুরুষা)! চর্মময়ী রঞ্জু সম্যভাবে স্থাপন করো এবং সেখানে বলীবর্দসমূহের জলপানের নিমিত্ত দ্রোণীবিশেষ (গামলা) নিষ্পদিত (নির্মাণ করো)। জল উদ্ধারণের নিমিত্ত নির্মিত কূপের ন্যায় বহুল জলে পূর্ণ, ভূতলগত পঙ্ক উদ্ধারণের দ্বারা প্রস্রবণেপেত, সকলের দ্বারা অহিংসিত, গ্রীষ্মকালেও শোষণাভাব লক্ষণযুক্ত অর্থাৎ অশোষক অবটের সেচন করো। কাষ্ঠ-পাষাণ নির্মিত দ্রোণীর অন্তস্থিত যে অবকাশ (স্থান) থাকে, সেটি হোল অবট; আমি সেই অবটে জল সিঞ্চন করছি (অর্থাৎ সেখানে জল প্রক্ষিপ্ত করছি)। (সেই অবট কিরূপ? না,) তা নিতাহাবং (অর্থাৎ পার্শ্ববতী সচ্ছিদ্র কূপ আছে, যা থেকে জল নিষ্কাষিত হয়) এবং সুবরত্রং (অর্থাৎ কুপ হতে জল উদ্বারণের নিমিত্ত দৃঢ় চর্মময় রজ্জ্বর সাথে যুক্ত), সুষেচন (অর্থাৎ সুষ্ঠুভাবে সেচনমোগ্য জল উদ্ধরণের উপযুক্ত পাত্রযুক্ত), উদ্রিণং (অর্থাৎ উদকবন্ত বা জলশালী), অক্ষিত (অর্থাৎ জলের অগলিত বা অ-ক্ষরিত হওয়ার বিষয়ে পক্ষপাতরহিত)। কবয়, অর্থাৎ কৃষিকর্মে অভিজ্ঞ জনেরা লাঙ্গল সজ্জিত করুক; তারপর এক এক করে তিন বা ছয় যুগ (জোয়াল) বিস্তার করুক (একৈকং বিস্তারয়ন্তু)। (কিরকম কবয়? না,) তারা ধীরা অর্থাৎ ধৈর্যযুক্ত বা আলস্যহীন ও দেবেষু সুন্নয়া অর্থাৎ দেবতাবিশেষের নিকট হতে সুখপ্রাপ্তি ইচ্ছা করে (সুখমিচ্ছন্তি)। হে কৃষকগণ (কর্যকাঃ)। লাঙ্গল যোজনা করো; যুগসমূহের বিস্তার করো, এবং কর্ষণ করা হলে সেইস্থানে বীজ বপন করো (বপত), অধিকন্তু, সেই বীজ আশীর্বাদরূপ মঙ্গলবাক্যের দ্বারা যুক্ত। মঙ্গলবাক্য-আমাদের শস্য ইত্যাদি সভরা (সফল বা সুফলা ) হোক, পক্ক ফল দা বা কাটারির দ্বারা লবনসাধিত অর্থাৎ ছেদিত হয়ে আমাদের সমীপে আগত হোক। এই লাঙ্গল ভূমি কর্ষণ করছে। (কিরকম লাঙ্গল? না,) এই লাঙ্গল বজ্রবৎ অতি তীক্ষ্ণ, কর্ষণে সুষ্ঠুভাবে কর্মক্ষম (অর্থাল অতি তীক্ষ্ণত্বের নিমিত্ত ভূমি কর্ষণে কোন প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না), এবং নিম্ন-উচ্চতাসম্পন্ন (অসমতল ভূমিতেও অবিচ্ছিন্নভাবে গমনকারী। এই কর্ষণের দ্বারা ফলাধিক্য হলে যজমান গো-ইত্যাদি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। লাঙ্গলের ফাল বা মুখাগুলি সুখে বিশেষভাবে কৰ্ষণ করুক। কৰ্ষক বা কৃষকগণ বলীবৰ্দের পশ্চাতে সুখে গমন করুক। মেঘ সুখে মধুর রসের দ্বারা ধারা যুক্ত হয়ে জল বৃষ্টি সৃষ্টি করুন (অর্থাৎ বর্ষণ করুন)। বায়ু ও আদিত্যদেবতা আমাদের সুখ প্রদান করুন (সুখমশ্বাসু ধৰ্ত্তম)। হে কামদুঘা (কামবর্ষণকারী) লাঙ্গলপদ্ধতি (লাঙ্গলের সীতা বা রেখা সমূহ)! তোমরা মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র, অগ্নি, পূষা, ওষধি ও প্রজাগণের কামনানুরূপ ভোগ সম্পাদন করো। এই সীতা বা লাঙ্গলরেখা মধুর স্মৃতের দ্বারা সম্যক আদ্রীকৃত (সিক্ত) হয়েছে; অতএব বিশ্বদেবগণ ও মরুৎ-দেবতাগণ তা সমীচীনরূপে অঙ্গীকার (স্বীকার করেছেন; সেগুলি আবার জলের দ্বারা আপ্যায়িত হয়েছে। হে সীতা (লাঙ্গলরেখা)! তুমি জলের দ্বারা আপ্যায়িত হয়ে আমাদের প্রতি আবর্তিতা হও। [এই মন্ত্রগুলি পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৪র্থ ও ৫ম অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট] ॥৫॥

[সায়ণাচার্য বলেন-ষষ্ঠ ওষধিবালো বিধীয়তে। অর্থাৎ এই ষষ্ঠ অনুবাকে ওষধিসমূহের বপন সংক্রান্ত বিধি কথিত হয়েছে]

.

ষষ্ঠ অনুবাক

মন্ত্র- যা জাতা ওষধয়ো দেবেভ্যস্ত্রিযুগং পুরা। মন্দামি বণামহম শতং ধ্যমানি সপ্ত চ। শতং বো অম্ব ধামানি সহস্রমুত বো রুহং। অথা শতক্ৰহদা যুয়মিমং মে অগদং কৃত।। পুষ্পবতীঃ প্রসূবতীঃ।। ফলিনীরফলা উত। অম্বা ইব সজিত্বরীবীরুধঃ পারয়িষ্ণবঃ। ওষধীরিতি মাতরস্তছো দেবীরূপ ধ্রুবে। রপাংসি বিঘ্নতীরিত রপঃ চাতয়মান্যঃ। অশ্বথে বো নিষদনং পর্ণে বো বসতিঃ কৃতা। গোভাজ ইং কিলাসথ যৎ সনবথ পুরুষ। যদহং বাজয়ন্নিমা ওষধীর্যন্ত আদধে। আত্মা যক্ষস্য নশ্যতি পুরা জীবগৃভো যথা। যদোযধয়ঃ সঙ্গচ্ছন্তে রাজানঃ সমিতাবিব। বিপ্রঃ স উচ্যতে ভিষগ্রক্ষোহাহমীবচ্যতনঃ। নিষ্কৃতির্নাম বো মাতাহথা যুয়ং স্থ সংকৃতীঃ। সরাঃ পতত্রিণীঃ হুন যদাময়তি নিকৃত। অন্যা বো অন্যামবত্বন্যাইন্যস্যা উপবত। তাঃ সৰ্ব্ব ওষধয়ঃ সম্বিদানা ইদং মে পিবতা বচঃ। উচ্ছু ওষধীনাং গাবোগোষ্ঠাদিবেরতে। ধনং সনিষ্যতীনামাত্মানং তব পুরুষ। অতি বিশ্বাঃ পরিষ্ঠাঃ স্তেন ইৰ ব্ৰজমক্ৰমুঃ।। ওষধয়ঃ প্রাচুচ্য] যৎ কিং চ তনুবাং রপঃ। যাঃ ত আতরাত্মানং য্য অবিশিশুঃ পঃপরু। তান্তে যক্ষ্মং বি বাধামুগ্রো মধ্যমশীরিব। সাকং যক্ষ্ম প্ৰ পত শ্যেনেন কিকিদীবিনা। সাকং বাতস্য ঘ্রাজ্যা সাকং নশা নিহাকয়া। অশ্বাবতীং সোমবতীমূৰ্জ্জয়ন্তীমুদোজস। আ বিসি সৰ্ব্বা ওষধীরম্মা অরিষ্টতয়ে। যাঃ ফলিনীৰ্যা অফলা অপু যাশ্চ পুষ্পিণীঃ। বৃহস্পতিপ্রসূতাস্তা নো মুঞ্চংহপঃ। যাঃ ওষধয়ঃ সোমরাজ্ঞীঃ প্রবিষ্টাঃ পৃথিবীমনু। তাসাং ত্বমত্তমা প্র জীবাতবে সুব। অবপতত্তীরবন্দিব ওষধয়ঃ পরি। যং জীবমশ্নৰামহৈ ন স রিষ্যাতি পূরষঃ। যাশ্চেদমুপন্তিযশ্চ দূরং পরাগতাঃ। ইহ সঙ্গত্য তাঃ সৰ্বা অম্মৈ সং দত্ত ভেষজ। মা বো রিষং খনিতা যস্মৈ চাহং খনামি বঃ।। দ্বিপচ্চপদস্মাকং সৰ্বৰ্মনাতুর। ওষধয়ঃ সং বদন্তে সোমেন সহ রাজ্ঞা। যস্মৈ করোতি ব্রাহ্মণস্তং রাজন পারয়ামসি ॥৬৷৷

 মর্মার্থ- (যুগে অর্থে কাল বা সময় বোঝান হয়েছে) ত্রিযুগ অর্থাৎ বর্ষা, শরৎ ও বসন্তকালের উদ্দেশে পুর্বে দেবতাগণের নিকট হতে (সকাশাৎ) যে ওষধিসমূহ উৎপন্ন হয়েছে, পরিপাকের দ্বারা পিঙ্গলবর্ণ সেই জাতিভেদানুসারে (অর্থাৎ গ্রাম্য এ আরণ্য ভেদে) শত সংখ্যক ও সাত প্রকার ধান্য সমূহকে দর্শন করে আমি হৃষ্ট হচ্ছি (হৃষ্যামি)। হে অম্ব (মাতৃস্থানীয়) ওষধিসমূহ! তোমাদের জাতিভেদে শত (অর্থাৎ অসংখ্য) ক্ষেত্র আছে, এবং তোমাদের প্ররোহ বা অঙ্কুরও সহস্ৰসংখ্যক (অর্থাৎ অসংখ্য)। সেইরকম তোমরা শত যজ্ঞ সাধনকারীত্বের বলে আমারপী এই যজমানকে অগদ অর্থাৎ ক্ষুৎপিপাসা ইত্যাদি রোগরহিত করো। এই ওষধিসমূহ নানাবিধ বিশেষণে প্রশংসিত হয়ে থাকে। কোনও ওষধি পুষ্পবতী (অর্থাৎ পুষ্পমাত্রে পর্যাবসি, ফল দান করে না), কোনটি প্রসূবতী (অর্থাৎ পুষ্পপূর্বক ফলোৎপত্তিস্থায়িনী); কোনও ওষধি বা ফলিনী (অর্থাৎ পুষ্প ব্যতিরেকে কেবলই ফলের দ্বারা যুক্তা), আবার কোন কোনটি বা অফলা (অর্থাৎ ফল-পুষ্প বিরহিতা)। ধীরুধ অর্থাৎ কোন কোন ওষধি লতারূপা; এগুলির কোনটি বহু সম্বৎসরব্যাপী স্থায়িনী, কোনটি যুদ্ধে জয়শীল শীঘ্রগামী অশ্বের ন্যায় উৎপন্নমাত্রই বিস্তৃতি লাভ করছে। হে মাতরো (মাতৃসমানা) দেবীগণ! (এই শব্দ এখানে হেতু অর্থে প্রযুক্ত)। তোমরা ওষধি বলে তোমাদের নিকট প্রার্থনা করছি। (অর্থাৎ ফল পক্ক হওয়া অবধি অবস্থান করে থাক বলে তোমাদের প্রতি প্রার্থনা উচিত হচ্ছে)। প্রার্থনা এই ফল পক্ক হওয়ার ক্ষেত্রে বিঘ্নরূপ পাপসমূহ বা পাপফলগুলি ও ফলপজনিত দুঃখসমূহ বিনাশপুর্বক তোমরা এই স্থানে প্রাপ্তা হও (অর্থাৎ আগতা হও)। হে ওষধি-দেবতাগণ! অশ্বথ বৃক্ষে তোমাদের অধিষ্ঠান (সেই হেতু লোকজগতে মনুষ্যগণ অশ্বখবৃক্ষকে প্রদক্ষিণ অর্থাৎ নমস্কার ইত্যাদির দ্বারা পূজা করে), ও পলাশ বৃক্ষে তোমাদের বাস (সেই হেতু পলাশবৃক্ষের কাষ্ঠে যজ্ঞের ইন্ধনরূপ কর্ম সাধিত হয়)। এই রূপেও অর্থাৎ স্থাবররূপেও তোমাদের অধিষ্ঠান লোকজগতে প্রসিদ্ধ। সেই কারণে বলা হয়ে থাকে–মনুষ্যগণকে অন্ন ইত্যাদির দ্বারা পোষণের কারণে তোমরা স্থাবররূপে ভূমিভাগে অবস্থান করে থাক। যখন অন্ন প্রাপ্তির ইচ্ছায় আমি ওষধিসমূহ হস্তে ধারণ করি তখন ক্ষুধা ইত্যাদি রোগের আত্মা স্বরূপেই বিনষ্টপ্রায় (নষ্টসদৃশ) হয়; যেমন লোকে ব্যাধগণ শশকদের গ্রহণের পূর্বেই কর্ণ ও নেত্র রুদ্ধ করে ভূমিসংশ্লিষ্ট মৃতের ন্যায় অবস্থান করে থাকে। সকল ওষধি ফলপ্রদানের নিমিত্ত ক্ষেত্রসঙ্গতা (মিলিত) হয়েছে, যেমন যুদ্ধে প্রতিপক্ষ সেনাদের জয় করবার নিমিত্ত পরস্পর অনুকুল রাজাগণ একত্রে মিলিত হন, সেই মতো (তবৎ)। সেই নিমিত্ত সঙ্গত ওষধি সম্বন্ধে মেধাবী অর্থাৎ ওষধির রসবীর্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ পুরুষকে ভিষজ বা ক্ষুধা ইত্যাদি রোগের চিকিৎসক বলা হয়ে থাকে। তাঁরা পক্ক ওষধির দ্বারা পুরোডাশকে রাক্ষসগণের দ্বারা বধের অযোগ্য করে নির্মাণ পূর্বক তাদের (অর্থাৎ রাক্ষসদের) উপদ্রবরূপ রোগ বিনাশ করেন। হে ওষধিসমূহ! তোমরা ক্ষুধা ইত্যাদি বিনাশের নিমিত্তই মাতৃবৎ উৎপন্না; অতএব তোমরা নিজকর্মে সম্যক্ সক্ষমা হও (ক্ষমা ভবত)। হে ওষধিসমূহ! তোমরা মিলিতভাবে পরস্পর রক্ষা করে থাক এবং তা উচিতও; সেইরকমে হে ওষধিসমূহ! পরস্পর একমত হয়ে আমার প্রার্থনা প্রকৃষ্ট ভাবে রক্ষা করো (প্রকর্ষেণ রক্ষতু)। ওষধিগুলি উপভোগের নিমিত্ত বিশেষ বলে উদ্দীপিত হচ্ছে, যেমন গাভীগণ, (তৃণ, লতা ইত্যাদি প্রাপ্তির নিমিত্ত) নিবাসস্থান বা গৃহ হতে অরণ্যদেশে গমনকালে হয়ে থাকে, সেইরকম। (ওষধিগুলির বিশেষ বলে উদ্দীপিত হওয়ার কারণ কি? না,) হে যজমান! ধনের মতো আপনাদের শরীর দানের নিমিত্ত, অর্থাৎ ধন বা বহুমূল্য সম্পদ দানের মতো (আপনাদরে শরীরাকারে পরিণত হয়ে) শরীর দানের নিমিত্ত বিশেষ বলে উদ্দীপিত হচ্ছে। ওষধিগুলি শরীর সম্বন্ধীয় জ্বর, শিরোব্যাধি, প্লীহা, উদরাময় ইত্যাদিরূপ যৎকিঞ্চিৎ পাপফলও (বা ব্যাধিও) বিনাশ করবার নিমিত্ত উদরের মধ্যে প্রবেশ করছে, যেমন রাত্রিকালে গুপ্ত চোরগুলি গরু চুরি করবার উদ্দেশে সাবধানে গোশালায় প্রবেশ করে সর্বতো ব্যাপ্ত হয়ে থাকে, সেই রকম। হে যজমান। ওষধিগুলি আপনার দেহে রসরূপে প্রবেশ করে আপনার রোগ (যক্ষ্ম) বিনাশ করুক, যেমন স্বকীয়-পরকীয় পক্ষপাতহীন কোন রাজা শাস্ত্রীয় মার্গনুসারে (ধর্মানুসারে) দুষ্টদের প্রতি উগ্রভাবাপন্ন হয়ে তাদের বিনাশ করেন, সেইরকম। (শ্লেষ্ময় কণ্ঠ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কি কি ধ্বনির অনুকরণে শব্দ ধ্বনিত হয় বলে কিকিদিবি, শ্লেষ্মর জন্য শ্যেনবৎ তীব্রতর পিত্তজনিত রোগ শ্যেনঃ)। হে রাজযক্ষ্মা রোগ! তুমি পিত্তজনিত ও শ্লেষ্মাজনিত রোগের সাথে (সাকং) বিনাশ প্রাপ্ত হও। সেই রকম, বাত রোগের ব্যাপ্তির সাথে বিনষ্ট হও। সেইরকম, যে রোগের পীড়ায় আমি হা কষ্ট হা কষ্ট বলে চিৎকার করছি, সেই রোগের সাথে তুমি বিনষ্ট হও। যে (অশ্বাবতী) ওষধি সমূহের দ্বারা অশ্ব লাভ করা যায়, যে (সোমবতী) ওষধি সমূহের দ্বারা ধান্য-সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে সোমযাগ করা যায়, যেগুলির দ্বারা প্রাণধারণের উপযোগী বল লাভ করা যায়, যেগুলি জাতিরুদোজা অর্থাৎ অন্নের দ্বারা পালিত উৎকৃষ্ট ধাতুরূপ ওজঃ লাভ করা যায়, সেই সকল ওষধিই আমি লাভ করেছি। (কি নিমিত্ত? না,) আমার অনিষ্টকে বিনাশ করবার নিমিত্ত (অর্থাৎ যজমানের প্রতি কারও হিংসাকে রহিত করবার নিমিত্ত)। যে ওষধিসমূহ ফলযুক্তা এবং যেগুলি ফলরহিতা, যেগুলি পুষ্পযুক্ত এবং যেগুলি পুষ্পরহিতা, সেই সবগুলিই বৃহস্পতি কর্তৃক ও প্রসূতা হয়ে আমাদের পাপমোচন করুক। সোমরাজার অনুরূপ যে ওষধিগুলি এই পৃথিবীতে অনুপ্রবেশ করছে, হে ওষধি! তুমি সেইগুলির মধ্যে উত্তম। (অর্থাৎ সেই ইদানীং উৎপদ্যমান ওষধির মধ্যে যেগুলি উত্তম জীবনসদৃশ, সেইগুলি লাভের নিমিত্ত আমাদের প্রকৃষ্টভাবে প্রেরণ করো)। স্বর্গের উপরিতন প্রদেশ হতে ভূমিতে বৃষ্টিবিন্দুর মতো পতিত ওষধিসমূহ ঘোষণা করেছিল। (কি ঘোষণা করেছিল? না,) যে পুরুষের মধ্যে আমরা ব্যাপ্ত হবো (ব্যাথুমঃ) সেই পুরুষ কখনও বিনষ্ট হবে না। যে ওষধিদেবতাগণ আমার প্রার্থনা পূর্ণরূপে শ্রবণ করেছেন, যাঁরা দূর হতে আংশিক শ্রবণ করেছেন, সেই ওষধিদেবতাগণ আমার এই কর্মে (যজ্ঞে) সঙ্গত (মিলিত) হয়ে যজমানের ক্ষুধা ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা সম্যক্ সাধিত করুন। হে ওষধিসমূহ! যারা চিকিৎসার উদ্দেশে ভূমি খনন পূর্বক তোমার মূল গ্রহণ করেছে, তারা যেন বিনষ্ট না হয়, এবং আমি যে রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসার্থে খনন পূর্বক তোমার মূল গ্রহণ করছি, সেই ব্যক্তিও যেন বিনাশপ্রাপ্ত না হয়। অধিকন্তু, আমাদের সম্বন্ধি যে দ্বিপদ (মনুষ্য) চতুষ্পদ (পশু) প্রাণী আছে, যারা তোমাদের অবলম্বন করে জীবিত আছে (যুম্মদুপজীবতি), তারা সকলেই অনাতুর (অর্থাৎ রোগরহিত) হোক। ওষধিদেবীগণ তাদের স্বামী সোমরাজের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে বলেছিলেন–যস্মৈ রুণায় চিকিৎসামস্মদীয়মূলাদিনা ব্রাহ্মণঃ করোতি, হে রাজংস্তমাতুরং বয়ং পরায়ামসি ব্যাধেরুত্তাবয়ামঃ। (অর্থাৎ-হে রাজন! আমাদের মূলের দ্বারা ব্রাহ্মণ যে রোগার্তের চিকিৎসা করেন, আমরা সেই রোগতুরকে ব্যাধি হতে পার করি, অর্থাৎ তার ব্যাধি নিরাময় করি)। [এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৫ম অনুবাকের কিছু মন্ত্র সম্পৃক্ত]।

[সায়ণাচার্য বলেন–সপ্তমে লোষ্টক্ষেপাদিকমভিধীয়তে। অর্থাৎ–এই সপ্তম অনুবাকে লোষ্টক্ষেপণ ইত্যাদি বিষয় কথিত হয়েছে]

.

সপ্তম অনুবাক

মন্ত্র- মা নো হিসজ্জনিতা যঃ পৃথিব্যা যো বা দিবং সতৃধৰ্মা জজান। যশ্যাপশ্চন্দ্রা বৃহতীর্জজান কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম। অভ্যাব পৃথিবি যজ্ঞেন পয়সা সহ। বপাং তে অগ্নিরিষিতোহৰ সৰ্পতু। অগ্নে যত্তে শুক্রং যচ্চন্দ্ৰং যৎ পূং যদ্যজ্ঞিয়। তদ্দেবেভ্যো ভরামসি। ইষমূৰ্জমহমিত আ দদ ঋতস্য ধামো অমৃতস্য যোনন। আ নো গোষু বিশোষধীষু জমি সেদিমনিরামমীবা। অগ্নে তব শ্রবো বয়ো মহি ভ্ৰাজ্যৰ্চয়ো বিভাবসসা। বৃহদ্ভানো শবসা বাজমুকৃথ্যং দধাসি দাশুষে কবে। ইরজ্যগ্নে প্ৰথয়স্ব জন্তুভিরস্মে বায়ো অমর্ত্য। স দর্শস্য বপুষো বি রাজসি পূণক্ষি সানসিং রয়িম্। উজ্জো নোজ্জাতবেদঃ সুশস্তিভিৰ্ম্মন্দ ধীতিভিহিতঃ। ত্বে ইষঃ সং দধুর্ভুরিরেতসশ্চিত্রোতয়ো বামজাতাঃ। পাবকবৰ্চাঃ শুক্ৰবৰ্চ্চা অনুনকৰ্চ্চা উদিয়র্ষি ভানুনা। পুত্রঃ পিতরা বিচরমুপোবষ্যভে পৃক্ষি রোদসী। ঋতাবানং মহিষং বিশ্বণিমগ্নি সুন্নায় ধধরে পুরো জনাঃ। কর্ণ ক্ষয়ন্তং সপ্রথমং ত্বা গিরা দৈব্যং মানুষ যুগা। নিষ্ককর্তারমধ্বস্য প্রচেতসং ক্ষয়ন্তং রাধলে মহে।। রাতিং ভূগুণামুশিজং কবিতুং পৃক্ষি সানসিম রয়িম। চিতঃ স্থ পরিচিত উচিতঃ শ্ৰয়ধ্বং তয়া দেবতায়হঙ্গিরস্ববদঃ সীদত। আ প্যায়স্ব সমেতু তে বিশ্বতঃ সোন বৃষ্ণিয়। ভবা বাজস্য সঙ্গথে। সং তে পয়াৎিসি সমু যন্তু বাজাঃ সং বৃক্ষিয়ান্যভিমাতিষাহঃ। আপ্যায়মোনো অমৃতায় সোম দিবি শ্ৰবাস্যুতমানি ধি॥৭৷৷

মর্মার্থ- যে প্রজাপতি পৃথিবীর ও দুলোকের জনয়িতা, (অর্থাৎ স্রষ্টা), যে প্রজাপতি সত্যধর্মা (অর্থাৎ সত্যকে ধারণশক্তিসম্পন্ন), পুনরায় যে প্রজাপতি আহ্লাদকারিণী বহুলা জল সৃষ্টি করেছেন, সেই প্রজাপতি যেন আমাদের হিংসা না করেন (মা হিংসীৎ)। সেই হেন প্রজাপতির উদ্দেশে আমরা হবির দ্বারা পরিচর‍্যা করব। হে পৃথিবী! যজ্ঞানুষ্ঠানের ফলভূত পয়সের সাথে (অর্থাৎ জল বা দুগ্ধ বা অন্নের সাথে) আমাদের অভিমুখে আগত হোন। ইষিত অর্থাৎ ইচ্ছাবান্ অগ্নিদেব আপনার বপাসদৃশ (ছিদ্রবৎ) স্থান প্রাপ্ত হোন। হে অগ্নিদেব! আপনার যে অঙ্গ দীপ্তিমান, যে অঙ্গ আহ্লাদকর, যে অঙ্গ শুদ্ধ এবং যে অঙ্গ যজ্ঞাহ অর্থাৎ যজ্ঞের যোগ্য, লোষ্টরূপ (মৃত্তিকাপিণ্ডরূপ) সেই সবগুলি দেবতাগণের নিমিত্ত সম্পাদন করছি। অমৃতের যোনিস্বরূপ অর্থাৎ কারণভূত এই যজ্ঞস্থান হতে অন্নরূপ তেজঃ ও রসরূপ লোষ্ট (মৃত্তিকাপিণ্ড) গ্রহণ করছি। হে অগ্নিদেব! প্রাণীগণের শ্রবণযোগ্য আপনার বহু নাম আছে। আপনি বিভাবসু, অর্থাৎ বিভা বা দীপ্তির ন্যায় বিস্তারিত বসু বা ধনশালী আপনি। হে বিভাবসু! আপনার শিখাসমূহ দীপ্যমান হচ্ছে (দীপ্যন্তে)। আপনি বৃহদ্ভানু, অর্থাৎ আপনার বৃহৎ (মহৎ) ভানু (কিরণ বা দীপ্তি) আছে। আপনি কবি, অর্থাৎ বিদ্বানরূপে যজমানের অভিপ্রায় সম্পর্কে সম্যক অভিজ্ঞ। এই হেন হে অগ্নিদেব! আপনি হবিঃ-দানকারী (হবিত্তবতে) যজমানকে উথ্য যজ্ঞের নিমিত্ত যাগযোগ্য অন্ন আপনার বলের দ্বারা দান করে থাকেন। হে অমর্ত্য (মরণহীন) অগ্নিদেব! পুরোডাশ ইত্যাদি হবিঃ-প্রদানকারী প্রাণীগণের দ্বারা দীপ্যমান হয়ে আপনি আমাদের ধনসমূহ বিস্তার করুন। আপনি চিত্য অর্থাৎ কৃতচয়ন অগ্নিরূপ দর্শনীয় শরীরের মধ্যে বিশেষভাবে দীপ্যমান হচ্ছেন; এবং আমাদের নিমিত্ত বহুরকম দানযোগ্য ধনসম্ভার পূর্ণ করুন। অন্নের অবিনাশয়িতা হে (ভো) জাবেদা! আপনি দীপ্তিযুক্ত হয়ে শোভন স্তুতির দ্বারা হৃষ্ট হোন (হৃষ্যস্ব)। যজমানগণ আপনার নিমিত্ত প্রভূত সারযুক্ত এই অনুরূপ আহুতিগুলি সম্পাদন করছেন। (কিরকম যজমানগণ? না,) আপনার দ্বারা রক্ষিত এবং সম্যক ভজনীয় (অর্থাৎ উক্তৃষ্ট) দেশে ও বংশে (কুলে) জাত। শোধকদীপ্তি, নির্মলদীপ্তি ও সম্পূর্ণদীপ্তিতে দীপ্যমান হয়ে আপনি উক্ত প্রাপ্ত হয়েছেন। আপনি দুলোক ও পৃথিবী এই উভয় লোকের সমীপে আগমন পূর্বক তাদের রক্ষা ও সম্পূর্ণতা বিধান করে পরিচর‍্যা করেন। (কেমন সেই পরিচর্যা? না,) লোকজগতে যেমন শাস্ত্রীয়মার্গানুসারী পুত্র তার পিতার পরিচর‍্যা করে, সেইরকম। মনুষ্যজাতিযুক্ত (অর্থাৎ মনুষ্যরূপী) ঋত্বিক ও যজমানগণ পূর্বকালে সুখপ্রাপ্তির উদ্দেশে স্তুতিরূপ বাক্যের দ্বারা এই স্থানে অগ্নিদেবকে স্থাপিত করেছিলেন। (কিরকম অগ্নিদেব? না,) তিনি ঋতাবানং, অর্থাৎ সত্যস্বরূপ; মহিষং, অর্থাৎ মহান; বিশ্বচষনিঃ, অর্থাৎ মনুষ্যগণের দ্বারা পরিচর্যাপ্রাপ্ত; কর্ণং, অর্থাৎ কর্ণে শ্রবণমাত্রই তা সম্পন্নকারী; এবং সপ্রথমস্তমং, অর্থাৎ অতিশয় প্রসিদ্ধির সাথে কীর্তিমান। ঋত্বিক ও যজমানগণ সেইরূপ অগ্নিকে দেববর্গের মঙ্গলসাধনের নিমিত্ত এই স্থানে ধারণ করেছিলেন। হে অগ্নিদেব! আপনি যজমানকে ধনের দ্বারা সম্পৃক্ত করুন (অর্থাৎ তাকে ধনপ্রাপ্ত করুন)। (কিরকম যজমান?) তিনি যজ্ঞের নিম্পাদক, তিনি প্রকৃষ্টচিত্তযুক্ত অর্থাৎ শ্রদ্ধালু, তিনি মহৎ বা প্রভূত হবিঃ-দানের নিমিত্ত এই স্থানে, নিবাসকারী, দাতা, তিনি ভৃগু ইত্যাদি তপস্বীগণের মধ্যে উশিজতুল্য (অর্থাৎ অত্যন্ত তপোযুক্ত), এবং তিনি বিদ্বানের ন্যায় সকল কর্তব্য, সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত হয়ে তা পালনকারী। হে শর্করা (অর্থাৎ চয়ন কালে ভূমিতে প্রক্ষিপ্ত হে কাকর)! তোমরা চয়নকালে (অর্থাৎ অগ্নিচয়নের নিমিত্ত কর্ষণের কালে) ভূমিতে, চতুর্দিকে ও ঊর্ধ্বে প্রক্ষিপ্ত হয়ে থাক। সেই অবস্থাতেই তোমরা এই চিতির সেবা পূর্বক এই স্থানে স্থির হয়ে থাক (অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যে শর্করাগুলির যে যে দেবতা, সেই দেবতাগণের সাথে এই চিতির অর্থাৎ অগ্নির সেবা পূর্বক এই স্থানে অবস্থান করো); যেমন, অঙ্গিরা ঋষিগণের চয়নে তোমরা স্থির হয়ে অবস্থান করেছিলে, সেই রকম। হে সোম! তুমি সর্বতোভাবে বর্ধিত হও। তুমি সকল আহার হতে রেতঃ সপ্রাপ্ত হও। অন্নের সাথে সঙ্গমের তুমি নিমিত্ত হও। হে সোম! তোমার পানীয়রূপ ক্ষীর ইত্যাদি রেতঃ সপ্রাপ্ত হোক; সেই রকমে তোমার অন্নসমূহও রেতের সাথে সংযুক্ত হোক, তোমার রেংসুও সংযুক্ত হোক। (কিরকম তোমার? না,) সহনের ক্ষেত্রে যে তুমি পাপের তিরস্কারকারী, ক্ষীর ইত্যাদির দ্বারা আপ্যায়িত হয়ে যে তুমি যজমানের অমৃতত্ব বা দেবত্বপ্রাপ্তির নিমিত্ত (দেবতাভাবায়) দুলোকে শ্রবণযোগ্য উত্তম অন্ন ধারণ করো (অর্থাৎ সম্পাদন করো)। [ এই অনুবাকের মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৫ম ও ৬ষ্ঠ অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৭॥

[সায়ণাচার্য বলেন–অষ্টমে রু পধানং বক্তব্য। তাহদৌ তাবশ্বাক্ৰমণমুচ্যতে। অর্থাৎ–এই অনুবাকের বক্তব্য রুক্স ইত্যাদির উপধান। সেই সঙ্গে অষের অভিক্রমণ বিষয় কথিত হয়েছে ]

.

অষ্টম অনুবাক

মন্ত্র- অভ্যস্থাদিশাঃ পৃতনা অতীতদগ্নিরাহ তদু সোম আহব বৃহস্পতিঃ সবিতা তন্ম আহ পূষা মাহৎ সুকৃতস্য লোকে। যদক্রন্দঃ প্রথমং জায়মান উদ্যৎ সমুদ্ৰাদুত বা পুরীষাৎ। শ্যেনস্য পক্ষা হরিণস্য বাহু উপস্তুতং জনিম তত্তে অর্ব। অপাং পৃষ্ঠমসি যোনিরশ্নেঃ সমুদ্রমভিতঃ পিম্বমান। বর্ধমানং মহঃ আ চ পুষ্করং দিবো মাত্রয়া বরিণা প্রথ। ব্ৰহ্ম জজ্ঞানং প্রথমং পুরস্তাদি সীমতঃ সুরুচো বেন আবঃ। স বুধিয়া উপমা অস্য বিষ্ঠাঃ সতশ্চ যোনিমসতশ্চ বিবঃ। হিরণ্য গর্ভঃ সমবাগ্রে ভুতস্য জাতঃ পতিরেক আসীৎ। স দাধার পৃথিবীং দ্যামুতেমাং কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম। প্রশ্চস্কন্দ পৃথিবীমনু দামিমং চ যোনিমনু যশ্চ পূৰ্ব্বঃ। তৃতীয়ং যোনিমনু সঞ্চরন্তং দ্ৰন্সং জুহোম্যনু সপ্ত ছোত্রাঃ। নমো অস্তু সর্পেভ্যো যে কে চ পৃথিবীমনু।। যে অন্তরিক্ষে যেই দিবি তেভ্যঃ সর্ধেভ্যো নমঃ। যেংদো নোচনে দিবো যে বা সুর্যস্য রশ্মিযু যেষামন্দু সদঃ কৃতং তেভ্যঃ সর্পেভ্যো নমঃ।। যা ইষবো যাতুদানাং যে বা বনস্পতীংরনু। যে বাহবটেষু শেরতে তেভ্যঃ সর্পেভ্যো নমঃ ॥৮॥

মর্মার্থ– এই অশ্ব পৃতনা অর্থাৎ প্রতিপক্ষ সেনাগণকে পদের দ্বারা অভিক্রম পূর্বক অবস্থান করুক। আহা সেই অভিক্রমণ অগ্নিদেব অনুমোদন করুন; সোমদেব, বৃহস্পতি দেবতা ও সবিতাদেবও তা অনুমোদন করুন। পূষাদেব সুকৃতির লোকে অর্থাৎ সুকৃতির ফলভূত স্বর্গে আমাকে স্থাপন করুন। হে অশ্ব (অর্ব! যে স্থান হতে জাত হয়ে তুমি প্রথম ক্রন্দন করেছিলে (অর্থাৎ অগ্নি ইত্যাদির কারণ-কারকরূপে মহৎ শব্দ করে উঠেছিলে) তোমার সেই জন্ম সমীচীন বলে সকলে স্তুতি করেছিল। (শ্রুতিতে বলা হয়েছে–অসু যোনির্বা অশ্ব–অর্থাৎ সমুদ্র-উপলক্ষিত জল হতে অশ্বের উৎপত্তি। অতএব) সমুদ্র হতে অথবা পুরুষের শক্তিসম্পন্ন অশ্ব হতে তোমার উৎপত্তি। তোমার জন্ম উপস্তুত (উৎকৃষ্ট বলে প্রশংসিত) হয়েছে; যেমন শ্যেনপক্ষীর পক্ষ দুটি শীঘ্র উড্ডীয়মান হওয়ার কারণে কিম্বা মৃগের পদসমূহ শীঘ্র গমনের কারণে লোকে প্রশংসা করে থাকে। হে পুষ্পরপর্ণ (পদ্মপত্র)! তুমি জলের উপরিভাগে অবস্থিত, তুমি অগ্নির যোনি অর্থাৎ জন্মের কারণস্বরূপ; সেইরকমে তুমি সমুদ্রসমান তোগজলের (বৃহৎ পুষ্করিণীর জলের) প্রীতিকর, জলে উৎপন্ন হয়ে দিনে দিনে বুদ্ধিযুক্ত, নির্লিপ্ত থাকার নিমিত্ত পূজনীয়, অগ্নির সম্পাদনের কারণে বৃদ্ধিযুক্ত (পুষ্টিকর)। এই হেন তুমি আকাশ অপেক্ষাও অধিক পরিমাণে বিস্তৃত হও।–প্রথম উৎপন্ন এই রুক্মস্বরূপ ব্ৰহ্ম অতি মহৎ। (তস্য রুক্মস্য দৃষ্টান্তত্বেন সূর্য প্রপঞ্চতে–অর্থাৎ) এই স্থলে রুক্সের (স্বর্ণের) দৃষ্টান্তের দ্বারা সূর্যের প্রসঙ্গ বিস্তারিত হচ্ছে–পূর্বদিকে অবস্থিত এই কমনীয় সূর্য তার শোভন রশ্মিসমূহের দ্বারা বিস্তৃত হচ্ছেন। এই রুক্সের উপমানভূত তিনি পৃথিবীতে বিশেষভাবে অবস্থান করছেন এবং সেখানে অবস্থিত সবকিছুকে প্রকাশ করছেন, (অর্থাৎ সেখানকার ঘটপট ইত্যাদির কারণ মৃত্তিকা ও মনুষ্য সব কিছুকেই প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ সেইরকমে সূর্যসদৃশ এই রুক্সও প্রকাশ পাচ্ছে)। হিরণ্যগর্ভ (অর্থাৎ হিরণ্যে তথা ব্রহ্মাণ্ডরূপ গর্ভে অবস্থিত) প্রজাপতি প্রাণিগণের উৎপত্তির পূর্বে স্বয়ং শরীরধারীরূপে বিরাজিত ছিলেন। তিনি উৎপন্নমাত্র সকল জগতের অধিপতি ছিলেন (পতিরাসীৎ)। অতএব তিনি মর্ত্যলোক, অন্তরিক্ষলোক এবং বিস্তীর্ণ স্বর্গলোক ধারণ করেছেন (ধৃতবা)। সেই হেন প্রজাপতিদেবতার উদ্দেশে হবিঃ সমর্পন পূর্বক পরিচর‍্যা করছি। দ্রব্যান্তরসঙ্টুনের অর্থাৎ মেলনের দ্বারা স্ফুটিত সেই হিরন্ময় পুরুষের অত্যন্ত স্বল্প অংশ (অবয়বলেশ) সর্পরূপে এই পৃথিবীতে পতিত হয়েছে; এবং সেই সর্পসমুহ আহুত হয়ে দুলোক, অন্তরিক্ষলোক ও ভূলোকে অনুসঞ্চারিত হয়েছে। পৃথিবীতে যে সর্পগণ আছে, সেই সর্পগণের উদ্দেশে নমস্কার (সর্পেভ্যো নমোহস্তু)। অন্তরিক্ষে অর্থাৎ যক্ষ, গন্ধর্ব ইত্যাদি লোকে যে সৰ্পৰ্জন বর্তমান, সেই সৰ্পৰ্গণের উদ্দেশে নমস্কার। এবং যে সর্পগণ দুলোকে বর্তমান, রাহু প্রভৃতি সেই সর্পগণের উদ্দেশে নমস্কার। যে সর্পগণের সূর্যমণ্ডলে বাস, যে সর্পগণ সূর্যরশ্মির ন্যায় দৃশ্যমান, যে সর্গণের নিবাসস্থান জল, সেই সকল সর্পের উদ্দেশে নমস্কার। যে সর্পজাতি রাক্ষসগণের বাণরূপে বর্তমান (রক্ষসামিষবো বাণরূপা বৰ্তন্তে), যে সর্পগণ বনস্পতি চন্দন ইত্যদি বৃক্ষ বেষ্টন করে অবস্থিত, যে সর্পগণ অবটে অর্থাল গহ্বরে শায়িত, সেই সর্পগণের উদ্দেশে নমস্কার। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৬ষ্ঠ ও ৭ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৮॥

[সায়ণাচার্য বলেন-নবমে স্বয়মাতৃম্নাদীষ্টকোপধানমুচ্যতে। অর্থাৎ, এই নবম অনুবাকে স্বয়মাতৃঃ ইত্যাদি ইষ্টকের উপধান উক্ত হয়েছে।]

.

নবম অনুবাক

মন্ত্র- ধ্রুবাহসি ধরুণাহস্তুতা বিশ্বকৰ্ম্মণা সুকৃতা। মা ত্বা সমুদ্র উদ্বধীমা সুপর্ণো ব্যথমানা পৃথিবীং দৃংহ। প্রজাপতিত্ত্বা সাদয়তু পৃথিৰ্যাঃ পৃষ্ঠে ব্যচস্বতীং প্রথমৃতীং প্রথোহসি পৃথিব্যসি ভূরসি ভূমিরস্যদিতিরসি বিশ্বধায়া বিশ্বস্য ভুবনস্য ধর্তী, পৃথিবীং বচ্ছ পৃথিবীং দৃংহ পৃথিবীং মা হিংসীৰ্বিশ্বম্মৈ প্রাণায়াপনায় ব্যায়োদানায় প্রতিষ্ঠায়ৈ চরিত্রায়গ্নিাহভি পাতু। মহ্যাঁ স্বস্ত্যা ছষা শম্ভমেন তয়া দেবতয়াহঙ্গিরস্ববা সীদ। কাণ্ডাৎ কাণ্ডাৎ প্রবোহস্তী পরুষঃ পরুষঃ পরি। এবা নো দুৰ্ব্বে প্র তনু সহস্রেণ শতেন চ।। যা শতেন প্রতনোষি সহণে বিবোহসি। তস্যান্তে দেবীষ্টকে বিধেন হবিষা বয়। আষাঢ়াহসি সহমান সহকারীতীঃ সহস্বারাতীয়তঃ সহস্র পৃতনাঃ সহস্ব পৃতন্যতঃ। সহস্রবীৰ্যা অসি সা মা জিম্ব। মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরিন্ত সিন্ধবঃ। মাধ্বীনঃ সন্তোষধীঃ। মধু নমুতাসি মধুমপার্থিবং রজঃ।। মধু দৌরস্তু নঃ পিতা। মধুমাগ্নে বনস্পতিৰ্ম্মধুমান অস্তু সূৰ্য্যঃ। মাধ্বীর্গাবো ভবন্তু নঃ। মহী দ্যৌঃ পৃথিবী চ ন ইমং যজ্ঞং মিনিক্ষতামূ। পিতৃতাং নো ভয়ীমভিঃ। তদ্বিষ্ণোঃ পরম পদম সদা পশ্যন্তি সূরয়। দিদীব চক্ষুরাততম্।। ধ্রুবাহসি পৃথিবি সহ পৃতন্যতঃ। সতা দেবেভিমৃতেনাহগাঃ। যাস্তে অগ্নে সুৰ্য্যে রুচ উদ্যততা দিবমাতন্তি রশ্মিভিঃ। তাতিঃ সৰ্বাভী রুচে জনায় নস্কৃধি। যা বো দেবাঃ সূৰ্য্যে রুচো গোম্বষেষু যা রুচঃ। ইন্দ্রাগ্নী তাভিঃ সৰ্বাভী রুচং নো ধও বৃহম্পতে। বিরাট জ্যোতিরধারয় সম্রাড়জ্যোতিরধারয়ৎ স্বরাড়জ্যোতিরধারয়ৎ। অগ্নে যুা হি যে তবাশ্বাস্যে দেব সাধবঃ। অরং বহত্যাশৰঃ।। যুক্ষা হি দেবহুতমান্ অশ্বানং অগ্নে রথীরিব। নি হোতা পূৰ্বঃ সদঃ। দ্রশ্চস্কন্দ পৃথিবীমনু দামি চ যোনিমনু যশ্চ পূৰ্ব্বঃ। তৃতীয়ং যোনিমনু সঞ্চরন্তং দ্রং জুহোম্যনু সপ্ত ছোত্রাঃ। অভূদিদং বিশ্বস্য ভুবনস্য বাজিনমগ্নের্বৈশ্বানসর্য চ। অগ্নিজ্জ্যোতিষা জ্যোতির্মান রুকো বৰ্চসা বর্ডম্বা। ঋচে জ্বা রুচে ত্বা সমিৎ শ্রবন্তি সরিতো ন ধেনা। অন্তৰ্জা মনসা পয়মানাঃ। ঘৃতস্য দারা অভি চাকশীমি। হিরণ্যয়ো বেতমো মধ্য আসাম। তস্মিৎ সুপর্ণো মধুকৃৎ কুলায়ী ভজন্নাস্তে মধু দেবতাভ্যঃ। তস্যাইসতেহরয় সপ্ত তীরে স্বধাং দুহানা অমৃতস্য ধারা ॥৯॥

মর্মার্থ- হে স্বয়মাতুন্ন নামে অভিহিতা ইষ্টকা! তুমি স্থিরা। (কিরকম? না,) ধরুণা, অর্থাৎ ভূমিরূপে বিশ্বের ধারয়িত্রী; বাস্তৃতা, অর্থাৎ কারও দ্বারা না হিংসিতা; বিশ্বকর্মা সুকৃতা, অর্থাৎ জগকর্তা বিশ্বকর্মা কর্তৃক সুষ্ঠ ভাবে নির্মিত। সমুদ্র যেন তোমাকে আপন উদরের মধ্যে নিমজ্জিত করে না বধ করেন, পক্ষীরাজ সুপর্ণও (গরুড়ও) যেন সাপ-উত্তোলন কালে (অর্থাৎ সর্পকে উত্তোলিত করে ভক্ষণ করার সময়ে) তোমাকে পরিত্যাগ করেন অর্থাৎ বধ না করেন। এইভাবে তুমি ভয়রহিত হয়ে (অর্থাৎ অব্যথমানা হয়ে) এই পৃথিবীকে দৃঢ় করো। (উপধান মন্ত্র)–হে স্বয়মাতৃগ্না! প্রজাপতি তোমাকে এই প্রদেশে (অর্থাৎ পৃথিবীর উপরে) স্থাপন করুন। (কিরকম তুমি? না, তুমি বিস্তারযুক্তা, পৃথুলা (অর্থাৎ স্থলা); অধিকন্তু এই চিতির বিস্তাররূপা (বিস্তাররূপমসি)। তোমার দ্বারা চিতির বিস্তার হয়। পৃথিবী হতে উৎপন্ন হওয়ার কারণে তুমি পৃথিবী, তুমি সুখের ভাবয়িত্রী (সুখদত্ৰী), তুমি ভূমিরূপা অর্থাৎ পৃথিবীর অভিমানী ভূমিদেবতা এবং তুমি অদিতি অর্থাৎ অখণ্ডনীয়া। তুমি বিশ্বধায়া, বিশ্বের পোষণকারিণী। সেইভাবে তুমি ভুবনের সর্ব লোকের ধারণকারিণী (ধত্রী)। তুমি এই পৃথিবীকে নিয়মিতা করো (অর্থাৎ সংযতা করো), তাকে দৃঢ়া করো এবং এই পৃথিবীর প্রতি হিংসা করো না। সকলের (অর্থাৎ সর্ব জীবের) প্রাণ-অপান-ব্যান-উদান নামে আখ্যায়িত বায়ুসমূহের বৃত্তি (অর্থাৎ স্বদেহে স্থিতি) লাভের নিমিত্ত ও শাস্ত্রীয় আচার লাভের নিমিত্ত অগ্নিদেব তোমাকে রক্ষা করুন। (কি ভাবে রক্ষা করবেন? না, তার মহতী যোগক্ষেম (অর্থাৎ অলব্ধ বস্তুর লাভ ও লব্ধ বস্তুর রক্ষণ)–রূপ সম্পত্তি ও অত্যন্ত সুখকর দীপ্তি বিশেষের দ্বারা রক্ষা করবেন। তোমার (অর্থাৎ স্বয়মাতৃণা ইষ্টকার) স্বামীভূত যে দেবতা, তাঁর দ্বারা অনুগৃহীতা হয়ে তুমি স্থির হয়ে এইস্থানে উপবেশন করো, যেমন অঙ্গিরা ঋষিগণ কর্তৃক অগ্নিচয়নের অনুষ্ঠানে ছিলে। হে দূর্বা, তুমি যেমন গুচ্ছে গুচ্ছে (গাছায় গোছায়) পর্বে পর্বে (গাঁটে গাঁটে) প্রকৃষ্টভাবে উৎপন্ন হয়ে থাক, সেইভাবে আমাদেরও শতশত ও সহস্ৰসহস্র সংখ্যায় তোমার মতোই প্রকর্ষের সাথে বিস্তৃত করো। হে দূর্বা! যে তুমি শত শত সংখ্যায় স্বরূপে অর্থাৎ দুর্বারূপে অত্যন্ত বিস্তৃতা হও, সেই তুমিই সহস্র সহস্র সংখ্যায় নানা আকারে উৎপাদিত হয়ে থাক। হে ইষ্টকা দেবী! আমরা হবির দ্বারা তোমার পরিচর‍্যা করছি। হে ইষ্টকা! তুমি অষাঢ়া (অর্থাৎ উখানির্মাণ কালে নির্মিতা অষাঢ়া নামক ইষ্টকা); তুমি কারও দ্বারা পরিভূত না হয়ে নিজে বিরোধীগণকে পরিভূত (তিরস্কৃত) করে থাক। যারা আমাদের দেয় (বা প্রাপ্য) বস্তু প্রদান করে না, সেই শত্রুগণকে পরিভূত করো; যারা পূর্বে শত্রুতা করেনি, কিন্তু পরে করবে, সেই শত্রুদেরও পরিভূত করো। হে ইষ্টকা! তুমি শত্রুসেনাকে পরিভব করো; যে শত্রুগণ সেনারহিত হয়েও বৈরিতা করেছে এবং পরে সেনা কামনা করছে, সেই শত্রুদেরও পরিভব করো। তুমি সহস্রবীর্য, অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক সামর্থ্যের অধিকারিণী; সেইভাবেই তুমি আমাকে প্রীত করো। যজ্ঞসাধনে ইচ্ছুক যজমানের উদ্দেশে বায়ুবর্গ মধুর রস ক্ষরণ (স্রবণ) করছে, সমদ্রসমূহও মধুর রস ক্ষরণ করছে; ওষধীসমূহও আমাদের নিমিত্ত মধুর রসোপেত (রসযুক্ত) হোক। রাত্রি ও দিবা (বা প্রভাত) আমাদের পক্ষে মধুময় হোক; পার্থিব রজঃ (অর্থাৎ পৃথিবীর সকল ধূলিকণাও) মধুর রসযুক্ত হোক; আমাদের পিতৃস্থানীয় দুলোক মধুর রসযুক্ত হোক। অশ্বত্থ ইত্যাদি বনস্পতিগণ আমাদের নিমিত্ত মাধুর্যরসোপেত হোক; সুর্যও সন্তাপরাহিত্য-লক্ষণ হয়ে মাধুর্যরসযুক্ত (অর্থাৎ মধুমান বা মধুর রস বর্ষণকারী) হোক, এবং গাভীগুলি আমাদের নিমিত্ত মধুর ক্ষীরযুক্তা হোক। এই দ্যাবাপৃথিবী উভয়ে আমাদের এই যজ্ঞ মধুর ফলবর্ষণের দ্বারা সিক্ত করতে ইচ্ছান্বিত হোক, ভরণ বা পালন শক্তির দ্বারা আমাদের পরিপূরিত করুক। বেদান্তপারগ বিদ্বানগণ বিষ্ণুর পরম পদ বা স্থান সদা দর্শন করে থাকেন। (কিরকম সেই দর্শন? না,) দিব্যাকাশে (নিরাবরণে) চক্ষুর ন্যায় ব্যাপ্ত। হে পৃথিবীর কার্যস্বরূপা উখা! তুমি স্থিরা; তুমি সংগ্রাম করতে ইচ্ছুক শত্রুগণ পরাজিত করো। তুমি দেবতাদের সাথে অমৃতসমান ঘৃতে পূর্ণা হয়ে আগমন করো। হে অগ্নিদেব! সূর্যমণ্ডলে উদিত হয়ে আপনার যে রশ্মিস্বরূপ দীপ্তির দ্বারা দ্যুলোককে সর্বতোভাবে ব্যাপ্ত করেছেন, সেই দীপ্তির দ্বারা আমার যজমানের প্রকাশ করুন। হে দেবতাগণ! সূর্যমণ্ডলে আপনাদের সম্বন্ধিনী যে দীপ্তি আছে, হে ইন্দ্র, অগ্নি ও বৃহস্পতি দেব! আপনারা তিনজন সেই সকল দীপ্তির দ্বারা আমাদের নিমিত্ত প্রকাশ সম্পাদিত করুন (নোহস্মর্থং রুচং প্রকাশং সম্পাদয়ত)। বিশেষভাবে রাজমান হওয়ার নিমিত্ত বিরাটু নামে আখ্যাত, সম্যক রাজমান হওয়ার কারণে সম্রাট নামে খ্যাত, স্বয়ং রাজমান হেতু স্বরা নামে অভিহিত, যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইষ্টকা তিনটি আমাদের নিমিত্ত (প্রতি) অনুগ্রহবশতঃ জ্যোতি ধারণ করেছিল। হে অগ্নিদেব! আপনার সাথে সম্বন্ধবিশিষ্ট যে সকল দান্ত (শান্ত), শীঘ্রগামী ও সুষ্ঠুভাবে ভারবহণকারী অশ্ব আছে, সেই অশ্বগুলিকে যোজনা করুন (যোজয়)। হে অগ্নিদেব! দেবতাবর্গকে আহ্বানকারী অশ্বগুলিকে সেইভাবে যোজিত করুন, যেভাবে রথস্বামী (রথী) তার অশ্বগুলিকে (রথে) যোজনা করেন। অধিকন্তু,আপনি পুরাতন হোতরূপে (অর্থাৎ হোমের উৎপাদক হয়ে) এই যজ্ঞস্থলে উপবেশন করুন।-দ্রব্যান্তর সঙ্টুনের দ্বারা (দ্রব্যসমূহের মেলনে বা পরস্পর ঘর্ষণ জনিত কারণে) স্ফুটিত যে হিরণ্যখণ্ড পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল, সেই প্রন্স বা খণ্ড আহুত হয়ে দ্যুলোক, অন্তরিক্ষলোক ও ভূলোক–এই তিন স্থানে অনুসঞ্চারিত হচ্ছে। সেই তিনস্থানে অনুসঞ্চরমান হিরণ্যখণ্ডের উদ্দেশে আমি মনে মনে আহুতি প্রদান করছি। (অর্থাৎ যে স্থানে খণ্ড পতিত হয়েছে, সেই স্থান ব্যতিরিক্ত হোমযোগ্য যে সাতটি দিক আছে, সেই দিক সমূহে আমি অনুক্রমে যুগানুষ্ঠান করছি, যাতে এই খণ্ড আহুত হয়ে আদিত্য ইত্যাদি তিন স্থানে সঞ্চারিত হয়, এমন ভাবছি)। এই হিরণ্য ভুবনের ভূতজাতের (অর্থাৎ প্রাণীসমূহের) অন্নস্বরূপ; এবং সেই হেতু এই হিরণ্য বিশ্বের সকল নরের হিতকরী বৈশ্বানর অগ্নিরও অনুভূত। এই অগ্নি হিরণ্যের প্রভায় (জ্যোতিতে) স্বয়ং জ্যোতিষ্মন হয়েছেন; সেইভাবে রোমান (কান্তিমান) অগ্নি হিরণ্যের কান্তিতে স্বয়ংও কান্তিমান হয়েছেন। (এইস্থলে বাহ্য প্রভা জ্যোতি ও শরীরগত কান্তি বর্চ বলে চিহ্নিত হয়েছে–অথ বাহ্যপ্রভা জ্যোতিঃ,শরীরগতকান্তির্বর্চ ইতি)। হে হিরণ্যশকল (খণ্ড)! এই যে স্তোত্ররূপা ঋক, তার নিমিত্ত তোমাকে দক্ষিণ অক্ষিগোলকে; এবং সেইভাবে, হে হিরণ্যখণ্ড! রুচি বা দীপ্তির নিমিত্ত তোমাকে বাম অক্ষিগোলকে প্রতিস্থাপিত করছি। পানযোগ্য দধির মধুর অংশসমূহ (অবয়বাঃ) সম্যক্ প্রবাহিত হচ্ছে। (কেমনভাবে? না, সরিতের মতো, যেমন নদী প্রবাহিত হয়, সেই রকম। শরীরের অভ্যন্তরে হৃদয়-পুণ্ডরীকবর্তী (অর্থাৎ মন বা হৃদয়রূপ পদ্মের মধ্যস্থায়ী) অন্তঃকরণের দ্বারা শোধিত হয়ে দধির মধুর অংশগুলি ঘৃতের ধারারূপে সম্পাদিত হচ্ছে (পরিণত হচ্ছে), সেই ধারাসমূহ আমার সম্মুখে (অভিতঃ) প্রকাশিত হচ্ছে (অর্থাৎ আমি অনুভব করছি)। এই ঘৃতধারার মধ্যে সুবর্ণময় (এমন) তেজোরূপ পুরুষের মস্তক প্রকাশমান হচ্ছে, যেমন জলপ্রবাহের মধ্যগত বেতসবৃক্ষ প্রকাশমান হয়ে থাকে। সেই বেতসস্থানীয় (অর্থাৎ বেতসের ন্যায় প্রকাশমান) পুরুষের মস্তকে কোনও মধুকর আছে। (কিরকম? না,) কুলায়ী, অর্থাৎ শোভন পক্ষবিশিষ্ট মধুকরের নিবাসস্থানের মতো। (কি করছে? না) সে দেবতাগণের নিমিত্ত মধু সম্পাদন করছে (অর্থাৎ সংগ্রহ করছে)। সেই পুরুষের মস্তকের সমীপে সপ্তছিদ্রবর্তী সপ্তসংখ্যক মধু আহরণশীল মধুকর বর্তমান। (কি করছে তারা? না,) তারা স্বকার-উপলক্ষিত ভোগ্যবস্তুরূপ অমৃতের বা মধুর ধারা ক্ষরণ করছে (মধুনো ধারাং দুহানাঃ স্রাবয়ন্তস্তে)। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৮ম ও ৯ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ॥৯॥

[সায়ণাচার্য বলেন–দশমে পশুশীর্ষোপধানং বক্তব্য। অর্থাৎ এই দশম অনুবাকের বক্তব্য হলো পশুশীর্ষের উপধান।]

.

দশম অনুবাক

মন্ত্র- আদিত্যং গর্ভং পয়সা সমঞ্জৎ সহস্ৰস্য প্রতিমাং বিশ্বরূপ। পরিবৃদ্ধি হরসা মাহভি মৃক্ষঃ শতায়ুষং কৃণুহি চীয়মানঃ। ইমম মা হিংসীৰ্দিপাদং পশুনাং সহস্রাক্ষ মেধ আ চীয়মানঃ। ময়ুমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানন্তনুবো নিষীদ। বাতস্য ব্রাজিং বরুণস্য নাভিমশ্বং জজ্ঞানং সরিসস্য মধ্যে। শিশুং নদীনাং হরিমদ্রিবুদ্ধময়ে মা হিংসীঃ পরমে ব্যেম। ইমং মা হিংসীরেকশফং পশনাং কনিক্ৰদং বাজিনং বাজিনেষু। গৌরারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানস্তনুবো নি যীদ। অজস্রমিন্দুমরুষং ভুরণামগ্নিমীড়ে পূৰ্ব্বচিত্তৌ নমোভিঃ। স পৰ্ব্বভিঋতুশঃ কল্পমানো গাং মা হিংসীরদিতং বিরাজ। ইমম্ সমুদ্রং শতধারমুৎর্সং ব্যচ্যমানং ভুবনস্য মধ্যে। ঘৃতং দুহানামদিতিং জনায়াগ্নে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোমা। গবরমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিম্বানন্তনুবো নি যীদ। বরুত্রিং ত্বষ্ট্ররুণস্য নাভিমবিং জজ্ঞানাং রজসঃ পয়ৎ। মহীৎ সাহশ্রীমসুরস্য মায়ামগ্নে বা হিংসীঃ পরমে ব্যোম। ইমামুর্ণায়ুং বরুণস্য মায়াং স্বচং পশুনাং দ্বিপাদং চতুষ্পদাম। ত্বঃ প্রজানাং প্রথমং জনিময়ে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোম। উষ্ট্রমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিন্বানন্তনুবো নি যীদ যে অগ্নিরগ্নেস্তপসোহধি জাতঃ শোচাৎ পৃথিব্যা উত বা দিম্পরি। যেন প্রজা বিশ্বকর্মা ব্যানটু তমগ্নে হেড়ঃ পরি তে বৃণ। অজা হ্যগ্নেরজনিষ্ট গর্ভাৎ সা বা অপশ্যঞ্জনিতারমগ্রে। তয়া রোহমায়নুপ মেধ্যাস। শুয়া দেবা দেবতামগ্র আয়। শরভমারণ্যমনু তে দিশামি তেন চিদানস্তনুবো নি যীদ ॥১০৷

মর্মার্থ- হে অগ্নি! আপনি চীয়মান হয়ে অদিতি দেবতার কার্যরূপ গর্ভসদৃশ এই পুরুষশীর্ষকে সর্বতোভাবে বর্জন করুন; আপনার তেজঃ বা জ্বালারূপের দ্বারা একে স্পর্শ করবেন না। (অর্থাৎ আপনার জ্বালামালায় সবকিছু দগ্ধ হলেও এই পরুষশীর্ষকে যেন দগ্ধ করবেন না)। এই দাহাভাবের দ্বারা (অর্থাৎ দাহ না করার দ্বারা) আপিনি গর্ভ বা যজমানকে শতায়ু করুন। (কিরকম গর্ভ? না,) সহস্র পশুতুল্য।–হে সহস্রাক্ষ (অর্থাৎ সহস্ৰসংখ্যক জ্বালারূপ চক্ষুযুক্ত)! হে মেধ (অর্থাৎ যজ্ঞনিম্পাদক অগ্নিদেব)! আপনি চীয়মান হয়ে গ্রাম্য ও আরণ্য পশুগণের মধ্যে এই পুরুষমুণ্ডরূপ দ্বিপাদযুক্ত গ্রাম্যপশুকে দাহরূপ হিংসা করবেন না ( অর্থাৎ মনুষ্য যজমানকে দগ্ধ করবেন না)। যদি আপনার ক্ষুধার উদ্রেক হয়, তবে আপনার ভক্ষণের নিমিত্ত এই কৃষ্ণমৃগ প্রদান করছি; এই মৃগভক্ষণের দ্বারা আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর পুষ্টি সাধন পূর্বক এই স্থানে উপবেশন করুন। হে অগ্নি! আপনার জ্বালারূপ হিংসায় এই অশ্বকে দগ্ধ করবেন না। বিবিধ রোগ হতেও একে রক্ষা করুন। (অর্থাৎ অশ্বের সহস্র রকমের রোগ থাকে, সেই সর্ব রোগ হতে একে রক্ষা করুন); এবং রক্ষিত এই অশ্বের যাতে পুনরায় কোন উপদ্রব না ঘটে। সেইভাবে একে পরম ব্যোমে স্থাপন করুন। (এই অশ্ব কিরকম? না,) এই অশ্ব বায়ুর ন্যায় শীঘ্রগতিসম্পন্ন; জলাধিপতি বরুণের নাভিস্থানীয়, (অর্থাৎ আপন উদরমধ্যবর্তী নাভিকে বস্ত্রাবৃত করে যেমন রক্ষা করা হয়, সেইরকম অত্যন্ত প্রিয়ত্বের কারণে বরুণ কর্তৃক পালনীয়); সমুদ্রজলের মধ্যে বড়বারূপে উৎপন্ন, (এই নিমিত্ত অশ্বকে অঙ্গুযযানি বলা হয়); নদীসমূহের শিশু, (অর্থাৎ নদীগণের পতি সমুদ্র এই অশ্বের পিতা, সুতরাং সমুদ্রের পত্নী নদীসমূহ এই অশ্বের মাতা); এবং তার উপরে আরোহণকারীকে বহনকারী। এই অশ্বের খুরের দ্বারা ক্ষুদ্র পাষাণ চূর্ণ হয়, সুতরাং পথের মধ্যে সেই পাষাণচূর্ণ দর্শনে বোধগম্য হয় (বোষ্ঠুং শক্যতে) যে, সেই পথে অশ্ব গমন করেছে। হে অগ্নিদেব! চতুষ্পদ পশুগণের মধ্যে এই অশ্ব এক খুরবিশিষ্ট, একে হিংসা করবেন না। (কিরকম অশ্ব? না,) হ্রেষা শব্দ (অশ্বধ্বনি)-রূপ অত্যন্ত ক্রন্দন উৎসারিত করতে করতে চলেছে; এই অশ্ব প্রাণীগণের মধ্যে অত্যন্ত শীঘ্রগতিযুক্ত। আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আপনাকে এই গৌর অর্থাৎ সিংহ প্রদান করছি, এই সিংহকে ভক্ষণের দ্বারা আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর, পুষ্টি সাধন পূর্বক এই স্থানে উপবেশন করুন। পূর্বকালীন মহর্ষিগণ কর্তৃক চয়নকালে পূজিত হয়ে অবস্থানকারী, এই ধ্যেয় (ধ্যানের বিষয়ীভূত) অগ্নিকে আমি নমস্কারযুক্ত স্তুতি করছি। (কিরকম আগ্ন? না,) এই অগ্নি নিরন্তর পরম ঐশ্বর্যোপেত; মর্মসংঘাত না করে যজমানকে পালন করে থাকেন। (অর্থাৎ যজমানের মনে কোনরূপ বৈরিতা উদঘাটিত না করে, এমন)। সেই অগ্নি আদিত্য রূপে অবস্থিত হয়ে প্রতি ঋতুর প্রতি অমাবস্যা ইত্যাদি তিথিতে বা পর্বে কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। সেই হেন, হে অগ্নিদেব! আপনি ঋষভশ্রেষ্ঠ এই গো-টিকে হিংসা করবেন না। (কিরকম গো? না,) অদিতি, অর্থাৎ অখণ্ডনীয়; বিরাজং, অর্থাৎ বিশেষরূপে রাজমান বা শোভমান। হে অগ্নিদেব! যজমানের নিমিত্ত এই ঋষভশ্রেষ্ঠ গো-টিকে হিংসা করবেন না; পরন্তু একে পরম ব্যোমে উত্তমভাবে বিবিধরকম রক্ষণের দ্বারা স্থাপন করুন। (কিরকম গো? না,) ইমং সমুদ্রং, অর্থাৎ এই গো সম্যক্‌ উন্নত; শতধারং, অর্থাৎ স্বজাতীয় ধেনুর দ্বারা শতসংখ্যক (অপরিমেয়) ক্ষীরধারাযুক্ত, (অর্থাৎ এর উৎস জলপ্রবাহের মতো; ভুবনের মধ্যে বাচ্যমান, বিদ্যমান বা সেব্যমান, স্বজাতীয় ধেনুর ক্ষীর ইত্যাদির দ্বারা ঘৃতদোহন বা ঘৃতপ্রাপ্তি যুক্ত); এবং অদিতিম, অর্থাৎ অখণ্ডনীয়। হে অগ্নি! আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আপনাকে এই গবয়টি (আরণ্য মৃগবিশেষ তথা বনগব বা গলকম্বলশূন্য গো-তুল্য আরণ্য পশুটিকে) প্রদান করছি, এটিকে ভক্ষণের দ্বারা আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর পুষ্টি সাধন পূর্বক এই স্থানে উপবেশন করুন।–হে অগ্নি! আপনি এই জ্যোতির্ময় মস্তকধারী অবিকে (মেষটিকে) হিংসা করবেন না; পরন্তু একে পরম ব্যোমে উত্তমভাবে বিবিধরকম রক্ষণের দ্বারা স্থাপন করুন। (এই অবি কিরকম? না,) এই অবি সকল বরণীয় রূপের নির্মাতা যে ত্বষ্ট্রদেবতা (বিশ্বকর্মা) তাঁরই অনুগ্রহে বরণীয় রূপযুক্ত, অগ্নি হতে অনিষ্ট নিবারক বরুণের নাভিস্থানীয় (অর্থাৎ নাভিকে বস্ত্রাবৃত করে যেমন রক্ষা করা হয়, সেইরকমভাবে বরুণ কর্তৃক পালনীয়), প্রজাপতির বক্ষঃস্থল হতে উৎপন্ন (প্রজাপত্যুরস উৎপন্না), মহান, সহস্র অসুরের মায়ায় গঠিত সুবর্ভানু নামক অসুর সম্বন্ধীয় ঘটনাক্রমে নির্মিত (বা সৃষ্ট)। (সুবর্ভানু ইত্যদির বিষয় ২য় কাণ্ডের ১ম প্রপাঠকের ২য় অনুবাকে প্রাপ্তব্য)।–হে অগ্নিদেব! এই জ্যোতির্মণ্ডিত মস্তক (বৃষ্ণিশিরো) উর্ণায়ু অর্থাৎ মেষকে আপনি হিংসা করবেন না। (কিরকম মেষ? না, এই মেষ অগ্নি সম্বন্ধীয় অনিষ্টের নিবারক বরুণের মায়ায় নির্মিত; মে দ্বিপদ মনুষ্য ও চতুষ্পদ গো-ইত্যাদি পশুর ত্বক-সদৃশ, (অর্থাৎ মনুষ্যগণ শীতনিবারণের নিমিত্ত মেষরোম-নির্মিত কম্বলের দ্বারা দেহ আচ্ছাদিত করে; কিংবা অশ্ব ও বলীবদের ভারবহনের মৃদুত্ব সম্পাদনের নিমিত্ত তাদের পৃষ্ঠে ঐ রকম কম্বলের আস্তরণ দেওয়া হয়। এই কম্বল যেন মনুষ্য ও ঐ পশুগণের ত্বকস্বরূপ);এই মেষ প্রজাপতির (ত্বদেবতার) সকাশে উৎপদ্যমান হওয়ার কারণে প্রজাগণের মধ্যে প্রথম ও প্রধান; এবং প্রাধান্যং, অর্থাৎ বীর্যবান। হে অগ্নি! আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আমি এই আরণ্য উষ্ট্র প্রদান করছি, আপনি এই উষ্ট্রকে ভক্ষণ পূর্বক আপনার জ্বলদর্চিরূপ তনুর পুষ্টি সাধন করুন এবং তারপর এই স্থানে উপবেশন করুন। হে অগ্নিদেব! আপনি প্রজাপতির সৃষ্টিসংকল্পরূপ তপস্যা হতে উৎপন্ন। (অর্থাৎ প্রজাপতি যখন সকল সৃষ্টির কামনায় তপস্যা করছিলেন, তখন তার সেই তপস্যা হতে অগ্নি জাত হয়েছিলেন)। আপনি পৃথিবী বা ভূমির উপরে শোভা পাচ্ছেন, এবং স্বর্গের উপরেও শোভা পাচ্ছেন। অধিকন্তু জগৎস্রষ্টা প্রজাপতি (বিশ্বকর্মা)। আপনার সৌজন্যেই বিবিধরকম প্রজা ও পশুর দ্বারা ব্যাপ্ত হয়েছেন। হে অগ্নি! প্রজাপতি আপনাকে তাপরূপ যে কোপ বা ক্রোধ প্রদান করেছেন, সেই কোপের বশে আপনি যেন এর বিনাশ করবেন না। হে অগ্নি! প্রজাপতি হতে সস্তৃতা এই অজাকে হিংসা করবেন না। এই অজা উৎপন্ন হবার পর আপন উৎপাদক প্রজাপতিকে দর্শন করেছিল; সেই কারণে এই অজা দেবতাগণের উদ্দেশে অনুষ্ঠিত যাগের পক্ষে উপযুক্ত হয়েছে, (অর্থাৎ যাগযোগ্য দৈব-অজা রূপে গৃহীত হয়েছে)। এই যাগযোগ্য অজা যজমানের স্বর্গপ্রাপ্তির কারণ। কারণ, পূর্ববর্তী জন্মে এই অজার দ্বারা যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠিত করে দেবগণ দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। (২কা, ১, ২অ. দ্রষ্টব্য)। হে অগ্নিদেব! আপনি এই অজাকে হিংসা করবেন না; পরন্তু আপনি একে পরম ব্যোমে স্থাপনপূর্বক রক্ষা করুন। আপনার যদি ক্ষুধাদ্রেক হয়, তবে আপনাকে এই শরভ (অর্থাৎ সিংহঘাতী ক্রুর মৃগ) প্রদান করছি, একে ভক্ষণ পূর্বক আপনি আপনার জ্বলদর্চিতনুর পুষ্টি সাধন করুন, এবং তারপর এই স্থানে উপবেশন করুন। [এই মন্ত্রগুলির সাথে পরবর্তী কাণ্ডের ২য় প্রপাঠকের ৯ম অনুবাকের মন্ত্রগুলি সংশ্লিষ্ট] ১০।

[সায়ণাচার্য বলেন-একাদশে যাজ্যানুবাক্যা উচ্যতে। অর্থাৎ–এই একাদশ অনুবাকে যাজ্যা ও পুরোনুবাক্যা সমূহ উক্ত হয়েছে]

.

একাদশ অনুবাক

মন্ত্র- ইন্দ্রাগ্নী রোচনা দিবঃ পরি বাজে ভূষথঃ। তদ্বাং চেতি প্ৰ বীৰ্য্য। থদ্ভূত্রমুত সনোতি বাজমিন্দ্রা যো অগ্নি সহুরী সপৰ্য্যাৎ। ইরজ্যা বসব্যস্য ভূরেঃ সহত্তমা সহসা বাজয়ন্তা।  প্ৰ চৰ্ষণিভঃ পৃতনা হবে প্র পৃথিব্যা রিরচাথে দিবশ্চ। প্র সিন্ধুভ্য প্ৰ গিরিভ্যো মহিত্বা প্রোগ্নী বিশ্বা ভুবনাহত্যন্যা।  মরুতো যস্য হি ক্ষয়ে পাখা দিবো বিমহসঃ। স সুগোপাতম জনঃ। যজ্ঞৰ্ব্বা যজ্ঞবাহসো বিপ্ৰস্য বা মতীনা। মরুতঃ শৃণুতা হব। শিয়সে কং ভানুভিঃ সং মিমিক্ষিরে তে রশ্মিভিত ঋকৃভিঃ সুখাদয়ঃ। তে বাণীমন্ত ইষ্ণিণো অভীরবো বিদ্রে প্রিয়স্য মারুতস্য ধামঃ। অব তে হেড় উদুত্তমম্। কয়া নশ্চিত্র আ ভুবদূতী সদাবৃধঃ সখা। কয়া শচিয়া বৃতা। কো অদ্য যুক্তে ধুরি গা ঋতস্য শিমীবততা ভামিনো দুর্ধণায়ুন। আসন্নিমূ হৃৎত্মসোময়োভূন্য এষাং ভূত্যাণধৎস জীবাৎ। অগ্নে নয়াহ দেবানাং শং নো ভরন্তু বাজেবাজে। অপস্বগ্নে সধিষ্টব সৌষধীনু রুধ্যমে। গর্ভে সঞ্জয়সে পুনঃ। বৃষা সোম দুমাং অসি বৃষা দেব বৃষব্রতঃ। বৃষা ধৰ্ম্মণি দধিষে। ইমং মে বরুণ তত্বা যামি ত্বং নো অগ্নে সত্ত্বং নো অগ্নে ॥১১। মর্মার্থ- (তত্ৰৈন্দ্ৰাগ্নস্য পুরোনাবাক্যামাহ)–দুলোকের দীপ্তি প্রদায়ক হে ইন্দ্র ও অগ্নিদেব! আপনারা সর্বতোভাবে হবিঃ-লক্ষণযুক্ত অন্নের ভাগ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন; সেই নিমিত্ত লোকে আপনাদের বীর্য-সামর্থ্য জ্ঞাত আছে। (যাজ্যা)–যে যজমান সমান আহ্বানযুক্ত, অর্থাৎ সমানভাবে আহ্বান পূর্বক ইন্দ্র ও অগ্নির পরিচর‍্যা করেন, সেই যজমান শত্রুকে বিনাশ করে থাকেন, অধিকন্তু সকলকে অন্নপ্রদান করে থাকেন, পুনরায় বহুল ধন লাভ করে থাকেন, আপন বলের দ্বারা অর্থাৎ স্বহস্তে পরবল অর্থাৎ শত্রুসৈন্যকে পরাভূত করে থাকেন, এবং নিজের জন্য অন্ন আকাঙ্ক্ষা করে থাকেন। (বিকল্পিত যাজ্যা)-হে ইন্দ্র ও অগ্নিদেব! সংগ্রামে ও হবিঃস্বীকারের নিমিত্ত আহ্বানে সকল মনুষ্যকে অতিক্রম পূর্বক আপনারা অবস্থান করছেন। সেই রকমে পৃথিবী ও দিবলোক (স্বর্গ বা আকাশ) এই উভয় লোককে অতিক্রম করে আপনারা অবস্থান করছেন। সেইভাবে সাগর, পর্বত, এমনকি সমগ্র ভুবনকে নিজস্ব মহিমায় অতিক্রম পূর্বক আপনারা অবস্থান করছেন। (অথ মারুত্যা আমিক্ষয়েঃ পুরোনুবাক্যামাহ)–হে মরুত্বর্গ! আপনারা দ্যুলোক হতে আগত হয়ে যে যজমানের গৃহ রক্ষা করছেন, সেই যজমান আত্যন্তিকভাবে (অতিশয়রূপে) রক্ষক হোন। (কিরকম মরুৎগণ? না, আপনারা মহৎ তেজঃবিশিষ্ট। (বিকল্পিত অন্য পুরোনুবাক্যা)-যজ্ঞের বাহক হে মরুৎগণ! যজ্ঞের নিমিত্ত আপনারা আমাদের আহ্বান শ্রবণ করুন, অথবা বিপ্রের বা যজমানের চিত্তবৃত্তিকে অনুগৃহীত করার নিমিত্ত আমাদের আহ্বান শ্রবণ করুন। (যাজ্যা)–পুরোবাতরূপী (অর্থাৎ অগ্রবর্তী বায়ুরূপী) যে মরুত্বর্গ প্রাণীবর্গের আশ্রয়ের নিমিত্ত (প্রাণিভিরাশ্রয়িতুং) সূর্যরশ্মির সাথে মেঘজাত বৃষ্টির দ্বারা সম্যক ভূমি-সেচনের ইচ্ছা করছেন, সেই মরুত্বর্গ যাজ্যা ও পুরোনুবাক্যারূপ ঋক্‌ মন্ত্রের দ্বারা স্তুত হয়ে সুখদেয় হবিঃ ভক্ষণ পূর্বক উৎসাহজনিত বহুবিধ শব্দ করতে করতে আপন গৃহের প্রতি গমন করেছেন। নিজেদের কর্তব্য-কর্ম নিষ্পন্ন হওয়ায় তারা বিঘ্নকারী অসুরগণ হতে ভয়রহিত হয়ে (অভীরবঃ) নিজেদের প্রিয় স্থান (অর্থাৎ মরুৎগণের সম্বন্ধি যে প্রিয় স্থান গগনমণ্ডল) প্রাপ্ত (লবন্ত) হয়েছেন।-(অথ বারুণীমামিক্ষামিত্যেতস্য যাজ্যানুবাক্যময়াঃ প্রতাঁকে দর্শয়তি)-অব তে হেড় উদুত্তমম্। এর মধ্যে অব তে হেড় এটি পুরোনুবাক্যা এবং উদুত্ত এটি যাজ্য। এই উভয়ই বৈশ্বানররা ন উত্য এই অনুষ্ঠাকে (১কা.৫পৃ. ১১অ.) ব্যাখ্যাত।–(অথ কায়মেকপালমিত্ত্যস্য পুরোনুবাক্যামাহ)–প্রজাপতি-সম্বন্ধিনী রক্ষণের দ্বারা বিচিত্র এই যজ্ঞ আমাদের প্রতি আগত হয়েছে। (কিরকম যজ্ঞ? না,) সদাবৃধঃ, অর্থাৎ সর্বদা বর্ধমান; সকা, অর্থাৎ সখিবৎ প্রিয়তম; এবং সেই যজ্ঞ প্রজাপতির অতিশয় শক্তির সাথে যুক্ত।–(যাজ্যা)–অদ্য এই যজ্ঞের প্রবৃত্তিবেলায় (অর্থাৎ যজ্ঞের অগ্রভাগে) প্রজাপতি আমাদের স্তুতিরূপ বাক্য আপন চিত্তে যোজিত করেছেন। (কিরকম স্তুর্তিরূপ বাক্য? না,) শিমীবতো, অর্থাৎ কর্মযোগ্যা; ভামিনো, অর্থাৎ স্বার্থের অবভাসকা বা প্রকাশিকা; দুৰ্ণায়ুন, অর্থাৎ দুঃখহরণশীলা; আসন্নিষুন, অর্থাৎ আমাদের মুখ হতে নিঃসৃতা; এবং ময়োভূন, অর্থাৎ সুখের ভারয়িত্ৰী বা প্রদানকারিণী। যে যজমান এই স্তুতিবাক্যরমূহের দ্বারা পুনঃ পুনঃ স্তুতি করেন, সেই যজমান চিরজীবী হন। (স্বিষ্টকৃৎ সম্পর্কিত যাজ্যা ও পুরোনুবাক্যা)-অগ্নে নয়াহ দেবানাম। এর মধ্যে অগ্নে নয় সুপথা এটি পুরোনুবাক্যা এবং আ দেবানামপি পন্থাম এটি যাজ্যা। এই উভয়ই উভা বামিন্দরাগ্নী এই অনুবাকে (১কা,১৫, ১৪অ) ব্যাখ্যাত।-(আমিক্ষানিষ্পদিনো বাজিনহবিষো যাজ্যানুবাক্যয়োঃ)–শং নো ভবন্তু বাজে বাজে। এর মধ্যে শং নো ভবন্তু বাজিনো হবেএটি পুরোনুবাক্যা এবং বাজেবাজেহবত বাজিন এটি যাজ্য। এই উভয়ই দেবস্যাহং সবিতুঃ এই অনুবাকে (১কা, ৭.৮অ) ব্যাখ্যাত।–(অবভৃথে প্রথমাজ্যভাগস্য পুরোনুবাক্যা)–হে অগ্নি! আপনার বল জলে বর্তমান, আপনি সেই বল ব্রীহি যব ইত্যাদি ওষধীতে জঠরাগ্নিরূপে স্বীকার করেছেন। পুনরায় আপনি অরণি গর্ভ হতে জাত হচ্ছেন।–(দ্বিতীয়াজ্যভাগস্য পুরোনুবাক্যা)-হে সোমদেব! আপনি কামসমূহের বর্ষণকারী ও দুলোকের দীপ্তিকারী। হে দেব! আপনি বৃষব্রত, অর্থাৎ বর্ষণকারী হওয়ার কারণে বর্ষণ আপনার ব্রত বা কৰ্ম্ম হয়েছে। অধিকন্তু, এই ব্রতধর্ম পালনের দ্বারা আপনি পুণ্য ধারণ করেছেন। হে সোম! আপনি বর্ষণের ধারয়িতা। (বারুণস্য যাজ্যানুবাক্যেয়োঃ)–ইমং মে বরুণ তত্ত্বা যামি। এর মধ্যে ইমং মে বরুণ ধী এটি পুরোনুবাক্যা এবং তত্ত্বা যামি ব্ৰহ্মণা বন্দমান এটি যাজ্যা। এই উভয়ই ইন্দ্রিং বো বিশ্বতস্পরীং নর এই অনুবাকে (২কা, ১০, ১১অ) ব্যাখ্যাত। (অগ্নিবারুণ স্বিষ্টকৃতঃসংযাজ্যয়োঃ)–ত্বং নো অগ্নে স ত্বং নো অগ্নে। এর মধ্যে ত্বং নো অগ্নে বরুণস্য এটি পুরোনুবাক্যা এবং স ত্বং নো অগ্নহবমো ভবোতি এটি যাজ্যা। এই উভয়ই অয়ুষ্ট আয়ুদা অগ্ন এই অনুবাকে (২কা.৫.১২অ.) ব্যাখ্যাত ॥১১।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *