০৬. রবীন্দ্রজীবনের ষষ্ঠ বৎসর

ষষ্ঠ অধ্যায়
১২৭৩ [1866-67] ১৭৮৮ শক ॥ রবীন্দ্রজীবনের ষষ্ঠ বৎসর

গত বৎসর অর্থাৎ ১২৭২ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে পুজোর ছুটির পর রবীন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ ও সত্যপ্রসাদ ক্যালকাটা ট্রেনিং অ্যাকাডেমি ত্যাগ করে গবর্মেন্ট পাঠশালার শিশুশ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন, এ কথা আমরা আগেই বলেছি। ভর্তির অল্পদিন পরেই সম্ভবত তাঁদের বার্ষিক পরীক্ষা দিতে হয়, কারণ গবর্মেন্ট জেলা স্কুল ও নর্মাল স্কুলগুলির ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে [বস্তুত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বহুদিন পর্যন্ত এন্ট্রান্স, এফ. এ., বি. এ. প্রভৃতি প্রধান প্রধান পরীক্ষা এই সময়েই সম্পন্ন হয়ে এসেছে এবং জানুয়ারি মাসের মধ্যেই গেজেটে উত্তীর্ণ ছাত্রদের নাম প্রকাশিত হয়েছে]। তাই মনে করা যেতে পারে, 1866-এর গোড়া থেকেই রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যেরা শিশুশ্রেণীর পরবর্তী ধাপে উন্নীত হয়েছেন। এই বছর তাঁদের জন্য বই কেনার একটিমাত্র হিসাবই দেখতে পাওয়া যায় ৮ই চৈত্র ১২৭২ [20 Mar 1866] তারিখে : ‘দ° সোমেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ সত্যপ্রসাদবাবু/গেজেট* ও পুস্তক খরিদে ৸৶ত’। ব্যয়ের পরিমাণ থেকেই বোঝা যায়, পাঠ্য-পুস্তকের তালিকা খুব দীর্ঘ ছিল না। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও যাতায়াতের জন্য ‘ইস্কুল গাড়ী’র বন্দোবস্ত ছিল, যার ‘৪টা ইস্পীরিং মেরামতি’র জন্য তিন টাকা খরচ দেখা যায় ইংরেজি বছরের প্রথম দিনেই। অবশ্য মাঝে মাঝে পালকি ভাড়ার উল্লেখ থেকে মনে হয়, কখনও কখনও যাতায়াতের জন্য পালকিও ব্যবহৃত হত।

নর্মাল স্কুলে এই বৎসরের পঠদ্দশার প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথরা সম্ভবত বাড়িতে পূর্বোক্ত গৃহ-পাঠশালার গুরুমশায়ের কাছেই পড়াশুনো করতেন। ১৮ শ্রাবণ [বৃহ 2 Aug 1866] তারিখের একটি হিসাবে দেখা যায় ’বং ব্রজেন্দ্রনাথ রায়/দং ছেলেবাবুদিগের/ পণ্ডিতকে খয়রাত বিঃ/এক ভাউচর ৪৲’। হিসাবটি অবশ্য বেতন-সংক্রান্ত নয় বলেই মনে হয়, সুতরাং নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে উক্ত গুরুমশায় বা পণ্ডিত এই সময় পর্যন্ত গৃহশিক্ষক হিসেবেই নিযুক্ত ছিলেন। [প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, হিসাবে উল্লিখিত ব্রজেন্দ্রনাথ রায় সারদা দেবীর ভ্রাতা, ঠাকুর-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়েই বাস করতেন এবং পারিবারিক হিসাবপত্র দেখাশোনা করতেন।] এর পর পুরোদস্তুর গৃহশিক্ষক হিসেবেই নিযুক্ত হন নীলকমল ঘোষাল। ১৫ অগ্র [বৃহ 29 Nov] তারিখের হিসাবে দেখি : ‘বঃ নিলকমল ঘোষাল (বালকদিগের পণ্ডিত)/ দং কার্তিক মাহার বেতন শোধ /বিঃ এক ভাউচার ১০৲’। এঁর উল্লেখ ক্যাশবহি-তে এই প্রথম পাওয়া যায়, সুতরাং মনে হয় ১ কার্তিক [বুধ 17 Oct] থেকে তিনি মাসিক দশ টাকা বেতনে রবীন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ ও সত্যপ্রসাদের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। এঁর কথা রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি-তে উল্লেখ করেছেন : ‘তখন নর্মাল স্কুলের একটি শিক্ষক, শ্রীযুক্ত নীলকমল ঘোষাল মহাশয় বাড়িতে আমাদের পড়াইতেন। তাঁহার শরীর ক্ষীণ শুষ্ক ও কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ ছিল। তাঁহাকে মানুষজন্মধারী একটি ছিপ্‌ছিপে বেতের মতো বোধ হইত। সকাল ছটা হইতে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাভার তাঁহার উপর ছিল।’ ছেলেবেলা-র বর্ণনাটি প্রায় একই রকম : ‘নীলকমল মাস্টারের ঘড়ি-ধরা সময় ছিল নিরেট। এক মিনিটের তফাত হবার জো ছিল না। খটখটে রোগা শরীর, কিন্তু স্বাস্থ্য তাঁর ছাত্রেরই মতো, এক দিনের জন্যেও মাথাধরার সুযোগ ঘটল না।’ অবশ্য সারা বছর স্কুলে বা গৃহশিক্ষকের কাছে তাঁরা কী পড়েছিলেন, তার হদিশ করা শক্ত। চৈত্র ১২৭২-এ গেজেটের সঙ্গে পুস্তক খরিদের উল্লেখ ছাড়া আর-কোনো বই কেনা হয়েছিল কিনা, ক্যাশবহি থেকে তা জানা যায় না। সুতরাং অনুমান করতে হয় দ্বিতীয়ভাগ বর্ণপরিচয় থেকে যুক্তাক্ষর শেখা, শ্রুতিলিখন, ধারাপাত, মানসাঙ্ক ইত্যাদির মধ্যেই সম্ভবত তাঁদের লেখাপড়া সীমাবদ্ধ ছিল। একটি কথা ঈষৎ অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে। নর্মাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখনকার দিনের একজন উল্লেখযোগ্য পাঠ্যপুস্তক-রচয়িতা ছিলেন। তাঁর রচিত একটি গ্রন্থের নাম ‘মানসাঙ্ক’*—সম্ভবত এই বৎসর কিংবা পরবর্তী বৎসরে বইটি রবীন্দ্রনাথদেরও অন্যতম পাঠ্যপুস্তক ছিল। দশটি পাঠে সমাপ্ত ৩২ পৃষ্ঠার এই বইটিতে মাঝে মাঝেই শিক্ষকদের প্রতি নির্দেশ-সহ বিষয়টি এমন সুচারুরূপে উপস্থাপিত হয়েছে, মনে হয় এটিকে আজকের দিনেও শিশুদের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্বাচিত করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, Jan 1867-এ দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথও নর্মাল স্কুলে ভর্তি হন, তখন তাঁর বয়স সাড়ে চার বছর মাত্র।

রবীন্দ্রনাথ তাঁদের তৎকালীন জীবনযাত্রাকে ‘ভৃত্যরাজকতন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছেন। এই ভৃত্যদের সম্পূর্ণ অধীন হয়ে তাঁর জীবন কিভাবে কাটত তার সম্পর্কে কিছু আলোচনা আমরা পূর্বেই করেছি—এদের শাসনকালের মধ্যে মহিমা বা আনন্দ কোনোটারই সাক্ষাৎ মেলে না। তিনি লিখেছেন : ‘এই-সকল রাজাদের পরিবর্তন বারংবার ঘটিয়াছে কিন্তু আমাদের ভাগ্যে সকল-তা’তেই নিষেধ ও প্রহারের ব্যবস্থার বৈলক্ষণ্য ঘটে নাই।… মার খাইলে আমরা কাঁদিতাম, প্রহারকর্তা সেটাকে শিষ্টোচিত বলিয়া গণ্য করিত না। বস্তুত, সেটা ভৃত্যরাজদের বিরুদ্ধে সিডিশন। আমার বেশ মনে আছে, সেই সিডিশন সম্পূর্ণ দমন করিবার জন্য জল রাখিবার বড়ো বড়ো জাল্লার মধ্যে আমাদের রোদনকে বিলুপ্ত করিয়া দেবার চেষ্টা করা হইত।’ এই বড়ো বড়ো জালাগুলি-ব্যবহৃত হত সারাবৎসরের পানীয় জল সঞ্চিত করে রাখার জন্য। তখনো কলকাতায় কলের জলের ব্যবস্থা চালু হয়নি, যদিও এই বৎসরেই Jan 1876 থেকে কলকাতার যোলো মাইল উত্তরে পলতায় গঙ্গার জল পরিশ্রুত করে পাইপের সাহায্যে কলকাতায় পাঠানোর কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল, অবশ্য কাজটি শেষ হয় তিন বছর পরে। ততদিন পর্যন্ত ‘বেহারা বাঁখে করে কলসি ভ’রে মাঘ-ফাল্গুনের গঙ্গার জল তুলে আনত। একতলার অন্ধকার ঘরে সারি সারি ভরা থাকত বড়ো বড়ো জালায় সারা বছরের খাবার জল। নীচের তলায় সেই-সব স্যাঁৎসেতে এঁধো কুটুরিতে গা ঢাকা দিয়ে যারা বাসা করেছিল কে না জানে তাদের মস্ত হাঁ, চোখ দুটো বুকে, কান দুটো কুলোর মত, পা দুটো উলটো দিকে। সেই ভুতুড়ে ছায়ার সামনে দিনে যখন বাড়িভিতরের বাগানে যেতুম, তোলপাড় করত বুকের ভিতরটা, পায়ে লাগাত তাড়া।’ এই বর্ণনা থেকেই বোঝা যায় ক্রন্দনরত শিশুদের অবাধ্য কান্নাকে সংযত করার পক্ষে ওই জালাগুলির উপযযাগিতা তর্কাতীত ছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, রবীন্দ্রনাথও সে-প্রশ্ন তুলেছেন, অভিজাত ঘরের সুকুমার-দর্শন এই বালকদের প্রতি [বালিকাদের ক্ষেত্রেও ব্যবহারের বিশেষ তারতম্য ছিল না, সরলা দেবী চৌধুরানীর জীবনের ঝরাপাতা-য় তার বিবরণ আছে] ভৃত্যদের এরূপ নির্মম ব্যবহারের কারণ কী। আসলে এই-সব ভৃত্যেরা সেবক-মাত্র ছিল না, একটি বা দুটি শিশুর দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে তাদের বহন করতে হত—অভিভাবকেরা সে-দিকে কিছুমাত্র নজর দিতেন না। সুতরাং মাইনে-করা চাকরেরা তাদের দায়িত্বকে সহজ করে নেওয়ার তাগিদে শিশুদের সমস্ত চাঞ্চল্যকে সম্পূর্ণ দমন করার সরল পথটিই বেছে নিত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বর্তমান বৎসরে নদের চাঁদ নামক একটি ভৃত্যকে সোমেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথকে দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। সত্যপ্রসাদের ভৃত্যের নাম ছিল মাধবদাস। এদের সকলেরই বেতন ছিল মাসিক সাড়ে তিন টাকা।

আমরা পূর্ব বৎসরের বিবরণে জোড়াসাঁকো নাট্যশালায় অভিনয়ের জন্য নতুন বাংলা নাটক সন্ধান করার কথা লিখেছি। এ-বিষয়ে যে প্রতিযোগিতা আহ্বান করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নিয়ে নাটক রচনার দায়িত্ব অর্পিত হয় প্রখ্যাত নাট্যকার রামনারায়ণ তর্করত্নের উপর। রামনারায়ণ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে অনেক দিন ধরেই ঘনিষ্ঠ ছিলেন, দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর কাছে সংস্কৃত শিক্ষা করেছিলেন। রামনারায়ণ যে নাটক লেখেন, তার নাম ‘বহু-বিবাহ প্রভৃতি কুপ্রথা বিষয়ক নব-নাটক’ [প্রকাশ : May 1866]। ‘১২৭৩ সনের ২৩ বৈশাখ এক প্রকাশ্য সভা আহূত হইল এবং কলিকাতার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের সমক্ষে নাটকখানি আদ্যোপান্ত পঠিত হইল। সভাপতি প্যারীচাঁদ মিত্র রৌপ্যপাত্রে রক্ষিত পাঁচশত টাকা তর্করত্ন মহাশয়কে প্রতিশ্রুত পুরস্কার বলিয়া প্রদান করিলেন। কেবল ইহাই নহে, গণেন্দ্রনাথ গ্রন্থখানির সহস্র খণ্ড মুদ্রণের সমস্ত ব্যয় এবং গ্রন্থ-স্বত্বও নাট্যকারকে প্রদান করিলেন।’

কমিটি অব্‌ ফাইভ্‌’, যাঁরা এই নাট্যাভিনয়ের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, গণেন্দ্রনাথ তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কিন্তু ব্যাপার গুরুতর হয়ে উঠছে দেখে যখন তিনি এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন সমস্ত আয়োজন নিখুঁত ও সর্বাঙ্গসুন্দর করতে তাঁর যত্ন ও অর্থব্যয়ের কার্পণ্য ছিল না। বৈঠকখানা বাড়ির দোতলায় স্টেজ বাঁধা হল, ভূমিকাগুলি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবর্গের মধ্যে বন্টিত হয়ে সাত-আট মাস ধরে দিনে অভিনয়ের রিহার্সাল ও রাত্রে কনসার্টের মহলা চলতে থাকে। এই আয়োজন শিশু রবীন্দ্রনাথের মনেও দাগ কেটেছিল, তিনি লিখেছেন : ‘মনে পড়ে, খুব যখন শিশু ছিলাম বারান্দার রেলিং ধরিয়া এক-একদিন সন্ধ্যার সময় চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিতাম। সম্মুখের বৈঠকখানাবাড়িতে আলো জ্বলিতেছে, লোক চলিতেছে, দ্বারে বড়ো বড়ো গাড়ি আসিয়া দাঁড়াইতেছে। কী হইতেছে ভালো বুঝিতাম না, কেবল অন্ধকারে দাঁড়াইয়া সেই আলোকমালার দিকে তাকাইয়া থাকিতাম। মাঝখানে ব্যবধান যদিও বেশি ছিল না, তবু সে আমার শিশুজগৎ হইতে বহুদূরের আলো।’

নব-নাটক প্রথম অভিনীত হয় ২২ পৌষ [শনি 5 Jan 1867] তারিখে। ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ভগিনীপতি যদুনাথ মুখোপাধ্যায়, সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় এবং নীলকমল মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের শ্যালক অমৃতলাল ও বিনোদলাল গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি এই নাটকের অভিনয়ে যোগদান করিয়াছিলেন। চিত্রপটগুলিও নিপুণ চিত্রকর দ্বারা অঙ্কিত হইয়াছিল। পঞ্চম দৃশ্যের চিত্রপটে নানাবিধ লতা পাতা এবং জীবন্ত জোনাকী পোকা জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল।’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই নাটকে নটী সেজেছিলেন এবং কনসার্টে হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলেন। নাটকখানি জোড়াসাঁকো রঙ্গমঞ্চে ন’বার অভিনীত হয়েছিল।

বড়োদের এই আমোদপ্রমোদে রবীন্দ্রনাথের মতো ছোটদের কোনো অংশ ছিল না। কিন্তু সাহিত্য ও ললিতকলা-চর্চ্চার এই আবহাওয়া তাঁর মানসিক গঠনের পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘দূর থেকে কখনো কখনো ঝরনার ফেনার মতো তার কিছু কিছু পড়ত ছিটকিয়ে আমাদের দিকে। এ বাড়ির বারান্দায় ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে থাকতুম, দেখতুম ও বাড়ির নাচঘর আলোয় আলোকময়। দেউড়ির সামনে বড়ো বড়ো জুড়িগাড়ি এসে জুটেছে। সদর দরজার কাছ থেকে দাদাদের কেউ কেউ অতিথিদের উপরে আগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। গোলাপপাশ থেকে গায়ে গোলাপজল ছিটিয়ে দিচ্ছেন, হতে-দিচ্ছেন, ছোটো একটি করে তোড়া। নাটকের থেকে কুলীন মেয়ের ফুঁপিয়ে কান্না কখনো কখনো কানে আসে, তার মর্ম বুঝতে পারি নে। বোঝবার ইচ্ছেটা হয় প্রবল। খবর পেতুম যিনি কাঁদতেন তিনি কুলীন বটে, কিন্তু তিনি আমার ভগ্নীপতি।’১০

এর পর ঠাকুরবাড়ির প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় স্থাপিত হল ‘হিন্দুমেলা’ [জাতীয় মেলা’ বা চৈত্র মেলা’ নামেও পরিচিত।] পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে, রাজনারায়ণ বসু-কৃত ‘অনুষ্ঠান পত্র’ ছিল এই মেলার প্রেরণাস্বরূপ। এ-বিষয়ে প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের সহপাঠী ‘দি ন্যাশনাল পেপার’-সম্পাদক নবগোপাল মিত্র। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে স্বাদেশিকতার আবহাওয়া যথেষ্ট পরিমাণেই বিদ্যমান ছিল। সুতরাং এই প্রস্তাবে তাঁদের সহযোগিতার অভাব হয়নি। দ্বিজেন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন। ‘নব-নাটক’ অভিনয়ের মতো এই মেলার আয়োজনেও গণেন্দ্রনাথ উৎসাহের সঙ্গে যোগদান করেন। তাঁকে সম্পাদক ও নবগোপাল মিত্রকে সহকারী সম্পাদক করে মেলার প্রথম অধিবেশন হল রাজা নরসিংহচন্দ্র রায় বাহাদুরের চিৎপুরের বাগানবাড়িতে ১২৭৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংক্রাক্তি অর্থাৎ ৩০ চৈত্র শুক্রবার 12 Apr 1867 তারিখে।১১ এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আয়োজিত এই প্রথম মেলা অবশ্য খুব ছোটো আকারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, মেলার অন্যতম উৎসাহী কর্মী নাট্যকার মনোমোহন বসুর ভাষায় : ‘জন্মদিনে কেবল অনুষ্ঠাতা ও কতিপয় বান্ধব মাত্র উৎসাহী ছিলেন। সে যেন নিজ বাটী ও পাড়াটী বলিয়া শুভকৰ্ম্ম সম্পন্ন করা।’১২ দেবেন্দ্রনাথ, দিগম্বর মিত্র, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, দুর্গাচরণ লাহা, উপেন্দ্রমোহন ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র, গিরিশচন্দ্র ঘোষ [‘বেঙ্গলী’ পত্রিকার সম্পাদক], প্যারীচরণ সরকার, কৈলাসচন্দ্র বসু, জয়গোপাল সেন, প্রসাদদাস মল্লিক, কালীকৃষ্ণ ঠাকুর প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ২৭ চৈত্র [মঙ্গল 9 Apr] তারিখে ক্যাশবহি-র হিসাবে দেখা যায় : ‘দান খাতে খরচ—২০৲/ব° শ্ৰীযুত নব গোপাল মিত্র/দ° চৈত্র মেলার দান ২০’। পরবর্তী বৎসরসমূহে এই দানের পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঠাকুরপরিবারের উপর তো বটেই, সমগ্র বঙ্গদেশ ও ভারতের উপরও হিন্দুমেলা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। দ্বারকানাথ ঠাকুরের ‘জমিদার সভা’, দেবেন্দ্রনাথ-প্রমুখের ‘ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ বা পরবর্তী কালে আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি স্থাপিত ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ রাজনীতিকেই একান্তভাবে আশ্রয় করেছিল, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগসূত্র ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু ‘হিন্দুমেলা’ বা ‘জাতীয় মেলা’ গঠনমূলক উদ্দেশ্য নিয়েই প্রবর্তিত হয়েছিল। এর ঘোষিত উদ্দেশ্যই ছিল ‘স্বজাতীয়দিগের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন করা ও স্বদেশীয় ব্যক্তিগণ দ্বারা স্বদেশের উন্নতি করা’। এই উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য ‘স্বদেশীয় লোকগণ মধ্যে পরস্পরের বিদ্বেষভাব উন্মূলন করিয়া উপরোক্ত সাধারণ কার্যে নিয়োগ’, ‘প্রত্যেক বৎসরে আমাদিগের হিন্দু সমাজের কত দূর উন্নতি হইল, এই বিষয়ের তত্ত্বাবধারণ’, ‘অস্মদ্দেশীয় যে সকল ব্যক্তি স্বজাতীয় বিদ্যানুশীলনের উন্নতি সাধনে ব্রতী হইয়াছেন, তাঁহাদিগের উৎসাহ বর্দ্ধন’, ‘প্রতি মেলায় ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীয় লোকের পরিশ্রম ও শিল্পজাত দ্রব্য’ সংগ্রহ ও প্রদর্শন, ‘স্বদেশীয় সঙ্গীত-নিপুণ ব্যক্তিগণের উৎসাহ বর্দ্ধন ও ‘যাঁহারা মল্ল-বিদ্যায় সুশিক্ষিত হইয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছেন, প্রতি মেলায় তাঁহাদিগকে একত্রিত করিয়া উপযুক্ত পারিতোষিক বা সম্মান প্রদান…এবং স্বদেশীয় লোক মধ্যে ব্যায়াম শিক্ষা’ প্রচলন—এই ছ-টি সাধনোপায় নির্দিষ্ট হয়েছিল এবং দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ছ-টি মণ্ডলীতে বিভক্ত করে তাঁদের উপর এক একটি বিভাগের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল। একথা স্বীকার করতেই হবে, যে বিরাট আদর্শ নিয়ে এই মেলার সূত্রপাত করা হয়েছিল, উপযুক্ত উৎসাহ ও সহায়তার অভাবে তার অনেকটাই সার্থক হতে পারেনি—শেষ পর্যন্ত নবগোপাল মিত্রের একক প্রযত্নের উপরই মেলার অনুষ্ঠান নির্ভর করত—কিন্তু স্বনির্ভরতার সাধনা ব্যতীত জাতির উন্নতি ঘটতে পারে না, এই সত্যকে হিন্দুমেলা বা জাতীয় মেলা তার স্বল্পশক্তি দিয়েও প্রথম প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিল, এইখানেই তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব। লক্ষণীয়, মেলার কাজকর্ম সমস্ত বাংলা ভাষায় পরিচালিত হত। কেশবচন্দ্র ধর্মপ্রচারে ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি রাজনৈতিক আন্দোলনে স্বদেশবাসীর কাছেও ইংরেজিতে বক্তৃতা করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে দূরত্ব রচনা করেছিলেন, মেলার অনুষ্ঠাতৃগণ সে দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এই মেলা যখন শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ তখন নিতান্ত শিশু এবং তাঁর কৈশোর অতিক্রান্ত হবার পূর্বেই এর অবলুপ্তি ঘটেছিল, সুতরাং যৌবনের পূর্ণ শক্তি নিয়ে জাতীয় মেলার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজ করার সুযোগ তাঁর ঘটেনি। কিন্তু মেলার আয়োজন-অনুষ্ঠান আলাপ-আলোচনার আবহাওয়ায় বড়ো হওয়ার জন্য এবং পরে কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ফলে তাঁর সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তায় এবং প্রথমে উত্তরবঙ্গের জমিদারিতে ও পরে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার ব্যবহারিক কাজকর্মে হিন্দুমেলা বা জাতীয় মেলার আদর্শের স্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রজীবনী রচনা করতে গিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা সেইখানেই।

প্রাসঙ্গিক তথ্য :১

এই প্রসঙ্গে আমরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার বিবরণ দেব।

দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয়া কন্যা শরৎকুমারী দেবীর সঙ্গে যদুনাথ মুখোপাধ্যায়ের* বিবাহ হয় সম্ভবত বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ মাসে। সুকুমারী, স্বর্ণকুমারী বা বর্ণকুমারীর বিবাহের বিস্তৃত বিবরণ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-য় প্রকাশিত হয়েছিল, আশ্চর্যের বিষয় শরৎকুমারীর বিবাহের কোনো সংবাদই উক্ত পত্রিকায় উল্লিখিত হয়নি। সুতরাং এ ক্ষেত্রে অনুমানের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অনুমানের ভিত্তি উক্ত পত্রিকায় আষাঢ় সংখ্যায় [পৃ ৭২] প্রকাশিত আদি ব্রাহ্মসমাজের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের আয়ব্যয়ের বিবরণে ‘শুভকর্ম্মের দান।/ শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ৩০’ টাকার উল্লেখ ও ক্যাশবহি-র ১৬ জ্যৈষ্ঠ [মঙ্গল 29 May 1866] তারিখের একটি হিসাব : ‘শ্ৰীমতী সারদাশুন্দরি দেবি খাতে খরচ—৯১৲/বঃ ব্রজেন্দ্রনাথ রায়/দঃ সরতসুন্দরির শুভবিবাহের গহনা খরিদ’। শরৎকুমারীর বয়স তখন আনুমানিক বারো বা তেরো বৎসর। গণেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা ভগিনী কুমুদিনীর স্বামী নীলকমল মুখোপাধ্যায় ছিলেন যদুনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, সেই সূত্রে ছেলেবেলা থেকেই দেবেন্দ্রনাথের বাড়িতে তাঁর অবাধ যাতায়াত ও মেলামেশা ছিল। এই কারণে বিয়ের পরও শরৎকুমারী স্বামীকে ‘যদু, ও যদু’ বলে ডেকে মায়ের কাছে বকুনি খেয়েছিলেন, ইন্দিরা দেবী তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনকথা’ [দ্র এক্ষণ, শারদীয়া ১৩৯৯। ২৩]-য় উল্লেখ করেছেন। যদুনাথ তখনো স্কুলের ছাত্র, ৩ শ্রাবণের হিসাবে দেখা যায় ‘দং বাবু যদুনাথ মুখোপাধ্যায়ের/বেঙ্গল এ্যাকাডেমির ফেবরুয়ারি মার্চ দুই মাসের বেতন/বিঃ দুই বিল ৭৲ হি—১৪৲’। তিনি সম্ভবত বীরেন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন। স্কুলের পড়াও তিনি শেষ করেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে, কেননা এই খরচের আর কোনো পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে না। এর পরিবর্তে তাঁকে একবার জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে দেখা যায় ৩ মাঘ-এর [15 Jan 1867] হিসাবে : ‘দ° জ্যোতী বাবু ও যদুবাবুর ইনড্রসট্রিএল আর্ট ইস্কুলে নিযুক্ত হইবার জানয়ারি মাহার ফি ২ বিলের কাত ২৲ হিঃ ৪৲’। অবনীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, গুণেন্দ্রনাথও এই সময়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন।১৩ কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ Mar 1867-এর শেষে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বোম্বাই যাত্রা করেন, সুতরাং এই শিক্ষাও যদুনাথ বেশিদিন লাভ করেছিলেন বলে মনে হয় না। দেবেন্দ্রনাথের এই জামাতাটি সম্পর্কে খুব অনুকূল মনোভাব ছিল না। ২৭ মাঘ ১২৭৪ [9 Feb 1868] সাহেবগঞ্জ থেকে গণেন্দ্রনাথকে একটি পত্রে তিনি লিখেছেন : ‘যদুনাথের এইক্ষণে বাণিজ্য ব্যবসায় অবলম্বন করিবার কোন সদুপায় দেখিতেছি না অতএব তিনি যেভাবে ট্রাস্টীর কৰ্ম্ম করিতেছেন [?] সেইভাবেই করিতে থাকুন এ বিষয়ে এইক্ষণে আর কোন কথা উত্থাপন করিবার আবশ্যক নাই।’১৪ আবার ৫ ভাদ্র ১২৭৫ [20 Aug 1868] হিমালয়ের Murree Hills থেকে তাঁকে লিখেছেন : ‘আমার নিকটে বাটীর এই একটি মন্দ সংবাদ আসিয়াছে যে যদু কতকগুলাণ ছোঁড়া জুটাইয়া আমাদের বাটীতে মাতলামি করে। তবে তুমি তাহাকে বিষয় কৰ্ম্মের যে ভার দিয়া বিরাহিমপুরে গিয়াছিলে, তাহা সে কি প্রকারে নির্ব্বাহ করিয়াছে, বুঝিতে পারিতেছি না।’ [অপ্রকাশিত পত্র] সন্তানদের, বিশেষ করে কন্যাদের, শিক্ষার ব্যাপারেও তিনি উদাসীন ছিলেন। সরলা দেবী লিখেছেন : ‘সেজ মাসিমার ছেলেমেয়েরা পড়াশুনার বেশি ধার ধারতেন না। সেকালের ‘চারুপাঠে’র উপরে আর উঠেছিলেন কি না সন্দেহ। …’ অবশ্য সুরসিক ব্যক্তি হিসেবে যদুনাথের খ্যাতি ছিল, নব-নাটক ও অলীকবাবু নাটকে তাঁর অভিনয়ের কথাও জানা যায়।

হেমেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠা কন্যা প্রতিভা দেবীর জন্মসাল জীবনস্মৃতি-তে প্রদত্ত বংশলতিকায় 1865 বলে উল্লিখিত হয়েছে : ২৩ পৌষ ১৩২৮ [শনি 7 Jan 1922] তাঁর মৃত্যুর পর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র মাঘ সংখ্যায় লিখিত হয় মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ৫৭ বৎসর হয়েছিল, সে-হিসেবেও তাঁর জন্মসাল 1865 [১২৭১]-ই হয়। কিন্তু আমাদের ধারণা, প্রতিভা দেবীর জন্ম হয় আষাঢ় ১২৭৩ [Jul 1866]-এর শেষ দিকে। ক্যাশবহি-তে ২৪ আষাঢ় [শনি 7 Jul-এর তারিখের একটি হিসাব : ‘আঁতুড় খরচ/কলেজের দাইকে দেওয়া প্রভৃতি ২৩ ’, এবং ১ শ্রাবণ [সোম 16 Jul] তারিখে লেখা হয়েছে ‘সেজো বধূ ঠাকুরাণীর আঁতুড়ে খরচ ৭৲’—এই দুটি হিসাব মিলিয়ে আমরা উক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। হেমেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় সন্তান হিতেন্দ্রনাথের জন্মতারিখ আমরা ১৫ অগ্র ১২৭৪ [শনি 30 Nov 1867] বলে নিশ্চিতভাবে জানি। সুতরাং উপরোক্ত হিসাবটি প্রতিভা দেবীর জন্মকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছিল, এমন সম্ভাবনার কথাই মেনে নিতে হয়।

৪ ভাদ্র [রবি 19 Aug] দেবেন্দ্রনাথের বৈবাহিক দুই পুত্রবধূ নীপময়ী ও প্রফুল্লময়ী দেবীর পিতা হরদেব চট্টোপাধ্যায় অর্শ রোগে ৬৫ বৎসর বয়সে সাঁতরাগাছিতে পরলোকগমন করেন। দেবেন্দ্রনাথের তিনি অন্যতম ভক্তবন্ধু ছিলেন। প্রফুল্লময়ী দেবী লিখেছেন : ‘পিতার সহিত তাঁহার এতদূর সৌহৃদ্য জন্মাইয়াছিল যে, দুইজনের মধ্যে স্থির ছিল যে, যাঁহার আগে মৃত্যু হইবে, তাঁহার বিধিমত সৎকার যিনি জীবিত থাকিবেন তিনিই করিবেন। পিতার মৃত্যু পূর্বেই হওয়াতে, আমার শ্বশুর স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া চন্দনকাষ্ঠে তাঁহার চিতাশয্যা প্রস্তুত করিয়া সুচারুরূপে সৎকারকার্য সম্পন্ন করেন।১৫ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র বিবরণ [আশ্বিন। ১৩৮-৪২] থেকে জানা যায়, দেবেন্দ্রনাথ এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। ৯ শ্রাবণ থেকে ১৭ কার্তিক পর্যন্ত বোলপুর থেকে গণেন্দ্রনাথ ও রাজনারায়ণ বসুকে লেখা দেবেন্দ্রনাথের অনেকগুলি চিঠি দেখে মনে হয়, এই সময়ে তিনি দীর্ঘকাল শান্তিনিকেতনে বাস করছিলেন, ভাদ্রের প্রথমে তিনি কয়েকদিনের জন্য কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি তাঁকে উত্তরবঙ্গে জমিদারি পরিদর্শন করতে দেখা যায়, সেখান থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন সম্ভবত ফাল্গুনের শেষে বা চৈত্রের গোড়ায়। এর মধ্যে ৯ পৌষ তিনি রাজশাহির বোয়ালিয়ায় একটি ব্রাহ্মসমাজ-মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

সত্যেন্দ্রনাথ 28 Oct [রবি ১২ কার্তিক] থেকে অসুস্থতার জন্য ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসেন এবং 10 Nov থেকে 9 Dec এই একমাস হীরালাল শীলের কাশীপুরের বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে সস্ত্রীক সেখানে বাস করেন। ইতিমধ্যে তাঁর বন্ধু মনোমোহন ঘোষ ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ফিরে আসেন, তিনিও কাশীপুরে সত্যেন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে ওঠেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নব-নাটক-এর রিহার্সালের ফাঁকে সেখানে গিয়ে মনোমোহনের কাছে ফরাসি ভাষা শিক্ষা করতে শুরু করেন। এর পর সত্যেন্দ্রনাথ যখন ফাল্গুন মাসে [Mar 1867] বোম্বাই যাত্রা করেন, এফ. এ.-পরীক্ষার্থী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পরীক্ষা না দিয়ে তাঁর সঙ্গে বোম্বাই হয়ে আমেদাবাদে চলে যান।

এই সময়ের মধ্যেই ১৩ পৌষ [বৃহ 27 Dec 1866] গবর্নর জেনারেল লর্ড জন লরেন্সের পার্টিতে জ্ঞানদানন্দিনী যোগদান করেন। সোমপ্রকাশ এ-সম্পর্কে লেখে [৯। ৭, ১৭ পৌষ, পৃ ১০৮] : ‘গত বৃহস্পতিবার গবর্ণর জেনেরলের বাটীতে রাত্রিকালে যে মজলিস হয়, তাহাতে বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী আমাদিগের জাতীয় বস্ত্র পরিধান করিয়া উপস্থিত ছিলেন। ইতিপূর্ব্বে কোন হিন্দু রমণী রাজ প্রতিনিধির বাটীতে গমন করেন নাই।’ সত্যেন্দ্রনাথ নিজে ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে : ‘আমি প্রথমবার বোম্বাই থেকে বাড়ী এসে আমার স্ত্রীকে গভর্ণমেন্ট হাউসে নিয়ে গিয়েছিলুম। সে কি মহা ব্যাপার। শত শত ইংরাজ-মহিলার মাঝখানে আমার স্ত্রী—সেখানে একটিমাত্র বঙ্গবালা—তখন প্রসন্নকুমার ঠাকুর জীবিত ছিলেন। তিনি ত ঘরের বৌকে প্রকাশ্যস্থলে দেখে রাগে লজ্জায় সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলেন।’১৬ জ্ঞানদানন্দিনী স্বয়ং ঘটনাটি সম্পর্কে একটু অন্য কথা বলেছেন : ‘একবার এমনি যখন কলকাতায় এসেছি, উনি একবার লাটসাহেবের বাড়ীর দরবারে পাঠিয়ে দিলেন। নিজে অসুস্থ বলে যেতে পারেননি, আমাকে এক মেমের সঙ্গে পাঠালেন—বোধ হয় Lady Phaer। বড় ঠাকুরঝি আমাকে মাথায় সিঁথি প্রভৃতি দিয়ে খুব সাজিয়ে দিলেন, উনি শুয়েছিলেন, তাঁকে আবার নিয়ে গিয়ে দেখালেন। সেখানে ঠাকুরগুষ্টির যাঁরা ছিলেন তাঁরা ঠাকুরবাড়ীর একজন বউ গিয়েছে শুনে লজ্জায় চলে গেলেন—পরে শুনলুম। ওঁকে ছেলেবেলায় একজন পড়িয়েছিলেন, তিনি আমার পরিচয় পেয়ে কাছে এসে কথা বল্লেন। বাড়ীর সকলে বল্লেন যে উনি নিজে গেলে ভাল হত, অন্য লোকের সঙ্গে পাঠানো ভাল হয়নি। শুনেছি আমাকে অনেকে মনে করেছিলেন ভূপালের বেগম, কারণ তিনিই একমাত্র তখন বেরতেন।’১৭ ঠাকুরবাড়ির মানসিক পরিবর্তনটুকুও এখানে লক্ষণীয়। প্রথমবার বোম্বাই থেকে ফিরে যখন তিনি সকলের সামনে গাড়ি থেকে নেমেছিলেন, তখন বাড়িতে এক শোকাবহ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, আর এখন যেটুকু গুঞ্জন উঠেছিল তার কারণ স্বামীর সঙ্গে না গিয়ে অন্য লোকের সঙ্গে লাটসাহেবের দরবারে গিয়েছিলেন!

প্রাসঙ্গিক তথ্য : ২

১১ মাঘ বুধবার 23 Jan 1867 আদি ব্রাহ্মসমাজের [তখনো পর্যন্ত ‘কলিকাতা ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত] সপ্তত্রিংশ সাংবৎসরিক অনুষ্ঠিত হয়। পূর্বাহ্ন ৮ ঘটিকায় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে প্রাতঃকালীন উপাসনায় দ্বিজেন্দ্রনাথ, বেচারাম চট্টোপাধ্যায় ও আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ বেদীর আসন গ্রহণ করেন ও সন্ধ্যা ৭টায় দেবেন্দ্র-ভবনে সায়ংকালীন উপাসনায় বেদীতে বসেন বেচারাম চট্টোপাধ্যায়, আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য। ৪টি ব্রহ্মসংগীত গাওয়ার পর সভা ভঙ্গ হয়। গানগুলি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-য় উদ্ধৃত হয়নি, কিন্তু এগুলি প্রতি বৎসর স্বতন্ত্রভাবে মুদ্রিত হয়ে সভাস্থলে বিতরিত হত : ‘১১ মাঘের গানের কাগজ’-এর মুদ্রণ-ব্যয়ের হিসাব থেকে তা অনুমান করা যায়।

১৭৮৮ শকে ব্রাহ্মসমাজের কার্যনির্বাহের জন্য নিম্নলিখিত কর্মচারীগণ নিযুক্ত হয়েছিলেন : অধ্যক্ষ—কাশীশ্বর মিত্র, হেমেন্দ্রনাথ ও অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, সম্পাদক—দ্বিজেন্দ্রনাথ ও সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, সহকারী সম্পাদক—আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র সম্পাদক—অবোধ্যানাথ পাকড়াশী।১৮

এই বৎসর আদি ব্রাহ্মসমাজ উড়িষ্যা ও মেদিনীপুরে দুর্ভিক্ষপীড়িত জনসাধারণকে সাহায্যের জন্য একটি বিশেষ তহবিল সংগ্রহ করেন। এই কাজ পরের বৎসরেও অব্যাহত ছিল।

ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে ইতিপূর্বেই যে বিভেদ দেখা দিয়েছিল, তা এই বৎসরেই সম্পূর্ণতা লাভ করল যখন ২৫ কার্তিক রবিবার 11 Nov 1866 তারিখে ৩০০ নং চিৎপুর রোডের ক্যালকাটা কলেজ ভবন প্রাঙ্গণে সভা আহ্বান করে কেশবচন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। উল্লেখ, নবগোপাল মিত্র এই সভায় উপস্থিত হয়ে নানা প্রস্তাব উত্থাপন করে সভার কাজে বাধা দেবার চেষ্টা করেন। এই সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এবং এই সভাতেও তা প্রতিফলিত হয়, সেটি এই যে, পূর্বে দেবেন্দ্রনাথ ‘ব্রাহ্মধর্ম’ গ্রন্থ সংকলন করার সময় যেমন কেবলমাত্র হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থসমূহের উপরই নির্ভর করেছিলেন ভারতবর্ষীয় সমাজ সে ক্ষেত্রে বাইবেল, কোরান, আবেস্তা প্রভৃতি থেকেও ‘ব্রাহ্মধৰ্ম্মপ্রতিপাদক বচন’ সংগ্রহ করে একটি সার্বজনীন ভিত্তি রচনার চেষ্টা করে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য : ৩

নব-নাটক-এর অভিনয় প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘আমি ইংলণ্ড থেকে ফিরে আসবার দুই বৎসর পরে ছুটী নিয়ে কলকাতায় এসে দেখি তাঁদের [গণেন্দ্রনাথের] বাড়ীতে ‘নবনাটক’ অভিনয়ের প্রভূত আয়োজন হয়েছে—আমি সেই সমারোহের মধ্যে এসে পড়ি। রঙ্গমঞ্চে যননিকার শিরোবেষ্টনী বিক্রমসভার নবরত্নের নামে অঙ্কিত—

ধন্বন্তরি ক্ষপণকামরসিংহ শঙ্কু-/র্বেতালভট্ট ঘটকৰ্পর কালিদাসাঃ

খ্যাতো বরাহমিহিরো নৃপতেঃ সভায়াং/রত্নানি বৈ বররুচি র্নব বিক্রমস্য।

নবনাটকখানি রামনারায়ণ তর্করত্ন প্রণীত, বহুবিবাহপ্রথায় পারিবারিক দুঃখজ্বালা অশান্তি প্রকটন সূত্রে লোকশিক্ষা দেওয়া ঐ নাটকের উদ্দেশ্য। আমাদের বাড়ীর ছেলেরা আত্মীয় স্বজন বন্ধু সেই নাটকের পাত্রপাত্রী সেজেছিলেন। মেয়ের পার্ট অবিশ্যি পুরুষের নিতে হয়েছিল। আমার পিতা এই অভিনয়ের সংবাদ পেয়ে কালীগ্রাম হ’তে মেজদাদাকে [গণেন্দ্রনাথ] লিখছেন; (৪ মাঘ ১৭৮৮ শক— 16th January 1867)

“তোমাদের নাট্যশালার দ্বার উদঘাটিত হইয়াছে—সমবেত বাদ্য দ্বারা অনেকের হৃদয় নৃত্য করিয়াছে—কবিত্ব রসের আস্বাদনে অনেকে পরিতৃপ্তি লাভ করিয়াছে। নির্দোষ আমোদ আমাদের দেশের যে একটি অভাব, তাহা এই প্রকারে ক্রমে ক্রমে দূরীভূত হইবে। পূর্ব্বে আমার সহৃদয় মধ্যমভায়ার উপরে ইহার জন্য আমার অনুরোধ ছিল, তুমি তাহা সম্পন্ন করিলে। কিন্তু আমি স্নেহপূৰ্ব্বক তোমাকে সাবধান করিতেছি যে, এ প্রকার আমোদ যেন দোষে পরিণত না হয়।”

‘আমাদের বন্ধু অক্ষয় মজুমদার নাট্যের প্রধান নায়ক গবেশবাবু সেজেছিলেন—নাট্য অভিনয়ে সেই তাঁর প্রথম উদ্যম; পরে তিনি ঐ ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর আরো উৎকর্ষ লাভ করেছিলেন—তাঁকে ছেড়ে আমাদের কোন অভিনয় সিদ্ধ হ’ত না। হাস্যরসের অভিনয়ে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন।’১৯

অন্যান্য অভিনেতাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ : ‘আমি হইলাম নটী, আমার জ্যেঠতুত ভগিনীপতি ৺ নীলকমল মুখোপাধ্যায় (পরে গ্ৰেহামের বাড়ীর মুচ্ছুদি) সাজিলেন নট, আমার নিজের আর এক ভগিনীপতি ৺ যদুনাথ মুখোপাধ্যায় “চিত্ততোষ”, আর এক ভগিনীপতি ৺সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় হইলেন গবেশবাবুর বড় স্ত্রী। …শ্রীযুক্ত মতিলাল চক্রবর্ত্তী “কৌতুকে”র পাঠ লইয়াছিলেন। … আমার এক শ্যালক অমৃতলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছোটগিন্নির ভূমিকায়… ৺ বিনোদলাল গঙ্গোপাধ্যায় (অমৃতলালের জ্যেষ্ঠ) সুবোধের ভূমিকায়।’২০ অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন, গবেশবাবুর আর-এক স্ত্রী ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মণিলাল মুখোপাধ্যায় [নীলকমলের ছোটো ভাই], কিন্তু তিনি ভ্রমবশত বিনোদলালকে অপর স্ত্রীর ভূমিকাভিনেতা বলে উল্লেখ করেছেন।২১ আর-একটি ভুল আছে ছেলেবেলা-র পাদটীকায় [দ্র ২৬। ৫৯৯], সেখানে ক্রন্দনরতা কুলীন-কন্যার প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, ‘যদুনাথ মুখোপাধ্যায়, শরৎকুমারী দেবীর স্বামী’, কিন্তু এই ভূমিকায় ছিলেন সৌদামিনী দেবীর স্বামী সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়—অবনীন্দ্রনাথও লিখেছেন, ‘বড়ো স্ত্রী সেজেছিলেন ও বাড়ির সারদা পিসেমশায়।’২১ ছোটোগিন্নি চন্দ্রলেখার ভূমিকায় অমৃতলালের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ একটি কৌতুক-কবিতা রচনা করেছিলেন :

মনে পড়ে সেইদিন, নাটকের “হিরোইন্‌”

সম্মুখে আয়না ধরি,

গবেশ করিতে বন্দী, পাতিছেন নানা ফন্দী

পান খেয়ে ঠোঁট লাল করি।

মরি, মরি, মরি ॥২২

অবনীন্দ্রনাথ ঘরোয়া-তে [পৃ ৯৩-৯৭] এই নাট্যাভিনয়-সম্পর্কে বিস্তৃত সরস বর্ণনা করেছেন, অবশ্য সে-সবই শোনা কথা, তাঁর তখনো জন্মই হয়নি।

কথিত আছে, নব-নাটক জোড়াসাঁকো রঙ্গমঞ্চে ন-বার অভিনীত হয়েছিল। আমরা চারটি অভিনয়ের সংবাদ সংগ্রহ করতে পেরেছি : ২২ পৌষ [5 Jan], ৭ মাঘ [শনি 19 Jan], ১৪ মাঘ [শনি 26 Jan] ও সম্ভবত ২১ মাঘ [শনি 2 Feb]—শেষোক্ত অভিনয়টি হয়েছিল ব্যারিস্টার জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাড়িতে। ন্যাশনাল পেপার [Vol. II No. 6, Feb 6] এই অভিনয়-সম্পর্কে লেখে : ‘… The latest one was that held at the house of Baboo Gonendra Mohun Tagore on the occasion of a performance of the Nobo Natuck. Many respectable European and Native gentlemen were present. Baboo Ganendro Mohun Tagore, Barrister at Law, entertained the whole party with lively conversations.’ ১৪ মাঘের অভিনয়-প্রসঙ্গে সোমপ্রকাশ পত্রিকা-য় [৯। ১১, ১৬ মাঘ, পৃ ১৬৫-৬৭] বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশিত হয় : ‘নবনাটক ও তাহার অভিনয়।/ শনিবার আমরা জোড়াসাঁকোর নাট্যশালায় নবনাটকের অভিনয় দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। এখানে নাটক অভিনয়ের যে প্রণালী দর্শন করিলাম, তাহা যদি সৰ্ব্বত্র প্রচলিত হয়, আমাদিগের বিশুদ্ধ আমোদ ভোগের একটি উৎকৃষ্ট উপায় হইয়া উঠে। নাট্য শালা প্রকৃত রীতিতে নির্ম্মিত ও দ্রষ্টব্যর্থগুলি সুন্দর বিশেষতঃ সূর্য্যাস্ত ও সন্ধ্যার সময় অতিমনোহর হইয়াছিল। অধিকতর আহ্লাদের বিষয় এ সমুদায়গুলি এতদ্দেশীয় শিল্পজাত। দর্শকদের উপবেশন প্রণালী অদ্যাপিও উৎকৃষ্ট হয় নাই। এজন্য গালারি করা আবশ্যক। সংকীর্ণ স্থানে অধিকসংখ্য চৌকি সন্নিবেশিত হয়। এককালে দ্বার উদ্‌ঘাটিত হওয়াতে যাবতীয় দর্শক প্রবেশ করিয়া সকলেই সমুখের আসন গ্রহণ করিবার চেষ্টা করেন, তাহাতে গোলযোগ, গাত্রঘর্ষণ ও আসনভঙ্গ ইহার ফল হইয়া উঠে।

[এরপর নাটকের কাহিনী-বর্ণনা ও তার সমালোচনা করা হয়েছে।]

‘অভিনয়ের বিষয় বক্তব্য এই, অভিনেতৃগণ প্রায় সকলেই স্বকৰ্ত্তব্য অভিনয়ক্রিয়া সুন্দররূপে সম্পন্ন করিয়াছেন। গবেশ ও চিত্ততোষের ত কথাই নাই, কৌতুক ও রসমরীর অংশ উত্তম হইয়াছে এবং নাগর ও গ্রাম্যের চরিত্রও নৈসর্গিক হইয়াছে। রঙ্গভূমির নাগর যদি যাবতীয় যুবক কৃতবিদ্যের আদর্শ হন, তাহা হইলে দেশের পরম মঙ্গল হয়। এ ব্যক্তির অভিনয় দর্শনে সবিশেষ পরিতোষ লাভ হইয়াছে। সুধীর পণ্ডিতের চরিত্র অতি উৎকৃষ্ট হইয়াছে। সাবিত্রী দাসীর অংশটী জঘন্য হইয়াছে। সকলেরই বেশ প্রায় উত্তম হইয়াছিল, কিন্তু সাবিত্রী না স্ত্রীলোক না হিজড়ে রূপ ধারণ করে। এ ব্যক্তির কথার ভাবও তুষ্টিকর হয় নাই। সুবোধের শেষ অংশটি বিরক্তি উৎপাদন করিয়াছে। অর্দ্ধ ঘটিকা পৰ্য্যন্ত কেবল ক্রন্দন কোন্‌ ব্যক্তি শ্রবণ করিতে পারেন? যে যুবক অভিমানে অনায়াসে দেশান্তরে গমন করিতে পারেন, তাঁহার স্ত্রীলোকের ন্যায় ক্রন্দন সঙ্গত নয়।

’উপসংহারকালে বক্তব্য এই, কোন কোন অংশে কিছু কিছু ত্রুটি থাকুক সাকল্যে বিবেচনা করিলে গ্রন্থ ও অভিনয় উভয়ই উত্তম হইয়াছে।’

সম্ভবত ফাল্গুন মাসে অন্যতম উদ্যোক্তা ও অভিনেতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বোম্বাই যাত্রা করায় নব-নাটক অভিনয় বন্ধ হয়ে যায় ও জোড়াসাঁকো নাট্যশালাও ‘বিগতজীবন’ হয়।

আগেই বলা হয়েছে, জোড়াসাঁকো নাট্যশালা থেকে তিনটি বিষয়ে নাটক রচনার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। বিপিনমোহন সেনগুপ্ত-রচিত হিন্দু মহিলা নাটক এই কারণে পুরস্কৃত হয়, কিন্তু নাটকটি এই নাট্যশালায় অভিনীত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেনি। গ্রন্থটির ‘বিজ্ঞাপন’-এ উল্লিখিত হয়েছে যে 1867-তেই এই ‘নাট্যশালা-সমাজ বিগত-জীবন’ হয়। সোমপ্রকাশ পত্রিকা-র ১৬ অগ্র ১২৭৫ [30 Nov 1868] সংখ্যায় ‘যোড়াসাঁকো অভিনয় সভা হইতে পুরস্কার প্রাপ্ত’ এই উল্লেখসহ নাটকটি বিজ্ঞাপিত হয়েছিল, সম্ভবত গ্রন্থটি সেই সময়েই প্রকাশলাভ করে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য : ৪

বহুকাল যাবৎ ধারণা ছিল হিন্দুমেলা বা জাতীয় মেলার প্রথম অধিবেশন হয় ১২৭৩ বঙ্গাব্দের চৈত্রসংক্রান্তির দিনে আশুতোষ দেবের বেলগাছিয়ার বাগানে [ডন ক্যাস্টরের বাগান বা ডন্‌কিন সাহেবের বাগান নামেও পরিচিত]। হিন্দুমেলার ইতিহাসকার যোগেশচন্দ্র বাগল জাতীয়তার নবমন্ত্র বা হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত [১৩৫২] গ্রন্থে এবং ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা-র অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গ্রন্থে এই ধারণাই ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দুমেলা ও ভারতচিন্তা’ প্রবন্ধে [দ্র দেশ, সাহিত্য-সংখ্যা ১৩৭৪। ৯৬-১০২] এই ধারণা সংশোধন করেন মেলার প্রধান উদ্যোক্তা নবগোপাল মিত্র-সম্পাদিত The National Paper-এ প্রকাশিত বিবরণ অবলম্বন করে।

পূর্বেই বলা হয়েছে The National Paper-এর প্রথম দিকে প্রকাশিত রাজনারায়ণ বসুর “Prospectus of a Society for the Promotion of National Feeling among the Educated Natives of Bengal” প্রবন্ধটি থেকে [উক্ত পত্রিকার ওই বৎসরের ফাইল পাওয়া যায়নি, সুতরাং ঠিক কোন্ তারিখ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল তা জানা যায় না। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র চৈত্র ১৭৮৭ শক সংখ্যায় প্রবন্ধটি. পুনর্মুদ্রিত হয়] নবগোপাল মিত্র এই মেলার প্রেরণা পান। অবশ্য Prospectus-টি প্রকাশিত হবার এক বৎসরেরও বেশি সময় পরে 20 Mar 1867 [বুধ ৭ চৈত্র ১২৭৩] উক্ত পত্রিকায় [Vol III, No. 12, pp. 138-39] ‘A National Gathering’-শীর্ষক একটি আবেদন প্রচারিত হয়, যাতে আসন্ন চৈত্রসংক্রান্তির দিন একটি সম্মিলনের আয়োজন করা যায় ‘to unite in one tie of brotherly love union the various races and tribes of the people, who though living in one common soil, having one common interest, feel themselves so many different nations.’ এই প্রস্তাব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই অনেকের সহানুভূতি লাভ করতে সমর্থ হয়। পরবর্তী সংখ্যায় [No. 13, Mar 27] লিখিত হয় : ‘We can congratulate ourselves too heartily on the success of the appeal made by us to the leading members of the Hindoo community to get up a movement for National Gathering at the end of the Bengalee Year. Some of the most respectable gentlemen of Calcutta have expressed sympathy with the cause by liberal contributions.’ পরের সংখ্যায় [No. 14, Apr 3] ১৫ জন শুভানুধ্যায়ীর নাম ঘোষণা করে জানানো হয় : ‘The movement for an annual National Gathering is drawing sympathy from all quarters… We understand that a meeting will soon be called of the subscribers to determine as to what should be the objects of the Gathering.’ এর পরবর্তী সংখ্যাতেই [No. 15, Apr 10] মেলার অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করা হয় : ‘The Mela will be held on Friday next at the Garden House of Rajah Narsing Chunder Roy Bahadoor, Chitpore, commencing its proceeding at 3 P.M. there will be different sorts of Gymnastic and Atheletic exercises, Music, Concert, Exhibition of the works of Hindoo Females, and Chemical experiments &&&.’ সোমপ্রকাশ পত্রিকা-ও [৯। ২১, ২৬ চৈত্র] সংবাদ দেয় : ‘নূতন বৎসর উপলক্ষে কলিকাতায় কয়েক জন ভদ্রলোক চৈত্র সংক্রান্তির দিবস একটি জাতীয় মেলা করিবেন। ঐ উপলক্ষে অনেক আমোদ হইবে। সর্ব্বসাধারণ মেলাদর্শনার্থ যাইতে পারিবেন। এ প্রকার সামাজিক একতা প্রার্থনীয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রতি বৎসর ইহা করিতেন। তাঁহার মৃত্যু অবধি নূতন বৎসর উপলক্ষে কোন উৎসবই নাই।’ এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায়, মেলার উদ্যোক্তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তখনও পর্যন্ত অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়নি। এমনকি কয়েক বৎসর মেলার পর ১২৭৬ বঙ্গাব্দের চতুর্থ অধিবেশন থেকে যখন চৈত্র-সংক্রান্তির পরিবর্তে মাঘ-সংক্রান্তি কিংবা ফাল্গুন মাসের প্রথম শনি ও রবিবার মেলা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয় [৬ ফাল্গুন ১২৭৬ বুধ 16 Feb 1870] লেখে : ‘কলিকাতার সুসভ্য যুবকবৃন্দ গাজন পর্ব্বের বিনিময়ে সেই বৎসর অর্থাৎ ১৮৬৭ খ্রীঃ হইতে চৈত্রমেলা বাহির করিয়াছিলেন, … যখন চড়কপর্ব্বের বিনিময়ে চৈত্রমেলার সৃষ্টি হইয়াছে, তখন এ বৎসর একেবারে তাহার নাম ও দিন পরিবর্ত্তন করিয়া ফেলা কোনক্রমেই যুক্তিসঙ্গত হয় নাই’ [এই বৎসর ‘চৈত্র মেলা’র পরিবর্তে ‘হিন্দু মেলা’ নামকরণ করা হয়]। অর্থাৎ মেলার কর্তৃপক্ষ ইতিপূর্বে এই ভ্রান্ত ধারণার প্রতিবাদ করেছিলেন; The National Paper-এর 15 Apr 1868 সংখ্যায় [Vol. V, No. 16] দ্বিতীয় অধিবেশনের কার্যসূচি বর্ণনা করে লিখিত হয় : ‘From the above programme it will be clear beyond doubt that the Mela was far from being a substitute of the Churruch Poojah or of any other existing festivity as is erroneously supposed by many.’ বোঝা যায়, নবগোপাল মিত্র বা অন্যান্যেরা এই মেলানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় চেতনার উদ্বোধন ঘটাতে চাইছিলেন, দেশ তখনও তার পক্ষে যথেষ্ট প্রস্তুত হতে পারেনি—হিন্দুমেলার আনুষ্ঠানিক দিকটি কিছু লোককে আকর্ষণ করেছে, কিন্তু এটি কোনোদিনই একটি আন্দোলনে পরিণত হয়নি। মেলা বহুদিন থেকেই ভারতের সামাজিক মিলনক্ষেত্র রূপে গণ্য হয়ে এসেছে, কিন্তু সর্বত্রই তা কোনো-না-কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত—আর সেই কারণেই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ জাতীয় মেলা ‘হিন্দু মেলা’ নাম নিয়েও জনজীবনে গভীরতর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়নি, অক্লান্ত কর্মী নবগোপাল মিত্রের জীবনব্যাপী সাধনার এইটিই বাস্তব পরিণতি।

প্রাসঙ্গিক তথ্য : ৫

রবীন্দ্রনাথ যে-সময়ে বিদ্যালয়ে পড়াশুনো করেছিলেন, সেই সময়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সম্পূর্ণ চিত্রটি বহুবিধ উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট পরিমাণে স্পষ্ট নয়। স্কুলগুলিতে ক’টি করে শ্রেণী থাকত, প্রত্যেক শ্রেণীর পাঠ্যতালিকা কী ছিল, বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি পরীক্ষা কোন্ কোন্ শ্রেণীর পাঠ সমাপ্ত করার পর দেওয়া যেত—এ-সম্পর্কে ঠিকমতো তথ্য পাওয়া যায় না; যদিও প্রতি বৎসরই বিস্তৃত আকারে General Report on Public Instruction প্রকাশিত হত, কিন্তু সেগুলি উপরোক্ত প্রশ্নগুলির জবাব দেবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বস্তুত এখনকার স্কুলের শ্রেণী-বিভাগের ধারণা দিয়ে সে-যুগের শিক্ষাব্যবস্থা বোঝা খুবই শক্ত। ম্যাট্রিক, স্কুল-ফাইন্যাল বা মাধ্যমিকের মতো তখন স্কুলের শেষ পরীক্ষার নাম ছিল ‘এন্ট্রান্স’ —কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দায়িত্ব ছিল পরীক্ষা পরিচালনার—কৃতী ছাত্রেরা কলেজে পড়ার জন্য পেত জুনিয়ার স্কলারশিপ। কিন্তু এখন যেমন স্কুলে দশ বছর পড়ার পর এই শো পরীক্ষা দেবার অনুমতি পাওয়া যায়, তখন এ-সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হত না। সোমপ্রকাশ পত্রিকায় ‘ছাত্রবৃত্তি’-শীর্ষক একটি সম্পাদকীয়তে [৪। ৪২ ১৭ ভাদ্র ১২৬৯, 1 Sep 1862] লেখা হয়েছিল : ‘এক্ষণে প্রায় যাবতীয় প্রথম শ্রেণির গবর্ণমেন্ট বিদ্যালয়ে নয় বৎসর পাঠ করিয়া শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা দিবার নিয়ম হইয়াছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বিদ্যালয় সকলেও সাত বৎসর অধ্যয়ন না করিয়া পরীক্ষা দিবার উপায় নাই। এরূপ স্থলে নিতান্ত পক্ষে গড়ে সাত বৎসর অধ্যয়ন না করিয়া পরীক্ষা দিবার উপায় নাই।’ ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকার 1 Aug 1864 সংখ্যায় [Vol. XI, No. 31] ক্যালকাটা ট্রেনিং অ্যাকাডেমির একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, ওই স্কুলে সিনিয়ার বিভাগে তিনটি, জুনিয়ার বিভাগে পাঁচটি ও শিশু শ্রেণী নিয়ে মোট ন’টি শ্রেণী ছিল; যেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের স্কুল বিভাগে দুটি প্রাথমিক শ্রেণী [Elementary class], প্রথম বর্ষ থেকে পঞ্চম বর্ষ পাঁচটি শ্রেণী ও এন্ট্রান্স ক্লাস নিয়ে মোট আটটি শ্রেণী ছিল। মনীষী বিপিনচন্দ্র পালও [1858-1932] তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘There were eight classes in our school, counted from the first or Entrance class…to the last or infant class’।২৩ এতেই বোঝা যায়, বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শ্রেণীর সংখ্যা সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হত না। তবে পরীক্ষার্থীর নিম্নতম বয়ঃসীমাটি নির্দিষ্ট ছিল—পরীক্ষা দেবার পরবর্তী 1 Mar তারিখ তার বয়স ষোলো বছরের বেশি হওয়া দরকার। অবশ্য বর্তমান পর্বে রবীন্দ্রনাথ যে স্কুলে পড়তেন, সেই গবর্মেন্ট পাঠশালা এন্ট্রান্স স্কুল ছিল না—ভার্নাকুলার স্কলারশিপ বা বাংলা ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার জন্যই এখানে ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হত। আমরা আগেই বলেছি, এই স্কুলে সাতটি শ্রেণী ছিল।

তখন স্কুল-পর্য্যায়ে মোটামুটি তিনটি বৃত্তি-পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল— Primary Scholarship, Vernacular কিংবা Minor Scholarship এবং Junior Scholarship বা Entrance; কিন্তু এই পরীক্ষাগুলি ঠিক কোন্‌ পর্যায়ে গৃহীত হত, সে-সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল বলে মনে হয় না। পরীক্ষার্থীদের বয়ঃসীমা ও পাঠ্যতালিকা বিভিন্ন বৎসরে বিভিন্ন ভাবে নির্ধারিত হয়েছে—সেখানেও কোনো অপরিবর্তনীয় নিয়ম অনুসরণ করতে দেখা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ যদিও উপরোক্ত কোনো ধরনের ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষা কখনোই দেননি, তবু কী ধরনের সিলেবাস অনুযায়ী তাঁকে পড়াশুনো করতে হয়েছিল সেটির একটি পরিচয় পাবার জন্য আমরা কয়েক বৎসরের পাঠ্যতালিকার পর্যালোচনা করছি।

1863-তে নিম্ন-পর্যায়ের দুটি ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার জন্য সোমপ্রকাশ-এ [৫। ১৫, ৫ ফাল্গুন ১২৬৯, 16 Feb 1863] একটি ‘বিজ্ঞাপন’ প্রকাশিত হয় :

দশবৎসরের ন্যুনবয়স্ক বালকদিগকে পশ্চাল্লিখিত বিষয়ের পরীক্ষা দিতে হইবে। যথা—

বাঙ্গালাসাহিত্য। /চারুপাঠ ১ম ভাগ, রণজিৎসিংহের জীবন বৃত্তান্ত, কবিতাপাঠ, শ্রুতলিখন ও হস্তাক্ষর।

ব্যাকরণ।/ সন্ধি, লিঙ্গ, ক্রিয়া, কারক।

ভূগোল।/ পৃথিবীর চারি প্রধানখণ্ডের ও ভারতবর্ষের মানচিত্র লিখন।

ইতিহাস।/ বাঙ্গালা ইতিহাস ২য় ভাগ।

অঙ্ক। ত্রৈরাশিক পর্যন্ত।

১১, ১২, ১৩ অর্থাৎ অপূর্ণ ত্রয়োদশ বৎসর বালকগণকে পশ্চাল্লিখিত বিষয়ের পরীক্ষা দিতে হইবেক। যথা— বাঙ্গালা সাহিত্য।/ নবপ্রবন্ধসার, টেলিমেকস্ ১ম ভাগ, পদ্য পাঠ, শ্রুতলিখন ও হস্তাক্ষর।

ব্যাকরণ।/ সন্ধি, লিঙ্গ, ক্রিয়া, কারক, সমাস।

ইতিহাস।/ বাঙ্গালা ইতিহাস ২য় ভাগ ও কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের ভারতবর্ষের ইতিহাস।

ভূগোল।/ তারিণীচরণকৃত ভূগোলবিবরণ সমুদয় পৃথিবীর চারি প্রধানখণ্ডের ও এসিয়ার সমুদায় দেশের মানচিত্র লিখন।

অঙ্ক।/ সামান্য ভগ্নাংশ পৰ্য্যন্ত।

পরের বৎসর অর্থাৎ 1864-এর ভার্নাকুলার স্কলারশিপের জন্য ১০ থেকে ১২ বছরের বালকদের এক বছরে যোলোটি পাঠ্যপুস্তক পড়ানো সম্পর্কে অভিযোগ করতে গিয়ে হিন্দু পেট্রিয়ট-এ [Vol. XI, No. 41, 10 Oct 1864] একজন পত্রপ্রেরক সেই বৎসরের পাঠ্য-তালিকাটি উদ্ধার করেছেন : ‘সীতার বনবাস, ব্যাকরণ, চারুপাঠ ৩য় ভাগ, পদ্যপাঠ, বাংলার ইতিহাস ১ম ও ২য় ভাগ, ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রাকৃত বিজ্ঞান, মানসাঙ্ক, স্বাস্থ্যরক্ষা, জমিদারী দর্শন, অর্থ ব্যবহার, পত্রকৌমুদী, ভূগোল, পাটীগণিত ও জ্যামিতি’। আগের বছরের তুলনায় এ বছরের কতকগুলি অতিরিক্ত বিষয় পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

1866-এর পাঠ্যতালিকাটি২৪ [ভার্নাকুলার স্কলারশিপ] এইরূপ :

বাংলা সাহিত্য—রচনাবলী : হরিনাথ শর্মা; জ্ঞানাঙ্কুর : নবীনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়; সদ্ভাবশতক : কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার।

ব্যাকরণ—সন্ধি, লিঙ্গ, কারক, ক্রিয়াপদ, ধাতু, তদ্ধিত, সমাস। বিবরণাত্মক ও বর্ণনামূলক রচনাদি।

পাটীগণিত—সামান্য ও দশমিক ভগ্নাংশ, সরল ও চক্রবৃদ্ধি সুদকষা, বর্গমূল, সমতল ক্ষেত্রের পরিমিতি, মানসাঙ্ক।

জ্যামিতি—ইউক্লিড ১ম খণ্ড।

প্রকৃতি-বিজ্ঞান [Natural Philosophy]—ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ১ম ভাগ’, প্রথম আটটি অধ্যায়।

ইতিহাস—তারিণীচরণ-কৃত ভারতবর্ষের ইতিহাস ১ম, কৃষ্ণচন্দ্রের ব্রিটিশ ভারত।

ভূগোল—তারিণীচরণ-কৃত ভূগোল (ভারতবর্ষ বাদে), শশীভূষণের ভারতবর্ষের ভূগোল, মানচিত্র লিখন, ঐতিহাসিক স্থানগুলি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান।

অতিরিক্ত বিষয়—দীননাথ মুখোপাধ্যায়ের জমিদারী হিসাব, পত্ৰ কৌমুদী, রাজকৃষ্ণের অর্থনীতি-বিজ্ঞান [Political Economy], রাধিকাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের স্বাস্থ্যরক্ষা।

ভার্নাকুলার স্কলারশিপ পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ছিল পনেরো বৎসর। মাইনর পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সীমা ছিল ষোলো বৎসর, তারাও উপরোক্ত সিলেবাসেই পরীক্ষা দিত, কেবল বাংলার ব্যাকরণ-বিষয়ক পত্রটির পরিবর্তে তাদের দুটি ইংরেজি পত্রে উত্তর করতে হত। বুঝতেই পারা যায়, ছাত্রদের পক্ষে পাঠ্যসূচির বোঝা যথেষ্ট ভারী ছিল। বয়সের ঊর্ধ্বসীমা যাই থাকুক-না-কেন, গেজেটে কৃতী ছাত্রদের যে তালিকা প্রকাশিত হত তাতে দেখা যায় এগারো থেকে তেরো বছর বয়সের ছাত্রেরাই এই পরীক্ষা দিয়েছে।

উপরে প্রদত্ত বিবরণটি আরও দীর্ঘ করা চলে, কিন্তু আমাদের মনে হয় রবীন্দ্রনাথের ছাত্রাবস্থায় পাঠ্যসূচিটি কী ধরনের ছিল উপরোক্ত তথ্যের সাহায্যেই তা যথেষ্ট স্পষ্ট হয়েছে। মনে রাখা দরকার, এর উপরেও তাঁদের জন্য ‘নানা বিদ্যার আয়োজন’ মেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ করেছিলেন, স্কুলের যা পাঠ্য ছিল বাড়িতে তার চেয়ে অনেক বেশি পড়তে হত।

উল্লেখপঞ্জি

জীবনস্মৃতি ১৭। ২৮৪-৮৫

ছেলেবেলা ২৬। ৬০৭

জীবনস্মৃতি ১৭। ২৭৬-৭৭

ছেলেবেলা ২৬। ৫৯০

আমার বাল্যকথা ও আমার বোম্বাইপ্রবাস। ২৭

মন্মথনাথ ঘোষ : জ্যোতিরিন্দ্রনাথ [১৩৩৪]। ১২

জীবনস্মৃতি ১৭। ৩৩৩-৩৪

দ্র প্রাসঙ্গিক তথ্য : ৩

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। ১৫

১০ ছেলেবেলা ২৬। ৫৯৮-৯৯

১১ দ্র প্রাসঙ্গিক তথ্য : ৪

১২ বক্তৃতামালা। ১৫; যোগেশচন্দ্র বাগল : হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত। ৫-এ উদ্ধৃত

১৩ ঘরোয়া। ৯৩

১৪ বি. ভা. প., বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৭৫। ২৫২, পত্র ১৪

১৫ ‘আমাদের কথা’ : বলেন্দ্ৰনাথ শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ। ১৫

১৬ আমার বাল্যকথা ও আমার বোম্বাই প্রবাস। ৫

১৭ পুরাতনী। ৩৩

১৮ দ্র তত্ত্ব, বৈশাখ। ২২

১৯ আমার বাল্যকথা ও আমার বোম্বাই প্রবাস। ৩৬-৩৭

২০ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন-স্মৃতি। ১০৪, ১১২

২১ ঘরোয়া। ৯৩

২২ বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস। ৩০৮

২৩ Bepin Chandra Pal : Memories of My Life and Times in the days of My Youth (1857-1884) [1932]/31

২৪ দ্র General Report on Public Instruction in the Lower Provinces of the Bengal Presidency for 1865-66 [1866]/89-90

* গেজেটটি কেন কেনা হয়েছিল, বলা সম্ভব নয়। ‘গেজেট’ বলতে যদি ‘ক্যালকাটা গেজেট’ বোঝানো হয়ে থাকে, তার Oct 1865 থেকে Mar 1866 পর্যন্ত সমস্ত সংখ্যাগুলি আমরা খুঁজে দেখেছি—এই বালকদের জন্য আবশ্যক, এমন কোনো সংবাদ তাতে নেই।

‘:.. আমার মামাশ্বশুর হিসাবপত্র দেখিতেন, কিন্তু তাঁরও মাথার দোষ থাকায় শ্বশুর তাঁহাকে ছাড়াইয়া দিতে বাধ্য হন।’—‘আমাদের কথা’ : প্রফুল্লময়ী দেবী, বলেন্দ্রনাথ শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ। ২০

* ‘MENTAL ARITHMETIC/ FOR CHILDREN./ PART I./ BY GOPAL CHUNDER BANERJEE./ মানসাঙ্ক/প্রথম ভাগ।/শিশুদিগের শিক্ষার্থ/ শ্রীগোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত। /কলিকাতা।/ শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ১৮২ সংখ্যক ভবনে/ ষ্ট্যান্‌হোপ্‌ যন্ত্রে যন্ত্রিত।/ বাং ১২৭১, ইং ১৮৬৪ সাল।’

রামনারায়ণ তর্করত্ন তাঁর ‘আত্মকথা’য় এই পারিতোষিকের পরিমাণ ‘২০০৲ টাকা’ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। দ্র সা-সা-চ ১। ৫। ৩৯

* চিত্রা দেব তাঁর ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ [১৩৮৭] গ্রন্থে এঁর নাম সর্বত্র ‘যদুকমল’ বলে উল্লেখ করেছেন, স্পষ্টতই সেটি ভুল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *