হাসিরও নয়, গল্পও নয়

হাসিরও নয় গল্পও নয়

আরে দুর্—আলাদা করে গপ্পো বানাবার কী দরকার, যেদিকে চোখ পড়ে কেবলই তো হাসি আর হাসি। উত্তরে চাই/দক্ষিণে চাই/ ফেনায় ফেনায়/কিছু নাই/আর কিছু নাই/কিছু নাই/—কেবলই সফেন হাসির হিল্লোল। দিল্লির কথাই ধরুন না? মসনদে তো হিরো হীরালাল হাজির, হাসাহাসির শেষ নেই, হর রোজ নয়া পালা বদলাচ্ছে, আর অডিয়েল তালিও বাজাচ্ছে, সিটিও মারছে। ঘরের কথা আর বলবো কি! দিব্যি চলছিল, হঠাৎ দেখি মহাকরণেও অট্টহাস্য তৈরি হচ্ছে—যুক্তফ্রন্টের মধ্যে ফ্রন্টাল অ্যাটাক! এ পালার কাছে কোথায় লাগে নট্ট কোম্পানী! উত্তরে চাই দক্ষিণে চাই… তামিলনাড়ু দেখুন, অন্ধ্র দেখুন, পঞ্জাব দেখুন, কাশ্মীর দেখুন,…. ফেনায় ফেনায় কিছু নাই, আর কিছু নাই। বিশুদ্ধ হাস্যকৌতুক। ভারতবর্ষের নয়া ইতিহাস!

কলকাতাতে পুজো গেল। কোন একটি পুজোমণ্ডপের অতি অপরূপ আলোকসজ্জার ছবি খবরের কাগজে ছাপানো হয়েছিল। পুজোর আগেই বাচ্চারা ভিড় করছিল আলো দেখতে। কেবল সুবিধের জন্য বৈদ্যুতিক তারটা তাঁরা জলের ভিতর দিয়ে টেনেছিলেন বলে একটা নাম-না-জানা পরিবারের বাচ্চা ছেলে না হয় বৈদ্যুতিক শক্ লেগে মরেই গেল ষষ্ঠীর দিনে। তা বলে পাড়ার চালউলীর সাক্ষী আবার সাক্ষী নাকি? সে বলেছে যিনিই তাকে ছাড়াতে যাচ্ছিলেন তাঁরই নাকি শক্ লাগছিল। শেষে বিজলী তারটা কেটে ফেলে ছেলেটার শরীর তুলতে পারা গেল। লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেছিল ছেলেটা! নেহাৎই অতি-মধ্যবিত্ত তার বোকা বাবাটির এতই আস্পদ্দা, বলে কিনা, “দশ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ আমি চাই না, ওতে কি আমার ছেলে ফেরত পাব?” জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা ভবে। তা বলে এই মাগ্গিগণ্ডার দিনে দশ হাজার টাকা তুই রিফিউজ করবি? হাসির গল্প না?

বাপের শ্মশানবৈরাগ্যের সুযোগে ক্লাবের তো দশ হাজার টাকা বেঁচে গেল! ভালই হল—সামনের বছর আলোকসজ্জাটা আরো জমজমাট হবে। অফারও করা হল, টাকাও গেল না। এর পর উকীল আত্মীয়স্বজনদের চাপে বাবাটি যদি মত বদলে ফের ক্ষতিপূরণ চান—হাজার চাইলেও ওটাকা ক্লাব আর কিন্তু বের করবে না। নিউজটা কাগজে আর নেই তো। সময়মত চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু ও-পাড়াতে আরো তো বাচ্চার বাবা-মায়েরা ছিলেন। তাঁরা কই কেউই তো দাবি করলেন না, “ও আলো আমরা চোখ মেলে দেখতে চাইনে—ও আলো মরণ-আলো, নেবাও, নেবাও। সাজানো আলো মলিন করে দিয়ে অন্তত তোমরা শোকপ্রকাশ করো, ওর বাবা টাকা নাই বা নিলেন!” ও আলো চিতার আলোর মত অশুভ। এ কথা ও-পাড়ার তো কেউই বললেন না—উলটে কলকাতা, ও সারা মফঃস্বল ভেঙে, ওই খুনে-আলোই দেখতে যেতে ভিড় করে লাইন লাগালেন নতুন কাপড়ে সেজে সুরভিত, সুসজ্জিত উৎসবী ‘মানুষ’। হাসির গল্প নয়? অট্টহাসির গল্প।

আরো হাসি আসছে, হাসি ছিটিয়ে হাসির ছর্‌রা দিয়ে। হাসির বুলেট আসছে। গল্প তৈরি হলো বলে, সৈয়দ সাহাবুদ্দীন সায়েব যেমন দ্রুত উন্নতি করছেন, উনিই ভারতের পরবর্তী গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী। রাজীববাবুই তাঁর প্রধান পথিকৃৎ। কি মুসলিম নারী ডিভোর্স বিল, কি সালমান রাশদির স্যাটানিক ভার্সেস, কি মার্টিন স্করসীজের ‘দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট’—ভারতবর্ষ রক্ষণশীলতার দিক থেকে সবার আগে আগে পথ দেখিয়ে চলেছে। এবার মিথ্যে সাক্ষীর জিব কেটে নেওয়া, চোরের হাত কেটে নেওয়া, পরদারগামীকে চাবুক মারা শুরু হবে। ক্রমশ দেশ সততা ও সভ্যতার আদর্শ হয়ে উঠছে তো, হাসির গল্প আমাদের সেক্যুলারিজম। নিষেধাজ্ঞা জারির বেলা এক অপূর্ব সর্বধর্মের প্রতি সমদৃষ্টি বিশেষত মাইনরিটি ধর্মের প্রতি (ইসলাম হাজার হোক, ফিফটি পার্সেন্টের কমই তো এ দেশে?) তীক্ষ্ণ নজর কি প্রশংসনীয় নয়? ঠিক সতী পুজোর সিঁদুর মাখানো চুনুরীর মত পত্পত্ করে উড়ছে আমাদের বিশিষ্ট সেক্যুলারিজম।

আমাদের ভারতীয় সেক্যুলারিজমের অন্য নাম সবরকমের মৌলবাদ, ‘ফান্ডামেন্টালিজম’কে আইনত মদত দেওয়া। গোঁড়া দেওরাস সাহেব অবিশ্যি সে কথা মানবেন না। তিনি বললেন হিন্দুধর্মের বেলায় এই সরকারী “রক্ষণশীল উদারনীতি” কাজ করে না। কে বলল করে না? কেন, সেই যে স্বামী অগ্নিবেশকে কি দেয়া হয়েছিল দেওরালাতে ঢুকতে? নিষিদ্ধ করা হয়নি কি তাঁর পদযাত্রা? হ্যাঁ এখন সেই ইংরেজ ব্যাটারা যদি দেড় শো-দু শো বছর আগেই সতীদাহ নিষিদ্ধ করে দ্যায় তো আমরা কী করবো? চুপচাপ দিচ্ছিলাম তো সতীপুজো, সতীমেলা, সবই চলতে—দু’-চারটে মেয়েকে সতীও তো করা হতো প্রায়ই রাজপুতনার ওদিকে। কাগজে দেখতাম, খুব নাকি সতী তামাশায় ভক্তের ভিড় হয়। পুলিশ ডেকে সে ভিড় সামলাতে হয়। তবুও বেআইনি সতীদাহ বন্ধ তো কই করা হত না? এখন খবরের কাগজে রূপ কানোয়ারের সতী হতে আপ্রাণ আপত্তির কথাটা হঠাৎ পাঁচ কান হয়ে গেল এই যা হল গণ্ডগোল। এখন ভেবে দেখুন, এই সুদীর্ঘ পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতা, সনাতন ধর্মের শ্বাশত রূপ বদলানোর পক্ষে দেড়শো/দুশো বছর আর কতটুকু সময়? এত চট করে দেশ বদলে যাবে, মনে করাটাই কি হাস্যকর নয়? হাসালেন, সত্যি!

এটা ব্লুফিলমের পার্লারের বাড়বাড়ন্তের দিনে আলুনি হাসির গল্প আর কার জন্যেই বা লিখবো! পড়বে কে? গোটা বাঁচাটাই তো এখন একটা হাসির গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে! র‍্যাশনের দোকানে তেল কিনে পাঁচ শো জনের পায়ে পক্ষাঘাত হলো। তাতে কি, ভেজাল যিনি মিশিয়েছেন তিনি মুক্ত বাতাসে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন (তাঁর জন্য ঠিকই তিনি গোকুলে বাড়ছেন—আমি বিশ্বাস করি—যিনি বাড়বার) আর অতর্কিতে জাল তেল খেয়ে পঙ্গুরা কি সুন্দর লেংচে লেংচে অথবা ঝকঝকে হুইল চেয়ারে বসে বসে হাসপাতালে স্পোর্টস খেলছে। মহোৎসাহে রেস দিচ্ছে তারা। কী সুন্দর দৃশ্য বলুন তো! প্রত্যেকটি কাগজে সযত্নে ছাপিয়েছে। হর্তাকর্তারাও সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। দেখে হাঃ হাঃ করে হাসি পায়নি আপনাদের? ও কি! কোঁচার খুঁটে মুছছেন যে! আপনি আবার কে? ও, কাগজের ছবির ওই ল্যাংড়া ছেলেটা বুঝি আপনার ছেলে? বাঃ? আপনার ছেলের বদলে আমার ছেলেটার যদি কাগজে ছবি উঠতো, আমি কি কাঁদতুম! পাবলিসিটির মূল্য বোঝেন না—বেশ মানুষ তো আপনি! হাসালেন বটে।

আরে মশাই এই তো আমাদের পাড়ায় সেদিন কী হলো! পাড়ায় ডাকাতি হচ্ছে, পুলিশ ভ্যান মোড়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে, পড়শীরা ছুটে ডাকতে গেলো, পুলিশ এলো না। তখন কি করা—বাড়িতে ডাকাত পড়েছে বলে দশ বছরের বাচ্চা ছেলেটাই দেখতে গেল। জন্মের শোধ গুলি খেয়ে চোখদুটি করে ফেললে অন্ধ। তাই নিয়ে কত লেখালেখি কাগজে। সেই ছেলের নাম রোজ রোজ ওই জন্যেই তো ছাপা হচ্ছে। তাকে দিল্লি অবধি পাঠালেন, সরকার মশাই এতই উদার সহৃদয়; তবুও সে ফিরল জন্মের মত দৃষ্টিহারা হয়ে। আরে মশাই দোষ কাকে দেবেন! ডাকাতকে? না পুলিশকে? না ছেলেটাকে? তোরই বা উকি দেবার দরকারটা কী? দোষ আসলে অদৃষ্টের। জ্যোতিষে তো বিশ্বাস করবেন আপনারা! মারে হরি তো রাখে কে! কপালে আছে তার অন্ধত্ব, আর দোষ দেবেন মানুষের! হাসালেন, সত্যি!

হাসাচ্ছেনা কেই বা! টিভি খুললেই উচ্চশ্রেণীর মৃদুমদির নীলরক্তের হাস্যপরিহাস দেখতে পাবেন। রেডিও খুললে হাসির তুবড়ি। আর খবরের কাগজে তো পাতায় পাতায় হেডলাইন থেকেই দমফাটানো হাসি। যেমন সক্রিয় আমাদের সরকারী বায়ুযান তেমনি কর্মঠ বেসরকারী বায়ুদূত। উঠছেন আর পড়ছেন। পড়ছেন আর উঠছেন। হায়ালজ্জার বালাই নেই। একজন বোকামতন বেঁটে রোগা রেলমন্ত্রী একবার একটি রেল দুর্ঘটনার দায় মাথায় নিয়ে মন্ত্রীপদ ত্যাগ করেছিলেন। পরে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশশুদ্ধ সবার পাপ মাথায় নিয়ে মনুষ্যপদটাই ত্যাগ করে ফেলেন তাসখন্দে। হ্যাঁ, হাসিয়েছিলেন বটে ভদ্রলোক! আরেক ভদ্রলোক এখনও আছেন, এতদিন রাজার ছেলে বলেই জানতুম, সেধে সেধে হঠাৎ নিজের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি সব পাবলিকের কাছে খোলসা করে ঘোষণা করে দিলেন। তাঁর ধারণা রাজনীতিতে থাকতে হলে এমনটি করাই নাকি মানানসই। তা, অমন নির্বুদ্ধিতার দৃষ্টান্ত আর কেউ যে গ্রহণ করেননি তা বলাই বাহুল্য। সত্যি, মাণ্ডির রাজা-রানী হাসিয়ে মারলেন না কি? “হাসালে সত্যি এবার, ওগো দশানন!/ যেন শালের কাছে দুব্বোঘাস করে আস্ফালন!” সারা দেশজোড়া এখনও বফর্স, ফেয়ারফ্যাক্স, কিছুরই সুরাহা হয়নি—এর মধ্যে কেই বা জানতে চেয়েছে, তোর মাসে ক’পয়সা রুজি-রোজগার! তা, যা বলছিলাম, সরকারী আকাশদূত কেন্দ্রীয় বিমানবাহিনী আর বিকেন্দ্রিক বায়ুদূতের কথা ভেবেই তো কতকাল আগেই কবি গাহিয়া গিয়াছেন—“পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা যুগযুগ ধাবিত যাত্রী”—এইসব পতিত অথবা নিপীড়িত যাত্রীদের উদ্দেশেই নিবেদিত এই পঙ্‌ক্তি। চিরসারথির রথচক্রই এঁদের ভরসা হয় শেষাবধি।

যেমন উজ্জ্বল আমাদের দ্যু-লোকসভা, তেমনিই অত্যুজ্জ্বল নৈ-রাজ্যসভা, তেমনিই মনোহারিণী নির্বিধানসভা। যেমন কেন্দ্র, তেমনিই রাজ্যগুলি—সবাই সর্বত্র বিবদমান। এত বড় দেশে চমৎকার একতা কিন্তু এদিক থেকে। কোই ফারাক নহী। সব ঝুট্ হ্যায়। সর্বত্র দলবাজি। তা বলে নির্বাচন কিন্তু নির্বিঘ্নেই সংগঠিত হয় সর্বত্র। সে বিষয়ে কেউ কিছু কইতে পারবো না, যে দলই যেখানে জিতুক, তা গণতন্ত্রের জয়। মারকাটারি গণতন্ত্র। ভোটের বয়েসটা যত কমবে গণতন্ত্র ততই সাবালক হয়ে উঠবে, দশ বছরটাই অ্যাডাল্ট ফ্রানচাইজের পক্ষে আজকাল ঠিক বলে মনে হয়। কম্পিউটারের যুগে, বুদ্ধির বয়সটা দ্রুত বাড়ে, স্কুল পালিয়ে ব্লুফিলম দেখে বাচ্চারাও পাকে তাড়াতাড়ি—সবই এগিয়ে যাচ্ছে, এটা এগোবে না!

“টঙ্কাদেবি! করো যদি কৃপা, থাকে না কিছুই জ্বালা/বিদ্যেবুদ্ধি কিছু না—কিছু না, সব ভস্মে ঘি-ঢালা!” এ কি আজকের কথা?

লেটেস্ট মডেলের কম্পিউটার বসবেন। জ্যোতিষী ঠাকুর এলেন, লগ্ন ঠিক করে দিলেন, গাঁদাফুলের মালা আর মেটে সিঁদুর পরিয়ে, নারকোল ভেঙে, ঘট-আলপনা-ধূপধুনো-পুরুত-ঘণ্টা-গঙ্গাজল সব সেরে শীততাপনিয়ন্ত্রিত কামরায় “ইহাগচ্ছ ইহাগচ্ছ ইহতিষ্ঠ ইহতিষ্ঠ, ইহ সন্নিধেহি, ইহ সন্নিরুধ্যস্ব, মম পূজাং গৃহাণ, অত্রাধিষ্ঠানং কুরু” বলে যন্ত্র দেবতা সুপ্রতিষ্ঠিত হলেন। দূরদর্শী কবি কত আগেই ঠিক এই উপলক্ষের জন্যেই তো আধুনিক মন্তর “নমো যন্ত্র নমো যন্ত্র” লিখে গেছেন। হাসির গল্প লেখার প্রয়োজন আমাদের থাকবেই বা কেন! পয়সা খরচ করে আমাদের দেশের বড়লোক মানুষরা ডিজনিল্যান্ডে বেড়াতে যায়ই বা কেন! অন্য দেশের লোকেদেরও তো উচিত ডিজনিল্যান্ডের বদলে এদেশে আসা এবং ক্ল্যাসিক্যাল খাজুরাহোর সঙ্গে আমাদের ক্লাসিক “হুজুর ওহোহো!” ও দেখা। দুটোই সমান মাদকতাময়, সমানভাবে শালীনতা-বিরোধী শিল্প। হাসাতে আবার কাউকে গপ্পো লিখতে হবে কেন! কাগজ খুলুন চোখ মেলুন, অফিসে যান।

আড়াল থেকে বাবা-মার কথা শুনে কানপুরে হঠাৎ পাখা থেকে ঝুলে স্বর্গের দিকে কেটে পড়লো তিনটে সুন্দরী বাচ্চা মেয়ে। বাবা-মার অমনোযোগী কথার গুণেই বছর না ঘুরতেই (কানপুরের ওই উদাহরণ কাগজে পড়েই নিশ্চয় উৎসাহ পেয়ে) পালঘাটে পাখা থেকেই ঝুলে পড়লো আরো চারটে ছোট ছোট মেয়ে। সাতটারই বয়স ছিল ১৬ থেকে ২৫-এর মধ্যে। জীবনের কিছুই দেখেনি তারা, কেবল বাবা-মায়ের উদ্বেগ দারিদ্র্য আর কষ্ট ছাড়া। সেটাই আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে, অভিমানিনীরা ভাবলে, বাবা-মার ভার কমিয়ে গেলুম।

আহাহা—কী বুদ্ধি! হাসবেন না কাঁদবেন! কানপুর, পালঘাট উত্তরে আর দক্ষিণে—দুই প্রান্তেই হিন্দু মেয়েদের একই গল্প। আরও হাসির গল্প শুনবেন? দেশজোড়া নারী নির্যাতন নিরোধ নিয়ে আস্ফালন আমরাই করছি। নিত্য নিয়মিত পত্রিকা, সংঘ, সমিতি, সেমিনার, ওয়র্কশপ, ন্যাশনাল কনফারেন্স, পেপার পড়া, গল্প-কবিতা লেখা, পথ-নাটক, রম্যরচনা ছাপা হচ্ছে। নারীবর্ষ, নারীদিবস, নারীদশক, উদযাপিত হচ্ছে। এই মেয়েগুলি তো শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতিত হয়নি। এরা তো নেহাতই বুদ্ধিহীনা, স্বেচ্ছাচারিণী। এদের তো জন্মদাতৃ বাবা-মায়ে জোর করে পাখা থেকে ঝুলিয়ে দেয়নি। তবে হ্যাঁ, দিয়েছে, আমাদের সমাজ। আশ্চর্য মেয়ে বাবা! বাপমায়ের মুখ দু’খানাও তোরা ভাবলি না একবার! (বাপমা যেন তাদের মুখগুলো ভেবেছিলেন, অর্থাভাব ও পণবিবাহ বিষয়ে নিষ্ঠুরতম আলাপ-আলোচনার সময়ে!) তবুও বলব না, বাঁচার চেয়ে মরাই ভালো। বলবো যুদ্ধ করো—যুদ্ধ করো, মেয়ে। সাতটি সৈনিক বিনাযুদ্ধে রণে ভঙ্গ দিলে? মনে বল করে “বিয়ে থা করব না, চাকরি করব” বলে বুনিয়াদী শিক্ষা নিয়েও উপার্জনের সৎ পথে নামা উচিত ছিল। তোদের মনে মরণ-সংগ্রামের জোর আছে, জীবন-সংগ্রামের শক্তি নেই?

কেমন করে যে হাসির গল্প বানিয়ে লিখি? শুয়ে আছি বিছানায়। ছেচল্লিশ দিন টানা হয়ে গেল। সামান্য মস্তিষ্কের গোলযোগ দেখা দিয়েছে। গুণময় পাঠকরা নিশ্চয় এতক্ষণে সেটা টেরও পেয়ে গেছেন। এদিকে গুরুজনবাক্য অতিক্রম করার সাধ্য নেই। সম্পাদক আমার গুরুজন মানুষ—তাঁর আদেশে শুয়েই কলম ধরা। এখন সেই পেলে-সাহেবের মতন অবস্থা। তিনি সুদূর ব্রেজিল থেকে একগাদা টাকার শ্রাদ্ধ করে কলকাতাতে এসে, মাঠে নেমে, স্ট্যাচু খেললেন। ফুটবলের গায়ে পা প্রায় ঠেকালেনই না! আমিও তেমনি লিখতে বসে হাসি বা গল্প কোনো কিছুরই ধারে কাছে পর্যন্ত আসতে পারিনি এখনও পর্যন্ত। যা বেরুচ্ছে তা ক্রোধের, আর কান্নার গুঞ্জন। ক্রোধ আর কান্না, এই দুটোই আমার হাসির অবলম্বন এখন।

সেদিন শারদ দিবা অবসান, হঠাৎ খেয়াল হলো বাইরে লক্ষ্মীপুজোর বিসর্জনের ঢাক বাজছে। লক্ষ্মীরও স্বেচ্ছা বিসর্জন হয়! হাসির কথা নয়! কখন যেন কুলোর বাতাস দিয়ে অলক্ষ্মী-বিদেয় করার দিন? সেটাও কি এই সময়ে? নাকি ইলেকশন টাইমে? নাকি দেওয়ালীর চোদ্দপিদিম জ্বালানোর রাত্তিরে। এক্ষণে আমার মধ্যে স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ বেশ বিশদভাবেই দেখা দিয়েছে—‘স্মৃতিভ্রংশাদ্‌…’ কী যেন হয়? ছাইয়ের বয়স আশৈশবের চেনা শ্লোকও ভুলিয়ে দিয়েছে। আমি ভুলে গেলে কি হবে, আমার মাকে জিজ্ঞেস করে আসুন তো? মা ঠিক বলে দেবেন। মাত্র পঁচাশি পূর্ণ হবে এই ত্রিশে নভেম্বর। পৌনে সাতটায় চা খেলে, সাতটায় বলেন—“কি রে? চা-টা আজ আর দিবি না?” অথচ সত্তর বছর আগেকার কথা হুবহু xerox করা মনে আছে। শৈশবে শেখা মন্ত্রতন্ত্র, শাস্ত্ৰবাক্য সমস্ত ঠোঁটস্থ যদিও বাড়িতে ঠাকুর-ঘর তৈরি করেননি। এই হচ্ছে ভগবানের হাসির গল্প। মানুষের তৈরি হাসির গল্প আরেক রকম। যেমন পি টি ঊষা, এবং আমরা। সে যেন দৌড়কল, যেন মানুষ নয়, তার যেন ভালমন্দ হতে পারে না। সে তো বেন জনসন হয়নি? তাকে নিয়ে কী নিষ্ঠুরতাই চলছে!

ভগবানের হাসির গল্পেরা চোখের সামনে দিবারাত্র ঘটে যাচ্ছে। সবার সে দেখার চোখ নেই যে। তা না হলে আর সজ্ঞানে আমার মেয়ে তার বন্ধুকে উপহার দেবে বলে অনেক খুঁজে পেতে কিনে আনলে, Quotable Trivia, Selected Trivia ইত্যাদি, ইত্যাদি। এ নিয়ে আলাদা বইও হয়? আরে! আমরা তবে কী করছি? বিদ্যালয়ে? বিশ্ববিদ্যালয়ে? পত্রপত্রিকায়? ক্লাস ওয়ান থেকে ডি লিট পর্যন্ত—ছোট পত্রিকা টু বড় পত্রিকা—পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা, সর্বত্রই একই কাণ্ড। অ্যাকাডেমিয়া মানেই তো Selected Trivia, আর এখন সাহিত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে Quotable Trivia— আর রাজনীতি? Unspeakable Trivia— হাসির গল্পের ঠিক মাঝগাঙে তলিয়ে যাচ্ছি আমরা, হাসির বান ডেকেছে। যতই শ্রদ্ধেয় সম্পাদকমশাই তাঁর পাইকপেয়াদা পাঠান, উঁহু—নবনীতা ও ফাঁদে পা দিচ্ছে না; নো মোর হাসির গল্প ফ্রম মি! হে হাসির গল্প, তোমায় আমি রেখে এলাম ঈশ্বরের হাতে। অবশ্য হাসাহাসির ভারটা ঈশ্বর স্বেচ্ছায় নিয়ে নিয়েছেন, আমাকে সমর্পণ করতে হয়নি। জীবন দেখে দেখে হাসির লেখা লেখবার পালা শেষ। এবার হাস্যকৌতুক লিখতে হলে প্রাণের বন্ধুর কাছ থেকে বাবার জমানো সেই পুরনো রীডার্স ডাইজেস্টগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সে সব তো এতদিনে বন্ধুই লিখে ফেলেছেন। কে জানতো বইগুলো এমন সোনার খনি? সে চোখ আমার ছিল না। বন্ধুর ছিল। সবার কি সবরকমের চোখ থাকে? এই যে পুণ্যব্রত! কত কী দেখতে পায়? সে সব কি আমাদের চোখে পড়ে?—একবার পুণ্যব্রত আবিষ্কার করলে, যে ওদের বাড়ির পোষা কুকুরের একটি, নেড়ি, (সে সত্যিই নেড়ি) যদিও গায়ে যথেষ্ট লোম—ইদানীং রোজ সন্ধে হলেই কোথায় উধাও হয়ে যায়। বেশ রাত করে ফেরে। এবং রাতে কিছুই খায় না। অঘোরে ঘুমোয়। পাহারা দেওয়া ডকে উঠেছে। সকালে তার আড়মোড়া ভেঙে ওঠা এক নাটকীয় ঘটনা। অথচ নেড়ি এরকম ছিল না। নেড়ির হলো কি? বৈজ্ঞানিকের উৎসাহে অনুসন্ধিৎসু পুণ্যব্রত এক সন্ধ্যায় নেড়ির পিছু নেওয়া স্থির করল। সে ডিসট্যান্স রেখে সে নেড়িকে ফলো করে গিয়ে দেখলো নেড়ি রামবাবুর গলির বিখ্যাত চুল্লুর দোকানটি আবিষ্কার করেছে। সারা সন্ধ্যে সে খদ্দেরদের ফেলে দেওয়া ভাঁড় চেটে চেটে সাফ করছে। তাদের ফেলে দেওয়া হাড় চিবুচ্ছে। ফলম্ অতি পরিষ্কারম্। সবার তো সব চোখ থাকে না? পুণ্যব্রতর আরো কুকুর ছিল, তাদের এই চোখ ছিল না। শুধু নেড়িরই ছিল। (আর পুণ্যব্রতর!)

তেমনি তারাপদরও খুব স্পেশাল চোখ আছে। তার চোখে যা পড়ে জগতে আর কারুর চোখে তা ধরতে পারবে না। সে ডোডোতাতাইকে তো দেখেছিল? আমাদেরও তো ঘরে ঘরে ডোডোতাতাই। আমরা কে ক’জন ওদের দেখতে পাই? তারাপদ নিত্য নতুন আবিষ্কর্তা। তারাপদ সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে, তাদের পোষ্যপুত্র সারমেয় শ্রীমান গণেশ ঠাকুর আজকাল খাবার দিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেতে খেতে বা খেয়ে উঠেই চড়াই পাখিদের তেড়ে তেড়ে মারতে ধরতে যায় না। বরং দূরে বসে সস্নেহে চেয়ে তাদের খাওয়া দেখতে থাকে। যেন ওই তাদের গার্জেন। ওদের খাওয়া পাহারা দ্যায়, খাওয়ায়। তারপর তারাপদ আরো আবিষ্কার করলে—নাঃ, জগতের সব চড়াই পাখির প্রতিই গণেশের ওই সস্নেহ ব্যবহার নেই। মাত্র দুটি বিশিষ্ট চড়াইকেই সেই সসম্মান উচ্ছিষ্ট-ভোজে আমন্ত্রণ জানায় গণেশ। অন্যদের তাড়িয়ে দেয়। ওই দুটি চড়াই পাখিকে, তারাপদর অতুলনীয় ভাষাতে, গণেশ—“পুষেছে।” কুকুর বলে কি তাকে পাখি পুষতে নেই!

পুণ্যবত আরেকবার করলে কি, রাস্তায় একটি রোগা মার্জারশিশু দেখতে পেয়ে দয়াপরবশ হয়ে বাড়িতে নিয়ে এল। যেহেতু সে হবু ডাক্তার, অচিরেই আবিষ্কার করলে মার্জারশিশুটি ঘোরতর অসুস্থ। কেন না তার বুকের ভেতর থেকে রীতিমতো ভয়াবহ ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। কোলে তুলেই বিনা স্টেথোস্কোপে স্পষ্ট সেই শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিউমোনিক স্প্যাজম, সন্দেহ নেই। স্টেথো লাগিয়ে দেখলে তো আরো ভয়ানক। পুণ্যব্রত যথাসাধ্য অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধপত্তর খাইয়ে দেখলে বেড়ালবাচ্চার খিদে নষ্ট, ক্রমশই সে আরো রোগা, ও লোমহীন হতে শুরু করেছে, কিন্তু ঐ বুকের মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দ একটুও কমেনি। অথাৎ তার বুকের মধ্যে প্রবল পরিমাণে কনজেস্শন থেকেই যাচ্ছে। ইতিমধ্যে পুণ্যর দিদি এলেন দেশ থেকে। পুণ্যব্রতর কাণ্ড দেখে খুব ধমক দিয়ে বেড়ালবাচ্চাকে কোলে বসিয়ে গাড়িতে করে সোজা মহিষাদল চলে গেলেন ও সব অ্যান্টিবায়োটিক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিশুদ্ধ জলমেশানো দুধ খাওয়াতে থাকলেন “দুধে-মাছে বেড়াল বাঁচে”—বলতে বলতে।

পুণ্যব্রত পুজোর সময়ে তাদের দেশে, মহিষাদলে, গিয়ে দ্যাখে বাড়ি জুড়ে বাঘের বাচ্চার মত এক বিশাল মার্জারী রাজত্ব করছেন। দিদি সস্নেহে হেসে বললেন—“তোর সেই বেড়ালছানাটা রে।”

—“সে এত বিশালবপু হল কেমন করে?”

—“ওই তো। চামচিকে আর বাদুড় খেয়ে খেয়ে। এ বাড়ি তো এখন ঝকঝকে পরিষ্কার। চিলেকুঠরিতে পর্যন্ত চামচিকে নেই। এখন গাছে উঠে দিনের বেলা বাদুড় ধরে খায়। যা এক্সপার্ট হয়েছে না!” দিদির যেন গর্ব ধরে না।

—“চামচিকে? ধরছে কী করে?” পুণ্যব্রত অবাক।

—“ওই তো! তাক করে থাকে। চামচিকেরা তো চক্কর খায়! ঠিক যক্ষুনি নেমে আসে ও তক্কে তক্কে থেকে টক্ করে লাফিয়ে উঠে তক্ষুনি খপ করে ধরে ফ্যালে। খুব শিকারী বেড়াল! টিকটিকি যেমন করে ফড়িং খায় আর কি।” খুব সহজভাবে দিদি বলেন। ইতিমধ্যে পুণ্যব্রত নানাভাবে সেই মার্জারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, (হাঁটে কি! যেন মেরিলিন মনরো!) এবং সেও করুণাপরবশ হয়ে পুণ্যর অঙ্কশায়িনী হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো পুণ্য সেকি? এত মোটাসোটা গোব্দা হুম্‌দো হয়েও সেই নিউমোনিক স্প্যাজম? এই নিয়েই অত লাফালাফি! সশঙ্ক পুণ্য বলে, “দিদি—এর যে এখনও ঘড়ঘড়—” দিদি তো হেসেই গড়িয়ে পড়লেন। —আহ্লাদ হলেই যে সব বেড়ালগুলোই অমন “গুর্‌গুর্” শব্দ করে, তাও জানিস না! তবে তুই কিসের ডাক্তারী করবি রে?” দিদি গালে হাত দিয়ে এত বড়ো হাঁ করে থাকেন।

—“মানুষের।” বেড়ালকে আদর করতে করতেই পুণ্যব্রত উত্তর দেয়। গম্ভীর আত্মস্থ।

পুণ্যরই এরকম শতশত গল্প আছে। এই যে ওর চেয়ে বেশ বয়োজ্যেষ্ঠ মা-বাবা। হরিদ্বারে পুণ্য করতে গিয়ে এই সেদিন এতই শস্তায় হঠাৎ কিছু কাঠের জিনিসপত্তর পেয়ে গেলন, যে সে-সবই তাঁদের কিনতেই হোলো…। ফলম্?—হরিদ্বারে বাকি চারদিন ওদের বাঁদরে ছোলা খেয়ে ও ট্রেনে শুধুই চীনেবাদাম খেয়ে বেঁচে থাকতে হোলো। রিজার্ভেশনটা চারদিন পরে ছিলো। সঙ্গে প্রচুর কাঠের জিনিসও ছিল অবশ্য। এই সান্ত্বনা। পুণ্যর গল্পেই একটা বাক্সো ভরে যায়। তার ওপর টুলুর আবার আছে তার সাঁত্রাগাছির নানান কেলেঙ্কারী—পেটে খিঁচ ধরিয়ে দেয়। আর নন্দিতার “হিমানীবাড়ির গল্পে” রীতিমত শরীর দু’ ভাঁজ হয়ে যায় আমার। কিন্তু ওরা বললে যেমনটি—আমি বললে তেমন তো নাও হতে পারে!—বিশেষ করে আমার এখন ঠিক হাসির গল্প বলার মেজাজ নেই। আমি কি এখন পারি হাসির গল্পের মতো সূক্ষ্মবস্তু রচনা করতে? বেশির ভাগ সময়েই কান্না পায় যে আমার। দুঃখে শোকে তো লেজিটিমেটলিই আসে, আনন্দেও আনন্দাশ্রু বিসর্জন আমার চিরকেলে অভ্যেস, আর ক্রোধে ক্রোধাশ্রু তো আশৈশবের প্র্যাকটিস! যত ক্রোধ তত অশ্রু। বন্ধু সুবীর বলেন, “নবনীতার Water Works।” ছোটবেলায় দাদাভাই বলত “ট্যাঙ্ক লীক করেছে র‍্যা”—মেয়েরা বলে “এই খেয়েছে!” ফলে আমার প্রাণের বন্ধুর অগুনতি হাসির গল্পগুলি বাজারে ভালো চললেও, যেমন আসলে মরজীবনে তাদের দাম নেই, আমার অশ্রুরও সেই অবস্থা। জগতে যার অশ্রুর দাম নেই, তার প্রাণেরই বা কী দাম! সে আর খামোখা হাসির গল্প লিখে আয়ুক্ষয় করবে কেন? এবার বরং সে কান্নার গল্প লিখলে পারে। লোকে তাতেও হাসবে। লোক হাসানোর কর্মটি একবার স্কন্ধে ভর করলে সিন্ধবাদ নাবিকের অবস্থা হয়। প্রেমের গল্প যেমন আমি লিখি না। ব্যাপারটা বড়ই গূঢ় বলে। হাসির গল্পও আজকাল আমি লিখি না লিখতে ইচ্ছে করে না বলে। “হাসির গল্প” পড়ে পাঠকদের গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করতে দেখেছি “এতে হাসির আছেটা কী?” অথবা “এতে গল্পটা কোথায়?” এসব দেখেশুনে শিক্ষা হয়ে গেছে। ভাবছি, হাসির গল্পের “লাইনটা” ছেড়েই দেবো, আবার কবিতায় ফিরে যাবো, প্রাণে আর হাসি পাচ্ছে না। শুধু কান্না, শুধু ক্রোধ। এসব কি আমি কঠিন গদ্যে ফোটাতে পারবো? কবিতাই আমার পক্ষে উপযুক্ত এখন। কবিতা খুব কঠোরতা বহন করবার শক্তি রাখে।

লেখা শেষ হবার আগেই কি বিশাল একটা হাসির গল্প ঘটে গেল। এই যেমন পাপ্পাকে আমরা শ্মশানে পুড়িয়ে এলুম, যাকে হাতে ধরে পদ্মপুকুরে চড়কের মেলায় নিয়ে গেছি। পাঁপরভাজা খাবার বায়না ধরেছে। শেষে বাঁদরের মুখোশটি পেয়েই খুশি। পাপ্পা যখন ক্লাস সিক্সে পড়তো, আমি তখন সদ্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢুকেছি। বুদ্ধদেব বসু সেই সময়ে খুব অনুবাদ করা নিয়ে মেতে ছিলেন। পাপ্পা শৈশবেও আমাদের কাছে ‘চাইল্ড-ওয়ান্ডা’র ছিল, ছোট ছোট আঙুল তুলে দেখিয়ে ঠিক বলে দিতে পারতো, কোন্ ছবিটা শাগালের, কোন্টা বা রেনোয়ার, কোন্টা পিকাসো, কোন্টা মোনে। আমরা প্রায়ই নতুন লোকজন পেলেই এই “ভানুমতী কা খেল্”টা সগৌরবে দেখাতুম, পাপ্পাকে ধরে এনে। কিশোরকুমারের একটি জনপ্রিয় বাংলা আধুনিক গান এই সময়ে পাল্লা ইংরিজিতে অনুবাদ করেছে বলে আমাদের জানালো। তারপর গম্ভীরভাবে আমাদের গেয়ে শোনালো—রীতিমতো কিশোরেরই সুর ও নিজস্ব ভাব দিয়ে… “ওয়ান পলকের/ওয়ান-টু সীয়িং/আরো ওয়ান-টু মোর হলে/ লস্ কী?/ইফ্ কাট্ দি প্রহর/সাইডে সীটে/মাইন্‌ডের টোয়াইস/টকও টেলে…/লস্ কী? লালালা/লালালা/লা/লা!! অতিপক্ক বালক পাপ্পার সে কী গান। সীরিয়াস মুখে পেট ফাটিয়ে হাসাতে তার জুড়ি ছিল না। অসামান্য কৌতুকপ্রিয় সেই ছোট্ট পাপ্পা, চলে গেছে। আমরা দিদিরা আছি। হাসির গল্প নয়! ভগবানের হাসির গল্প রোজ লেখা হচ্ছে।

পাপ্পা ছেলেবেলায় প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসতো, আমার মা ওকে দুধের সর খাওয়াতে ভালোবাসতেন। একবার মাকে একটা ভূতের গল্প বলেছিল সে। মা যুক্তিবাদী। ভূতে বিশ্বাস করেন না। পাপ্পা এসে বলল—“মাসীমা, আমি সত্যি সত্যি পরশু দিন ভূত দেখেছি। জানেন?” তখনও ঢাকুরিয়া ব্রিজ হয়নি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়নি। যোধপুর পার্ক হচ্ছে। যাদবপুর এঞ্জিনিয়ারিং কলেজটিই শুধু ছিল। যাদবপুরের ওপাশে বনজঙ্গল কেটে তখন উদ্বাস্তুদের বসানো হচ্ছে, বাঘাযতীন কলোনি তৈরি হচ্ছে। বাগানবাড়িও কয়েকটা রয়েছে পুরনো বড়লোকদের, এখনও যেমন মল্লিকপুর, রাজপুরে দেখতে পাই। আসল কথা, যাদবপুরকে তখনও কলকাতা ভাবা হত না। ঢাকুরিয়াকেই মফস্বল ভাবতো লোকে। রেললাইনের ওপার মানেই বহুদূর। মা বললেন—“কোথায় দেখেছো, ভূত?”

পাপ্পা—“যাদবপুরের ওপাশে যেখানে কলোনি হচ্ছে।”

মা—সেই সেখানে, অতদূরে কী করতে গেছিলে? সঙ্গে কে ছিল?”

প্রশ্ন এড়িয়ে উত্তরে তখনি এক্সপার্ট পাপ্পা—“আমার এক ক্লাসের ছেলের বাড়িতে গিয়েছিলাম। নেমন্তন্ন ছিল।”

মা—“সঙ্গে কে কে ছিল?”

পাপ্পা—“সেই তো মুশকিল। গড়িয়াহাটে গিয়ে দেখি তখনও ক্লাসের আর কেউই আসেনি, এমন সময় যাদবপুরের ৮বি বাস এলো, উঠেই পড়লাম।”

মা—“তারপর?”

পাপ্পা—“তারপর তো বাস টার্মিনাসে নেমে রিকশা নিয়ে তাকে বললাম, ‘পাকড়াশীদের বাড়ি চল।’ তখনই রিকশাওলাটা কি রকম অদ্ভুতভাবে তাকিয়েছিল, কিন্তু তখন তার মানে বুঝিনি। সে খানিকদূর গিয়ে বলল—এবার নেমে যান—এই বাঁশের পুলের ওপারে সাদা বাড়ি। রিকশা পুলে উঠবে না।” সত্যি পাশাপাশি কয়েকটা বাঁশ বাঁধা আছে। গোটা তিনেক হবে। পুল না হাতি। নিচে একটা নোংরা নর্দমা। সাদা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। একতলা। সামনে অনেকটা বাগান। বাস থেকে যখন নামি, তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সূর্য সদ্য সদ্য ডুবেছিল। চারদিক লাল, যেন রক্তরাঙা, কলকাতার মত এমন পাংশু নয় যাদবপুরের সূর্যাস্ত। কিন্তু যখন রিকশা থেকে নামছি, ততক্ষণে লাল রংটা বেগুনী হয়ে কালচে মতন, জামরঙা হয়ে আসছে। সন্ধ্যা নেমে পড়েছে হঠাৎই। সশব্দে ঘিরে ধরেছে চারদিকে ঝিঁঝির ডাক। কোথাও কোনো মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে সাদা বাড়ির গেট ঠেললুম—ক্যাঁ—চ্। শব্দ করে খুললো মর্চেধরা দরজা যেন কেউ অনেককাল খোলে না। মস্ত বাগান—একপাশে বাঁধানো দীঘি—মজে এসেছে।”

—“তারপর?” আমার সঙ্গে, মাও আগ্রহী।

“তারপর? দরজা বন্ধ করলুম।” পাপ্পা অসীম ধৈর্য সহকারে উত্তর দিল।

“ফের কোঁ ওঁ—চ”—

—“তারপর? তারপর?” এত ক্যাঁচকোঁচে আর আমার ধৈর্য ধরছে না।

—“কোনো লোকজন ছিল সে বাড়িতে? পাকড়াশীরা ছিল?” আমি অধৈর্য হলেও মা শান্ত স্বভাবের।

—“ছিল। বারান্দাতেই ছিল। এক বৃদ্ধ বারান্দায় বসে, শূন্যে ঠিক যেন সাঁতার কাটছিলেন।” হাত নেড়ে পাপ্পা ব্রেস্ট স্ট্রোকের মত করে দেখালো। “আমি ভাবলুম, পাগল। আমি ডাকতে থাকি; সুজিত! সুজিত! জবাব নেই। সাঁতার কাটতে কাটতেই বাতাসে কাকে যেন ডেকে বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন—ওগো, সুজিত নেই? ধারেকাছে কেউ ছিল না। এই সময় লক্ষ করলাম বাড়িটাতে সমস্ত জানলা বন্ধ, জানলা দরজা সবই কপাটবন্ধ। যেন বহুকাল কেউ খোলেনি। কিন্তু একপাশের দরজা খুলে শুভ্রকেশী এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন। চমকে উঠে দেখি তিনিও দু হাতে ব্রেস্ট স্ট্রোক দিচ্ছেন। সাঁতার দিতে দিতেই বৃদ্ধা ডাকলেন, “সুজিত! সুজিত! তোর কাছে সেই বন্ধু এসেছে।” কেউ এল না।

আমি তখন একটু একটু পিছোচ্ছি। আর মহিলাটিও দুই হাতে ব্রেস্ট স্ট্রোক দিতে দিতে মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে স্টেপ বাই স্টেপ একটু একটু এগোচ্ছেন—“এসো, এসো। বোসো না, বোসো। এই চেয়ারে বোসো। সুজিত এখুনি এসে পড়বে। পিছোচ্ছো কেন? ভয় কি?” বলে দন্তহীন মুখে শূন্যে সন্তরণরতা বৃদ্ধা এমনই এক রহস্যপূর্ণ হাসি হাসলো যে অতর্কিতে আমি ভয়ে—“সু-জি-ই-ইত্” বলে ডেকে উঠি। সুজিত তক্ষুনি বেরিয়ে এল সেই দরজা দিয়ে। ঠিক সেই একইভাবে দুইহাতে ব্রেস্ট স্ট্রোক দিতে দিতে। মুখে এক বিচিত্র নিঃশব্দ হাসি। “এসেছিস? শুদ্ধশীল? আয় আয়—” বলে দুইহাত নাড়তে নাড়তেই আমার দিকে সুজিত অদ্ভুতভাবে এগিয়ে এল। তখন বাগান অন্ধকার হয়ে গেছে। আমি কোনোরকমে দৌড়োতে দৌড়োতে কী করে যে পুলটা পেরিয়ে এলুম, কিছুই জানি না। জ্ঞান হলে দেখি—”

—“তুই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছিলি পাপুন? কোথাও লাগেনি তো?” এতক্ষণে মাকে একটু বিচলিত দেখলুম। পাপ্পা স্বল্প হেসে মাথা চুলকে বলল, “নাঃ, লাগেনি। জ্ঞান হতে দেখি অনেক লোকজন। তার মধ্যে আসল নরম্যাল সুজিতও আছে। হাতফাত নাড়ছে না।

—“তুই অমন ভয় পেয়ে হঠাৎ পালালি কেন?” আসল সুজিত বলল।

—“তোদের বাড়িতে সবারই অমন শূন্যে ব্রেস্ট স্ট্রোক…?”

—“ওঃ! তা-ই?” সুজিত হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। “এই জন্য? হায়রে! চল বাড়ি চল দাদুঠাকুমা ব্যস্ত হয়ে বসে আছেন তোর জন্য। তোমাকেও ওইরকম ব্রেস্ট স্ট্রোক করতে হবে যাদু—সন্ধেবেলা আমাদের বারান্দাতে বসতে গেলে। দাদু তো শুনবেন না। মশার মধ্যে বসে বসে তাঁর বাগানে সূর্যাস্ত দেখা চাইই। ঘরে চল। ঘরের মধ্যে। ফ্লিট, ধুনো আছে, ভিতরে মশা নেই। জানলাদরজা সব বন্ধ থাকে তো?”

এই গল্প সে বিভিন্ন বার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন লোককে বলেছে—মূলটা অবশ্য এক—যাদবপুরের মশা! সেই যাদবপুরের মশাদের সঙ্গেই দোস্তি করে পাপ্পা প্রায় কুড়ি বছর চাকরিবাকরি করলে?—শেষটা পালিয়ে গেল! ভগবানের হাসির গল্প নয়? আমরা ওর সেই গল্পের মশাদের এখন বেশ চিনি। তারা সবাই টেবিলের নিচে রেগুলারলি ইভনিং ক্লাস করে—সমস্ত সাবজেক্টে। সবারই ফ্রী স্টুডেন্ট শিপ।

এবার শেষ হাসির গল্পটা বলে নিই, সেটা ঘটেছে অক্টোবরের শেষ দুদিনে দিল্লিতে। কলকাতাতেও ঐ দুদিন ভারী মজার ছিল অবশ্য। যুক্তফ্রন্টে বিযুক্ত ফ্রন্টাল অ্যাটাক চলছিল। শক্ৰমিত্র সবাই হেসে আকুল। সে কী হাততালি! কিন্তু ঘরের কথা বাইরে বের করতে আমি যে পছন্দ করি না, সে তো আপনারা সবাই জানেন। বরং আসুন কেন্দ্রচর্চা করি। ঘরের কেচ্ছা ঘরেই থাক।

কী হাসি কী হাসি। দিল্লির বোটক্লাবে দেশের গরিব চাষী, যাদের “কিসান” বলে, তারা এক জনসভা বসালো। তারা চাদরে ৭ দিনের চিঁড়েগুড় বেঁধে এনে ধর্না দিলো দিল্লির মসনদে। তাদের কিছু দাবি আছে। দেশটা নাকি তাদেরই? রাতভর দিনভর ধর্না চলছেই। ৩১শে পর্যন্ত চলবে। গেঁয়ো কিসানগুলো বড্ড একগুঁয়ে গোঁয়ার। কিছুতেই ধর্না তোলে না! তা দিল্লি পুলিস কী করল? হুঁ বাবা, তারাও ঘুঘু! ঠিক পাশেই পুরোদমে সারারাত ইংরিজি পপমিউজিক বাজালো উচ্চগ্রামে। গাঁওয়ার, দেহাতি, কিসানদের কিছু দিল্লির কালচার খাইয়ে দেওয়া তো তাদের কর্তব্য বটে? তাছাড়া যুদ্ধের সময়ে যেমন রেডিওতে হিটলার এবং মিত্রপক্ষ ব্যাজর ব্যাজর শব্দ করে বিপরীত পক্ষের বক্তৃতা চাপা দিত, তেমনি পপ মিউজিকের চমকদার ঝিনচাকে কিসানদের কাঁচা ‘টিকায়েৎ’পনা, একেবারে আনএন্টারটেইনিং ‘ভাইয়ো আর বহেনো’ তেলনুনলকড়ির বক্তৃতা ডুবে গেল। যে যাই বলুক—কেউ কিছু শুনতেই পেল না। কত বুদ্ধি বলুন? এই দিল্লি পুলিসেই কিরণ বেদী নাম্নী এক বেপরোয়া স্ত্রীলোকের অধীনস্থ এক কনস্টেবল জনৈক অসৎ উকীল ভদ্রলোককে চুরি করতে হঠাৎ হাতেনাতে ধরে ফেলে লজ্জায় বাধ্য হয়ে হাতকড়া পরিয়ে ফেলেছিলেন বলে ভদ্রমহিলাকে “শিক্ষা” দিতে কী কাণ্ডটাই না করে দেখালেন দিল্লির আইনজীবীবৃন্দ। তার অর্ধেকও যদি ঐক্যবদ্ধ উৎসাহ তাঁরা দেখাতেন মুসলিম নারী ডিভোর্সবিলের সময়ে! তাহলে বিলটা পাশ হত না। অট্টহাস্যের গল্প নয়? আমাদের উচ্চতম পদস্থ আইনজীবীদের মূল্যবোধ এই! আরো হাসির গল্প চাই?

যা বলে শুরু করেছিলুম হাসির গল্প আর আলাদা করে লিখবো কি সে তো খোদাতাল্লাই লিখছেন হররোজ নেহাৎ কমবখ্ত আমি আর হাসিকান্নার কতটুকুই বা জানি? একটা থেকে আরেকটাকে আলাদাই করতে পারি নে সময়ে সময়ে। কাগজে পড়লুম মায়ের চোখের সামনে সন্তান ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মরে গেল বিসর্জন আর ঈদের আহ্লাদে। হাত পা বাঁধা বাপের চোখের সামনে মেয়ে খোদ পুলিসদের দ্বারা গণধর্ষিত হল, হয়ে মরেই গেল। কেন, না সে গ্রামের হরিজনবংশে জন্মেছে এই কম্পিউটার যুগের ভারতবর্ষে। আমাদের সম্পাদকমশাই বোধহয় অতটা আধুনিক এখনও হননি তাই কম্পিউটার অথবা জ্যোতিষী দেখিয়ে (দুটোই এক) হাসির গল্পের সংখ্যার সময়টা বাছেননি—তবু হাসির গল্প জমা দেবার যোগ্য সময় এটাই। এদিকে পাখাও খোলা। বেশ হিম পড়ছে—এদিকে পাখাও খোলা। ঠিক আবহাওয়া। ঋতু বদলের এই স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বোম্বাইয়ের বিলাসবহুল ক্লাব থেকে খাবার প্লেট কেড়ে নিয়ে ম্যানেজার রাস্তার বের করে দেন—কাকে? না মকবুল ফিদা হুসেনকে। সোনিয়া দেবী শুনেছি নাকি খুব ছবি-টবি কেনেন। (কিনে, আবার বেচেছেন কি না সেটা শুনিনি।) তিনি কী বলেছেন ক্লাবটিকে? কেউ কিছু করেছেন কি এ নিয়ে? হুসেনের নাকি দোষ ছিল একটিই। ভারতের ৮০% মানুষের মতই তাঁর শ্রীচরণযুগলে জুতো ছিল না। তবে আমার প্রশ্ন, তিনি তাহলে ওই ক্লাবে কী করছিলেন? দেশের ৮০% মানুষ তো ঐ ক্লাবে যায় বলে জানি না। গায়ে দামি পোশাক পরে—পায়ে জুতো না পরলেই বুঝি আমজনতার ‘জীবন-সংগ্রামে’ শামিল হওয়া হয়? এটাও তো হাসির গল্প। বেদম হাসির।

যুবক শুদ্ধশীলের অকালপ্রয়াণ যেন আমার মাথার মধ্যে একটা প্রচণ্ড বোমা ফাটিয়ে হঠাৎ এক আলোর মায়া শেকলের খেলা শুরু করে দিয়েছে। টেনে আনছে বিস্মৃতিছিন্ন করে মুখের পর মুখ। হাসির গল্প? এত প্রিয় মুখ ছিল, অথচ এখন মনেও পড়ে না!—কী? ক’দিন মনে থাকবে এত স্নেহের শুদ্ধশীলকে? এটা বুঝি হাসির কথা নয়? তিন বছর আগে শুভ চলে গেল, শুভ বসু, আমার মৃত পুত্রের বয়সী। পাপ্পা তাকে মনে পড়িয়ে দিল। মনে পড়িয়ে দিল একদিকে ডেভিড ম্যাক্কাচিয়ানকে, আর ফাদার আঁতোয়ানকে অন্যদিকে যোগব্রতকে আর তুষার রায়কে। তুষার শংকরকে। শংকর বিমলকে বিমল দীপেনকে, দীপেন কেয়াকে, কেয়া অজিতেশকে। মনে পড়ে গেল কবি সুব্রত চক্রবর্তীকে, অরুণ সরকারকে। সমর সেন। সমরেশ বসু। মনে পড়ছে কমল মজুমদারকে। সন্তোষকুমার ঘোষকে। অশোককুমার সরকারকেও। সেই মুহূর্তটা। কী ভয়ানক।

সব পাপ্পা নতুন করে মনে পড়িয়ে দিল। বুদ্ধদেবকে, সুধীন্দ্রনাথকে, বিষ্ণু দেকে। মনে পড়ল প্রেমেন্দ্র মিত্রকে। পরপর আমরা হারিয়ে ফেলেছি মানুষের পর মানুষ। মুছে যাচ্ছে মুখের পর মুখ। বাবা বেঁচে থাকলে আজ বাবা একশো বছরেরটি হতেন। ক’দিনের জন্যই বা আসি? তার মধ্যেই এত উচ্চাশা, এত ঈর্ষা, এত ক্রোধ, এত ব্যর্থতার বেদনা। হাসির গল্প? “সব কুঁড়ি মোর ফুটে ওঠে তোমার হাসির ইশারাতে” সেই চিরকেলে হাসির গল্পের নায়ক কে? বলুন তো? সেই শেষ হাসির ইশারাটি অনেককাল আগেই যুধিষ্ঠির দিয়ে গেছেন তাঁর বকরূপী পিতাকে—অহণ্যহণি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দিরম। শেষাঃ স্থিরমিচ্ছন্তি। কিমাশ্চর্মতঃ পরম?”

‘তবুও শান্তি তবু আনন্দ অনন্ত জাগে।’ এই তো অতঃপর আশ্চর্য। এই তো আসল হাসির গল্পটা।

সরসগল্প সংখ্যা, ‘দেশ’ ১৯৮৮

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *