হাসতে মোদের মানা

হাসতে মোদের মানা

বাঙালি মেয়ের কৌতুকবোধ নেই, তাদের রসিকতাজ্ঞান নেই, এ কথা বললে কোনও শালি শুনবেন না। আর সমস্ত বাঙালি জামাইবাবু সেধে তাঁদের সাক্ষী হবেন। অথচ রসসাহিত্যে বাঙালি লেখিকা ক’জন? সত্যি বলতে কি, বাঙালি কেন, সারা বিশ্বেই এই প্রশ্নটির একই চেহারা—রসসাহিত্যে মেয়েদের আনাগোনাই বড় কম। কিন্তু এমনটা কেন হবে? বাঙালি মেয়েদের মোটে শ্লেষ ব্যঙ্গ বক্রোক্তির ক্ষমতাই নেই, একথা একবার বাঙালি স্বামীদের বলেই দেখুন না? ঠিকঠাক জবাব পেয়ে যাবেন। অথচ মেয়েরা না লেখেন রঙ্গ কৌতুকের কাহিনী, না ব্যঙ্গবিদ্রূপ। এই তো এত ভাল ভাল মেয়ে চিত্রশিল্পী আছেন জগৎজুড়ে এবং আছেন স্বনামধন্যা একাধিক বাঙালিনীও। ভাস্কর্যেও তো অসামান্যা বাঙালিনী দু’ একজনের নাম প্রত্যেকেরই মনে আসছে। অথচ ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী মেয়ে? কারও নাম মনে পড়ছে কি? মেয়ে কার্টুনিস্ট সারা পৃথিবীতেই অতি দুর্লভ প্রাণী। কিন্তু কেন? এমনটা কেন হয়?

ডাবলিউ এইচ অডেন ১৯৭২-এ মাইকেল নিউম্যানকে লিখেছিলেন, “কোনও নারীই নন্দনবিদ্যায় পটু নন। কোনও নারী কখনও আজগুবি ছড়া লেখেননি। জগতে পুরুষেরই উৎসাহ রঙ্গলীলায়, মেয়েরা বাস্তবধর্মী। তুমি যদি একটা মজার গল্প শোনাও, কেবল একজন মেয়েই তোমায় প্রশ্ন করবে, এটা কি সত্যি ঘটনা?

অড়েন একা নন, সারা পৃথিবী জুড়েই মেয়েদের সম্পর্কে এইরকম একটা পুরুষ মানুষের মনগড়া ধারণা ছড়িয়ে আছে। মেয়েরা ঠাট্টা তামাসা সইতে পারে না, রেগে যায় (পুরুষেরা কিন্তু পারে, কেউ কখ্খনও রেগে যায় না!) তাদের সেন্স অব হিউমার নেই। ‘সেন্স অব হিউমার’ মানে হচ্ছে, অন্যে তোমায় নিয়ে রঙ্গ রস করবে, তুমি মৃদু হাস্য দিয়ে তাদের তাচ্ছিল্য দেখাবে। বা মহা আহ্লাদে হেসে হেসে সেই রসিকতা উপভোগ করবে। কিন্তু তুমি যদি অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করতে চাও, হে নারী, তার আগে দু বার ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে নিও। বাসরঘরে বন্দী অন্য লোকের নতুন বর ছাড়া জগতে কেউই সেটা সহজে সহ্য করবে না কিন্তু। কেনই বা করবে? তুমি তোমার সীমানা ছাড়িয়ে যাবে, আর অন্যে তা মেনে নেবে?

সব সমাজেরই কিছু বাঁধাধরা প্রত্যাশা আছে। তার ধরন পুরুষের কাছে একরকম, আর নারীর কাছে আর একরকম। বাঙালি সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। আমার একটা ব্যাখ্যা আছে, কেন যে বাঙালি মেয়েরা এতকাল ধরে এত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যসৃষ্টি করে গেছেন কিন্তু বিশেষ রঙ্গরসের চর্চা করেননি। কেন তাঁরা ছবি আঁকেন অথচ কার্টুন আঁকেন না। আমার ধারণাটি আমি সবিনয়ে পেশ করি।

বাঙালি কি অবাঙালি, ভারতীয় কি অভারতীয় প্রায় সব ‘সভ্য’ সমাজেই পিতৃতন্ত্র চালু, আর এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের অত্যন্ত জরুরি একটি ভূমিকা আছে। যে ভূমিকার সঙ্গে ঠাট্টাতামাশা, রঙ্গরসিকতা, বিশেষত ব্যঙ্গবিদ্রূপ তো একেবারেই খাপ খায় না। জাতিধর্ম নির্বিচারে মেয়েদের কাছে আমাদের সমাজের প্রত্যাশাই এই যে, তাঁরা তাঁদের জীবনে ও কর্মে সমাজের প্রচলিত প্রথাগুলি, স্বীকৃত মূল্যবোধগুলি প্রতিষ্ঠিত করবেন। প্রাচীন ঐতিহ্যগুলিকে ধরে রাখা, চালু সংস্কৃতির আইনকানুন মেনে তার চরিত্র বজায় রাখা, ‘প্রগতি’র নামে সমাজের ‘ভাঙন’ রোধ করে সমাজের রীতিনীতিকে সংরক্ষণ করা, এ সব মেয়েদেরই পবিত্র কর্তব্য। যুগ যুগ ধরে সনাতন মূল্যবোধের ও সামাজিক বিধিবিধানের প্রধান আধার হিসেবে মেয়েরাই ব্যবহৃত হয়ে এসেছেন। কোনও প্রশ্ন না করে প্রচলিত প্রথার পুনরাবৃত্তি করাই আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক, আমাদের স্বধর্ম বলেই আমাদের মানানো হয়েছে। আমরাও দিব্যি তা মেনে নিয়েছি। বিবেকের ওপরে সমাজকে ধরে রাখার এই পুণ্যময় বোঝা নিয়ে আমরা মেয়েরা জীবনযাপন করি। এই সমাজের বিধিনিষেধের নীচে নিজেরাই সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত হলেও কেমন করেই বা আমরা সেই সমাজকে উপহাস করি? কেমন করেই বা তার দোষ ধরি? আমরা না সমাজের ধাত্রী? আমাদের আচারে, আচরণে, মহত্ত্বে, ত্যাগে, আমরাই তো সমাজের চিরাচরিত চেহারা অনড় রাখব। এমনটাই যেন হবার কথা। উট্‌কো পুরুষমানুষের মতো সমাজের রীতিনীতি নিয়ে হাস্যপরিহাস করা কি আমাদের মানায়? সমাজ সংসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করা কি মেয়েমানুষকে সাজে? সমাজের ত্রুটিবিচ্যুতির দিকে আড়চোখে চাওয়াটাও মেয়েদের কাছে প্রত্যাশিত নয়। সমাজ-বিধানের প্রতি প্রশ্ন তোলা নয়, শ্রদ্ধাহীনতা নয়, তাকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানানোই আমাদের কর্তব্য। ত্রুটির দিকে চোখ বুজে থেকে, প্রচলিত ধারাকেই আমরা স্থিতি দেব, কদাচ আপত্তি তুলে স্থির জলে ঢিল ফেলব না, ঢেউ তুলব না, তবেই না আমরা আদর্শ বাঙালি নারী? হাস্যকৌতুক করতে হলে তো ঢিল ছুড়তে হয়।

তবে হ্যাঁ, এ কথা ভাবা ঠিক নয় যে বৃহত্তর হাস্যকৌতুকের জগৎ থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ দিলে চলবে কেন? পুরুষের ব্যঙ্গবিদ্রূপের বলি হবে কে? উপহাসের পাত্রী হিসেবেই তো আমরা মেয়েরা হাস্যকৌতুকের রাজ্যের আধখানা জুড়ে রাজত্ব করছি। কি দেশে কি বিদেশে, ডিভেলপড বা ডিভেলপিং যেমনই হোক না যে দেশের অর্থনীতি, অনর্থের নীতিটা সর্বত্র একই। প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় সব ভুবনেই দেখি নারীকে পুরুষের রঙ্গরসের উপলক্ষ হতে হয়। বরং বোধ করি ভারতবর্ষেই বিলেত আমেরিকার চেয়ে এটার চল তুলনায় একটু কমতি। তবে ভারতবর্ষের মধ্যে, উত্তর দক্ষিণে পূর্ব পশ্চিমে খুব একটা তফাত যে নেই, তা বোঝা যাবে মেয়েদের নিয়ে যে সব প্রবাদ প্রবচন চালু আছে, সেগুলোর তুলনা করলেই। সর্বত্রই ব্যঙ্গবিদ্রূপের লক্ষ্য হিসেবে নারী অগ্রগণ্যা। মেয়েরা হয় পুরুষের কামের লক্ষ্যবস্তু নয়তো কৌতুকের, এটা সব দেশের পুরুষরা শৈশবেই শিখে যান। এবং শিখে যাই সঙ্গে সঙ্গে আমরা, মেয়েরাও। পুরুষ নারী কেউই এটাকে প্রশ্ন করি না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম বলে ধরে নিই। কিন্তু এ নিয়মটা তো প্রকৃতির তৈরি নয়। নিয়মটা সমাজের তৈরি। মানুষের তৈরি। অথাৎ পুরুষ মানুষের। এবং মেয়েদের নিঃশব্দে মেনে নেওয়ায়, দিনে দিনে জোরালো হয়ে ওঠা। পশ্চিমী দেশে শাশুড়িকে নিয়ে জামাইদের ঠাট্টাতামাশায় অসতী স্ত্রীর অদৃশ্য শিং গজানো স্বামীকে নিয়ে রঙ্গ রসিকতায় যে মনোভাবের প্রকাশ, তাতে মেয়েদের প্রতি অসম্মান ছাড়া আর কোনও ‘মজা’ই নেই। মেয়েদের নিয়ে রসিকতাতে মেয়েদের নির্বোধ, বা অসৎ, বেহিসেবি, বা বোঝাস্বরূপ, অকর্মণ্য বা স্বার্থপর বা রূপসর্বস্ব, গুণহীন, এই সবই বলা হয়ে থাকে। আমাদের দুর্ভাগ্য, যে আমরা মেয়েরাও অনেক সময় এইসব পুরুষের তৈরি মূল্যবোধগুলিকে পরিপূর্ণ আত্মসাৎ করে নিই। নিজেদের দিকে নিজের মতো করে চাইতে, আলাদাভাবে চিন্তা করতে ভুলে যাই। তখন আমরাও পুরুষমানুষের ধরনেই মেয়েদের নিয়ে রঙ্গব্যঙ্গ ঠাট্টাবিদ্রূপ করি, যেন নিজের মেয়ে নই। তাদের চেয়ে উচ্চশ্রেণীর অন্য কোনও জীব। মেয়েরা মেয়েদের নিয়ে ঠাট্টা করবে সে তো খুব ভাল কথা, কিন্তু তার ঢংটা পুরুষদের চেয়ে আলাদা হওয়াই উচিত। কিন্তু বেদনাদায়ক হলেও স্বীকার করতে হবে যে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে পুরুষের ঢং অনুসরণ করে নিজেদের উপহাস করার মধ্যে ‘মজা’র চেয়ে ‘অসম্মান’ আছে বেশি।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আমরা মেয়েরা না ভেবেচিন্তে প্রচলিত পুরুষশাসিত মূল্যবোধগুলিকে সমাজসিদ্ধ ও সর্বসম্মত বলে ধরে নিয়ে, অনেক সময়ে নিজেদের লক্ষ করে নিজেরাই ঢিল ছুঁড়ে বসি। এমনকি শ্ৰীমতী লীলা মজুমদারের মতো এমন একজন তুলনাহীন তীক্ষ্ণমেধাবিনী, সংবেদনশীলা রসশিল্পীও (সুরসিকা বাঙালিনী লেখিকা বলতে তো লীলা মজুমদার ও আশাপুর্ণা দেবীকেই মনে পড়ে? কবিতায় অপরাজিতা দেবী, আর মিষ্টি প্রণয়লীলার ঠাট্টায় প্রতিভা বসুকে) এই ধরনের সামাজিক অভ্যাসজনিত ভুল করে বসেন। নির্মল কৌতুকবোধে, আজগুবি কল্পনায় যাঁর সত্যিই তুলনা মেলে না (স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষেই) তিনিও যখন এই ফাঁদে পড়ে যান তখনই টের পাই কী ভয়ানক এই ফাঁস। একটি বইতে তাঁর রেডিওর চাকরির প্রসঙ্গে তিনি সহকর্মিণী চাকুরে মেয়েদের কিছু বিদঘুটে কাণ্ডজ্ঞানহীন কার্যকলাপ নিয়ে রসিকতা করেছেন, কিন্তু নিজের আচরণ তাঁদের চেয়ে আলাদা (অর্থাৎ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন) বলে বর্ণনা করেছেন। ঠিক এই ধরনের রসিকতাই ট্রামেবাসে পুরুষরা করে থাকে চাকুরে মেয়েদের নিয়ে। চাকুরে মেয়েদের নিজেদের চোখে সহকর্মিণীদের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ অন্য দৃষ্টি আশা করা যায়। এই উপহাসটুকু আমাকে যথেষ্ট অবাক করলেও, ঈশ্বরের দয়ায় লীলা মজুমদারের সর্বাঙ্গীন অবদানের তুলনায় এটুকু তুচ্ছ বিচ্যুতি কিছুই নয়। তাঁর উচ্ছল, প্রাণবন্ত, মানবিক, স্নেহশীল, অনুভূতিপ্রবণ রচনার প্রাচুর্যের মধ্যে এটি হারিয়ে যাবে। কিন্তু আমরা এতেই যেন আয়নায় দেখতে পাই চিনতে পারি নিজেদের মুখ। বাংলায় তাঁর মতো ধীমতী নারী ক’জন? অথচ তিনিও তো এমনি ভুল করেন। তবে আর আমরা করব না কেন?

আরও একটা কথা। লীলা মজুমদারের মতো উঁচু দরের রসশিল্পী বাংলায় স্ত্রীপুরুষ মিলিয়ে কত ক’টি? অথচ তাঁকে মহিলা সাহিত্যিক হিসেবেই ধরা হয়, আর ধরা হয় শিশু সাহিত্যিক বলে। রসসাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয় না। অথচ তাঁর রসসৃষ্টি শুধুই শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সের পাঠককেই তা মোহিত করে। সেই স্বীকৃতি কি তিনি পেয়েছেন? কেন পাননি?

কেন না এই হল মেয়েদের কাছে আমাদের বাঁধা প্রত্যাশার চেহারা। এর কাছে এইটুকু, ওর কাছে সেইটুকু। কোনও লেখিকার একটি বিশিষ্ট দিকেই আলো ফেলি আমরা, অন্যান্য দিকগুলিকে অবহেলা করি। মেয়েরা কবি হবেন, শিশুসাহিত্যিক হবেন, কিংবা লিখবেন ঘরকন্নার উপন্যাস, অথবা প্রেমপ্রণয়ের মিঠে গপ্পো। যদি বা তাঁরা হাত দিয়ে ফেলেন রাজনীতিতে, কি সমালোচনায়, প্রবন্ধে তক্ষুনি তাঁরা নিজেরাও নিজেদের ‘মহিলা’ লেখক বলতে চান না, আর সমালোচকরাও তাঁদের বলেন, “ঠিক পুরুষের মতোই এঁর বলিষ্ঠ লেখনী”। পুরুষ কেন রে বাবা? মেয়েদের বুঝি বলিষ্ঠ লেখনী থাকতে নেই? আশাপূর্ণা কি এই ঘোর মনুষ্যজীবন নিয়ে দুর্বল লেখনীতে লেখেন? তা হলে চার্লস ডিকেন্সও তাই। এই কঠোর মহাকালকে নিয়ে, এই জটিল মানবচরিত্র নিয়ে লিখতে বুঝি বলিষ্ঠ লেখনী লাগে না? কেবল রাজনীতি নিয়ে গল্প ফাঁদতেই কলমের বলবত্তার প্রয়োজন? আর রাজনীতি যেমন পুরুষের নীতি, পুরুষের ক্ষেত্র বলেই চিহ্নিত, সাহিত্যে রঙ্গরসও তাই। বর্তমান সময়ের নাগরিক মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের ভাঙাগড়ার সবচেয়ে কুশলী কলাকার আশাপূর্ণাকে আমরা শরৎ, রবীন্দ্র, অকাদেমি, জ্ঞানপীঠ, যাবতীয় সাহিত্য পুরস্কার সবই তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি, তবুও তাঁকে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল সাহ্লাদে নির্লজ্জ উপেক্ষা করে চলেছেন, “ঘরকন্নার খুচরো গল্প” বলে। আরে, ঘরকন্নাটা নেই কার? আশাপূর্ণার তীক্ষ্ণ আয়রনি, বুদ্ধি-উজ্জ্বল কৌতুক, মানবচরিত্রকে নিয়ে মার্জিত রুচিসম্মত ব্যঙ্গবিদ্রুপ, নেহাত পরিহাসচ্ছলে প্রতীয়মান বাস্তবতার উর্ধ্বে দৃষ্টি তুলে জীবনের গভীরতর সত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার অমূল্য ক্ষমতাকে আমরা কী সহজেই না অবহেলা করি! তাঁর ওপরে যে হায়, না আছে কাফকা কামুর ছাপ, না সোজাসুজি তুলনা চলে তাঁর সঙ্গে মার্কোয়েজ কি আচিবির, না বোরহেস কি কুন্দেরার। অথচ বাংলায় তিন বাঁড়ুজ্যের পরেই যদি নাম করতে হয় কারুর, তিনি আশাপূর্ণা। নেহাত বাঙালি মেয়ে হয়ে জন্মেছেন, পুড়বে মেয়ে উড়বে ছাই, তবে মেয়ের গুণ গাই। অশীতিপূর্ণা আশাপূর্ণার জীবৎকালে তাঁর সাহিত্য মূল্যের সম্যক যাচাই ‘লিখিত’ভাবে হবে কি না কে জানে? বাংলা সাহিত্যে ব্যঙ্গ কৌতুকের রচয়িতা হিসেবে তিনিও অবহেলিত—লীলা মজুমদারের পাশেই। লীলা মজুমদারের নির্মল কৌতুকই বেশি, আশাপূর্ণার নারী চরিত্রগুলি তীব্র ব্যঙ্গনিপুণা। কবিতায় যেমন ব্যঙ্গনিপুণা ছিলেন অপরাজিতা। সেই নিয়ে তাঁকে নিন্দেও শুনতে হয়েছে প্রচুর। স্বয়ং শরৎচন্দ্রও অপরাজিতার রঙ্গরসিকতাকে ‘অশ্লীল’ মনে করেছেন। মেয়ে হয়ে এ আবার কি বেআক্কেলেপনা? নির্মল হাস্যকৌতুকের দিকে আমাদের সমাজবিধানে তবুও মেয়েদের নরম হাতটি বাড়ানো চলে, কিন্তু ব্যঙ্গবিদ্রুপ? তীব্র শ্লেষ? না, ও সব একেবারেই মেয়েদের ‘মেয়েলি’ থাকতে দেয় না। ও সব ‘পুরুষালি’ কঠোর অভ্যেস।

জীবনের মতোই সাহিত্যেও ক্ষেত্র বিভাজন করা আছে, কোনটা নারীর, কোনটা পুরুষের। মানবিক ভাবাবেগ নিয়ে মাথা ঘামাবে মেয়েরা, তারা লিখবে প্রেমের কবিতা, শোকের গীতি, প্রশস্তি গাথা, হালকা প্রেমের গল্প। নইলে ঘরকন্নার জট পাকানো হাঁড়ি হেঁশেলের কাহিনী। অর্থাৎ রূপকথা লিখবে তারা, কি ছোটদের, কি বড়দের। আর সত্যি বড়দের জন্য সত্যি সিরিয়াস ভাবনাচিন্তার ব্যাপার স্যাপার, যাতে দর্শন, জীবনদর্শন, এ সব এসে পড়ছে, আর হাস্যপরিহাস রঙ্গরস (তাতেও যে দর্শন, জীবনদর্শন ঢুকে পড়ে) এই সব বুদ্ধিনির্ভর উন্নততর মননশীলতার ক্ষেত্র তো পুরুষেরই হবার কথা। জীবনের যেখানটিতে দুর্বলতা, অসংলগ্নতা, ত্রুটি বিচ্যুতির ফাঁক সেইখানে মোটে নজর দেবার কথাই নয় আমাদের মেয়েদের। কী কাজ তাহার সাথে? তার সাথে? মিথ্যাকে উপহাসে উড়িয়ে দেওয়ার কঠোর কর্ম মেয়েদের জন্য নয়। কেন না ওটা বিপজ্জনক ব্যাপার, ওতে আছে ছদ্মবেশী ক্রোধ। আছে সমাজের ত্রুটি ধরার চেষ্টা। আছে হাসির অস্ত্রে সত্যকে অনাবৃত করার বুদ্ধির খেলা। এ সব অধিকার আবার মেয়েরা কবে কোথায় পেয়েছে? মেয়েদের অধিকার বিলাপে, প্রণয়ে, স্বপ্নে, আতঙ্কে, শ্লেষে নয়। তারা তো চালিত হয় বুদ্ধির দ্বারা নয়, অন্তঃশীলা এক বোধের ধারায়। ইন্টেলেক্টে নয় ইনস্টিংক্টেই মেয়েদের স্বতঃসিদ্ধ অধিকার। কিন্তু রঙ্গব্যঙ্গ ইনস্টিংক্টের ব্যাপার নয়, বুদ্ধির খেলা। রসসাহিত্যিক সম্পূর্ণ বুদ্ধি নির্ভর স্বাধীনচেতা শিল্পী।

সত্যি বলতে কি, আমাদের সমাজে স্ত্রী লেখক ও পুরুষ লেখককে কোনও কালেই এক চোখে দেখা হত না, এখনও হয় না। রসসাহিত্য বিশেষ করে এমনই এক ক্ষেত্র যেখানে স্ত্রী পুরুষের কাছে পাঠকের আলাদা আলাদা প্রত্যাশা। ভাষার ওপরেও মেয়ে ও পুরুষের অধিকারের ধরন আলাদা। যে ভাষা পুরুষের লেখনীতে দিব্যি স্বাভাবিক, নারীর লেখনীতে সেইটাই ঘোর অশালীন দেখাতে পারে। যে রসিকতাটি পুরুষের পক্ষে মানানসই, সেই রসিকতাই নারীর পক্ষে রীতিমত আপত্তিকর। এমনিতেই স্ত্রী ও পুরুষ যে যাই লিখুন না কেন, তাতে পাঠকের দৃষ্টি নিরপেক্ষ থাকে না, নারীর লেখার বেলায় সমাজের একটা আলাদা নজরদারি থাকেই। পুরুষের আছে ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’, নারীর কিন্তু নেই! ধরুন, কবি শক্তি চাটুজ্যে যেমন ‘কবি জীবন’ যাপন করেন, আমিও সেই জীবনটি যাপন করে দেখি তো? না, তারপর তাঁর ছেলেমেয়ের আর আমার ছেলেমেয়ের ইস্কুলে একরকম অবস্থা হবে না। বাঙালি মধ্যবিত্ত সংসারে দু রকমের হিসেব চলে। বাবাদের যা মানায়, মায়েদের তা মানায় না। সে মা কবি হলেই বা কি! ঠিক একই নিয়মে বাংলায় একজন মেয়ে লেখকের কাছে মধ্যবিত্ত পাঠকের আশা শোভনতা নম্রতা, সামাজিক, নৈতিক, বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা, এক কথায় ঠিক সেই সব বস্তুর প্রতি বিশ্বাস, একটি তরুণ পুরুষ লিখতে বসেই যে মূল্যবোধকে সাধারণভাবে চ্যালেঞ্জ করেন।

এইগুলিই আবার জীবনের সেই সব দিক, একজন রসসাহিত্যিক যাকে অদৃশ্য ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন, সত্যের খাতিরে। বিদ্রোহের সাতরঙা ধ্বজা না উড়িয়েও। ব্যঙ্গবিদ্রুপের সঙ্গে ভদ্রতা নম্রতা, শালীনতা শোভনতার একটা অন্তর্গত বিরোধ আছে, দুয়ের মিলন সাধান সহজ নয়। প্রায়ই একটির জন্য অন্যটির মায়া ত্যাগ করতে হয়। নারী পুরুষের বাক স্বাধীনতা সমান নয়। আমাদের ভাষাগত শোভনতার মানদণ্ডও এক নয়। ছাত্রবয়সে একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমার মস্ত এক শিক্ষা হয়ে গিয়েছিল। নিতান্ত দুর্ভাগ্যবশত আমাকে বলতে হচ্ছিল স্পুটনিকের বিরুদ্ধে। পৃথিবীর প্রথম মহাকাশযান, যাকে নিয়ে সারা বিশ্ব তখন উত্তেজনায় মত্ত, প্রশংসায় সহস্রমুখ। অগত্যা সমস্ত বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা ভিন্ন আমার কোনও পন্থা ছিল না। আমি জানতাম একজন পুরুষের মুখে যা শুনতে খুবই মজাদার, মোটেই অমার্জিত শোনায় না, তাই-ই একজন মেয়ের মুখে অতি কুরুচিপূর্ণ এবং একটুও মজাদার নয়, এমন মনে হতেই পারে। একই শব্দ একজন ছাত্রী উচ্চারণ করলে সেটা ত্রুটি, কিন্তু ছাত্র উচ্চারণ করলে ত্রুটি নয়। কেন না কানেই ধরা পড়ে না। স্পুটনিকের যাত্রী ছিল লাইকা নামে একটি মেয়ে কুকুর। আমি ‘ডেড বিচ’ শব্দটি ব্যবহার করে বলেছিলাম, কোটি কোটি ডলার খরচ করে একটি মৃত কুক্কুরীকে হঠাৎ সশরীরে স্বর্গে পাঠানোর কী দরকার ছিল? তাও তো সে মর্তে ফিরেই এল! ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্ট! পরবর্তী বক্তাটি উঠে গুরুগম্ভীরভাবে বললেন মৃত কুক্কুরীকে স্বর্গে পাঠানোটা মোটেই স্পুটনিকের উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি আমার বক্তব্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খণ্ডন করে জানালেন বৈজ্ঞানিক তথ্যাদির অনুসন্ধানই স্পুটনিকের ব্যোম অভিযানের উদ্দেশ্য! প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণায় জানা গেল আমি ‘ডিসকোয়ালিফায়েড’ কেন না একটা মন্দ শব্দ (বিচ্) ব্যবহার করেছি পাবলিকে। মহিলা হয়ে প্রকাশ্যে অশোভন ভাষা ব্যবহার অমার্জনীয়। মজা এই যে, আমার পরবর্তী সিরিয়াস পুরুষ বক্তাটিও ওই শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন বিচারকটির কানে কিন্তু তা ধাক্কা মারেনি। পুরুষের মুখে শোনা বলেই সম্ভবত। ‘ডেড ডগ’ কিংবা ‘ডেড ফিমেল ডগ’ বললেও ঠিক হত, ‘বিচ্’ বলাটা না কি ঠিক হয়নি। আমার বিশ্বাস ওই শুধু একটা শব্দই নয় আমার পুরো বক্তব্যটার মধ্যেই ছিল আজগুবি চিন্তা ও শ্রদ্ধার অভাব। যে লঘু রস—বড় ব্যাপারকে ছোট করে মজা করার মনোভাব আমার মধ্যে কাজ করছিল, সেটিকেই রক্ষণশীল বিচারকটি মেনে নিতে পারেননি। আমার মুখে যে শব্দ ব্যবহার তাঁর সামাজিক সম্ভ্রমবোধে আঘাত করেছে, আমার পরবর্তী তরুণ বক্তার মুখেও সেই একই শব্দ তো তাঁকে বিব্রত করেনি?

রসসাহিত্যিক জগতে অকারণ অহংভাবের ফুলকো বেলুনে ছুঁচ ফুটিয়ে হাওয়া বের করে দেন। মিথ্যের রহস্যময়তাকে অট্টহাস্যের ইট মেরে ঘুচিয়ে সত্যকে উন্মোচন করেন।

পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের কাজ ঠিক এর বিপরীত। ধ্বংসাত্মক নয়, তা রক্ষণশীল। আমাদের কাজ ছেঁড়াখোঁড়া টুটাফুটা রীতিনীতিকে সেলাই ফোঁড়াই দিয়ে রিপু করে তালি মেরে চালু রাখা। মিথ্যের হাঁড়ির মুখে সরা চাপা দিয়ে তাকে রহস্যে লুকিয়ে রাখা। শতছিন্ন থাকে যেন তেন প্রকারেণ অসীম সহ্যশক্তির দ্বারা চিরায়ত করা। এইখানে বাঙালি মেয়ের সামাজিক দায়িত্ব আর রসসাহিত্যিকের সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে বিরোধ এসে যাচ্ছে। সমাজ সংশোধকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি সাধারণের চেয়ে উন্নতমানের বুদ্ধিমত্তা ও মননশীলতার প্রত্যাশা রাখে। সেটা যেহেতু নারীদের কাছে প্রত্যাশিত নয়, সেইহেতু নারীকে কার্টুনে কিংবা রসসাহিত্যে দেখা যায় না। শুধু বাংলায় কেন, পৃথিবীর প্রায় কোথাও নয়। আমরা নিজেরাই নিজেদের এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে না নিলে, ‘অন্যে পরে আমাদের ‘মুক্তি’ উপহার এনে দেবে না। আমাদের মেয়েদের মধ্যে সচেতন আত্মচিন্তার প্রয়োজন। নতুন করে নিজেদের দেখতে শিখতে হবে। নিজেদের কাছেই নিজেদের মূল্য না থাকলে অন্যের কাছে মূল্য আশা করব কী করে?

সমাজের ধারণা তা হলে মোটামুটি এইরকম: যেহেতু মেয়েরা নিজেরাই হালকা পলকা, তাদের খুব একটা তলিয়ে ভাববার মতো ওজনই নেই, সুতরাং তারা লিখবে পলকা বিষয়বস্তু নিয়ে গুরুগম্ভীর গদ্য পদ্য, গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে হালকা চালে কলম চালানোর কম্মোটি তাদের নয়। গম্ভীর বিষয়ে হালকা সুরে কথা বলবার অধিকার শুধু মগজপ্রধান পুরুষের। আর হালকা বিষয়ে সিরিয়াস সুরে লেখার কথা আবেগপ্রধান নারীর। মোটামুটি এমন একটা অলিখিত প্রত্যাশার হিসেব বাঙালির মনে মনে তৈরি। বাঙালি কেন, জগৎ জুড়ে উদার সুরে এই আনন্দ গানই বাজছে। মেয়েরা লিখছেন প্রেমের কবিতা, ভূতের গল্প, রোমান্স, আর ডরোটি মেয়ার্স, আগাথা ক্রিস্টির মতো প্রচণ্ড মেধাবিনীরা নেহাত এসে ঢুকে পড়েছিলেন, তাই। নতুবা রহস্য রোমাঞ্চের অঞ্চলপ্রধান এলাকাতেও মেয়েরা ঢুকতেন কি না সন্দেহ। বাঙালি মেয়ে তো খুব একটা ঢোকেনওনি।

সমাজে নারীর স্থান এমনই নির্দিষ্ট, যে নিজেকে নিয়ে নিজের মত করে হাসতেও আমরা শিখিনি। নিজেকে যে আকর্ষণীয় করে রাখতে হবেই। নম্রমধুর শ্রীময়ী (জ্বালাময়ী হলেও শ্রী চাই) করে রাখতেই হবে। সং সাজলে ক্লাউনিং করলে তো চলবে না। লোকে হাসবে যে! লোকের ‘সম্মান’ চাই যে। হায়, সম্ভ্রমসর্বস্ব বাঙালিনী।

তাই আমরা লায়ন টেমার হতে রাজি। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শূন্যে ঝুলন দুলতে রাজি, রাজি সিংহের খাঁচায় মাথা গলাতে। কিন্তু হাস্যকর সং সেজে ইচ্ছে করে লোক হাসাতে রাজি নই। সার্কাসে মেয়ে ক্লাউন দেখা যায় না, কিন্তু প্রাণ হাতে করে ট্রাপিজ খেলতে দেখা যায়। মেয়ে লায়ন টেমার বহু। রাজ্ঞী সম্রাজ্ঞী ভারতের ইতিহাসে অনেক, কিন্তু রাজসভার বিদূষকের ভূমিকায়, সাহিত্যেও কখনও নারীকে দেখা যায়নি। আমার তো মনে হয় আজও বাঙালি মেয়ের পক্ষে নিজেকে ভারতের শাসনকর্ত্রীর ভূমিকায় চিন্তা করা বরং তুলনায় সহজ, নিজেকে বিদূষক হিসেবে ভাববার চেয়ে।

আনন্দবাজার ১ বৈশাখ, ১৯৯০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *