কবিতা, ফুটবল, মাছ ও মারুতি
১ ॥ কবিতা বনিতা চৈব সুখদা স্বয়মাগতা
স্বয়মাগতা না হলে সুখ দেয় না নাকি। না কবিতা, না বনিতা। সুখ নেয় কে? কেন, পাঠক? কিংবা প্রেমিক? কিন্তু তাই কি? কবিতা, তুমি প্রথমে কার? হে স্বয়মাগতা, তুমি কার কাছে আবির্ভূতা হও? ধন্য করো কাকে? কৃতকৃতার্থ করে দাও, আপ্লুত, অভিভূত করে দাও, কাকে? কবিকেই তো! কবিতার অসহায় ক্রীতদাস, চিরবন্দী সেবক, পূজারী, অতৃপ্ত প্রেমিক, সে তো কবিই! কবির সঙ্গে কাব্যলক্ষ্মীর সেই প্রেমযুদ্ধ থেকেই একটি একটি খণ্ড কবিতার জন্ম। সেই সার্থক প্রণয়লীলাই কাব্যের সৃজনলীলা। কবির সঙ্গে কবিতার প্রেম, শব্দ আর সংকেতের লীলাবৈচিত্র্যে। প্রশ্ন উঠতে পারে, কবি এবং কবিতার এই একান্ত নিবিড়, সঘন, তন্নিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে পাঠকমশাইয়ের স্থানটা তবে কোথায়?
সহৃদয় পাঠক হলেন কবির হৃদয়সঙ্গী, তার অন্তরঙ্গ সখা। পাঠক নির্জনের সাথী, কবির গোপন কথার শ্রোতা, তার দুঃখসুখের অংশভাক্। কবিতা, তা সে গীতিকবিতাই হোক আর নাট্যকাব্যই হোক, কোনো না কোনো একভাবে তা কবির অস্বাক্ষরিত দিনলিপি। আজকের তৃতীয় বিশ্বের কবিতা, কৃষ্ণসাহিত্য, নারীসাহিত্য, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য, যা কিছুই বুকের রক্ত দিয়ে লেখা। তা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং নৈর্ব্যক্তিক। ব্যক্তিগত উচ্চারণে একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতার রূপলেখা। ছ’ লাইনের স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার মধ্যেও যেমন ছ’শো লাইনের নৈর্ব্যক্তিক কাব্যনাট্যেও তেমনি কবির পূর্ণ ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস, ভূগোল ধরা পড়ে যায়। তার রক্তচাপের ওঠাপড়া, তার হৃৎস্পন্দনের গতি, তার জীবনীশক্তি ভাইট্যালক্যাপাসিটি তার বদ্হজম আর কোষ্ঠবদ্ধতা আছে কিনা, প্রায় সবই ধরা পড়ে যায় কবিতার মোহিনী আড়ালের জালের নিচে। এলিয়ট কি পাউণ্ড যতই নৈর্ব্যক্তিকতার ধ্বজা ওড়ান কবিতায়, তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যে তার আজ মূল্য কতটুকু ভাবা দরকার। সুকান্ত কেন এলিয়টের মতো লিখবেন? এড্রিয়েন রিচ্ কেন লিখবেন পাউন্ডের মত? যে-কোনও শিল্পের ব্যক্তিত্বের নির্বিকল্প ছাপ ধরে রাখে অবিকল টিপ-সইয়ের মতো। মডার্নিস্ট যত যাই বলুক, আমাদের পক্ষে কবিতা কবির আত্মপ্রকৃতি। কিন্তু কবিতা লেখার টেবিলের কবি আর মাছের বাজারে কি র্যাশনের লাইনে দাঁড়ানো কবি ভিন্ন ব্যক্তি। কেবল র্যাশনকার্ডের নামটুকুই এক।
পূজোর ঘরে ব্রহ্মান্ডবিস্মৃত ক্ষান্তপিসি আর কলতলায় পাড়া-জাগানো ক্ষান্তপিসি যেমন দু’জন ব্যক্তি, কবিও তাই। স্বয়মাগতা কবিতা যখন কবির পিছন থেকে এসে চোখ টিপে ধরে, কবি তার গায়ে আলতো হাতটি রাখেন আর চকিতে চিনে নেন। তারপরে আরম্ভ খেলা। কবিতাকে সাজানোর, কবিতাকে নিয়ে কবির ভালোবাসার খেলা। স্বয়মাগতাতেই তো কবির তৃপ্তি নেই? যেমন বনিতার বেলায় তেমনি কবিতার বেলাতেও। আগমনেই প্রণয়ের শেষ নয়, সেই তো মাত্র শুরু। তারপরে তুমুল যুদ্ধ। তারপর উত্তুঙ্গ পর্বতে আরোহণ, তারপর ডুবুরির পোশাক পরে গহীন গাঙে ডুব দেওয়া। অক্সিজেন ফুরিয়ে আসবে, তবেই না তৈরি হবে কবিতা। কবিতার সর্ব অঙ্গে যতক্ষণ কবির পরিশ্রমের স্বেদবিন্দুর লবণটুকু এসে না মিশছে ততক্ষণ কাব্যের লাবণ্য আসে না। তার শ্রীসৌষ্ঠব সম্পূর্ণতা পায় না। এবং মুগ্ধ হন না পাঠকও। বনিতাও যেমন। তিনি স্বয়মাগতা হলে দয়িতের সুখ বটে কিন্তু প্রণয়লীলাটি পূর্ণ সম্ভোগ করতে হলে বনিতারও সুখটুকু চাই। আর তাকে সেই সুখের স্বাদ দেবার জন্য প্রণয়ীর যে আয়াস, সেইটুকুই তার প্রেম। অনেকখানি তেপান্তর মাঠ জুড়তে হয় না প্রেমের অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে, চাই কেবল হাইফেনের মতো একটুখানি অত্যাবশ্যক চিহ্ন, যত্নের। আয়াসের। সচেতন আকুলতার প্রমাণটুকু থাকা চাই। কবিতাই বলল আর বনিতাই বলো, প্রকৃত সান্নিধ্য পেতে হলে কিছু স্বেদ দিতেই হবে তার বিনিময় মূল্য। কিছু ভাবনা, কিছু কামনা, কিছু আর্তি, কিছু শ্রম। তবেই শিল্পের সার্থকতা।
ছেলেবেলাতে কবিতার সঙ্গে বনিতার এই তুল্যমূল্যটা আমাকে খুব উল্টোপাল্টা ভাবাতো। এতদিনে বোধহয় একটা মানে বুঝেছি। বুঝেছি, যে পাশাপাশি এই যে জীবন আর শিল্পের আসন দুটি পাতা এতে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধেরই একটি জরুরি দিক উদ্ঘাটিত হয়েছে। স্ত্রীলোক এই সমাজের ব্যাকরণে কর্তা নয়, কর্ম। যেমন শিল্প। সুখদা, স্বয়মাগতা, এই সব শব্দ ব্যবহারেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে শিল্পে অধিকার কেবলমাত্র পুরুষেরই, যেমন নারীতেও। কবিতা মনোজগতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাঁর পূজা নারী করবে কেমন করে? নারীর আবার মনোজগৎ আছে নাকি? নারীর তো আছে কেবল শরীরী অস্তিত্ব, সেও অন্যের সুখের আধার হিসেবে। যেমন বনিতা তেমনি কবিতাও কেবল পুরুষেরই প্রণয়বস্তু, বিশেষত বঙ্গসন্তানের। কবিতা নাকি বঙ্গজ পুরুষের সমীপে সর্বদাই স্বয়মাগতা। বাঙালি জাত-কবি। তা প্রণয়িনী যখন স্বেচ্ছায় ধরা দেন তার চেয়ে লোভনীয় মিলনমুহূর্ত আর কীই বা হতে পারে? পুরুষের পক্ষে?
[হায়। বনিতার নিজের পক্ষে সুখদ যে ঠিক কী, সেটাকে মহাজনবৃন্দ শ্লোকরচনার যোগ্য বিষয়বস্তু বলেই বিবেচনা করেননি।
২ ॥ শুধু কবিতার জন্য তুমি নারী
বাঙালি নাকি জাত-কবি। জন্মকবি। চিরকালের কবি। যেমন বাঙালি চিরবিপ্লবী। চিরপ্রেমিক। স্পষ্টতই এখানে শুধুমাত্র পুরুষের কথা হচ্ছে। যার কাছে কবিতা বনিতার মতো। [‘মেয়েরা আবার কবি কিসের?’ এই বিষয়ে কবি শাক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অতিবিজ্ঞাপিত মন্তব্যটি কিন্তু বাংলার সংখ্যাগুরু পুরুষের অভিমত—অন্যেরা ‘শতং ভাবো মা বদ’ নীতি নেন—শক্তি কবিসুলভ অবিমৃষ্যকারিতায় (নাকি সরলতায়? নাকি দম্ভে?) অধিকাংশ পুরুষের মনের কু-কথাটি প্রকাশ্যে উচ্চারণ করে ফেলে হাতে M.C.P.-র জন্য নির্দিষ্ট হাতকড়াটি পরেছেন ] সত্যি বলতে কি আমরা যখন বলি: প্রত্যেকটি বাঙালি মনে মনে কবি, তখন কি আমরা মেয়েদের কথা মনে রাখি? ষোলো বছরে প্রেমে পড়েনি এমন বঙ্গসন্তান যেমন পাওয়া শক্ত ষোলো বছরে একটাও কবিতা লেখেনি এমন বঙ্গসন্তানও নাকি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বলাবাহুল্য, এখানে যাদের কথা ভাবা হচ্ছে তারা সবাই পুরুষ। মেয়েরা তো কবি নয়, তারা কবির প্রেরণা। তারা কবিতার মালমশলা? “কী লেখে সে? কবিতা? নাকি কবিতা রচনা করে তাকে?” তাকে তো রচনা করে কবিতাই। অন্তত বাঙালি পুরুষের হৃদয় তাই বলে। উচ্চকিত হৃদয় বাঙালি পুরুষের দেহেমনে যেই যৌবনচাঞ্চল্য আসে, কোকিলের কুহু কুহু এবং মলয় বাতাসের উহুউহু অমনি সে শুনতে পায়। এবং তোড়ে কবিতার স্বয়মাগমনের চোটে তার অঙ্ক খাতাগুলি ফুরিয়ে যেতে থাকে। বাঙালি-অবাঙালি সকলকেই একযোগে বলতে শুনেছি, কবিতা লেখাটা বাঙালি (পুরুষের?) স্বভাবগত। কিন্তু বাঙালি মেয়ের কি ষোলো বছর বয়স হয় না? কোকিলের ডাক কি তার কানে পৌঁছয় না? মলয় বাতাস কি তারও ত্বক্কে রোমাঞ্চিত করে না? কবিতা তবে কেমনতর সঙ্গিনী? সে কি কেবলই পুরুষের নর্মসঙ্গিনী হয়? নারীর মর্মসঙ্গিনী হয় না? হয় বৈকি! বাল্যে, কৈশোরে, যৌবনে, বার্ধক্যে ও লুকিয়ে লুকিয়ে খাতা ভর্তি করে কবিতা লিখে ফেলেছে অজস্র মেয়ে। জগতে কেউই কোনোদিনই সেগুলির মুখ দেখেনি। সেইসব কবিতা সেই মেয়ের ব্যক্তিগত স্ত্রীধন, তার নিজস্ব সম্পত্তি। পুরুষ শুধু লিখেই ক্ষান্ত নয়, যতক্ষণ না লেখাটি আর কাউকে দেখাচ্ছে, অন্য কোনো দ্বিতীয় মত যতক্ষণ না সংগ্রহ করতে পারছে, তার স্বস্তি নেই। অথচ সারা বিশ্ব জুড়ে বহু মেয়েই, পুরুষশাসিত এই জগতে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তিকেই লেখাগুলি না দেখিয়ে দিনের পর দিন টিনের বাক্সতে তালা মেরে রেখে দিয়ে শেষ দিনে চলে যেতে পারে। এমন উদাহরণ জগৎ জুড়ে ভুরি ভুরি রয়েছে। হয়তো সেই মেয়েটিই প্রকৃত তন্নিষ্ঠ শিল্পী যার অর্ন্তলীনতা স্বনির্ভর। যার দরকার নেই বড়দের পিঠ চাপড়ানিতে, সমবয়সীর বাহাদুরিতে, কনিষ্ঠের আরাধনায়। যার কবিতার পাঠক শুধু সেই, একাকী। ছাপার হরফে নিজের নামটি দেখবার বালখিল্য মোহ তার নেই, নেই দ্বিতীয় নয়নের মুগ্ধ চাহনির লোভ। এমন অনেক নাম-না-জানা মেয়ে কবি আছেন আমাদের বাঙালি ঘরে ঘরে। এই লেখাটি চোখে পড়লে যাঁরা অবাক হয়ে ভাববেন, “কী করে নবনীতা জানলো আমার কথা?” মফস্বলের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে যেসব গ্রামের কিশোরীর কবিতা আজ ছাপা হয়, তাদের মধ্যে অনেকেই রীতিমতো সামনে এসে দাঁড়াবে হয়তো একদিন,—অথচ আরও ত্রিশ বছর আগে জন্মালে তাদের অধিকাংশই কোনওদিনই মুদ্রিত হবার কথা ভাবত না। কিন্তু লিখতো ঠিকই। নিজের খাতায়।
এ সত্ত্বেও বাংলা ভাষার সবচেয়ে জোরালো জায়গাগুলির মধ্যে একটি এর প্রতিষ্ঠিত নারী কবির গুচ্ছ। যুগে যুগে মেয়েরা ভালো কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে সম্মান অর্জন করেছে। আমাদের অহংকার: বাংলায় এই মুহূর্তেও আছেন কবিতা, বিজয়া, দেবারতির মতো শক্তিমতী কবিরা, ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষার যে-সৌভাগ্য নেই। নেই বাংলাদেশেরও। গদ্যের ভারতীয় মেয়েরা অসাধারণ গুরুত্ব অর্জন করেছেন অথচ আধুনিক কবিতায় তাঁদের প্রয়াস তুলনায় অল্প। বাংলা কবিতাই সগৌরব ব্যতিক্রম।
তথাপি, কি আশ্চর্য, ‘বাঙালি জাতকবি’ যখন বলি আমরা তখন মেয়েদের কথা মনে রাখি না। অথচ একটা “জাতীয় চরিত্র” তো স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই প্রযোজ্য হবে? ধরুন “বাঙালি মাছ-ভাত খায়” এক্ষেত্রে কথাটা স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই প্রয়োগ করা চলবে, কিন্তু “বাঙালি কবিতা ভালোবাসে” বললেই কেউ কেউ বলতে চাইবেন “মেয়েরা বাদে”। মননশীলতার পাড়ায় যে পুরুষেরই একচেটিয়া অধিকার। কবিতার বাগর্থের দেশে নারীর প্রবেশ বিনা পাসপোর্টে!
অথচ বাঙালিই কবিকে চিরকালই ‘মেয়েলি’ বলে কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গ, কিঞ্চিৎ অপমান দিয়ে এসেছে। ‘মেয়েলি’ মানে একটু কমকম মানুষ। মানুষ তো পুরুষমানুষ। সূক্ষ্ম রসবোধ সুকুমার রুচি ও স্পর্শকাতরতাকে দুর্বলতার সঙ্গে ও অন্তর্মুখিনতাকে মেয়েলি পর্দানশীনতার সঙ্গে, অন্যপক্ষে স্থূলতা, রুক্ষতা, কঠোরতার সঙ্গে শক্তিকে এবং বহির্মুখিনতার সঙ্গে পৌরুষকে মিলিয়ে ফেলার এই ভ্রান্ত অভ্যাস একা বাঙালিরই নয়, সারা পৃথিবীরই আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তো ‘মেয়েলি’ এই বিশেষণে কবিদের অহংকার হওয়া উচিত ছিল। হয় না কেন? হয় না কেননা এই ধারণার অর্থ এই নয় যে পুরুষ নিজেকে ভাবে স্থূলবুদ্ধি, কর্কশরুচি বা বহির্মুখী। বরং বিপরীতটাই প্রচলিত ধারণায় সর্বত্র। নারী যখন কবির ‘প্রেরণা’ ভিন্ন অন্য কোনও ভূমিকায়, সে তখন মননহীন, শারীরবৃত্তের মধ্যে বন্দী, জৈবপ্রকৃতির দাস, তার সৌন্দর্য মাত্র যৌবনেই আবদ্ধ। তার পরিণতি নেই, পচন আছে। নারী তুলনীয় পুষ্পের সঙ্গে, বৃক্ষের সঙ্গে নয়। তার আত্মা নেই, ইন্দ্রিয় আছে। চিন্তা নেই। সজ্জা আছে। এই সব অসঙ্গত ধ্যানধারণা নিয়ে যতকাল আমরা নিজেদের দিগভ্রান্ত করে রাখবো, ততকালই আমরা চিরকালীন শিল্প সত্যের নাগাল পাব না।
৩ ॥ শুধু কবিতার জন্য?
কিন্তু অধিকাংশ বাঙালি পুরুষের আত্মার শান্তি প্রাণের আনন্দ বোধহয় সত্যিই ততক্ষণ নেই যতক্ষণ না একটি কবিতার বই বেরুচ্ছে। একটি আস্ত মস্ত বিশুদ্ধ বাঙালি রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা, একচ্ছত্র কর্ণধার মহান রাষ্ট্রপতি হয়েও জনাব এরশাদের তৃপ্তি নেই যতক্ষণ না “কবি” উপাধি সম্মানটি পাচ্ছেন। বাঙালির কি সেখানেই প্রকৃত, সাফল্য, প্রকৃত পূর্ণতা? বুদ্ধিজীব্যতার শেষ প্রমাণ? ঠিক এরশাদের মতো উচ্চগ্রামের কবিকর্মী আমাদের রাজনীতি ক্ষেত্রে এখনও আবির্ভূত হননি বটে তবে প্রিয় দাসমুন্সির উপন্যাস আমরা পড়েছি, কবিতাও পড়েছি তাঁর। এবারে কবিতাগ্রন্থ বেরিয়েছে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের। আগেই নানা জায়গায় পড়েছি অপরাজিতা গোপ্পীর কবিতা। সিদ্ধার্থশংকর, জ্যোতি বসু বা যতীন চক্রবর্তীর কবিতা এখনও চোখে পড়েনি, কিন্তু পড়তে কতোক্ষণ? রবীন্দ্রনাথ সত্তর বছরে তুলি ধরে তুলকালাম করে ছেড়েছেন। জ্যোতিবাবু যতীনবাবুর কবি যশোলাভের দিন এখনও যায়নি। (বার্মা গিয়ে পাইলট প্রধানমন্ত্রী যদি শায়েরী লিখতে পারেন, বাঙালি না হয়েই!) পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী কবিতা থেকেই তো মিছিলে গেলেন। এককালে নিজেই উৎকৃষ্ট কবিতা লিখেছেন, এবং এখনও যত্রতত্র অন্যের কবিতা উদ্ধৃত করা ওঁর মহৎ মুদ্রাদোষ। রামমোহন, বিবেকানন্দ, শ্রীঅরবিন্দ, কোন্ মহান্ বঙ্গসন্তান কবিতা লেখেননি? “মনে কর শেষের সেদিন ভয়ংকর” থেকে “বহুরূপে সম্মুখে তোমার”—পর্যন্ত? একমাত্র সুভাষচন্দ্রের কাব্যাভ্যাসের খবরটা এখনও জানি না।
কিন্তু ধরুন কেউ কি রাষ্ট্রপতি পদের বদলে রাষ্ট্রকবি হবেন? যদি কবি এরশাদকে বলা হয়, শামসুর রাহমান, আল মহমুদ, এঁরা সবাই তুচ্ছ, আপনিই বাংলাদেশের কবিপ্রধান। আজ থেকে রাষ্ট্রকবি হলেন, শুধু তার বদলে রাষ্ট্রপতিত্বটা ছেড়ে দিন। তিনি কি রাজি হবেন? উল্টোদিকে অনেক কবির কথাই ভাবতে পারি দুই বাংলাতে—যাঁদের “আর আপনার একটাও কবিতা ছাপা হবে না। কিন্তু আজ থেকে আপনাকে রাষ্ট্রপতি করে দেওয়া হলো”, বললে তাঁদের মোটেই আপত্তি থাকবে না। গোপনে বলেই ফেলি, প্রকৃতপক্ষে বাঙালি বোধহয় ততটা কবিপ্রকৃতির নয়, যতটা সে নিজেকে ভাবতে ভালবাসে।
৪ ॥ আ ল্যান্ড মেড ফর পোয়ট্রি
সত্যি বলতে কি, অনেক ভেবেচিন্তে, ‘বাঙালি মাত্রেই কবি’ এই প্রবাদ বাক্যটিকে এখন অন্তত আমার কেমন যেন মনে হয় কৃত্রিম প্রণালীতে প্রস্তুত। কিছু সম্পাদক, সমালোচক, সাহিত্যকারের অনুচ্চারিত ষড়যন্ত্রের ফল। দরিদ্র, দুর্বল, অক্ষম বঙ্গসন্তানের আত্মতুষ্টির জন্য সাবধানে সৃষ্টি করা একটি নিরীহ আত্মপ্রতিমা কখন যেন চালু করে দেওয়া হয়েছিল এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে, এবং লাউ-গড়-গড় করে তা চলতেই লেগেছে। আমাদের না হয় অর্থ নেই, মনন তো আছে? না হয় গায়ে জোর নেই। কবিত্ব তো আছে? বাঙালি কবিমানুষ, বাঙালি আত্মভোলা। বাঙালির চরিত্র নান্দনিক, সুকুমার। সে জাত-কবি—এটি চতুর বাঙালির সচেতন প্রয়াসে রটনা-করা একটি স্লোগান।
আমার এই বক্তব্য শুনে এক পণ্ডিত বন্ধু বললেন: কথাটা বাঙালিদের বানানো না হয়ে সাহেবদের বানানোও হওয়া অসম্ভব নয়। বলেই উদ্ধৃতি দিলেন; এডওয়ার্ড টমসন ১৯৩৬-এ টাইম্স লিটেরারি সাপ্লিমেন্টে একটি প্রবন্ধে বাংলা, মারাঠি এবং তামিল কবিতা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “Bengal: a land made for poetry: new India’s hopes & fears.” বুদ্ধদেব বসু নিজেও তাঁর একটি প্রবন্ধে সগৌরবে এই মন্তব্যটি উদ্ধৃত করেছিলেন, এটিই নাকি ছিল টমসন সাহেবের প্রবন্ধের শিরোনাম! প্রবন্ধটিতে টমসন লিখেছেন:
“Bengal is a land made for poetry. …Its people live with the sense of boundless horizons, the word Diganta which may usually be translated ‘horizon’ is rarely long away from Bangali poetry …the language, too, has poetry in it, a wealth of beautiful words still close to the primitive life that created them, words often onomatopocic and always expressive and musical…”
হায় রে, বাঙালির জীবন থেকে সেই নিঃসীম দিগন্ত কবেই হারিয়ে গিয়েছে। আছে শুধু শব্দঝংকার, শব্দঝরনা, শব্দযন্ত্রণা। এক ভাষাতাত্ত্বিক বন্ধু বলেছিলেন, একমাত্র বাংলা ভাষাতেই এত বেশি স্বরান্তক শব্দ আছে, এবং ক্রিয়াপদে এত বেশি ল-য়ের ব্যবহার, তাছাড়া দন্ত্যবর্ণ যেমন অসংখ্য, তেমনি অগুণতি আনুনাসিক বর্ণও। এমনধারা নরমসরম ভাষার মধুর না হয়ে উপায় আছে? ইওরোপে যে ভাষা দটির মিষ্টি বলে খ্যাতি আছে সেই দুটিরই প্রধান গুণগুলি বাংলা ভাষায় পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, ইতালীয় ভাষার গুণ, তাতে চ-বর্গ ও ত-বর্গের আধিপত্য আছে, ল-এর ব্যবহার খুব বেশি, এবং স্বরান্ত (বিশেষত ‘ও’-দিয়ে শেষ) শব্দসংখ্যা বহু। এর প্রত্যেকটিই বাংলা ভাষাতেও বিদ্যমান। পরন্তু ফরাসি ভাষার গুণপনাটি অথাৎ মধুর অনুনাসিকতাও আছে বাংলাতে। এমন তিলোত্তমা আর এদেশের কোন্ ভাষাটি? আমরি বাংলা ভাষা! এই ভাষাতে কবির কারখানা হবে না তো কি?
আমার অবশ্য ধারণা বাঙালির কবি-প্রতিভা বাঙালির প্রেম-প্রতিভা ও বিপ্লব-প্রতিভারই স্বগোত্রীয়। অর্থাৎ এক কথায় বাঙালি জাত-রোমান্টিক, তার নানা বিচিত্র প্রকাশ আছে, কবিতায়, প্রণয়ে, বিপ্লবে, সাইকেলে, ভূপর্যটনে, বাঙালির সার্কাস তৈরিতে। ব্যাপারটা আসলে একই। রোমান্টিক বঙ্গসন্তান তার কল্পনার রাশ টানে না। টমসনের ভাষায় তার যে অনাদি ‘দিগন্ত’!
আমার প্রিয় এক পশ্চাৎপক্ব কিশোরী এর একটা ‘শুষ্কং কাষ্ঠম্’ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বঙ্গজননী-ই বাঙালিকে এভাবে নষ্ট করেছেন। এককালে নামমাত্র আয়াসেই তার জমিতে সোনা ফলেছে, নদীতে, পুকুরে মাছেরও অভাব ছিল না, ন্যূনতম শ্রমে ভরণপোষণ চলে যেত। এই গাঙ্গেয় উপত্যকার প্রশ্রয়েই বঙ্গসন্তান ক্রমশ আলস্যপরায়ণ হয়ে কবি-কবি, প্রেমিক-প্রেমিক হয়ে উঠেছে। এখন আর সে সোনার বাংলা না-থাকলে কি হবে স্বভাব যায় না মলে! সে খাটতে না পেরে বিপ্লব করে। হাতে অতিরিক্ত সময় ছিল, সে মাথা খাটিয়েছে। আগেভাগেই ইংরিজি শিক্ষাটি পেয়ে, সে আগে আগেই আধুনিকমনস্ক হয়েছে আর সারা ভারতবর্ষও তাকে “আহা! আহা!” বলে প্রশংসা করে নষ্ট করেছে। বাঙালি বাংলা মায়ের তথা ভারতমাতার ‘স্পয়েল্ট চাইল্ড’,—প্রভুটি নিজেই এখন নষ্ট হয়ে যাবার পথে। বুদ্ধিজীবী বলে নিজেকে প্রশ্রয় দেওয়া বাঙালির বড়ই আহ্লাদে বদ্ স্বভাব!
শুনেটুনে মনে হচ্ছে স্বপ্নদ্রষ্টা বাঙালি আসলে আল্সেই! ব্যবসা করতেও তো স্বপ্নই লাগে? শ্রমও লাগে কিন্তু! আর হিসেব। বাঙালির ঝামেলাটা সেইখানে। বাঙালির চরিত্রে হিসেবটা কম ছিল বলেই হয়তো কবিতাটা ছিল বেশি? আজও বাঙালির একগুঁয়ে বামপন্থী সরকার বজায় রেখে চলার মধ্যে একটা কবিতা আছে না? বাঙালি আজকের সুবিধেটুকু না দেখে আরো দূরের সত্য খোঁজে বোধহয় এখনও। ছোট হিসেবটা কষতে পারে না, একটা বড় হিসেব কি কোথাও ঠিক রাখে? আ ল্যান্ড মেড ফর পোয়ট্রি?
৫ ॥ যৌবনে ভেবেছিলাম কবিতাই প্রেম, কিংবা কামনার উপ্চে পড়া
কবির কারখানাই বলুন আর কবিতার কারখানাই বলুন, তার নাম লিটল ম্যাগাজিন। মাস স্কেলে কবিতা উৎপাদন এবং কবি উৎপাদন এই ছোটো পত্রিকার পাতায় পাতায়। প্রায় সব বইমনস্ক বাঙালির যৌবনই একটা না একটা ছোট পত্রিকাকে একবার না একবার ছুঁয়ে গেছে। বুদ্ধদেব বসু যদিও পরে মত বদল করেছিলেন তবু তাঁর মনে হয়েছিল কবিতা বুঝি যৌবনেরই জৈব আনুষঙ্গিক। এলিয়ট সাহেব ভেবেছিলেন উলটো—তাঁর মনে হয়েছিল পঁচিশ পার হয়েও যাঁর কলমে কবিতা স্বয়মাগতা তিনিই প্রকৃত কবি, পরিণত কবি। তৎপূর্বে কবি-অকবি সকলেই একটু আধটু কবিতাচর্চা করেন। অর্থাৎ? বাঙালির একারই বদভ্যাস নয় কামনার উপচে পড়াকে কবিতার বাঁধুনি দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা। তাহলে তো সাহেবরাও কবির জাত। ঠিক বাঙালির মতই।
যতো ছোটো পত্রিকা বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয় ভারতবর্ষের আর কোনো ভাষাতে এত বেশি লিটল ম্যাগাজিন নেই। এগুলির প্রধান উপজীব্য, কবিতা। ভারতবর্ষের আর কোনো ভাষাতে এত অধিক সংখ্যক কবিতা ছাপা হয় বলে আমি জানি না। তরুণ বাঙালি হৃদয়ের দুর্দমনীয় নেশা এই কাব্যচর্চা। বুক থেকে কবিতা এবং বুক পকেট থেকে চাঁদা—এই দুটি বস্তু সাপ্লাই দিয়ে তরুণ কবিরা অক্লান্ত পরিশ্রমে রুগ্ন সন্তানের মতো যত্নে লিটল ম্যাগাজিনগুলিকে সেবা করে বাঁচিয়ে রাখেন। গ্রামেগঞ্জে মফস্বল শহরের আনাচে কানাচে রীতিমত জমজমাট লিটল ম্যাগাজিনের গুচ্ছ গুচ্ছ কবিদল বেড়ে উঠছেন। অনেকদিন বাংলা কবিতা (এবং গদ্যও) কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল, এখন কিন্তু সেটা বলা চলে না। বাংলা কবিতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে কবিতা-বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই। আমাদের বাড়িতে, পঞ্চাশ বছর আগের এক ডাকসাইটে মহিলা কবি বলেন, প্রায় দশ বছর ধরেই বলছেন—বাংলা ভাষাতে একটি কবিতা-নিরোধ প্রকল্প অত্যাবশক। বাংলায় হঠাৎ পোয়ট্রি এক্সপ্লোশান ঘটেছে নাকি, যা সংস্কৃতির পক্ষে পপুলেশন এক্সপ্লোশানের মতই ভয়াবহ। কাব্যজননীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ফলন বেশি, স্বাদ কম। বছর দশ-বারো আগে একটি ছোটো কবিতা পত্রিকায় এক তরুণ ঔপন্যাসিক মন্তব্য করেছিলেন, বাংলায় কবি যতো বাড়ছে কবিতা ততো বাড়ছে না। একথা এখনও অপ্রমাণিত হয়নি। যতো কবিতা পত্রিকা বাড়ছে কবি সম্পাদকও ততো বাড়ছেন, কিন্তু কবিতা কই? ভালো কবিতা চোখে পড়ছে কই? ক’জন নতুন কবি এসেছেন পাঠকের হৃদয়মান লুট করে নিতে? এই গুরুতর সমস্যাটি নিয়ে তরুণ ও প্রবীণ প্রতিটি কবিরই দুশ্চিন্তা করা কর্তব্য। কবিতার পাঠকরা এ নিয়ে দুশ্চিন্তিত কিন্তু বহুদিনই। তাঁরা বাংলা কবিতা পড়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। বাঙালির নেশা এখন বিদেশী কবিতার বই কেনা। কবি বাড়ছে, কবিতা বাড়ছে না, এই কারণেই কি কবিতাপিপাসুর চোখ এখন অন্য নদীর ঘাটে? এখন বাঙালিকে বুদ্ধিজীবী হতে গেলে বাংলা কবিতা না পড়লেও চলে। দু’দশক আগেও তা দুঃসহ স্পর্ধা বলে পরিগণিত হতো।
৬ ॥ কিন্তু অন্য ধারণা সম্প্রতি
এক সময়ে আমি সত্যিই ভাবতুম বাঙালির কবিতাপ্রীতি ব্যাপারটি অসামান্য এক জাতীয় সম্পদবিশেষ, —রাজটীকার মতো, প্রতি বাঙালি ললাটে যে শুভচিহ্নটি নিয়েই পৃথিবীতে আসে।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই ক্রমশ আমার ধারণাটা পালটে যেতে শুরু করেছে। শুরু করেছে এই সব লিটল ম্যাগাজিন পড়তে পড়তেই। “যৌবনে ভেবেছিলাম কবিতাই প্রেম…কিন্তু অন্য ধারণা সম্প্রতি।” বুদ্ধদেব বসুর “অন্য ধারণা” আর আমার “অন্য” ধারণা দুটি ঠিক এক নয় অবিশ্যি এক্ষেত্রে—কিন্তু আজ যৌবনের কবিতাও যে। কবিতার প্রতি প্রেমমাত্র নয়, সেটা বোধহয় টের পাচ্ছি।
আজকের লিটল ম্যাগাজিনগুলি খুব মন দিয়ে পড়ে যা বুঝেছি, কিছু তরুণ-তরুণী আছেন আজও সেই ভূতগ্রস্ত কবিতাপাগল, কবিতা প্রেমিক, পাবলিসিটিতে নয়, শিল্প-প্রেমেই যাঁদের কবিতার পূর্ণতা। তাঁরাই ভবিষ্যৎ বাংলা সাহিত্যের ভরসা, যদিও তাঁরা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়। অর কিছু আছেন যাঁদের “দিকে চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই।” এঁদেরই জন্যে কি বাঙালির ‘সবাই-কবি’ নাম? এঁরা অলস নন, অতিমাত্রায় শ্রমশীল, কিন্তু সব প্রয়াস খরচ হয়ে যাচ্ছে স্বনামপ্রচারে। শিল্প অনুশীলনের জন্য আর বাকি থাকছে না বিশেষ সময়। পাড়ার মাঠে খেলতে নামবার আগেই এঁরা যে ওয়ার্ল্ডকাপে খেলতে ব্যাকুল। বাংলাতে লিখতে না লিখতেই হিন্দি-ইংরিজি অনুবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কবিযশের প্রতি এঁদের শীতল, অধীর ব্যবসায়িক দৃষ্টি। অথচ আপন সৃষ্টির প্রতি যত্নবান নন। কবিতা যে বড় ধৈর্যের ধন। এভাবে কি হয়? (তবে, “বলা যায় না ঠিক জায়গায় ঠিক মুরুব্বি ধরতে পারলে হয়তো আকাদমি পুরস্কারটা জুটেও যেতে পারে।” এ লোভ এখন সকলের। গদ্যে যখন সম্ভব হয়েছে, পদ্যে কেন হবে না?)
কবিতার ওপরতলায় উঠতে যে মই লাগে না দরকার শুধু রক্তপাতের, এটা তাঁদের বিশ্বাস হয় না। তাঁরা মনে করেন যুগ পালটাচ্ছে কবির স্ট্র্যাটেজিও পালটানো দরকার। তরুণতরদের মধ্যে এই উল্টো হিসেব দেখে মন বড়ো খারাপ হয়ে যায়। এমন তো কথা ছিল না? কেন এমন হল?
কলকাতা বইমেলা এক অত্যাশ্চর্য বঙ্গীয় অঘটন যা প্রতিবছর ঘটে একথা সারা ভারতে শুনি। “কবিতা মেলাও” হয় এই কলকাতাতেই, “বাৎসরিক কবিতা উৎসবের” জন্মস্থানও এই পশ্চিমবঙ্গ। কবীর-কবি সুভাষ বলেছেন কলকাতাতে “কবিতা-দিবস” উদ্যাপনের প্রসঙ্গ উঠলেও নিশ্চয় কারুর আপত্তি হবে না। কেন, ‘কবিতা-দিবস’ তত উদ্যাপিত হয়ই কলকাতাতে! পঁচিশে বৈশাখ সকালবেলায় জোড়াসাঁকোতে আর রবীন্দ্রসদনে তবে কী হয়? অতো লিটল ম্যাগাজিন? ওতো কবিতার প্রতি বাঙালির প্রেমনিবেদন ভিন্ন আর কিছু নয়! এই ভালোবাসাতে খাদ নেই। বাঙালি জাত-কবি হোক না হোক, পঁচিশে বৈশাখ সকালবেলা বাঙালি যুবক-যুবতীরা কবিতা-সকাল উদ্যাপন করেন। কোনো একজন কবিকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি, এত ব্যক্তিগত ভালোবাসাবাসি, এ আর কোনো জাতে ঘটেছে কি? শেক্সপীয়ার কিংবা পুশকিন কারুর ভাগ্যেই জুটেছে কি? সুব্রহ্মনিয়ম ভারতী কিংবা ইকবালের ভাগ্যেও জোটেনি কিন্তু।
কবি তো কোনোকালেই শুধু পটে লিখা নন, তিনি চিরকালই আলো হাতে চলেছেন আঁধারের যাত্রী, সুদূর নীহারিকার পথে। সেই অরণ্যের অন্ধকারে পাতালরাজ্যে পথভ্রষ্ট কবি দান্তের হাত ধরেছিলেন যখন ছায়াতনু মহাকবি ভার্জিল, তখন থেকে। নাকি ক্রৌঞ্চমিথুনের শোকে বাল্মীকি মুনির মুখনিঃসৃত ছন্দোবদ্ধ বাক্য থেকেই? সেই সত্য যা রচিবে তুমি। কাব্যের সত্যই জীবনের সত্য। যা ঘটনা-দুর্ঘটনার আপাত সত্যকে ছাড়িয়ে উঠে চিরজীবী হয়। কবি চিরদিন আলোর পাখি, সত্যের ঘোষক।
বাঙালি কবির জাত? বাঙালি কি সত্য খোঁজে? নাকি সে সত্যবিমুখ। কল্পনাবিলাসী? কবিত্ব কি কল্পনাবিলাসের অন্য নাম, আর সত্যের সন্ধানকে বলা হয় বিজ্ঞান? কল্পনা কি সত্যাদর্শন নয়? বিজ্ঞানেও কি কল্পনা চাই না? “কবিতা কল্পনালতা” কি মিথ্যারই চর্চা? তবে কি কিছু অসামাজিক, বাস্তববিমুখ, সত্যভীরু, কর্মভীরু, দায়িত্ব এড়ানো, মেজাজী, অপরিণতমনস্ক, অসংসারী, লাজুক অথবা দাম্ভিক (একই টাকার এপিঠ-ওপিঠ) মানুষকে আমরা কবি আখ্যা দিয়ে থাকি বাংলাতে? কেন, বাস্তবঘেঁষা, পরিণতবুদ্ধি, সামাজিক দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন, সংযতস্বভাব, নেশাবিহীন, পরিশ্রমী, সৎ নাগরিক কি ‘কবি’ হতে পারেন না? ‘কবি’ কি তবে একটা নিন্দাশব্দ? ‘কবি-কবি’ তো নিশ্চয়ই তাই।
সংস্কৃতে ‘কবি’ বলতে এককালে ঋষিদের বোঝাতো, সত্যদর্শনের শক্তি যাঁদের ছিল। বাংলাতে ‘কবি’ বলতে সেইজাতের শ্রদ্ধার অধিকার অর্জন করেছিলেন শুধু একজনই। তাঁকে বাদ দিলে বাংলা-সাহিত্যে চলতি প্রতিমায় কবির চেহারা কিন্তু ঋষিজনোচিত নয়। চিরকালই কথাটায় মেটানো ছিল এক চিলতে ঠাট্টা। সোনালি ফ্রেমের মধ্যে উদাস দৃষ্টি, এলোমেলো লম্বা চুল, ললিত লবঙ্গলতা চলনবলন, আলুথালু ধুতি পাঞ্জাবি, বগলে (কবিতার) খাতা, লাজুক,—এই ছিল কবির স্টিরিওটাইপ। পথে-ঘাটে এই চেহারা দেখলেই “কবি” শব্দটি মনে উদয় হবার কথা। হতে পারে তিনি কবি নন। তেজারতির ব্যবসা তাঁর। কিন্তু এই দৃশ্যের অনুষঙ্গ, কবিতার। প্রতিমাটির সঙ্গে কিছু মূল্যবোধও সেঁটে ছিল। অসংসারী, নির্ধন, উদাস। এখন প্রতিমাটি একটু বদলেছে। দৃষ্টি আর উদাস নয়, রাগী, সোনালি নয়, মোটা ফ্রেমের চশমা, ললিত-লাজুক নয়, দাম্ভিক চলনবলন, ধুতি নয় জিনস, বগলে খাতা নয় কাঁধে ঝোলাব্যাগে বই, উস্কোখুস্কো চুলদাড়িতে তেল নেই। ঠোঁটে ঝুলন্ত সিগারেট। কবি আজ ‘মেয়েলি’ নয়, ধম্কে কথা কয় সে, যদিও এখনও বড় রোগা। পঞ্চাশের গুণ্ডা কবিরা মধ্যরাত্রে কলকাতা শাসন করেও কবির ‘মাসলম্যান’ ইমেজটি তেমন করে গড়ে দিতে পারেননি, ‘বটলম্যান’ ইমেজটিতে যেমন সাফল্য লাভ করেছেন। কবির গায়ে চিরকালই একটু মদের গন্ধ, একটু তামাকের গন্ধ আর একটু গোলাপের সুবাস লেগে থাকতো। আজকাল ফুলটুকু বাদ গেছে। সঙ্গে থাকেন বান্ববী স্বয়ং। কি আগে, কি এখন, কবি-প্রতিমাটির পুংলিঙ্গ। ‘কবি’ বলতে কোনো নারীর উদাস নয়ন চট করে মনে আসে না। আসবে কি করে? মেয়েরা ‘প্র্যাকটিকাল’ মেয়েরা ‘মেটেরিয়ালিস্টিক’ আর কবিরা ঠিক তার উলটো যে। কবি মানুষটি চিরকালই উদাসীন, উন্মনা, বেহিসেবি বটে, তবে কিনা বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি আবার একটু পরশ্রীকাতরও। অন্য সাহিত্য ক্ষেত্রের তো ভেতরের কেচ্ছা জানি না তেমন? আমাদের নিজেদের ঘরের ব্যাপার যা জানি আধুনিক যুগে, রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই বাঙালি কবি ঘরের কোন্দলে বড় পটু। যুগ যুগ ধরে কিছু না কিছু বাঙালি কবি একা একা অথবা দলবাজি করে সতীর্থদের নিন্দেমন্দ করেই চলেছেন। দুঃখের কথা প্রবীণদের মতো তরুণদের মধ্যেও জ্ঞাতিবিরোধ প্রবল। সমালোচনার নামে সদর্থক গদ্যের চেয়ে নঞর্থক গদ্যই বেশি চোখে পড়ে আজকের মফস্বলী লিটল ম্যাগাজিনে। উল্টোপক্ষে পরস্পর (দল-সাপেক্ষে) পৃষ্ঠকণ্ডূয়নের একটা প্রবণতাও স্পষ্ট নজরে আসছে। এ লক্ষণ শরবন গড়ে ওঠার। যদুবংশ, সাবধান।
আমরা যদি সত্যিই জাত-কবি হই তাহলে তো জাত-উদারও হবো? কবির বাস হবে সব নোংরামির ঊর্ধ্বে। শিল্পের সম্মানে কবিকে সত্যের অনুশীলনেই আত্মনিয়োগ করতে হবে, শিল্প-অতিরিক্ত দড়ি টানাটানির পঙ্ককর্দমে সে নামবে কী করে? ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলার নিরপেক্ষ আত্মপ্রত্যয় না থাকলে শিল্পের সার্থকতা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় শিল্পীর মুক্তিও।
৭ ॥ কবিতা, ফুটবল এবং মাছভাত
আমরা কি সত্যিই কবিতাঅন্তপ্রাণ? হজরত মহম্মদ বলেছিলেন দুটি পয়সা পেলে এক পয়সায় ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করবে আর অন্য পয়সাটি দিয়ে ফুল কিনবে। দক্ষিণ ভারতের হিন্দু সমাজে মহতের এই উপদেশটি দেখি অনাদিকাল থেকে দিব্যি পালিত হয়ে আসছে, মুসলিম সমাজে ততটা হোক না হোক। চুলে ফুল না দিলে দক্ষিণী মেয়ের সাজ সম্পূর্ণ হয় না।
আসলে কথাটা তো ফুল নিয়ে না। কথাটা নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির। বাঙালির প্রত্যহের জীবনযাপনে কতোটুকু কবিতা আছে? আমি তো দেখি মধ্যবিত্ত বঙ্গসন্তান কবিতার চেয়ে ফুটবল বেশি ভালোবাসে, কবিতার চেয়ে মাছভাত ভালোবাসে। কবিতার চেয়ে ইমরান খানকে ভালোবাসে, কবিতার চেয়ে টেলিভিশন তার বেশি প্রিয়।
জোড়া ইলিশ মাছের বদলে, কিংবা ফুটবলের বড় খেলার টিকিটের বদলে জোড়া কবিতার বই দিলে বেশি খুশি হব কি আমরা? বুকে হাত দিয়ে ক’জন বাঙালি কবিই বা একথা মেনে নেবেন নিজের কাছে?
তবে হ্যাঁ, বাঙালি ছড়া কাটতে ভালোবাসে। বাঙালির মতো ছড়া কাটায় ওস্তাদ জাতি ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয় আছেন কিনা জানি না। আমরা গাঁয়ের বৃদ্ধদের দেখেছি মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করতেও ছড়া কাটছেন, আবার ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে শাপশাপান্ত করতেও ছড়া কাটছেন। বাচ্চারাও কি ছড়া কাটায় ওস্তাদ কম? তারা কুল পাড়তেও ছড়া কাটছে, কলমি তুলতেও ছড়া কাটছে। “বুলবুলি লো সই/ একটা বোড়োই ফেলে দে রে, গোঁসাইয়ের নাম লই!” কিংবা পুকুরপাড়ে “কলমিলতা কলমিলতা/জলশুকোলে যাবি কোথা?” কলমিও বলছে, “লুকিয়ে থাকি মাটির তলে/লাফিয়ে উঠি বর্ষা হলে।” গ্রাম নাহয় বাদই দিচ্ছি, গ্রামের জীবনে ছড়ার ছন্দ হয়তো সর্বভারতীয়। কিন্তু বঙ্গসন্তানের নাগরিকতাও ছড়ার ছন্দে বাঁধা। শহরে রাজনীতির দাদাদের তো আজও দেখছি জনসভাতে দিব্যি ছড়া কাটতে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়ার তো সচেতন প্রতিযোগিতাই পড়ে যায়। আমরা পথে পথে চানাচুর বিক্রি করে বেড়াই ছড়া কেটে, আবার বিলিতি আইসক্রিমও বিক্রি করি হোর্ডিঙের দামী রংদার বিজ্ঞাপনে ছড়া কেটে। এমনকি আমরা বিনা পয়সায় বিনা অজুহাতে, সর্বসাধারণকে নীতিজ্ঞানও বিতরণ করি ছড়া কেটে। যেমন ধরুন: দমদম বিমানবন্দর থেকে বাসস্টপে আসতে পিচের রাস্তার ওপরে চকখড়ি দিয়ে লেখা আছে:
“মন্দ কাজ করে প্রাণে ভয় হয় যবে/‘বেশ করেছি’ বলে তাহা ঢাকতে চাও তবে।।” (পড়ে বুক শুকিয়ে যায়!) ভবানীপুরে একটা কারখানার পাঁচিলে সযত্নে খচিত আছে: “প্রস্রাব করিবেন”। যথারীতি “না”টি মুছে দেওয়া। কিন্তু তার ঠিক নিচেই আরো যত্নকরে অন্য হস্তাক্ষরে লেখা হয়েছে: “করিলেই মরিবেন!”…বাঙালিই এটা পারে।
কিন্তু ছড়া কবিতা নয়। বাঙালিকে ‘ছড়াকাটার জাত’ বললে আপত্তি করবো না কিন্তু ‘কবির-জাত’ কথাটা হয়ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে আজকের দিনে।
এই কবিতা বাতিক কি বাঙালির একারই? তামিল, মারবাড়ি, পাঞ্জাবী, সিন্ধী—এঁরাও কি আমাদের মতো কাব্যবাহিক গ্রস্ত নন? কি জানি! কানে তো আসেনি তেমন কোনো নিন্দে। তবে হ্যাঁ, বাঙালির চেয়ে উত্তর ভারতের ঊর্দুভাষী সমাজের কাব্যপ্রীতি একটুও কম নয়। বরং প্রবলতর, বলা যেতেই পারে। কেননা তাঁরা সবাই লেখেন না, সবাই পড়েন। সবাই মজে থাকেন। যেকোনো সভাসমিতিতে (আড্ডাতে তো বটেই, পেটে দু’পাত্র সুরা পড়লে আর কথাই নেই) ঊর্দুভাষীদের শায়েরী আওড়ানো শুরু হয়ে যায়। দুর্দম তাঁদের শায়েরীপ্রীতি আরো দুর্মদ তাঁদের শায়েরীস্মৃতি। বাঙালির এত কবিতা মুখস্ত থাকে না, কেননা শায়েরীর মতো শ্লোকবদ্ধ দৃঢ়সন্নদ্ধ নয় তো বাংলা কবিতা। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, দেশাচার, বেশভূষা, প্রাকৃতিক আবহাওয়া, সাংস্কৃতিক পরিবেশ কিছুর সঙ্গেই উত্তর ভারতের উর্দুভাষীদের বিন্দুমাত্র মিল নেই অথচ এই কাব্যপ্রীতিতে এমন মিল হলো কেমন করে?
বোধহয় যত দোষ এই ভাষা দুটোর। ভাষা দুটোই হয়তো মূল আসামী। ওদেরই চরিত্রদোষে এই ভাষাভাষীদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে এক সম্পন্ন বিস্ময়। ভাষা দুটোরই অণুপরমাণুতে রোম কূপে-কূপে কবিতা ফুটে আছে—এভাষা যাদের মাতৃভাষা কবিতার নেশা থেকে তাদের মুক্তি নেই। যে ভাষার বর্ণপরিচয়ে অকবি বৈয়াকরণই লেখেন “জল পড়ে, পাতা নড়ে” তার আর উপায় কী! আ মরি বাংলা ভাষা! ভাষার অন্তরেই যে ছন্দ, তার শিরাধমনীতে যে স্পন্দন, যে রূপ, যে মিল, যে মোহ, যে ম্যাজিক, তারই ছদ্মনাম কি কবিতা? উর্দুতেও, বাংলাতেও, সেই ছলনাই কি ভেলকি দেখায়?
৮ ॥ এসেছে বনগাঁ থেকে কবি সম্মেলনপ্রিয় তিনটি তরুণী/একলরি কবি নিয়ে..
এত কবি সম্মেলন বেড়ে গেছে, এত আবৃত্তির আসর বসছে, গ্রাম-শহর তোলপাড় করছে বাংলা কবিতা, এপার বাংলা ওপার বাংলা এক হয়ে যাচ্ছে কেবল এই একটি কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে, অথচ মাঝবয়সী বাঙালিদেরই মধ্যে বাংলা, কবিতায় একটা অ্যালার্জির ধাতও যেন নাড়ি ধরলেই টের পাওয়া যাচ্ছে। এককালে যাঁরা নিজেরা কবিতা লিখতেন, তাঁরাও কেউ কেউ অতি আধুনিক কবি ও কবিতা দেখলেই মারমুখী হচ্ছেন। ব্যাপারটা কী? জগৎ জুড়েই যেমন মধ্যবিত্তের সন্দেহবাতিক যে বেদে মাত্রেই চোর আর হাতসাফাইয়ে ওস্তাদ, এবং বেদেনী মাত্রেই স্বেচ্ছাচারিণী, তেমন তাঁদের বিশ্বাস যে ইন্দানীং কবিমাত্রেই মদ্যপ। নয়তো অসচ্চরিত্র, নিদেনপক্ষে চালিয়াৎ (এমনকি জালিয়াৎ হওয়ায় অসম্ভব নয়) হয়তো সবগুলি গুণেরই আলোকিত সমন্বয়। মধ্যবিত্ত বাঙালি মনেও এ ধারণা সঞ্চারিত হয়েছে। বাঙালি কবিরা পাত্র হিসেবে কোনোকালেই যদিও পাত্রীপক্ষের কাম্য ছিলেন না, তথাপি একক রবীন্দ্রনাথের অনন্য ইন্দ্রজালের বিভায় কবির পরিপার্শ্বে একটি জ্যোতির্ময় দিব্য লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু আমাদেরই কার্যকারণের কৃপায় ভালোমানুষ হিসেবেও কবির বাজারদর হুড়মুড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। মাধ্যাকর্ষণের মতো এই নিয়তির টান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে বাঙালি কবির সচেতন প্রয়াস প্রয়োজন। এবং পাঠকেরও কিছু সহযোগিতা চাই।
চিরকালই বাঙালি পাঠকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বাঙালি লেখকদের মতোই প্রবল। আশ্চর্য একটা দু’মুখো মূল্যবোধ ইদানীং নজরে আসছে আমার। তরুণ কবির ঠাঁইটুকু মধ্যবিত্ত সমাজে যেমনই নড়বড়ে, প্রতিষ্ঠিত কবিদের আসন তেমনই জরিদার, ঝলমলে। একদিকে সংশয়ের আলো-আঁধারি, অন্যদিকে রৌদ্র ঠিকরে পড়ছে। রৌদ্র, নাকি হ্যালোজনের ফ্লাডলাইট? রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের কবিদেরও কপালে মান-সম্মান কম জোটেনি। ফুলের মালা, মিষ্টির বাক্সো নিয়ে মুগ্ধ পাঠকরা ছুটে যেতেন কবিসন্দর্শনে। ঐকান্তিক ভালোবাসায় তাঁদের প্রণাম জানাতেন। সেসব কবিদের নাম আমরা মনেও রাখিনি। কিন্তু ইদানীং এত “কবি সম্মেলন”-এর কৃপায়। দিকে দিকে যে-দৃশ্য চোখে পড়ে, প্রেমোন্মাদে যেভাবে প্রিয় কবিদের ভক্তিভরে তেড়ে গিয়ে আক্রমণ করেন ও পেড়ে ফেলেন, তাঁদের তরুণ অনুরাগীদের দল, যেন রাজকাপুর কিংবা রজনীশ, তাতে কে বলবে বাঙালি কবির জাত নয়? এই কবি-মত্ততা কিন্তু বাঙালি তরুণদেরই একচেটিয়া, যা দেখলুম। ঠিক এমনটি সারা ভারতে যে দেখিনি। শুনেছি কেরালাতে খোলামাঠে দশ হাজার লোকের মধ্যে কবি-সম্মেলন হয়, অবশ্য চোখে দেখিনি, সেখানেও নাকি কবিদের নিয়ে কাড়াকাড়ি অভ্যাস নেই, বাংলায় যেমন আছে। কবিরা সাফল্য পেলে, বাংলাতে সপারস্টার হতে পারেন (যদিও সফল না-হওয়া অবধি পথ অতীব দুর্গম!)।
কিন্তু এটাকেই কবিতাপ্রেম বলব কি না, জানি না। সত্যি বলতে কি, ভয় করে। মনে হয় কোথাও কী যেন একটা ফাঁপা জায়গা ঠন্ঠন্ করে বেজে উঠছে। কবিপ্রীতির মধ্যেও, কবিতার মধ্যেও, কে বলতে পারে, কবির মধ্যেও বাজে কি না? উন্মত্ততা দেখে সন্দেহ হয় এই ভক্তি কি বিশুদ্ধ কাব্যপ্রীতি? না কি কবিতার অতিরিক্ত কিছু? ক্যারিস্মার যোগবিভূতি? আমরা হুজুগপ্রিয় বাঙালি বলেই কি ক্রিকেট, ফুটবল, সিনেমা, রাজনীতি, ধর্মের মতোই কবিদের নিয়েও হুজুগে মাতি? এ কি প্রচারব্যবসায়িক “স্টার-সিস্টেমের” ফল? নাকি এই-ই প্রকৃত প্রেম? আশা করব আমার সংশয় মিথ্যা। এটাই প্রেম। কবিতারই প্রতি আনুগত্য। উন্মাদনার প্রতি নয়। এতই নিমজ্জিত হয়ে আছি আমরা অন্তরে অন্তরে কবিতার অঙ্গসুরভিতে, যে হয়তো আর আলাদা করে চিনেও নিতে পারি না তাকে। বাংলাতে দাদের মলমেও যে কবিতা রাখার চেষ্টা থাকে!
৯ ॥ কানের ভিতর দিয়া মরমে
যুগটা অডিওভিশুয়ালের। কবিতা-পাঠ ও আবৃত্তি এখন প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পেয়েছে। নাটকের দলের মতোই আবৃত্তির গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে পাড়ায় পাড়ায়। নতুন একটি সাংস্কৃতিক অনুশীলনের। শাখা সৃষ্টি হয়েছে। আবৃত্তি। আগেকার দিনে পাড়ার জলসায় আবৃত্তির ঠাঁই ছিল ঠিক বড় মাসিক পত্রিকার পাদপূরণে কবিতা ছাপার মতোই। নাচ-গান-থিয়েটারের মধ্যে হাইফেন। পাড়ার ছোট বাচ্চাদের মঞ্চে ওঠার সুযোগ দেওয়া, ‘পঞ্চনদের তীরে/ বেণী পাকাইয়া শিরে’, ‘বাবুদের তালপুকুরে’, কিংবা ‘আরে আরে তুই নাকি কাল’। এখন ব্যাপারটা পালটে গেছে। রীতিমত ভাড়াকরা “আর্টিস্ট” নিয়ে আসতে হয় ‘আবৃত্তি’ বা ‘পাঠ’ করতে। কবিতা ব্যাপারটার বাজারদর হয়েছে। শুধুমাত্র ‘পাঠ’ আর ‘আবৃত্তি’রই একটা গোটা জলসার কথা আগে ভাবাই যেত না, এখন টিকিট কেটে লোকে কবিতা-আবৃত্তি শুনতেই যায়। (শুনতে, নাকি দৃষ্ট হতে?) ‘আবৃত্তির আসর’ কিন্তু ‘কবিসম্মেলন’ নয়। এখানে যাঁরা অংশগ্রহণ করেন তাঁরা কবিতা লেখেন না। পড়েন। তাঁরা মূলত কবিতা ভালবাসেন, তাই আবৃত্তি করে অন্যদের কাছেও কবিতার ভালোবাসাটি পৌঁছে দিতে চান। “যাঁরা কবিতা ভালোবাসেন ও তার আবৃত্তি শুনতে চান” তাঁদের জন্যই শুরু হলেও এই আসর এখন ঠিক কবিতাপ্রাণ শ্রোতাদের কাছে বিশুদ্ধ ভালো কবিতাকে পৌঁছে দেবার দৌত্যকর্মে লিপ্ত নেই।
রেডিওজাত আধুনিকতম আবিষ্কার সাধারণ মঞ্চে ‘শ্রুতিনাটকের’ অনুষ্ঠানের মতোই হয়ে গেছে আবৃত্তি, নাটকীয়তা থাকাটাই জরুরি তার মঞ্চ সফলতার জন্য। প্রথমদিকে কবিতা-চয়নের মধ্যে সেই নিরিখটা অজ্ঞাতসারেই ঢুকে পড়ে হয়তো; যে কবিতা কানের ভিতর দিয়া শ্রোতার মরমে প্রবেশ করে মন-প্রাণ আকুল করবে সেই কবিতাই বেছে নিতেন পাঠক বা আবৃত্তিকার। আমাদের ছেলেবেলায় ‘পাঠ’-এর চল ছিল না, মুখস্ত ‘আবৃত্তি’ করাই ছিল কবিতার কানন। ক্রমশ আলস্য জিতে গেল। ‘পাঠ’ শুরু হল। ‘পাঠ’ করার সময় কবিতার শ্রুতিসাফল্য নিয়ে সর্বদা ভাবা হত না, কিছুটা আপনমনেই পড়তেন পাঠক, যেন নিজের কাছে নিজেই। কিন্তু কবিতার আসর যখন ব্যক্তিগত ঘরের কোণের চা-মুড়ির পরিবেশ থেকে বেরিয়ে পড়ে টিকিট বেচে মঞ্চে গিয়ে উঠল, তখনই তার কবিতা-চয়নের নীতি বদল হয়ে গেল। তখন আর শুধু একমুঠো মুগ্ধপ্রাণ কবিতাপ্রিয়ের একক্রিয়ান্বয়িতার প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন এখন এক হলঘর। পয়সা উশুল করতে চাওয়া “অডিয়েন্স”-এর মনোরঞ্জনের! শিল্পকে যে ব্যবসায়িক হলেই মন্দ হতে হবে তা নয়। গান তো ব্যবসাই। নাটকও। কবিতাই বা হতে চাইবে না কেন? কিন্তু এ কেন-র জবাব নেই। কবিতা হয়তো একটু লাজুক। হয়তো ঠিক জনসভার যোগ্য নয় সে, কি জানি!
আমাদের আর মোটেই অবাক হওয়া উচিত নয় যে এই অডিওভিশুয়াল যুগে কবিতার সঙ্গে আলোকসম্পাত হবে। সাইকেডেলিক লাইটিং হবে ঢ্যাম কুড়কুড় বাদ্যি বাজবে, সে সেতারই হোক, তবলাই হোক অথবা ঝিন্চাক বিলিতি জগঝম্প। এ তো হতেই পারে যে কবিতার মধ্যে সুপ্ত যে নৃত্যগীত ছবিটার সবকিছুকে অক্ষর ছাড়াও নানাভাবে খোলাখুলি সবকটা ইন্দ্রিয়ের কাছে বাইরে থেকে পৌঁছে দেবার একটা সর্বাঙ্গীণ চেষ্টা করা হবে। শিল্পকে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট সহ্য করতে হয়। “যে আগুনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি তাতে যেন আমার পুণ্য হয়” বলতে বলতে কবিতাও একদিন আবার কবিতার আপন ঘরটিতে ঠিক ফিরবে। ফিরবে, নাকি পৌঁছবে? আমি তো দেখছি ইতিহাস লাইন টেনে নয় বৃত্তাকারে ঘুরছে—আগে কবিতা শোনাই হত, মহাকাব্য শুনে পুণ্যবান হতেন শ্রোতা। বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সুর দিয়ে গাওয়া হত। কবিতা—আজকে যেমন মার্কিনী কবি অ্যালেন গিনসবার্গ একটি ছোট্ট হারমোনিয়াম কোলে করে গান গেয়েই তাঁর কবিতা পড়েন। (বিপরীত, শঙ্খ দেখিয়েছেন কীভাবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান ছেঁকে কবিতা তুলে নিয়েছেন পরিণত বয়সে, উজান বেয়ে গিয়ে!)
কবিতা আবৃত্তির আসরগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল কবিতার আরেকটু জনপ্রিয়তা বাড়ানো; কবিতাকে সকলের মধ্যে টেনে আনা। জানি না সেটা কতদূর সার্থক হয়েছে। জানি না এতে মানুষ বেশি বেশি কবিতার বই কিনছেন কিনা? (আবৃত্তি ইস্কুলের টেক্সট হিসেবে ছাড়া!) বেশি করে আপনমনে কবিতা পড়ছেন কিনা? নাকি সেজেগুজে ‘ফাংশনে’ যাওয়াটাই আসল। “যে গানটা গাইতে পারে না, কবিতাও লিখতে পারে না, সে কবিতা আবৃত্তি করে”—এক তরুণ দুর্বিনয়ী অনেকদিন আগে চোখ টিপে আমাকে বলেছিলেন এক কবিতার আসবে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে কথাটা। বিশেষত যখন দেখি আবৃত্তির প্রয়োজনে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কবির অতি সাধারণ পদ্য ‘ব্যবহার’ করা হয় ভাল কবিতা বাদ দিয়ে। কোন্ কবিতা কবিতার নিরিখে কত ভালো, আবৃত্তির জন্য সেটা মাপকাঠি নয়, জনমনোলোভা হলেই হবে। জীবনানন্দের কি সুধীন্দ্রনাথের চেয়ে তাই তরুণ কবির আদিবাসী ঢংয়ের মিষ্টি কবিতাই বাজারি আবেদনে বেশি মূল্যবান। যেহেতু তা মঞ্চে বেশি ফলপ্রসূ। কাব্যরুচি তৈরির উদ্দেশ্যটা বদলে গেছে। এখন এখানে মনন নয়, শ্রবণই প্রধান। আপনমনে কবিতাপাঠের ক্রিয়াটি আলাদা। তার আবেদন শুধু ইন্দ্রিয়ে নয়।
১০ ॥ কে তুমি পড়িছো বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহল ভরে?
আবৃত্তির এই গরম বাজারদর কবিতার পক্ষে প্রথমটা খুবই আহ্লাদের হয়েছিল—কিন্তু প্রকৃত কবিতাপ্রেমীর পক্ষে এটা উদ্বেগের কারণও হতে পারে। কবিতা আর কবির মধ্যে যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কবি আর তাঁর পাঠকের মধ্যেও সেই ঘনিষ্ঠ সঙ্গোপন দেওয়া-নেওয়ার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। কবি আর পাঠকের মধ্যে সেতু হয় কবিতা, এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া কবি আর পাঠকের মধ্যে একাত্মতা ঘটিয়ে দেয়। কবি যে ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন তা কে জানতে চায়! পাঠক যা পড়তে চান, তিনি তাই পড়ে নিয়েছেন। একক্রিয়ান্বয়িতা তাতেও ঘটে। পাঠকের সহৃদয়তাতেই কবির এবং কবিতার সম্পূর্ণতা।
কিন্তু মধ্যপথে এসে দাঁড়ান আবৃত্তিকার। তিনি তাঁর মতো করে কবিতাটি বুঝিয়ে দেন। আবৃত্তি এক ধরনের ব্যাখ্যা তো বটে? পাঠের ধরনে, বাচনভঙ্গিতে, কঠস্বরের ওঠাপড়ায় কবিতার যে বিশেষ অর্থব্যঞ্জনা তিনি ফুটিয়ে তোলেন, সেটাই পাঠকের হৃদয়ে অদ্বিতীয় হয়ে ছাপ ফেলে যায়। কবি তো কেবল শীতল ছাপার হরফের নিরপেক্ষ পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তাঁর বলবার কথাটুকু। পাঠক তাঁর আপনমনের মাধুরী মিশায়ে নিজের মতো করে বুঝে নিতেন যা বোঝার। সম্পর্কটা গড়ে উঠত সোজাসুজি দুজনের মধ্যে। আবৃত্তিকার এসে পড়ে কবিকে অংশত মুছে দেন। কবির কণ্ঠস্বরের বদলে শ্রোতার কাছে পৌঁছয় আবৃত্তিকারের কণ্ঠ। নাটক দেখার পরে দর্শকের মনে বেঁচে থাকেন যেমন অভিনেতাই, নাট্যকার নামেমাত্র, ঠিক তেমনিই পাঠক এবং কবির মধ্যে এসে দাঁড়ান জনপ্রিয় আবৃত্তিকার। জয় করে নেন শ্রোতাকে তিনিই। এখানে খেয়াল করতে হবে যে গান, গীতিকার, গায়ক ও শ্রোতা এবং কবিতা, কবি, আবৃত্তিকার ও পাঠক এঁদের ভূমিকাগুলি কিন্তু একেবারেই তুলনীয় নয়! গায়ক প্রাণ প্রতিষ্ঠা না করলে, ছাপার হরফে গান গানই নয়। গায়কই তাতে সুরের সোনারকাঠি ছোঁয়ান। কবিতা তা নয়। কবিতার পাঠক আছেন। গানের শুধুই শ্রোতা, গায়কই সেতু বাঁধেন গীতিকার ও শ্রোতার মধ্যে। আবৃত্তিকার কিন্তু শুধু সেতুই নয়, কখনও কখনও অনিচ্ছাকৃত দেওয়ালও গড়েন। আজকের কবিতা পঠনের জন্য। সভাশোভন না হলেও সে প্রাণবন্ত। আবৃত্তিকার মধ্যস্থ হয়ে কবিতাতে একটি অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেন। তাতে অতিরিক্ত সরলতা অথবা জটিলতা সৃষ্টি হবার সুযোগ ঘটে। পাঠকে-কবিতে যে নির্জন নিজস্ব ঘনিষ্ঠতা, শ্রোতাতে-কবিতে ঠিক সেটা ঘটে না। কবির স্বকণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি শোনা কিন্তু একেবারেই অন্য জাতের মহার্ঘ অভিজ্ঞতা। এই কারণেই ‘কবিসম্মেলন’ শিল্পের খাতিরেও মহা মূল্যবান। কবি স্বয়ং তাঁর কবিতার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন আবৃত্তির মাধ্যমে। শ্রোতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তার স্বকীয় মূল ভাষ্যটি, সোজাসুজি।
প্রায়শই মঞ্চসফল পেশাদার আবৃত্তিকারেরা সপ্রেমে, সবিনয়ে কবিদের অনুরোধ জানান তাঁদের জন্য মঞ্চে পাঠোপযোগী, আবৃত্তিযোগ্য কবিতা লিখে দিতে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ই বোধহয়, অনেকদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে লোথার লুৎজে সাহেবকে বলেছিলেন যে বাঙালি কবিরা এখন দু’ধরনের কবিতা লেখেন, কবি সম্মেলনে জমিয়ে পাঠ করার উদ্দেশ্যে এক জাতের আর বিজন পাঠক-পাঠিকার উদ্দেশে আরেক জাতের।
বাংলায় এই শেষ জাতের কবিতার মান ক্রমশই নেমে যাচ্ছে, এ নিয়েই পাঠক শীর্ষেন্দুর অভিযোগ ছিল বলে আমার বিশ্বাস। হাটে মাঠে বাটে বিকিয়ে যাচ্ছে কবিতা, জনমনোরঞ্জনে নেমেছে কবিতা, কোথায় গেল তার গোপন লাস্য? যা ছিল শুধু অক্ষরের মোহিনী আড়ালে লুকোন, একক পাঠকের জন্য?
১১ ॥ করেছি ভুল কিছু বটে!
করজোড়ে আরও একটি দুর্বিনীত নিবেদন। মনুষ্য সমাজে কর্মের মূল্য যদি অর্থ দিয়ে যাচাই হয় তবে কবির কর্মের কোন দাম নেই। সবচেয়ে শস্তা শিল্প কবিতা। তারও চেয়ে শস্তা কবি নিজে। কবির সময়ের কোনো দাম নেই। গাইয়ে অন্যের লেখা অন্যের সুর দেওয়া গান পুনরুচ্চারণ করে দক্ষিণা নেন। আবৃত্তিকারও অন্যের লেখা কবিতা মাইকের সামনে আবৃত্তি করার নিমন্ত্রণও বিনামূল্যে গ্রহণ করেন না। একমাত্র স্বরচিত কবিতা পড়তে কবিকূল “হেথাহোথা আনমনে” সদাসর্বদাই ছুটে যান। দক্ষিণার প্রশ্ন কেউ তোলেন না। না আমন্ত্রণকর্তা, না কবি। দুর্লভ দু’একটি বেসরকারি ঘটনা ও সরকারি কবিসম্মেলন ব্যতীত, কবিসম্মেলনে ইলেকট্রিশিয়ান, চা-ওলা, শতরঞ্চি-ওলা, সকলেই তাঁদের সহায়তার জন্য অর্থমূল্য পান—একমাত্র কবিকূলই পান না।
এঁরা যে সবাই পেশাদার। গায়ক, বাদক, দোকানদার, ঠিকেদার। কিন্তু ছি ছি কবিত্বের সঙ্গে পেশাদারির কেমন একটা বিরোধ আছে না? চাঁদের আলো কি বিল পাঠায়?
কিন্তু কবি চাঁদের আলো নন। কবিতা কবির অতি কষ্টার্জিত শিল্পকর্ম। শুধুই নেশা নয়, কবিতা লেখাই কবির পেশাও। জীবিকা নাও হতে পারে। সে তো গায়ক, পাঠকদেরও অন্যান্য জীবিকা থাকে। পেশাদার শিল্পী কিন্তু কবিও। এটা কবি ও পাঠক দুজনেরই স্মরণ থাকা উচিত। সুখের বিষয় আবৃত্তিকারেরা ‘তু’ করলেই ছুটে যান না আমাদের মতো। আমরা কবিরা আপন কর্মকে যথেষ্ট মর্যাদা দিই না, যথেষ্ট মূল্য দিই না কবিতাকে। তবু ভালো যে আবৃত্তিকারদের কল্যাণে আজ কবিতারও কিছু অর্থমূল্য নির্দিষ্ট হয়েছে বাজারে।
কবি যখন স্বয়ং উপস্থিত হয়ে নিজের কবিতা নিজেই পড়তে স্বীকৃত হয়েছেন, স্বভাবতই তাঁর তো আবৃত্তিকারের চেয়ে অধিকতর সম্মানমূল্য পাওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত। জাত-কবি বাঙালি যদি কবির কর্মকে সম্মান করত, কবিতাকে সঙ্গীতের মতো সামাজিক মর্যাদা দিত, তাহলে “কবিসম্মেলনে”র আয়োজকেরাই সেই ঐতিহ্য নিজে থেকেই স্থাপন করতেন। স্বকণ্ঠের কবিতা শুনতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই কবিকে সম্মানমূল্য দেওয়া অবশ্যকর্তব্য মনে হত। কবিকে চাইতে হবে কেন? পৌরোহিত্য, পুরস্কারদাতৃত্ব, প্রধান অতিথ্য গ্রহণ ইত্যাদি কষ্টকর অকর্মের জন্যও কবির নষ্ট সময়ের অর্থমূল্য নির্দিষ্ট থাকা উচিত। কবি বক্তৃতা দিয়ে বা কবিতা পড়ে, মালচন্দন ছাড়াও কিছু উপার্জন করবেন এটাই স্বাভাবিক। দোষ সবটাই পাবলিকের নয়, অনেকটা দোষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সেই যে তিনি ঠিক করে দিয়ে গেছেন কবির “পুরস্কার”—“ওই ফুলমালাখানি…” সেই থেকেই সবার ধারণা হয়েছে,—“ওই ওতেই হবে!” তাঁর মনেপ্রাণে জমিদারি ছিল, তিনি বলতেই পারেন!
“তুচ্ছ অর্থমূল্যে কবির মূল্য কেনই বা যাচাই করব আমরা,” বলে কোনো কাব্যময় তাত্ত্বিক বিতর্কে আমি যাবো না। বর্তমান সমাজে “ফুলমালা”র সম্মান যে কত, তা নিয়েও আলোচনায় অবতীর্ণ হব না। তবে কবিকে আজ নিজের সময়ের সামাজিক মূল্য নির্ধারণ করতেই হবে। মূলত এর দায়িত্বটা ছিল কিন্তু অবশ্যই কবিতাপ্রেমিক শ্রোতা-পাঠকের। আর সকলকেই কাজের জন্য যখন মূল্য ধরে দেওয়া হচ্ছে, কবিকে বিনামূল্যে খাটিয়ে নেওয়া হবে কেন?
কবি-সম্মেলনের আয়োজকদের এর পরে কবিদের আনতে হলে শুধু মালাচন্দনই চলবে না, নগদ কবি-দক্ষিণা চাই। অন্যান্য আর সব শিল্পীদের মতোই কবিরও সময় মহার্ঘ। জগতের নানান দেশে ঘুরে দেখলুম সর্বত্রই কবিদক্ষিণা দেওয়া নিয়ম। বাংলায় ছাড়া। আমরা যে জাত-কবি! (কবির ছড়াছড়ি! যে টাকা চাইবে, তাকে বাদ দিয়ে, যে চাইবে না তাকেই ডাকবো। অমন ঢের পাব!)
১২ ॥ আমাদের গোলাপ বাগানে গদ্যের বাহিনী
উমবেরতো একো লিখেছিলেন, আলগা ট্রাউজার্স পরার মেজাজের সঙ্গে টাইট জিন্স পরা আঁটসাঁট মেজাজের প্রভূত পার্থক্য আছে। আমার তো মনে হয় বাঙালির চরিত্রের পোশাক-আশাকের বদলের সঙ্গে একটা গভীর পরিবর্তন আসছে, এসেছে, যেটা বাঙালি মানতে চাইছে না। কবিতা-মেলা বসছে, কবিতা আবৃত্তির আসর জমে উঠেছে, কবিতা-পত্রিকার সংখ্যাও দিনে দিনে কালকেতুর মতোই বাড়ছে, কিন্তু কবিতা কোথায়? সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার কটি কবিতা মনকে স্পর্শ করে? ‘কবিতা’ পত্রিকা ত্রিশ বছর উঠে গেছে। ‘কবি ও কবিতা’ উবে গেছে তিন-চার বছর। আর নেই ‘কৃত্তিবাস’ ‘কয়েকজন’, ‘অলিন্দ’ কত আর নাম করব? নতুন কাগজও অবশ্য এসেছে ‘সংবেদ’, ‘বিভাব’, ‘প্রমা’। টিমটিম করে চলেছে ‘একক’, ‘কবিপত্র’। কবিতা ভালোবেসে যাঁরা কবিতার কাগজ বের করতেন যে-সব আঁতুড় থেকে বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠিত কবিরা প্রসূত হয়েছেন সেইসব কাগজ মুছে যাচ্ছে, যুগটা যে গদ্যের। কবিরা হয়ে উঠছেন গল্পকার, ঔপন্যাসিক—সঙ্গে সঙ্গেই: “পদ্যের শরীর থেকে অনিবারণীয়ভাবে/উঠে আসে গদ্যের দুর্গন্ধময় লাশের আঘ্রাণ।” রফিক আজাদের এই মন্তব্য বাংলাদেশের পক্ষে কতটা সত্য জানি না তবে পশ্চিমবাংলার পক্ষে নিখাদ সত্য। গদ্য লেখার মান যে উচ্চে উঠে যাচ্ছে, সেকথা বলা যাবে না, কিন্তু কবিতার মান নেমে যাচ্ছে, বলতে কোনো বাধা নেই। বড় কবিরা কার্যত ক্রমশ ছোট কবি হয়ে যাচ্ছেন, অথচ ছোটো কবিরা বড় কবি হচ্ছেন কই? কবিতা এখন বাঙালির অন্তর্জীবনের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত একটি প্রাকৃতিক শক্তির মতো কাজ করে না আর।
আমাদের জীবনের সঙ্গে শিল্পসৌকর্যের যোগ কতটুকু? কবিতা তো একা নয়। জীবনের যে সুকুমার দিকটিকে কবিতা আলোকিত করে, হৃদয়মনের যে স্পর্শকাতর কোমল সূক্ষ্ম তন্তুগুলির বুননে কবিতার সৃষ্টি হয় (আমি যে চাঁদ ফুল বসন্ত বাতাসের কথা বলছি না তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন) সেই দিকটিই কি বাঙালি জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে না? যে বিশেষ গুণ বা দোষটির জন্যেই বাঙালি তার ‘কবি’ বদনাম, কি ‘জন্মরোমান্টিক’ দুর্নামটি কিনেছিল, সেই দিকটি আর বাঙালির জাতীয় চরিত্রে প্রাধান্য পায় না। তুচ্ছ হতে হতে মুছেই গেছে প্রায় বলা যায়। বাকি আছে শুধু ‘আড্ডা’টুকুই। যা আলস্যপ্রসূত।
আজকের বঙ্গসন্তানের একটা অতিরিক্ত সমস্যা এই অন্তর্বিরোধ। “আমি-কবি”, “আমি-রোমান্টিক” “মরামরা” উচ্চারণের মতো বাঙালি নিজেকে নিজে এই অটোসাজেশন দিয়ে চলেছে বটে কিন্তু কার্যত বাঙালি আর কবি নেই, রোমান্টিক নেই। বাঙালি এখন শ্রমবিমুখ অথচ অর্থলিপ্সু, মননগর্বী অথচ বহির্মুখী। বাংলা কবিতা লিখে উচ্চাশী তরুণ কবিটি একদিন পন্টিয়াক গাড়ি দাবি করেছিলেন—সেদিন সেটি ছিল অবাস্তব। বাঙালি কিশোরের উদ্ধত কবিকল্পনার চরম দুর্ধর্ষ চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এখন আর ব্যাপারটা আজগুবি নেই, বরং শুদ্ধ কবিতাই ক্রমশ অবাস্তব কবিকল্পনার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যাঁরা মারুতি চড়েন, তাঁরাই কবিতাও লেখেন। এ আর এমন কি? তবে, না শুধু কবিতা লিখেই তাঁরা মারুতি চড়েননি!
আমরা বাঙালিরা নিজেকে ভাবতে চাই চিরকবি, চিরপ্রেমিক, চিরবিপ্লবী, চিরতরুণ, চিররোমাঞ্চিত রোমান্টিক—ভাবতে চাই সূক্ষ্মরুচির ও সুকুমার শিল্প অনুভূতির সর্বস্বত্বাধিকারী। পরিপূর্ণ আত্মিকবোধের তাড়নায় পরিচালিত, মানসগগনবিহারী। অতএব বাঙালির তুলনায় অন্যান্য প্রদেশের বুদ্ধিমান মনুষ্যগুলি, জীবনে যাঁরা বিষয়-সম্পত্তি করে ফেলেন, তাঁদের স্থূলবুদ্ধি, পুঁজিবাদী, মুনাফাখখার, বিষয়বুদ্ধিতাড়িত নেহাৎ নিকৃষ্ট জীব, কিঞ্চিৎ অসংস্কৃত প্রাণী মনে করে সান্ত্বনা পেতে চাই আমরা। অথচ এই যে—“চারিদিকে সবে বাঁটিয়া দুনিয়া/আপন অংশ নিতেছে গুনিয়া” আমরা তাতেও শান্তি পাচ্ছি কৈ আর! তাঁদের মতো জীবনযাত্রাই কি তবে আমাদেরও প্রকৃতপক্ষে কাঙিক্ষত ছিল? কিঞ্চিৎ পরাজিত, পরশ্রীকাতর হয়ে পড়েছি কি আমরা? অথচ জন্মকবির তো জন্ম-উদার এবং মহৎপ্রাণ হবার কথা!
কবিতা এখন বাঙালির হৃদয়ে মনে স্বপনে জাগরণে কোথাও নেই। কবিতা এখন শো-কেসে সাজানো কিউরোয়ো। “গদ্যে গদ্যে ভরে যাচ্ছে আমাদের পানাপুকুর থেকে শুরু করে/বঙ্গোপসাগর অবদি জলের সংসার।” আর চোখের মধ্যে মৃত স্বপ্নের শবদেহ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাঙালি।
১৩ ॥ মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়
ধুতি পাঞ্জাবি চাদর পরা বাংলার মাস্টারমশাইরা আমাদের কিশোরদের আদর্শ নন, দামী সুটিংয়ের কবীর বেদী হতে চায় তারা। আমাদের তরুণ-তরুণীরা শর্মিলা-পতৌদির মতো হতে চায়, জয়দেব-পদ্মাবতীকে তারা চেনে না। বিজনেস এক্সিকিউটিভ, ফিল্মস্টার বা প্রথম শ্রেণীর স্পোর্টসম্যানের জীবনই অধিকাংশ বাঙালি তরুণ-তরুণীর আদর্শ বললে কি ভুল করব? এঁদের কি ঠিক কবির-জাত বলে ভাবতে পারছি?
ধুতি-পাঞ্জাবির ঝলঝলে পোশাকে স্বপ্নদ্রষ্টা বাঙালি তরুণ হয়তো ছিল না চটপটে, পারত না সে গোর্খা কি শিখেদের মতো বেতনভুক সৈন্য হয়ে লড়াই করা, (অনায়াসেই প্রাণ দিতে পেরেছে গুলির সামনে যদিও নির্ভয়ে, কেন না সেটাও স্বপ্ন দেখার ফল; বিনি পয়সার যুদ্ধে বাঙালির তুলনা নেই!) ধুতিপাঞ্জাবির ‘ভেতো’ বাঙালি ভাঙরা নাচতে একটুও পারত না, কখকও নয়, কথাকলিও নয়, সে পারত বাঁশি বাজাতে, গান বাঁধতে, ছন্দ গাঁথতে, স্বপ্ন দেখতে। “ঘর ছাড়ানো আকুল সুরে উদাস হয়ে বেড়ায় ঘুরে” যে গৃহহারা পূবে হাওয়া, বাঙালি তরুণ ছিল তারই আত্মার দোসর।
সে বাঙালি তরুণ এখন কোথাও নেই।
১৪ ॥ নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে!
কবি যতই বাড়ুক বাংলায় প্রকৃত কবি এখন সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় উঠেছেন। কবিতা সত্যিই সরে গেছে বাঙালির জীবন থেকে। কেন সরে গেল কবিতা? কার দোষে? সে কি বাঙালির বাঁচার ধরন, উচ্চাশার চরিত্র, তারুণ্যের আদর্শ বদলে গেছে বলে? নাকি কবিতাও ক্রমশ সরে গিয়েছে বিচ্ছিন্নতার দিব্য সর্বনাশে? কোথায় সেই বহুদূর হৃতজগতের অংশগুলি? কবিতা কি আর তবে মানুষের বুকের ভিতরটা নিজেকে নিজে বুঝিয়ে দেবার কাজে লাগে না? সে কি উচ্চাসনে বসে অচেনা পোশাকে রহস্যময়ী সেজে চোখে চোখে কথা কইছে কেবলই কবিদের সঙ্গে? কোথায় কবিতার সেই জ্যোৎস্নাজড়িত নিশা? কবিতা তুমি কি এখন কিছু স্বপ্ন, বাকিটুকু স্মৃতি? বাঙালি কবি কবিতার স্বরূপ বিস্মৃত হয়েছেন কি? কবি, তুমি পথ হারাইয়াছ? কবিতা ধ্যানস্বরূপা। কবিতা রক্ত চায়। কষ্টার্জিত এই কবিতার মুখ। মিলের বাঁধন খুইয়ে আধুনিক কবিতা সরল হয়ে যায়নি, জটিল হয়েছে।
“বাঙালি কবির জাত” নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে হবে বলে আমি উদ্বিগ্ন শুনে আমার এক তরুণ বন্ধু একমুখ ধোঁওয়া উড়িয়ে বললেন, “কেন? এ আবার কঠিন বিষয় কেন? বাঙালি কবির জাত না-ই হল, ব্যর্থ কবির জাত তো বটে? অনেক দুঃখেই জীবনানন্দকে লিখতে হয়েছিল, ‘সকলেই কবি নয়।’ শতকরা নব্বুইজন বয়স্ক বাঙালিই ব্যর্থ কবি। বাকি দশজন ব্যর্থ আর-কিছু!”—বেশ তো। তাই-ই যদি হয়,কবিতাকে এতো ভালোবেসে কবিতার ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে বাঙালি কী অর্জন করেছে? কোন্ সে চরিত্রবল? কোথাও আছে কি সেই নিভৃত নীল পদ্মের ইশারা? ভিতরে আছে কি কেউ? রক্তের ভিতরে কেউ আছে?
পরিণত বয়সে পৌঁছে এলিয়টকে বলতে হয়েছিল কোনো সত্য কবিই তাঁর কাব্যের চিরন্তন মূল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না, তাঁর সমগ্র জন্মটাই যে ব্যর্থতার সাধনায় ভ্রষ্ট হল না—তা, কে জানে? বাঙালিকেও কি পিছনে ফিরে একবার তার প্রিয় কবি-প্রতিমাটির দিকে সত্যদৃষ্টিতে তাকাতে হবে না? ভাবতে হবে না, এখন কি তবে—“বিবাগী ভ্রমর ওড়ে, পাখা নাড়ে, তারপরে আর কিছু নেই?” নাকি সে। অতিতরুণ কণ্ঠে ঘোষণা করে উঠবে—“প্রথাবদ্ধতার ঋণ অতিক্রম করে যাবে এ বসন্তে আমার কবিতা?”
এজরা পাউন্ড চেয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর কবিতা হবে গ্রানাইটের মতো কঠিন। তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকবে তার অন্তরাত্মার সত্যে। আবেগমুক্ত, ঋজু, কঠোর সন্ন্যাসীর মতো নির্লিপ্ত হবে তার বহিরঙ্গ। ওদিকে পাস্টেরনাক বলেছিলেন লেখার মূল্য নির্ভর করছে বিষয়বস্তু চয়নের ওপরে নয়, লেখকের সঙ্গে সেই লেখাটির সম্পর্কের গভীরতার ওপরে। প্রকাশভঙ্গির অন্তরঙ্গতার ওপরেই লেখার গুরুত্ব এবং সার্থকতা নির্ভরশীল। অবশ্য প্রসঙ্গ ছিল গদ্য।
তাঁরা মহাকবি। তুচ্ছ পাঠক আমার তো মনে হয় কবিতাকে সন্ন্যাসী হতে হবে না, প্রেমিক হতে হবে। সত্যসন্ধ, আর বিশ্বস্ত প্রণয়ী। কবিতা পড়ে আমি কী চাই? কবিতা লিখে আমি কী চাই? আমি চাই একটি স্পর্শ। চাই হাতের মধ্যে আর একটি হাত ধরতে। যিনি আমার কবিতাটি এখন পড়ছেন, তাঁর পাশটিতে ঘেঁষে বসতে চাই, আমার নিঃশ্বাসবায়ু তাঁর শরীরে পড়ুক, আমি চাই। বিপ্লবই হোক আর বসন্তই হোক, যাই আমার কবিতার বিষয় হোক, আমি চাই পাঠকের উষ্ণ ত্বকের ছোঁয়া। অর্থাৎ আমার কবিতাটি পড়ে পাঠকের যেন এক মুহূর্তের স্তব্ধতায় তাঁর নিজের কথাই মনে পড়ে যায়। আমার কথা নয়। আমার কবিতাটি যেন তাঁর হয়। আজ দু’হাজার খ্রীষ্টাব্দের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমার বলতে ইচ্ছে করছে—কবিতা, তোকে খুব সহজ হতে হবে আর খুব শক্তপোক্ত। ঋজু আর জ্যান্ত। হবি মমতাময়ী, কিন্তু এলিয়ে পড়লে চলবে না। দিনকাল বড় কঠোর, বড় জটিল। চারিদিকে বড় অপ্রেম। কবিতা তুই শক্ত হ’। আরও গভীর করে ভালোবাসতে শেখ। তোকে দেশ উদ্ধার করতে হবে না, মানবাত্মার মুক্তি ঘটাতে হবে না, তীক্ষ্ণ জটিল বিদ্যেবুদ্ধির পরীক্ষা দিতে হবে না তোকে, কেবল মানুষের বুকের কাছে ঘেঁষে বসতে হবে। তার হাত মুঠোর মধ্যে তুলে নিতে হবে। বাংলা কবিতাকে আজ বাঁচাতে পারে কেবল সৎ কবিতাই। উদ্ধরেৎ আত্মনা আত্মানম্। অবশ্য সৎ কবিতা যে কী, তা নিয়ে অনেক ধরনের মত থাকাই স্বাভাবিক। আমারটি তাদের মধ্যে একটি মাত্র।
অবিষয়ী বাঙালি একদিন অন্তর্জগতের বাসিন্দা হতে পেরেছিল। তখন কবিতা হয়েছিল তার আত্মার প্রতীক। এখন আছে শুধু তার স্মৃতি, তার সৌরভ আর তার অহঙ্কার। সেই অন্তর্জগত আর আমাদের আয়ত্তে নেই। কোথায়, কেমন করে পেতে দেবো সেই আঁচলটুকু আমরা, কবিতা যার ওপরে রাখতে পারে তার চরণ? আমাদের সর্বাঙ্গে এখন টাইট ব্লু জীনসের পোশাক। বাঙালির বাস এখন বহিরঙ্গে। বাঙালির মনপ্রাণ ছেয়ে রয়েছে মাছ আর মারুতি। সেখানে কবিতার ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই। ছোট এ তরীটি যে বিজ্ঞাপিত আদর্শের সোনার ধানেই ভরে গিয়েছে। আর মূর্খ নয়। জগৎ সুষ্ঠু আর সকলের মতোই ‘ভেতো’ বাঙালিও এখন চতুর বড়।
আমরা আজ বাস করছি বিজ্ঞাপনের জগতে। এই জগৎটি আমাদের কাছে এখনও অভিনব বলেই একটু যেন বেশি মোহন—কাগজ, রেডিও, সিনেমা, টিভি—সর্বত্র আমাদের নয়নকে, শ্রবণকে, মননকে, ইচ্ছাকে, স্বপ্নকেও নিয়ন্ত্রণ করছে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের পৃথিবী কবিতার পৃথিবী নয়। বিজ্ঞাপন আমাদের চোখ টেনে নেয় বাইরে দূরে। বিজ্ঞাপন বাঙালিকে উন্মুক্ত বিশ্বের নাগরিক করে দেবার আশ্বাস দেয়।
কবিতা অন্তর্লোকের। যে যাই বলুক আমার গভীর বিশ্বাস অবগুণ্ঠনবতী, অন্তর্জগতের বাসিন্দা কবিতাই পারে মানুষকে বিপুল ব্রহ্মাণ্ডের অক্ষয় পরমাণু করে দিতে। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের অক্ষয় পরমাণু হতে চায় কে? যে চাইবে,—“সে জন পাগল পরাণ বিকল/ভবকূল হতে ছিঁড়িয়া শিকল”, সে শুধুই কবি।
কবিতা নিয়ে তবুও বাঙালির এত কষ্ট কেন? “কবিতার পৃথিবী ছোটো নয়” বাঙালির বুকের ভিতরে, খুব ভিতরে কোথাও এমন একটা নিশ্চিত, অমোঘ সংবাদ কি রয়েই গেছে? তবু আমার রক্তে খালি তোমার সুর বাজে?
শ্ৰীমতী প্রাবন্ধিক তো এত পৃষ্ঠা লিখলেন। সম্পাদকের আজ্ঞায় নানাদিক থেকে বাঙালি জাত-কবি কিনা এই প্রসঙ্গটি উল্টে পাল্টে দেখার প্রয়াস পেলেন। কিন্তু শ্ৰীমতী কবি এক্ষেত্রে কী করতেন? চার লাইনেই প্রবন্ধ শেষ হয়ে যেতো যদি গোড়াতেই কবি-বন্ধুটিকে উদ্ধৃতি করতুম—
“ছোটো নয়, ছোটো নয়”,—এই কথা হাওয়া বলে গেলো
“ছোটো নয়, ছোটো নয়”,—এই কথা দু’একটি
মানুষ শুধু বুঝতে পেরে
কবিতার বই কিনে, বাড়ি চলে এলো।
বিশাল রঙিন বল অন্ধকারে গড়িয়ে গড়িয়ে আসে
মাটির ওপরে।।”
যাঁদের কবিতার পঙ্ক্তি ব্যবহৃত হয়েছে—রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রফিক আজাদ, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, কৃত্তিবাস রায়, বিবেকানন্দ, নজরুল, সুকুমার রায়, রামমোহন রায়, বিদ্যাপতি।
‘দেশ’
