পাকশালার পাকে পাকে

পাকশালার পাকেপাকে

রান্নাবান্নার মধ্যে নাকি একটা গোটা জাতির সভ্যতা সংস্কৃতির নাড়ীর খবর (হাঁড়ির খবর?) ধরতে পারা যায়। যত জটিল রান্না তত উন্নত সংস্কৃতি। যথা বাঙালি, যথা ফরাসি। জাতির পক্ষে যাই হোক, রান্নাঘর থেকে কিন্তু একটা পরিবারের সাংস্কৃতিক মান ঠিকই যাচাই করা যায়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে “আধুনিক রান্নাঘর’ বলতে কিছু মেশিন বুঝি না, কিন্তু মনোভাব বুঝি। বুঝি, যে-রান্নাঘরে গৃহকর্তার হাতেও হাতাখুন্তি থাকবে, শুধুই গৃহিণীর হাতে নয়। গেরস্থর রান্নাঘরকে আধুনিক করতে হলে কেবল বাইরে থেকে অগ্রগতির যন্ত্র আমদানি করলেই তো হবে না, গেরস্থর মনের ভেতরটাতে অগ্রগতির মন্ত্র আমদানি করাটা জরুরি। আরেকটু ভাবনা, আরেকটু সহানুভূতি, আরেকটু সম্মানবোধ, আরেকটু সমতা। হ্যাঁ, তখনই বলবো, বাঃ, আধুনিক পরিবার বটে! টালিতে আর উনুনে, ফুড প্রসেসর আর মাইক্রো-আভেনে তো আধুনিক রান্নাঘর হয় না। আধুনিক মানুষের রান্নাঘরকেই আমি “আধুনিক রান্নাঘর” বলি। আধুনিক মেশিনের ঘরকে নয়।

আমাদের টিভিতে, পত্রিকায় মশলাপাতি, বাসনপত্র, রান্নাঘর তৈরির সাজসরঞ্জাম ও রান্নার যন্ত্রপাতির হৃদয়হরণ করা বিজ্ঞাপনে শুধুই দেখি সুন্দরী মেয়েদের ছবি—পাপিয়া, মুনমুনরা প্রেশারকুকার, স্টেনলেস স্টীল, কি গুঁড়ো মশলার গুণপনায় আহ্লাদে আটখানা। কিন্তু ছেলেরা কেন নয়? মিঠন কৈ? অমিতাভ? ভিক্টর? সৌমিত্র? তাঁদের হাতে খুন্তি দিয়ে বিজ্ঞাপন যতদিন না বেরুচ্ছে, ততদিন কিন্তু জানবো আমাদের রান্নাঘরের কালচারটা ভিতরে ভিতরে প্রাচীনপন্থীই রয়ে গেছে, পাকশালাটা যতই সেজেগুজে বাইরে বাইরে সায়েবিআনা শিখুক। সায়েবদের দেশের কাগজপত্তরে কিন্তু আজকাল ঘরোয়া রান্নার বিজ্ঞাপনে পুরুষদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে, আগে যেখানে শুধুই মেয়েদের রাখা হতো। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও সে-সময় আসেনি। রান্নাঘরে নারীত্বের স্বাভাবিক স্ফুরণ ঘটার কথা, তাই মুনমুন, পাপিয়াকে রান্নাঘরের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করলে তাদের লজ্জা নেই। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন কি কপিলদেবকে, সৌমিত্র কি নাসিরুদ্দীনকে রান্নাঘরের বিজ্ঞাপনে দেখানো সহজে যাবে না। কেননা তাতে “মাচো’ ইমেজের যেমন ক্ষতি, “অ্যাঁতেল” ইমেজেরও তেমনি সর্বনাশ। পুরুষমানুষের পৌরুষ এই দুই স্টেশনের মধ্যেই দৌড়োদৌড়ি করে কিনা! কিন্তু জমানা বদল্ গয়া।

অবশ্য বিলিতি দেশের টিভি বা পত্রিকার বিজ্ঞাপনে যখনই “প্রফেশনল” রান্নার প্রসঙ্গ ওঠে, অমনি সাদা টোপর পরা ‘শেফ’ কিংবা ‘বেকার’ (যখন যেমনটি দরকার) হাস্য বদনে চলে এসে জ্ঞান দিয়ে যায়। টিভিতে রান্না শেখানোর ক্লাসও নেন ছেলেরা। যেখানেই রন্ধনকার্যের বিনিময় মূল্য অর্থ দিয়ে মাপা হয় অর্থাৎ রান্নার কাজটি যখনই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখনই সেটা চলে যায় মেয়েদের আওতার বাইরে, পুরুষের কাজ হয়ে ওঠে। যেমন হোটেলের বাবুর্চি, ভিয়েনের ঠাকুর, মিষ্টির দোকানের ময়রা। এমন কি বাড়ির রাঁধুনি বামুনঠাকুরও। কেবলমাত্র রন্ধনকার্যের বিনিময়মূল্য যখন স্নেহমমতা, (অথবা স্রেফ বিবেক, কর্তব্যবোধ) তখনই রান্নাঘরে মেয়েদের প্রবেশ এবং ক্রীতদাসীত্ব। (যার নামটি কিন্তু “একাধিপত্য”!) তখন রান্না কাজটার আর সামাজিক বাণিজ্যিক মূল্য নেই। রাঁধুনীরও সম্মানমূল্য অপ্রয়োজন। কাজটি সঙ্গে সঙ্গেই তুচ্ছতার পর্যায়ে চলে গেল। শিল্প নয়, কলা নয়, নেহাৎ গৃহকর্ম। “মেয়েলি” কাজ।

এই ধারণাটি নির্মূল না হওয়া অবধি আমরা একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করতে পারবো না।

॥ ২ ॥

কিন্তু রান্নাঘর কি একটা? রান্না ব্যাপারটা এত জটিল, সভ্যতাসংস্কৃতির এত বিভিন্ন স্তরে তার পরতে পরতে পাপড়ি-মেলা, যে তার হিসেব বড় শক্ত। রাত্রের দিকে গড়িয়াহাটের মোড়ে বেশ বড় করে একটা রান্নাঘরে বসে দেখেছি, ফুটপাতবাসী ভিকিরিদের রান্নাঘর। কাঠকুটো ছেঁড়া কাগজ দিয়ে ইঁটের তৈরি উনুন ধরিয়ে তাতে ত্যাড়াব্যাঁকা কালিঝুলি মাখান হাঁড়ি বসিয়ে নানা ধরনের চালের সঙ্গে বাজার-কুড়োনো মাছের কান্‌কো, মাংসের ছাঁট, পচা-গলা আলুটা-মুলোটা সেদ্ধ হয়। যে ভিখারিণী সেটি সেদ্ধ করেন তাঁর হাবভাবই আলাদা। বড়োবাড়ির গিন্নিমায়ের মতো। জেগে-থাকা বাচ্চাকাচ্চারা রান্নার চারপাশে লোভী চোখে বসে থাকে। বুড়োরাও, একটু দূরে বসে ওই অমৃতের ভোগের অপেক্ষায় বিড়ি ফোঁকে। রন্ধনকর্ত্রীকে যে-ই যখন ক্ষুধায় অর্ধেক হয়ে “আর কত দেরি” প্রশ্ন করে, সেই অনিবার্য ধমক শোনে “আদেখ্লা”! চতুর্দিকের বাতাস পচা রান্নার দুর্গন্ধে ভরে ওঠে। বাসস্টপে দাঁড়ানো মুশকিল হয় আমাদের মতো চারবেলা ভরপেট-খেকো বাবুবিবিদের পক্ষে।

ঝোপ্‌ড়িবাসীদের রান্নাঘর এর চেয়ে ঢের উন্নত। বস্তিবাসীদের আরও একটু। তারা কেউ কেউ স্টোভের মালিক, কেউ তোলা উনুনের। রীতিমতো জ্বালানির খদ্দের। তোলা উনুনে গুল্-ঘুঁটে-কাঠকুচোর আগুন জ্বলে, ধোঁয়ায় ধোঁয়া হয়ে যায় দিগ্বিদিক। কিন্তু তাদের রান্না থেকে পচা মাছের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে না। তারা শ্রমিক, দিনমজুর, ঠিকে কাজের মেয়ে, তাদের কাজ আছে। তাদের ঘর আছে। ঘর থাকলেই আরও কিছু নাকিও থাকেই। রাস্তার মোড়ে রিকশাওলাদেরও একবেলার রান্নাঘর বসে রোজ গভীর রাত্রে, ওরা কখনো রুটি পাকায়, কখনো ভাত রাঁধে দুটোই দেখেছি। দুপুরবেলায় আগে দেখতুম অপূর্ব ঝলমলে সোনার কানাউচু থালা করে হলুদ ছোলার ছাতুতে সবুজ লঙ্কা মেখে খেতে; সোনার ঘটিতে করে ঠাণ্ডা জল। আমাদের বাড়ির কাছেই, পাকাকলার মত রং এক বিহারী ঠাকুরের দোকানে। এখন ফুটপাতে, সেই ঠাকুরের পুত্রের নতুন রান্নাঘরের বাসন শুকোয়, নতুন বাসনকোসন। পুত্রের পৈতে দেখা যায় না, গায়ে গেঞ্জি থাকে। আর সব থালাগুলোই হিন্দেলিয়ামের। আর ঘটির বদলে গেলাস। কোথায় গেল সেইসব সোনার মতন সুশ্রী ঘাঁটি, কাঁসার ঘটি কাঁসি? ছোটবেলাতে দেখেছি গড়িয়াহাটের ভিকিরিদের রান্না হতো পোড়ামাটির হাঁড়িতে। এখন হয় কালিঝুলিমাখা ত্যাড়াবাঁকা হিন্দেলিয়ামের ডেকচিতে। সময়ের সঙ্গে ফুটপাতের রান্নাঘরেও বদল এসে গেছে, আরও বাবুবিবিদের রান্নাঘরে আসবে না? আমার এক পিসিমাকে দেখতুম ভিজে গামছা পরে শাশুড়ির নিরামিষ হেঁশেলে রান্না করছেন। আমরা গেলে লজ্জিত হেসে খুন্তি নেড়ে রান্নাঘরের চৌকাঠ থেকেই অভ্যর্থনা করতেন, ছোটজা-কে বলতেন আমাদের দেখাশুনো করতে। তিনি তাঁতের শাড়ি পরে আমিষ হেঁশেলে রাঁধেন, ওসব গামছা পরা তাঁর পোষায় না। শাশুড়ির রান্নার ঝঞ্ঝাট তিনি পোহান না। আমার সেই ভিজে গামছা পরা পিসিমার নাতনিটি এখন বাসীকাপড়ের ওপর হাউসকোট চড়িয়ে চটি পায়ে রুক্ষ চুলে শ্বশুর শাশুড়ির জন্যে রান্না করেন, কাচের টালি বসানো, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দিয়ে মোড়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে। আধুনিক রান্নাঘরের যে সবই ভালো, তা নয়। এই দাঁড়িয়ে রান্না করাটা কিন্তু বেশ অস্থাস্থ্যকর। পায়ে ভ্যারিকোজ ভেইনস রোগ হয়ে যায়। বিলেতের গিন্নিদের আজকাল রান্নাঘরে উঁচু টুল নিয়ে বসে বসে কাজকর্ম করতে বলেন ডাক্তারেরা। আমাদের দেশের পিঁড়িতে বসে কুটনো কোটা রান্না করাটা অনেক বেশি স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো অভ্যাস ছিলো। যেমন ভালো হেঁট হয়ে ঘর ঝাঁট দেওয়া, হাঁটু মুড়ে ঘর মোছা (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যন্ত্র দিয়ে ঝাড় লাগানোর চেয়ে), মেদ জমে না পেটে। হজম ভালো হয়। কোমরে পায়ে বাত হয় না। বয়েসও বাড়তে সাহস পায় না চট্ করে। কীপ্-ফিট্ প্রোগ্রাম একটা চমৎকার।

আধুনিক সংসারে আর মেঝেতে বসে খাওয়া নেই, মেঝেয় রান্নাবান্নারও পাট নেই। সবই ঊর্ধ্বগামী। টেবিলে উঠে বসেছে জনতা স্টোভও। এখন রান্নাঘরে জুতো পায়ে ঢুকলে তত অস্বাস্থ্যকর কিছু নেই। তবুও বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে স্ত্রী-পুরুষ কাউকেই এখনও রাস্তার জুতো পরে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখি না বড় একটা। আজকের বউমারা যে চটি পায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রান্না করেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুটনো কোটেন, ইলেকট্রিকের যন্ত্র চালিয়ে বাটনা বেটে নেন, সেই চটিটিতে কিন্তু রাস্তার ধুলো লাগে না। ওটি ঘরে পরার চটি। এটা নিয়মরক্ষা নয়, স্বাস্থ্যরক্ষা। রান্নাঘর বিষয়ে কতকগুলো প্রাথমিক পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যরক্ষার নিয়মকানুন মেনে চলা বাঙালি বাড়ির সুস্থ রীতি ছিল। তারই বাড়াবাড়িটা শুচিবায়ুর পর্যায়ে পৌঁছলে ভিজে গামছা পরে রান্না করার পালা এসে যায়। রান্নাঘরে জুতো পায়ে ঢোকাটা ছিল একটা বিশেষ চরিত্র লক্ষণ। রোহিণীর রান্নাঘরে হরলাল যে জুতো পায়ে মসমস্ শব্দ করে গিয়ে ঢুকেছিল, তাতে হরলালের এবং রোহিনীর মূল্যবোধ বিষয়ে অনেকটা সংবাদই সংকেতে জানিয়ে দিতে পেরেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

রান্না খাওয়া ব্যাপারটা বাঙালির কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড। সেই চর্যাপদের “ভগ্করভত্তা” থেকেই কাব্যে খাবার সুখের বর্ণনা পাচ্ছি। এত রোমান্টিক রবি ঠাকুর পর্যন্ত “পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে” লিখে বয়েসকালে আনন্দ পেয়েছেন। বাঙালির কাছে রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়াটা খুব জরুরি বলে রান্নাঘরটাও কি খুব জরুরি? মোটেই নয়। অনেক কাল পর্যন্ত যে দুটি ঘর বাঙালিবাড়িতে সবচেয়ে অযত্নে অস্বাস্থ্যকরভাবে তৈরি হতো, তা হলো আঁতুড়ঘর আর রান্নাঘর। কেননা ওদিকে পুরুষদের কোনো কাজ নেই। ঘরগুলিতে শুধু মেয়েদেরই বসবাস। নেহাৎ মেয়েমহল। ওখানেই যতটা সম্ভব খরচ কমানো নিয়ম একচিলতে কুটুরিতে, ধুলোময়লা, ইঁদুর আরশোলার মধ্যে গরমে সেদ্ধ হতে হতে বাড়ির গিন্নিবান্নি বউঝিরা সারাদিন ধরে কর্তাদের রসনা পরিতৃপ্তির ব্যবস্থা করতেন।

॥ ৩ ॥

দেশ-বিদেশের রান্নাঘরের গল্প আর কী করবো! বিদেশের সব রান্নাঘরই মোটামুটি এক। যে-কোনো কারুর রান্নাঘরে ঢুকেই গিন্নির অনুপস্থিতে মনের সুখে রান্না করা যায়। তাকের ওপর মশলা টশলাগুলো সাজানো, বাসনপত্র সবই যথাস্থানে গুছোনো, যন্ত্রপাতি সব ড্রয়ারে মজুত, রান্নার উনুনটি নিজেই তো কত কিছু কায়দায় রান্নাবান্না করতে জানে, স্বয়ংক্রিয় বেল বাজিয়ে বলেও দেয় তোমার রান্না খতম। এবার তুলে নাও। কথা না শুনলে রান্না পুড়ে যাবার সম্ভাবনা। খুব কম লোকেরই রান্না পুড়ে যায়। আমাদের দেশে প্রত্যেক বাড়ির রান্নাঘরের চরিত্র আলাদা। গিন্নি না থাকলে তাঁর রান্নাঘরে সুবিধে করা যায় না। তাঁর নিজের জানার মধ্যে সবকিছু গুছোনো। দেখিয়ে না দিলে অন্যের পক্ষে মুশকিল। গিন্নিদের নিজস্ব চরিত্রের একটা ছাপ থাকে দিশি রান্নাঘরে।

আধুনিক কলকারখানার সমাজে শহুরে মানুষের জীবনযাত্রার ঢঙে একটা ঐক্য, একটা সামগ্রিক সমতা এসেছে, যার ফলে জাতীয় বৈশিষ্ট্যগুলি মুছে গিয়ে ইউরোপ, আমেরিকায় সব দেশের রান্নাঘরই আজকাল প্রায় এক ধরনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতালীয় আর ইংরেজী রুশী আর ফরাসি রান্নায় যেমন তফাত, রান্নাঘরে কিন্তু তেমন তফাত আর নেই। অথচ আগেকার দিনে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। রুশ আর ইতালীয়ের, গ্রীক আর ইংরেজের রান্নার স্বাদের মতই তাদের রান্নাঘরের চরিত্রও ছিল ভিন্ন। এখন সব শহরের সব রাস্তায় পাশ্চাত্য দেশে যেমন একই ফাস্ট-ফুড বিক্রি হয়, তাদের ঘরে ঘরেও রান্নাঘর সব এক রকমের হয়ে গেছে। দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপের ঘোর গণ্ডগ্রামে গরীব গুর্বো পাড়াতে গেলে এখনও কিছু কিছু সেরকম পুরোনো রান্নাঘর দেখা যায়। সেখানে সর্বাধুনিক টেকনোলজির কল্যাণে আঞ্চলিক বৈচিত্র্যগুলি ভেঙে গুঁড়িয়ে এক করে ফেলা হয়নি এখনও। ইউনিফর্ম পরে নেয়নি রান্নাঘর। বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ বিশেষ খাদ্য প্রস্তুতের জন্য বিশিষ্ট সব বাসনপত্র লাগতো। এখন বাজারেই যা রেডিমেড কিনতে পাওয়া যায়, সেইসব খাদ্যবস্তু তো আগে ঘরেই তৈরি করতে হতো! বিভিন্ন রকমের ‘নাস্তা’ যেমন স্পাগেত্তি, রাভিওলি ম্যাকারোনি ইত্যাদি। মদও আগে ঘরে তৈরি হতো, কতরকমের হতো জ্যামজেলি, শুকনো মাংস। এখন সবই বাজারে আছে।

আমাদের ভারতবর্ষেও তেমনি। যেমন আঞ্চলিক খাদ্যরুচির তফাত আছে তেমনি রান্নাঘরেরও অনেক ফারাক। দক্ষিণের দেশে রান্নাঘরেই ঠাকুরঘর। প্রায় সব ব্রাহ্মণ বাড়িতেই দেখেছি একদিকে তাকের ওপরে পেতেছেন গৃহদেবতার আসন, অন্য দিকে উনুন। সেই ঘরেই খাবার ব্যবস্থা। বাড়ির লোকেরা মেঝে মুছে নিয়ে মেঝেতেই খেতে বসেন। আসন পাতার অভ্যাস নেই। দক্ষিণে দেখেছি রান্নাঘরের দিকে নজর দেওয়া হয় অন্যসব ঘরের মতোই শ্রদ্ধার সঙ্গে। শোবার ঘরের মতোই যত্নে, ভালোভাবে তৈরি হয় রান্নাঘরটিও। আমাদের এই পূর্ব দেশে যেমন অ্যাসবেস্টসে কি টিনে, যেনতেনপ্রকারেণ হেলায় ফেলায় ঢেকেঢুকে দেওয়া হয় রান্নাঘরের ছাদটা, তেমন নয়। বাঙালি বাড়িতে সবচেয়ে অযত্নে, সবচেয়ে অল্প খরচে বাজে মালমশলায় তৈরি হয় রান্নাঘর। দক্ষিণে তেমনটি দেখিনি ইদ্লি, দোসার নানারকমের দীর্ঘ সময়সাধ্য এবং শ্রমসাধ্য রন্ধন-প্রণালী দক্ষিণ দেশের। সেই রান্নাঘরে ক্রমশ নানা বদল দেখলুম। বদল হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইদ্লি-দোসা তৈরির দীর্ঘ ডাল ভেজানো, চাল গুঁড়োনো ইত্যাদির জটিল পদ্ধতির দুই, তিন দিনের প্রস্তুতিপর্ব ক্রমশ কমতে কমতে ইনস্ট্যান্ট পাউডারে এসে দাঁড়িয়েছে। রেডিমেড ইদ্লি-ফ্লাওয়ার, দোসা-ফ্লাওয়ার, সম্বর পাউডার বিক্রি হচ্ছে। তৈরি হয়েছে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইদ্লি-কুকার।

দিল্লিতে “রাধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা” রুটিনে অভ্যস্ত গৃহিণীজীবনে আমার অনেক ধরনের দিশি রান্নাঘর দেখবার সুযোগ হয়েছিল। বড়লোকের বিলিতি ধাঁচের রান্নাঘরের রূপ সব সংসারেই এক। তা সে ইঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, যারই হোক না কেন। সব ধনী বাড়িতেই আধুনিক রান্নাঘরটি যেন ইউনিফর্ম-পরা সেপাই। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের দিশি রান্নাঘরে পা দিলেই তার প্রাদেশিক চরিত্রের ঐশ্বর্যটি ধরা পড়ে, ধরা পড়ে গিন্নির স্বভাবখানাও।

দিল্লিতে আমাদের রান্নাঘরের লাগোয়া ছিল ভাইস-চ্যানসেলর প্রফেসর কে. এম. রাজের রান্নাঘর। দুটি ঠিক যেন যমজ ফ্ল্যাট। যমজ রান্নাঘরও। ওইটির কেরলী গৃহকত্রী অসামান্য সুগৃহিণী। তিনি ভোরে উঠে ধরেই নিতেন স্বামী আজও লাঞ্চে দশজনের খাবার খাবেন। প্রফেসর রাজের স্বভাবও ছিল আমাদের গৃহকর্তার মতই, না বলে অতিথি ধরে আনার। সেইমত ছ’টায় স্নান সেরে কোমর বেঁধে রান্নাঘরে অবর্তীণ হতেন তাঁর পত্নী। রাজ্যের জটিল থেকে জটিলতর রন্ধনে তাঁর ছিল অদম্য উৎসাহ। আমাদের ফ্ল্যাটে রান্নাঘর ছিল দুটো করে। একটাতে দিশি উনুন। দিশি যন্ত্রপাতিতে ভরা। অন্যটাতে বিলিতি উনুন, বিলিতি যন্ত্রপাতি। আমাদের দুটি ফ্ল্যাটেই সবই ছিল একরকমের। শুধু বয়সে দুই গিন্নির ছিল পুরো দশ বছরের তফাত। তাই রাজগিন্নি আমাকে যেমন রান্নাবান্না ঘরকন্না শেখাতেন আবার তেমনি ধম্কে বৃন্দাবনও দেখিয়ে দিতেন “ওসব কবি টবি আমি জানি না বাপু, আমরা বুঝি কাজ” ছিল তাঁর মুখের বাক্যি! আমিও তাঁদের মন রাখতে রাখতে “কবি টবি বুঝি না বাপু’ হয়ে গিয়েছিলুম। তাঁর বিলিতি রান্নাঘরটি টিপটপ ছিল, ব্যবস্থা সব আমারটার মতই, তেমন পার্থক্য ছিল না। কিন্তু তাঁর দিশি রান্নাঘরটি ছিল অনেক বেশি ‘ইন্টারেস্টিং’। ওঁদের একটা উদূখল ছিল। প্রাগৈতিহাসিক, ভীষণ চেহারার কালো পাথরের বিপুল এক হামানদিস্তের গর্তে ওঁদের আদা-পেঁয়াজ বাটা হতো। আমাদের মতো শিলনোড়া ছিল না ওঁদের। আমি ভাবতুম সুদূর কেরালা থেকে দিল্লি অবধি এল কেমন করে অত বড়ো পাথরের জিনিসটা! ঠেলে নড়ানো যেতো না। ইতালীয় ফোয়ারার মতো ওজনদার ক্লাসিকাল দ্রাবিড় গাম্ভীর্যে উদূখলটি রান্নাঘরের এক কোণ আলো করে বসেই থাকতো। ওদিকে আমার ছিল একটা লোহার হামানদিস্তে আর একটা পেতলের। সেই বিপুল ব্ৰবডিংনাগের প্রস্তর যুগের উদ্ধখলের পাশে আমার ওই ক্ষুদ্র যন্ত্রগুলিকে দেখাতো যেন মিনিয়েচার—লিলিপুটের বামনের মতো। ওদের রন্নাঘরে আরেকটা অদৃষ্টপূর্ব বড়সড় পেতলের যন্ত্র ছিল যাতে বানানো হতো চালের গুঁড়োর তৈরি নুড্লস। শ্রীলঙ্কায় এই নুড্লসের নানারকম রান্না খেয়েছি—মিঠে, নোন্তা, ঝাল, টক সবরকমের। কেরালাতেও যে সেই নুড্লস রান্না হয় তা জানা ছিল না। কেবল রান্নাই নয়, রান্নার দিন সকালে রান্নাঘরেই তৈরিও হয় তা। বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। নারকেলের দুধ আর চিনি দিয়ে ফুটিয়ে সেদ্ধ করে একটা উপাদেয় রান্না সরসম্মা করতেন তাই দিয়ে। তার প্রস্তুতি চলতো দু’দিন ধরে। আমাদের বাঙালি বাড়িতে যেমন ‘চষি’ তৈরি হতো, তেমনি সহজ নয়। এখন তো ‘চষি’র চল প্রায় উঠেই গেছে, আর শহরের কোনও বাড়িতেই তৈরি হয় না বোধ হয়। যেমন দ্রুত উঠে যাচ্ছে বড়ি দেওয়ার প্রচলনটা। আমাদের মাসি পিসিরা কোনোদিন বাজারের বড়ি কেনেননি, আমরা ঠিক উলটো, আমরা কোনোদিন ঘরে বড়ি দিই না। সময় কোথায়? অথচ ছোটোবেলায় পিসিমার সঙ্গে ভাদ্র মাসের রোদে উবু হয়ে বসে ছাদের মেঝেয় মেলা শাড়ির ওপর দেওয়া বিচিত্র ধরনের বড়ির নাক টেনে টেনে তুলেছি আর ছড়া কেটে প্রার্থনা করেছি আমার বরের নাকটা যেন ওই বড়ির মতন লম্বা হয়। মাসি পিসির দয়ায় চিরপুষ্ট আমি তৈরি-বড়ি যে বাজারে কিনতে পাওয়া যায়, সেটাই জেনেছি মাত্র পাঁচ-ছয় বছর আগে।

সরসম্মার রান্নাঘরে একটা আশ্চর্য সুন্দর পুরু লাল রঙের মাটির পাত্রে, মাছ-রান্না হতো। খানিকটা হাফ্-হাঁড়ির ধরনেরই দেখতে, চ্যাপটা, চ্যাটালো গড়নের যেন হাঁড়ি মাঝখানে কেটে ফেলা। মুখটা খুব চওড়া। সরসম্মা বলতেন ওটা কেরালার সর্ববাদীসম্মত মাছ রান্নার পাত্র। ওতে করে ছাড়া নাকি মাছ রাঁধাই যায় না। “সে কি? তোমরা বাঙালিরা এত মাছ খাও, তোমাদের মাছ রান্নার জন্যে স্পেশাল বাসন নেই?” আমাদের কড়ার যে কী প্রচণ্ড বহুমুখী প্রতিভা আছে, দুধ থেকে মাছ পর্যন্ত সবই রাঁধা যায়, ডেকচির চেয়েও বেশি অল-পারপাস বাসন সেটা সসম্মাকে বোঝনো মুশকিল। তিনি পারফেকশনিস্ট। কেরলের রান্নাঘর বাঙালিকে টেক্কা দেয়, যা দেখলুম, অথচ বাঙালির রান্না রীতিমতো জটিল, নিঃসন্দেহে! রোজই করি বলে আর খেয়াল করি না আমরা।

কেরলের রান্নাঘর যেমন জটিল, পাঞ্জাবের প্রাত্যহিক রান্নাবান্না তেমনি সরল ছিল। আমার প্রতিবেশিনীদের দেখতুম ওই রান্নাঘরের চৌকাঠে বসে আড্ডা মারতে মারতে রুটি করছেন, কিংবা ছুরি নিয়ে টিভির সামনে বসে সব্জি কুচোচ্ছেন। একটি ছুরি, একটি চাকি বেলুন, একটা তাওয়া, একটি কড়া, দু-একটি ডেকচি, দু-একটি হাতখুন্তি, শিলনোড়া, আর একটা স্টোভ। ব্যাস্। খাওয়াদাওয়াটা বিশেষ বড় ব্যাপার ছিল না ওঁদের। একটি সব্জি বা ডাল বা হাতখুন্তি, শিলনোড়া, আর একটা বা আচার, স্যালাড, রুটি দুধ। স্বাদু, স্বাস্থ্যকর, সরল। গিন্নিদের প্রচুর অবসর থাকতো হাতে।

দিল্লিতে যেমন মোড়ে মোড়ে ইস্তিরিওলারা দাঁড়াতো—তেমনি পাড়ায় পাড়ায় বসতো তন্দুরওলারা। ঘরে আটা মেখে নিয়ে যাও, নিজে মাছ, মাংস মেখেজুখে তৈরি করে নিয়ে যাও,—ওখানে মাঠের মধ্যে ফার্স্টক্লাস তন্দুর-উনুন রয়েছে, মাটির তলায় তৈরির অদৃশ্য গন্গনে আঁচ, তাতে ঢুকিয়ে তৈরি করে দেবে তারা, তন্দুরি রুটি, তন্দুরি ফিশ কি চিকেন। তার জন্য সামান্য কিছু দক্ষিণা লাগবে। কলকাতাতে ইস্তিরিওলারা বহুদিনই এসে গেছে, কিন্তু তন্দুরওলাদের দেখিনি। জানি না দিল্লিতেও তারা আর আছে কিনা! খোলা জমি কিছুটা চাই তো মাটির নীচে তন্দুর গড়তে।

রান্নাঘর কি আর ঘরে আছে! এখন শহরের পথে বেরিয়ে এসেছে সে। পথে ঘাটে কতো রান্নাঘর। ঠেলাগাড়িতে রোলের দোকান মানেই তো মোবাইল মিনি রান্নাঘর। আমাদের ছেলেবেলাতে গল্পের বইতে যেই পড়তুম ছেলেরা বাপের পকেট থেকে পয়সা চুরি করে “চপকাটলেট” খাচ্ছে, অমনি জিবে জল এসে যেতো। কিন্তু “রেস্টুরেন্টে” যাওয়া আমাদের নিষেধ ছিল। এখন হাতে রোজগারের টাকা, এখন পথে পথে কতই রাজা মহারাজা শাহেনশার নামে ঝুপড়ি দোকানে চপকাটলেটের ছড়াছড়ি। যত খুশি খাও। অথচ মনের মধ্যে ছেলেবেলার ওই গল্পের বইয়ের খাওয়া “চপ্কাটলেটের” সাধ কিন্তু আজও মেটেনি!

॥ ৪ ॥

কলকাতায় এসে চাকুরে-মা হয়ে কাজ নেবার আগে, এক যুগ ধরে কেবল রান্নাই করেছি, কাজেই রান্নাঘরের সঙ্গে আমার একটা প্রাণের যোগ ছিল। আজ রান্নার সঙ্গে জীবনের যোগাযোগ থাকলেও প্রাণের যোগ আর নেই। এখন আমি নিজেকে সংসারী গৃহিণী বলে মনেই করি না। “ভোজনং যত্র তত্র শয়নং হট্টমন্দিরে” এটা জীবনে সত্যি সত্যিই অক্ষরে অক্ষরে ছত্রে ছত্রে পালন করে ফেলেছি—এবং তার জন্য ঈশ্বরের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। জীবনের অধিকাশংটাই আমার কাছে ঢাকা পড়ে ছিলো, এবং তেমনি অলক্ষ্যেই থেকে যেতো। কেবলই উন্নত থেকে আরো উন্নত, সুদৃশ্য থেকে আরো সুদৃশ্য আরো সুবিধেজনক, আরো সময় কমানো, আরো শ্রম বাঁচানো, আরো লোক দেখানো, আরো, আরো, আরো-তে। ভর্তি রান্নাঘরের স্বপ্নে স্বপ্নে লোভে লোভেই কখন একদিন আমার জীবনে সূর্য ডুবে যেত। এত বড়ো পৃথিবীটার সঙ্গে দেখাই হতো না। উন্নততর রান্নাঘরের বাসিন্দা হতে তো সকলেরই ভাল লাগে—কিন্তু কেবল সেই তুচ্ছ উদ্দেশেই কি মানুষ জন্ম নেয়? বিশেষ করে নারীজন্ম?

রান্নাঘর আর আঁতুড়ঘর এই দুটির মধ্যে নারীর মহীয়সী মাতৃমূর্তি পূর্ণতা পায়। এটি জন্মেই সে শিখে যায় সমাজের কাছে। অথচ আঁতুড়ে’র ক্রিয়ার শুরু যেমন আঁতুড়ের বাইরে, দশ মাস আগে, এবং তার দায়িত্ব মহীয়সী মায়ের একার নয়, তেমনি রান্নাঘরের যে উন্নয়নের ঢেউ এসেছে, সে ব্যাপারটাও বিশুদ্ধ ‘মেয়েলি’ নয়, তার দায়ের মূলে গৃহস্বামীও আছেন। আর আছে বণিকদের হিসেব। প্রথমেই তো দেখেছি, রান্নাঘর হাজারটা মানুষের হাজার রকমের জীবনযাত্রার সাক্ষী। রান্নাঘরের স্পষ্ট শ্রেণীবিভাগ আছে। দিশি, বিলিতি, এবং তাদের মধ্যেও নিচেরতলা, ওপরতলা আছে। রান্নাঘরটা একটা আইডেনটিটি কার্ডের মতো। গৃহকর্তার স্টেটাস সিম্বল। ‘কিচেন-ই-আম’ থেকে ‘কিচেন-ই-খাস’-এ ওঠা মানে নিজেকে সমাজের এক শ্রেণী থেকে অন্য এক শ্রেণীতে উন্নীত করা। মানে, আমি জনতা কোর্টে এফিডেভিড করে পদবী পাল্টাচ্ছি। মহাশয়গণ, দেখুন, কেমন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত, তা থেকে বিত্তবান হলুম। নিম্নমধ্যবিত্তকে ঠিক এক্ষুনি হিসেবে ধরছি না, কেননা তাঁদের ক্ষেত্রে এক্ষুনি কিচেন-ই-খাস তৈরি হবে না। ওটা এখন অনেককাল শুধু স্বপ্নের পর্যায়েই থাকবে কেননা পাকশালের জন্য টাঁকশাল লাগে।

আমার এক বিদেশী বান্ধবী এক ভারতীয় অধ্যাপককে বিয়ে করে দিল্লিতে এলেন। তাঁদের চমৎকার বিলিতি বাংলোবাড়ি। কিন্তু মেমসাহেবের অত পুরনো স্টাইল পছন্দ নয়। যত বছর উনি দিল্লিতে ছিলেন সমানেই দেখেছি বছরের পর বছর বাড়িতে মিস্ত্রি খাটতো। হয় কাঠের মিস্ত্রি, নয় দর্জি, নয় কলের মিস্ত্রি, নয় রাজমিস্ত্রি। সমানেই বাড়িটা ভাঙাচোরা, আধখেঁচ্ড়া, ঠকাংঠং, ঘস্ঘস্, ধুলোবালি। তিনি লাগাতার উৎসাহে বাড়িটার কিছু না কিছু উন্নতিসাধন করেই চলতেন। এবং সবাই তাঁকে বাহবা দিতুম। প্রথমে কিচেন দিয়েই শুরু হয়েছিল। তারপর বাথরুম হল। তারপর আরেকবার রান্নাঘর। তারপর আরেকবার স্নানঘর। তারপর শোবারঘর, পড়ারঘর, বসারঘর, এমনকি ভাঁড়ার ঘরও। একে একে সবই বদলাতে লাগলেন। নতুন নতুন সুন্দর সুন্দর আসবাবপত্তর, মডার্ন থেকে মডার্নতর ফিটিংস—আমি তো ছিলুম তাঁর ধৈর্য, পরিশ্রম, উৎসাহ, কল্পনাশক্তি, রুচি এবং কেরামতিতে সদাবিমুগ্ধ। উন্নতিশীলা কল্পনাপ্রবণ মহিলাটি শেষ পর্যন্ত স্বামীর-ঘরটাও বদল করে ফেললেন। আরেকটা বিয়ে করে সাগরপারের দেশেই ফিরে গেলেন। পিছনে পড়ে রইলো তাঁর অত সাধের তৈরি আধুনিকতম গৃহসজ্জায় অপরূপ বাংলোটি। অন্যের ভোগের জন্য। নিজে যতদিন এ দেশে রইলেন, একদিনও মিস্ত্রিবিহীন বাড়িতে স্বস্তিতে বসবাস করতে দেখলুম না তাঁকে। জীবনে মানুষ কী চায়? কিসের তৃপ্তি পাচ্ছিলেন তিনি ওই অন্তহীন গৃহসংস্কারে? যার কোনোদিনই শেষ হল না!

এই পাকশাল সংস্কার ব্যাপারটি বড় গোলমেলে। ওটি শুধু পাকশালের ব্যাপার থাকে না, পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে গৃহস্থকে। ময়াল সাপের মতো গিলে ফেলে শেষপর্যন্ত।

॥ ৫ ॥

রান্নাঘর বিষয়ে লিখতে হবে শুনে প্রশ্ন করি: “আর কে কে লিখবেন?” উত্তর হয়: “কেন, মেয়েরাই লিখবেন। একজন কোনো পুরুষও থাকবেন অবশ্য দলে।” (এই পুরুষ বেচারীকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলবেন “টোকেন মেল।”) না, রাগ করব না। মেয়েরাই রান্নাঘরটাকে হাড়ে হাড়ে জানে, এটা অবশ্য ঠিক। মেয়েরাই মর্মে মর্মে বুঝেছে, “বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা-র” “অন্তর্নিহিত অর্থ” কি! রান্নাঘরের মধ্যে যাদের আবদ্ধ থাকতে হয় তাদের গোষ্পদেই সাগর। রান্নাঘরটাই মেয়েদের বিশ্বভুবন হয়ে ওঠে। এবং শেষপর্যন্ত গোটা সংসারের সর্বনাশও ডেকে আনতে পারে।

আদর্শ ঘরকন্নার আজকাল রীতিমতো প্রদর্শনী হয়, বড় বড় হোটেলে। আধুনিক সুশ্রী সংসারের যত বিজ্ঞাপন দেখি—টেলিভিশনে, ইংরাজি বাংলা পত্রপত্রিকায়, ঝক্ঝকে চক্চকে রঙিন রান্নাঘরের টালির দেয়াল থেকে মাছি পিছ্লে যাচ্ছে, আমার ততই মেজাজ খিঁচ্ড়ে যায়। মনে হয়—দূর ছাই, এই রান্নাঘরটাতে কাল ঢুকবোই বা কী করে, আর রাঁধবোই বা কী করে? হলেই বা গ্যাস—এমন সেকেলে নোংরামতন এই তেলচিটে ডবলবার্নার কি মানুষে রাঁধতে পারে? আর এই হয়েছে এক কালিপড়া সাতকেলে কেরোসিনের স্টোভ! নাঃ, এ দিয়ে আর তো চলে না। কুকিং রেঞ্জ একটা সত্যি সত্যিই দরকার। তা, কোন্‌টা নিলে ভালো হয়? এদেশে তো কোনো কনজিউমারস ম্যাগাজিনও নেই ছাই! সব কাগজই তো বিজ্ঞাপনদাতাদের বন্ধু। ক্রেতাদের সহায় কেউই নেই। কী নেব? নিকিতাসা, না ব্লুস্টার? নাকি সুপার ফ্রেমই ভালো? নাকি দিশি নামের নবজ্যোত্টাই দেখবো ওসব ইংরিজি নামের উনুন কেনা মানেই তো কলোনিয়াল হ্যাং ওভার। বরং জাপানিটাই নিই তার চেয়ে—এশিয়ান দ্রব্যই তো! (দেশী মালের চেয়ে তো ভালোও হবে!)

রান্নাঘরটি আধুনিক দর্শন যতদিন না হচ্ছে, আধুনিক দম্পতির সংসারটাও ততদিন যেন ঠিকঠাক আধুনিক আর হচ্ছেই না। সেকেলে রান্নাঘর মানেই পুরো লাইফস্টাইলটা পুরোনো, গোটা জীবনযাত্রাটাই সেকেলে। মূল্যবোধগুলিও অকেজো। ভোরে উঠে উনুন ধরাও রে, উবু হয়ে পিঁড়ি পেতে বসে রান্না করো রে, মাটিতে বসে কুটনো কোটো বঁটি পেতে, শিলনোড়াতে বাটনাবাটো, হাঁটু ধরে যাবে না? তাছাড়া ধোঁয়া-ধুলো-কয়লার গুঁড়ো-গুল্‌-ঘুঁটে—ওফ্—এসব কারবার যতদিন বন্ধ না হচ্ছে কোনো সংসারই আধুনিক সংসার বলতে পারে না নিজেকে। গ্যাস না হয় মাসের পর মাস আসবে না, তাবলে গ্যাস থাকবে না বাড়িতে? যত বিজ্ঞাপন দেখি তত মুষড়ে পড়ি। ঈর্ষার চেয়ে বড় যন্ত্রণা নেই। উনুনের ছবি তো নয়, যেন কবিতা। আহা, চোখে সেঁটে থাকে, মনে গেঁথে থাকে। “চোখে আঠায় আটকেছে বাঘ, নেড়ে বসছে না।” ব্যাঘ্রটি বড়ই বলশালী। লোভ নামক ব্যাঘ্রের তুলনীয় কোনো হিংস্র পশু হৃদজগতে আর নাই। পড়শীর রান্নাঘরের যদি পুনর্নবীকরণ হয়, তবে আমারও বেশি দেরি হবে না দরকার হলে প্রভিডেন্ট ফাণ্ড তুলে নিয়েও।

আমাদের দেশের ক’জন মানুষের জন্যে এই নবীন রন্ধনশালার সুযোগ? মাসিক কত টাকা উপার্জন করলে তবে “সর্বাধুনিক” রান্নাঘরের মালিক হওয়া যায়? সত্যি সত্যি পুরোপুরি সর্বাধুনিকের জন্য চাই সর্বোচ্চ রোজগারের ক্ষমতাও। সেটা না হয় বাদই দিচ্ছি। কিন্তু এই “শস্তা” নিকিতাসা নব্‌জ্যোতের জন্যও কমপক্ষে মাসে কত হাজার বাঁধা রোজগার চাইই? আটপৌরে রান্নাঘরটাকে একবার যদি বিগত যৌবন বৃদ্ধ স্বামীর মত মনে হতে থাকে আর নবীন ‘কিচেন’ হাতছানি দিতে থাকে বুকের মধ্যে শ্যামের বাঁশির মতো, তবে তো পরমান্নও বিস্বাদ হয়ে যাবে, মলয় বাতাসে গায়ে ফোস্কা পড়বে। যতদিন না যেনতেন প্রকারেণ রান্নাঘরটা ‘কিচেনে’ উন্নীত হচ্ছে।

আর রান্নাঘরটা যদি আধুনিক হয়ে যায় তবে বাড়ির অন্যান্য ঘরগুলোকেও তো ম্যাচ করাতে হবে তার সঙ্গে! তখন বাবার আমলের খাবার টেবিলটা দেখে মনে হবে—“ইশ্! এইরকম টেবিল চেয়ারে মানুষ বসতে পারে? এতদিন বসছি কেমন করে? চোখ ছিল না নাকি?” বৈঠকখানাঘরে ঢুকলে মনে হবে—“বাপ্‌রে বাপ্—কী ‘শ্যাবি’ এইসব কুশনগুলো। এক্ষুনি বদলে ফেলা দরকার। কাগজে দেখেছিলাম বটে কোথায় যেন একজিবিশন হচ্ছে আপহোলস্ট্রির?” এতদিনের পুরোনো হেভি ঘরজোড়া সোফাসেটও আর চলে না। “নাঃ, এক রবিবার রাসেল স্ট্রিট-পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে যেতেই হচ্ছে। অকশনগুলোতে ঢুঁ মারা দরকার।” খেতে বসে মনে হবে—“আরে, এমন প্লেটে মানুষকে খেতে দিয়েছি এতদিন? মায়ের রুচিরও বলিহারি।” মনে হবে কালো টেলিফোন ভালো টেলিফোন নয়, মনে হবে চুনকামের দেওয়াল গরিব দেওয়াল, প্লাস্টিক পেন্ট চাই, মনে হবে সংসারটাকে মানানসই করতে হলে গোটা বাড়িটাকেই ঢেলে সাজানো দরকার। ঘরদোর নীট অ্যান্ড টাইডি করে তুলতে না পারলে জীবনটাই রূপরসহীন। রান্নাঘর বদলালেই তো হবে না, বদলাতে হবে স্নানের ঘরও। সেটাও যে একটা স্টেটাস সিম্বল। সুসজ্জিত, ও আধুনিক বাথরুম থাকাটা অবশ্য প্রয়োজন। বিলিতি কায়দার শৌচাগার চাই, তা হোক না দিশি শৌচাগার তার চেয়ে শতগুণ বেশি স্বাস্থ্যকর। সব দিক থেকেই।

চালু ইংরেজ চলে যাবার সময়ে মিচ্‌কে হেসে চোখ মেরে গিয়েছিল ভারতমাতার দিকে। চল্লিশ বছর পরে ডিম ফুটে বেরুচ্ছে আমাদের অন্ধ সাহেবপ্রীতি। জীবনের ছোটবড় সব ক্ষেত্রে দেশী বৈশিষ্ট্যগুলিকে “পুরোনো” মনে করে বিনা বিচারে বিসর্জন দিয়ে আমরা আকুলভাবে, হন্যে হয়ে বিলিতিয়ানাকে “আধুনিক” আখ্যা দিয়ে সেদিকে লোভের হাত বাড়িয়েছি। জিনিসের বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে বিচারবুদ্ধি অন্ধ—লোভ আর চাহিদা যত বাড়ছে ইনফ্লেশনও তত বাড়ছে। বাড়ছে নিত্য ব্যবহার্যের মূল্যও। কিন্তু কেনা কমছে না—চাহিদা সৃষ্টি করছে বিজ্ঞাপন, কিনছি আমরা। এত টাকা কোথা থেকে আসছে? সৎপথে না আসুক—আরো পথ তো আছে। তা বলে জীবনে “ভালোভাবে” বাঁচতে হবে না? ভগবদ্‌গীতা যাই বলুক, একটাই তো জীবন। পুনর্জন্ম যদি নিতে হয় তবে এই জীবনেই চাই। আর রান্নাঘরেই ঘটবে সেই নবজন্ম। সেই নতুন পরিচয়। —গ্যাসের পর ফ্রিজ, ফ্রিজের পর কুকিং রেঞ্জ, কুকিং রেঞ্জের পরে মিক্সি, মিক্সির পরে রাইসকুকার। তারপর জটিল ফুডপ্রসেসর, তারপর মাইক্রো আভেন। তারপর আরেকটু কম জরুরি জিনিসপত্তর—গীজার, বৈদ্যুতিক ঝাড়ুবালতি, বৈদ্যুতিক সাবানকাচার কল, বৈদ্যুতিক বাসনমাজার যন্ত্র। ঠিকে মেয়েটাকে কষ্ট করে লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে আর আসতে হবে না। তবে ঐ যা, লোডশেডিং হলে একটু কষ্ট। তবে একটা মিনি জেনারেটার কিনে ফেললেই ওসব ঝামেলা চুকে যাবে।

তবে কেবল রান্নাঘরেই তো আধুনিকতা এলে হবে না! এসবই তো কাজে লাগবে শুধু গিন্নির। কর্তার কিছু চাই না বুঝি? রঙিন টিভি। ভিসিআর। ছেলেমেয়ের চাই না! মিউজিক সিস্টেম। ছোট দেখে একটা পার্সোনাল কমপুটারও যদি যোগাড় করা যেতো, সুবিধে হতো কত। পড়াশুনোর অনেক উন্নতি হতো ছেলেমেয়েগুলোর।

এদিকে বয়স তো বাড়ছে বৈ কমছে না? আমরা বাঙালিরা কিন্তু বড্ড বেশি ইন্টেলেকচুয়াল, নয়তো স্রেফ্‌ স্পিরিচুয়াল। শরীরটার দিকে মোটে নজর দিই না। স্বাস্থ্যবিষয়ে বিন্দুমাত্র সচেতনতা নেই আমাদের। অথচ ফিট্নেসটা কি দারুণ জরুরি, যে কোনো পত্রপত্রিকা পড়লে, টিভি দেখলে, জানা যায়। আমরা ভারতীয়রাই শুধু এ বিষয়ে উদাসীন। স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, এসব যেন কেবল ফিল্মি দুনিয়ার একচেটিয়া। বাকিরা সবাই, কি স্ত্রী, কি পুরুষ, নিশ্চিন্তে ইয়া ভুঁড়ি দুলিয়ে মুটিয়ে যাই ত্রিশ বছর বয়সেই। নাঃ, চাই একটা দৈনিক ব্যায়ামের ঘরোয়া ব্যবস্থা, দু’ চারটে অত্যাবশ্যক যন্ত্রপাতি, পারলে একটা কোণে একটা ‘স্যানাবাথ’ যদি লাগিয়ে নেওয়া যায়, তবে তো কথাই নেই।

তাছাড়া জীবনের নান্দনিক দিকটাও তো দেখতে হবে! রূপচর্চাই বা এজীবনে ফ্যালনা হবে কেন? দু’ একটা ছোটখাটো জিনিস, কার্লার, হেয়ারড্রয়ার, ফেশিয়াল স্যানা—এসব গুলো ঘরেই থাকা এসেনশিয়াল। অনেক পয়সা বেঁচে যায় যদি বাড়ির মেয়েদের নিত্যি বিউটিপার্লারে ছুটে না যেতে হয়। আপ্‌না হাথ জগন্নাথ! কি বলুন!

॥ ৬ ॥

রান্নাঘরের মডার্নাইজেশনের আগুন তো উনুনেই আটকে থাকে না। সে আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। জীবনের প্রতিটি খাঁজে। মূল্যবোধ ধরে টান মারে।

আমরা দিশি মধ্যবিত্তরা এখন ইতিহাসের বড্ড অসহায় এক মুহূর্তে ঝুলন্ত রয়েছি। মিশ্র ইকনমিতে বহুকাল ধরে না ঘরকা না ঘাটকা হতে হতে আমরা এখন নিজেরাই নিজেদের পরিচয় জানি না। রক্ষণশীলতা আর উটকো চালবাজির ঘন অরণ্যের মাঝখানের সংকীর্ণ বনপথটুকু খুঁজে বেড়াচ্ছি, চতুর্দিকে লোভের বাঘ ডাকছে, গর্জনে কান কাঁপছে, না আছে আমাদের হাতে প্রবীণ আদর্শের লাঠি সড়কি—না আছে নবীন আদর্শের জ্বলন্ত মশাল। আমরা বেঁচে রয়েছি মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে। হাতের কাছে যা দেখেছি তাকেই ধরতে যাচ্ছি অমূল্য মনে করে। প্রশ্ন করছি না, বাছাই করছি না। আমাদের মনে কিছু শিথিলতা, হাতে কিছু অবকাশ আর পকেটে কিছু স্থিতিস্থাপকতা আছে—আমাদের নীতিবোধের মধ্যেও ক্রমশ ঠাঁই করে নিচ্ছে সেই সর্বনেশে স্থিতিস্থাপকতা—বাঘের ভোগে কি লেগে গেছি আমরা? অথচ এই মধ্যবিত্তের হাতেই নাকি চাবিকাঠি! আমার অদূরদৃষ্টিতে যেটুকু কুলোচ্ছে দেখতে পাচ্ছি আমরা ভারতবর্ষের একমুঠো লোক তথাকথিত ‘আধুনিক’ রান্নাঘরের টাইমমেশিনে চড়ে একুশ শতকের দিকে ধাবমান হয়েছি, আর বাকি কোটি কোটি মানুষ পড়ে আছে মাঠে ঘাটে। শোবারঘর, রান্নাঘর, বসার ঘর প্রত্যেকটি শব্দই যাদের কাছে বিলাসমাত্র। একবেলা রান্না করবার মত অন্নই জোটে না যাদের। আংশিক শিল্পায়নের পূর্ণ সুযোগ কেবলমাত্র একমুঠোর পকেটেই, বাকি দেশ প্রি-ইণ্ডাস্ট্রিয়াল দূরবস্থার অংশীদার—তাদের কাছে আমাদের ‘জাংকফুড’ ‘ফাস্টফুড’ এসব রসিকতার ব্যাপার। এখনও মূলত ‘ফুডটাই তাদের সমস্যা। আমরা অবশ্য তাদের কেউ নই।

কাগজে কালাহাণ্ডির অস্বাভাবিক রোগা শিশুর বিশ্রী ছবি দেখতে দেখতে আমরা অন্যমনে হিসেব করছি—গ্যাস বিদ্যুৎ-এর দিনদিন যা অবস্থা হচ্ছে, সৌর চুল্লিটা কিনেই ফেলব কিনা সামনের মাসে!

রান্নাঘর সংখ্যা, ‘দেশ’ ১৩৮৮

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *