শব্দ পড়ে টাপুর টুপুর

শব্দ পড়ে টাপুর টুপুর

‘Parlare alcuno di se medesimo pare non lici to’—(‘নিজের বিষয়ে কথা বলাটা সমীচীন নয়’।) Dante, CONVIVIO.

কোথায় গেল আমার সেই চোখ, যা সকলকে সুন্দর দেখতো? কোথায় সেই মন, যা সবেতেই আশ্চর্য হোতো? জীবন, হে জীবন মহারাজ, দয়া করে ফিরে নাও তোমার চালশের এই চশমা আমি আর স্পষ্ট দেখতে চাই না, আমি শুধু রম্য দেখতে চাই। কে তুমি হে আমার এই চোখের কোটরে এসে বসেছো, রংবেরঙের কড়া আলো ফেলে পালটে দিচ্ছো দৃশ্যপট, আমি আর স্বচ্ছ দেখতে পাচ্ছিনে কেন?

কোথায়, আমার তুষারশিখর হিমালয়, দাও ধুয়ে দাও মলিন এই চোখ? কই? গঙ্গোত্রীর উচ্ছল গঙ্গা? এসো, স্থির করে দাও এই চপল বক্ষোতল, তোমার সেই শৈবালহীন মর্মরখণ্ডগুলির মতো নিষ্কলঙ্ক মসৃণ আর কঠিন করে দাও। অঝোরঝরণ সহস্র প্রস্রবণেও যেন সে-বুকে দাগ না পড়ে, ক্ষত না হয়। তবেই তো আমার কলমে ধরা পড়বে, যা রম্য? তবে তো ধরা পড়বে, যা মধুর?

নাকি পড়বে না ধরা? শেষ পর্যন্ত কি অধরাই থেকে যাবে, যতো মাধুরী? তবে হ্যাঁ, নয়ন, শ্রবণ, স্পর্শন, এসবের চেয়ে ঢের বড়ো ফাঁদ শব্দের ফাঁদ। ‘শব্দ’ দিয়ে আমি দেখি, শুনি, ছুঁই, জড়াই। বয়সের ঘষ্‌টানি লেগে ভোঁতা হতে হতে একদিন যদি চোখ থাকতেও দেখতে ভুলে যাই, শ্রবণ থাকতেও ভুলে যাই শ্রুতি, তবুও ‘শব্দ’ দিয়ে, মগজের দর্পণে আমি ঠিক দেখবো, শুনবো।

তা বলে পাঁচ-হাজার শব্দ চাই? ও বাবা ! হে সম্পাদকমশাই, এ তো এগারো। অক্ষৌহিণীর মতো শুনতে লাগছে। শব্দ তো এমনিতেই দৈব বলে বলীয়ান—প্রায় অপরাজেয়, প্রায় অপ্রতিরোধ্য, যাকে বলে সারস্বত সেনা। নিজের যা-খুশি-তাই নিয়ে পাঁচ-হাজার-রম্য-শব্দ? তাছাড়া আমার স্বভাবটা একটু ক্রীতদাস-টাইপের—যদি তর্জনী উচিয়ে বলে দেওয়া হয় ইশকুলের রচনা লেখার মতো ‘এই নাও তোমার বিষয়বস্তু’, তবে হুড়হুড়িয়ে ভাবতে পারি। কিন্তু ‘যা-খুশি’? ব্যাস্। হয়ে গেলো। খুশিটা যে আমার কিসে সেটাই আমি জানি ছাই? পাঁচ হাজার মোট শব্দই কি আমি জানি? আমার নিজস্ব জীবনে অতোগুলো শব্দ কি জরুরী হয়ে উঠতে পেরেছে কখনোই? যা একান্ত জরুরী নয়, তা লিখেই বা কী হবে?

অবিশ্যি শব্দ ছাড়া লেখার আছেই বা কী? শব্দ দিয়েই তো প্রাণ-সন্ধি। শব্দই তো মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র। মানুষের সঙ্গে পরিপার্শ্বের পরিচয়ের ঘটক চূড়ামণি।

বড়ই আশ্চর্য জিনিস এই ‘শব্দ’। শব্দের ভেলায় ভেসে যেমন কোথাও উত্তীর্ণ হওয়া যায়, শব্দের পাথরে ঠোক্কর লেগে তেমনি ডুবে যাওয়া যায়। শব্দেরই বাতাসে আমরা শ্বাস নিচ্ছি, শব্দের অন্নেই আমরা পুষ্ট হচ্ছি, সত্যিই এই ‘শব্দ’ বড় আশ্চর্য বিষয়। পাঁচ হাজার রম্য শব্দ? বেশ তো, শব্দের বিষয়েই লেখা যাক না কেন? ছোট্ট থেকে একের পর এক নিত্যনতুন শব্দের রাজত্বেই তো আমি বাস করে এসেছি—রীতিমতো খাজনা আদায় করে প্রজা বানিয়ে ছেড়েছে আমাকে এক-এক সময়ে এক-একটা শব্দ। কিছু কিছু শব্দ হয়তো যেখানে ছিলো থেকে গেছে সেখানেই, আমিই তাদের অতিক্রম করে এসেছি। —কিছু কিছু আবার আমারই সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে তাদের চেহারা, তাদের মুখচ্ছবি। কোনো শব্দ ক্রমশ অনেক বড়ো হয়ে উঠেছে, কোনো শব্দ আবার ছোট হতে হতে কুঁকড়ে গেছে, কেউ বা রং বদলেছে, কেউ ঢং। শব্দেরা যেমন এক জায়গায় থাকে না, তেমনি এক থাক না শব্দের সঙ্গে নিয়ত আমাদের যোগাযোগ, আমাদের সম্পর্কও। কেউ কাছে চলে আসে, কেউ দূরে সরে যায়। কোনো কোনো ধূপছায়া রঙের শব্দ হয়তো চিরকালই রহস্যের আলো-আঁধারি মেখে আধোজানা থেকে যায়। শেষ দিন পর্যন্ত চলে তার সঙ্গে পাঞ্জা লড়া।

শব্দের ইঁট বসিয়ে বসিয়েই তো আমাদের চৈতন্যের প্রাসাদ গড়ে ওঠে—শব্দের ওপরেই আমাদের জানা-বোঝা-মানা-অমান্য করা সব কিছু। শব্দ দিয়ে দিয়ে তৈরি এই যে জগৎ, শব্দসিদ্ধ, শব্দসন্ধ এই যে বিপুল বিশ্বভুবন আমার সামনে, আমার ভিতরে, একটু একটু করে গড়ে উঠলো, সেই বাড়ন্ত জগৎটার একটা জরীপের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? নিতান্তই শব্দনির্ভর যে চেতনা সেই চেতনাই তো আমি। কবির সচেতন শব্দ ব্যবহারের, শব্দলীলার প্রসঙ্গ নয়, সাধারণভাবে মানুষের শব্দনির্ভর চৈতন্যের কথা বলছি।

জীবনে আমার কাছে সবচেয়ে যে শব্দগুলি জরুরি—সেগুলি না। নাম, শুধু নাম। শুধু নাম। নাম তো নয় এক-একটা পৃথিবী।

মান অভিমান প্রাপ্তি বঞ্চনা আশা হতাশায় ভরা এক-একটি নাম আমার জীবনের এক-একটা ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু আজ সেই বিশেষ শব্দগুলির কাছে যাবো না। প্রিয় নামগুলি, অপ্রিয় নামগুলির সঙ্গেই আজ একটু দূরে থাকুক। আজ বরং স্মৃতি থেকে কুড়িয়ে আনি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই সব শব্দকে যারা সকলের। সকলের হয়েও তারা যেখানে আমার নিজস্ব, ঠিক সেখানে তাদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। অন্যদের দিকে তাদের নজর কেমন কে জানে? আমার দিকে তাদের চাউনিটা ঘোর-লাগানো। কখনো ভয়ের, কখনো ভাবনার, কখনো ভালোবাসার।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রায় সমানবয়সী আমি, আমার চেতনার প্রথম উন্মেষের মুহূর্তে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ছিল প্রায় ‘দুধ’ শব্দের মতোই জরুরি। আর ছিল, অন্ধকার মাখানো, ভয় জড়ানো একটি শব্দ, ‘ব্ল্যাক আউট’। যার পাশাপাশি বুকের মধ্যে উৎসৃত হত তীব্র তীক্ষ্ণ আর্তনাদ—‘সাইরেন’ শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ভয়, ছোট্ ছোট্ ছোট্ ! সব্বাই একতলায় গিয়ে ‘দিদা’র ঘরে জড়ো হই। ছোটরা গুঁড়ি মেরে ঢুকতুম দিদার তক্তপোষের নিচে। ইঁট দিয়ে উঁচু করা তক্তপোষ, তার নিচে কী নেই? আমরাও যোগ দিতুম সেই সব বাসন-কোসনবাক্স—প্যাঁটরার সঙ্গে। এবার নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাক-বোমা পড়ার অপেক্ষায়। ‘অলক্লিয়া’র সিগন্যাল দিলে, তবে বেরোও মাথাময় ঝুলকালি মেখে, খুবই হতাশ হয়ে। দেখে মনে হতো যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই আসছি। ঐ সময়ে সাদা হেলমেট পরা বেশ কিছু লোক পথেঘাটে দৌড়োদৌড়ি করতে ইতস্তত। মায়ের কাছে সদ্য তখন এ বি সি ডি শিখছি। ভেবেই পেতুম না একই লোকের নাম ‘এ’ আর ‘পি’ হয় কী করে? ঐ নামের অনেক লোেক ছিল পাড়াতে। তারশর এল ফর্টিটু—এবং “ইভ্যাকুয়েশন” শব্দ। এবং আমরা কুচবিহারে চলে গেলুম। কি সুন্দর শব্দ ‘কুচবিহার’। বাড়িটা একতলা একটা মস্ত বাগান ছিল কোথাও—দোপাটিফুল, বেলফুলের সঙ্গে তাতে ছিল পেঁপেগাছ, পেয়ারাগাছ, বেলগাছ। একটি পেতলের সাজিতে করে ভোরবেলা ফুল তুলতুম। পাশের বাড়ির উঠোনের মধ্যে ‘পুজোবাড়ি’ ছিল, একটাই ঘর, দশদিকে ঘেরা গোলবারান্দা, অনেক ঠাকুর দেবতার বাসা সেই ঘরে। সন্ধেবেলায় আরতি হতো। আমাদের এ বাড়ির উঠোনেও একটা গোল কুটিরের মতো দেখতে বাড়ি ছিল, কিন্তু তাতে ঢোকার পথ ছিল না, যদিও নাম ‘গোলাঘর’। —তাতে নাকি সারা বছরের ধান তোলা থাকে। বাবা যাননি সঙ্গে, বাবার চিঠি যেতো। এই সময়েই আমার ‘নির্মলা’ শব্দটি অসম্ভব ভালো লেগে গেল। এত ভালো, যে আমার অপছন্দের ‘নবনীতা’ নাম আমি চুপি চুপি বদলে ফেললুম। সেই প্রথমবার। বাবাকে চিঠির নিচে নাম সই করলুম ইতি—নির্মলা। এবং গোপন অনুরোধ বাবা যেন এবার থেকে ওই নামেই ডাকেন আমাকে। তারপরেই সেই প্রচণ্ড কেলেঙ্কারি। আমার জীবনের প্রথম সামাজিক লজ্জার ব্যাপারটা ঘটলো। ছেলেদের বিশ্বাস করতে নেই সেদিনই বোঝা উচিত ছিলো আমার। —একদিন খামে একটা চিঠি এলো। কেউই বুঝতে পারে না ও-চিঠি কার। নাম রয়েছে—‘কুমারী নির্মলা দেব’।

এদিকে আমি তো মর্মে মর্মে বুঝেছি, আর বাবার ওপরে অভিমানে গলায় পাথর ঠেলে আসছে। যা ছিল গোপন, আমাদের একান্ত ব্যাপার তা বাবা কেন প্রকাশ এবং সর্বজনীন করে দিলেন? চিঠি খুলে দেখা গেল ভিতরে ছবি এঁকে, বড় বড় হরফে, আমাকে লেখা বাবার চিঠি ! আমি আর নির্মলা নামে বাবাকে, বা কাউকেই চিঠি লিখিনি বটে তবে বাড়িতে অট্টহাসি আর থামল না। মাসীমা তো সেদিনও হাসতেন। এখন নেহাৎ তিনি হাসিকান্নার বাইরে।

কলকাতায় বাবা। মামা, মেসোমশাইদের খাওয়া-দাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছিল, জাপানীরাও আর বোমা ফেলবে বলে মনে হচ্ছিল না, ঐ যা পড়ার দু-একটা তখনই পড়ে গিয়েছিল। আমরা আবার সদলে কলকাতায় ফিরলুম। আমার বেশ মনে আছে একদিন ভোরবেলা একতলা থেকে খবরের কাগজগুলো নিয়ে ওপরে আসছি, বাবা-মাকে দেবো, একটা কাগজের দিকে চেয়ে দেখি নামাঙ্কনের চেয়েও বড়ো বড়ো হরফে লেখা রয়েছে, “দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান”। সেই খবর বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে জীবন থেকে আস্তে আস্তে সরে গেল মুছেই গেল, ‘শেল্টার’, ‘মিলিটারি ক্যাম্প’, ‘বম্বার্ডমেন্ট’, ‘ম্পিলন্টার’, ‘এয়াররেইড’, ‘ব্যাফল ওয়াল’, ‘ট্রেঞ্চ’, ‘সাবমেরিন’, ‘টর্পিডো’ ইত্যাদি একগাদা চেনা শব্দ—যারা হয়ে উঠেছিল দিবারাত্রের সঙ্গী, বড়দের আলাপচারিতে।

যুদ্ধের সময়ে ‘জাপানী’ আর ‘জার্মানী’ এই শব্দ দুটোই খুব নিষ্ঠুর আর ভয়ের মনে হতো। বিদেশী, অচেনা এই শব্দ দুটিকে কানে একইরকম শুনতে লাগতো, আর প্রায়ই গুলিয়ে ফেলতুম। বিশেষণ, বিশেষ্য ব্যাপারটা বোঝবার মত বড় হইনি তখন। গুলিয়ে ফেলতুম ফ্যাশিস্ট আর বলশেভিক এই শব্দ দুটোও। কোনোটারই মানে জানি না, সর্বদা শুনছি। আরো দুটো এইরকম এক ধরনের গোলমেলে শব্দ ছিল। টিটো আর তোজো। এক যে ছিলেন টিটো এক-যে ছিলেন তোজো—তাঁরা সাদা, না কালো, মন্দ, নাকি ভালো, কিছুই বুঝি না। এই নামদুটোও কেবলি গুলিয়ে যেত।

কিন্তু গুলিয়ে যেত না চার্চিলের সঙ্গে চুরুট, হিটলারের সঙ্গে মাছি-গোঁফ, স্ট্যালিনের সঙ্গে বাবা-গোঁফ। একটা মজার শব্দ ছিল, তাতে কুয়োর মধ্যে বোতলের ঘটি নামিয়ে দেবার মতন আওয়াজ হত : কুয়ো-মিন-টাং। আরেকটা শব্দ ছিল খুব ভয়ের মতন খাই-খাই, আর ঠক্ ঠক্ কাঁপুনি ভরা, চিয়াং-খাই-শেক। ঐ সময়ে চীনদেশে একজন বিখ্যাত বাঙালী নেতা ছিলেন, তাঁর নামের আধখানা উর্দু, আধখানা বাংলা,—সানিয়াৎ সেন। হিন্দু, না মুসলমান কে জানে?

ইতিপূর্বেই জীবনে আবির্ভূত হয়েছে ‘ড্রাকুলা’ শব্দের মতই রক্তখেকো, দাঁত বের করা ‘ভ্যাম্পায়ার’ শব্দের মত হাড় হিমকরা দুটি শব্দ। —সেই শব্দেরা সোজাসুজি বুকের ওপরে আছড়ে পড়ে, ফেটে রক্তাক্ত হয়ে ছিটিয়ে পড়েছে চৈতন্যের চতুর্দিকে, শান বাঁধানো পথের ওপরে যেমন ফাটতো ইলাবাসে’র পাকা বটফল। —হিরোশিমা, নাগাসাকি। তাদের সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি শব্দ—‘নোয়াখালি’।

আমাদের হিন্দুস্থান পার্কের শান্তিপূর্ণ বাড়িটা থেকে ‘নোয়াখালি’ আর ‘নাগাসাকি’ যেন প্রায় একইরকম সুদূর আর অবাস্তব। সোজাসুজি চেনাশুনোর প্রশ্ন নেই—কিন্তু বড়দের মুখে শোনা কথার ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে হাঁ করে চেয়ে থাকা আছে। তাতেই শুধু তাতেই এই শব্দগুলো নিজেরাই হয়ে উঠেছিল মূর্ত হাহাকার, ধ্বস্ত মনুষ্যত্বের রক্তাক্ত প্রতীক। আর একটা ভয়-ভয়-করা মরীয়া ধরনের শব্দ ক’দিন ধরে ফিসফিস শুনছিলুম ;—শুনতে শুনতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল, তারপর এসে গেল সেই নির্দিষ্ট তারিখ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ শব্দ কাজে পরিণত হল। ষোলই অগাস্ট ১৯৪৬। ‘কমুনাল রায়ট’ শব্দের সঙ্গে আর মৃত্যুভয়ের সঙ্গে সেই পরিচয়। যুদ্ধের ‘সাইরেন’ বাজা, ও ছুটোছুটি করার মধ্যে যেন খেলাই ছিল, মৃত্যুভয় ছিল না। অন্তত আমার কাছে তখন ‘বোমা’র চেয়েও ‘আরশোলা’ অনেক বেশি ভয়াবহ শব্দ ছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও ‘দাঙ্গা’ শব্দটার সঙ্গে মৃত্যু জড়ানো আমার মনে। ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ শব্দটি এখন হোয়াইটওয়াশ্‌ড হয়ে কেমন ভোল পালটে ফেলেছে। অন্য প্রসঙ্গে অন্য ক্ষেত্রে সহজভাবে সসম্মানে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমার মনের মধ্যে কিন্তু তার রং হিংসায় অপ্রেমে নির্দয়তায় মাখামাখি। ‘কমুনাল রায়ট’ শব্দের বানান করবার যোগ্যতা সেই ৭/৮ বছর বয়সে অর্জন করিনি বটে, কিন্তু হৃদয়ে তার বানান ভুল হবে না কোনোদিন। বাবার বন্ধু ইমপ্রেসারিয়ো, হরেন ঘোষের শরীর টুকরো টুকরো করে কেটে প্যাকিং বাক্সে ভরা পাওয়া গিয়েছিল। সেই বর্ণনা দিনে রাতে আমাকে কষ্ট দিত, ঘুমিয়ে পড়তে ভয় করত যদি স্বপ্নে দেখি? শুনেছিলুম তিনি লোকটি খুব ভালো ছিলেন, প্রতিবেশীদের বিশ্বাস করেছিলেন। তাই পাড়া ছেড়ে পালাননি। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকবার হাতে-নাতে উদাহরণ আমার জীবনে সেই প্রথম। সেই শুরু। শেষ কবে হবে কে জানে?

তারই মধ্যে গভীর গম্ভীর একটা শব্দ বুদ্ধমন্দিরের বিশাল গং-টার আওয়াজের মতো উদাত্ত পবিত্র ধ্বনি তুলতো বুকের মধ্যে সেই শব্দ, ‘স্বাধীনতা’। ‘স্বাধীনতা’র সঙ্গে ‘বন্দেমাতরম্‌’। তারপর ‘জয়হিন্দ’। এখন ‘বন্দেমাতরম্’ শব্দটা হয়ে গেছে হিন্দুয়ানি, ‘জয়হিন্দ’ হয়ে গেছে কংগ্রেসী, আর ‘স্বাধীনতা’ শব্দকেও আমরা তার সোনার সিংহাসন থেকে টেনে এনে নর্দমায় ফেলে দিয়েছি। একদিন যে শব্দের জন্য এতগুলি প্রাণ অবহেলায় ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে, “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়” শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দকেই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো কী অবহেলায়! সেই আমাদের ফেলে দেবার শুরু। পতনের অবমূল্যায়নের দিন শুরু। ঐ সঙ্গে ক্রমে ক্রমে বিসর্জনে চলে গেছে অনেক গাঢ়-গভীর, উষ্ণ-উজ্জ্বল বিশ্বাস! বুকের মাটিটাই যেন ক্রমশ পিছল হয়ে গিয়েছে—কিছুই আর দাঁড়িয়ে থাকে না। সবই হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে গেছে আমাদের ছোটোবেলার সেই হিমহিম শিশির ভেজা ছমছমে ভোররাত্তিরের আলো-আঁধারি মাখা, কড়া ইস্ত্রির ধবধবে পোশাকপরা, ড্রাম-বিউগলের শব্দে শিহরিত পদপাতের ছন্দে দৃপ্ত, সুরেলা শব্দ—‘প্রভাতফেরী’।

আর কি ম্যাজিক আছে, সেই আশ্চর্য শব্দে, চোদ্দই অগাস্ট? যে রাতে পাড়াসুদ্ধু মানুষ, ছোট-বড়ো সবাই নির্ভয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল, রাত বারোটাতে জোরে রেডিও বেজে উঠেছিল ঘরে ঘরে, নতুন পতাকা উড়েছিলো ছাদে ছাদে।—সেই বহু আকাঙিক্ষত শব্দটি এখন পনেরোই অগাস্টের সরকারী ছুটি হয়ে ক্যালেন্ডারেই যা লেগে আছে। বুকের মধ্যে তার জাদুর ছোঁয়া ঘুচে গেছে কবেই।

‘স্বদেশ’, ‘স্বাধীনতা’ এইসব শব্দ বুকের মধ্যে মোচড় দিত একদিন। তেমনি ঐ শঙ্খ-শুভ্রতার পাশেই একই সঙ্গে ছিল লজ্জা, কান্না, অপমান জড়ানো শেকলপরানো এক কালো শব্দ, ‘পরাধীনতা’। যেটাকে ইরেজার ঘষে মুছে ফেলাই আমাদের শিশু-কল্পনার চরম ছিল। এখন তো সাদাকালো দুটি শব্দই মুছে গেছে। পেয়েছি কি সেই আকাঙিক্ষত ‘স্বদেশ’ শব্দের ঠিকানা?

‘পরাধীনতা’র চেয়েও কুৎসিত কয়েকটা শব্দ ছিল। মানুষের মাথাকাটা যাওয়ার মতো শব্দ। যেমন ‘মীরকাশিম’, যেমন ‘জুডাস’। শৈশবে মানুষের বুকে ভয় আর ভালোবাসার অভিজ্ঞতা যতটা থাকে, ঘৃণার অভিজ্ঞতা ততটা থাকে কি? ফ্রয়েডসাহেব অবিশ্যি গোড়াতেই বাপ তুলে বাক্যারম্ভ করবেন, ঘৃণা-ভালোবাসায় ব্র্যাকেট বেঁধে—আমি বলছি কেবল চেতনমনের কথাই। ‘মীরকাশিম’ অনেকটাই দূরের শব্দ ‘জুডাস’ তো আরো দূরগামী, তবু, ঘৃণার রংটা আমাকে চিনিয়েছিল এরাই। কিন্তু খুব ভালো করে চেনালো এর পরে আরেকটি শব্দ। খুব কাছের, জীবন্ত গুলির শব্দ হয়ে চলে এলো, ‘গড্‌সে’। আমার শৈশবে ঘৃণিততম শব্দ। (হিটলারের কীর্তিকলাপ তখনো কিছুই জানি না। যদিও ‘নাজী’ শব্দটা শুনেছি যথেষ্ট, ওটা খারাপ শব্দ তাও জানি। ‘নাৎসি’ শব্দটি শিখেছি অনেক পরে।) ত্রিশে জানুয়ারির সেই রেডিওবার্তা, মার সেই ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া, সেই অনন্ত মৌন মিছিল যেখানে খালিপায়ে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি মানুষের চোখে জল। সেই আমার মায়ের সঙ্গে মায়ের পাশাপাশি কোনো মিছিলে হাঁটা। মাকে আর কখনও মিছিলে দেখিনি। যে-মা ঘরেও চটি না পরে থাকতে পারেন না, আর আমি খালিপায়ে ঘুরি বলে বকাবকি করেন, তিনিই বেরুনোর আগে চটি খুলে রাখলেন।

তখনও দেশের এমন ‘হাওয়াই’ দিন আসেনি। না এসেছে হাফপ্যান্টপরা মার্কিন ভ্রমণকারীদের অঙ্গের ‘হাওয়াই শার্ট’ না ফুটপাতে ঢেলে ‘হাওয়াই চটি’। আর ছিল কেবল একটি গান, ‘হাওয়াই দ্বীপে আজ ফুল ফুটেছে, সেই দেশে নৌকা ভাসাই’—আর আমরা ছোটরা তার সঙ্গে নাচতুম সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেলে। হাওয়াই চটি ছিল না বলে ‘অশৌচে’র কোনো কমপ্রোমাইজও বেরোয়নি।’ হয় খালি পায় থাকো, নয় জুতো পরো। যেমন মস্তক মুণ্ডনের কোনো মধ্যপন্থা নেই।

‘গড্‌সে’র অনেক আগেই শিখে গেছি ‘পাকিস্তান’ শব্দ। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ ‘আল্লা হো আকবর’ ইত্যাদি রক্তাক্ত কয়েকটি শব্দপুঞ্জ সমেত—এই শেষ ধ্বনিটি লিখতে গিয়েও এক অনুপলের জন্য আঙুলে অনুভব করলুম এক অস্পষ্ট স্নায়বিক ভীতি—ছোটবেলায় এই স্লোগানটি থেকে অনেক রক্ত ঝরেছে। বিপরীতে, ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিরও যে চরম অবমাননা, চূড়ান্ত অপব্যবহার ঘটেছিল ঐ একই প্রেক্ষিতে, সেই বয়েসে সেটা ঠিক টের পাইনি। তার জন্য বড়ো হতে হয়েছে, ইতিহাস সচেতন হতে, নিরপেক্ষ হতে হয়েছে। শৈশবে ‘বন্দেমাতরম্‌’-এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কেবলই বীরত্ব আর আত্মত্যাগ ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’র সুর, ছোরাছুরি দাঙ্গাহাঙ্গামা আগুন ছারখার নয়।

জানুয়ারির তেইশে আর ছাব্বিশে, পনেরোই অগাস্ট, ২৫শে বৈশাখ, এইসব ছিল প্রভাতফেরীর লগ্ন। আর ত্রিশে জানুয়ারির মতো মুখ-কালো করা অন্ধকার দিন আরেকটি ছিল, বাইশে শ্রাবণ। বাবা মা ঘোষণা করতেন : বাইশে শ্রাবণ আমরা মানি না। ঐদিন কোনো সভায় ডাকলে, তাঁরা যেতেন না। অথচ দিনযাপনের প্রাত্যহিক ছন্দের মধ্যে কেমন সূক্ষ্মভাবে তির্‌তির্ করে চলে আসতো স্মৃতি-অশ্রুর ভিজে বাতাস। এই শিশুটির বুকে ছুঁয়ে ঠিক জানিয়ে যেতো ‘আজই বাইশে শ্রাবণ’।

‘বাইশে শ্রাবণ’টাও মনে পড়ে। তখন বছর তিনেক আমার বয়েস, বাবা-মা সেদিন সারাদিন বাড়ি নেই, অচেনা রাত হয়ে গেল, ফিরছেন না, গুনিয়াভাই আর আমি বাড়িতে। কখন আমি মনের দুঃখে কেঁদে কেঁদে ঠাকুমার ভারি বাসনের সিন্ধুকটার তলায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছি। শেষে ছোটমামা এসে আমাকে খুঁজে বের করে আদর করে খাইয়েছিলেন। আমার জীবনে তরুণ সুন্দর ছোটমামারও সেই শেষ স্মৃতি। তারপরেই শিলুম ভয়ঙ্কর ‘টাইফয়েড’ শব্দটা। “ক্লোরোমাইসেটিন” শব্দ আরও প্রায় দশ বছর পরের ঘটনা। “টাইফয়েড” দৈত্যকে নির্বীব করেছে সে। এইভাবে বড়ো থেকে ছোটো হয়ে গেছে অনেক শব্দই। কখনো ভয় থেকে নির্ভয়ে, কখনো প্রেম থেকে অপ্রেমে, কখনো অজানা থেকে জানায় পৌঁছে। যেমন যক্ষ্মা। যেমন স্বদেশ। যেমন চাঁদ।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটা একদিন কতো বিপুল ছিলো এখন কতো ছোটো হয়ে গেছে। যেমন ‘কংগ্রেসী’ শব্দ। বাল্যকালে আমার মনে মনে ঐ শব্দের রং ছিল গেরুয়া, ত্যাগের রং, সন্ন্যাসের রং। আস্তে আস্তে রং বদল হয়ে এখন তো ‘কংগ্রেসী গুণ্ডা’ বলে শব্দও চালু হয়েছে—, ‘সোনার পাথরবাটি’র মতো। এখন কংগ্রেসী মানে ত্যাগী নয়, ভোগী। শুধু কি ‘কংগ্রেসী’ ও ‘রাজনীতি’? রাজনীতি করা ছেলে মানেই এককালে ছিল যে-ছেলে দেশের উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছে, অথচ এখন পলিটিক্স মানেই ধান্দাবাজী। চাকরি, কি ব্যবসাপাতির মতই রাজনীতিও একটা পেশা। আমার এক গুজরাতি বন্ধু তো রাশভারি তামাক কোম্পানির ডিরেক্টরের পদ ছেড়ে দিয়ে দিল্লি চলে গেল, মন দিয়ে পেশাদারি রাজনীতি করবার আশায়। রাজনীতির মত সহজে ব্যক্তিগত উন্নতির পথ সুগম করতে আর কোনো পেশাই পারে না। ডাক্তারি, ব্যারিস্টারি, জমিদারি, কালোবাজারি, সব ছেড়ে লোভী মানুষরা ছুটেছে ‘পলিটিক্সে’। এখন পলিটিক্সেই আসল দুনিয়াদারি। সম্মান। অর্থ। ক্ষমতা। যা চাও সব সেখানে।

কেন, আমাদের ছাত্রজীবনের সেই অগ্নিশুদ্ধ, উজ্জ্বলতম শব্দ, ‘কমিউনিস্ট’? আমরা তখন আর ‘কংগ্রেসী’ শব্দের প্রজা হয়ে নেই, বুকের ভেতরে অন্য এক নতুন স্পন্দন। উদয়-সূর্যের মতো টকটকে লাল, নাঙ্গা তরওয়ালের মতো ধারালো শব্দ—‘কমিউনিজম’ আমাদের বশ করেছে। একটা কোনো দেশ নয়, সারা পৃথিবীটা জুড়েই দুঃখী মানুষ উদ্ধারের কাজে ঐক্যবদ্ধ ভাবে জান-কবুল করেছে কে? কংগ্রেসী নয়, ‘কমিউনিস্ট’। তখন আই পি টি-এর রমরমা। ‘জনশিক্ষা’ পরিষদে কত উজ্জ্বল মুখ। আজ কোথায় সেই শ্রদ্ধেয় শব্দ “কমিউনিস্ট”? তার সেই পবিত্র জ্যোতির্মণ্ডল কোথায়? এখন বহুধাবিভক্ত হয়ে সে “কংগ্রেসী” শব্দের পাশে, একই পচা আস্তাকুঁড়ে এসে ঠাঁই নিয়েছে।

‘বিপ্লব’ ও ‘বিপ্লবী’ এই শব্দ দুটোকেও বেয়াল্লিশ থেকে বাহাত্তরের মধ্যে কেমনভাবে উলটে পালটে বদলে যেতে দেখলুম। বেয়াল্লিশে আমি পৃথিবীতে মাত্র ৩/৪ বছরের বাসিন্দা টেররিজমের ধারণাটা শিখেছি পরে। ইতিহাসে। কিন্তু নকশালবাড়ির আগে অনেক ঘাটের জল খাওয়া হয়েছে। দীর্ঘ, সুদীর্ঘ প্রবাসযাপনের ফলে স্বদেশের প্রতি অসহায় অনির্বাণ, আত্মসমর্পিত ভালোবাসাকেও চেনা হয়েছে। ‘বিপ্লব’ তখন নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল আমাদের চোখেও। আর—এখন?

‘চীন’ এই শব্দটা যেমন। রঙীন স্বপ্ন যেমন হঠাৎ ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হয়ে যায়, ‘চীন’ শব্দটাও মনের মধ্যে কেমন রঙচঙে শব্দ থেকে সরে গিয়ে সাদা-কালো শব্দে পরিণত হয়েছে ‘মাও’ শব্দের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু বুকের মধ্যে ‘ভিয়েতনাম’ শব্দের প্রতিধ্বনি আজও অবিনাশ। পঁচিশ বছর বাদেও নষ্ট হয়নি ‘কিউবা’ শব্দের প্রতিশ্রুতি। হ্যাঁ ‘ফিদেল’ শব্দের সেদিনকার দৈব বিভা হয়তো খানিক ম্লান হয়েছে। তবু অবশিষ্ট আছে অনেকটাই। আর, হঠাৎ অকালমৃত্যু না এলে, বেঁচেবর্তে সুখে থাকলে, আজো কি এমনি উজ্জ্বল থাকতো ‘চে’ শব্দটি?

একটা সময় ছিলো যখন ‘জনগণ’ শব্দটি ছিলো শ্রদ্ধেয়। এখন শব্দটা ব্যঙ্গাত্মক। যেমন ধরা যাক ‘জনসভা’ শব্দ। এ শব্দটি নিজেই একদা সুমহান ছিলো। ‘জনসভা’ শব্দে ওজন ছিলো, ব্যাপ্তি ছিলো, মহত্ব ছিলো। যথাযথ ব্যক্তিত্ব উপস্থিত হলে, জনতাও উপস্থিত হতো, সভা মহৎ হয়ে উঠতো আপনা থেকেই।

বিজ্ঞপ্তিতে ‘সভা’র আগে তুলি কলম নিয়ে ‘মহতী’ জুড়তে হতো না। ‘জনসভা’ শব্দের মধ্যে ইন্দ্রজাল, আবেগ ছিল, যৌবন আর স্বপ্ন ছিল, ধ্যান আর প্রতিজ্ঞা ছিল, যা ছিল ‘মিছিল’ এই শব্দের মধ্যেও।

বাল্যের ‘প্রভাতফেরী’ আর ‘কংগ্রেসী’র নির্দিষ্ট জায়গায় কৈশোরে ‘মিছিল’ আর ‘কম্যুনিস্ট’ শব্দ দুটি এসে দাঁড়িয়েছিল। এখন? ঐ ‘মহতী জনসভার’ পোস্টারে আর প্রতিবাদ মিছিলের ঘোষণায় শহরের দেওয়াল যতই ঢেকেছে, হৃদয় ঠিক ততই ফাঁকা হয়েছে। এখন জনসভা মোটে জনতার ব্যাপারই নয়, পার্টির ব্যাপার। হয় পয়সার খেলা, নয়তো ব্যবস্থাপনার নৈপুণ্য, অথবা দুটোই। হৃদয়াবেগের জাদুতে আর জনসভার সাফল্য নির্ধারিত হয় না।

‘জাদু’ শব্দে মনে পড়ে গেল খুব ছোটোবেলাতে তিনজন জাদুকরকে নিয়ে বেজায় গোলমাল বাধতো মনের মধ্যে। ধ্যানচাঁদ, ব্র্যাডম্যান, আর সরকার। হকি, ক্রিকেট দুটোই আমার অচেনা না-খেলা খেলা। কে যে কোনটা্র জাদুকর, মনে থাকতো না। —কেবল সুম্পষ্ট জাগ্রত থাকবেন পি সি সরকার। জাদুসম্রাট বলে কথা। তাঁর বেলায় গোলমাল নেই!

শুধু ‘জনসভা’, কি ‘স্বাধীনতা’ কেন, বাবা, মা, শিক্ষক, অধ্যাপক, শব্দগুলির মুখও আমাদের সময়ে যেমন ছিলো, আমাদের সন্তানদের সময়ে তা নেই। শব্দগুলির সেই ধারও নেই সেই ভারও নেই। রুপোর টাকা নয়, কাগজের নোট। বা-মা কেন, এখন ‘বন্ধু’ শব্দ, ‘ভাই’ শব্দ ‘বিশ্বাস’ শব্দ কেমন নীরক্ত, কেমন বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে না? ঠিক সেই আগের মতন আছে কি, তেমনি জ্বলজ্বলে, জবাকুসুমসঙ্কাশ শব্দ হয়ে? যেমন সস্তা হয়ে গেছে ‘বিলেত ফেরতা’ শব্দটাও। আগে তার সঙ্গে যোগ ছিলো যোগ্যতার, এখন কেবলই অর্থের। কলিকালে যে অর্থই একমাত্র যোগ্যতা, আর যৌন আহ্লাদ একমাত্র আনন্দ হবার কথা ছিল, সেটা এমনভাবে মিলে যাবে বিশ্বজুড়ে, ছোটবেলায় বিশ্বাস করিনি।

‘দেশপ্রেম’, ‘জনগণ’, ‘দেশ উদ্ধার’ শব্দগুলো বহু ব্যবহারে, আর অপব্যবহারে হালকা হতে হতে ক্রমে শূন্য হয়ে গেল। তারপর মাইনাস্। শ্লেষাত্মক, ব্যঙ্গাত্মক শব্দ হয়ে দাঁড়ালো। ‘বিপ্লব’ শব্দেরও যে সেই দুর্গতি, সেই একই দশা হবে কে ভেবেছিলো। একদিন মেয়েকে জিগ্যেস করলুম, “হ্যাঁরে, ‘বিপ্লব’ শুনলে তোদের কী মনে হয়?” শুনে সে হাসলো,—“হাসি পায়।” আমার কান্না পেয়েছিলো ওদের কথা ভেবে। এ কোন্ লীলা মহাকালের? এদের খুঁটি কোথায়? অবিশ্যি আমাদেরই বা খুঁটি কোথায় রইলো? শুধুমাত্র শব্দের খুঁটি হলে সে তো শব্দের বান ডাকালেই উপড়ে যাবে। আর জীবনে যখন বান ডাকে, তখন কি শব্দের বাঁধ দিয়ে তাকে ঠেকানো যায়?

‘পার্টিশান’, ‘পাকিস্তান’, ‘উদ্বাস্তু’ শব্দগুলি ‘রায়ট’ শব্দের পিছু পিছুই আমদানি হয়েছিল জীবনে। আমরা কলকাতার খাস বাসিন্দে, ‘পার্টিশান’ শব্দের যন্ত্রণা আমাদের জীবনকে স্পর্শ করেনি, প্রধানত বুদ্ধিকেই বিচলিত করেছিল। সমুদ্রের মতো বাস্তুহারা মানুষদের কলকাতায় এসে আছড়ে পড়া, এবং কলকাতাকে ভিড়ে, দারিদ্রে, ভিখিরিতে, হকারে, নোংরা ছাউনিতে ছেয়ে ফেলা, তার ওপর কলকাতার ভাষাকে বাঙাল ভাষা মিশিয়ে জাতিচ্যুত করা, নেটিব কলকাতাবাসীর মোটেই পছন্দ হয়নি। চাকরিতে, ইস্কুল, কলেজের সীটে, পাত্র খোঁজায় চর্তুগুণ কম্পিটিশন তো আছেই। তবুও উদ্বাস্তুদের প্রতি কলকাতার মানুষের শত্রুতা ছিল না—‘উদ্বাস্তু খেদাও’, ‘উদ্বাস্তু হটাও’ অভিযানও করেনি তারা। কিন্তু বাস্তু যাদের হারায়নি, উদ্বাস্তুদের প্রতি কিঞ্চিৎ অবজ্ঞা তো থাকবেই তাদের। আহা, ওরা করুণার পাত্র, খানিক দয়ামায়া করো ওদের, আর খানিক অবজ্ঞা। ‘বাঙাল’ শব্দ আমার বাল্যকালে যেভাবে ব্যবহৃত হতো এখন আর তা হয় না, গত ত্রিশ বছরে সব ফারাক মুছে গেছে। দক্ষিণ কলকাতায় অন্তত আলাদা করে ‘বাঙাল’ বলে আর কেউ নেই। উত্তর কলকাতার কথা বলতে পারি না।

গত ত্রিশ বছরেও ‘উদ্বাস্তু’ আসা থামেনি, এতদিনে বডার সীল করার প্রশ্নে নাকি পূর্ববঙ্গের সরকারমশাই বিরক্ত হচ্ছেন, এদিকে বারো বছর আগে যে পুরো দেশটাই ‘ছিনতাই’ হয়ে গেল, সেটা কেউ খেয়াল করলেন না। বাংলাদেশটা আর আমাদের দেশই নয়, কেবল পূর্ববঙ্গের মানুষদের দেশ। পশ্চিম জার্মানী জার্মানীতে, পশ্চিম ইওরোপ ইওরোপে কিন্তু পশ্চিম বাংলা বাংলাদেশেই নয়। আসামেও নয়, বিহারেও নয়, ওড়িশাতেও নয়। পশ্চিম বাংলার দেশ কোথায়? পশ্চিম বাংলাকে ‘উদ্বাস্তু’ করেছে ‘বাংলাদেশ’।

‘উদ্বাস্তু’ শব্দটার এখন চরিত্র বদলেছে। ‘উদ্বাস্তু’ এই শব্দ এখন কেমন যেন সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী হয়ে উঠেছে। আমার মনের মধ্যে অন্তত শব্দটা খুব নিজস্ব। এই বিশ শতকের শেষাশেষি, কোথাও কোনো দেশেই কেউ কি বাকি আছি, যে নাকি ভিটেহারা হইনি? বাস্তুভিটে কারই বা রক্ষা পেয়েছে বুকের ভেতরে? হৃদয়ের মধ্যেই কখন উপড়ে গেছে ঐতিহ্যের মূল, বিশ্বাসের ভিত, শেকড়ছেঁড়া এক আশ্চর্য ভাসমান জগৎ। একদা অনাত্মীয় এই ‘উদ্বাস্তু’ শব্দটি আমার নিজের জীবনে এখন চন্দ্র সূর্যের সমান সত্য। আমি সত্যি সত্যি বাস্তু হারিয়েছি। আর হারিয়েছিলেন আমার শ্বশুরমশাই। হিন্দুস্থান পার্ক বাঙালিপাড়া বটে, কিন্তু উদ্বাস্তুপাড়া নয়, যাদবপুর বা গড়িয়া যেমন। এখানে প্রচুর পূর্ববাংলার বিত্তবান মানুষ দেশবিভাগের আগেই এসে বড় বড় বাড়ি করেছিলেন। আমার শ্বশুরমশাইয়ের শান্তিনিকেতনের ‘প্রতীচী’ বাড়ি যেমন পার্তিশানের আগেকার। বাবা কিন্তু মনে মনে নিজেকে একজন বাস্তুহারাই ভাবতেন। বাস্তুভিটে মত্তগ্রামের জন্যে, ঢাকায় লারমিনি স্ত্রীটের পৈতৃক বসতবাড়িটি আর জয়কালী মন্দির রোডের একজোড়া ভাড়াটে বাড়ি, এদের জন্যে বাবার মনে দুঃখ ছিল। আমার শাশুড়িমা, আর তাঁর ছেলেমেয়েরা পর পর দু পুরুষ বীরভূমের লালমাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন, শান্তিনিকেতনের সঙ্গেই তাঁদের নাড়ির বাঁধন। পূর্ববঙ্গের জন্য তাঁদের মনে এই বাস্তু-শোক দেখিনি। বিষয়-সম্পত্তি হারানোর দুঃখও না। শ্বশুরমশায়ের মুখের ভাষাও ছিল ঢাকাই। শাশুড়ি মা মজা করে হাসতেন, যখন বাবা বেড়ালকে ‘মেকুর, নাগাল পাওয়াকে ‘লাগুড় পাওয়া’ বা হাত চিপ্টে যাওয়াকে ‘চেঙ্গি লাগা’ বলতেন। বাবা বীরভূমকে, বীরভূমের ধানক্ষেতকে প্রাণাধিক ভালোবেসেছিলেন, বছরে তিনবার করে ফসল ফলাতে শিখিয়েছিলেন বীরভূমের চাষীদের তিনি। বীরভূমেরই সেবায় জীবনের শেষটুকু উৎসর্গ করেছিলেন। তবু, কোপাই কি আর পদ্মার পাশে দাঁড়াতে পারে? বাবার বুকের মধ্যে বাস্তুহারা একটি মানুষ লুকিয়ে ছিলই, ঢাকার সঙ্গে যাঁর পিতৃ-পিতামহের পরিচয় যুক্ত। আমার শিশু কন্যাকে তিনি যখন আদর করে সাতপুরুষের পিতৃপরিচয় শেখাতেন, তাঁর দৃষ্টিতে, তাঁর স্বরে ঝরে পড়তো ‘দেশের’ জন্যে সেই নসট্যালজিয়া। ‘দেশ’, বা ‘দেশের বাড়ি’ ব্যাপারটা আমার কোনোদিন ছিল না, কলকাতাই আমাদের বাপের বাড়ির দেশ বলে। এই নসট্যালজিয়ার অভাবটা আমি খুব অনুভব করেছি ছোটবেলাতে। স্কুলের ছুটিতে যাবার জন্যে যাদের ‘দেশ’ ছিল, তাদের চেয়ে দরিদ্র মনে হতো নিজেকে। বিয়ে হয়ে আমারও ‘দেশ’ হলো। মত্তগ্রামের জন্যে ধার-করা দুঃখু হতো আমার। যদি কখনো বাংলাদেশে যাই, নিশ্চয়ই একবার ‘মত্তগ্রামে’ যাবো। আমার সন্তানদের সাতপুরুষের পরিচয় যে-মাটিতে।

‘শ্বশুরবাড়ি’ শব্দটাও সত্যি আশ্চর্য বটে। ছোট্ট থেকেই একটা ঘোমটাটানা সিঁদুরপরা, গয়না ঝুমঝুম, রাঙাটুকটুক শব্দ। শব্দটার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘কাবুলিওয়ালা’ পড়বার আগেই। সদ্য যুদ্ধ থেমেছে, মিলিটারি ক্যাম্পগুলো ভাঙা হয়েছে, পড়ে আছে বিরাট বিরাট শান-বাঁধানো খোলা জায়গা, এখানে সেখানে। গড়িয়াহাট হিন্দুস্থান পার্কের মোড়েও অমন জায়গা ছিলো (দমকলের ওপাশে)। সার্কাসের তাঁবু পড়লো সেখানে। পাড়ার বাচ্চাদের উত্তেজনার অন্ত নেই। বাঘ সিংহীর ডাক শোনা যায়, ভোরবেলায় হাতী, উটেরা মর্নিং ওয়াকে বেরোয়, আর সবচেয়ে উত্তেজনা একজন অবাঙালি ‘ক্লাউন’কে নিয়ে। তিনি বাচ্চাদের নিয়ে খুব মাতামাতি করতেন। মার্কিন মিলিটারিরা ছোটদের চুইংগাম দিত যেমন, তিনিও তেমনি আমাদের লজেন্স খাওয়াতেন। নানান মজার অঙ্গভঙ্গি তো করতেনই এর ওপর একটা ছড়া বলতেন, যেটা বললেই ছেলেরা খুব হাসতো আর মেয়েরা ছুটে পালিয়ে যেতো। ছড়াটা এই—“তাড়াতুড়ি তাড়াতুড়ি আমি যাব শ্বশুরবাড়ি।” এতে যে এত লজ্জাশরমের কী ছিল, এখন বুঝি না। কিন্তু তখন? ওরে বাবা ! ঐ “অসভ্য” ছড়াটা শুনলেই আমরা ছুট্টে দূরে পালাতুম। আমিও। কেননা ওটাই দস্তুর। ওটাই রেওয়াজ। ছোটরা খুব ‘রেওয়াজ’ মানে। ‘শ্বশুরবাড়ি’ শব্দ মানেই খানিজ লজ্জা, খানিক আহ্লাদ। আরেকটু বড় হয়ে বুঝলুম, খানিক স্বপ্ন, খানিক ভয়। ‘বর’ শব্দটাও ক্রমশ ঠাঁই করে নিচ্ছিল বুকের মধ্যে। থির্‌থির্ করে কাঁপতো যেন হ্রদের জলে বনের ছায়া। তাতে স্বপ্নের বাতাস দিচ্ছে, ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে কিছু অস্পষ্ট ছায়াময় শ্যামলিমা, দুলছে, কাঁপছে, দুলছে, বুকের আয়নায় চেপে ধরা যাচ্ছে না। যখন সত্যি সত্যি আমারও ‘বর’ হলো, ‘শ্বশুরবাড়ি’ হলো, তখন সে কী আনন্দ আমার। এমন মনের মতো বরটি, এত স্বপ্নের মতো শ্বশুরবাড়িটি। কলকাতা শহরে চারতলা বাড়িতে বড় হওয়া মেয়ে, গাছ পুকুর ধানখেত ইঁদারাওলা একতলা বাড়ি আমার স্বপ্ন—ঠিক তেমনি বাড়িই ‘প্রতিচী’, যেমন বাড়িতে কলকাতার লোকে ২-৪ দিন ছুটিতে বেড়াতেই যেতে পায়, জন্মের শোধ বসবাস করবার অধিকার পায় না। ঠিক তেমনি বাড়িতেই লাল বেনারসী পরে শাশুড়ি-মা আমাকে কোলে করে চৌকাঠ পার করিয়ে, শিলের ওপর দাঁড় করালেন। আরেকটা শ্বশুরবাড়ি দিল্লিতে ন নম্বর অশোক রোডে শ্বশুরমশায়ের সরকারী কোয়ার্টার। ও বাবা, সেও ইলাহি ব্যাপার। নতুন বউটি কলকাতা থেকে পৌঁছে, গাড়ি থেকে নেমেই দ্যাখে গেটে ঢুকে ডাইনে মস্ত দোলনা। আর কথা নয়, সোজা গিয়েই চড়ে বসেছে! শ্বশুর-শাশুড়ি বৌয়ের আদেখলেপনায় একটুও বকলেন না, শাশুড়ি মা বরং আদর করে কয়েকবার দোল দিয়ে বললেন—“আজ নেমে এসো, কাল আবার হবে।” অশোক রোডের বাড়ির সামনে চমৎকার বাগান আর পিছনে বিরাট সবুজ মাঠ, যার নাম ‘লন’। আর মস্ত মস্ত বড় বড় গাছ ছিল। সন্ধেবেলা সেইসব গাছে টিয়াপাখির ঝাঁক উড়ে আসতো। এমন গাছওলা, টিয়াপাখিওলা, মাঠওলা বাড়িতে বড় হইনি তো? ছেলেবেলায় সব খেলার মাঠেই ট্রেঞ্চ খোঁড়া থাকতো। তায় দোলনাওলা বাড়ি। খুব ভালো লেগেছিলো, শ্বশুর-শাশুড়ি সমেত সুন্দর ‘শ্বশুরবাড়ি’, যদিও খেলার দিন শেষ। কিন্তু জীবন সব সময় কথা রাখতে পারে না। সময়ের কাছে জীবন বড় অসহায়। ‘শ্বশুরবাড়ি’ শব্দের ওপর এখন অনেক মেঘের ছায়া, অনেক বানভাসি জলের শুকনো দাগ।

জীবন থেকে কোনো শব্দ চুরি হয়ে যায়। কোনোটা বা পুরনো হয়ে যায়, পচে যায়, ফুরিয়ে যায়। আবার কত নতুন নতুন শব্দ আসে। ‘বর’ শ্বশুরবাড়ি’ এসব শ্রী-ছাঁদের সঙ্গে বরণডালায় সাজানো সিঁদুর মাখানো লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে তোলা শব্দগুলি ধমনীর স্রোতের সঙ্গে যা এক হয়ে গিয়েছিল, কখন আবার ‘ডিভোর্স’ শব্দের প্রবল প্রতাপে তারা খরচ হয়ে গেল। ঐরকম ভয়ঙ্কর খুনখারাবির রঙের নাঙ্গা তলোয়ারের মতো শব্দ ‘ডিভোর্স’ যে কোনোদিন এই আমারই হাতবাক্সোতে এসে ঢুকবে এ কেউ ভেবেছিলো? আর ‘ডিভোর্সী’ মেয়ে মানেই তো বদ্। ছলচাতুরী করা, চরিত্রহীন। অতি সব্বেনেশে জিনিস ওই সব উড়নচণ্ড, ঘরভাঙা মেয়েরা। ওইসব স্বামীত্যাগিনী খারাপ মেয়ের থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভাল। অন্যের ঘরসংসারে আগুন তো জ্বালে ওরাই। ডিভোর্সের চেয়েও ভয়ঙ্কর শব্দ ছিল ঐ ‘ডিভোর্সী’।

আর আজ? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভালো করে মুখের দিকে তাকাই, দেখতে চেষ্টা করি সেই সুলক্ষণা “বউ” শব্দটা কোথায় ফুরোলো, আর অলুক্ষুণে “ডিভোর্সী” শব্দটারই বা কোন্খান থেকে শুরু। মুখ কিছুই ক্লু দেয় না। আয়নাটা বোধহীন জড়বস্তুর মতো আচরণ করে।

কোথাকার শব্দ, কোথায় গড়ায়। ‘সৎমা’ শব্দটাই ধরা যাক। রূপকথায় শোনা ঐ বুক দুরুদুরু ভীষণ শব্দের জীবন্ত চেহারা কখনও দেখিনি। স্কুলে একটি মেয়ে বোর্ডিঙে থাকতো। শুনেছিলুম তার নাকি ‘সৎমা’ আছে, ‘মা’ নেই। তাই ওকে বাবা বোর্ডিংয়ে ফেলে রাখেন। ভয়ে ভয়ে কৌতূহলের সঙ্গে ওকে দূর থেকে চেয়ে দেখতুম, বেচারী। বাগে পেলে সৎমা ওকে না একদিন জীবজন্তু বানিয়ে দেয়। সৎ মা-রা তো ডাইনি হয়। হিংসুটি হয়।

অনেক শখ করে যখন ‘মা’ হয়েছিলুম তখন কি ভেবেছি, আমার এই তুলতুলে পুতুলের মতো বাচ্চা দুটোর জীবনেও এই গল্পে-শোনা, সত্য শব্দ জ্যান্ত হয়ে ঢুকে আসবে? এক আধুনিক রূপকথার চরিত্র হয়ে উঠবো আমরাই? কিন্তু বিয়েও যেমন আর জন্মজন্মান্তরের জন্যে হয় না, কংগ্রেসীরা যেমন দেশপ্রেমিক হয় না, কমিউনিস্টরা আর হয় না মানবপ্রেমিক, এখনকার সৎমারাও আর ডাইনি-টাইনি হয় না। আর চুপিচুপি বলে রাখি, ‘ডিভোর্সী’রাও হয় না তেমন কিছু ভয়াল, মুণ্ডমালিনী !

কিন্তু ‘ডিভোর্স’ শব্দ? হ্যাঁ, সেই শব্দের অমোঘ আঘাত, তার মর্মবিদারী মৃত্যুতুল্য তীব্র ব্যঞ্জনা এখনও মানুষের জীবনে একইভাবে বজায় আছে, থাকবেও, “প্রেম” শব্দের জাদু আর যন্ত্রণার আয়ু যতোদিন।

তাহলে পরিপ্রেক্ষিত বদল হলে, শব্দের চরিত্রও বদলে যায়? যতদিন অন্যের ঘরে, ততদিন এক পোশাক, যেই নিজের ঘরে এল তখন অনন্য। শব্দের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক পালটে যায় কেমন। যেমন ‘মা’ শব্দ। যতদিন নিজে ‘মা’ হইনি, ততদিন একরকম। আর যেই নিজে ‘মা’ হলুম, অমনি তার আরেক মূর্তি। এই ‘মা’ শব্দটা আমাকে কম ভুগিয়েছে? আরো কতো ভোগাবে কে জানে?

‘মা’ বললেই বুকের মধ্যে মোচড় দিতো। মা-কে সশরীরে সামনে দেখেও মার জন্যে মন কেমন করতো। সেই বোধহয় ভালোবাসার প্রথম পাঠ।

বিয়ের পর বিদেশে কেবল বরটি আর বউটি। জীবনের সবচেয়ে কাছের সবচেয়ে প্রিয় ডাকটি ‘মা’। যখনই অন্যমনস্ক হয়ে অমর্ত্যকে ডাকতে যাই—‘মা’ বলে ডেকে উঠি। তারপর আমিও লজ্জা পাই, উনিও ক্ষ্যাপান। একটু কি আর চটেও যান না? এক সময়ে দেখি ‘মা’ বলে ডাকলে, ‘উঁ’ বলে সাড়া আসছে। “কী করে বুঝলে তোমাকেই ডাকছি?” আমি তো মুগ্ধ ! আর উনি নাচার ! “না বুঝে উপায় কি? বাড়িতে আর তো তৃতীয় ব্যক্তি কেউ নেই !” সেই ‘মা’ ডাক এখন আরেক ভাবে জ্বালায়। পথে ঘাটে, ট্রামে বাসে অন্যের বাড়িতে, কেউ কারুকে “মা” বলে একবার ডাকলে হয় ! আর রক্ষে নেই, অমনি “হাম্বা ! হাম্বা!” করে আমিই সাড়া দিয়ে উঠি। কখনো মুখে, আর কখনো বুকের ভেতরে। যেন জগতে ‘মা’ শব্দ একমাত্র আমারই ডাকনাম।

অথচ, নিজে যখন ‘মা’ হতে চলেছি তখন কী ভয়— ‘মা’ যে হবো, মা হবার যোগ্যতা কি আমার আছে? সবাই কি আর ‘মা’ হতে পারে? ‘মা’কে হতে হবে নিখুঁত। আমার মায়ের মতো। মা-কে জানতে হবে সব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর, সব ভয়ের নিশ্চিত মাভৈঃ, মাকে থাকতে হবে অটল আত্মবিশ্বাসে, আর ‘মা’র জীবনই হবে মা’র বাণী। আরেকটা পুরো ‘মানুষ’ তৈরি করা,—এ তো ঈশ্বরের কর্ম। আর ‘মা’য়েদের। আমি কি ‘মা’ হতে পারি? এদিকে প্রবলভাবে শিশু ভালবাসি। মা হবার ইচ্ছে খুব। কেমব্রিজে যখন মা হতে যাচ্ছি, খুব সিরিয়াসলি হপ্তায় দুর্দিন করে ন্যাচারাল চাইল্ডবার্থের স্পেশাল ক্লাস করলুম, যাতে শিশুটির জন্ম মুহূর্তটি আনন্দময়, শান্তিময় হয়। বার্থ-ট্রমা যাতে স্বল্পতম হতে পারে। জন্মানোর মুহূর্ত থেকেই সন্তানের জীবন পথ যাতে স্বচ্ছন্দ, সরল, সুগম ও আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ হয় তার চেষ্টা, তার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করা চলল। ‘মা’ হবার পরে তো আরেক প্রস্থ দুর্ভাবনা শুরু হবে। কেমন করে বড়ো করা। কতটুকু ছেড়ে, কতটুকু আগলে? কতটুকুতে ফ্রিডম, কতটুকু ছাড়ালে লাইসেন্স? কতটুকুতে কেয়ার, কতটাতে ডিক্টেটোরিয়াল? কতটুকুতে ইন্টারেস্টেড, ইনভলভড, কতটুকুর বেশি হলেই ইন্টারফায়ারিং? আর কতটুকু কমতি হলেই নেগলেক্ট? কোথায় কেয়ার থেকে পজেসিভনেস-এর শুরু হয়ে যায়? এতসব আমি কেমন করে জানবো? কী কর্তব্য বুঝবো কি? পারবো কি? বইয়ের পরে বই কেনা হতে লাগলো। শিশু তখনও পেটের মধ্যে হাত-পা ছুঁড়ে মনের সুখে জলকেলি করছে। আমার আর ‘মা’ শব্দের যোগ্য হবার জন্য প্রস্তুতি শেষ হয় না। ইতিমধ্যে ডক্টরেট পাশ করে গেলুম বিনা উদ্বেগে। সেখানে যোগ্যতা নিয়ে নিজের মনে প্রশ্ন ছিল না।

যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে বিনা ওষুধপত্তরে, বিনা কাটাছেঁড়ায়, সজ্ঞানে, সানন্দে দৌড়ে স্বদেশে উড়ে এসে ‘মাতৃভূমি’তে হাস্যবদনে নির্ভয়ে সন্তান প্রসব করলুম। (যদি গরু ভেড়া পারে, আমিই বা পারবো না কেন?) আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সবচেয়ে সার্থকতার মুহূর্ত সেই প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়া। সেই ‘মা’ শব্দের দাবিদার হলুম।

কিন্তু সেসব অনেকদিন আগের কথা। “বিশ সাল বাদ” আমারই ভাবতে অবাক লাগে, এরকম পাগল ছিলুম? এমন ঐকান্তিকভাবে, সর্বান্তঃকরণে ‘মা’ শব্দের যোগ্য হতে চেয়েছে ক’জন মেয়ে, জানি না। তবে, সেটাই ভুল হয়েছিল। এখন মনে মনে বুঝি আমার নিজের বিষয়ে সব উদ্বেগ, সব ভীতিই অভ্রান্ত ছিল। ‘মা’ শব্দের যোগ্যতা আমি কোনোদিনই অর্জন করতে পারবো না। এই জেনারেশনের মা হবার যোগ্যতা আমাদের জেনারেশনের নেই। আমাদের মায়েদের সঙ্গে সেই যুগের অন্ত হয়েছে।

জীবন আর শব্দ পরস্পরকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কখনো আমরা শব্দের পিছু ধাই, আবার শব্দ কখনো আমাদের। হ্যাঁ, ছিল বটে স্বপ্নময়, জাদুময় ‘কফি হাউস’ শব্দটি ! আমাদের প্রাচীন পরিবারেও যেন সার্সির ভয়ঙ্কর দ্বীপ, যেন কামাখ্যার পাহাড় ! ওখানে পা দিলেই মেয়েরা হয়ে যায় উড়নচণ্ডী, আর ছেলেরা কমিউনিস্ট ! পড়াশুনো শিকেয় ওঠে। এবং প্রেম না করে উপায় থাকে না। অতএব বাড়ি থেকে ফতোয়া জারি করা হলো : “প্রেসিডেন্সিতে যাবে যাও, কিন্তু কফি হাউসে পদার্পণ করবে না !” “ভালো মেয়ে” এই আত্মপ্রবঞ্চক শব্দের সঙ্গে আবাল্য এমনই একাত্ম হয়েছি যে আজও মায়ের ইচ্ছের অবাধ্য হবার শক্তি হয়নি। জুলজুল করে ঊর্ধ্বপানে কফি হাউসের দিকে চেয়ে থাকতুম, গরীব লোকে যেমন চেয়ে থাকে বড় বড় মিষ্টির দোকানের দিকে, প্রেসিডেন্সি থেকে সংস্কৃত কলেজে সংস্কৃত ক্লাস করতে যাবার পথে, বন্ধুরা সবাই স্বাধীন, তারা দিব্যি কফি হাউসে যেত, কত কি ইন্টেলেকচুয়াল কথাবার্তা শিখত। (তখনও ‘আঁতেল’ শব্দ চালু হয়নি।) কিন্তু কফি হাউসে না ঢুকেও আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতুম তাদের তালে তাল মিলিয়ে চলতে। তাই নিত্যি নতুন শক্ত শক্ত শব্দ শিক্ষা নিতেই হত। শব্দের সঙ্গে সঙ্গে খুলে যাচ্ছিল এক-একটা নতুন ভাবনার জগৎ। ‘ডায়থেকটিক্স’, ‘মাস মোবিলাইজেশন’, ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ এসব শিখতে না শিখতে, ‘লং মার্চ’ নিয়ে মুগ্ধ হতে না হতেই, এসে পড়লো পার্সোনালিটি কালট’-এর নিন্দে। এবং একটা খুব জরুরি শব্দ শিখলুম : ‘কমিটমেন্ট’। দুই অর্থে দুই ক্ষেত্রে দুই দিগন্তে—এক ; আদর্শের প্রতি। দুই : ব্যক্তির প্রতি। কি নৈতিক বিশ্বাসে, কি ব্যক্তিগত সম্পর্কে, ‘কমিটেড’ হওয়াটা ‘ইন্টেগ্রিটি’র লক্ষণ। আর ‘নন্কমিটাল’ যারা, তারা আসলে সুবিধের লোক নয় ! অর্থাৎ সুবিধাবাদী লোক। সতীর্থরা অকালপক্ব, আমি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এঁটে আর উঠতে পারছি না, ঝটপট শিখে ফেলছি ওপর-ওপর কিছু শব্দের জায়গা মতো ব্যবহার। যেমন, এই ‘অথেনটিক’ আর ‘ফোনি’, ‘থিওরি’ আর ‘প্র্যাকটিস’। ‘অ্যাটিচ্যুড’, ‘পয়েন্ট অব ভিউ’, ‘অ্যাপ্রোচ’, এসব ‘হ্যান্‌ডি’ শব্দগুলো খুব কাজে লেগে যেত, যেমন কাজে লাগতো ‘লোকাস স্ট্যান্‌ডাই’, কি ‘ভ্যালু জাজমেন্ট’—‘ভ্যালুজ’ কিংবা ‘লজিক্যালি ইনভ্যালিড’ শব্দ-টব্দগুলো। ‘হাইপোথেটিক্যাল’ আর ‘নাইভ’ তো দারুণ শব্দ ! ‘সাবজেকটিভ’ আর ‘অবজেকটিভ’-ও তাই। তখন এই শব্দগুলো ঠিক শব্দ ছিল না। যেন ফরমূলা ছিল। যেমন ‘প্রবেবিলিটি’ মাত্রেই ‘রিমোট’, আর ‘আইডেনটিটি’ হলেই ‘বেসিক’ হওয়া চাই। তখনও ‘আইডেনটিটি’ শব্দের জুড়িদার হয়ে ‘ক্রাইসিস’ উপস্থিত হয়নি আমার মননে, সেটা এল বছর দুয়েক বাদে ‘এগজিসট্যানশিয়াল’ শব্দের হাত ধরে। আরেকটা বিশ্বের দোল খুলে দিয়ে।

ফরাসি শেখবার আগে আগে বড্ডই ঝামেলা বাধাত তিনটে র-দিয়ে শুরু দীর্ঘ শব্দ। বাংলা বইতে নানারকমের উচ্চারণে লেখা হয়। —রেনেসাঁ? রেনেশাঁ? রেনেসান্স? রেনেসাঁস? রেনেশাঁস? শাঁসালো সমস্যা। —রেস্টুরেন্ট? রেস্টোর‍্যান্ট? রেস্তোঁরা? রেস্তোরাঁ? চন্দ্রবিন্দুটি দেয় কোথায়? আর তৃতীয় শব্দটা তো আরো গোলমেলে। —রেনডেজভুজ? রেনদেজভুজ? রেন্দেজভু? রেন্দেভু? রাঁদেভু? দূর ছাই—ট্রিস্ট কিংবা অভিসার ঢের ভালো ! (এ শব্দগুলো আপনাকেও নির্ঘাৎ জ্বালিয়েছে? বুকে হাত দিয়ে বলুন, জ্বালায়নি?)

চোখের সামনে দেখলুম একই শব্দ পোশাক পালটে নতুন নতুন শব্দ হল। ছিল ফোনোগ্রাফ, হলো গ্রামোফোন, তারপর রেকর্ডপ্লেয়ার তার থেকে হাই-ফাই, স্টিরিও, কত কী। ছিল রেডিওগ্রাম, হলো টু-ইন-ওয়ান, থ্রি-ইন-ওয়ান, আরো বাড্‌বেড়ে এখন নাম মিউজিক সেন্টার। ছিলুম কলোনি, হলুম আনডার ডেভেলপ কানট্রি, তারপর ডেভেলপিং নেশন এখন তৃতীয় বিশ্ব। আরো কী কী হবে তা জানতে ব্যগ্র হয়ে আছি। বাবাদের এন্ট্রান্স, দাদাদের ম্যাট্রিক, আমাদের ইশকুল ফাইন্যাল, ছেলেমেয়েদের মাধ্যমিক যেমন। কখনো কখনো শব্দ বদলায় বটে কিন্তু আর কিছুই বদলায় না। যেমন আগে ছিল ‘পাশবিক অত্যাচারে’র যুগ আর ‘ফুসলাইয়া লইয়া যাইবার’ দিন। পরে বড় হয়ে বুঝেছি ‘পাশবিক অত্যাচার’ পশুরা কখনোই করে না, ওটা কেবলই মানবিক অধিকারের এক্তিয়ারে পড়ে ! এবং ‘বলাৎকার’ মানে প্রচণ্ড মারধোর নয়। অন্য কিছু। তাই পশুদের নিস্তার দিয়ে এখন দিনটা হয়ে গেছে সোজাসুজি ‘ধর্ষণ’-এর। তফাৎটা কেবল এই, যে ‘পাশবিক অত্যাচার’ শব্দটা দেখতে হলে ‘আইন-আদালত’-এর পাতা খুলতে হতো। এখন ‘ধর্ষণ’ শব্দ প্রথম পৃষ্ঠাতেই বুক ফুলিয়ে বিরাজ করে। যুগটা বদলেছে এইখানে।

যেমন, যার নাম ছিলো ভি-ডি, তারই নাম এস টি ডি হলো, কিন্তু তাতে তো অসুখটার পদোন্নতি হলো না? তবে একটি অসুখের বরং পদচ্যুতি হয়েছে বলা যায়। যা ছিল থাইসিস তাই হল টি বি কিন্তু “রাজ-রোগ” আর নেই সে। নায়ক-নায়িকাদের মেরে ফেলতে হলে এখন টি বি-তে শানায় না, ক্যান্সার চাই। গাঁয়ের লোকেরা আর কল্কেফুলের বিচি কি তুঁতেবিষ খেয়ে মরে না তারা খায় ফলিডল। এর নাম টেকনোলজিকাল প্রগ্রেস।

এই ঘূর্ণ্যমান, বধর্মান, পরিবর্তমান জগৎ, এ তো শব্দের রণ্পায়েই এগিয়ে চলেছে। রকেট থেকে স্পেসল্যাবে। চালের কন্ট্রোল থেকে কাপড়ের কন্ট্রোলে, তা থেকে বার্থ কন্ট্রোলে। টেস্টটিউব জানি, বেবিও জানি। কিন্তু দুটি শব্দ জুড়ে দিয়ে যেটি হলো, সেই নতুন শব্দ কোথায় বাড়িয়ে দিলো জানার সীমানা ! কে জানতে পাঁজরার মধ্যে বসানো যাবে লোহার যন্ত্রর, যা নাড়ীর গতি চালু রাখবে? কে ভেবেছিলো একজনের হৃদয় সত্যিই আরেক জনের বক্ষপিঞ্জরে ফিট করে দেবার মতো বিশ্বকমা জন্মাবেন ধরাধামে? “হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট” শব্দটা এখনও আমাকে আশ্চর্য, রোমাঞ্চিত করে—হৃদয় যেন ধানের চারা !

এই “পারমিসিভ্” সমাজে এখন কোনো শব্দই আর নিষিদ্ধ নেই। হাইস্কুলের কিশোর কিশোরীর মুখে কী সহজেই ‘ফাক্’ ‘স্ক্রু’ এই সব শব্দ চুইংগাম চিলেটের মতো এঁটে থাকছে। কিন্তু আমাদের কৈশোরে অজস্র নিষিদ্ধ শব্দ ছিলো। শব্দের রহস্যময় একটা পৃথিবীই অনাবিষ্কৃত ছিলো আমাদের কাছে, বড়ো হবার, চাবি পাবার অপেক্ষায়। আমাদের অনেক ‘অসভ্য’ শব্দ ছিলো। যেমন ‘কিস্‌’। বাচ্চাদের চুমু খায়, বড়োরা কিস্ করে। বোধহয় মধ্যবিত্ত বাঙালি বড়োদের চুম্বনের দৃশ্য আমরা ঘরোয়া পটভূমিতে কখনো প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাই না বলেই, ওই মোহময় কর্মকাণ্ডটি ইংরিজি সিনেমার পর্দার অনুষঙ্গ নিয়ে ‘কিস্‌’ হয়ে এসেছিলো আমাদের শব্দ ভাণ্ডারে। ‘কিস্‌’-এর সগোত্র শব্দ ছিল ‘বয়ফ্রেন্ড’, ছিল ‘লাভ’, আর ‘লাভার’ এবং ‘লাভ ম্যারেজ।’ এগুলো সবই ইংরিজি ক্রিয়াপ্রক্রিয়া। কিন্তু সম্বন্ধ করে যে শুভলগ্নের শাস্ত্রীয় কর্ম, তার নাম ‘বিয়ে’। সেটা নিষিদ্ধ শব্দ ছিল না। প্রথাসিদ্ধ শব্দ ছিল।

আমেরিকাতে পড়তে গিয়ে আরেক প্রস্থ শব্দ শিখলুম। নতুন শব্দদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে মার্কিন সংস্কৃতি, মার্কিন সমাজকে চিনলুম। যাত্রাপথেই শিখে ফেলেছি ‘ফিয়াঁসে’ শব্দের সালঙ্কার মহিমা, অনামিকায় শোভা পাচ্ছে ‘এনগেজমেন্ট রিং’ এবং হৃদয়ে আছেন হৃদীশ্বর। হস্টেলে গিয়ে দেখি বান্ধবীদের জীবনে ঢেউ তুলেছে গায়ে-কাঁটা-দেওয়া সব লোমহর্ষক শব্দলহরী : ‘ডেটিং’, ‘নেকিং’, পেটিং’। ‘লাভমেকিং’ মানে প্রেম করা নয়, ‘স্লিপিং’ মানে ঘুমুনো নয় মোটেই ! ইংরিজি জানতুম না তা তো নয়? অথচ জানা ছিল না এও ঠিক? ‘শিট্’ মানে যে হাশিশ, ‘গ্রাস’ মানে যে মারিহুয়ানা, এসবও কি জীবনে জানতুম? বিষ্ঠা বা ঘাস যে খাবার জিনিস নয়, তাই জানি। সেসব প্রথম চমক আমার জীবনে ভোলবার নয়। প্রথম যেদিন ‘স্টোন্‌ড’ শব্দটা শুনি তার নিষ্ঠুরতা কল্পনা করে কেঁপে উঠেছিলুম। এ কোন দেশ? এখনও এখানে লিনচিং হয়? যেমন হতো দক্ষিণে কাফ্রি ক্রীতদাসদের বেলা, দশ মিনিট ধরে হেসে বন্ধুরা বুঝিয়ে দিয়েছিল, ‘স্টোনড’ মানে ড্রাগ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়া—পাথর ছুঁড়ে মারা নয়।

এসব নতুন নতুন শব্দ বেয়ে আমি এক নতুন জগতে পৌঁছোলুম। ‘কিস্’, ‘বয়ফ্রেন্ড’, ‘লাভ ম্যারেজ’-এর জগৎ থেকে সেটা অনেক দূরে। ‘ভি.ডি’ আর ‘পর্নো’ সেখানে জলভাত ‘হোমো সেকশুয়াল’ বেশ ফ্যাশনদুরস্ত, সমাজবিপ্লবী। ‘গেঁ’, ‘ডাইক’, এসব শব্দের পায়ে পায়েই চলে এলো ‘সেকসিস্টি’ আর ‘ফেমিনিস্ট’ শব্দের যুগ। ‘ব্ল্যাক ইজ বিউটিফুল’, স্লোগানের পিছু পিছু এসে পড়লো ‘লেসবিয়ান সিস্টারহুড’।

রাজনীতির বিপ্লব সরে গেল সমাজনীতির দিকে, তা থেকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দিকে—জানি না এখন এটা কতটা সদর্থক আর কতটা নঞর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইংরিজি শব্দের মানে জেনেও বিশেষাৰ্থ জানতুম না, এ তেমন লজ্জার নয়—বাংলাই কি ঠিক-ঠিক জানি? ‘নিজলিঙ্গাপ্পা’ নাম নিয়ে আমরা কত হাসাহাসি করেছি কলেজে, ‘রাধারমণ’ নিয়ে তো কেউ হাসে না, নামটার অর্থ নিয়ে কেউ যে ভাবেই না ! এ না হয় গেল একে সংস্কৃত, তায় ঠাকুর দেবতার নাম—এটা সভ্য না অসভ্য ভাবার সুযোগ হয়নি। কিন্তু সভ্যভব্য বাংলা চলতি শব্দেরই কি সব বিশেষার্থ সব সময়ে জানি? আমার একটা নির্বুদ্ধিতার গল্প তো এক্ষুণি মনে পড়ে গেল। লন্ডনের ব্যাটারসী পার্কে গেছি হবু-স্বামীর সঙ্গে। উপবনে মুক্তবায়ু সেবনের উদ্দেশে গেলেও, গিয়ে দেখি হৈ হৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার, সেটা আসলে একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। কোনি আইল্যান্ড বা টিভোলিপার্ক যেমন।

কালচক্রের মতো বিপুল এক ঘূর্ণ্যমান বৈদ্যুতিক নাগরদোলা থেকে নেমে, আমার প্রাণেশ বললেন, “তুমি বন্দুক ছুঁড়তে পারো?” চারিদিকে বিমল আনন্দের বিচিত্র ব্যবস্থা। ধুড়ুদুম করে গাড়িতে গাড়িতে ধাক্কা মেরে আনন্দ দিচ্ছে ‘ডজ’ এম কার-এর দোকান, ডিসুম্ ডিসুম্ গুলি মেরে বেলুন ফাটিয়ে আনন্দ দিচ্ছে রাইফেলশুটিং-এর দোকান। আমার তো শোক উথ্লে উঠলো এই প্রশ্ন শুনে। ‘আনডার ওয়েট’ বলে এন সি সি-তে রিজেকটেড হয়েছিলুম—অন্য বন্ধুরা দিব্যি কি সুন্দর বন্দুক চালাতে শিখে গেল !

“তুমিও শিখবে? রাইফেল চালানো খুব সোজা”—এই বলে দ্রোণাচার্য শ্ৰীমতী অর্জুনের কাঁধে বন্দুক তুলে দিলেন। —“ট্রিগারে এই আঙুলটা রাখো, আর ঐ যে মাছিটা দেখছ, ঐ মাছির সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু ও বন্দুকের নলকে একই লাইনে নিয়ে এসো। ব্যাস হয়ে গেল ‘এইম’ করা ! কই, ট্রিগার টানো?” ‘টানো’ বললে কি হবে আমি আর ট্রিগার টানি না। টানবো কি, মাছি? মাছিটা গেল কোথায়, তখন লন্ডন খুব পরিচ্ছন্ন, এখনকার মত শিথিল নোংরা, দীনদুঃখী চেহারা তার ছিল না। মাছি-টাছিকে পাত্তাই দিত না শহর লন্ডন। উনি আবার মাছি পেলেন কোথা থেকে? মহা দুর্ভাবনায় পড়া গেল, অনেক চেষ্টা করেও ওঁর-দেখা মাছিটা আমি আর দেখতে পেলাম না। সে কি স্থির হয়ে বসে থাকার জিনিস? শেষে ভয়ে ভয়ে বলেই ফেলি—“মাছিটা উড়েটুড়ে গেছে বোধহয়, দেখতে পাচ্ছিনে তো?” শুনে অমর্ত্য হেসেই কুটিপাটি! এই নাকি কবির বাংলা জ্ঞানের বহর? বন্দুকের ‘মাছি’ চেনো না? চিনবে কী করে, বন্দুকই দেখেছি নাকি জীবনে? এখনো যে-কোনো মেলার মাঠে বেলুন ফাটানো খেলা দেখলেই আমার ‘মাছি’র গল্পটা মনে পড়ে যায়। ব্যাটরসি পার্কের সেই সদ্য-বাগ্দত্ত ছেলেমেয়ে দুটির জন্য মন কেমন করে। হায় বাক্ ! জীবনের তোড়ে তুমি কোন্ বনবাদাড়ে ভেসে যাও!

এরই নাম ‘নস্ট্যালজিয়া’। অনেক সময়ে পুরনো শব্দ নতুন হয়ে যায়। যেমন এই ‘নস্ট্যালজিয়া’। এটা তো ইশকুল থেকেই জানি? ইংরিজি কবিতা প্রসঙ্গে প্রায়ই ব্যবহৃত হয় শব্দটা। কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে তার মানে অনুধাবন করতে পারা অন্য জিনিস। বিদেশে পড়তে দূরে গিয়ে প্রথমে টের পেলুম শব্দটার ভিতরের বর্ণগন্ধ কেমন। তারপর শৈশব থেকে যতই দূরে চলে এসেছি, মূল থেকে যতই উৎপাটিত হয়েছি, ‘নস্ট্যালজিয়া’ শব্দ যেন ততই নিওনবাতিতে জ্বলজ্বলে হয়েছে মনের মধ্যে। ‘নস্ট্যালজিয়া’ ব্যাপারটার শ্রেষ্ঠ বর্ণনা ছিল লন্ডনের একটি দেয়াল লিখনে : “Nostalgia isn’t what it was!” অভিমান শব্দের ইংরিজি নেই সবাই বলি, কিন্তু ‘নস্ট্যালজিয়া’ শব্দের বাংলা হয় না। বাংলা নেই।

কোন্ মনিবের কেমন করে মন রাখতে হয় সেটা শব্দেরা দিব্যি জানে। একই শব্দ সবাইকে সমান সার্ভিস দেয় না। কবি, অকবি সবার বেলায়। একবার এ ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলুম। করমণ্ডল এক্সপ্রেসে মাদ্রাজ থেকে কলকাতা আসছি, কামরায় আছেন একজন মিলিটারি অফিসার ও তাঁর বালকপুত্র (কেরালার ক্রিশ্চান তাঁরা), দুজন দক্ষিণী যুবক ব্যাঙ্ককর্মী ও আমি। বাচ্চাটি মার জন্য মন খারাপ করছে আর কামরাসুদ্ধ চেষ্টা করছি তাকে খুশি রাখতে। গান হলো, কাটাকুটি খেলা হলো, পেটাপেটি খেলা হলো, তাসের ম্যাজিক, জিওগ্রাফি গেম। সব দেশেরই প্রায় A দিয়ে নাম শেষ হয়, আর A দিয়ে আরম্ভ দেশ মাত্র কয়েকটাই! অতএব সে খেলাও ফুরোলো, এলো word associations, শব্দের অনুষঙ্গ বেয়ে এগিয়ে চলার খেলা! বেশ জমেছে হঠাৎ ‘ডেথ’, শব্দটা বাচ্চা ছেলেটির ভাগ্যেই পড়লো। সবাই তটস্থ, ওইটুকু শিশু, ও আবার মৃত্যুর অনুষঙ্গে কী বলবে। কিন্তু শিশু তখুনি উত্তর দিল ‘হেভ্‌ন’! সত্যিই তো, শিশুর মনে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, মৃত্যুর পরেই স্বর্গবাস। আর এক রাউন্ডে বাচ্চাটির কপালে পড়লো ‘লাভ’ শব্দটা। অতটুকু ছেলে প্রেমের কী জানে? জানে, জানে। কে বলেছে, জানে না? বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করেই সে বললে : ‘মেরী—যীসাস এ্যান্ড মেরী !’

আমি নিশ্চিত জানি, আরো দশ বছর এই গ্রহে বসবাস করবার পরে ওই ছেলেটি ‘লাভ’ শুনলে আর ‘যীসাস অ্যান্ড মেরী’ বলবে না। ‘ডেথ’ শুনলেও অমন নিঃসঙ্কোচে উচ্চারণ করতে পারবে না ‘হেভেন’। শব্দগুলি ওর জীবনে পুনর্জাত হবে, নতুন অনুষঙ্গে, পুনর্বিচারের পর।

অর্থাৎ ছেলেটা ‘বড় হয়ে’ যাবে। এই বড় হওয়া বড়ই আশ্চর্য শব্দ। শুনেছিলুম বড় হলে সবই সহজ হয়ে যায়। বুদ্ধিশুদ্ধি খোলে। চিন্তাভাবনা দানা বাঁধে, বোধ বিশ্বাস পরিচ্ছন্ন হয়। অন্যকে উপদেশ দেবার অধিকার জন্মায়। বয়স যতই বেড়েছে, অধীর হয়ে ভেবেছি এইসব অমৃতফল এবার বুঝি হাতে আসবে।

কিন্তু ‘বড় হওয়া’ যে এত গোলমেলে শব্দ তা কে জানতো? আমি তো দেখলুম যতই বড় হলুম ততই জানার শিকড় শিথিল হলো, দাঁত পড়ার মতো বিশ্বাসগুলো খসে পড়তে শুরু করলো টুপটাপ। অন্যকে বারণ করবো কি, উপদেশ দেবো কি, নিজেই কি এখন আমি নিশ্চিত করে জানি আর কোন্‌টা ভালো আর কোন্‌টা মন্দ? কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক? কাকে কী বলবার অধিকার কতটুকু আমার আছে, আর কতটা নেই? আগেই বরং বেশি স্পষ্ট ধারণা ছিল—কোনটা সাদা কোনটা কালো, কে দায়ী, কে দায়হীন, হ্যাঁ-না। ‘বড় হয়ে জ্ঞানগম্যি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, অনিশ্চয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারেই, জানা জিনিস ক্রমশ অজানা হয়ে যাচ্ছে। যতই সুবিচার আর নিরপেক্ষতা নিয়ে ঘামছে মাথাটি, ততই জট পাকিয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধের সূক্ষ্ম তন্তুগুলোতে, গোল বাধছে মাথার মধ্যে। এ-ও হয়, ও-ও হয়। ইয়েস অ্যান্ড নো। বোধ আর সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না, বুদ্ধিকেই দায়িত্ব দিয়ে সরে দাঁড়ায়। বুদ্ধি আবার অতি সাবধানী। হুট্‌ করে কিছু করে না। সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে তাই কেবলই দেরি হতে থাকে। ভুল করবার ভয়ে কাজটাই করা হয়ে ওঠে না। অথচ কথা ছিল উলটোটা হবে, ‘বড় হলে’ ভয়ডর ঘুচে যাবে, ভুল করার সম্ভাবনা মুছে যাবে। কতো শক্তপোক্ত, কতো নিশ্চিন্ত, নির্ভরযোগ্য শব্দ ছিল ‘বড় হওয়া’। এখন তো খুব কাছে দেখতে পাচ্ছি—কী দুর্বল, কী করুশ, কী অনিশ্চিত চেহারা বেচারীর। কিছুই সহজ নয়, কিছুই সহজ নেই আর!

যদিও নিজেই বদলে যায়, বদলাতে বদলাতেও শব্দই আমাদের ইতিহাস-বিলগ্ন করে রাখে। বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না জীবন থেকে, সত্য থেকে। যতই বন্যা আসুক, সর্বস্ব যাক, ছিন্ন হয় না শব্দের অমূর্ত বাঁধন।

হলে কি হবে, কয়েকটা শব্দ, ধূপছায়া রং, কয়েকটা বিশেষ শব্দ চিরদিনই জ্বালিয়ে যায়। আধো-জানা, আধো অজানার আলো-আঁধারি ডোরাকাটা ঝিরি-ঝুরু জংলা ছায়ার মধ্যে গা মিলিয়ে কেবলই তারা পালিয়ে বেড়ায়, ধরা দেয় না, নাগালে আসে না।—হঠাৎ হঠাৎ এক-একবার মনে হয় এই তো, ধরে ফেলেছি—মুঠো খুলে আবার দেখি, কই, নেই তো? তেমনি মধুকরী জাদুকরী বেশ কয়েকটি শব্দ থেকেই গেছে জীবনে—মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁওয়া যাবে—অথচ হাতটা বাড়িয়ে দিলেই দেখি ফাঁকা ধূ ধূ করছে—ধূসর পর্বতের মতো শব্দটা সরে গেছে দিগন্তে। এমনিই এক চালিয়াৎ জালিয়াৎ শব্দ ‘প্রেম’, এমনিই বুক ফাটানো শব্দ ‘ঈশ্বর’, এমনিই অধরা-বিধুর বোরখাপরা শব্দ ‘মৃত্যু’—যার শুধু চোখদুটিই চেনা যায়। আর ‘বয়স’? সেও এক পিছল শব্দ—অত শত করেও যাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আরো একটা পিছল শব্দ আছে যে যাই-যাই করেও যায় না, বুকের মধ্যে মাটি কামড়ে পড়েই থাকে, নেপথ্যে, জলের তলায় যেমন পা কামড়ে ধরে থাকে অদৃশ্য কুমীরে—আমৃত্যু…সেই শব্দের নাম, ‘যৌবন’।

আমরা সব সময়ে খুঁজতে চেষ্টা করি একটা কোনো শব্দের লাঠি, একটা কোনো খুঁটি, নোঙর ফেলার মতো একটা কোনো শব্দকে চেপে ধরতে চাই। ছোটবেলায় যা ছিল ‘বড় হওয়া’, বড় হলে সেটা কী? বুকের ভেতরে যতদূর যায় হাত বাড়িয়ে খুঁজতে চেষ্টা করি, যদি পাই কোনো একটা মূল শব্দ, প্রাণভোমরার কৌটোর মতো নিবিড় নিটোল অদ্বিতীয় কোনো শব্দ, যার বিহনে এই ফুলন্ত টকটকে শিমুলগাছ সাজানো, এই সাগরদ্বীপের প্রবাসী বাতাস-দেওয়া, মেঘরঙা সন্দেবেলা নিয়ে চৈত্র মাসটাই মিথ্যে হয়ে যাবে, হিমালয় আর হাওয়াইদ্বীপ, দানিয়ুব আর কিউবা নিয়ে বিশ্বভুবন শূন্য হয়ে যাবে, যার বিহনে বাতাস নাস্তি, দিবস নিরালোক—আমার জীবনে কী সেই মূল শব্দ, সেই Keyword বলবামাত্র কেউই কি আর চট্ করে খুঁজে পাবো? অথচ প্রত্যেকেরই এমন দিন ছিলো যখন শব্দটা ভাবতেই হতো না। জীবনব্যাপিয়া ভুবন ভাপিয়া নিৰ্ণিমেষ জেগে থাকতো সেই মূল শব্দ, প্রত্যেকে জানতুম, কেন বাঁচি। কে কোন্ খুঁটিতে নৌকো বেঁধেছি। আজকের কুড়ি বছর বয়েস কি আর উত্তরটা তেমনি করে জানে? আমরা যেমন করে জানতুম? আজকের কুড়ি বছর শৈবালদলের মতো ভাসে, কি শিলার মতো ডোবে। সময়ের স্বকীয় চরিত্রেই। আমাদের বাবা-মায়েরা তো এখনও জানেন ঠিক কোন্খানে তাঁদের নোঙর। দিশা হারিয়ে ফেলেছি আমরাই।

নিজের ভিতরে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ স্পষ্ট বুঝতে পারি শিবরাম চক্রবর্তী শেষ জীবনে কেন তিনটি শব্দ নিয়ে অমন খেলা করেছিলেন। ঈশ্বর। পৃথিবী। ভালোবাসা।

জীবনের এক-এক সময়ে এই তিন শব্দের এক-একটির কাছে আমরা বল ভরসা খুঁজি। তিনটি শব্দই পৃথিবীর সমান গুরুভার। সত্যিই তো, এই শব্দময়, শব্দসর্বস্ব জীবনে যা আমাকে ধরে রাখে, যা আমাকে গেঁথে রেখে দেয়—কী সেই মূল শব্দ?—না, বয়েস এসে বাগড়া দিল না, জ্ঞানগম্যি, বুদ্ধিযুক্তি এসে দাঁড়ালো না পথ জুড়ে। কুড়ি বছর বয়েসের সেই বোধ অবিকল উঠে এসে উত্তর দিয়ে দেয়। কিন্তু সেই উচ্চারণ বাজুক শুধু নিজেরই কানে কানে, গুণ গুণ করে যেন দ্বিতীয় কানটি শুনতে না পায়, তাতেও নষ্ট হয়ে যাবে ওর জাদু : বোধ বলে : ‘তোমার জীবনের শেষতম শব্দটি হোক—ভালোবাসা !’ ও, ভালোবাসার কাছে যাবে? বেশ তো, নিজের বুকের মধ্যে যাও। যাও তৃণগুল্মের কাছে। নদী বৃক্ষের কাছে। গৃহপালিত প্রাণীটির শান্ত চোখের কাছে যাও। এরা বলবে না, ‘ভালোবাসি’ ; বলবে না, ‘আমি তোমার’। কিন্তু ভালোবাসা পেলে, শুধু তোমারই নিজস্ব হয়ে যাবে। তুমি না ছাড়লে এরা তোমাকে ছেড়ে যাবে না। ঈশ্বর যেমন। তেমনিই পৃথিবী। তুমি চাইলেই আছে। যত কাছে চাও, তত কাছে।

‘আর মানুষ’?

ও শব্দটাকে জড়িয়ে না বরং।

‘ভালোবাসা’ বড় ওজনদার শব্দ, বড় বেশি ভার তার। ‘ঈশ্বর’ কি ‘পৃথিবী’র কাছে ওকে জমা রাখো, দেখো, ঠিক থাকবে। কিন্তু মানুষ? ‘মানুষ’ শব্দ যে বড় ভঙ্গুর। বড় হালকা পলকা, মধুমাধবী শব্দ, শৌখীন, যেন শোলার ফুল, বড় লঘু-মায়াবী, যেন ময়ূরপাখার মুকুট, অমন গুরুভার শব্দের ভর সইতে পারবে কেন?

আসন্ন চৈত্র-সন্ধ্যার নোনা বাতাস আমার চুলে-গালে হাত বুলিয়ে শব্দবিহীন, নিঃশব্দ প্রগল্ভতায় বলে যায়, “পারবে, পারবে, দ্যাখোই না।”

সাহিত্য সংখ্যা, ‘দেশ’ ১৩৯১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *