আমার কোনও তাড়া নেই

আমার কোনও তাড়া নেই

মাননীয় সম্পাদক মশায়ের ‘দাবি অতি সামান্য।’ কী সেই দাবি? “আপনার নিজের মখে নিজের কথা।” কী কথা? এই—‘জীবন’, ‘কর্মক্ষেত্র’, ‘দুঃখসখ’, ‘সাফল্য-ব্যর্থতা’ এই সব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খেলাচ্ছলে ১২০০-১৫০০ শব্দের পুঁটুলি বেঁধে ফেলা। চিঠি যখন সাগরপারে এসে পৌঁছল তখন দিন শেষ। এখন শুরু করেছি তেরাত্তির জেগে ব্রতধারণের পালা। মনস্তাত্ত্বিক চেম্বারে যাইনি কখনও, কিন্তু শুনেছি নরম কোচে আরাম করে শুইয়ে ফেলে তীব্র আত্ম-অম্বেষণের কাজটি চালানো হয়। আর সম্পাদকমশাই খপ করে সামনে একটা বড় সাইজের আয়না ধরে দিয়েছেন। পিছনে আরেকটা। আয়নার মধ্যে আয়না, তার মধ্যে আয়না, তার মধ্যে আয়না। আমার চোখ সামনে। আমার চোখ দূরে।

মা। মা কিছু দেখতে পাচ্ছ কি? আমার সামনে তুমি রয়েছ, আমাকে কেমন দেখছ? একমাত্র তোমারই গভীর গভীরতর আগ্রহ আমার কুশল শুনতে। একমাত্র তোমারই আছে অসীম সময় আর সমস্ত আকুতি, আমার বিষয়ে। আমার সামনে তুমি রয়েছ, যেমন তুমি রয়েছ আমার দশদিক ঘিরে, প্রাণবায়ু হয়ে। সেই রক্তাক্ত নাড়ির দৈর্ঘ্য এখন অন্তহীন, মা। যতদূর চোখ যায়, নাড়ির পাক, লাল রক্ত। আমরা তো মেয়ে, আমাদের ভাগ্যিস নীলরক্ত হয় না। শুধু চটচটে গরম, টুকটুকে লাল রক্ত। যা ডেলা পাকিয়ে যায়, আর সেই ডেলা থেকে আমরা তৈরি করি আর একটা মানুষ। আমার দুটো ছোট মেয়ে বড় হতে হতে এখন পূর্ণ যুবতী, কিন্তু তোমার মেয়েটাকে তুমি বাড়তে দাওনি, অশেষ কৈশোরে বন্দি করে রেখে দিয়েছ। এই হয়েছে আমার মরণ। জিয়নকাঠিটি ছিল তোমার হাতে। এইবার আমাকেই আমার মা হতে হবে।

আমি কেমন আছি। এই দ্যাখো মা, আমি একটা নামহীন দ্বীপে দাঁড়িয়ে নোনা বাতাসে আমার খোলাচুল উড়ছে। চারিদিক থেকে ঘিরে ধরছে বালির ঢেউ, অনেক অনেক দূরে নীলকালো সমুদ্রের সংকেত, ওইখানে আমাদের যেতে হবে। ঝাঁ ঝাঁ করছে মাথার ওপরে ইস্পাতের আকাশ, মধ্য দিনের রোদ ঠিকরে পড়ছে সাদা বালিতে, সিসের মতো ভারী আর গরম পায়ের তলার সেই বালি, পা আমার চলবে তো? ওই দূরে না-দেখা সমুদ্রের গুরু-গুরুতে, নীলকালো রেখায় পালতোলা রাজহংসী নৌকোটি নিয়ে তুমি রয়েছ পদ্ম ফুলে বসে, তোমার হাতে কলম। আমাকে কেমন দেখছ মা? মন্দ না থাকার নামই কি ভাল থাকা? চির-কৈশোরের অভিশাপ আমার ওপরে, কেবল চুলই পাকে, বুদ্ধি পাকে না। গোলকধাঁধা পথ হাতড়ে হাতড়ে সন্ধে থেকে সকাল, সকাল থেকে সন্ধে। যারা গুলি-সুতো মুঠোয় নিয়ে জন্মেছে তারা কী সুন্দর পথ চিনতে পারে। তুমি আমাকে কেবল আলপনাই দিতে শেখালে, হিসেব কষতে শেখালে না মা। সেই জিয়নকাঠির মন্তরটা আমার কানে কানে বলে দাও, এই তো তোমার সমুদ্রের শাঁখটা আমি আমার কানে চেপে ধরেছি।

সফলতা, ব্যর্থতা। ‘কর্মক্ষেত্র’ এই কথাটা বড় বেশি ওজনদার। কতগুলো সহজ প্রশ্নে ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারি। যেমন: তোমার নাম কী?—নবনীতা। তোমার ঠিকানা কী? ‘ভালো-বাসা’ বাড়ি। তুমি কী করো?—কী জানি? সে কি? যে গান করে, সে গাইয়ে। ব্যবসা করে, ব্যবসায়ী। সংসার করলে, গিন্নি। কাপড় কাচলে ধোপা। তুমি কী করো? তুমি কে? তোমার কর্মক্ষেত্রটা কী?

আমি কি পুরুষ মানুষ যে একটা চারচৌকা ‘কর্মক্ষেত্র’ দিয়েই আমাকে মেপে ফেলতে পারবে? আমি কি একটা? আমি মাস্টার, আমি ড্রাইভার, আমি কবি, আমি ধোপা, আমি রাঁধুনি, আমি ভাবুনি, আমি মেয়ে, আমি মা, আমি গিন্নি, আমার পায়ের তলায় সর্ষে। এতগুলো যার ‘কর্মক্ষেত্র’ সে কখনও ফল ফলাবার আশা মনে রাখতে পারে? মুকুল ঝরানোর মজাটা যে আমিও চিনে ফেলেছি। যে-কাজের অর্থ নেই সেটাই ব্যর্থ তো? আমি যে-কাজই করি না কেন, তার প্রত্যেকটাই অর্থপূর্ণ, খুব জরুরি। সে ঝিনুক কুড়োনোই হোক, আর লাফ দিয়ে গাছের পাতা ছোঁবার চেষ্টা করাই হোক। পণ্ডিতে বলবে মুখ্যুমি, কেজো লোকে বলবে অকাজ, তুমি বলবে পাগলামি, কিন্তু আমি বলব জরুরি। প্রত্যেকটাই অপরিহার্য। সব কিছুরই সময় আছে, সময়কালে তার অর্থও আছে। বিচ্ছেদ হয়েছে বলে কি মিলন ব্যর্থ? মাথুরও সত্য, বৃন্দাবনও অব্যর্থ।

আরগো জাহাজ। বদলায় না কোন জিনিস? পাথরে তৈরি অনড় হিমালয়, বাষ্পে তৈরি আকাশ দুই-ই তো নিত্যি বদলাচ্ছে। মরুভূমির কোন বালুকণাটি একবারও মরীচিকা হয়ে কেঁপে ওঠেনি? আমাদের অস্তিত্বই সেই গ্রিক জাহাজ যার প্রতিটি খুঁটিনাটি অংশ বদল হতে হতে একদিন সে একেবারে নতুন জাহাজ হয়ে গিয়েছিল, এক ছিল তার গঠন আর নামটা। দশ বছরের মেয়ে, বিশ বছরের তরুণী, পঞ্চাশ বছরের নারী। প্রত্যেকেই অন্য লোক কিন্তু মানুষটি অভিন্ন। শুধু নামেই নয়, রক্তের কোষের মধ্যে ডি.এন.এর অন্দরে যে গভীর গভীরতর পরিচয়টি খেলা করছে, সেই হল আসল টিপছাপ। সে পাঁচেও যা, পঞ্চাশেও তাই। এই তো মজা, একদিকে এত বদল, অন্যদিকে যেমন কে সেই। আমরা সবাই আছি, অথচ পাপ্পা? সুবীর? সুপ্রিয়দা? বলে ডাকলে কোনও সাড়া পাই না। জাহাজের ওই অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি কখন নিঃশব্দে পালটে গেছে। অথচ গোটা জাহাজ দিব্যি ভেসে চলেছে। এই ভেসে চলার কাহিনীটা লিখে রাখাই আমার আসল কাজ। আমি কী করি? এক অত্যাশ্চর্য জাহাজের গল্প লিখি। পলে পলে যার বদল হচ্ছে। আর চিরটা কালই এক থাকছে। যতই টুকরো হোক, যেটা গোটা থাকবেই; তাতে না আছে সফলতার প্রশ্ন, না ব্যর্থতার?

সময়, সময়। মহা ফ্যাসাদে ফেলেছেন সম্পাদক মশাই, এক ধাক্কায় নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ভাবনা মানেই যাতনা। চারি ধারের মানুষ, প্রিয়জনেরা সংসারে, না ভবিষ্যতে। অনেকখানি বর্তমান বিছিয়ে নিয়ে আমি তার শীতল মেঝেয় আঁচল পেতে শুয়ে আছি। যতদূর চোখ যায়। সামনেই হোক আর পিছনেই হোক আমার কাছে সবটাই বর্তমান। চোখের পাতা বন্ধ করলেই আমার দু’ চোখ ভরে যা এসে দাঁড়াচ্ছে, তা বর্তমান ছাড়া কী? তা হলে অতীত কাকে বলে? চোখ বুজলে আমি যাকে আর দেখতে পাই না, তার নাম অতীত। স্বপ্ন আর স্মৃতির সুতোয় বোনা এক অখণ্ড বর্তমানে আমার বাস। তাতে আলো অন্ধকারের ঢেউ খেলে।

এই সেদিনও আমরা ক’জনে মিলে পরস্পর কোমর জড়িয়ে ধরে মস্ত এক মালার মতো গোল, অচ্ছেদ্য, বাঁশির সুরে সুরে পা ফেলে, তালে তাল মিলিয়ে কী সুন্দর নাচছিলুম। হঠাৎ দেখি দাঁড়িয়ে পড়েছি মুখোমুখি, প্রত্যেকে একলা, প্রত্যেকের হাতে তীরধনুক। হাতে তীরধনুক মাদলে উঠছে যুদ্ধের বোল।

যতদিন স্বপ্ন দেখা, ততদিনই বাঁশি বাজে। ততকাল নাচের ছন্দে মালা হয়ে বাঁচা। অসাবধানে থাকলেই মধ্যবয়স এসে টুকরো করে ফেলে স্বপ্ন, হাতে ধরিয়ে দেয় তীরধনুক। তখন শুরু হয় লক্ষ্যভেদ, লক্ষ্যবেধ। আর তখন থেকেই বর্তমান কুঁকড়ে, গুটিয়ে ছোট হয়ে আসে, ভবিষ্যৎ দুর্ভাবনার চেহারা ধরে, আর জীবনের দখল চলে যেতে থাকে অতীতের হাতে। মালা ছিন্ন হয়।

সময় জ্ঞানাঞ্জনশলাকা তুমি ছাড়া আর কার হাতে আছে? তীব্র স্পর্শে চোখ ফোটানোর কায়দা তুমি ছাড়া আর জানে কে? ঠোঁটের কোণে, চোখের টানে তুমি ভয়ানক সত্যদর্শন করাও। তোমার সঙ্গে এই যে আমার অন্তহীন, মুক্তিহীন মুখোমুখি, এ কি প্রণয়ে, না দ্বৈরথে?

‘জলকে নেমেছি।’

: তোমার প্রাণ ভোমরাটি কোথায়?

: কেন? প্রাণ যেখানে। ভালোবাসায়।

: খালি ভালোবাসা আর ভালোবাসা। বলি বয়েস কত হল?

: কত হবে? পঁয়তিরিশ।

: আর তোমার মেয়ে দুটির?

: ওই দশ পাঁচ বছরের এদিক ওদিক।

: কী সুন্দর অংক। ‘বনং ব্রজেৎ’টা ভূলতে চাও?

‘ব্ৰনং ব্রজেৎ’-এর সঙ্গে আমার কী? পঞ্চাশ কি আমাকে পাকড়াতে পারবে কোনও দিন? পঞ্চাশ বছর ধরে তো এটাই শিখলুম যে পঞ্চাশ আমার পেরোবে না। আমার বাবারও পেরোয়নি। আমারও পেরোবে না। আমাদের গুষ্টিতে কারুর কোনওদিন পঞ্চাশ পেরোয় না। বুঝেছ? এ হল পাঁচ মাতালের বংশ।

: তোমার বাবা তো মদ ছুঁতেন না? তিনি তো তিরাশি বছর বয়সে—

: আরে আরে? তিরাশির সঙ্গে পঞ্চাশ পেরুনোর কী যোগ? কী যোগ আছে মদের সঙ্গে মাতালের? ওই যে মাতাল হাওয়া বইছে, সে কি মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে? আমরা হচ্ছি সেই জাতের মাতাল। বাবাকে মনে করে দ্যাখো? বাবার ছিল তিরাশিতেও হাজার মাইল বর্তমান জুড়ে বসবাস। ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্বপ্ন, ঝলকে ঝলকে স্মৃতি, বনে কেন হবে, বালাই ষাট, তাঁর বিহার ছিল জীবনের পল্লবিত কুঞ্জবনে। সত্যি সত্যি পঞ্চাশ যেদিন পেরোব, সেদিন দেখবে, অতীত স্মৃতির একমণ ওজনের বস্তা এক কাঁধে, অন্য কাঁধে ভবিষ্যতের একমণ দুর্ভাবনার পোঁটলা নিয়ে, কুঁজো হয়ে, বর্তমানের একালে বাঁশের সাঁকোটা কোনও রকমে পার হচ্ছি পা টিপে পা টিপে। সেই যাত্রা বনের দিকে যাওয়া। এখন কী? আমার দিকে ভাল করে চেয়েও দ্যাখোনি বুঝি কোনও দিন? সত্যি আর মিথ্যের ঝিলিমিলি কাটা আলো-আঁধারি দালানে গড়িয়ে পড়েছে পঞ্চাশ বছরের পূর্ণচন্দ্রের বিভা। ছায়াময়, মায়ামগ্ন, ব্যাপ্ত বর্তমানে, একটু একটু মাতাল, আমি শুয়ে আছি। হঠাৎ সম্পাদকমশাই তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এসো, তবে খেলা করি।

: খেলা করবে? বলি বয়েস কত হল?

: ওই তো বললুম! আবার বলব? বেশ, বয়েস হল রামধনুর সমান। বিদ্যুতের সমান। বয়েস? বৃষ্টির ফোঁটার সমান।

: তবে তো বড় মুশকিল তোমার? বৃষ্টির ফোঁটাটি বড় একা একা দীর্ঘপথ ভ্রমণ করে মাটিতে এসে পৌঁছোয়। বিদ্যুৎলতা খুব একলা চমকায়। রামধনুর কোনও সঙ্গী নেই। একা কোথায়? অত বড় আকাশটাকেই ভুলে গেলে? চিরকেলে আদুরে মেয়ে আমি। দর্পহারী কোলে বসে আছি। দৃষ্টি যতদিন, শ্রুতি যতদিন, ওই ‘একা’র সাধ্যি কী আমাকে ধরতে পারে? আমার মা-কে দেখেছি না? আর, আমি তো খেলুড়ে। আমি এই পাথর থেকে ওই পাথরে এ-ডাঙা থেকে সেই ডাঙায় লাফ দিতে দিতে সব কামট্ভরা খাঁড়ি ঠিক পার হয়ে যাব—বয়েস আমাকে কী ভয় দেখাবে? এই কুমির! তোর জলকে নেমে—ছি!

ব্যক্তিগত। বেশ তো কুমির-কুমির খেলা হচ্ছে, বলি তোমার সমাজচিন্তা-টিন্তা গেল কোথায়? নারীবাদ, মৌলবাদ, সাম্যবাদ, শিল্পবাদ—কিছু না হোক অনুবাদ কোনও বিষয়েই তো কিছু বললে না।

: তুমি তো জ্বালালে বাপু? মানুষকে একটু একা থাকতে দেবে না? যত ভাবনাচিন্তা সবই কি সব সময়ে চেঁচিয়ে বলতে হবে? সামজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্যও এই সবই তো আমাদের আলো মাটি বাতাস, এ বাদ দিয়ে কিছু লেখা হয়? যদি বল “কই, নবনীতা, তোমার শরীরে তো পঞ্চভূত কোন্টা কোথায় কিছু দেখতে পাচ্ছি না—” সে-বলা যেমন হবে, এ-বলাও তেমনি। মানুষের কলমে বেরোবে তা, হয় সংঘাতের নয়, সংযোগের সংকেত। ভাষা তো সমাজেরই কলকাঠি। বিয়োগ অত সহজ নাকি? তার জন্যে সন্ন্যাস নিতে হয়। এই যে তুমিই তো সমাজ। তোমার সঙ্গেই কতো কথা কইছি। আজকের ভাবনা কেবল একজনকে নিয়ে। সেই এক ব্যক্তির অন্তর্গত রক্তের ভিতরে যে দুর্ভিক্ষ, যে দারিদ্র্যরেখা, যে মন্দির মসজিদ, যে বধূহত্যা সেই সব নিয়ে কথা। কেন, তোমার বুঝি পছন্দ হচ্ছে না? “ব্যক্তিগত” ছাপমারা চিঠি, পড়া হয়ে গেলেই ছিঁড়ে ফেলা নিয়ম।

ছায়ামানুষ। এই যে শুয়ে আছি, এই শয্যা ঘরে পেতেছি, না বাইরে? নদী পাহাড় রোদ বৃষ্টি ছাড়াও, ছুটন্ত গাড়ির আলোর তীর, ভাসন্ত নৌকোর দাঁড়ের টান, সবই তো ঢুকে আসছে আমার ঘরের মধ্যে। আমি শুয়ে আছি—একটা নরম গদির বিছানা, নাকি নরম ঘাসের গালচেয়? আমি কি নদীর পাড়ে, তারার আলোয়, নাকি ঘরেই জ্বেলেছি নীল ঘুমের বাতি? জীবনভোর হেঁয়ালির মধ্যে বয়ে গেলুম—ঘরে আছি? না বাইরে? আমি তোমাদের ঘরের লোক? না বাইরের লোক? আমি তোমার ঘুমে, না জাগরণে? তোমাদের প্রণয়ে আমি, না প্রতারণায়?

মাঝে মাঝেই যখন আকাশ দিয়ে উড়ে যাই, কখনও পশ্চিমের অনাত্মীয় শূন্যে ভাসি, কখনও ভারতবর্ষের চেনা মেঘ ছুঁই, আমার মনে হয়, এই বেশ। আকাশটাই আমার প্রকৃত ঠাঁই। এই যে বাঁধনবিহীন আকাশী বাতাস, এটাই আমি।

প্রায়ই আমার নিজেকে ছায়ামানুষ বলে মনে হয়। বাস্তব আর অবাস্তবে প্রভেদ থাকে না, চেনা টাকাপয়সাগুলো যেন খোলামকুচি হয়ে যায়। ছায়ামানুষের আবার কাজ অকাজ কী? সফল বিফল কী? ছায়ামানুষ তো কেবল পিছলে বেড়াবে, মাটিতে তার পায়ের ছাপটুকুও পড়বে না। সুখ যারে কয় সকলজনে—ছায়ামানুষ তার ছায়াটিকে ঠিক ছুঁতে পারে।

অধরা মাধুরী। কেউ মোদো মাতাল। কেউ ধমর্মাতাল। কেউ কেজো মাতাল। আমি কুঁড়ে মাতাল। আলস্যের নেশায় আমি বুঁদ হয়ে আছি। বারান্দা থেকে দেখতে পাই নৌকোর পরে নৌকো ভেসে যাচ্ছে নদীর জলে জাপানি পাখার আলপনা কেটে, চলে যেতে যেতে মাকড়সার মতো সূক্ষ্ম জাল বুনে পিছন থেকে নদীটাকে জড়িয়ে ধরছে বুকে, অঙ্গাবিহীন আলিঙ্গনের অছিলায়।

অমন করে তোত জড়াতে জড়াতে শিখিনি আজও আমার হাত বাড়াতে ইচ্ছে করে না। চোখে যতটুকু ধরে সেই আমার ঢের। আমার কোনও তাড়াও নেই। খুড়োর কলের মতো কোনও রসালো গোল্লা আমি ঝুলিয়ে রাখিনি আমার নাকের ডগায়।

রুথের দিদিমা ছিয়ানব্বই পার হয়েছেন সম্প্রতি। তিনমাস আগে একটি ছানি কাটিয়েছেন। ডাক্তারের নোটিস এসেছে, দু’নম্বরের ছানিটা আর তিনমাস পরে কাটাতে হবে। দিদিমা অবাক হয়ে নাকের ডগায় চশমা নাচিয়ে বললেন—“আরে? এই তো সেদিনই একটা কাটলে। এত তাড়া কীসের? আমার তো হাতে যথেষ্ট সময়।”

সত্যিই তো, তাড়াটা কীসের? সময় যথেষ্ট। সেই যে একটা নিরবধিকালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না আমাদের, বিপুলা পৃথ্বীর সঙ্গে? ভুলিনি আমি। সেম টাইম, সেম প্লাস।

জিয়নকাঠি। কাজের মধ্যে শাঁখ ধরে আছি। সমুদ্রের শাঁখ আমাকে বললে: যতদিন মগজের মধুতে হৃৎকমলটি ভরে থাকবে, ততদিনই ভালবাসার গুনগুন্। যতদিন তোমার হাতে কলম, ততদিনই তুমি নবনীতা। ওই যে, জিয়নকাঠি তোমার হাতেই রয়েছে।

এখন থেকে তুমিই তোমার মা।

আনন্দবাজার, মহাসপ্তমী ১৯৯৪

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *