বুঝি কালান্তরে যাবে?

বুঝি কালান্তরে যাবে?

জগতে আনন্দযজ্ঞে কি সবারই নিমন্ত্রণ থাকে? মহাকবি মহত্ত্ব করে যাই বলুন, থাকে না।

আনন্দযজ্ঞে চিরন্তন গেস্ট কনট্রোল। শর্ট লিস্টেড হতে হয়। আর যজ্ঞ মানেই আগুন আর আহুতি। হবি চাই। আনন্দযজ্ঞ তো সোজা ব্যাপার নয়। সর্বস্বমেধের ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে, আঁটি গাঁঠ ছিঁড়ে। জীবনই যদি কখনও দয়া করে আঁটো গাঁঠগুলো খুলে দেয় তবেই না বেরিয়ে পড়া সম্ভব। আর সেইটেই হল জগতের মহাযজ্ঞে যোগ দেবার আমন্ত্রণ।

তবে হ্যাঁ। জগতের যজ্ঞভূমিতে যার একবার ডাক এসে যায়, সংসার সুখের পঙ্‌ক্তিভোজে তার কিন্তু আর নিমন্ত্রণ থাকে না। সে তখন আলাদা প্রাণী। যদিও গায়ে নেই কোনো লেবেল আঁটা তবুও কেমন করে যেন সবাই বুঝে যায়। ওর জামার নিচে ডানা আছে। ও ভিন্ন প্রাণী।

তুমি নিজে যদি মনে কর তুমি মুক্তপ্রাণী তোমাকে বদ্ধ প্রাণী করতে পারে হেন সাধ্য কারুর নেই। জ্ঞান হয়ে ইস্তক বাড়িতে শুনে আসছি খুকুটা বড় জংলী। বড্ড অসভ্য। কেমন ক্ষ্যাপাটে। এতদিনে টের পেয়েছি জংলী হওয়াটা কিছু অন্যায় নয়। সবাই কি আর সভ্য হতে পারে? সবাই তো আর গৃহপালিত জীব হয় না, কেউ কেউ বন্যপ্রাণী। তাদের বন চাইই। আমি বুনো, তো বুনোই।

তোমার বনটা কোথায়? এই তো বুকের ভেতরে। কিন্তু অভয়ারণ্য। ও যিনি আগলে রাখার তিনি ঠিকই আগলে রাখেন।

ভ্রমণ মানে কি পালানো?

না ভ্রমণ মানে ফিরে আসা?

আমার কাছে ভ্রমণ মানেই ঘরবসত্। শেকড় খোঁজা। ভ্ৰমণ চলে যাওয়া নয়, ফিরে আসা। প্রতিদিন প্রতিদিন এই যে চলে যাওয়া, এই যে হারিয়ে যাওয়া ফুরিয়ে যাওয়া, প্রতিদিনকার এই খরচ হয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে একটু বাঁচানো। জমার ঘরে একটুখানি তোলা। দু’ চামচে আমি।

ভ্রমণ মানে নিজের সঙ্গে দেখা। নিজের হাতটি ধরে নিজের মুখোমুখি বসা।

কি নবনীতা, কেমন আছো? দিন কাটছে কেমন?

সুখেও নয়। দুঃখেও নয়। তবে হ্যাঁ যেমন কথা ছিলো, তেমনটি কাটছে না।

কেমনধারা কথা ছিল?

কি জানি। কে জানে? তবে এমন ধারা নয়। দিন যাচ্ছে। দিন যায়।

বিষাদে?

বিষাদ বড় বিপুল শব্দ। বিষাদ হলেও তো ভালোই ছিলো। তুচ্ছতায়। তুচ্ছতায় দিন কেটে যায়। কী অবহেলায় সূর্য ওঠে। কখন যেন ডুবে যায়।

“নিজেই নিজের কাঁধে হাত রাখি, বলি: চিয়ার আপ! ওল্ড গার্ল! বুঝি কালান্তরে যাবে? ছাড়পত্র চাই?”

অথচ এমন কথা ছিলো না, ছিলো না। নেমন্তন্ন চিঠি তো পেয়েছিলুম।

কিন্তু ভোজ ঠিক জমলো না। ভুল ঠিকানায় পৌঁছেছি কি? ভুল পঙ্‌ক্তিতে বসে পড়েছি কি? নাকি আমিই ভুল মানুষটা?

কি জানি। কে জানে? পায়ে যেন বেড়ি। গলায় যেন ফাঁস। কেবল ইচ্ছে করে বেরিয়ে পড়ি। দৌড়ে চলে যাই। একটু ছুটে বেড়াই। ছোটবেলায় পড়তে পড়তে আমার ইচ্ছে করতো একটু স্কিপিং করে নেবার। বারান্দায় গিয়ে একটু লাফিয়ে আসতুম। কে জানতে এখনও সেই ইচ্ছেটা এমন করে থেকে যাবে বুকের মধ্যে? কে জানতো।

মধ্যদিনের রোদে যে বুকের ভেতরটায় এমনি দারুণ খরা লাগবে, কে জানতো, জ্বলে যাবে মাঠ কে মাঠ! সাধের বীজ ধানও পুড়ে লাল। ভ্রমণ আমার বৃষ্টি।

কিছুদিন না বেরুতে পারলে আমার মনে হয় গাছপাথর হয়ে যাচ্ছি। তুমি জানতেও পারবে না, চলমান জগৎ কখন তোমাকে চিঁড়েচ্যাপ্টা করে রেখে যাবে। তুমি খাচ্ছ দাচ্ছ চাকরি করছ ভাবছ বুঝি দিব্যি বেঁচে আছ। কিন্তু যারা তোমার কাছাকাছি আসবে, তারা মরা মানুষের বাসি গন্ধ পাবে। ঘুরে যে বেড়ায় তার গা থেকে তাজা ঘাসের মত টাটকা জীবনের সুরভি বেরোয়। ভ্রমণ জীবনের লবণ, আর লাবণি।

মানুষ না হয়ে সাপ হলুম না কেন যে? বছর বছর দিব্যি খোলস পালটানো যেত। এ খোলসটা আর যে সহ্য হচ্ছে না! কিন্তু ছাড়ি কেমন করে? প্রতিটি ভ্রমণে একটু করে খোলস ছাড়ার চেষ্টা। একটু মুছে যাওয়া, একটু ফিরে হওয়া। কিছু রিফুকর্ম। একটা নবজন্মের প্রয়াস। এক একটি মৃত্যুর পরিবর্ত।

ভ্রম ধাতুর একটু অর্থ, জরায়ুর মধ্যে নবীন প্রাণের স্পন্দন, জেগে ওঠা। সেই মানেটাই আমার সবচেয়ে যথাযথ মনে হয়। আর ভ্রম ধাতু থেকেই বিভ্ৰম—সেটাও অভ্রান্ত। আমার কাছে ভ্রমণ একটা যৌগ—কিছুটা ভ্রম, বাদবাকিটুকু রমণ। দুইয়ে মিলে আমার ভ্রমণ।

সাধে কি সাহেবদের জন্যে এত মায়া হয়? ওরা তো ভ্রমণ করে না, আহা, করে ট্র্যাভেল। আরে ট্র্যাভেল করে মরবো কেন, হাতের কাছে এমন প্রমণ থাকতে? ট্র্যাভেল আর ট্র্যাভেইল একই শব্দ, উৎপত্তি ত্ৰাভায়ি থেকে—অর্থাৎ পরিশ্রম। ওরা ভ্রমণের মধ্যে দেখেছে খাটাখাটুনি, শ্ৰমণীয় দিকটা, আর আমরা রমণীয় আর ভ্ৰমণীয়টুকু। আরে, আজ না হয় সাহেবরা এত ঘোরাঘুরি শিখেছে, আগে কি তাই ছিল?

গুরুদেব সক্রেটিস বলে যাননি কি, “একটা পাহাড় দেখো, একটি নদী, এক সমুদ্র—সেই যথেষ্ট?” ছি, গুরুদেব, ছিঃ। এটা জ্ঞানীর যোগ্য উপদেশ হোলো?

আর প্লেটোকেও বলিহারি যাই। তিনি বিধান দিয়ে গেছেন চল্লিশের নিচে কাউকে দেশের বাইরে পদার্পণ করতে দেওয়া উচিত নয়। এই সেদিনও অ্যাডাম স্মিথ সাহেব পর্যন্ত বলেছেন, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ভ্রমণ মানুষকে নষ্ট করে ফ্যালে। তাকে বেপরোয়া, অহংকারী, উড়নচণ্ডে আর দায়িত্বহীন করে দেয়। স্বভূমে থাকলে যা ঘটতো না। কথাগুলো অবিশ্যি মিথ্যে নয়। খুব সত্যি। হাড়ে মজ্জায় খাঁটি। আমিই তার জ্যান্ত প্রমাণ। সাধে আর কালাপানি পার হতে বারণ করতেন পণ্ডিতেরা? ভ্রমণে হাত পাগুলো লম্বা হয়ে যায়, বুকের ছাতিটা চওড়া। প্লেটো যে চল্লিশের পরে বেরুতে অনুমতি দিয়েছিলেন, সে কি আর না বুঝে? তখন মানুষ বাড়তির দিকে নয়, কমতির দিকে যায়। তখন মানুষ ছোট ছোট অভ্যেসের দাস। ছোট ছোট লাভ লোকসানের, আরাম-আয়াসের দাস। দাস আর পালাবে কোথায়? যাক না।

কিন্তু চল্লিশের আগেই যার পা লম্বা হয়েছে, সে চল্লিশে পা দেয়ই না—তার পা আর বয়েসের গণ্ডিতে ধরাই দেয় না। যেমন আমার বাবা। আমার বিশ্বাস হয় না। বাবার কোনোদিন চল্লিশ হয়েছিল।

তাহলে কি আমরা পারতুম অমন পরমাশ্চর্য শুভক্ষণে বিলেত রওনা হতে? এ বিষয়ে সম্ভবত আমরা বাঙালির ইতিহাসে ঠাঁই পাবার যোগ্য। বিলেত যাওয়া ঠিক। বম্বেতে জাহাজ ধরব। ট্রেন বুকিং, হোটেল রিজার্ভেশন কমপ্লিট। এমন সময়ে শুভার্থীরা আছড়ে পড়লেন—সর্বনাশ হয়েছে। মঘা, অশ্লেষা, ত্র্যহস্পর্শ যোগ, প্লাস বেস্পতিবারের বারবেলা। এতগুলো একসঙ্গে নিষ্প্রয়োজন, যে কোনো একটাতেই যাত্রা নাস্তি। বাবা থামবেন তাতে? বললেন—“আগে বরং বম্বে মেলটা থামাও। সবাই একসঙ্গে পরের ট্রেনে যাবো।” অতএব লগ্ন দেখেশুনে, মঘা, অশ্লেষা, ত্র্যহস্পর্শ, বারবেলা, যাত্রা নাস্তির শুভমুহূর্তে বাবা সপরিবারে সাতসমুদ্দুর পারে রওনা হলেন। গলায় গোড়ের মালা পরে হাসতে হাসতে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললেন—‘তোমরা বাবু একটু সাবধানে বাড়ি যেও, দিনক্ষণ নাকি সুবিধের নয়।”

আজকাল যারা বিলেতে-আমেরিকায় যায়, তারা শুধু বিলেতেই যায়, সমুদ্রযাত্রা তাদের কপালে জোটে না। সে যেতুম বটে আমরা। যাচ্ছি তো যাচ্ছি, যাচ্ছি তো যাচ্ছিই, পথ আর ফুরোয় না। একুশ দিন একুশ রাত্রি পায়ের তলায় ঢেউয়ের দোলা, হাঁটুর ছন্দই পাল্টে যায় মানুষের, স্থলচর মাথার মধ্যে অন্য এক তরল গতির ধারণা ছলকে উঠতে থাকে। নোনা বাতাসে জীবনের স্বাদ গন্ধ আলাদা হয়ে যায়। আর চারিপাশে ওই নিঃসীম বিস্তার। কি আকাশ, কি সমুদ্র, চরাচরব্যাপ্ত বিশালতা, নীলিম অবকাশ, নিস্তরঙ্গ মধ্য সমুদ্রের শব্দহীন গাম্ভীর্য, বন্দরের জন্যে উতল অপেক্ষা, দূরে অন্য জাহাজ দেখা দেবার রোমাঞ্চ—উড়োজাহাজীদের এসব শোভা জানাই হয় না। আকাশপথে দৃশ্য বলতে কী আছে? ওই পঞ্চভূত। দূর থেকে বিস্ফারিত নয়নে ক্ষিতি-অপ্কে নিরীক্ষণ করা, আর কাছ থেকে নিবিড় নীলিমাকে অর্থাৎ তেজ-মরুৎ-ব্যোমকে দেখা। সেই বা কতক্ষণ? বর্ধমান যাচ্ছি না বিলেত যাচ্ছি বুঝতে পারার আগেই পা মাটিতে ঠেকে যায়।

আমি অনেক সমুদ্রের জল পেরিয়েছি। একবার কুইন এলিজাবেথ টু-তে চড়ে অতলান্তিক পার হয়েছি। প্রথমবার বিলেত যাবার সময় জাহাজে যে সুইমিং পুল ছিল, তাতে স্নানের সময়ে বাবা বলে দিতেন, “এই জলটা কিন্তু আরব সাগরের”—”আজকের জলটা লোহিত সাগরের”—”এটা ভূমধ্যসাগরের জল”—সে যে কী পরম রোমাঞ্চ, আমি বলতে পারব না। আর সেই বেলা এগারোটায় গোলাপী আইসক্রিম? জাহাজে ছোটদের খুব আইসক্রিম খাবার সুখ। জাহাজে সবাই ছুটিতে থাকে। জাহাজের আবহাওয়াতেই আয়েস আর স্বস্তি। এরোপ্লেন মানেই ভীষণ তাড়া। সুখ নেই।

যে লোকটা চাকরি করতে যায় আর যে লোকটা বেড়াতে যায় দুটো কিন্তু এক মানুষ নয়। একজন খাঁচার পাখি, অন্যজন উড়াল জানে। একজন আরেকজনকে হিংসে করে।

—রঞ্জন বলে, বেড়াতে বেরুলেই দিদি অন্য লোক।

—মেয়েরা বলে, কলকাতায় ফিরেও তুমি অমনি থাক না কেন মা?

—মা বলেন, কলকাতা খুকুর সয় না।

—দীপঙ্কর বলে, কলকাতায় দিদির মিনিমাম থাকা উচিত।

—আমি বলি, কলকাতায় তো আমি থাকিই না। কলকাতায় যে থাকে, সে তো অন্য লোক। এই শহরটাও আমার সেই চেনা শহরটা নয়, এই মেয়েটাও আমার চেনা মেয়েটা নয়। এই অজানা শহরে ওই অজানা অদ্ভুত মেয়েটা বাঁচল কি মরল তাতে আমার কি। কী ভয়াবহ ওর জীবন। নিঃসময়, সঙ্গীহীন, সদাব্যস্ত, নিজেকে নিয়ে তিতিবিরক্ত,—ওই মেয়েটা কে? পান থেকে চূণ খসলেই যার সর্বনাশ হয়? দিনরাত রুগ্ন?

কেন যে ওই মেয়েটাকে লোকে আমি বলে ভাবে। আমার তো কোনো বিঘ্নই বিঘ্ন মনে হয় না, কোনো ক্রিয়াই অভ্রান্ত বলে আশা হয় না, সব পাঁচিলই ডিঙোনো যায়, সব ভুলই শুধরানো সম্ভব, কোনো যুদ্ধই যুদ্ধ নয়, খেলা। ট্রেন মিস হল? হল তো হল। নেক্সট ট্রেনে। একটা না একটা গাড়ি একদিন না একদিন আসবেই। তাড়া কিসের?

কিন্তু এটা তো সংসারের সঙ্গে লাগামবাঁধা আমি-টার মনে হয় না। তার সব কিছুরই মরণ-বাঁচন সংগ্রাম। মন্ত্রের সাধন নতুবা শরীর পাতন। শরীর পাতনটাই হয়, মন্ত্র অসাধিত থেকে যায়।

সংসারের দড়িদড়া ছিঁড়ে, কলকাতার আস্তাবল থেকে বেরুতে পারলেই সব সবুজ, সব শান্ত। কেবলই ইচ্ছে করে বেরিয়ে পড়ি, চলে যাই। কিন্তু কোথায়? কখন? ছুটি দেবে কে? ঘর আগলাবে কে? কে? কে? কে?

আজকাল আমার প্রায়ই মধুপুরের কথা মনে হয়। মধুপুরে আমাদের ছোট্টো শাদা বাড়িটার সামনে একটা বিশাল সবুজ মাঠ ছিলো তার এপারে একটা লাল মাটির পথ, আর ওপারে আরো বড় নীল আকাশ। ওই মাঠটাই, আমি জেনে নিয়েছিলুম, আসলে তেপান্তর। উত্তরদিকে কয়েকটা কালোপাথরের মস্ত মস্ত চাঁই এলোপাথাড়ি বসানো, বেঁটে খাটো পাহাড়। একবার চড়তে পারলেই ব্যাস, ফুরিয়ে গেল। না আছে গুহা, না জঙ্গল। মাঠের দক্ষিণে একটা ছোট্ট, রোগা, খুব সুন্দরী, বালিতিরতিরে নদী। নদীর ওপারে ছড়ানো ধানক্ষেত, এপারে কুমোরপাড়া। চাক্‌ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওরা সাজি ভরে ছোটদের রান্নাবাড়ির খেলনাও। সেই কুমোরের চাকে চোখ রেখেই আমার দিনের চাকা ঘুরে যেতো, সন্ধে আর শীত নেমে আসতো রোগা নদীতে খুদে রূপোলি মাছেদের গায়ে রাঙা সোনা গলিয়ে। সোয়েটারের ওপর কোট চড়াতে বাড়ি ছুটতুম। পিছু পিছু ছুটতে লিলি। ইঁদারার ইঁটের গাদার কোণে চারটে কুকুরছানা হয়েছিল। মা-টা কোথায় চলে গেল কে জানে? থেকে গেল কেবল লিলি। ছুটি ফুরোলে আমরা মধুপুর ছেড়ে, লিলিকে ছেড়ে, চলে এলুম ইস্কুলের রাজ্যে, কলকাতায়। সেই ধানক্ষেত আর পাহাড় নিয়ে খোলামাঠটা, ইঁদারা আর গোলাপফুল নিয়ে শাদা বাড়িটা, রূপুলি মাছ আর সোনালি সূর্যাস্ত নিয়ে ঝিরিঝিরি নদীটা পিছনে পড়ে রইলো। কিন্তু পিছনে পড়ে রইল কি? এই তো আজও, এত বছর পরেও বুকের মধ্যে সেই মাঠে স্মৃতির বাতাস শন্শন্? সেই কুমোরবাড়ির চাক ঘুরছে বনবন্? দু’হাতের মধ্যে টকাটক উঠে আসছে নিটোল স্মৃতির ভাণ্ড, লিলি কচি গলায় ভৌ ভৌ করে ছুটে ছুটে আসছে এক্কা গাড়ির পেছু পেছু—যতক্ষণ না মালীর ছেলেটি এসে ওকে কোলে তুলে নিচ্ছে। ঐ ছেলে আমার খেলার সাথী; ওর সঙ্গেই আমি পাহাড়ে উঠি, পেয়ারা গাছে চড়ি। এই তো আমি ইঁদারার পাশে গামছা পরে গুটি গুটি বসে আছি আর ছোট বালতি করে জল তুলে ও আমার মাথায় ঢেলে দিচ্ছে, শীতের ভয়ে আমার যতই কাঁপুনি ওর ততই হাসি—ওর হাতে সব সময় একটা ছপ্‌টি থাকে, তাই দিয়ে পেড়ে দেয় বুনো কুল, উঁচু ডালের পেয়ারা। কিন্তু ওর নাম কী? গলায় মাদুলি বাঁধা, রুক্ষু চুল ঐ ছেলেটার নাম কী? এই ছেলে, তোর নাম কী রে?

রেলগাড়ির ঝাঁকুনিতে, এক্কা গাড়ির ধুলোয় ইস্টিশানের হাঁকডাকে আমার মনের তার বাঁধা। শরীরেরও। ট্রেনের মধ্যে ঘুম ভাঙিয়ে মা ঝাঁকুনি দিচ্ছেন—

—“খুকুরে, ওঠ্ ওঠ্ ঐ দ্যাখ হল্‌দিঘাট দিয়ে যাচ্ছি আমরা—”

—“হলদিঘাট? পানিপথের যুদ্ধ?”

—“হ্যাঁ হ্যাঁ, রাণাপ্রতাপ রে!”

মার সেই উত্তেজনা আমার চেয়ে একটুও কম ছিল না। কিংবা, গুম গুম শব্দে গভীর রাত্রে ট্রেনের মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল, বাবা খুশি হয়ে বললেন, “উঠে পড়িচিস? ঐ দ্যাখ্ কত বড় নদী? গোদাবরী।” সবগুলো নদী দেখিয়েছিলেন বাবা—কৃষ্ণা, কাবেরী, নর্মদা—সেবার অনেক ঘুরেছিলুম দক্ষিণ ভারতে। মহাবলীপুরম্ যা দেখেছিলুম, পরে গিয়ে দেখেছি তার অনেকখানি জলে ডুবে গেছে। কিন্তু রাত দুটোর গোদাবরী ব্রিজ বুকের মধ্যে এখনও প্রতিধ্বনি তুলে চলেছে। মাঝরাতের লণ্ঠনের আলোয় গাছের তলায় হাওয়াই দ্বীপের সুন্দরীদের ঘাসের ঘাঘরা পরে আলোহা নৃত্য দেখে, কিংবা হঠাৎ বাঁক ঘুরেই বরফ-ঘেরা ফুজিয়ামা পাহাড়ের চূড়ো দেখতে পেয়েও সেই আশ্চর্যের তুলনা পাইনি। তবে হ্যাঁ, ছেলেবেলায় নালন্দা দেখে যে উত্তেজনা হয়েছিল, বড় হয়ে ক্রীট দ্বীপে গিয়ে ল্যাবিরিন্‌থ দেখে প্রায় তেমনিই ছেলেমানুষী রোমহর্ষণ হয়েছিল আমার। তবে এও সত্যি; আথেন্স দেখে অতটা উত্তেজিত লাগেনি, ডেলফাইয়ের সূর্যমন্দির দেখে যেমন। অপরূপ গ্রীস! তখন ন’ মাসের শিশু পেটে, ঈজিয়ান সমুদ্রে খুব সাঁতার কেটেছি মনের সুখে, দেড়শ মাইল বাসে পাহাড় ডিঙিয়ে ডেলফাই গেছি, জাহাজে চড়ে গ্রীসের দ্বীপে দ্বীপে ঘুরেছি। পরে ডাক্তার বলেছেন—কী সর্বনাশ! ভগবানই শিশুটাকে বাঁচিয়েছেন! কী কাণ্ড?

বাবা-মার সঙ্গে, সাত আট বছর বয়েসে, সদ্য ‘রাজকাহিনী’ পড়বার পরেই গেছি রাজপুতনা বেড়াতে। অবাক চোখে হাঁ করে গিলেছি মেবারের দৃশ্য, সেই গল্পে পড়া চিতোরগড়, উদয়সিংহের ধাত্রীপান্নার সেই পান্নামহল। রানী পদ্মিনীর জহরব্রতের কুয়োটি দেখে কেঁদে ফেলেছি, মীরাবাঈ আর রানাকুম্ভের বিয়ের সভাঘর দেখে মুগ্ধ হয়েছি, আর চিতোরেশ্বরীর সেই “ম্যায় ভুখা হুঁ” স্বপ্ন দেওয়া মাকালীর মন্দির দেখে সারা গায়ে কাঁটা দিয়েছে। ভাগ্যিস ওই বয়সে দেখেছিলুম? তখন না দেখে, আজ যদি যেতুম ওসব জায়গায়, পেতুম সেই অসীম বিস্ময় আর অগাধ আহ্লাদ? বোধহয় না। নালন্দার ধ্বংসাবশেষ দেখে যেরকম অভিভূত হয়েছিল সেই আট বছরের মেয়েটি, পরে আটত্রিশে বিক্রমশিলার অবশেষ দেখে তার অনুমাত্রও সে ফেরৎ পায়নি। কেন পেলুম না? তিরিশ বছরের পাঁচিল? না সঙ্গীবিভ্রাট? ভ্রমণের পক্ষে সঙ্গটা খুব জরুরি।

হয় একলা বেড়াবো। নইলে সঠিক সঙ্গী চাই। সঙ্গী গড়বড় হয়ে গেলে সবই বৃথা ভ্রমণ। বিভ্রমণ। সঙ্গ এবং সময় দুটোই জরুরি। কার সঙ্গে, এবং কখন।

সেই ছেলেবেলায় নোতরদাম গির্জের ঘন্টাঘর দেখে সেই যে মনে হয়েছিল— “এইখানে কোয়াসিমোদো—সেই হাঞ্চব্যাক ছিল?” পরে হাজারবার নোত্‌রদামে গিয়েছি, তার কথা মনে পড়েনি। লোটাস উইনডোর শিল্প সৌন্দর্য নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি। সেই রোমাঞ্চ আর পাইনি।

তবে বারো বছর বয়েসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চার্চিল আর অ্যাটলিসাহেবকে দেখেছি। ভেবে আজ যতটা তীব্র রোমাঞ্চিত হই, যেদিন দেখি সেদিন তা ঘটেনি। বরং বাবা-মার ওপরে দারুণ রাগ হচ্ছিল, কী দরকার ছিল আমাকে শাড়ি পরিয়ে বড়মেয়ে সাজিয়ে ভিতরে ঢোকানোর? বোরিং যত সভা চলছে রাজনীতির। চুরুট মুখে, মোটা চার্চিলকে (অনেক ছবি দেখেছি) চিনতে পেরেছিলাম সহজেই, ঐ যা এক মিনিটের জয়ের সুখ। অ্যাট্লিকে চিনতে পারিনি, বাবা দেখিয়ে দিলেন। “খিদে পেয়েছে”, “জল খাব”, “বাথরুমে যাব” ইত্যাদি বহুৎ বলে বলে তবেই সেখান থেকে বের করতে পেরেছিলুম বাবা-মাকে।

তেমনিই বিরক্ত লেগেছিল একটা দীর্ঘ শবযাত্রার পেছু পেছু যেতে। গোলডার্স গ্রীন কবরখানায় গিয়ে সেই শবাধারে বাবা-মা আবার মালা দিলেন। যিনি মারা গেলেন পরের সপ্তাহেই বাবার সঙ্গে তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। বুড়োর নাম বার্নার্ড শ’।

ভ্রমণ আমার জীবনে বারে বারে নানাভাবে এসেছে, নানান নবনীতাকে উদ্ঘাটিত করেছে আমার ভিতরে। তবে বাল্যে, কৈশোরে বাবা-মায়ের সঙ্গে সেই যে বেড়িয়েছি, পরে অমর্ত্যর সঙ্গেও প্রচুর ঘুরেছি কিন্তু দুটো আনন্দের জাত আলাদা। অমর্ত্যর সঙ্গে ঘোরার মধ্যে কোথায় যাচ্ছি তার চেয়েও আমরা দুজনে কোথাও যাচ্ছি, এটাই বেশি আনন্দের ছিল। উনি খুব ব্যস্ত মানুষ, সময় করে বেড়াতে বেরুতে পেরেছেন এটাই মস্ত ব্যাপার। বাবা-মাকে তো আলোবাতাসের মত নিঃসপত্ন অধিকারে পেয়েছি, তাঁদের সঙ্গে গেলে দ্রষ্টব্য স্থানটিতেই তাই মনোযোগ পড়েছে বেশি। অমর্ত্যর টুরিস্ট স্বভাব নয়। ফোটো তোলা, ঐতিহাসিক স্থল দেখা—এসব একদম পছন্দ হতো না। ওঁর উদ্দেশ্য রিল্যাকস করা। ছুটি উপভোগ। আমার আবার বাঙালের মত আদেখ্‌লে স্বভাব। গির্জে, মিউজিয়াম, প্যালেস এসবেও লোভ।

বোধহয় ছেলেবেলায় বাবা-মার সঙ্গে অতো ঘুরে বেড়িয়েই এই বেড়ানোর নেশাটা রক্তে ঢুকে গেছে। বাল্যের নিত্য নতুন বিস্ময়ের তুলনা নেই—সেই ইঁদুরছানার আলমারির কোণটি দেখেই—“ওরে বাবা পৃথিবীটা এত বড় নাকি”—বলার মত অবস্থা হত। রাজগীরে জরাসন্ধের পাহাড় দেখে যেমন লেগেছিল। তারপর তো দেখলুম লোহিতসাগরের জল মধ্যসমুদ্রে সত্যিই বেশ লালচে, দেখলুম সুয়েজখালের হাল্কা সবুজ জলের তলা থেকে মিশরীয় ছেলেরা কেমন ডুব দিয়ে পয়সা কুড়োচ্ছে, গঙ্গানদীতে ঝাঁপানো বাঙালি ছেলেদেরই মতন, ভূমধ্যসাগরের নীল জল, চির বিক্ষুব্ধ বে অব বিস্কে, সব পেরিয়ে শেষে যখন টিলবেরি ডকে পৌঁছে টেম্‌সের বুকে এসে থামলুম, তখনও কি বিশ্বাস হতে চায় এটাই বিলেত? কী হতাশই হয়েছিলুম টেমস নদী দেখে। এই? তবে লন্ডন ব্রিজটা মন্দ লাগেনি, তবু ভাল! বিলেতের ছবির মতই দেখতে। সহজে বিশ্বাস কি হতে চায়?

যেমন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ুক্কু মাছকে উড়তে দেখেছি। এখানে জল ছেড়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠছে, একটুক্ষণ বাতাস কেটে, ফের ওখানে ঝাঁপিয়ে জলে পড়ছে। স্বচক্ষে দেখার আগে বইতে যখন পড়েছি উড়ুক্কু মাছের কথা, ঠিক বিশ্বাস করিনি, মাছ আবার ওড়ে! হুঁঃ।

তেমনি বইতে যতই পড়ি না কেন, সত্যি যে চোখে কোনদিন নিশীথরাতের সূর্য দেখতে পাবো, তা কি ভেবেছি? সূর্য ড্যাবড্যাব করে চেয়েই রইলেন, পাটে নামার নামটি নেই। ঘড়িতে সন্ধে পেরিয়ে মাঝরাত্তির হয়ে গেল, সূর্য আর ডোবে না। ঘুমুবো কী করে? রাতই হচ্ছে না তো। শেষে বারোটা নাগাদ একটু সন্ধে সন্ধে মতন। গোধূলির মতন আলো হতেই মা মোটা মোটা পরদা টেনে কম্বল চাপা দিয়ে শুইয়ে দিলেন। শুয়েছি কি শুইনি ঘুমিয়েছি কি ঘুমুইনি বাবা চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন, লেপকম্বল টেনে ফেলে দিচ্ছেন গা থেকে—“আপ! আপ! গেট আপ! পশ্য! পশ্য!” লাফিয়ে উঠে ঘুমঘুম চোখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলুম কশ্যপমুনির বংশধর রাত না পড়তেই দিবা করতে আসছেন। আকাশ জবাফুল হয়ে নমস্কার করছে। বাবা বললেন—“ঘড়িটা দ্যাখ্ খুকু ঘড়িটা দ্যাখ”—ডবলশীটের কাচের পিছনে তখন উচ্ছৃঙ্খল কর্তার ভোররাতে বাড়ি ফেরার মতো অসময়ে টলতে টলতে সূয্যিদেব উদয় হচ্ছেন। কব্জীতে রাত দুটো! যা নয় তাই? রাতবিরেতে এ কী অসৈরণ বল দেখি? টাইগার হিলে যেটা ভোর চারটেয় ঘটে, ইওরোপের উত্তরতম প্রান্তের রেলস্টেশনে এসে, ওসলো থেকে নারভিক, নারভিক থেকে ট্রোমসো উজিয়ে গিয়ে, সেই ঘটনাটি মাত্র ঘণ্টা দুই এগিয়ে নেওয়া। এই বই তো নয়? তার জন্যে এত হা-পিত্যেশ, এমন দৌড়োদৌড়ি—আরে ওই দুটো ঘণ্টাই যে মোক্ষম দু’ ঘণ্টা, যা রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে ফেলেছে!

আর ফিয়োর্ড দিয়ে যেতে যেতে মেরুসমুদ্রে আইসবার্গ দেখা? ওঃ কী সুন্দর। নীলচে-সবজে বরফের বিশাল চাঁই সবুজ জলে ভাসছে, বাবা বললেন—“বিশাল আর দেখছিস কি, বেশির ভাগটাই তো জলের তলায় ডুবে।” জাহাজ একবার একটির সঙ্গে ধাক্কা খেলেই ব্যাস আমরাও টুপটাপ অক্কা পাব।

আর জাহাজও তেমনি, মায়ের লক্ষ্মী ছেলেটি হয়ে হাত ধরে ফুটপাত দিয়ে চলেছে। অর্থাৎ পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে, সাবধানে। পাড় কীরকম? যতদূর দেখা যায় শাদা বরফ ঢাকা জমিতে উঁচু উঁচু ঝাউগাছ। ঝাউগাছই ছিল তো? কি জানি ভূর্জও হতে পারে।

—“আচ্ছা মা, এটাই কি উত্তর মেরু?”

—“ঠিক উত্তর মেরু না হলেও, মেরু-অঞ্চল তো বটে।”

কলকাতার ইস্কুলের মেয়ের পক্ষে হঠাৎ এই আবহাওয়ায় গিয়ে পড়া ঠিক রূপকথার মতো মনে হয়েছিল।

আর যে নরউইজীয় শিশুগুলির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, একটি ভারতীয় ছোট মেয়েকে পেয়ে ওদেরও মনে হচ্ছিল বুঝি রূপকথার গল্পে ঢুকে পড়েছে। মার শাড়ি নিয়ে ওদের কী কৌতূহল! আমাদের গায়ের রং নিয়ে ওদের কী উল্লাস!

শিশুরা তখন ইস্কুলে ইংরিজি পড়ত, গল্প করতে অসুবিধা ছিল না। এখন নিশ্চয় ভারতীয় দেখে দেখে তাদের চোখ ক্লান্ত।

ইউরোপে আমি তিন জীবনে তিনরকমের ভ্রমণ করলুম। অমর্ত্যের সঙ্গে বেড়াতে যেতুম গাড়িতে। কখনো দক্ষিণ ফ্রান্স, রিভিয়েরা, কখনো ইতালী, কখনো জার্মানী, অস্ট্রিয়া। আর বারবার শুধুই প্যারিস। বেশ ক’দিন ধরে কোলোন থেকে মেইনজ পর্যন্ত রাইনভ্যালি দিয়ে ঘুরেছি, রাইন নদীতে দুর্গের পর দুর্গ দেখতে দেখতে নৌকো বিহারও করেছি দীর্ঘ দীর্ঘ, ঘুরেছি রূপসী মোজেস নদীর ভ্যালিতেও। আঙুর ক্ষেতের দ্রাক্ষা রসের রাজ্যে। কখনো সুইজারল্যান্ডের হ্রদে-পর্বতে। আরেকরকম ঘোরা এখন ঘুরি। নিজে নিজে। জরুরি কাজের সুযোগে ফাঁক পেয়ে একটু ঘুরে নেওয়া। বাবা-মার সঙ্গে ঘুরতুম রেলগাড়িতে। স্বামীর সঙ্গে মোটরে। এখন বাধ্য হয়ে উড়োজাহাজে। সময় ক্রমশই সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। আর বদলে গেছে ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর আমার পরিচয়। কুমারীকালে দ্রষ্টব্যস্থলটা প্রধান ছিল, বিবাহিত জীবনে ছিল ছুটিটাই প্রধান, এখন কাজটা প্রধান। বেড়ানোটা উপরি। স্বদেশে অবশ্য বেড়ানোটাই হয় প্রধান, আর কাজটা উপলক্ষ। বিদেশে তা নয়। একলা ঘোরার নেশা আছে। এই আমিটা এখন ভেতরে ভেতরে বড় লক্ষ্মীছাড়া, বড় দিশাহারা। ঘরসংসার আমাকে আর টানে না, সংসারকে বড় কঠিন মনিব বলে মনে হয়। কয়েদখানা। চাবকে চাবকে পাপোষ তৈরি করিয়ে নেয়। সংসার মানেই হাজতবাস। মুক্ত কেবল সাধু সন্ন্যিসিরা। যাদের বাঁধা ঠিকানা নেই। পূর্বস্মৃতি নেই। বহতা নদী, রমতা সাধু।

ভ্রমণ মানে জবাকুসুম সঙ্কাশ সূর্য। চৈতন্যের মধ্যে সূর্যোদয়। ভ্রমণের মধ্য দিয়ে সুতো গুটিয়ে আনি আমি। গোড়ার কাছে ফিরি। অমন ভ্রমণ চট্ করে হয় না। কখনো কখনো ঘটে যায়। যেমন হয়েছিল গতবছর পুজোর সময়ে। হরিদ্বারে। হৃষীকেশে।

অথচ এ বছর? গ্রীষ্মে? বহুত ঘুরেছি। প্রথম আয়ারল্যান্ড ভ্রমণ, প্রচুর অবিশ্বাস্য স্থান এবং মনুষ্য আবিষ্কার (যেমন চিনুয়া আচিবি, হোর্হে লুইস বোরহেস এবং অ্যান্টনি বার্জেসের সঙ্গে আলাপ) এই প্রথমবার রাশিয়া দর্শন, আবার আমেরিকা, আবার ক্যানাডা, আরো মনুষ্য আবিষ্কার (যেমন কার্লোস ফুয়েনতাস), একটানা চৌত্রিশ ঘণ্টা ধরে আকাশে উড়েছি, লম্বা চওড়া ব্যাপার—কিন্তু গতবছর পুজোর ছুটির মতনটি আরমহবে না। আকাশে সেই আলোই দেখা দেবে না আর।

হৃষীকেশ।

আ, হৃষীকেশ। আমার হৃদয়ের মধ্যে স্থিত থাকো।

আ মরি, গঙ্গা! আমার রক্তস্রোতে প্রবাহিত থাকো।

আর হিমালয়। তুমি থাকো আমার বিশ্বাসের গভীরে, অবিচল।

আমার বুকের ভেতরে যে কান আছে সেখানে বাজুক ব্রাহ্মমুহূর্তের সেই অশ্রুতপূর্ব দৈব নৈঃশব্দ্য। সেই প্রস্তুতি।

সাধু নই। কিন্তু সংসারও আমাকে গ্রহণ করেনি। আমার মুক্তি তারায় তারায়। সত্যিসত্যিই ভবঘুরে মেয়ে, যত্র তত্র ভোজনে আমার একটুও অসুবিধে নেই এবং হট্টমন্দিরে শয়নেও না। অথচ উড়নচণ্ডী এদেরই বলে। এবং ত্রিভুবনে উড়নচণ্ডী মেয়েদের কেউ ভালোবাসে না। তাদের নিয়ে কেউ কবিতা লেখে না, তাদের চোখ যে পাখির নীড়ের মতো হয় না, পাখির উড়ন্ত ডানার মতো হয়। সব পথ যেখানে এসে ফুরোয়, সেইখানে অপেক্ষায় থাকার কথা যে নারীর, এ মেয়ে সেই মেয়ে নয়। হাজার বছর ধরে যে পুরুষ পথ হাঁটেন, তিনি তো নারীকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটেন না, নারীরই কাছে এসে থামেন। দু’ দণ্ডের শান্তিজল আছে যার আঁজলায়। শরৎচন্দ্রের তালপাতার পাখা আর গরম লুচিতে, বুদ্ধদেবের আধ ঘন্টা নারীর আলস্যে, ওই একই প্রতীক্ষার বাণী, আতিথ্যের বাণী, “এতদিন কোথায় ছিলেন?” কিন্তু মেয়েদেরও যে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়, মেয়েদেরও যে ক্লান্তি নামে, দু’দণ্ডের শান্তির তেষ্টা পায়—সে কথাটি কেউই খেয়াল করে না। ভ্রমণ আমার একক পথচলার সেই শান্তি। নিজেই নিজের কাছে ভেসে উঠি একটা চরের মতন। যেখানে আশ্রয় নেওয়া যাবে। সত্যি ছুটি কি আমাদের আছে? সে মেলে কেবল সন্ন্যাসে। ঘড়ি-পরা মিটিং-করা সন্ন্যাসে নয়, অন্য এক ঘড়িহীন অনন্ত সময়ের চেতনায়। মঠে মন্দিরে নয়, হয়ত অরণ্যে পর্বতে। আমার তো ভরতমুনির দশা হয়েছে। এই মায়ায় গেরো না খুলতে পারলে মুক্তি নেই। আপাতত এই ভ্রমণই একমাত্র মুক্তি। আমার ভ্রমণের রং গেরুয়া। আমার রক্তের রংও বোধহয় গৈরিক।

কিন্তু বাবা-মায়ের ভ্রমণের স্বাদ গন্ধ ছিল। একদম আলাদা। লাল টুকটুকে। মা বেরুতেন বেড়াতে, সঙ্গে যেত সংসার। গরমের ছুটিতে গেলে রেলের কামরার ভেতরে নেওয়া হত আইসবক্স, তাতে কাঠের গুঁড়োর মধ্যে বরফের চাঁই থাকতো, বরফের ওপরে রাখা থাকতো পাকা আম, লাল লিচু, সাজা পান, মিষ্টিটিষ্টি। লাল ঘাঘরা পরানো জয়পুরী কুঁজোর ভেতরের নলেও বরফ কুচি ভরা থাকতো, জলে লাগতো না বরফ, জল বরফ-ঠাণ্ডা হতো। বরফের চাঁইয়ের ওপর বন্ বন্ করে পাখা ঘুরতো, ঘরময় ফিন্ফিনে বরফ কুচির শীতলতা ছড়িয়ে পড়তো, সেই সঙ্গে পাকা ফলের সুবাস। মা খড়খড়ি নামিয়ে কামরা অন্ধকার করে দিতেন। কু-ঝিক-ঝিক শব্দে আর দোলায়, শীতলতায় আর সুবাসে, আমি ঘুমিয়ে পড়তুম হোলডল খোলা ফর্সা বিছানায়।

তার আগে, অ্যাটেনডেন্টের কামরা থেকে ইকমিককুকার হাতে ঝুলিয়ে হাসিমুখে চলে আসতো শুনিয়াভাই, আমাদের সংসারের প্রাণনিধি, গুণনিধি। সে তার অ্যাটেনডেন্ট কামরায় “ইম্পিরিট লম্পো”তে ইকমিককুকার বসিয়ে বেঁধে ফেলেছে বেআইনি লাঞ্চ। ঘি তেজপাতা দেওয়া আতপচালের ভুরভুরে সুগন্ধী সরু সরু শাদা শাদা ভাত, হালকা মাংসের ঝোল, একটা সবজী। আশ্চর্য কুশলতায় চলতি গাড়িতে গুনিয়াভাই খাবার সাজিয়ে দিতে প্লেটে প্লেটে—কী ভালোই লাগতো সেই খাবার। খেয়ে এত আনন্দ বাড়িতে কখনও পেতুম না। অথচ সেই গুনিয়াভাই তো খাইয়ে দিত বাড়িতেও?

রেলগাড়িতে গুনিয়াভায়ের সঙ্গে থাকতো সেই আশ্চর্য ভাঁড়ার ঘর ট্র্যাংক! তার মধ্যে স্টোভ বঁটি চাকি বেলুন হাঁড়ি কড়া থালা গেলাস চাল ডাল তেল মশলা আলু পেঁয়াজ সব থাকতো। আমি কিছুতেই বুঝতুম না এই একই জিনিসের জন্যে বাড়িতে কেন দু’ দুটো ঘর লাগে, রান্নার, ভাঁড়ারের।

আর ট্রেনে স্নান? মা ছাড়বেন? ওইটুকু বাথরুমেই সাবান মাখিয়ে বালতি মগে জল ঢেলে অথবা সাওয়ারে অকরুণ ভাবে রগড়ে রগড়ে স্নান করিয়ে দিতেন। নইলে ট্রেনের ময়লা কাটবে কেন? এখন বেড়াতে বেরুলে আমি খবর্দার ট্রেনে স্নান না করে তার শোধ তুলে নিই!

জীবন যতই জটিল হচ্ছে, ভ্রমণ ততই সরল হচ্ছে দেশে। হুজুগ পড়েছে দেশ বেড়ানোর। ভ্রমণের সেল’ লেগেছে। দেশসুন্ধু সবাই তোমাকে ডেকে ডেকে বলছে, ওগো, করছ কি, বেড়াতে বেরুলে না এখনও? বেলা যে পড়ে এল? সরকারী ভ্রমণ সংস্থা বলছেন, বেসরকারী ভ্রমণ সংস্থারা বলছেন, উচ্চ, মধ্য, নিম্ন, সব স্তরের জন্য যোগ্য ব্যবস্থা প্রস্তুত। লে লে বাবা ছে আনা দীঘা-বক্রেশ্বর ছে আনা। কোন্‌টা চাও? তুমি কোন পার্টি? স্বাস্থ্যপার্টি, ধর্মপাটি? না শপিং পার্টি? দ্বারকা-তিরুপতি, না হংকং-সিঙ্গাপুর? নাকি কালচার-পার্টি? অজন্তা-ইলোরা-খাজুরাহো? অথবা রোম-প্যারিস-লন্ডন? রূইন্স দ্যাখো, মুজিয়ম দ্যাখো, থিয়েটার দ্যাখো। যাতায়াত জলের মতন। অর্থানুকূল্য থাকলে সব ঘরে মোর ঘর আছে। কিন্তু দর্শনে আজ আর সে রোমাঞ্চ নেই, সে বিস্ময় নেই, যা ছিল পঁচিশ বছর আগেও। এখনকার যুগে সবাই সবজান্তা, সবাই রামগরুড়। ইনফরমেশন এক্সপ্লোশনের যুগে বিস্ময়ের এক্সপ্লোশনটা কমে যাবেই। সবাই যে সহজলভ্য—কেদারবদ্রী অমরনাথও আর দুর্লভ নন। কষ্ট না করেই যা মেলে, তাকে কেষ্ট বলে মানা শক্ত।

তখন হুড্রু দেখেই যত রোমাঞ্চ হত, এখন নায়াগ্রা দেখলেও মানুষের তত আহ্লাদ হয় না, আহ্লাদের ক্ষমতা কমে গেছে সবারই। তবে হ্যাঁ। আশ্চর্য হবার ক্ষমতা ঈশ্বর এখনো সবটা কেড়ে নেননি। কী উত্তেজনা হয়েছিল ক’ মাস আগে, লেক আইল অফ ইনিশ ফ্রি দেখে! ইয়েটসের দেশ ঘুরে বেড়াতে গিয়ে দেখি সেই বিগবুলবেন, গ্লেন কার ঝরনা। ইয়েটসের কবিতায় পড়া জীবন্ত জায়গাগুলি দেখেছি, আর সেই রাজকাহিনীর রাজপুতানার মতই গায়ে কাঁটা দিয়েছে। জয়েসের ব্যবহৃত জিনিসপত্তর, কি সুইফট আর স্টেলার যুগ্ম কবর দেখেও ঠিক তাই! আর ক্রেমলিনে? ইভান দ্য টেরিবলের বিয়ের গির্জে দেখে কি ছোটবেলায় টাওয়ার অব লন্ডন দেখার মতই রোমাঞ্চ হয়নি? টলস্টয়ের বসতবাড়িতে হাঁটতে হাঁটতে কি ভাইমারে গ্যয়টের বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখার কথা মনে পড়েনি? বাল্যে শেক্সপীয়রের বাড়ি দেখবার তুল্যই কৃতার্থ, ধন্য মনে হয়েছে। ঠিক এইখানেই তিনি বেঁচে ছিলেন? ভাবতেই শিহরণ হয়েছে।

কিন্তু প্যাকেজ ট্যুরে আমার রুচি নেই।

আমি বেড়াতে চাই স্বাধীনভাবে। রুটিনবিহীন।

কোম্পানির ভ্রমণ আমার জন্যে নয়। অত নিয়মকানুন আমার সহ্য হয় না। সব ঠিকঠাক, ভালো হোটেলে ঘরটি, ভালো থিয়েটারের টিকিটটি, ফেরার পথে সীটটি—দূর দূর! একি বুড়ুটে বেড়ানো। ওতে আবার মজা আছে নাকি? ঝুপ্ করে বেরিয়ে পড়বো, ধুপ্ধাপ্ নেবে পড়বো, হুপহাপ লম্ফঝম্ফ মারবো, যখন খুশি গন্তব্য পালটাবো, টুক করে মার কাছে ফিরে আসবো। ঘরের মেয়ে ঘরে। কেবল একটু অন্যরকম হয়ে আসবো। যে মেয়ে যায়, সেই মেয়ে ফেরে না। একটুখানি রেখে আসে ধুলোবালিতে, আর অনেকখানি নিয়ে আসে নিশ্বাসেপ্রশ্বাসে। প্রত্যেকটা যাত্রা আমাকে একটু একটু বদলে দেয়।

সুন্দরবন ভ্রমণ এখন খুব ফ্যাশনদুরস্ত। কত কায়দার লঞ্চ যাত্রা আছে। আমিও একবার গিয়েছিলুম, সে যাওয়া একেবার অন্যরকম। গ্রামের পুজো দেখব বলে ঝোঁক হয়েছিল। একটি ছেলের সঙ্গে চলে গিয়েছিলুম গোসাবা। সে ঐ অঞ্চলে স্কুলমাস্টারি করে। সঙ্গে আমার সাঙ্গপাঙ্গ। ফেরার দিন উনিশবার যানবাহন বদল করতে হয়েছিল, আর মোট এগারো রকমের যানে চড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল এক যাত্রায়। কাদায় আছাড়গুলো ছেড়েই দিচ্ছি। বাচ্চারা কাঁদেনি, কিছু ঝামেলা করেনি। ভাঙা জেটি থেকে তাদের যখন দশফুট নিচের নৌকোয় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি অচেনা হাটুরেরা লুফে লুফে নিয়েছে তখনও তারা ভয় পায়নি, কেবল মাজননীকে কে ছুঁড়বে, এবং কে লুফবে এইটে তাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। পাগাড়ি, ডিঙি নৌকো, খেয়াতরী, সাইকেল-ভ্যান, টেম্পো, বাস, হাটুরেদের নৌকো, ইস্টিমার, বাস, সাইকেল-রিকশা, রেলগাড়ি, ট্রাম, রিকশা—এগারো রকমের যানে চড়ে আমরা এলুম সুন্দরবন থেকে হিন্দুস্থান পার্ক—বেরুবার সময় আকাশ ছিল বেগুনি রঙের, সূর্য ওঠেনি। ফেরবার সময়ে মালার অকূল গাঙ্ ভাসাচ্ছে কোজাগরীর বেহিসেবি চাঁদ।

যাঁরা যান ট্যুরিস্ট লঞ্চে চেপে, সারেঙের হাতের খানা খেতে খেতে এসব কিছুই তারা জানতে পারেন না। কাঁকড়া আর মিনি-মাছ-হাঁটা শূলো বের করা এঁটেল কাদা পেরুতে গিয়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদায় গেঁথে যান না তাঁরা, রোদ মাথায় হুডবিহীন টেম্পোতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছায়া সবুজ গাঁ গেরাম দেখেননি তাঁরা, তক্তা আঁটা সাইকেল-ভ্যানে বাবু হয়ে বসে ছাগলছানার সঙ্গে ভ্রমণ করেননি তাঁরা, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে কুঁড়ে ঘরে খৈ ভাজার শব্দ শোনেননি তাঁরা। আঁচলে খৈ নিয়ে খেতে খেতে পথ চলেননি, গুণ টানতে টানতে নরেন মাঝি তাদের পার করে দেয়নি উজানের খাঁড়ি, আধঘন্টার পথ পেরুতে তিন ঘন্টা লেগে যাবার মজাটা তাঁরা জানতে পারেন না। বাঘে না ধরলে, তাঁরা টের পাবেন না ওটা সুন্দরবন, না ডিজনীল্যান্ডের ট্রিপ একটা।

অতি সুখে থাকায় আমার সুখ সহ্য হয় না। দুর্গাপুজো দেখতে গিয়ে উঠেছিলুম হ্যামিলটনের বাংলোয়। যেই না গোসাবা বাজারে চায়ের দোকানে ছেলেটির সঙ্গে আলাপ হওয়া, আর সে বললে তার বাড়ি অনেক ভেতরদিকে, গ্রামের মধ্যে, খাঁড়ি বেয়ে নৌকো চেপে দু’ঘন্টার পথ, সেই চিংড়ি ভেড়ির কাছে, বনের বাঘ সাঁতরে চলে আসে মানুষ ধরতে, যাবেন নাকি দিদি, আমাদের গাঁয়ে? অমনি নেচে উঠেছি, এক্ষুনি, এক্ষুনি। রাত তখনই সাড়ে নটা। আর গ্রামদেশে সাতটায় রাত নিঃঝুম। সেই রাতে দু’ ঘন্টা নৌকোয়, দেড়ঘন্টা পায়ে হেঁটে, বাচ্চাকাচ্চা সমেত, ফুটফুটে জোছনায় হাসন্ত ধানক্ষেত আর ভাসন্ত শাপলাফুলের ধার দিয়ে ছায়াছায়া বাঁশঝাড় আর নাম-না-জানা অন্ধকার গাছের তলা দিয়ে তিন চারটে ঘুমন্ত গ্রাম পার হয়ে পৌঁছেছিলুম অতনুর বাড়িতে। রাত দুটোর সময়ে রবাহূত অতিথিদের সে কী যত্ন, কী আপ্যায়ন। চা, বিস্কুট, মুড়ি, নাড়ু। হ্যাঁ, জোয়ার দেখেছি বটে সেই রাত্রে। একই সঙ্গে জলে আর জ্যোৎস্নায় জোয়ার—নৌকো পথ ভুলে উঠে ঢুকে পড়েছিল জলে ঢাকা ডাঙ্গায়। মাঝি নেমে পড়ে ঠেলেঠুলে কখনো ধানক্ষেত থেকে কখনো গেরস্তের উঠোন থেকে নৌকোকে ফিরিয়ে আনছিল নদীর জলে। কানা উপ্‌ছোনো চরাচরব্যাপী চন্দ্রালোকে ঝোপঝাড়, শাপলা-শালুকগুলোকে রুসোর আঁকা ছবির ফুলপাতা বনজঙ্গলের মত অবাস্তব দেখাচ্ছিল। কাছেই বাঘ ডাকতে পারত। তার বদলে তীব্র তীক্ষ্ণ শিস দিয়ে জ্যোৎস্নারাত্রি চিরে ফেলেছিল বাঘের মতই এক রাতপাখি। গরাণ-বাইন গাছগুলোর কপাল পর্যন্ত জলে ডুবে গেছে। বন্যার ছবির মতোই দেখাচ্ছিল (মাইনাস শোক)।

ফেরার সময় ছিল ভাঁটা। কামট ভর্তি খাঁড়িতে নেমে গুণ টানতে টানতে উজান বেয়ে নৌকো আনতে জান নিকলে গিয়েছিল মাঝির। জল নেমে গেছে অনেক নিচে। বাইন, গরাণ গাছগুলোর উঁচু ডালে ফুল ফলের মতো ঝুলে আছে গেঁড়ি, গুগলি, শামুক। সে যে কী বিসদৃশ, কৃষ্ণের মুখে সিঁদুর-কুমকুম লেগে থাকার চেয়েও বেশি। এবার বোঝা গেল হিমালয়ের মাথায় কী করে তিমির কংকাল পাওয়া যায়। প্রাগৈতিহাসিক জোয়ার নেমে যাবার কাহিনী সেটা।

বন্ধুরা বকে; এত লোক বেড়াতে যায়, তোর বেলাই যত অঘটন ঘটে কেন? তোরই ভিসা ফুরিয়ে যায়, তোকেই পুলিশে ধরে, তোরই বাক্সপ্যাঁটরা খোয়া যায়, তোরই পাশপোর্ট, তোরই ট্র্যাভেলার্স চেকবই বারবার হারিয়ে যায় কেন? নিজের গাড়িটা না হয় অনবরত যত্রতত্র বিগড়ে ফেলচিস, কিন্তু তুই মার্কিনী রেলগাড়ি পর্যন্ত বিগড়ে ফেললি কেমন করে? কী করে ম্যানেজ করিস এত গণ্ডগোল?

বকুনি খাওয়া ছাড়া উপায় কী? সত্যি কথাই তো। সেবার শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথে ল্যাংচা খেতে গিয়ে গাড়ির চাবি শক্তিগড়ে হারিয়ে গেল। কী করে ফিরলুম? অন্য একটা ফিয়াট গাড়ি দাঁড় করিয়ে তার চাবি দিয়ে স্টার্ট করে নিয়ে, চাবি ফেরৎ দিয়ে, ঐ স্টার্টই বজায় রেখে রেখে যদ্দূর যাওয়া যায়। লেভেল ক্রসিং-এ এসে? নেক্সট ফিয়ার্ট গাড়ি ধর। ঐভাবেই গাড়ি সুদ্ধু ছাত্রীদের এনে ফেলেছিলাম কিন্তু ডানলপ ব্রীজ পর্যন্ত! এই অসামান্য কীর্তির জন্যে কেউ একটা বাহাদুরি তো দিলেই না, উল্টে চাবি হারানো নিয়ে খোঁটা দিতে লাগলো। অথচ চাবিটা হারালো খোকন।

আর মার্কিনী রেল গাড়িটা কি আমি ভেঙে ফেলেছিলম? শিকাগো টু সানফ্রান্সিস্কো যাচ্ছি, পথে এইসা বরফ ঝড় হলো যে বুড়ো বুড়ো রেড উড ট্রি উপড়ে পড়লো রেল লাইনে, আর ফেদার নদীর সেতু গেল ভেঙে। ট্রেন প্রায় পৌঁছে এসেছিল রসদ সংগ্রহের এক ঘাঁটির কাছে, তাই জল ফুরিয়ে গেল, খাদ্যও ফুরিয়ে গেল, সবার আগে চলে গেল বিজলী ব্যবস্থা। সে-দুর্গতি কল্পনাতীত। প্রচণ্ডভাবে যন্ত্রনির্ভর, নিশ্চিত নিয়মানুগ দেশে এমন আজব কাণ্ডের জন্যে মানসিক প্রস্তুতি থাকে না, সবাই খুব ঘাবড়ে যায়। সাহেবদের উদ্বেগ, শঙ্কা এবং আর্তি চরমে উঠলেও, আমাদের কাছে তো এ নস্যি। এ ধরনের আশাতীত অব্যবস্থাও ওদের হঠাৎ আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দেয়, কিন্তু আমাদের এসব তুচ্ছ। আমি তো ফোকটে অ্যাডভেনচার পেয়ে মহা আহ্লাদিত। রোগা ফেদার নদীর সে কী ধ্বংসময়ী রূপ। বন্যায় ঝড়ে, বরফে, স্ট্র্যানডেড হয়ে যাওয়া ট্রেনে—আমার তো খুব ভালোই হলো, দারুণ মজা। দিব্যি গীতার স্থিতধীর প্রতিমূর্তি, নিরুদ্বেগ ওরিয়েন্টাল উইসডম হয়ে মহোল্লাসে বসে আছি!

একবার ফলতা ফোর্ট দেখতে ছানাপোনাদের নিয়ে গেছি, গাড়ি বেঁকে বসলো। মুহূর্তেই জুটে গেল দুশো কুচোকাচা পরামর্শদাতা।

—“বিস্যজিৎ-এর মটরগাড়িটাও এইখেনে খারাপ হয়ে গেস্‌ল।”

—“বিস্যজিৎ-এর মটরগাড়িটাও এইখেনে খারাপ হয়ে গেস্‌ল।”

—“বিশ্বজিৎ গাড়িটা সারালেন কী করে?”

—“সারায়নি। ঠেলতে ঠেলতে থানায় নিয়ে গেল।”

—“তবে তাই চল।”

থানা দু মাইল। পোঁছোলুম ঘন অন্ধকারে। গাড়ি উঠোনে রাখার বন্দোবস্ত করে পুলিশদের বললুম—

—“এবার দয়া করে একটা লক আপে আমাদের জন্যে একটু জায়গা করে দেবেন ভাই?”

—“লক্ আপে? লক আপে কেন?”

—“কোথায় থাকবো এত রাত্রে, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে? সেফটির পক্ষে তো লক আপই শ্রেষ্ঠ। পয়সাও লাগবে না।”

হৈ হৈ করে উঠলেন পুলিশ অফিসারেরা—“এইজন্যে? আমরা এতজন ভাই থাকতে সেফটির চিন্তা? লক আপে ছাড়া বুঝি বিনা খরচে থাকা যায় না?”

সে রাত্রে ভাইদের ব্যবস্থায় রাজার হালে থেকেছিলুম গঙ্গার তীরে বাগানঘেরা একটি বাড়িতে।

তবে ভাইরা সব সময়ে যে একরকম হয়, তা নয়। সেবার দুর্গাপুর স্টেশনে দুটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হল। কথায় কথায় একজন বললে তাদের গ্রামে অপূর্ব পোড়া মাটির মন্দির আছে, অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইতে তার উল্লেখ আছে। তার বন্ধু বললে—“চলে যান না দিদি, ওদের পুকুরে মাছের চাষ। পেট ভরে মাছ ভাজা খেয়ে আসবেন!” দিদি তো “আঁচাবো কোথায়?” বলে তৈরি।

গ্রামটি বাঁকুড়ায় দুবার বাস বদল করে বড়জোড়ায় নেমে সাইকেল রিকশা নিয়ে বিশাল মাঠ পার হয়ে ওদের গ্রাম। ডাক্তারবাবুর সামনের বাড়ি বললেই নিয়ে যাবে।

—“সকাল সকালই চলে আসুন। কাল নাইট ডিউটি আছে দুপুরে বাড়িই থাকব। দুটি ভাত-মাছ খেয়ে আসবেন ভায়ের কাছে।”

—“অবশ্যই। অবশ্যই। সে আর বলতে। কাল দেখা হবে।”

দুর্গাপুর গার্লস হাইস্কুলের টীচাররা কিছুতেই যেতে দেবেন না। পাগল নাকি? দাঁড়ান, টানা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।” (ওঁদের প্রাইজ বিতরণেই যাওয়া!) আমি তো চুপিচুপি মেয়েদের নিয়ে ভোকাট্টা। বাসটাস বদলে রিকশাটিকশা নিয়ে ঠিক হাজির হয়েছি। দীর্ঘ পথ। ঠাঁঠাঁ রোদ খিদেতেষ্টা বেশ জমে উঠেছে।

আমাকে হাস্যবদনে সকন্যাদ্বয় দুয়োরে সশরীরে খাড়া দেখেই ছেলেটা অজ্ঞান হয়ে পড়বার যোগাড়। বুঝলুম বিশেষ কেলেংকারি করে ফেলেছি। এটা কল্পনার অতীত ঘটনা এ বাড়িতে। ভাতের প্রশ্ন উঠল না। আর বুঝতেই পারলাম মাছ চাষের গল্পটা, গল্পই। অবিশ্যি ব্যাপারটা সয়ে যাবার পরে, যত্নের অভাব হল না। চা-মুড়ি এল। বড়জোড়া বাস স্টপে ফিরে ডাল চচ্চড়ি পোনা মাছের ঝোল দিয়ে মোটা ভাত, খিদের মুখে দারুণ স্বোয়াদ লাগলো। মেয়েরা অবিশ্যি এখনো বলে, “কেমন খেলে মা, গরম গরম মাছ ভাজা, ভায়ের বাড়িতে?”

কিন্তু দোষ তো ওদের নয়। শহুরে লোকেরা মুখে কত কীই তো বলে। আমার মত শহুরে বিবিটি কষ্ট করে সত্যি সত্যি ওদের বাড়িতে যাবে, এটা ও বিশ্বাস করতে পারেনি।

আমাদের কাজের মেয়ে শীলার বিয়েতে আমি যখন ডায়মন্ডহারবার থেকে কাকদ্বীপের বাসে চড়ে সত্যি সত্যি ‘ধলের খাল’ স্টপে নেবে পালান মাঝির বাড়ি পৌঁছেছিলুম, সেখানেও এই রকম অপ্রস্তুতি, সংকোচ আর সমূহ কেলেঙ্কারি ঘটেছিল। দুটো ডাব খেয়ে ফিরতে হয়েছিল ডায়মনড হারবারে। সাগরিকায় খেয়ে নিয়ে ট্রেন ধরে বাড়ি। গ্রামের লোকেরা আমাকে ঠিক সীরিয়াসলি নেয় না। (শহরের লোকেরা তো নয়ই।)

লোহার সিন্দুকে হাত ডুবিয়ে চায়ের পেয়ালা বের করতে করতে পোড়ামাটির মন্দিরের গাঁয়ের ছেলেটি আমার কাছেই দুঃখু করল,—“আমার বন্ধু বলেছিল বটে, সাংঘাতিক মহিলা, বলা যায় না, চলেও যেতে পারে। একা একাই নাকি কুম্ভে গেস্‌ল!…

আচ্ছা দিদি, কী করে গেলেন, মেয়েছেলে হয়ে? ভয় করল না আপনার?”

নাঃ। ভয় আর করে কই? আমার দায় তো এখন ঈশ্বরের। ভয় ভাবনা তিনি বুঝুন। আমার কি?

তাই যত্রতত্র নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যেতে পারি। একা তো নই? সঙ্গে তো সড়কি বল্লম নিয়ে চলেছেন অলক্ষ্য চৌকিদারটি। তিনিই জুটিয়ে দেন চমৎকার সব সঙ্গী। সাপ্লাই করেন সহায় সম্বল, রাত্রির আশ্রয়। এই অগাধ বিশ্বাসটা যিনি বুকের মধ্যে পুরে দিয়েছেন তিনিই নেন শেষরক্ষার ভারটা। নইলে কিসের জোরে চলে গেলুম কুম্ভমেলার ভিড়ে? কী করে অমন জবরদস্তি ঢুকে পড়ি ডাঃ লালওয়ানীর শোবার ঘরে, ঘুমুতে? আমি কি নির্বোধ? নাকি মেয়েই নই? নাকি বদ্‌মতলবে? সে আপনারা যা খুশি ভেবে নিন। আমার সত্যিই গঙ্গাদ্বীপের ধুলোভরা রাস্তায় কম্বল পেতে শুয়ে পড়তে ভয় করেনি, কাশীর ধর্মশালায় অচেনা ছটি পুরুষ মানুষের সঙ্গে একটা ঢালা তক্তাপোশে নাক ডাকিয়ে ঘুমুতে দ্বিধা হয়নি। এমন কি তাওয়াং-এর মত পাণ্ডববর্জিত দেশে হিমালয়ের নির্জন গ্রামে মোমপা লামার তিব্বতী বাড়িতে গিয়েও কুটুমবাড়ি যাবার মতন আদরযত্ন জুটে যায় আমার কপালে। ঠিক যেমনটি জোটে রাত দুটোয়, সুন্দরবনের গ্রামে। কিসের ভয়?

অনেক ঘুরেছি। লোভ করি না। অতৃপ্তি নেই। তৃপ্তিও না। “যথেষ্ট” বলে ভ্রমণে কোনো শব্দ নেই। এর পরে খুলে যাবে গ্রহান্তরে ভ্রমণের পথ—‘কুণ্ডু স্পেশাল টু জুপিটার’—অবশ্য তখনও আমি চেষ্টা করব হিচহাইক করতে—শরীরে দেবে তো? দেবে, দেবে। খুব দেবে।

ভ্রমণ কি শুধু দেশই দেখায়? ভ্রমণ আমাকে মানুষও দেখায়। একা একা ঘুরেই আমি সবচেয়ে আনন্দ পাই। এই ভ্রমণের কল্যাণে আমার প্রচুর বন্ধুলাভ হয়। চিরদিনের বন্ধু কেউ হয় কিনা জানি না, তবে এরা সবাই পথের বন্ধু। কত যে ভালো লোক আছে এই পৃথিবীতে তার ইয়ত্তা নেই। ভ্রমণে আমি মোদ্দা কথা এই শিখেছি, যে মানুষ মানুষের বন্ধু। মানুষ মানুষের আশ্রয়। রোজ রোজ কলকাতায় ট্রামে বাসে কেরোসিনের লাইনে এই কথাটা ভুলে যাই। ভ্রমণ আমাকে মনে পড়িয়ে দেয় “জীবন নয় জীবন সংগ্রাম”। কাদের ভরসায় আমি ঘুরে বেড়াই? ঘরে আমার লোকবল না থাক, পথে আমার লোকবল ঢের।

১৯৭৬। বুদাপেস্টে, ড্যানিউব নদীর মার্গিট সির্গাট দ্বীপে হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় ‘কারমেন’ অপেরা হচ্ছে। কিছু বুঝতে পারছি না, খুবই শীত করছে, উঠে এলুম। পার্ক থেকে বেরিয়ে সেতু বেয়ে এসেছি ডাঙায়, কিন্তু কী করে যে হোটেলে ফিরব, জানি না। রাত প্রায় বারোটা বাজে, পথভর্তি মানুষ, কিন্তু কেউই আমার ভাষা বুঝছে না। হঠাৎ একটি ছেলে এসে ইংরিজিতে বলল, “তোমায় সাহায্য করতে পারি?” হাতে চাঁদ পেয়েছি। গল্প করতে করতে ট্রামে গিয়ে চড়লুম। যেতে যেতে দেখি একটা পাহাড়ের মাথায় খুব জোর আলো। “কী ওখানে? বুদাপাহাড়ে?”—“ক্যাথিড্রালে আলো দিয়েছে, ওখানে আজ পিয়ানো কনসার্ট হচ্ছে। যাবে শুনতে?”—“কী করে যেতে হয়?”—“চলো আমি নিয়ে যাচ্ছি।”—“চলো যাই।” সেই ডাক্তারী ছাত্র, লাসলো পুশকাশের সঙ্গে চলে গেলুম বুদাপাহাড়ের ওপরে, রাত্রি যদিও তখন ঢের, এবং তাকে সত্যি সত্যিই চিনি না। কিন্তু চিনে নিতে কতক্ষণ? কী ভালোই লেগেছিল সেদিন! কী চমৎকার পুরোনো ক্যাথিড্রাল, কী অপরূপ পুরোনো শহর। কী সুন্দর বাতি সাজিয়েছে। খিলেনের পর খিলেন। নদীর দিকে মুখ করে বসবার অজস্র আসন বাগানে। পাহাড়ের গায়ে বাগান, আমরা বাইরে বসে বসেই পিয়ানো শুনলুম। নিচে ড্যানিউব বয়ে যাচ্ছে, ওপারে পেস্ট শহর, বুদা আর পেস্ট মিলিয়ে বুদাপেস্ট নগরী। মুহূর্তেই লাসলোর সঙ্গে গভীর বন্ধুতা হয়ে গেল। রাত তিনটেয় যখন হোটেলে ফিরলুম, শুনি বন্ধু-বান্ধবরা খুব ভাবনায় পড়েছিলেন আমার জন্যে।

মানুষ তো এমনিই। কে কখন কাছে চলে আসে, কাছের মানুষ দূরে সরে যায়। ভ্রমণের সময়ে পৃথিবীটা আমার খুব কাছাকাছি চলে আসে। আর সংসারে? অনেক দূরে, আউট অব ফোকাস সরে যায়। যখন ঘুরে বেড়াই তখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত কত সত্য, কত জীবন্ত, জগতের সঙ্গে একটার পর একটা নতুন সম্পর্ক পাতানো হয়, বসুধা যেন পরম আত্মীয় হয়ে ওঠে, এবং আত্মীয়তা হয় নিজের সঙ্গেও। নিজের হৃৎসস্পন্দের ছন্দের সঙ্গে চেনাও বেশ হয়। কিছু ভ্ৰম, বাকিটা রমণ।

মাইসোর রিজিওনাল কলেজে সামার স্কুলে পড়াতে গেছি। ওরাই নিয়ে যাচ্ছিল বেলুড় হালিবিড় দেখাতে। পথে বাস গেল ভেঙে। আমি দু’দিন বাদে ফিরে আসব কলকাতা—খুব মন খারাপ। রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, বাস সারলে মাইসোর ফিরে যাব—হঠাৎ দেখি একটা বাস আসছে “বেলুড়-হালিবিড়” লেখা। হাত দেখিয়ে চেঁচামেচি করে থামিয়ে উঠে পড়লুম। পরে বুঝলুম এটা ট্যুরিস্ট বাস। আগে থেকে টিকিট কিনে উঠতে হয়। কিন্তু বাসের গাইড ক্লীনার আর ড্রাইভারের সঙ্গে এমন প্রাণের বন্ধুত্ব হয়ে গেল তারা আমাকে বিনা টিকিটেই বেলুড় হালিবিড় শ্রবণ বেলগোলা দেখিয়ে আনল। পরদিনও আবার নিয়ে গেল উটী বেড়াতে। কিছুতেই একটা পয়সা নেওয়াতে পারলাম না—ঐ যে “সিস্টার ডেকে ফেলেছি আমরা”, পয়সার প্রশ্নই ওঠে না!

আরেকবার গন্তব্য ছিল পূর্ব জার্মানী। একের পর এক প্লেনের কনেকশন মিস করে পূর্বের বদলে পশ্চিম বার্লিনে গিয়ে পৌঁছুলুম রাত সাড়ে দশটায়। ভোরবেলা পূর্ব বার্লিন এয়ারপোর্ট থেকে ভাইমারের প্লেন ধরতে হবে। এখন যাই কোথায়? হাতে মার্ক নেই। এয়ার টার্মিনালেও ব্যাংক নেই। শহরেও ব্যাংক সব বন্ধ! থাকবই বা কোথায়? টার্মিনালও তো বন্ধ হয়ে যাবে। বসবার জায়গাও দেখছি না। ট্যাক্সি নিয়ে কোনো হোটেলে যাবার উপায় নেই, ট্যাক্সি ভাড়া দেবারও পয়সা নেই। পশ্চিম বার্লিনে তো আসবার কথাই ছিল না। ক্রিস মাসের আগের সপ্তাহ। জবর শীত। বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ দেখি দীর্ঘ একটি ভারতীয় ছেলে। দৌড়ে গেলুম। “আপনি ভারতীয়?”

—“ধরে নিন তাইই। কেন বলুন তো?” “মহামুশকিলে পড়েছি ভাই”—সব খুলে বললাম। ছেলেটি বলল, “চলুন সিস্টার আমার সঙ্গে। কিছু ভাববেন না। আমার স্ত্রী কন্যা আছে, আপনার থাকার অসুবিধে নেই।” পথ থেকে নিয়ে গেল বাড়িতে। তার নাম আলম। দেশ লাহোর। পশ্চিম পাকিস্তানের ছেলে, আমাকে স্বস্তি দিতে বলেছে ধরে নিন ভারতীয়ই।

—“কিন্তু যখন জন্মেছিলাম, তখন তো লাহোর ভারতবর্ষেই ছিল। কাজেই খুব ভুলও বলিনি।” আলম সলজ্জমুখে বলেছে পরে। ভোর রাতে ৪টের সময়ে তার স্ত্রী ডরথি আমাকে তুলে দিয়ে চা খাইয়ে সঙ্গে করে নিয়ে বেরুল—ফাঁকা ঘন অন্ধকার, ভয় ভয়, যানবাহনশূন্য বৃষ্টিভেজা বার্লিনের রাস্তায় জুতোর প্রতিধ্বনি তুলে, ডরথি আর আমি ছুটতে লাগলুম, প্রথমে ভূগর্ভ রেলে চড়ে এক জায়গায় যাওয়া, সেখানে ট্রেন বদল করে আবার এক জায়গায়। এইখানেই বাস স্টেশন। বাস নিয়ে আমি যাব শোনাফেল্ট, পূর্ব বার্লিন এয়ারপোর্টে। দিনের প্রথম বাসটিই ডরথি আমায় ধরিয়ে দিল, ৫টার সময়। উঠিয়ে দিয়েই ওর মনে পড়ল, আমার কাছে তো টাকা নেই। হাতে গুঁজে দিল একমুঠো নোট, না গুণেই। ডরথি-আলম আমার পুরো নামটা পর্যন্ত জানে না। পরে ওদের টাকা শোধ করেছি কিন্তু অদ্ভুত করুণা অপরিশোধ্য! এমনও মানুষ হয়? তবু লোকে ভাবে আমি একা একা ঘুরি। চতুর্দিকে আমার পূর্বজন্মের সঙ্গী-সাথীরা আছে না। কে বলেছে একা?

সাহিত্য সংখ্যা, ‘দেশ’ ১৩৯০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *