এ শুধু মেঘের খেলা

এ শুধু মেঘের খেলা

ভালোবাসার কথা?

সম্পাদকমশাইয়ের আদেশ, পাশ্চাত্যদেশের প্রেমের বিষয়ে কিছু লিখতে হবে। কী লিখি? প্রেম কখনো গদ্যে বোঝানো যায়? অন্তত আমি তো পারি না। প্রেম মানেই কবিতা। কিছুটা ধরা দেবে, বাকিটা অধরা। সম্ভব শুধু প্রেম বিষয়ে কিছু প্রেম নিবেদন।

ছাত্র বয়েসে ভালোবাসা নিয়ে ভাবার অনেক সুযোগ হয়েছিল। পৃথিবীর তখন অল্প অল্প করে ঘোমটা খুলছে, জীবনের মুখখানি একটু একটু করে চিনতে পারছি। ভালোবাসার সঙ্গে চেনাশুনো সেই তখন থেকে। কলকাতা শহরের সঙ্গেও প্রকৃত চেনাশুনো তখন থেকে। এবং এই নবনীতাটার সঙ্গেও।

সেই যে, “প্রেম এল না, দুঃখ এল।” সেই আমার বড়ো হয়ে ওঠা। কিন্তু প্রেম তো সূর্যের মতো। অস্ত যায়, আবার উদয় হয়। বেদনার রাত্রি অনিঃশেষ হয় না।

তাই যখন একলা সাগরপারে গেলুম, তখন আমি ছাত্রী এবং সদ্য বাগ্দত্তা। পৃথিবীর রং লেগেছে, বাতাসে সুর জেগেছে। ভালোবাসি, ভালোবাসি, জলে স্থলে বাজায় বাঁশি। এইরকম অবস্থায় তো পৌঁছানো গেল অতলান্তিকের ওপারে। মা-বাবা কলকাতায়, ভালোবাসার মানুষটি কেমব্রিজে, আমি সেই ধ্যাধ্‌ধেড়ে গোবিন্দপুরে। আস্তে আস্তে পশ্চিমী সভ্যতার সঙ্গে আলাপ শুরু হলো।

দেখা গেল শুক্রবার বিশেষত শনিবার সন্ধ্যাবেলাটা কোনো মেয়ের পক্ষে হস্টেলে অথবা লাইব্রেরিতে বসে থাকাটা নিদারুণ লজ্জার। ওটা প্রেমের সময়। জোড় বেঁধে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ম। কলকাতাতে এমন রুটিন বাঁধা প্রেমের চল ছিল না তখনও। এখনকার কথাটা ঠিক জানি না। এমন আষ্টেপৃষ্ঠে যাবতীয় মার্কিনি অভ্যাসের আমবা নকলনবিসি করছি, টী-শার্ট, বাবলগাম, ওয়াকম্যান, ভিডিও গেমস, টিভি সিরিয়ালের নেশা—যে হয় তো ইতিমধ্যে শনিবার সন্ধ্যার প্রেম না-করার সামাজিক মানহানিটাও ধার করে বসে আছি, কি জানি? বাগদত্তা বলে আমি নিজেকে তখন এই ডেটিং-পেটিং মহান্‌ কর্মকাণ্ডের বাইরে রেখেছিলুম। ‘ডেট’ করাটা ঠিক কী জিনিস বুঝতে পারি না ; প্রেম নয়, আবার প্রেম করা আছেও। বাগদত্তার পক্ষে নৈতিক আপত্তি তুলতে অসুবিধে নেই। অথচ কার্লা, ফিনল্যান্ডের মেয়ে? তার টেবিলেও তার ফিয়ান্সের ছবি আছে, সে কিন্তু ‘ডেট’ করতো। বলতে— “ধুৎ, এ আবার প্রেম নাকি? এ তো খেলাধুলো। কেবল মজা করছি।” আমার মনে হত এভাবে মজা করতে গেলেই। আমার মজা বেরিয়ে যাবে। তখন ডেটিং মানে ছিল পুরুষটির পয়সায় মেয়েটি সিনেমা দেখবে, হয়তো ড্রাইভ-ইন-মুভিতেই, ডিনার খাবে, এবং খানিক নেকিং-পেটিং করবে। একেক সপ্তাহে একেকজন ভিন্ন সঙ্গী হতেই পারে যতদিন না “গোয়িং স্টেডি” স্টেজ আসে। তারপর আংটির সময়। কিন্তু ডেট-এ ছেলেরা আশাই করবে মেয়েদের শরীরে কিছুটা অধিকার। মেয়েদেরও তাতে আপত্তি নেই। বরং ‘ডেট’ না পেলেই চিন্তার কথা ! সারাদিন তারই প্রস্তুতি চলে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে মেয়েদের টয়লেটে আয়নার সামনে ভিড়। চুলে ব্রাশ, নাকে পাউডার, চোখে ঠোঁটে রং বুলোনো। মেয়েরা সযত্নে সর্বক্ষণ সাজাচ্ছে নিজেদের, ছেলেদের চোখে লোভনীয় দৃশ্য হয়ে থাকা চাই অনুক্ষণ, শো-কেসে সাজানো পসরার মতো, কখন কার চোখে ধরে যায় কে জানে? পাত্রী যে নিজেই ঘট্কী। ওদেশে পণপ্রথা নেই কে বলেছে? রূপযৌবনই কন্যাপণ ওখানে। জীবনে নিরাপত্তার জন্য কী উদ্বেগ, কী ভাবনা মেয়েদের। দেখে আমার দুঃখ হতো। কলকাতায় আমরা দিব্যি বুকের কাছে দুটো বইখাতা নিয়ে রুমালে বাসভাড়াটা বেঁধে, ট্রামে-বাসে আর চড়চড়ে রোদ ঝমঝমে বিষ্টির মধ্যে পথে পথে হেঁটে বেড়িয়ে ভরদুপুরে প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে আরেক রকমের প্রেম করেছি। সঙ্গে চিরুনি পাউডার কিছুই থাকতো না, ভ্যানিটি ব্যাগই ছিল না আমাদের। কই, চুল এলোমেলো নাক ঘাম তেলতেলে বলে তো সেই তরুণ প্রেমিকদের মুগ্ধতার অভাব হয়নি? দিনকাল এখন বদলে গেছে পশ্চিমেও। ষাটের দশকেই বদলাতে শুরু করেছে। মেয়েরা এখন ওভাবে পুরুষনির্ভর নয়, প্রণয়াকাঙ্ক্ষিণী হতেই হবে এ ব্যাপারটা নেই। মাঝে “স্বাভাবিক সাজে” ব্যাপারটা এসেছিল। মেয়েরা এখন মনেপ্রাণে অনেক সহজ, অনেক স্বাধীন হয়েছে পশ্চিম দেশে। এখনও ডেটিং আছে কিন্তু “শনিবার আমার অন্য কাজকর্ম আছে, পড়াশুনো আছে, এই শনিবার বেরুচ্ছি না”—বললে মানহানি আর হয় না।

‘ডেট’-এও অনেক সময়েই যে-যার খরচ নিজেরা দেয়। পুরুষমানুষের কাছে মূল্যবান হওয়ার মাধ্যমেই মেয়েদের একমাত্র মূল্যায়ন আর হয় না। পুরুষদেরও, শুনেছি সঙ্গে মেয়ে না-থাকলে শনিবার একদম স্টেটাস মাটি। প্যারিসে এটা এখনও আছে। সঙ্গী-সঙ্গিনীবিহীন একক মানুষটিকে রেস্তরাঁর স্টুয়ার্ডও শনিবার করুণার চোখে দেখে। মার্কিন দেশ আমার জ্ঞানের চোখ উন্মীলন করে ছিল অভিজ্ঞতার শলাকা ফুটিয়ে।

পড়াশুনো সেরে লাইব্রেরি থেকে ফিরতে রাত হয়। সাড়ে দশটার পরে লাউঞ্জে ছেলেদের বসতে দেয় না দোর বন্ধ হয়ে যায়। অতএব ঐ সময়ের পর হস্টেলের বাইরে দরজার দুই ধারের অন্ধকার দেওয়াল জুড়ে জীবন্ত খাজুরাহোর কারুকার্য।

ওদের দেখে ফেলে আমারই লজ্জায় লুকোতে ইচ্ছে করতো। ঈশ্, প্রেমটা বুঝি পাবলিক প্রপার্টি? এত শস্তা? পরে বুঝেছি এর অনেকটাই লৌকিকতা, লোক দেখানো। এটা বুঝতে সময় লেগেছিল।

আমাদের এক বাঙালি বন্ধুর বিদেশিনী পত্নীকে দেখতুম সর্বসমক্ষে তাঁর সলজ্জ স্বামীর কোলে গিয়ে বসতেন। ইনি ছিলেন তৃতীয় স্বামী। কিছুকাল পরে তিনি এঁর কোল থেকে উঠে চতুর্থ স্বামীর কোলে গিয়ে বসলেন। আরেক বিদেশিনী বান্ধবীকে দেখতুম আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেও বার কয়েক অকারণ পুলকে স্বামীকে টেলিফোন করতেন। এবং সে কী গহন গদগদ উচ্চারণে ! আমি সরে যেতুম। তারপর তিনিই একদিন এক দক্ষিণ আমেরিকার শিল্পীর সঙ্গে সুদূর ভেনেজুয়েলায় পালিয়ে গেলেন স্বামীকে ফেলে। তার আগে পর্যন্ত আমি ওর জন্যে দারুণ ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতুম। বন্ধুর বাড়িতে গেলে আমি তো কই স্বামীকে ফোন করে প্রেমের কথা বলি না? তবে কি আমি স্বামীকে ঠিকঠাক ভালোবাসি না?

এবার এল অন্য সমস্যা, অন্য প্রশ্ন। স্বামীকে এত প্রেমবাক্য বলার পরেও ইনি কেন ভেনেজুয়েলায় পালালেন? উনিই বা এত ভালোবেসে এত কোলে বসেও চতুর্থ স্বামীর কাছে চলে গেলেন কেন? প্রেমের কাছে তাহলে ওদেশের মেয়েরা কী চায়?

অবশ্য এর উত্তর ছ’শো বছর আগে চসার সাহেব দিয়ে গিয়েছেন তাঁর ওয়াইফ অভ্ বাথ্-এর কাহিনীতে। পর পর পাঁচটি স্বামী ও অসংখ্য প্রেমিকের মালিকানী এই ওয়াইফ অভ বাথ-এর প্রতি চসারের দিব্যি উষ্ণমধুর ভালোবাসা আছে বোঝা যায়।

একটি নাইট ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পেল। নাইট বড়ই সুপুরুষ। তাই রাণীমার মায়া হোলো তিনি রাজাকে বলেকয়ে নাইটটির প্রাণভিক্ষা নিলেন। রাণী নাইটকে বললেন, “বাছা, তুমি যদি এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে পারো তবে তোমার মুক্তি। আর না-পারলে, মৃত্যু। প্রশ্নটা—এই : নারী ইহজীবনে সবচেয়ে বেশি কী চায়?” নাইট কিছুতেই উত্তর ভেবে পেলেন না, শেষে এক মাঠের মধ্যে হত কুৎসিত এক বৃদ্ধার কাছে জবাবটা মিললো। বুড়ি বললে “এর বদলে আমি যা চাইবো তাই দিতে হবে।” নাইট বললে— “দেবোগো দেবো। এর বদলে আমি প্রাণ ফিরে পাচ্ছি।” নাইট সভায় গিয়ে উত্তরটা জানালেন : “নারী জীবনে সবচেয়ে বেশি চায় তার প্রেমিক পুরুষটির ওপরে শর্তহীন প্রভুত্ব, প্রণয়ীর নিঃশর্ত দাসখৎ—” রাজসভায় ছুঁচ পড়লেও শব্দ হতো—রাণী ও তাঁর সখীরা বললেন— “নাইট, তুমি মুক্ত !” তৎক্ষণাৎ বুড়ি বললে, “নাইট, আমাকে তবে তোমার প্রণয়িনী পত্নী করো। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছো !” তরুণ নাইট কুশ্রী বুড়ির দিকে চেয়ে প্রায় কেঁদেই ফেললে—“তোমার আর যা খুশি তাই নাও, প্রাণটাই নাও। প্রেম চেও না” —কিন্তু বুড়ি নাছোড়। সে বিয়েই করবে নাইটকে। অগত্যা রাজসভা থেকে ধরে বেঁধে নাইটের সঙ্গে বুড়ির নিরানন্দ বিয়ে দেওয়া হলো। চুক্তিভঙ্গ তো হতে পারে না ! বাসরগৃহে বউ বললে— “কই গো স্বামী? এ কেমন বাসর? বউকে আদর করো?” স্বেচ্ছাচারী সেই ধর্ষণকারী নাইট আর পারলো না, বলেই ফেললো—“তুমি একেই তো কুরূপা, তায় গরিব ভিখিরি, না-জানি কোন নীচরক্ত তোমার গায়ে, তাছাড়া বুড়ি থুত্থুড়ি। তোমাকে ছুঁতেই হচ্ছে করে না।” বুড়ি হাসিমুখে বললে ; “স্বামী, রূপ চিরকালের নয়, যৌবনও চলে যাবার জন্যই আসে, আর সদ্বংশের লক্ষণ তো কাজেই প্রমাণ হয়, চাদ্দিকে উচ্চবর্ণের যা কীর্তিকলাপ সে তো দেখতেই পাচ্ছি। গরিব? দারিদ্র্য কোনো ব্যক্তির দোষ নয়। যে মানুষ দারিদ্র্য সত্ত্বেও অনুদ্বিগ্ন, অভিযোগ বিহীন, তিনিই প্রকৃত ঐশ্বর্যবান। কোষাগারে অশেষ ধন নিয়েও যার অভিযোগ অনুযোগ উদ্বেগ জমছে, আসলে দরিদ্র তো সে-ই। কাজেই আমাকে অপছন্দ করার চারটে কারণই তোমার ভুল। এটা তো বুঝলে? এবার মন স্থির করে আমাকে বলো তুমি জীবনে কী চাও। আমি জাদু জানি, রূপসী যুবতী স্ত্রী হয়ে তোমার সেবা করতে পারি কিন্তু বিশ্বসুদ্ধু লোক যুবতীর প্রেমে পড়বে, সেও একটু-আধটু প্রশ্রয় দেবেই, মনুষ্যধর্ম। যুবতী সুন্দরী পত্নী বিশ্বস্ত হবে না। বুড়ি বউয়ের দিকে কেউ নজর দেবে না, সেও চিরকাল শুধু তোমারই থাকবে। সংসারেও শান্তি থাকবে। এবার বলো, কী তোমার ইচ্ছে। নিরাপত্তা? না রূপযৌবন?” যুবক অনেক ভেবে কূল না পেয়ে শেষে বুড়িরই শরণাগত হল। —“তুমিই বলে দাও আমার কিসে ভালো হবে?”—বুড়ি খুশি হয়ে বললে—“তাহলে স্বামী, বিবাহিত জীবনে তুমি আমার প্রভুত্ব মেনে নিলে?” নাইট বললে—“নিঃশর্তে!” বুড়ি বললে—“তবে একটা চুমু দাও!” অগত্যা স্বামী চুমু দিলে, কিন্তু চোখ বুজে। তারপর? চোখ খুলে দ্যাখে সামনে রূপসী, যুবতী বউ বসে মিটিমিটি হাসছে। বউ বললে—“আমার কাছে যখন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছো, তখন তুমি দুটোই পাবে স্বামী, রূপযৌবনের সঙ্গে বিশ্বস্ততা, আনুগত্য। আমাকে জিতিয়ে দিয়ে তুমি নিজেই জিতে গেলে।”

এই বোধহয় প্রেমের শেষ কথা। প্রেমিকই হোন, বা প্রেমিকাই হোন, একে যদি অন্যকে জিতিয়ে দিয়েই সত্যি খুশি হতে পারেন তবেই তিনি শেষ জিতটা জিতে যান। অনায়াসে। প্রেম মানেই দিয়ে খুশি হওয়া—নেবার হিসেব কষা নয়। আমরা ছেলেবেলাতে এইরকমই মোটামুটি একটা ছক্ শিখেছিলুম আমাদের বাবা-মায়ের কাছে—

—“কী পাইনি সেটা দেখতে গেলেই দুঃখ! কী দিইনি সেটা দেখতে হয়, সেইখানেই সুখ।” যে-কোনো মানবিক সম্পর্কেরই গোড়ার কথা এবং শেষের কথা এইটে। পাওয়াটা তোমার নিজের হাতের মধ্যে নয়, দেওয়াটা নিজের ক্ষমতার ভেতরে।

যৌনমুক্তির পরে প্রেম ব্যাপারটা পশ্চিমদেশে একেবারে হুলুস্থুলু বাধিয়ে ছেড়েছে। ডাক্তার, বিউটিশিয়ান, ব্যায়ামবীর, মনস্তাত্ত্বিক, সক্কলে মিলে তোমার প্রেমজীবনটাকে সুখের করতে উঠেপড়ে লেগে গেছেন। কী কী করলে তোমার প্রেমজীবন অথাৎ কিনা যৌনজীবন (দুঃখের বিষয় দুটো এক হয়ে গেছে পশ্চিমে এখন) সার্থক হবে সে নিয়ে প্রত্যেকেরই মাথাব্যথা।

এখন শরীরী প্রণয়ই প্রেম, এবং সেখানে যৌনকর্তব্য সম্পাদনের বাহাদুরিটা খুব জরুরি। প্রেম ও-দেশে এখন দুটি দর্শক এবং দুটি শিল্পী যুক্ত একটি পারফরমিং আর্ট। প্রেমিক-প্রেমিকাতে পরস্পরের সঙ্গে জৈব প্রণয়ের যৌথ অনুশীলন করেন। পশ্চিমে সবই এখন অ্যাচিভ্‌মেন্ট-ওরিয়েন্টেড। প্রণয়ীযুগলও পারফরম্যান্সের প্রাণপণ প্রতিযোগিতা দেন বিছানায়। এততেও কি আর হৃদয় মনে অধরা মাধুরী বাকি থাকে? কে জানে? “শুধু স্বপনে এসেছিল সে, নয়ন কোণে হেসেছিল সে,” হয়তো এদেশেও এখন অর্থহীন প্রলাপ। পিল্-পরবর্তী যুগে এখন পশ্চিমে প্রেমপ্রণয় করা ঘরের মধ্যেই সহজ হয়ে গেছে। যৌনমুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আর পথেঘাটে, দেয়ালে-দরজায়, পার্ক-করা গাড়ির মধ্যে সেইভাবে প্রণয়ীযুগলের দেখা পেতে হয় না বটে, কিন্তু বেড়ে গিয়েছে টীন-এজ প্রেগনান্সি, টীন-এজের মধ্যে যৌনরোগ, এবং বড়দের ডিভোর্স রেট।

ফিলসফিকাল, ডিক্শনরি-তে বন্ধুত্ব বিষয়ে মহামতি ভলত্যার লিখেছিলেন, ‘আমিতিয়ে’ হলো “আত্মার বিবাহ। দুটি সূক্ষ্ম মনোবৃত্তিসম্পন্ন সৎ মানুষের মধ্যে একটি চুক্তি।” আর প্রেম ‘আমুর’ বিষয়ে ভার্জিল উদ্ধৃত করে (“প্রেম সকলেরই একরকম”) শুরু করেছিলেন—“এখানে আমাদের হতেই হবে শরীরী: এটা প্রকৃতির ব্যাপার, যাকে কল্পনা বিচিত্র কারুকার্যে মণ্ডিত করেছে। প্রেম বিষয়ে জানতে চাও? তাহলে ওই বাগানের চড়ই পাখিগুলির দিকে তাকাও, তাকাও কপোত-কপোতীর দিকে, ষাঁড়টিকে লক্ষ্য করো যখন তোমার গাভীর কাছে তাকে এনেছো, অহংকারী অশ্বটির দিকে নজর রাখো যখন তাকে শান্ত, প্রতীক্ষমানা অশ্বীটির কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে…হ্যাঁ এদের দ্যাখো, কিন্তু ঈর্ষা কোর না। বরং ভেবে দ্যাখো, ওদের যা যা আছে, প্রকৃতি মনুষ্য প্রজাতিকে তারই পরিবর্তে দিয়েছেন প্রেম—প্রেম একাই পরিপূরক সমস্ত জান্তব গুণের—শক্তির, সৌন্দর্যের, সরলতার, গতিবেগের—। ভাবো, একমাত্র মানুষই তো জেনেছে চুম্বনের সুখ, একমাত্র মানুষের জন্যই সকল ঋতু প্রণয়ের ঋতু। এমনকি যৌনসুখের অভিজ্ঞতাকেও মানুষই ঢের বেশি উপভোগ করতে শিখেছে পশুদের তুলনায়। তার আছে কল্পনা, সে যৌনতায় যোগ করেছে শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্ব।”

হ্যাঁ প্রেম বোধহয় আজও খানিকটা শ্রদ্ধা, খানিক বন্ধুতা, কিছু যৌনতা, বাকিটা কল্পনারই ব্যাকুলতা। এদেশেও, ওদেশেও, যেখানেই প্রেম আছে সেখানেই। কামনার নিবৃত্তি আর প্রেমকে কি গুলিয়ে ফেলেছে বর্তমান যুগ? বিশেষত পাশ্চাত্য দেশ? (সংস্কৃত সাহিত্যের মতন কি?)—প্রেম করা আর ‘প্রেম-করা’ এক হয়ে গেছে।

কলোনিয়াল কালচারের কল্যাণে ভারতবর্ষে সতীদাহ বন্ধ আইন করা, বিধবা বিবাহ চালু করার সঙ্গে সঙ্গে ‘লাভ ম্যারেজ’ বলে একটি নবীন ব্যাপার চালু হয়েছিল এবং আমরা শিখেছিলাম “রোমান্টিক প্রেম” “প্লেটনিক প্রেম” ইত্যাদির সংজ্ঞা। প্লেটনিক প্রেম বাঙালির কাছে নতুন কিছু নয়—রজকিনী প্রেমের মতোই নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তায়। —শিব ও সুন্দরের আদর্শে বাঁধা। আমরা সকলেই কোনো না কোনো সময়ে প্লেটনিক প্রেমে বিশ্বাসী হয়েছি (হয়েছি না?), আবার কোনো সময়ে সেই বিশ্বাস হ্যাক্ থুর বলে ছুঁড়ে ফেলেও দিয়েছি (দিয়েছি না?)। ইংরিজি শিক্ষায় বড়ো হবার একটা অত্যাবশ্যক অঙ্গ ওসব।

তা বলে “সক্রেটিক লাভ”? সে-ব্যাপারটা তো কই তেমনভাবে চালু হয়নি? আমরা ক’জনই বা জানি সক্রেটিক লাভ কী বস্তু? সক্রেটিসের সঙ্গে তাঁর শিষ্য বালকদের যে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, কেউ কেউ বলেন সেটাই বালক-প্রেম। সুন্দর বালকের প্রতি গ্রীক পুরুষের আসক্তি বেশ স্বাভাবিক সামাজিক আচারের স্বীকৃতি পেয়েছিল। গ্রীক ভাস্কর্যে কি সেই প্রেমেরই কিছু প্রমাণ? পুরুষের সৌন্দর্যকে এত ভালোবেসে দেখানো সেখানে কি এজন্যেই সম্ভব হয়েছে? রোমেও সুন্দর বালকদের প্রেমিক হবার অভ্যাস ছিল অভিজাত পুরুষদের মধ্যে। বহু সুন্দর বালক তাই অর্থের বিনিময়ে প্রেম দেওয়া-নেওয়ার ব্যবসা করতো, যা সম্রাট অগাস্টাস বন্ধ করে দেন। ‘মেটা মরফসিসে’ অভিদ অরকিউসকেই বালক প্রেমের প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত করেছেন।

শুনেছি প্যারিসে এখনও সুন্দর বালকদের খোঁজে বিশেষ বিশেষ রাস্তার মোড়ে বালকপ্রেমী অধ্যাপক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের এসে দাঁড়াতে দেখা যায়।

আরব দেশে তো এ ব্যবসা খোলাখুলি চলে আসছে অনাদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত। গালি খেয়ে মরেছেন কেবল ক্রিশ্চান পাদ্রীরাই। তাঁদের অবৈধ বালকপ্রেমই নিন্দের কিংবদন্তী হয়ে দাঁড়িয়েছে জগতে। অথচ ব্যাপারটার তাঁরা আবিষ্কর্তা ছিলেন না। জঁ জেনের বালকপ্রেমের কথা তাঁর জর্নালে যেভাবে বর্ণিত তাতে বালকপ্রেমের প্রতি ভক্তি হয় না ঠিকই, কিন্তু আন্দ্রে জিদ-এর জর্নালে সমুদ্রতীরে আরব কিশোরদের নগ্ন জলক্রীড়ার যে অপরূপ বর্ণনা আছে তাতে বোঝা যায় সমকামী প্রেমও রোমান্টিক প্রেমই। চরিত্রগত কোনো তফাৎ নেই। টোমাস মান-এর “ভেনিসে মৃত্যু” গল্পে যে সমকামী প্রেমের চিত্র আছে তার চেয়ে তীব্র অসহায়, সূক্ষ্ম, অনিবার্য প্রেমের ছবি সাহিত্যে কমই পাওয়া যাবে। (সেই প্রেমটিকে বোধহয় একই সঙ্গে প্লেটনিক এবং সক্রেটিক বলতে পারেন তাঁরা, যাঁরা অকারণ ক্লাসিকাল রেফারেন্সে তৃপ্তি পান!) নারীপুরুষের প্রেমে মানুষ প্রকৃতিরই পরিচারক মাত্র কিন্তু সমকামী প্রণয়ে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছে রুচি ও মনন প্রকৃতিকে ছাড়িয়ে ওঠে—এখানে প্রেমই শিল্পে পরিণত, এমন একটি মতও পশ্চিমে চালু, যেজন্য শিল্পী মহলেই সমকামী প্রণয় বেশি দেখা যেত।

আরব দেশে বালকপ্রেমের ধারা আবহমান কাল থেকে চলছে। ওমর খৈয়ামের বালক সাকীকে ভিক্টোরিয়ান ইংলন্ডে ফিট্সজেরলড্ সাহেব সেক্সচেঞ্জ করিয়ে সখী বানিয়ে ছিলেন। নরেন্দ্র দেব আর কান্তি ঘোষ মশাইও সেই মহাজনঃ যেন গতঃ, সেই পন্থাই বাংলাতে অনুসরণ করলেন। এদেশে খোলাবাজারে বালকপ্রেমের চল নেই। বই তো মার খেতোই, তার লেখকও তা থেকে বাঁচতেন না। কী হবে বাপু নৈতিকতার বোলতার ঢাকে ঢিল মেরে! সমকামিতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কমই ভালো গল্প আমার চোখে পড়েছে। বাণী রায়ের একটি অসামান্য গল্প আছে প্রায় চল্লিশ বছর আগে লেখা, লেসবিয়ান প্রেমের বিষয়ে। তারপর এই গোলমেলে বিষয়ে কোনো স্মরণীয় লেখা চোখে পড়েনি। ‘দেশ’ পত্রিকায় জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর বছর কুড়ি আগে বালকপ্রণয় সংক্রান্ত একটি গল্প ছিল, সেটির উপজীব্য কাম। বাণী রায়ের গল্পটিতে ছিল রোমান্টিক প্রেম। দুটি নারীর মধ্যে প্রেমের স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখে একটি হোমোফোবিক পুরুষের ঘৃণা, ঈর্ষা ও অপমানবোধের অসামান্য মানবিক কাহিনী।

প্লুটার্ক তাঁর “প্রেমবিষয়ক কথোপকথনে” এক পুরুষের উক্তিতে বলেছেন—“নারীরা মোটেই প্রেমের যোগ্য নয়। ওরা প্রেমের বোঝে কী? পুরুষের প্রণয়ের প্রকৃত মূল্য দিতে পারে কেবল পুরুষই।” থীব্সে তো সৈন্যদের মধ্যে “লাভার্স রেজিমেন্ট” ছিল, যারা পরস্পরের জন্য প্রাণত্যাগের শপথে আবদ্ধ থাকতো। গ্রাস ছিল সমকামী প্রেমের স্বর্গরাজ্য। লেসবসের নারীরা আকছার পরস্পরের প্রেমে পড়তেন, কবি সাফো ছিলেন সেই নারী প্রণয়ের মুখ্য পূজারিণী। “লেসবিয়ান” শব্দে গ্রীসের সেই কিংবদন্তী বিধৃত। আজকের এই নারীমুক্তি আন্দোলনে পশ্চিমের মেয়েদের মুখে প্লুটার্কের যুক্তির প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। মেয়েরা বলছেন নারীহৃদয়ের সূক্ষ্ম স্পর্শকাতর প্রণয়ের কিছুই বোঝে না স্থূল আত্মসর্বস্ব পুরুষ জাতি। তারা নারীর প্রেমের যোগ্য নয়। নারীর ভালোবাসার প্রকৃত মূল্য নারীরাই দিতে সক্ষম। তাই বর্তমানে ফেমিনিজমের একটি শক্তিমান শাখা চলে গেছে লেসবিয়ানিজমের অভিমুখে। ফেমিনিজমের রাজনীতিক তত্ত্বের সঙ্গে মিশে গেছে। লেসবিয়ানিজমের যৌন রাজনীতির তত্ত্ব। যৌনতা ও ক্ষমতার যে অবশ্যম্ভাবী অশুভ সমন্বয়ে পুরুষ সেক্সিস্ট হয়ে ওঠে, তা থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে চেয়ে লেসবিয়ানিজমের দিকে সরে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা নারীরা। এতে অনেকের অসুবিধেও হচ্ছে, অস্বস্তিতে পড়ছেন তাঁরা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সমকামিতাকে জড়িয়ে দেখতে চান না। আর সমকামিতার শত্রুরা নারীমুক্তির শত্রু হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ‘জড়িয়ে গেছে সরু মোটা দুটো তারে।’

প্রেম বিষয়ে লিখতে গিয়ে বাঙালি পাঠককে কী কী একদম বলার দরকার নেই তার একটা তালিকা করে নিয়েছিলুম গোড়াতেই। দরকার নেই বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, ভানুসিংহকে; দরকার নেই দেবদাস-পার্বতী, অমিত-লাবণ্যকে; দরকার নেই “এই বন্দী আমার প্রাণেশ্বর” উক্তি; চাই না রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গান; অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগের রেফারেন্স; বা সুচিত্রা-উত্তমের বাঁধানো ফোটো। বাঙালির প্রেম বিষয়ে ইন্-ডেপথ্ স্টাডি করা হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে শোভা পাচ্ছেন উচ্চমানের গবেষক। আমি যাই লিখি তার চেয়ে ঢের ভালো লিখতে পারতেন আপনি নিজেই। পাশ্চাত্যের প্রেম বিষয়েও, বলতে হবে না উনিশ শতকের কথা। বলতে হবে না আজকের পারমিসিভ্ সোসাইটির কথা। এইডসের প্রসঙ্গটা বলার দরকার আছে কি নেই, সেটা অবিশ্যি ভাবনার কথা। ভলত্যারের সৃষ্ট দার্শনিক পাঙ্গ্লস্‌ তাঁর সিফিলিসের ইতিহাস বলতে গিয়ে দুঃখ করেছেন, “মহান্ প্রেম, যা কিনা জৈব ধর্মের। সৃষ্টির গোড়ার কথা, তাই থেকেই এই ধ্বংসের জীবাণু সৃষ্টি হয়—এ কি বিড়ম্বনা!” এইডস্ বিষয়ে ঠিক এটা সম্পূর্ণ প্রয়োগ হয়তো করা যাবে না, তবে হ্যাঁ ‘মহান্ প্রেম’ তো বটে! যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গায় সমকামিতা বে-আইন হয়ে গেছে। এইড্স বন্ধ করার আকুল প্রয়াসে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতায় আদালতের এই হস্তক্ষেপ। “প্রেম বেআইনি” শুনলে হাসি পায়। কিন্তু “ব্যাভিচার বেআইনি” শুনলে হাসি পায় না। “সমকামিতা বেআইনি” শুনলেও হাসি পেত না সেদিন পর্যন্তই। এখনও পায় না এদেশে। কিন্তু পশ্চিমে জমানা বদল্ গয়া। সত্তরের দশকের শেষদিকে ইংলন্ডে এক ধর্মযাজক দুজন পুরুষের বিবাহ দিয়ে খবর হয়েছিলেন। এখন কানাডার, যুক্তরাষ্ট্রে, ফ্রান্সে, জার্মানীতে নারী দম্পতি, কিংবা পুরুষ দম্পতি, দিব্যি ঘরকন্না করে। তাদের প্রেম সমাজে আর অসিদ্ধ নয়। সমকামিতাকে যৌন অনাচর বলে মনে করা হয় না, মানুষী ভালোবাসা বলেই স্বীকার করা হয়। এটা ভালো না মন্দ তা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই, তবে হোমোফোবিয়া বলে একটি শব্দ আছে। সমকামিতার ভীতি। আমরা বাঙালিরা নব্বই ভাগই সেই ভীতিতে আক্রান্ত। পশ্চিমেও প্রচুর মানুষ সেরকমই।

“সক্রেটিক প্রণয়” নিয়ে তো অনেক কথা হচ্ছে। কিন্তু প্রেম বিষয়ে সক্রেটিসের জ্ঞানলাভ হয়েছিল সেই প্রজ্ঞাবতী নারী দিত্ততিমার কাছে। দিত্ততিমার মতে, সক্রেটিস বলেছেন, —“প্রেম না-সুন্দর, না-কুৎসিত, না-জ্ঞানী, না-অজ্ঞ, না-নশ্বর, না-দৈব।” প্রেমকে দেবতা ও মনুষ্যের মধ্যবর্তী আধিদৈবিক শক্তিগুলির অন্যতম ভাবছেন তাঁরা। —“আফ্রোদিতের জন্মদিনের ভোজ-উৎসবে দারিদ্র্য নাম্নী ভিখারিণীর গর্ভে আর সঙ্গতির (রিসোর্স) ঔরসে জন্ম হয়েছিল প্রেম-এর। সে রুক্ষ, সে বেপরোয়া, সে উদ্দাম। সে জুতো পরে না। অনবরত নানান ঝামেলা ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে পড়ে প্রেম। সূক্ষ্মতার লেশ নেই তার মধ্যে। কিন্তু নিরবধিকাল, নিত্যনতুন আবিষ্কার নিয়ে মেতে আছে সেই জ্ঞান-শিকারী। এই সে পরিপূর্ণ, এই সে সর্বহারা, এমনিই হলো প্রেমের চরিত্র!” কিন্তু সক্রেটিস এর আগে বলেছেন—“কিছু কামনা করা মানেই তার অভাব আছে। প্রেম যেহেতু সৌন্দর্যের ভিখারী তার অর্থ, প্রেমে সৌন্দর্যের অভাব আছে।” তা বলে সেটাই কিন্তু শেষ কথা নয়। সক্রেটিস আরো একরকমের প্রেমের কথা বলেন।

—“কিন্তু প্রেমে-পড়া-বলে এক ধরনের প্রণয় আছে যা কেবলই সুন্দরকে লাভ করতে চেয়েই তৃপ্ত নয়, সে চায় সুন্দরকে জন্ম দিতেও। সে চায় সুন্দরকে সৃষ্টি করতে। চায় অবিনশ্বরতা। পাখি যে তার জুড়িটিকে ভালোবাসে, ডিমে তা দিয়ে শাবকের জন্ম দেয়, সেও চায় অনিঃশেষ হতে। তবে হ্যাঁ, দুটি সৃষ্টিশীল মন যখন একত্র মিলিত হবে, তখন তাদের উচিত জৈব প্রণালীতে নশ্বর প্রাণ সৃষ্টি করা নয়, তাদের উচিত উচ্চ আদর্শের জন্ম দেওয়া, উচিত যুগ্ম মননশীলতার, যুগল চিন্তার ফসল ফলানো, যা চিরকালের। যার বিনাশ নেই, যা থেকে যাবে মানুষের অনন্ত ঐশ্বর্য হয়ে। বাইরের রূপ নয়, নশ্বর রূপ নয়, প্রেমের দৃষ্টি দেখতে পাবে অন্তরাত্মার গোপন সৌন্দর্য ভাণ্ডার, জন্ম দেবে সত্যের। আর হয়ে উঠবে ঈশ্বরের বন্ধু।”

হ্যাঁ, সক্রেটিস প্রেম বলেন তাকেই। প্রকৃতপক্ষে এই সক্রেটিক প্রণয়। যা প্রাকৃতিক জৈব প্রণয়ের ঊর্ধ্বে, মানুষের আত্মিক মিলনের সেই জয়গান।

প্রেম বিষয়ে লিখছি শুনে এক সদ্য তরুণী তাঁর অধীর ভুরু আকাশে তুলে বললেন—“ও; বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করা হয় সত্যি এই একটা তুচ্ছ হ্যাকনীড বিষয় নিয়ে। লেখবার ওতে আছেটা কী?”—আর সদ্য মৃত্যুর দোর থেকে ফিরে আসা আমাদের কবি-দাদাটি বললেন— “এই প্রেম-ব্যাপারটা বুঝলি, যতই বয়েস হচ্ছে ততই এর প্রকৃতিটা টের পাচ্ছি। এই যে আজকের সকালটা—এত চমৎকার একটা সকাল হয়েছিল, এমন তীব্র, গাঢ় একটা ভালো-লাগা সৃষ্টি করেছিল, আমার তো মনে হল না নারী পুরুষের প্রেমের অনুভূতির তীব্রতা তার চেয়ে প্রগাঢ়—” একটু থেমে অন্যমনস্ক চোখে, যেন আপন মনেই বললেন “কেবল হরফগুলো পালটে পালটে যায়, বুঝলি? আমাদের ছেলেবয়েসে পত্রিকাতে একটা খেলা থাকতো—সাদাকে কালো করো—চৌখুপ্পিকাটা ঘর আছে তার ভেতরে একটা একটা করে হরফ পালটে সাদাকে কালো করতে হবে। সাদা থেকে কাদা। কাদা থেকে কালা। কালা থেকে কালো। ব্যাস তিনবারের বারে সাদাটা কালো হয়ে গেল। প্রেমও বোধহয় এমনি ধারা একটু একটু করে পালটে যায় রে—” কবি কবির যোগ্য মন্তব্যই করেছেন। কিন্তু তরুণী?

হ্যাঁ, তিনিও। প্রেম নিয়ে বাড়াবাড়ি করায় এ-যুগ বিশ্বাসী নয়। প্রেম আছে, আছে। প্রেম যায় যাবে। প্রেম হলে, হবে। না হয়, নাই হবে। তখন প্রেম করলেই হবে। এ যুগের প্রেমটা ঠিক আমাদের প্রেমের মতো নয়, সেটা বুঝতে পারি। তবে এর স্বভাবচরিত্রটা ঠিক ধরতে পারি না। বিদেশেরটা বুঝি। তাদের পশ্চিমী সমাজের যা মূল্যবোধ, যা ধ্যানধারণা, লৌকিক আচারকানুন, সেই মতেই তারা চলে, তাদের প্রেম প্রণয় চলে, তাদের লিভিং টুগেদার। ট্রায়াল ম্যারেজ, সব চলে। আমাদের তরুণ তরুণীরা পড়েছে দু নৌকোয়। একদিকে ইংরিজি শিক্ষা, বিদেশী সিনেমা, খবরের কাগজ, পত্রপত্রিকা, অন্যদিকে ঠাকুমা-পিসিমা-জ্যাঠামণি, দুর্গাপুজো, মহরম্ আর অন্তরীক্ষে বোম্বের হিন্দি ছবির রূপকথা। বল্ মা তারা দাঁড়াই কোথায়? “মিল্স এন্ড বুন্‌স” পড়ে প্রেমের ধারণা তৈরি করছে বলরাম বসুর লেনের মেয়েটি, (ছেলেরা আরেক কাঠি, তারা প্রেমের ধারণা তৈরি করছে পর্ণোগ্রাফি পড়ে, ব্লু ফিল্ম দেখে), সেটা সে প্রয়োগ করবে কোথায়? প্রেম যে বড়োই টাইমবাউন্ড কালচারবাউন্ড ব্যাপার। সম্পূর্ণ দেশকাল নির্ভর একটা জিনিস চিরটাকাল লোক ঠকিয়ে শাশ্বত চিরন্তন, এইসব শব্দগুলোর মালিকানা স্বত্ব ভোগ করে এলো। যুগে যুগে প্রেম সাজবদল করে দিক-বদল করে। যা ইতিহাস-ভূগোল দুটোর ওপরেই নির্ভরশীল নয়, শারীরতত্ত্বের ওপরেও, সে জিনিসকে নশ্বর না বলে কবিরা অবিনশ্বর কেন যে বলে এসেছেন! ইতিহাসের লিনিয়ার তত্ত্বের ওপরেও আমি ক্রমশই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছি, যেন চক্রবৎ ফিরে আসছে মানুষের অভিজ্ঞতার মালা। ছোটখাটো তফাৎ এই যে কুন্তীর কোলেই হয় তো আজ কর্ণ বড়ো হবেন, যদি পশ্চিমে জন্মান, নয় তো জন্মাবেনই না (আরেকটা সম্ভাবনা ডাস্টবিনে যাবার)। ভারতবর্ষে কি ‘প্রেম’ ছিল না? পশ্চিমী আমদানি? ভারতবর্ষে নাকি যা ছিল তা কাম। স্বেদকম্প ইত্যাদি অষ্টবিধ অবস্থাই তো শরীরের বর্ণনা, মন কোথায়? ও তো কামজ্বর। ‘ব্ৰহ্মস্বাদসহোদরা’ যে অনন্য অভিজ্ঞতা সেটা কি তবে দুরন্ত জৈবমিলনের চরম মুহূর্তটি? ‘প্রেম’ কি তবে সেই ক’টি তীব্র সেকেন্ডের জন্য সাধনা? কল্পনায় তারই স্বাদগ্রহণ এবং ঘটে যাবার পরে একান্তে সেই স্মৃতি কণ্ডূয়নের নামই প্রেম? পুনরপিস্মরণে তারই আস্বাদন পুনরপি প্রতীক্ষা? মাত্র এই? যেমন দেখেছি মেঘদূত? যেমন আছে অভিজ্ঞানশকুন্তলায়? মানতে ইচ্ছে করে না। এখানে আমরা যেন সেই শশীর মতো ভুল করে ফেলছি। “শরীর শরীর, তোমার মন নাই কুসুম?”—কুসুমের মনের ভাষাটাই ছিল শরীর। শশী পড়তে পারেনি। ইংরিজি শিক্ষিত চোখ নিয়ে আমরাও বোধহয় সংস্কৃত সাহিত্যের প্রেমের ভাষাটা আর পড়তে পারি না।

প্রেমের ভাষা পড়া কি সোজা কাজ? বেচারী কবি অভিদ ওই কর্মটি করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত রোম থেকে নির্বাসিত হয়েছিলেন। অভিদকে কাতুল্লুসের মতো মহান প্রেমিক বলা শক্ত যদিও তিনি প্রেম নিয়ে প্রচুর লেখালিখি করেছেন। প্রেমিকা করিন্নাকে নিয়ে “প্রেম” এবং রোমাকদের জন্য “প্রেমের শিল্প” লিখে (শেষকালে “প্রেমের প্রতিষেধক” পর্যন্ত লিখেছিলেন) প্রেম বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন। “মেটামরফসিসে”ও প্রচুর প্রেমকাহিনী রয়েছে, বিচিত্র জাতের। অভিদ, মধ্যযুগের ইওরোপে যাবতীয় প্রেমের রেফারেন্স হয়ে উঠেছিলেন, অথচ তাঁর প্রেম বর্ণনা বড়ই ভয়ানক। “প্রেমের শিল্পে” যে প্রেম, তাতে অবক্ষয়ী রোমক অভিজাত শ্রেণীর সামাজিক চেহারা, তাদের রুচি প্রকৃতি ধরা পড়েছে। তাতে আছে হয় প্রেমকে শ্লেষ, ব্যঙ্গ বিদ্রূপ, নয়তো শরীরী প্রণয়ের উত্তেজনা। নীতির সবরকম বাধাবন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে অভিদ যেভাবে তাঁর সমকালীন শহুরে প্রণয়ের চিত্র এঁকেছেন তাতে এক স্তরের ফ্যাশানেবল রোমক নাগরিক খুব আহ্লাদ পেলেও সব মানুষ সুখী হতে পারেনি, সুখী হননি সম্রাট অগাস্টাসও। রাজকুমারী জুলিয়ার যথেচ্ছ বিহারের কল্যাণে রোম যেন যৌন অনাচারের মুক্তাঞ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘প্রেম’ বলতে তখন বোঝাতো কেবলই ‘যৌনতা’। আজকের পাশ্চাত্য সমাজ আরো একবার যেন সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছে। আবেগশূন্য, হৃদয়হীন, সেন্টিমেন্টের ধার-না-ধারা শরীরী প্রণয়ের “শিল্পে” একটা আশ্চর্য কঠোর অবক্ষয়ের ছাপ ছিল যা অগাস্টাসের সয়নি। যিনি জুলিয়া ও তাঁর প্রেমের সাঙ্গোপাঙ্গকে নির্বাসিত করলেন, নির্বাসন দিলেন অভিদকেও।

‘প্রেম’ ব্যাপারটি ইয়োরোপে বহুকাল প্রধানত ধনী, নাগরিক সম্প্রদায়ের একচেটিয়া হয়েই ছিল অন্তত সাহিত্যক্ষেত্রে। গয়লানী, রাখালিনীরাও আসতো শুধু অভিজাতদের প্রেমপাত্রী হিসেবেই। অভিদের প্রণয়িনী করিন্না বোধহয় লিবার্তিন সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন, সেজন্যও অভিদের সমালোচনা হয়েছিল।

কবির প্রেমিকা হবেন উচ্চশ্রেণীর। তবে তো প্রেমটা হবে উচ্চাঙ্গের? বোদলেয়ারের মতো প্রেমিকা বাছলে চলবে কেন, প্রেমিকা বাছতে হবে দান্তের মতো, পেত্রাকার মতো।

দান্তে লিখেছিলেন বিয়াত্রিচেকে ভালোবেসে তাঁর “নবজীবনের” কবিতাগুচ্ছ। দান্তের পরে পেত্রার্কা লরাকে নিয়ে প্রায় তিন শো সনেট লিখে ফেললেন তাঁর “গানের বই”-তে। এঁদের বিয়ে করার প্রশ্ন ছিল না, এঁরা ছিলেন অপরের নারী। দুজনেরই মৃত্যু ঘটেছিলো অল্পবয়সে—তা যদি নাও ঘটতো, কবিদের জীবনে তাঁদের সঙ্গে মিলনের আশা ছিল না। তাঁদের ভালোবাসার মধ্যেও সেই মধ্যযুগীয় উচ্চাঙ্গ প্রেমের সভাসুন্দর প্রণয়ের প্রভাব ছিল, সেই সঙ্গে ছায়া পড়েছিল অনাগত রেনেসাঁস যুগের মুক্ত মানবিক চিন্তার। তাই “দিভিনা কমেদিয়া”তে বিয়াত্রিচে কবিকে দেখা দেন নরকের দ্বার হয়ে নয়, স্বর্গের পথনির্দেশিকা হয়ে। পরকীয়া প্রেমই এখানে পবিত্র দীপশিখার মতো মানবাত্মাকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছে। লরার মৃত্যুর পর লরাকেও পেত্রার্কা এই ভূমিকা দেন—এমনকি একদার প্রণয়িনী ফিয়ামেত্তাকে বোকাচ্চিও পর্যন্ত এইভাবে আধ্যাত্মিক প্রণয়িনী করে তুলেছেন তাঁর লেখা সনেটে। নারী আর নরকের দ্বার নয়।

অথচ তার শ’দুই বছর আগেই আবেলার এবং এলোয়িজের অসহায় উদ্দাম প্রণয়কাহিনীর সেই প্রসিদ্ধ ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। আবেলার ছিলেন প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিত, অদ্বিতীয় জ্ঞানীগুণী মানুষ। সর্বজনশ্রদ্ধেয়। তিনি গোপনে প্রেমে পড়ে গেলেন তাঁরই আশ্রয়দাতার ভাইঝি এবং তাঁর ছাত্রী সুন্দরী শ্রীমতী এলোয়িজের। প্রেম তাঁদের দুজনের জীবনকেই অর্থপূর্ণ, ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তুললো। এই ভালোবাসার ফসল হয়ে এলোয়িজের একটি পুত্র সন্তান জন্মালো। আবেলার তখন এলোয়িজকে বিবাহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, শিশুটি যাতে যথার্থ পিতৃপরিচয় পায়। এলোয়িজ নানাভাবে বাধা দিলেন, তিনি লিখেছিলেন আবেলারকে—“তোমার রক্ষিত হয়ে বাঁচাই আমার কাম্য, মহামান্য সম্রাটের পত্নী হওয়ার চেয়েও।” এই প্রণয়ের ফলে এলোয়িজ শেষ পর্যন্ত প্যারিসের বাইরে আবেলারেরই প্রতিষ্ঠিত একটি মঠের অধ্যক্ষা হয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। কিন্তু আবেলারকে ধরে গুণ্ডা লাগিয়ে নির্দয়ভাবে নপুংসক করে দিয়েছিলেন এলোয়িজের খুড়োমশাই—এলোয়িজকে সন্ন্যাস নিতে উদ্বুদ্ধ করার দোষে। ওদিকে আবেলারের পতন হয়েছে বলে ধরে নিয়েছিল চার্চ—তিনি বিবাহ করেছিলেন বলে। কেন? এই তো পোপই তো আছেন—তিনি কি বিয়ে করেন? কেবলই “ভাগ্নে’ “ভাগ্নীর” জন্ম দেন। তেমনি করতে পারতেন তো আবেলার? বিবাহ করে চার্চের মুখে চুনকালি না দিয়ে! নারীই নরকের দ্বার!—

এলোয়িজ-আবেলারের প্রণয় আজ কিংবদন্তী বটে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস। কিন্তু ত্ৰিস্তান আর ইসোল্দির গল্প ইতিহাস কি না জানা যায় না, আয়ারল্যান্ডের রাজকন্যা আর ইংলন্ডের এক রাজকুমারের এই চিরবিরহী ব্যভিচারী প্রেমের গাথা মধ্যযুগীয় ইওরোপে সবচেয়ে পরিচিত সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেমকাহিনী ছিল। এদের প্রেম তখনই কিংবদন্তী। দ্বাদশ শতক থেকেই প্রেমের কবিতায় ত্রিস্তানের উল্লেখ পাওয়া যায় ফ্রান্সে, ইতালিতে, জর্মানিতে। ক্ৰবাদুর কবিরাও তাঁর কথা বলেছেন মিনেসাঙ কবিও। এক মিনেসাঙ কবি তো বলছেন “আমার প্রেম ত্রিস্তানের চেয়েও মূল্যবান কেননা তাঁর একনিষ্ঠতার মূলে ছিল বশীকরণের মন্ত্রঃপূত জাদু-সরবৎ। আমার কোনো তুক্তাক্ নেই, আছে বিশুদ্ধ ভালোবাসার জাদু।” ত্রিস্তান ছিলেন রাজা মার্ক-এর ভাগ্নে; ইসোল্দি মার্ক-এর রাণী। স্বামী-স্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট বশীকরণ-সরবৎ ইসোল্দির ধাত্রী ভুলবশত (নাকি ইচ্ছে করেই?) তরুণ ত্ৰিস্তান আর ইসোল্দিকে পান করিয়ে তাদের অচ্ছেদ্য প্রেমবন্ধনে বেঁধে ফেলেছিল। এদের প্রেমের মর্মন্তুদ কাহিনী বিশ্বে কারুর অবিদিত নেই। এদেশে তুলনীয় বোধহয় লায়লা-মজনুর কি হীর-রনঝার গল্প।

ত্রুবাদুর আর মিনেসাঙ কবিরা দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রভঁস এলাকায় আর জর্মানিতে সভা থেকে সভাতে প্রেম নিবেদনের গান গেয়ে বেড়াতেন বীন বাজিয়ে। ক্রবাদুরের সময়টা বারো শতক—মিনেসাঙ তেরো পর্যন্ত চলেছে—সারা ইওরোপের প্রধান রাজারাজড়ারা তখন ক্রুসেডের ধর্মযুদ্ধে দেশান্তরী। সভায় বসেন প্রধানত রাণীরাই। ফলে কবিরা গাইতেন রাণীদের স্তুতি, পরকীয়া প্রণয়ের কাব্যে। রাণী এলেনরের প্রশ্রয়ে এই ধারার আরম্ভ। তাঁর কন্যাও অনেক কবিকে উৎসাহ দিয়েছেন। প্রভু এবং তাঁর নিম্নস্থ রাজন্যদের মধ্যে যে সম্পর্কটি ছিল কবিরা তাঁদের রাণী প্রণয়িনীদের সঙ্গে সেই রকমই একটি আনুগত্যের সম্পর্ক স্বীকার করে নিতেন। প্রেমিকাকে বসাতেন দেবীর মতো বেদীতে, পদমূলে কবিরা নিবেদন করতেন প্রণয়ার্ঘ।

এই সময়েই ‘কোর্টলিলাভ’/সভাসুন্দর প্রণয়ের রমরমা। শিবঠাকুরের আপন দেশের মতো তার ছিল নানা সর্বদেশে আইনকানুন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শাপল্যাঁ তো আস্ত একটা শাস্ত্রই লিখে ফেললেন (দে আর্তে অনেস্তে আমান্‌দি) সভাসুন্দর প্রণয়ের নিয়মকানুন। কিন্তু প্রেমকলার শাস্ত্র, কাম-কলার নয়। এর প্রভুত্ব করে দেহ নয়, মন। বাৎস্যায়নের সঙ্গে শাপল্যাঁর তুলনা চলে না।

প্রভঁসাল কবিদের যে প্রণয়াদর্শ তার সবটাই বিশুদ্ধ পাশ্চাত্য ঐতিহ্য নয়, তাতে মিশে গিয়েছিল মধ্য এশিয়ার ইসলামধর্মের প্রেমতত্ত্বের ছোঁয়াচ—আরবি-ফারসি সাহিত্যের প্রেমের তত্ত্ব, যে-প্রণয় চিরবিরহী, যেখানে জীব আর স্রষ্টার চিরঅতৃপ্ত আসঙ্গলিপ্সার ছায়া। মৃত্যু আর প্রেম যেখানে অঙ্গাঙ্গী। যার শেষে মিলন নেই, শুধু তৃষ্ণা আছে। অনেক পরে জর্মনিতে এই ‘প্রেম-মৃত্যু’র প্রেমতত্ত্বই মহীরুহ হয়ে উঠেছিল।

সভাসুন্দর প্রেমের নানা নিয়মের দু-একটা এখানে বলি; চারটে লক্ষণ এতে থাকতেই হবে : আহ্লাদ, যৌবন, যোগ্যতা এবং মাৎসর্য। শেষোক্তটি থাকবে প্রেমিকার, স্বামীর, বাকি তিনটি প্রেমিকের। এই যোগ্যতা বস্তুটি খুব রহস্যময়, কিন্তু প্রবল পরাক্রম। “অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়” শুদ্ধ ভালোবাসার ক্ষমতাই ওই যোগ্যতা এনে দেয়। আর যা যা হতেই হবে: প্রেমিক হবেন উচ্চবর্গের। এবং প্রেম কদাচ বিবাহে শেষ হবে না অতএব তাঁকে কুমারী বা বিধবা হলে চলবে না, তাকে হতেই হবে পরকীয়া। এবং যেহেতু পরকীয়া, খুবই জরুরী হচ্ছে তাঁর নামটি গোপনে রাখা। প্রেমটা মিলনাত্মক হলে চলবে না বটে, কিন্তু তা বলে শরীরী আশা আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে না এমন নয়। ক্রবাদুর, মিনেসাঙ কবিতায় কামনার রং বিদ্যাপতির মতোই তীব্র। শুনেছি “ত্রুবাদুর” শব্দে নাকি আরবি “তরব্”-এর প্রতিধ্বনি আছে, “তরব্” হচ্ছে প্রণয়ের উত্তেজনা। (আরবি জানি না, ভাবছি “তরব্” থেকেই কি “তড়পানো’? “তড়প্‌রহা হ্যায় দিল তো ক্যা?”) শাপল্যাঁ এরই ওপর ভর করে প্রেমশাস্ত্রটি রচনা করেন।

শাপল্যাঁর সেই সভায় শোভনপ্রণয়বিধির পুস্তকে নানা বিচিত্র তালিকা আছে। আমি বেছে বেছে কয়েকটি মোক্ষম বাণী তুলে দিচ্ছি—বলা তো যায় না, কখন্‌ কার কী কাজে লেগে যায়! প্ৰেমশাস্ত্রের বিধিবিধান

 ১। লোভ হইতে পলায়ন করিবে। প্রেম লোভের পাড়ায় পদার্পণ করে না।

 ২। কৃত্রিমতার আশ্রয় লইও না।

 ৩। প্রেমিক যুগলের গোপনকথা কদাচ প্রকাশ করিয়া দিও না।

 ৪। যে নারীটিকে একদা প্রেমনিবেদন করিতে সংকোচ বোধ করিয়াছিলে তাহারই নিকট পুনরপি প্রণয় যাচঞা করিতে যাইও না।

 ৫। প্রেমের আনন্দ দিবার ও লইবার সময়েও সর্বদা সৌকর্য, সৌজন্য ও শালীনতাবোধ বিস্মৃত হইও না।

 ৬। প্রেমের আনন্দ দিবার সময়ে প্রেমিকার বাসনার প্রতি নজর রাখিতে ভুলিও না।

 ৭। বিবাহ হইয়া গিয়াছে, ইহা প্রেমের বিরুদ্ধে কোনোই যুক্তি নহে।

 ৮ যাহার ঈর্ষা নাই তাহার প্রেমও নাই।

 ৯। কদাচ একযোগে দুটি প্রেম করিবে না।

১০। প্রেম সর্বদাই হয় বৃদ্ধি পায়, নতুবা হ্রাস পায়।

১১। কৈশোর উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে পুরুষের প্রেম করা নিষিদ্ধ।

১২। তেমন নারীর সহিত প্রেম করিবে না যাহাকে স্ত্রী করিতে তোমার লজ্জা করিত!

১৩। যাহার প্রেমের আড়ম্বর যত বেশি তাহার প্রেম ততই অল্প।

১৪। যদি কোনো নারীর প্রেমে দুইজন পুরুষ পড়েন, অথবা কোনো পুরুষের প্রেমে দুইজন নারী—তাহাতে জগতে কেহই বাধা দিতে পারে না!

১৫। সহজেই যাহাকে জয় করা যায় তাহার মূল্য নাই। সেই ক্ষেত্রেই প্রেমের মূল্য আছে যাহাকে জয় করা কঠিন।

১৬। পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়িয়া যায় নব প্রেমজালে।

১৭। জানাজানি হইয়া গেলে প্রেম টেকে না, অতএব গোপনীয়তা অত্যাবশ্যক।

১৮। প্রেমের পাত্রপাত্রীর মৃত্যু হইলে অন্তত দুই বৎসর অপেক্ষা করিবে। তাহার পর নবীন প্রেম করিতে পার।

বলতে নেই কথাগুলো কিন্তু বুকের মধ্যে আজও ধাক্কা দেয় (হাসলে কি হবে।)।

মধ্যযুগীয় লাতিন প্রেমের কবিতাতেই চাঁদের দু’পিঠ দেখা গেছে। প্রেমগাথার পবিত্র আর অপবিত্র দিক (দ সেক্রেড এবং দ প্রোফেন)। একপিঠে ধর্মলীলা অন্য পিঠে নর্মলীলা। দুভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়, যেমন রাধাকৃষ্ণের ভক্তিগীতিকা। যেমন পূজা ও প্রেম।

রেনেসাঁসের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পে সাহিত্যেও এসে পড়লো অর্থনৈতিক সামাজিক দার্শনিক নবজাগরণের প্রবল ছাপ, নশ্বর সময় হঠাৎ উঠলো দামী হয়ে, নশ্বর শরীরও পেলো তার মূল্য। অতএব ভিয়োঁ বললেন, কোথায় গেল গত বছরের তুষার স্তূপ প্রশ্ন কোর না, উত্তরে ঐ প্রশ্নেরই প্রতিধ্বনি ফিরে আসবে। রঁসার বললেন বরং বোঁটায় থাকতে থাকতেই এসো আমরা তুলে নিই ওই আধো-ফোটা কুঁড়ি, তার রূপে সৌরভে ভরে নিই বুক, কালই ও গোলাপ ধুলোতে তার পাপড়ি ঝরাবে। ওঠো, জাগো, ঘুমিও না প্রিয়তমা, সময় চলে যাচ্ছে।

ভিয়োঁ, রঁসার, স্পেনসর, সারে—সকলের সেই একই তাগাদা। “জীবনের পরম লগন কোর না হেলা হে গরবিনি!” রেনেসাঁসের সকল কবিরই কণ্ঠে সেই এক প্রার্থনা—“আজিকার দিন না ফুরাতে/ হবে মোর এ আশা পুরাতে/ শুধু এবারের মতো/ বসন্তের ফুল যতো/ যাবো মোরা দুজনে কুড়াতে!”—বড়ই সংকীর্ণ নশ্বর মানুষের সময়। আরো সংকীর্ণ প্রেমের সময়। কিন্তু শিল্পের সময় নিরবধি। একমাত্র শিল্পই পারে প্রেমকে অবিনশ্বর করতে। পারেন কবি পারেন শিল্পী। দান্তে, পেত্রার্কা, বোকাচ্চিওর মতোই রঁসার তাঁর তিন প্রেমিকাকেই অমরত্ব দিয়েছেন তাঁর কবিতায়। ‘আমোরেত্তি’ সনেটগুচ্ছ লিখে স্পেনসর অমর করে গেছেন এলিজাবেথ বয়েডকে। এখানে বিশেষ লক্ষণীয় এই যে এঁকে তিনি বিবাহও করেছিলেন, জানি না তার পরেও তাদের প্রণয় কেমন ছিল। আমার মা নিজে কবি, বিয়ে করেছিলেন ভালোবেসে আর এক কবিকে। দৃশ্যত তো বাবার জীবনের শেষদিন অবধি দুজনের ভালোবাসার ঘাটতি দেখিনি। অথচ মা সবাইকে বলেন, “যদি কাউকে ভালোবাসো, আর সেই দামী ভালোবাসাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাও তবে তাকে যেন খবদ্দার বিয়ে করে বোসো না!” (কী অন্যায় কথা? তবে যাকে বিয়ে করবো, তাকে কি ভালোবাসবো না?) মায়ের মতে, রোমান্টিক প্রেমে খানিকটা রহস্য চাই, খানিক কুয়াশা, খানিক দূরত্ব। স্বপ্নমদির নেশায় মেশা উন্মত্ততা নইলে বজায় থাকে না, ক্লান্তি আসেই। বিয়ে এই ক্লান্তি আনতে সবচেয়ে পারদর্শী। প্রেমে কিছুটা না-পাওয়া না-থাকলে পেতে-চাওয়াটা আসবে কোথা থেকে?

তাই তো রাধাকৃষ্ণ প্রেমের আদর্শ, শিব এবং সতী নন। যদিও সতী-শিবের দক্ষযজ্ঞের কাহিনীর মতো উদ্দাম, উত্তাল, একনিষ্ঠ প্রেমের গল্প দেবদেবীদের মধ্যে ভেবে পাওয়া কঠিন। তাই কৃষ্ণের মতো স্বামী কোনো নারীই চায় না, চায় শিবের মতো বর–শ্রীরাধার মতো স্ত্রীও কোনো সংসারে কাম্য নয়। তাঁরা স্বামী স্ত্রীর আদর্শ নন, প্রেমিক-প্রেমিকার আদর্শ। তবে কি স্বামী-স্ত্রী প্রেমিক-প্রেমিকা হতে পারে না? কোথাও একটা বিরোধ রয়ে যাচ্ছে? আমার বন্ধুবান্ধবদের দেখে যা বুঝেছি, স্বামীরা প্রেমিক অবশ্যই হতে রাজি, তবে নিজের স্ত্রীর নয়। স্ত্রীর প্রেমিকের ভূমিকায় তাঁরা নিজেদের ভাবতেই পারেন না। অথচ স্ত্রীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামীকে প্রেমিকের ভূমিকাতে কল্পনা করেন, এবং বুঝতেই পারেন না কেন স্বামী কিছুতেই প্রেমিকের মতো আচরণ করছেন না? ওদিকে স্বামীও বোঝেন না স্ত্রীর অভিযোগটা কিসের? তাঁর অভাবটা কোথায়? স্নেহ-ভালবাসা, আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তা, সন্তান, সবই তো দিচ্ছি। অভাবটা যে যগ্ডুমুরের ফুলের, অভাব যে আলোকলতার মূলের—যা চোখে দেখা যায় না, তার। সেটা বলবে কে?

অথচ বিবাহিত প্রেমই সুন্দর হয়ে ওঠে বার্ধক্যে। যখন বাইরের অবলম্বনগুলো ঘুচে যায়, পুরুষ তখন শিশুর মতো এসে আশ্রয় নেয় ঘরের মানুষটির কাছেই। শেষ অবধি পুরুষ, সে যতই মননশীল দুর্ধর্ষ দার্শনিক হোক না কেন, নারীর কাছে আত্মিক আশ্রয় খোঁজে। মৃত্যুর আগে অশীতিপর দৃষ্টিহীন বোরহেস আইবুড়ো নাম খণ্ডন করে বিবাহ করে গেলেন তাঁর সহকারিণী অর্ধেক বয়সী সেক্রেটারি মারিয়াকে। অস্তিত্ববাদী সার্ত্র বিবাহ করলেন না সিমোন দ বোভোয়ারকে, এদিক ওদিক প্রেম করে বেড়ালেন সারা জীবন, শেষ জীবনে সেই সিমোনের সেবাই তাঁর জরাগ্রস্ত মুহূর্তগুলির আশ্রয় ছিল। প্রেম-পিপাসিত ছিলেন এঁরা সকলেই? সিমোনেরও এদিক-ওদিকে প্রণয় হয়েছে, সার্ত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কিন্তু অখণ্ডই থেকে গেছে। “টিল ডেথ ডু আস পার্ট” প্রতিজ্ঞা কি এর চেয়ে আলাদা হতো?

রু সাঁ দনিতে প্রতি সন্ধ্যায় কামু স্ত্রীসঙ্গের খোঁজে ঘুরে বেড়াতেন, অথচ মাদাম কামুর তাঁর স্বামীকে নিয়ে কোনোই অভিযোগ ছিল না। কী চাইতেন কামু? কেন চারবার বিবাহ করতে হয়েছিল বার্ট্রান্ড রাসেলকে? কিংবা চার্লি চ্যাপলিনকে? কেন আটবার এলিজাবেথ টেলর, পাঁচবার রিচার্ড বার্টন? তিন-তিনবার বিয়ে করেছিলেন কেন অভিদ?

কিছু মানুষ আছে জগতে, যারা অন্তরাত্মায় নাবিক প্রকৃতির, কেবলই ঘাট থেকে ঘাটে ঘুরে বেড়িয়েও যাদের আকুল তৃষ্ণা মেটে না। সাধারণত জগৎসংসার তাদের নিন্দে করে, মন্দ বলে, তারা হয়তো দুম্দাম বিয়ে ভেঙে ফ্যালে, ফটাফট বিয়ে করেও ফ্যালে, তাদের নিয়ে সমাজে নানা জট পাকায়, তারাই কিন্তু প্রকৃত রোমান্টিক, তারা বেহিসেবি। তাদেরই বুকের মধ্যে সেই “হেথা নয় অন্য কোথা” নিশি-ডাক নেশার মতো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, তাদের স্থির হতে দেয় না। সংসারী মানুষ এদের মনে করে হৃদয়হীন পাষণ্ড, বা দায়িত্বহীন অপরিণতমনা, কিংবা অগভীর, স্বার্থসন্ধানী। কিন্তু এরাই হয়তো জগতের সবচেয়ে সিরিয়াস প্রেমিক। প্রেমই এদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। এরা প্রণয়ের দাসানুদাস। এলিজাবেথ টেলর এক চিরন্তনী শ্রীরাধা, তাঁর কৃষ্ণটা বদ্লে যায়। প্রেমের আকুলতা বদলায় না।

আরেক দল আছে, যাদের ‘ওয়ানম্যানডগ’-এর স্বজাতি বলা যায়, ‘ওয়ান প্রেম লোক’ তারা। হোলো তো হোলো আমৃত্যু টিকে গেল। আর যদি না টিকলো তবে ব্যাস্। খেল্ খতম। এজন্মের মতো আর হয়ে গেছে যা হবার, জীবনে নতুন প্রেম তাদের নাগাল পায় না। এরা হয় অলস, নয় ভীরু, নয়তো দুটোই। অসাফল্যের ভয়, অপমানের ভয়, আরেকবার নতুন করে একা হয়ে যাবার ভয়। মনে হয় না এরা আমৃত্যু একা থেকে যায় সেই অদ্বিতীয় প্রেমের প্রতি অচলা ভক্তির কারণেই। জীবনে ঝুঁকি নেয় না এরা, ফলে নতুন করে ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয় না। জগতে এদের সংযমী বলে নাম। এদের খুব প্রশংসা। এরা চিরপ্রেমিক। এরা রোম্যান্টিক প্রেমের জ্যান্ত উদাহরণ। আসলে এরাই কিন্তু আনরোম্যান্টিক, চরম প্র্যাকটিক্যাল। রোম্যান্স সব সময়ে ঝুঁকি নেয়। প্রেম কি ঝুঁকি না নিয়ে সম্ভব? নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং প্রেম একসঙ্গে দুটোই চাই বলেই তো বিবাহিত প্রণয়ে এত গোলমাল!

এই যেমন পশ্চিমী সমাজে আজ যতই গে-লিবারেশন, উইমেন্‌স লিব, ফ্রী লাভ ফ্রী সেক্স চালু হোক, যে তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজকে আমরা আজকের যৌনমুক্তি যজ্ঞের হোতা বলে মনে করি এবং মনেপ্রাণে সাহিত্যে সংস্কৃতিতে নকল করতে চেষ্টা করি, সেখানেও কোনো কোনো ‘পকেট’ থেকেই যায়, রক্ষণশীলতার। ক্ষমতার ক্ষেত্রে—বিশেষ করে। —মার্কিন সমাজের পারমিসিভ চরিত্রের মধ্যেও অদ্ভুত একটা দ্বৈত মূল্যবোধ কাজ করে। এমন হিপক্রিটিকাল সমাজ খুব কম আছে। আচরণের সঙ্গে তত্ত্বের মিল নেই। আবেলার-এলোয়িজের যুগ থেকে খুব বেশি এগোয়নি কেনেডি ওনাসিসের যুগ। অথবা গ্যারি হার্টের। প্রতিষ্ঠানকে অসম্মান করে সমাজের মাথায় থাকা চলবে না। তলায় তলায় করলে তত দোষ নেই, যদি না পড়ো ধরা। সমাজে সবাই জানে, লোকে একটু-আধটু ব্যভিচারী প্রণয় করেই থাকে। কিন্তু যদি প্রেসিডেন্ট হতে চাও তবে আরেকটু সাবধানী হতে হবে? জ্যাকি যদি এদিক ওদিক প্রেমপ্রণয় করতেন লোকে মেনে নিত, আহা, মনুষ্যধৰ্ম! কিন্তু বিবাহ? খোলাখুলি পূর্ব-প্রণয়কে অস্বীকার? আবেলারের বেলায় যেমন—বিবাহ? খোলাখুলি চার্চের বুকে শেল?

ধরা যাক ইংলন্ডের রাজবাড়ির আইনকানুন। ও বংশের বউ হতে হলে কৌমার্য পরীক্ষায় পাস করা চাই। রাজা হতে হলে অবিশ্যি সে প্রশ্ন ওঠে না। চার্লসের প্রণয়িনীদের তালিকা কাগজেই বেরিয়েছিল। কিন্তু ডায়ানা ছিলেন কুমারী। রাজপুত্র অ্যানড্রু শ্রীমতী কু স্টার্ককে প্রণয় করেও বিয়ে করতে পারলেন না, তাঁর নগ্নচিত্র পত্র-পত্রিকাতে বেরিয়েছিল বলে। যৌনতা নিয়ে হিপোক্রেসি কি পাশ্চাত্য সমাজে আজও প্রবল। মার্কিন দেশে সম্প্রতি একটি মেয়ের বিশ্বসুন্দরী খেতাব পরে কেড়ে নেওয়া হল, কয়েক বছর আগে তার নগ্নচিত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল বলে। এই তো মুক্ত সমাজ! প্রেমের ক্ষেত্রেও এরই ছায়া স্পষ্ট। দোরোখা মূল্যবোধ। আমরাও তারই অনুসরণ করছি।

স্তঁদাল যখন তাঁর আজকে অনতিপরিচিত “দ্য লামুর” লিখলেন, তাঁর নিজের ভাষাতে—ঠাণ্ডামাথায় প্রেমের, অর্থাৎ আত্মার এই বিচিত্র অসুখটির “বিভিন্ন রোগ লক্ষণের বিষয়ে সুচিন্তিত আলোচনা করতে”—ইওরোপে তখন উনিশ শতকের প্রথম চতুর্থাংশ শেষ হয়ে এসেছে। স্তঁদাল দেখালেন জগতে রয়েছে মোটমাট চারটি জাতের প্রেম। (ক) লামুর পাসিওন (সর্বগ্রাসী প্রণয়, যা যথাসর্বস্ব ভুলিয়ে দেয় যেমন এলোয়িজ-আবেলারের); (খ) লামুর গ্যু (যাকে বলে রুচিশীল প্রণয়, অর্থাৎ ফ্লার্টেশন, লৌকিকতার রীতিনীতি অনুযায়ী কদাচ আত্মহারা হয়ে, বৈঠকখানার প্রেমলীলা); (গ) লামুর দ্য ভানিতে (সামাজিক আত্মশ্লাঘার জন্য যে প্রেম, যা একটা দামী গয়নার মতো লোক দেখানো অহংকার); (ঘ) লামুর ফিজিক্ (জৈব প্রণয়, দেহসর্বস্ব কামপ্রধান প্রণয়পর্ব)। উনিশ শতকের প্যারিসে বসে স্তঁদাল প্রেমরোগের যে চারটি প্রধান ভাগ করেছেন এই বিশ শতকের শেষ পর্বে কলকাতাতেও আমরা সেই চারটি প্রেমের দেখা পাই। ইওরোপ-আমেরিকাতেও এখনও মুছে যায়নি এই চতুর্বর্গ প্রেমের ঐতিহ্য। এত যৌনমুক্তি নারীমুক্তি নানাবিধ মুক্তি আন্দোলনের পরেও রয়ে গেছে প্রবলপরাক্রম “লামুর পাসিওন”—প্রেমের জন্য খুন-খারাপি, আত্মহত্যা, সংসারত্যাগ সবই নিত্য নৈমিত্তিক দুই দেশেই। “লামুর গ্যু” এদেশেও ইঙ্গ-বঙ্গ “পার্টির” সন্ধ্যায় প্রস্ফুটিত হয়। পশ্চিমে তো আছেই, “লামুর দ্য ভানিতে”-র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রচুর প্রচলন হয়েছে, মুখে যে-যাই বলুক, প্রেম এখনও তারুণ্যের স্টেটাস সিম্‌বল। এবং “লামুর ফিজিক” তার রগরগে চেহারায় ঘরে ঘরেই লুকোনো। তার খবর দেবে পরিবার পরিকল্পনার ক্লিনিক, দেবে মার্কিন দেশের ডাস্টবিনে ছ’শো শিশুর পরিত্যক্ত প্রাণ। দেখেশুনে মনে হয় প্লেটো সাহেবই হয়তো ঠিক ভেবেছিলেন। কিংবা সক্রেটিস। পশ্চিমে ওরকমটি ভাবা যায়, সেখানে ভেনাস কামদেবী, তাঁর সন্তান কিউপিড প্রেমের দেবতা। কিন্তু এদেশে ভাগাভাগি হবে কী করে, মদন আর রতি, প্রেম আর কাম যে যুগল। বাক এবং অর্থের মতোই পরস্পর সম্পৃক্ত, অভিন্ন। দেহে আর মনে আমরা ওভাবে লাইন টানি না। ইহজগতে কোন্ মানুষটি আছেন, যিনি সেই ম্যাজিক মলমের নাগাল না চাইবেন, প্রেমের দেবী আফ্রোদিতের দয়ায় লেসবসের খেয়াতরীর মাঝি ফাওন যেটি পেয়েছিলেন; আর যার কল্যাণে লেসবসের প্রতিটি মেয়েরই ফাওনের প্রেমে হাবুডুবু না খেয়ে উপায় ছিল না? কেউ কেউ ওই মন্ত্রটি অন্তরাত্মায় মেখেই জন্ম নেয় আর কেউ বা সারা জীবনের সাধনাতেও তাকে আয়ত্ত করতে পারে না। এ হলো দৈব করুণা। প্রেমের ভাগ্য নিয়ে সবাই আসে না। কিন্তু প্রেমের চেয়ে মদিরতর আর কোন্ অভিজ্ঞতা?

সং অভ্ সলোমনের সেই অসামান্য প্রথম পঙ্ক্তি দুটি স্মরণ করুন—

Let him Kiss me with the Kisses of his mouth./ For thy love is better than wine.

আর প্রেমের চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয় কে? মনে করুন তার পরের দিকের পঙ্ক্তিগুলি—

Set me as a seal upon thine heart/ as a seal upon thinearm;/ for love is strong as death;/ jealousy is cruel as the grave;/ the flashes thereof are flashes of fire, many waters cannot quench love/ neither can the floods drown it.

এই সেই ওলড্ টেস্টামেন্টের সঙ অভ সঙ্স—“সঙ্গীতের সঙ্গীত” যেটি সম্ভবতই জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথের অনেক সুপরিচিত উপমারই উৎসমূল! প্রেমিকের চোখ এখানে অবশ্য পাখির নীড় নয়, পাখিই। দারুচিনিবন আছে, আছে শ্রাবস্তীর কারুকার্যও (his aspect is like Lebanon…his body is as ivory work overlaid with sapphires)। তিন কি চার হাজার খ্রীস্টপূর্বাব্দের এই তীব্র প্রেমগাথা আজও আমাদের সেইভাবেই বিদ্ধ করে—যেভাবে বিদ্ধ করেন এলোয়িজ আর আবেলার, ত্রিস্তান আর ইসোলদি, কচ আর দেবযানী। শকুন্তলা আর দুষ্মন্ত। প্রেম পুরোনো হয় না, এই পুরোনো কথাটাও যে পুরোনো হয়নি। প্রেমের বেশ পালটায়।

কিন্তু প্রেম নিয়ে এত বেশি কথা বলার পরে আমার যে হেডনিস্টদের সেই বিখ্যাত দুমুখো সমস্যার প্রসঙ্গটি মনে পড়ছে। শরীরবাদী দার্শনিকেরা একদিন আবিষ্কার করলেন যে শরীরবাদ নিয়ে অত বেশি ভাবনাচিন্তা করলে শরীরটাকে আর তেমন উপভোগ করা যায় না। ওটা প্রযুক্তিতেই ভালো, তাত্ত্বিকতায় তত ভালো নয়। (আমাদের এমার্জেন্সির অনুশাসনে একেই বোধহয় বলেছিল—“কথা কম, কাজ বেশি”)! প্রেম বিষয়েও আমার সেই এক কথা। এই যে আমি সারা রাত্রি না ঘুমিয়ে প্রেম নিয়ে শুষ্কং কাষ্ঠং গদ্য রচনা লিখলুম, প্রেম নিয়ে কি এর চেয়ে মধুরতর কোনো উপায়ে এই বিনিদ্র রজনীটি কাটানো যেত না। বন্ধু, প্রেমবিষয়ক প্রবন্ধ পড়া যন্ত্রণার জানি। তার চেয়েও যন্ত্রণার প্রেমবিষয়ক প্রবন্ধ লেখা। প্রেম আর প্রবন্ধ পরস্পর বিরোধী। একটি যুক্তি তর্ক ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আরেকটির যুক্তিতেই অস্তিত্ব। আমি তো মনে করি প্রেম নিয়ে এত বলাবলি না করাই মঙ্গল। প্রেমের স্বভাবটা বড়ো সুকুমার, অনেকটা কাসুন্দির মতো, বেশি নাড়াঘাঁটা সয় না, ওতে ঝাঁঝ মরে যায়। প্রেম মানেই মনখারাপ, প্রেম মানেই রক্তঝরা। তবুও তো সেই প্রেমের কাছেই ছুটে যাওয়া। মাথা খুঁড়ে মরা। সে কি গদ্যে হয়?

ভালোবাসা তুমি কেবলই কি গাঢ় দুঃখ?
কেবলই কি নীল জমাট রক্ত ললাটে
ভালোবাসা, তুমি শির-কাটা স্রোত, উষ্ণ
এসো ভালোবাসা, তবুও দাঁড়াও কবাটে।
তবুও তোমারি জন্যে আগল মুক্ত
তবুও তোমারি জন্যে সাজানো শয্যা
এসো ভালোবাসা, কুক্‌রি চালাও শিরাতে
কৃপণের মতো কী হবে জমিয়ে লজ্জা?
ঝরে যাক কিছু উষ্ণতা বড়ো রাস্তায়
নর্দমাক্ত কর্দমাক্ত রক্তে
লেগে থাক্ কিছু প্রামাণ্য শেষ চিহ্ন
তোমারি ত্রস্ত অবিশ্বস্ত ভক্তের!

প্রেম সংখ্যা, ‘দেশ’ ১৯৮৮

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *