সুখের মণি – ওবায়েদ হক

সুখের মণি

ভ্যাপসা গরমে নুরুল হক বিছানায় শুয়ে থাকতে পারছে না, ঘামে বিছানা জবজব করছে। ঘরে হারিকেনের মৃদু আলোয় সবকিছু আবছা দেখা যাচ্ছে। পাশেই তার পাঁচ বছরের ছেলে আমির হোসেন আর বউ লুৎফা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছেলে আর বউকে ঘুমাতে দেখে নুরুল হকের খুব মায়া লাগল। লুৎফার শিথিল হাত থেকে পাখাটা নিয়ে বাতাস করতে লাগল। এই কাজটা সে প্রায়ই করে, ঘুম ভেঙে গেলে উঠে ছেলে আর বউকে বাতাস করে। লুৎফা জেগে থাকলে এই কাজটা কখনোই করতে পারত না সে। পুরুষের মায়া লুকিয়ে রাখার জিনিস, মেয়েরা তা দেখলেই সর্বনাশ, বিয়ের আগে থেকেই আশেপাশের মানুষ এই দীক্ষা দিয়ে আসছে তাকে।

নুরুল হকের বিয়েতে তার মায়ের মত ছিল না। বলেছিল, ‘এত ধলা মাইয়া আনলে পোলার মাথা খাইবো।’

কিন্তু নুরুল হক কানে কানে তার দুলাভাইকে বলেছিল, ‘এই মাইয়া ছাড়া আমি বিয়া করুম না।’

গ্রামের বউ-ঝিরা নতুন বউ দেখতে আসে তার খুঁত বের করার জন্য। নুরুলের বউকে দেখে তারা খুব হতাশ হলো, কী সুন্দর গায়ের রং, টানা টানা চোখ, হাঁটাচলাতেও কোনো সমস্যা নেই। তাই তখন তারা ভবিষ্যদ্বাণী করল, ‘নুরুল সব সময় তার বউয়ের আঁচলের নিচেই থাকবে।’ সবাই মাথা নেড়ে এই কথায় সায় দিলো আর নুরুল হকের মায়ের মন নতুন বউয়ের প্রতি বিষিয়ে উঠল।

নুরুল মায়ের ভর্ৎসনার ভয়ে কোনো সময়ই বউয়ের সাথে মিষ্টি করে কথা বলে না। সবসময়ই তার কথায় ধমকের সুর থাকে, কিন্তু লুৎফা তার স্বামীর এই কাঁচা অভিনয় খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে আর মনে মনে হাসে।

প্রথম প্রথম গঞ্জে গেলে প্রায়ই নুরুল লুৎফার জন্য চুলের ফিতা, কপালের টিপ, আলতা, পাউডার—এসব নিয়ে আসত। রাতের বেলা নুরুলের মা ঘুমিয়ে গেলে বের করে লুৎফার কাছে দিয়ে বলত, ‘গঞ্জে গেছিলাম, ছাদেক ভাইয়ের দোকানের সামনে দিয়া যাইতেছিলাম, জোর কইরা দিয়া দিলো।’

লুৎফা আঁচলে মুখ ঢেকে হাসত আর বলত, ‘ছাদেক ভাই এমনেই দিয়া দিলো?’

নুরুল বিরক্তির ভাব ধরে বলল, ‘কেমনে দিয়া দিলো সেইটা তোমার জানোনের কাম নাই, অহন যাও চুলে ফিতাটা পইরা আসো দেখি।’

লুৎফা আঁচলের কোনাটা ঠোঁট দিয়ে কামড়ে মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানায়। বউয়ের এই ধৃষ্টতায় নুরুলের খুব রেগে ওঠা উচিত ছিল, কিন্তু সে রাগতে পারে না, তার বউয়ের ওপর তো একেবারে না।

গলার স্বর একটু নামিয়ে একটু অনুরোধের সুরে বলে, ‘পরো না!’

লুৎফা আবার মাথা নাড়ায়, নুরুল হতাশ হয়ে বসে থাকে। কিন্তু একটু পরে লুৎফা চোখে কাজল লাগিয়ে, নতুন লাল শাড়ি পরে, মাথায় রঙিন ফিতা বেঁধে নুরুলের সামনে আসে। নুরুলের বুকটা ধ্বক করে ওঠে, মায়ায় বুকটা ভরে যায়। অনেক চেষ্টা করেও সে মায়া লুকাতে পারে না। আবেগে বলে ওঠে, ‘বউ, আমার কাছে আইসা বসো।’

লুৎফা আবার মুখে আঁচল দিয়ে মাথা নাড়ায়।

সংসারের ভারে আর অযত্নের কারণে লুৎফার গায়ের রং এখন একটু মলিন। কিন্তু কারো প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই। শাশুড়ি মারা যাওয়ার আগে দুই বছর শয্যাশায়ী ছিল, লুৎফা এই দুই বছর অমানুষিক পরিশ্রম করেছে, কিন্তু শাশুড়ির যত্নে কোনো অবহেলা করেনি। নুরুলের মা মারা যাওয়ার আগে নুরুলকে ডাকেননি, ডেকেছেন লুৎফাকে। লুৎফার হাত ধরে বেশি কিছু বলতে পারেননি, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল আর মুখে শুধু ‘মা মা’ বলে ডেকেছেন।

নুরুলের মনটা বিষাদে ছেয়ে যায়, তার এত ভালো বউয়ের জন্য সে একটা নতুন শাড়িও কিনে আনতে পারে না। গত বছর সব ফসল ভেসে গেল বন্যায়, উত্তর দিকের বিলের জমিটা মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে সুলায়মান মিয়ার কাছে। সে টাকা থেকে ফসল করার টাকা আলাদা করে সারা বছরের খোরাকি চালাতে হয়েছে। এই বছর জমি একটা কম তাই ফসলও কম আসবে। সারা বছরের যথেষ্ট খোরাকি হবে কি-না সন্দেহ আছে।

আমির হোসেনকে স্কুলে ভর্তি করাতে চায় লুৎফা, কিন্তু কীভাবে? যেখানে দুই বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা নাই সেখানে স্কুলে পড়ানোর মতো বিলাসিতা তারা কীভাবে করবে? লুৎফা সন্ধ্যার পরেই আমিরকে নিয়ে হারিকেন জ্বালিয়ে আদর্শলিপি খুলে বসে। আমির মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আঙুল আদর্শলিপিতে ঠেকিয়ে সুর করে পড়ে, ‘অ, আ’। মা-ছেলের এই ছোট্ট স্কুলের কার্যক্রম দেখে নুরুলের চোখে পানি চলে আসে। সেই আবেগের অশ্রু ঢেকে রাখতেই সে একটু অন্ধকারে বসে।

লুৎফা জানে না, কিন্তু নুরুল আমিরের পড়ার জন্য আলাদা করে টাকা জমাচ্ছে। নিজের জমির কাজ শেষ করে সে সুলায়মান মিয়ার জমিতে কামলা খাটছে। অসম্ভব ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে সে। সন্ধ্যায় হারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়া বউ যখন তার ছেলের শিক্ষিকা হয়ে যায় তখন নুরুল হক হলুদাভ আলোয় উদ্ভাসিত ছাত্র-শিক্ষিকার মুখের দিকে তৃপ্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তার চোখগুলোও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সব ক্লান্তি নিমিষেই নিঃশেষ হয়ে যায়।

কেরোসিনের অভাবে নিভু নিভু হারিকেনটা আস্তে আস্তে মিইয়ে গিয়ে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে বাঁশের বেড়ার ফাঁক গলে হুড়মুড় করে জ্যোৎস্না ঘরে ঢুকল। নুরুল হকের আজ আর ঘুম আসবে না। আলতো করে সে খাট থেকে নামল, তবুও নড়বড়ে খাটে ক্যাঁচ করে শব্দ করে উঠল। বিয়ের প্রথম প্রথম এই নড়বড়ে খাটের জন্য খুব লজ্জা পেতে হতো তাদের।

আজ পূর্ণিমার রাত নয়, তবুও বাইরে রুপালি আলোর বন্যা হয়েছে। নুরুল সাবধানে কোনো শব্দ না করে দরজা খুলে বাহিরে এসে নিজের ঘরের দিকে তাকাল, চাঁদের আলোয় নিজের ঘরটাকে জবুথবু হয়ে বসে থাকা কোনো বৃদ্ধের মতো দেখাচ্ছে। বর্ষাকালের আগেই ঘরটা নতুন করে বাঁধার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এ বছর আর সম্ভব না। এমন করে কত বছর কেটে গেল, কোনো বছরেই আর ঘর ঠিক করা হয় না। বৃষ্টি শুরু হলে লুৎফা হাঁড়িপাতিল নিয়ে টানাটানি শুরু করে, ঘরের চাল গড়িয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ে হাঁড়িতে।

বাহিরে এসেও যেন গরম কমছে না নুরুলের, খুব হাঁসফাঁস লাগছে। তার যেদিন মনখারাপ থাকে সেদিন এরকম লাগে। আজ তার খুব মনখারাপ।

ঘরের উত্তরদিকে একটা বড় আমগাছ আছে, চাঁদের আলোতে সেটাকে বিশাল কোনো দানবের মতো দেখাচ্ছে। সেই গাছের পিছনে ঝোপঝাড়ে ভরতি, দিনের বেলাও সেখানে কেউ যায় না, সাপখোপের আড্ডাখানা জায়গাটা। কিন্তু সেই গাছের নিচে মৃদু বাতাস সবসময়ই থাকে। নুরুল হক আমগাছের নিচে গিয়ে বসল। গাছে আম ছিল, কিন্তু গ্রামের ছেলেদের কল্যাণে আমগুলো দীর্ঘায়ু পায় না, একেবারে সাফ করে দিয়ে গেছে। কালেভদ্রে দুই-একটা আম পাকার সুযোগ পায়। নুরুল হকের গায়ে একটা গামছা। সে গামছাটা কাঁধে অবহেলায় ফেলে রাখল আর সাথে সাথেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে শীতল স্পর্শ দিয়ে গেল, সাথে পাকা আমের মিষ্টি সুবাসও পেল।

হঠাৎ উজ্জ্বল কিছু চোখে পড়ল তার। ঝোপঝাড়ের পাশে গোলমতন কিছু একটা আলো ছড়াচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখতে গিয়েও গেল না। বুকটা কেঁপে উঠল তার, তাহলে এটাই কি সেই জিনিস? এটাই কি সেই সাত রাজার ধন, সাপের মাথার মণি?

অনেকক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে, কী করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না। মণিটা তুলে দৌড় দিবে কি-না ভাবছে। আস্তে আস্তে মাথা ঠান্ডা করল সে। মাথা ঠান্ডা না করার কারণেই তার দাদা নিজের জীবন দিয়েছিল। দাদির মুখে বহুবার শুনেছে, দাদি প্রতিদিন সন্ধ্যায় কুপি জ্বালিয়ে উঠানে বসে একবার হলেও এই গল্প করত। মাথায় ঘোমটা টেনে বলত, ‘গঞ্জে ডুলা বেইচ্যা লোকটা গেরামে আইতাছিল। সবাই ঘুইরা ক্ষেতের ওপর দিয়া গেল, কিন্তু তোর দাদায় আইলো ঘোষ বাড়ির তেঁতুলগাছের নিচ দিয়া। গেরামের কেউ রাইতের বেলায় হেই তেঁতুলগাছের নিচ দিয়া আওনের সাহস করে না, কিন্তু তিনার আবার সাহস বেশি, ডরভয় নাই। একবার রাইতের বেলা কবরস্থানের তুলা গাছ থেইকা ফুল পাইড়া আনল। আমি কিরা খাওয়াইলাম রাইতের বেলা আর ওইখানে যাইবেন না, হেরপর থেইকা আর যায় নাই। তো হেই তেঁতুলগাছের নিচে দিয়া আওনের সময় দেখল কী জানি চকমক করতাছে, কাছে গিয়া দেখে সাপের মণি। লোকটা কিছু না ভাইবা মণি হাতে তুইলা দিছে দৌড়, আর দুই দিক দিয়া দুই কালা সাপ দিলো ঠ্যাঙে কামড়। বেশি দূর আইতে পারে নাই, ওইখানেই শেষ।’

নুরুল হক প্রতিবার এই গল্প হাঁ হয়ে শুনত, তার আগ্রহ দেখে তার দাদি খুব খুশি হতো। তারপর বলত, ‘সাপের মণি পাইলে দৌড় দিতে নাই, রাইতের বেলা এই মণি আনন যাইতো না, তাইলেই মরণ। মণিঅলা সাপ হইতাছে রাজসাপ, এরা রাইতের বেলা মণি রাইখা খেলাদুলা করে আর ফজরের আজান দিলে মণি লইয়া গর্তে ঢুইকা যায়। ফজরের আজান পর্যন্ত মণি পাহারা দিতে পারলেই আর চিন্তা নাই।’

নুরুল বড় বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে আশেপাশে ভালো করে দেখল, কোনো সাপ নজরে পড়ল না। সে নিজের কাঁধের ময়লা গামছাটাকে মণিটার ওপর ছড়িয়ে দিলো, তারপর একটু ফাঁকা জায়গায় বসল। যাতে সাপ এলে আগে থেকেই দেখতে পায়। আমগাছের একটা মরা ডাল হাতে নিয়ে সে ফজরের আজানের অপেক্ষা করতে লাগল। ডালটা হাতে নিয়েছে নিজে বাঁচার জন্য, সাপ মারার ইচ্ছে তার নেই।

সেই ছোটবেলায় একবার সাপ পিটিয়ে মেরেছিল সে। সুলায়মানকে কামড়াতে যাচ্ছিল সাপটি, তার আগেই সে গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে মেরেছে। সুলায়মান ভয়ে ‘ও বাবাগো’ বলে চিৎকার করছিল।

আজ বিশেষ করে সুলায়মানের সে ভয়ের চিৎকার খুব মনে পড়ছে নুরুলের। আজ সুলায়মান তাকে আড়ালে ডেকে বলেছিল, ‘শোন, ছুডোবেলায় তোর লগে খেলতাম বইলা তুই আমারে তুইতুকারি করছস, এখন তো আর হেই দিন নাই। তুই আমার ক্ষেতে কাম করছস, আমার কামলারা তোর লগে তুই-তুকারি করে, তুইও যদি আমারে তারার সামনে তুই কইরা কস, কয়দিন পরে তো আমার কামলারাও আমারে তুই কওয়া শুরু করব। তুই এখন থেইকা আমারে আপনে কইরা কবি, না পারলে কতা কওনের দরকার নাই। অন্য ক্ষেতে কাম করিছ।’

নুরুল চোয়াল শক্ত করে শুনেছে। ঘাড় শক্ত করার মুরোদ তার নেই।

আদম ব্যবসা করে সুলায়মান মিয়া, কিছু মানুষকে বিদেশ পাঠিয়েছে আর অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে ছেড়েছে। যারা টাকা ফেরত পায়নি তারা প্রায়ই এসে হম্বিতম্বি করত। একবার জনা বিশেক লোক লাঠি নিয়ে তার বাড়ি এলো। এতজন অনাহুত অতিথি দেখে সুলায়মান পালিয়ে নুরুল হকের ঘরে আশ্রয় নিতে এসেছিল। কাকুতি করে বলেছিল, ‘ভাই নুরুল, তুই আমার ধর্মের ভাই, আমারে একটু লুকানের জায়গা দে। আমারে পাইলে ওই জানোয়ারেরা জানে মাইরা ফালাইবো।’

নুরুলের সেই ধর্মের ভাই তার সামনে চেয়ারে বসে টাকা গুনে তার হাতে দিয়ে বলল, ‘দশ ট্যাকা বেশি দিলাম, তোর পোলাটারে কিছু কিন্যা খাওয়াইছ। নাম কী রাখছোস পোলার?’

নুরুল নিতান্ত অনিচ্ছায় কোনোমতে বলল, ‘আমির।’

সুলায়মান মিয়া হেসে উঠল। বলল, ‘নাম জিনিসটা আসলেই আজব। নিশিন্দাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাব বিরাট বড়লোক মানুষ। তিনটা পাকা বাড়ি, একটা রাইস মিল আছে, হের পোলার নাম গরীব উদ্দীন। আর তোর পোলার নাম আমির।’

বলেই আবার গা কাঁপিয়ে হেসে উঠল।

নুরুল হকের শরীরটা জ্বলে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল অতিরিক্ত দশ টাকাসহ পুরো টাকাটা সুলায়মানের মুখে ছুড়ে মারে। কিন্তু তার দারিদ্র্য তাকে সে ক্ষমতা দেয়নি।

গামছা দিয়ে ঢাকার পরও গামছা ভেদ করে আলো ঠিকরে মণিটা চকচক করছে। সেই সাথে নুরুলের চোখগুলোও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, রাত শেষ হতে আর দেরি নেই। তার বউয়ের তালি দেওয়া শাড়ি, তার ভাঙা ঘর, ছেলের নাম শুনে মানুষের উপহাস—সব অতীত হয়ে যাবে ফজরের আজানের সাথে সাথেই। বেশ কিছু টাকা সুলায়মানের মুখে ছুড়ে দিয়ে বলবে, ‘তোর পোলারে কিছু কিন্যা খাওয়াইছ।’

একটা টেলিভিশন অবশ্যই কিনবে নুরুল। গত শীতে আলীম ব্যাপারির শহরে থাকা ছেলেটা গ্রামে এলো, সাথে নিয়ে এলো টেলিভিশন। রত্নাবতী বাজার থেকে দুইটা ব্যাটারি এনে চার কোনা কিছু একটা ঢুকিয়ে দিলো একটা চ্যাপ্টা বাক্সে। কী আজব বাক্স, মানুষের ছবি দেখা যায়, তারা নাচে, গায়, কথা বলে আবার কাঁদেও। আলীম ব্যাপারি ছেলেমেয়ে নিয়ে একেবারে সামনে চেয়ার পেতে বসেছিলেন, তাদের পেছনে মহিলা আর বাচ্চাদের জন্য চাটাই পেতে দেওয়া হয়েছিল আর পুরুষেরা বসেছে খড় পেতে একেবারে পিছনে। সামনের চেয়ারওয়ালাদের জন্য ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না কিছুই, নায়িকার মাথা দেখা গেলে পা দেখা যায় না। তবুও খুব ভালো লেগেছিল নুরুলের। আমির সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, বসে বসে দেখতে পাচ্ছিল না। নুরুল টেলিভিশন কিনে চেয়ার পেতে বসবে, আমির আর লুৎফার জন্যও চেয়ার থাকবে। আর বাচ্চাদের বসার জায়গা করে দিবে সামনে, যাতে তাদের দাঁড়িয়ে দেখতে না হয়, আর হাত-পা-সহ পুরো নায়িকাকেই যাতে দেখতে পায়।

ঘরটাও ঠিক করতে হবে, দোতলা ঘর বানাবে সে। এই তল্লাটে কারো দোতলা ঘর নেই। টাকাপয়সার তো আর অভাব নেই। বড় একটা পালঙ্কখাট কিনবে, নতুন শাড়ি পরে লুৎফা সুপারি কাটবে খাটে বসে।

কিন্তু খালি খরচ করলেই তো হবে না, বসে বসে খেলে নাকি রাজার ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায়। সাত রাজার ধনও ফুরিয়ে যেতে পারে। কী করা যায়? চিন্তার ভাঁজ পড়ল নুরুলের কপালে। অনেক অনেক জমি কিনবে সে, রাইস মিল দিবে। কিন্তু এত কিছু সামলাবে কী করে! আমির একটু বড় হলে সেও সাহায্য করতে পারবে। স্কুলে যাওয়ার আর কী দরকার? বাপের টাকার তো আর অভাব নেই।

আচ্ছা, এত কিছু ভাবছে সে, কিন্তু এই মণি বিক্রি করবে কার কাছে? তাদের রত্নাবতী বাজারে এই মণি কেনার ক্ষমতা কারো নেই। বাজারে দুইজন স্বর্ণকার আছে। যতীন আর কেষ্ট। কেষ্ট লোক ভালো না, একবার বিপদে পড়ে লুৎফার নাকফুল বিক্রি করতে গিয়েছিল। কেষ্ট দেখেই বলল, ‘এইটা তো ইমিটেশন, পাঁচ ট্যাকা পাইবা।’

নুরুল হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসার সময় ডেকে বলল, ‘তুই গরিব মানুষ, হের লাইগা পাঁচ ট্যাহা বাড়াইয়া দিমু। দিয়া যা।’

ইমিটিশনের নাকফুলের জন্য দশ টাকা! নুরুলের সন্দেহ হলো। সে যতীনকে দেখাল। যতীন বলল, ‘ভালো জিনিস, নাকফুল হইলেও ওজন আছে। একশো পঞ্চাশ ট্যাকার বেশি দিতে পারুম না।’

যতীনকে দিয়েই শহরে গিয়ে মণি বিক্রি করবে, নুরুল মনে মনে ঠিক করে ফেলে।

একটা চিন্তা থেকে মুক্তি পেতেই আরেকটা চিন্তা গ্রাস করে তাকে। এত সম্পত্তি হঠাৎ করে হলে লোকে সন্দেহ করবে, কত শত্রু হবে! পাশের গ্রাম সর্দারকান্দিতে আলীম ব্যাপারির ফুপাতো ভাই থাকত, অনেক টাকাপয়সা, অর্থসম্পত্তির মালিক ছিল। তিনবার হজ করেছে। কিন্তু বর্ষাকালে তার বাড়িতে ডাকাত পড়ল, সোনাদানা সব নিলো, সাথে সবাইকে কেটে রেখে গেল। এক রাতে নির্বংশ হয়ে গেল লোকটা।

ভাবতেই গলা শুকিয়ে যায় নুরুলের। না মানুষকে বুঝতে দেওয়া যাবে না, যা করতে হবে গোপনে করতে হবে। কিন্তু লুৎফা মেয়েমানুষ, সে তো পেটের ভেতর কথা রাখতে পারবে না। এখনই তার কথা শোনে না, তখন কি শুনবে? টাকাপয়সা হাতে আসলে মেয়েমানুষের রূপ পাল্টে যায়। শোয়ার সময় কি আর বাতাস করবে? নাকি খালি পালঙ্কে বসে পান-সুপারিই খাবে। মনে মনে লুৎফার প্রতি অকারণেই বিরক্তি বোধ করে নুরুল। ভাবে, নবাবের বেটির নবাবি ছুটামু আমি, যখন আরেকটা বউ আনমু তখন ঠ্যালা বুঝবো, আমার ট্যাকাপইসার অভাব নাই, বিয়া ইচ্ছা করলে দশটা করুম। বইয়া বইয়া পান-সুপারি খাওন ট্যার পাইবো। তেড়িবেড়ি করলে লাথি দিয়া ঘর থেইকা বাইর কইরা দিমু।

রাগে, দুঃশ্চিন্তায় নুরুল কাঁপতে থাকে। নিজের মাথাটার ওজন অনেক বেশি মনে হয় তার, বিশাল বড় ধানের বোঝা মাথায় নিলে যত ওজন হয়, তারচেয়েও বেশি। এমন সময় হঠাৎ মসজিদ থেকে ইমাম সাহেবের গলা শুনতে পেল, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।’ চারদিকে তাকিয়ে দেখল, দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশে ভালো করে দেখল, কোনো সাপ নেই। নুরুল হক তার সাহসের সবটুকু প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে গামছাটা সরাল। আর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

কোথায় মণি! নির্ঘুম রাতের সব স্বপ্ন ভেসে উদ্ভাসিত হলো টিনের কৌটার মুখ। রাতে চাঁদের আলোতে এটাই চকচক করছিল। মুহূর্তেই কল্পনার হিংসা, ভয় আর অবিশ্বাসের কঠিন জগৎ থেকে সে তার লুৎফা আর আমিরের সরল-স্বাভাবিক বাস্তবজীবনে ফিরে এলো।

নুরুল হকের মনে হলো, মাথা থেকে একটা বড় বোঝা নেমে গেল। নিজেকে খুব নির্ভার, হালকা মনে হচ্ছে। সাত রাজার ধন না পেয়েও সে খুব খুশি। নিজের চিন্তাগুলোকে দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে এখন।

ফজরের নামাজ পড়ে ঘরে এসে দেখল, লুৎফা হাঁসগুলোকে খাবার খাওয়াচ্ছে। লুৎফার সামনে নুরুলের নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। কিন্তু সেই ভাবটা গোপন করে বলল, ‘বউ, ভাত দেও, ক্ষেতে যামু।’

লুৎফা স্বামীকে ভাত দিতে যাচ্ছিল, নুরুল হক ডেকে আদুরে ভঙ্গিতে বলল, ‘একটু চ্যাপা শুঁটকি বানাইবা? তোমার হাতের চ্যাপা শুঁটকি খাইলে দিনডা ভালা যায়।’

লুৎফা আঁচলটা ঠোঁট দিয়ে কামড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘পারুম না।’

নুরুল জানে লুৎফা একটু পরেই তার পাতে চ্যাপা শুঁটকি তুলে দিবে। চ্যাপা শুঁটকি দিয়ে ভাত খাবে ভেবেই মনটা ভালো হয়ে গেল তার। সাপের মণি দরকার নেই, তার কাছে সুখের মণি আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *