প্রায়শ্চিত্ত – ওবায়েদ হক

প্রায়শ্চিত্ত

কামরুল সাহেব সারারাত চেষ্টা করেও সুইসাইড নোটটা গুছিয়ে লিখতে পারেননি। এই প্রথম লিখতে হচ্ছে, স্কুল-কলেজে ‘বাবার কাছে টাকা চেয়ে চিঠি’ লেখা শিখেছেন, কিন্তু সুইসাইড লেটার লেখা শিখেননি কখনো। সারারাত নিজের কেবিনে বসে চিন্তা করেছেন, কিন্তু কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। এমন সময় দরজা ঠেলে শুধু মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো পিয়ন, বাথরুমের ভেতর থেকে উলঙ্গ মানুষ যেভাবে তোয়ালে চায়, ঠিক সেভাবে।

‘স্যার, নাস্তা দিমু নাকি?’

পিয়ন এমনভাবে জিজ্ঞেস করল, যেন কোনো কুপ্রস্তাব দিচ্ছে। কামরুল সাহেব শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুই কখন এলি?’

‘এট্টু আগে।’

‘আর কেউ আসছে?’

‘জ্বে না।’

‘ইকরাম আসলে আমার কেবিনে পাঠিয়ে দিস আর ম্যানেজার সাহেব এলেও পাঠিয়ে দিস।’

‘স্যার, নাস্তা খাইবেন না?’

‘না, শুধু এক কাপ চা দিস। আর শোন, এভাবে উঁকি দিয়ে কথা বলা বাজে অভ্যাস, মনে হয় যেন কাপড় পরিস নাই।’

পিয়ন এই কথা শুনে অবাক হয়ে কামরুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকল। কামরুল সাহেব এবার রাগের ভঙ্গিতেই বললেন, ‘সোজা হয়ে দাঁড়া।’

এবার পিয়ন সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কামরুল সাহেবের গলা আবার শান্ত হয়ে গেল। বললেন, ‘এখন যা, চা নিয়ে আয়।’

কামরুল সাহেব গত দুই দিন যাবত অফিসেই আছেন। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না, যাওয়ার মতো কেউ নেই-ও অবশ্য। অফিসের কাজকর্মও বন্ধ আছে। সেক্রেটারি, ম্যানেজার আর পিয়ন ছাড়া সবাইকেই ছুটি দিয়েছেন, অপ্রত্যাশিত ছুটি পেয়ে সবাই অবাক এবং খুশি হয়েছে। এই ব্যস্ত অফিসে দুই দিন কাজ বন্ধ থাকলে কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে যায়; কিন্তু সেসব নিয়ে ভাবছেন না তিনি। চেয়ার থেকে উঠে কেবিনের লাগোয়া ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলেন। বেসিনের আয়নায় নিজের চেহারা দেখলেন। চোখগুলো ফুলে আছে, চোখের নিচে স্ফীত হয়ে আছে, রাতজাগার কারণে নাকি বয়সের কারণে বুঝতে পারছেন না। গত মাসেই চল্লিশ পেরিয়েছেন তিনি, কিন্তু গত দুই দিনেই তার বয়স অনেক বেড়ে গেছে। হঠাৎ কী যেন মনে হতেই নিজের চেহারার দিকে ঘৃণায় আর তাকাতে পারলেন না। তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন, পিয়ন টেবিলের ওপর চা দিয়ে গেছে, সাথে দুটো বিস্কুট।

কোনোমতে চা-টা শেষ করলেন কামরুল সাহেব, বিস্কুট খেলেন না। নিজের প্রতি প্রবল ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে তাঁর। বেশ কিছু কাজ বাকি আছে, সুইসাইড নোটটাও লেখা খুব জরুরি, তাঁর নিজের জন্য না হলেও আশেপাশের মানুষগুলোর জন্য জরুরি। পরে দেখা যাবে মিডিয়া সাড়ে তিন দিন যাবত এটা নিয়ে লাফালাফি করবে। এত বড় ব্যবসায়ী খুন হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে মাইক্রোফোন ঠেসে ধরে জবাব চাইবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়তো অপরাধী বের করার আশ্বাস দিবেন, পুলিশ এসে অফিসের ম্যানেজার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, পিয়ন, দারোয়ান সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। তিন দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই তারা সব অপরাধ স্বীকার করে নিবে। পুলিশ বিজয়ীর ভঙ্গিতে তাদের গলায় হত্যাকারী লিখে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে আসবে ছবি তোলার জন্য, ফোলা ফোলা চোখ-মুখে রিমান্ডের ছাপ স্পষ্ট। সাংবাদিকরা তাদের মাইক্রোফোন নিয়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করবে, ‘খুন কেন করেছেন?’

ম্যানেজার চুপ করে থাকবে, পুলিশ পেছন থেকে গলা খাকারি দিলেই বলে উঠবে, ‘টাকার জন্য।’

‘কীভাবে খুন করেছেন?’

এই প্রশ্ন শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া তারা আর কীই-বা করবে?

আপাতত এরচেয়ে বেশি ভবিষ্যৎ চিন্তায় গেলেন না কামরুল সাহেব। দরজায় ঠক-ঠক আওয়াজ হতেই দেখলেন ইকরাম দাঁড়িয়ে আছে। ইকরামকে বসতে ইশারা করলেন। ইকরাম কামরুল সাহেবের সেক্রেটারি। আগে ডেস্টিনিতে কাজ করত, ডেস্টিনি ছেড়েছে; কিন্তু টাই-টা ছাড়তে পারেনি। কামরুল সাহেব ইকরামকে কখনোই টাই ছাড়া দেখেননি। আজও একটা টকটকে লাল টাই পরে এসেছে, সাথে নীল শার্ট; দেখতে কোনো অভিজাত রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের মতো লাগছে। বেমানান কিছু সবসময়ই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সাদা ধবধবে শার্টে ছোট একটা দাগও সবার নজরে পড়ে, সবাই পুরো সাদা শার্ট রেখে শুধু সেই দাগের দিকেই তাকিয়ে থাকে। কামরুল সাহেবের চোখও বারবার সেই লাল টাই-টার দিকে চলে যাচ্ছে। টাইয়ের দিকে তাকিয়েই বললেন, ‘ইকরাম, আমার জন্য কিছু সুইসাইড লেটার যোগাড় করে দিতে পারবে?’

কামরুল সাহেব ইকরামের টাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন, তাই সুইসাইড লেটারের কথা শুনে ইকরামের মুখের অভিব্যক্তি দেখতে পেলেন না। ইকরাম খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল, ‘সমস্যা নাই, স্যার, হয়ে যাবে।’

কামরুল সাহেবও জানতেন ইকরাম এমনই বলবে। সে হচ্ছে কামরুল সাহেবের কাছে আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মতো। যা কিছুই বলা হোক, তার কাছে সেটা কোনো সমস্যাই না। সে হয়তো ভাবছে, ব্যবসার কোনো কাজেই লাগবে চিঠিগুলো। সে হচ্ছে কর্মী মৌমাছি, শুধু কাজ করে যাবে। কী দিয়ে কী হবে সেসব ভাবা তার কাজ নয়।

কামরুল সাহেবের কোনো পিছুটান নেই, হাফপ্যান্ট পরা বয়সেই বাবা-মা মরেছে। এক চাচার বাসায় বড় হয়েছেন, তিনিও টাকাপয়সা না লাগলে খোঁজ নেন না। মাঝে কয়েকদিন অবশ্য নিজের ছোট মেয়েটাকে নিয়ে প্রায়ই আসতেন। মেয়েটি লজ্জা লজ্জা মুখ নিয়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় বসে থাকত আর তার বাবা তার বিজ্ঞাপন করত। চাচার বর্ণনা অনুযায়ী তার মেয়ে ভদ্র, নম্র, সভ্য, মার্জিত, বাধ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। কামরুল সাহেবের একাকিত্বের কথাও বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিতেও ভুলতেন না কখনো। কামরুল সাহেবের কিছু হলে এই বিশাল সম্পত্তির কী হবে তা নিয়ে তিনি বেজায় চিন্তিত। শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্যও কাউকে দরকার, যে যত্ন নিয়ে রান্না করে খাওয়াবে। রান্নার প্রসঙ্গ এলেই নিজের মেয়ের রাঁধুনি পরিচয়টা পুনর্বার প্রকাশ করতেন। তার মেয়ের হাতের রান্না খেলে যে কেউ প্লেট চেটে পাতলা করে ফেলে।

কামরুল সাহেবের নিজের প্লেট চাটার কোনো ইচ্ছা ছিল না। চাচাও হাল ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে অন্যত্র পাত্রস্থ করলেন। বিয়ের সমস্ত খরচ কামরুল সাহেব দিলেন। চাচার তোষামোদী তাতে এক বিন্দুও কমেনি। বিশেষ করে ছেলেদের বিদেশে পাঠানোর সময় যখন টাকার দরকার হয়েছিল তখন নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি তার দরদ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছিল।

আশেপাশের মানুষগুলোর কৃত্রিম তোষামোদ দেখলে কামরুল সাহেব খুব বিব্রত ও বিরক্ত হন। যারা জন্ম থেকে ধনী, তারা এই কৃত্রিমতাটুকু ধরতে পারে না, তারা সবসময় এইরকম আচরণ পেয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু কামরুল সাহেব ভালোভাবেই বুঝতে পারেন, কারণ তাঁর দারিদ্র্যের সময়টুকু তিনি কখনোই ভুলেননি, সেটাই ছিল তাঁর সুখের সময়।

চাচার বাসায় থাকার সময় তিনি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। তবুও তিনি যখন চাচার বাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন, তখন চাচাকে দেখে মনে হয় যেন তিনি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। অন্তত একজনের খাওয়ার খরচ বেঁচে গেল।

ঢাকায় এসেই মেসে উঠল সে, তার মতো সবাই ছাত্র। কামরুল তখনো সাহেব হয়ে ওঠেনি। তার আপন কেউ ছিল না, তাই কাউকে আপন করে নেওয়ার বিদ্যাও তার অজানা ছিল। সবাইকে একটু এড়িয়েই চলত সে। অবশ্য সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলার মতো অবস্থাও তার ছিল না। সবার যখন বাড়ি থেকে টাকা আসত, তখন তাকে অপেক্ষা করতে হতো টিউশনির বেতনের জন্য। সময় মতো বেতন কখনোই পেত না, মেসে এজন্য অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হতো। বাধ্য হয়ে মেস পরিবর্তন করতে হয়। টাকা বাঁচানোর জন্য সকালে নাস্তা করা ছেড়ে দিয়েছিল অনেক আগেই, শুধু এক কাপ চা খেত, পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। এখনও কামরুল ‘সাহেব’ সকালে নাস্তা করেন না, শুধু এক কাপ চা খান। মাঝে মাঝেই যুবক কামরুল দুপুরের মিল বন্ধ করে একটু আগেই টিউশনিতে চলে যেত। টিউশনির নাস্তায় হয়ে যেত তার লাঞ্চ। যেদিন নাস্তা দিত না, সেদিন রমনা পার্কের সামনে ঝালমুড়ি কিনে খেত। মেসে সবার টেবিলফ্যান ছিল, কিন্তু তার ছিল না, টেবিল-ফ্যান কেনার মতো টাকা জমাতে পারেনি কখনো। খুব গরমের রাতে মাথার ওপর জানালাটা খুলে দিয়ে ভেজা গামছা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকত, মুহূর্তেই ঘুম চলে আসত। এখন এয়ারকন্ডিশন্ড রুমেও সেই ঘুম আসে না।

গলা খাকারি শুনে কামরুল সাহেবের সংবিৎ ফিরে এলো, ম্যানেজার সাহেব এসেছেন। ম্যানেজারের নাম বোরহান উদ্দীন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ইকরাম যতটা ফিটফাট, ইনি ততটাই ঢিলেঢালা। টাই তো দূরের কথা, তাকে কখনো শার্ট ইন করতেও দেখা যায়নি। যদি কামরুল সাহেবের মানা না থাকত, বোরহান উদ্দীন নিশ্চিত লুঙ্গি পরে অফিসে আসত। বোরহান উদ্দীনের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। যদিও সে এই অফিসের ম্যানেজার, তবুও সে সপ্তাহের মধ্যে তিন দিন আদালতে পড়ে থাকে। অফিসের মামলার কাজে নয়, নিজের মামলায়। তার নামে কেউ মামলা দেয়নি, সে-ই মানুষের নামে মামলা দিয়ে বেড়ায়। সিরাজগঞ্জের মানুষ তো, মামলা করাটা তার জন্য তালি বাজিয়ে মশা মারার মতো।

সিরাজগঞ্জের প্রায় সবারই নাকি প্রচুর জমিজমা। মাটি নিয়ে প্রায়শই তাদের এর নামে ওর নামে মামলা করতে হয়। গ্রাম থেকে কোনো কাজে সিরাজগঞ্জ শহরে আসলেই চাচা-জ্যাঠার নামে একটা মামলা করে যায় তারা। বোরহান উদ্দীন একবার ভাড়া বেশি রাখার কারণে এক বাস কন্ডাক্টারের নামে মামলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আদালত সেই মামলা নেয়নি। সেই দুঃখে সে অভিমান করে পুরো এক সপ্তাহ আদালতে যায়নি। কামরুল সাহেবের আইনগত সব কাজ বোরহান উদ্দীনই করে, জুনিয়র উকিলদের সে আইনি পরামর্শও দিয়ে থাকে। কামরুল সাহেবের কোনোদিন কোনো উকিলের প্রয়োজন পড়েনি, তার কোনো শত্রু নেই। যাদের বন্ধু হয় না, তাদের শত্রুও হয় না। কিন্তু আজ তাঁর একজন উকিল প্রয়োজন। ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার পরিচিত কোনো ভালো উকিল আছে?’

প্রশ্নটা করেই কামরুল সাহেব বুঝলেন ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছেন। বোরহান উদ্দীনও প্রশ্নটা শুনে খুব মর্মাহত হলো। অবাক করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এইটা কী বললেন, স্যার? আদালতপাড়ায় নতুন কোনো উকিল এলে আমার পায়ে ধরে সালাম করে আশীর্বাদ নিয়ে যায়। কয়টা উকিল লাগবে আপনার, ফোন করে দিলে এখনই চলে আসবে।’

তারপর তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, উৎফুল্লিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কারো নামে মামলা করবেন, স্যার?’

‘না, একটা উইল করব।’

বোরহান উদ্দীন চুপসে গেল। লবণ ছাড়া তরকারি মুখে দিলে মানুষের চেহারা যেমন হয়, চেহারাটা ঠিক তেমন করে বলল, ‘ও।’ তার ‘ও’ শুনেই বোঝা গেল এসব নিরামিষ ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই।

উইলের কাজটা শেষ হয়ে গেলে কামরুল সাহেব কিছুটা নির্ভার হতে পারেন। এই বিপুল সম্পত্তির বোঝা তিনি আর বইতে পারছেন না। এই ব্যবসা, বিশাল বাড়ি—সব নিজের হাতে গড়েছেন। কিন্তু তাও এই সম্পত্তিকে তার কখনো আপন মনে হয়নি, কখনোই উপভোগ করতে পারেননি এই আভিজাত্য।

পৃথিবীতে সহজলভ্য কোনো কিছুই উপভোগ্য নয়। আজও মনে ভেসে ওঠে সেই দিনের কথা। সিনেমাতে নায়কের ভাগ্যও বোধ হয় এত সহজে পরিবর্তন হয় না। সেদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিল ‘বেকার’ কামরুল। পড়ালেখা শেষ, দুইটা টিউশনি আর চাকরির খোঁজখবর করা ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ ছিল না তার। তবুও ভোরে উঠেছিল, মেসের ভাড়া দেওয়ার তারিখ পার হয়েছে দুই দিন আগে, ম্যানেজার দুইবার এসে ঘুরে গেছে। সবাই টাকা দিয়ে দিয়েছে, শুধু সে বাকি। টিউশনির বেতনটা এখনো পায়নি এই মাসে। তাই সবাই উঠে যাওয়ার আগেই সে চুপি চুপি বের হয়ে গেল। রমনা পার্কের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। এখানেই কাটাতে হবে তিনটা পর্যন্ত, তারপর নীলক্ষেত যেতে হবে, নতুন কোনো চাকরির সার্কুলার এসেছে কি-না খোঁজ নিতে হবে। যদিও চাকরির কোনো আশা নেই, তার রেজাল্টও খুব একটা ভালো না, মামা-খালুও নেই।

রমনা পার্কে এর আগেও এরকম সময় কাটাতে হয়েছে তাকে, ভালোই লাগে এখানে এলে। সকালে মোটা মোটা মানুষগুলো এখানে দৌড়াদৌড়ি করে, একেকজন একেক ভঙ্গিতে। কেউ কেউ আর্মি ভঙ্গিতে লেফট-রাইট করে হাঁটে, কেউ কেউ আবার খুব আস্তে আস্তে ধীর-চালে হাঁটে, এরা একটু ভাবুক প্রকৃতির, প্রায় সময় এরা ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁটে আর অন্য মানুষদের সাথে ধাক্কা খায়। আবার আরেক প্রকৃতির মানুষ আছে যারা পার্কে কেডস-ট্রাউজার পরে আসে, কিন্তু এরা হাঁটে না। মুখ গোমড়া করে বেঞ্চে বসে থাকে আর বারবার ঘড়ির দিকে তাকায়। এরা বোধ হয় বউয়ের ধমক খেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসেছে।

আরেক ধরনের আছে যারা একটু দৌড়বিদ টাইপের। এদের বয়স একটু কম হয়, শরীরও একটু শীর্ণকায়। বয়স্ক আর স্থূলকায়ীরা এদের দিকে হিংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হাঁটাহাঁটি শেষ করে এদের মধ্যে প্রায় সবাই আশেপাশের খাবারের দোকানে ভিড় করে।

তারপর একটু বেলা হলে তরুণ-সমাজের আগমন হয়। এরা আসে জোড়ায় জোড়ায়। বাদামওয়ালা আর ভিক্ষুকদের ব্যবসা শুরু হয় তখন থেকে। বাদামওয়ালারা বেরসিকের মতো একান্ত আলাপচারিতার মধ্যে তাঁর বাদামের বিজ্ঞাপন করে, ভাবখানা এমন ‘যতক্ষণ না কিনবি কানের কাছে বাদাম বাদাম করেই যাব’। কিন্তু আজকাল প্রতিযোগী বেড়েছে, দেখা যাচ্ছে এক জোড়া কপোত-কপোতীর আশেপাশে দুই জোড়া বাদামওয়ালা ঘুরছে।

ভিক্ষুকদের মধ্যেও আজকাল রেশারেশি শুরু হয়েছে। আগে শুধু বৃদ্ধ, খোঁড়া, অন্ধ ভিক্ষুক দেখা যেত, কিন্তু এখন ছোট ছোট বাচ্চারা তাদের কম্পিটিশন দিচ্ছে। বাচ্চারা ভিক্ষা না পেলে পারলে কোলে বসে যায়, কিন্তু সিনিয়ররা তো আর এই মেথড অ্যাপ্লাই করতে পারেন না, তাই তারা একটু পিছিয়ে পড়েছে। অবশ্য ঝগড়ারত প্রেমিক-জোড়ার কাছে গেলে জুনিয়রদের প্রায়ই চড়-থাপ্পড় খেতে হয়। অভিজ্ঞতার কারণে ক্লায়েন্ট সিলেকশনে তারা প্রায়ই ভুল করে, এক্ষেত্রে আবার সিনিয়ররা এগিয়ে আছে। কামরুলের কাছে জুনিয়র ভিক্ষুকরা প্রায়ই আসে, কিন্তু তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে দুইটা টাকাও পকেট থেকে বের করে দিতে পারে না। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেয়। তারা তবুও আসে, হয়তো এরকম ভিক্ষা আর কেউ দেয় না, একটু আদর নেওয়ার জন্য তারা বারবার আসে তার কাছে।

স্যান্ডেল জোড়া মাথার নিচে দিয়ে বেঞ্চে সটান হয়ে ক্লাসিক্যাল বেকার-ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে সে, গাছের ছায়ায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা অপূর্ব এক অনুভূতি। নিজেকে প্রকৃতির অংশ মনে হয়। প্রকৃতির কোলে নিজেকে সঁপে দিয়ে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে সে, অদ্ভুত শান্তির ঘুম। টিউশনিতে এসেছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হয়ে গেল, কিন্তু এখনো বেতন বা নাস্তা দেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ইতোমধ্যে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ফেলেছে সে। দেড় ঘণ্টার জায়গায় সেদিন দুই ঘণ্টা পড়ালো, কিন্তু শুধু আশাভঙ্গই হলো। আরো কিছুক্ষণ বসতো, কিন্তু আরেকজন টিচার আসায় রণে ভঙ্গ দিলো কামরুল। প্রচণ্ড ক্ষুধায় মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। অন্ধকার নেমে গেছে, শহরের বৈদ্যুতিক বাতিগুলো সন্ধ্যাটাকে ধরে-বেঁধে আরো তাড়াতাড়ি নিয়ে আসে। সে হাঁটছে গ্রিন রোডের এক গলির ভেতর দিয়ে, হাঁটতে ভীষণ ক্লান্তি লাগছে, খুব ইচ্ছা করছে একটা রিকশা নিয়ে ফার্মগেট যেতে, কুদ্দুস মিয়ার দোকান থেকে ঠোঙায় করে ঝালমুড়ি খেতে। ঝালমুড়ি খাওয়ার টাকা আছে, কিন্তু এতদূর হেঁটে যেতে হবে চিন্তা করতেই আরো বেশি ক্লান্তি লাগছে। পাগুলো আর চলছে না, একটা অন্ধকার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল কামরুল, ল্যাম্পপোস্টের আলো এদিক পর্যন্ত আসে না। এইখানে পাশাপাশি ঘেঁষা দুটি বাড়ির মাঝখানে একটি খুবই সরু জায়গা আছে। দুই বাড়ির লোকজন এই জায়গাটা সম্ভবত ময়লা ফেলার কাজে ব্যবহার করে। জায়গাটা এতই অন্ধকার যে ভালো করে না দেখলে এই ছোট্ট সরু গলির অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। অন্ধকারটা চোখে সয়ে যেতেই ভেতরে কিছু একটার নড়াচড়া লক্ষ করল সে। একটা লোক অস্থিরভাবে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে, তার হাতে একটা কালো ব্যাগ। লোকটি কামরুলকে লক্ষ করেনি, সে অন্ধকারে ছিল অথবা লোকটি হয়তো খুব বেশি অস্থির ছিল তাই। লোকটি তাঁর হাতের ব্যাগটা একটা চটের বস্তা দিয়ে ঢেকেই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল। লোকটি বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই কামরুল লোকটির চেহারা দেখল, চেহারায় ভয় আর উৎকণ্ঠা মিশে আছে, এই হালকা শীতে তাঁর কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম নামছে।

লোকটিকে দেখেই কামরুলের সন্দেহ হলো, চেহারায় কেমন একটা অপরাধী অপরাধী ভাব আছে। অস্থিরভাবে হাঁটতে হাঁটতে লোকটি গলির মোড় থেকে একটা রিকশা নিয়ে চলে গেল। হতবিহ্বল হয়ে কামরুল সেই অন্ধকার গলির চটের বস্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল। মাথার ভেতরে অনেকগুলো চিন্তা একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু কোনো চিন্তাই বেশিদূর এগোচ্ছে না। ক্ষুধার অনুভূতিটাও লোপ পেয়েছে। হঠাৎ লক্ষ করল নিজের অজান্তেই সে ভেতরে যাচ্ছে, তার ভেতরের কোনো একটা সত্তা তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রমানবের মতো চটের বস্তাটা সরিয়ে কালো ব্যাগটা হাতে নিলো সে। ব্যাগের চেইনটা খুলে ঝাপসা অন্ধকারে যা দেখল তা দেখে তার বিবেকবুদ্ধির অবশিষ্টাংশও লোপ পেল। এগুলো কি সত্যিই টাকা, এত টাকা!

কামরুল তার মেসে শুয়ে আছে, তার চৌকির তলায় কালো ব্যাগটা আছে। বারবার নিজের মনকে বোঝাচ্ছে এই টাকাগুলো তার ভাগ্যে ছিল, সে না নিলে নিশ্চিত এটা কিছু খারাপ মানুষের হাতে যেত।

মনকে বোঝাচ্ছে, কিন্তু শান্তি পাচ্ছে না। মেসের ভাড়া পরিশোধ করেও আগের মতো শান্তি পেল না সে। সারারাত একরকম না ঘুমিয়েই কাটালো, সকালবেলাতেই অনেকগুলো নোট পকেটে পুরে রমনা পার্কে রওনা দিলো। আজকের পরিবেশটা একেবারে অন্যরকম লাগছে। হাঁটাহাঁটি করতে থাকা মানুষগুলোকে দেখে আগের মতো আর ভালো লাগছে না। দশ টাকার বাদাম কিনল, কিন্তু খেতে একদম ইচ্ছা করছে না। আগে দুই টাকার বাদাম কিনে খেলেও অমৃত লাগত। মাঝে মাঝে মনে হতো তার কাছে অনেক টাকা থাকলে বাদাম ছিলত আর খেত, কিন্তু এখন কেন ভালো লাগছে না?

একটা বাচ্চা এসে তার সামনে হাত পাতল, কামরুল খুব গর্বের ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলো, বাচ্চাটা খুব অবাক হয়ে হাত পেতে টাকাটা নিয়ে চলে গেল, কিন্তু যেটা সে চাইতে এসেছিল তা পায়নি, কামরুলও যেটা পেতে চেয়েছিল তা পায়নি। তারপরের ইতিহাস খুব একঘেয়ে, কামরুল টাকার সাথে টাকার প্রজনন করে আরো অনেক টাকা উৎপন্ন করেছে। বাড়ি, গাড়ি, আভিজাত্য কিনেছে, কিন্তু সুখ কিনতে পারেনি, রমনা পার্কের সেই ঘুম কিনতে পারেনি।

ইকরাম অনেকগুলো চিঠি নিয়ে এসেছে, সব সুইসাইড লেটার। প্রায় বিশ-পঁচিশটা তো হবেই। কামরুল সাহেব অবাক হয়ে ইকরামের দিকে চেয়ে আছেন, ইকরামের চেহারায় সেই বীরের ভঙ্গি। কামরুল সাহেবের এবার সন্দেহ হলো, সে নিজে লিখে আনেনি তো? তাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় পেলে এত চিঠি?’

‘বংশাল থানার এসআই থেকে এনেছি, আমাদের গ্রামের লোক।’

‘এমনিতেই দিলো?’

‘না, স্যার, পকেট গরম করতে হইছিল।’

‘এগুলো সব আসল?’

‘হান্ড্রেড পারসেন্ট আসল, সাকসেস রেট নব্বই পারসেন্ট, শুধু যারা বিষ খাইছে তারা বাঁইচা আছে।’

‘ঠিক আছে, তুমি যাও।’

ইকরাম চলে যাচ্ছিল, কামরুল সাহেব তখন আবার ডেকে বললেন, “ইকরাম, তোমাকে আরো একটা কাজ করতে হবে।”

‘একশটা কাজ বলেন।’

‘তুমি আজকাল বেশি কথা বলছ।’

‘স্যরি, স্যার।’

‘পুরান ঢাকার আলম মিয়া নামে একজনের খোঁজ নিতে হবে।’

‘ধরে নিয়ে আসব, স্যার?’

এবার কামরুল সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা, যেটুকু বলছি সেটুকু করো।’

এইটুকু বলে একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এখানে ঠিকানা আছে, শুধু খোঁজখবর নিবে, তুমি যে খোঁজখবর নিচ্ছ তা যাতে তিনি জানতে না পারেন।’

মাথা কাত করে ইকরাম কাগজটা নিয়ে চলে গেল। কামরুল সাহেব চিঠিগুলো নিয়ে বসলেন। পনেরোটা চিঠি পড়ার পর আর পড়তে ইচ্ছা করছিল না। হতাশ হয়ে চিঠিগুলো ফেলে রাখলেন। প্রায় সবগুলোই প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাস। একটা চিঠি আছে ঢাকা মেডিকেলের এক ছাত্রীর, সে পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহত্যা করেছে। একটা ক্লাস টেনে পড়া মেয়ের চিঠি আছে, মা বকা দিয়েছে তাই অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে। কামরুল সাহেব ভাবলেন মানুষ কত ক্ষুদ্র কারণে আত্মহত্যা করে। কেউ আত্মহত্যা করে অভিমানে, কেউ করে ব্যর্থতায়, কেউ করে দায়িত্ব এড়াতে, কেউ করে লজ্জায়। কিন্তু কামরুল সাহেব আত্মহত্যা করবেন ঘৃণায়, নিজের প্রতি ঘৃণায়।

গত তিন দিন ধরে নিজেকে কোনোমতেই সহ্য করতে পারছেন না তিনি। তিন দিন আগে তিনি অতীতের হারানো সুখ খুঁজতে গিয়ে একরাশ দুঃখ আর ঘৃণা কিনে এনেছেন। এত পরিমাণে যে, তাঁর বুকে জায়গা হচ্ছে না। নিঃশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে।

সেদিন দুপুরবেলা ফার্মগেটের জ্যামে গাড়িতে বসে ছিলেন। রাস্তায় যানজট আর ফুটপাতের ওপর জনজট লেগে আছে। সেই জনজটে পিষ্ট মানুষগুলোর মাঝে হঠাৎ যেন তিনি নিজেকে খুঁজে পেলেন। প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে এরকম মানুষের চাপে পিষ্ট হয়ে গিয়ে কুদ্দুসের ঝালমুড়ি খেতেন, আহা, তখন কী অমৃতের মতো লাগত! সেই অমৃতের লোভে কামরুল সাহেব গাড়ি থেকে নেমে গেলেন, গাড়িটাকে চলে যেতে বলে তিনি সেই জনজটে যোগ দিলেন। তাঁকে এই মানুষদের মাঝে বড্ড বেমানান লাগছে। সবাই ধাক্কাধাক্কি করে হাঁটছে, কিন্তু তাকে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে না। তাঁর গায়ে কেউ গা লাগাচ্ছে না, মনে হচ্ছে তিনি যেন অস্পৃশ্য। মানুষ দুইভাবে অস্পৃশ্য হয়, খুব নিচু জাতের হলে আর খুব উঁচু জাতের হলে।

কুদ্দুস মিয়াকে অনেক খুঁজেও পেলেন না। হয়তো বিদেশ চলে গেছে, বিদেশে যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল তার। একজন ঝালমুড়িওয়ালা পাওয়া গেল। কাস্টমারের জন্য এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। এই সময়ে খুব একটা কাস্টমার পাওয়া যায় না। কামরুল সাহেব কাছে গিয়ে বললেন, ‘দুই টাকার ঝালমুড়ি দেন।’

ঝালমুড়িওয়ালা অবাক হয়ে কামরুল সাহেবের দিকে তাকালো। অবাক হওয়ার কারণ দুইটা, প্রথমটা হলো এরকম স্যুট পরা বড়লোকেরা এই সময়ে কখনো ঝালমুড়ি খেতে আসে না, এই সময়ে আসে লুঙ্গি পরা রিকশাওয়ালা, ছেঁড়া কাপড় পরা ভিক্ষুক অথবা ব্যাগ হাতে গরিব ছাত্র। আর দ্বিতীয় কারণ হলো এই যুগে কেউ দুই টাকার মুড়ি কিনতে আসে না। বিশেষ করে এমন বড়লোক মানুষেরা।

ঝালমুড়িওয়ালা একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েই বলল, ‘দুই ট্যাহার বেচি না, পাঁচ ট্যাহা আর দশ ট্যাহা।’

কামরুল সাহেব অনেকদিন পরে এলেন, তিনি যখন কিনতেন তখন দুই টাকারই বিক্রি হতো। তিনি খুব বেশি বিচলিত না হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, পাঁচ টাকার দেন।’

অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় ঝালমুড়িওয়ালা মুড়িতে মশলা মিশিয়ে একটা পুরাতন পত্রিকা দিয়ে বানানো ঠোঙায় মুড়ি ঢেলে তাঁর সামনে দিলো। ঝালমুড়িওয়ালাকে টাকা দিয়ে কামরুল সাহেব খুব আশা নিয়ে এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে দিলেন। আরেকবার তাঁর আশাভঙ্গ হলো। সেই স্বাদ আর নেই, আসলে স্বাদ ছিল সেই দারিদ্র্যে। বিরস মুখে মুড়ি চাবাতে চাবাতে নিজের হাতের কাগজের ঠোঙাটার দিকে তাকাতেই তাঁর চক্ষু স্থির হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি মুড়িটুকু ফেলে দিয়ে পত্রিকার কাগজটা মেলে ধরলেন। গ্রিন রোডের গলিতে দেখা সেই লোকটাকে দেখা গেল পুরোনো পত্রিকার খণ্ডাংশে। ছবিতে লোকটা হাউমাউ করে কাঁদছে। পাশেই তাঁর বাচ্চার লাশের ছবি। পানি থেকে তোলা, ফুলে আছে লাশটা। গলা টিপে মেরে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ওপরে লাল মোটা মোটা অক্ষরে লেখা—’মুক্তিপণের টাকা দিয়েও নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারলেন না বাবা’।

কামরুল সাহেবের গা গুলিয়ে উঠল, মুখ দিয়ে হড়বড় করে একগাদা বমি বের হয়ে এলো।

পত্রিকার কাটিং দেখেই কামরুল সাহেব সেই দুর্ভাগা বাবার নাম জেনেছেন। আলম মিয়া নামের সেই বাবার নামেই সবকিছু উইল করে দিয়ে গেছেন। এই সবকিছু তাঁরই, তাই সব ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন।

কিন্তু তাও কি সব ফিরাতে পারলেন? যে ছেলেটি বাবাকে দেখে দৌড়ে কোলে আসত, চকলেট কিনে না দিলে স্কুলে না যাওয়ার হুমকি দিত। যে হয়তো কেবলমাত্র ‘আ’ ‘ম’ আম লিখতে শিখেছিল, যা দেখে তার বাবা-মার মনে কত গর্ব হতো, কত স্বপ্ন রচিত হতো। যার মা তার পিছনে ভাতের প্লেট নিয়ে ঘুরত, চরম মমতায় হয়তো বলত, ‘আরেকটু খা, বাবা’। দোকানে গেলেও বাবার মন যার জন্য সবসময় উৎকণ্ঠিত থাকত, এই বুঝি ছেলেটা খাট থেকে পড়ে ব্যথা পেল, এই বুঝি খেলতে গিয়ে হাঁটু ছিলে ফেলল।

সেই ছেলেকে তিনি কীভাবে ফিরিয়ে দিবেন? যে সন্তানের জন্য নিজের সবকিছু বিক্রি করে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা জোগাড় করে নির্জন গলিতে রেখে এসেছিলেন, তার ফুলে যাওয়া লাশ দেখে কেমন লেগেছিল সে বাবার? মৃত্যুর সময় ছেলেটির কেমন কষ্ট হয়েছিল, যখন গলা টিপেছিল তখন কি চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল? উফ, আর ভাবতে পারছেন না কামরুল সাহেব, নিজেকে খুনি মনে হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তাঁর।

কামরুল সাহেব তাঁর লাইসেন্স করা পিস্তলটা টেবিলের ওপর রাখলেন। যদিও তাঁর কোনো শত্রু নেই, তবুও বাস্তবে পিস্তল কেমন হয় দেখার জন্য লাইসেন্স নিয়েছিলেন। জীবনে কোনোদিন ভাবেননি এটা ব্যবহার করবেন। একটি মাত্র বুলেট আছে পিস্তলটাতে। এই একটা বুলেটই তাঁকে মুক্তি দিবে ঘৃণা থেকে, একটি জঘন্য পাপের প্রায়শ্চিত্ত না করতে পারার বেদনা থেকে।

কামরুল সাহেব পিস্তলটা মাথায় ঠেকালেন। চোখ বন্ধ করে মায়ের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করলেন। কোনো সময়ই মনে করতে পারেন না, কিন্তু আজ স্পষ্ট দেখতে পেলেন হারিকেনের আলোয় মায়ের উজ্জ্বল মুখ।

মধ্যরাতে ক্লান্ত ঢাকা শহরে বিকট শব্দে কিছু পাখির ঘুম ভেঙে গেল। ছন্দহীনভাবে আর্তনাদ করে তারা একটা ব্যর্থ প্রায়শ্চিত্তের ঘোষণা করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *