উপহার
সন্তান হওয়ার পর মায়ের প্রথম অপেক্ষা থাকে ‘মা’ ডাক শোনার জন্য। সাধারণত দুই বছরের মধ্যেই তাদের সে অপেক্ষার অবসান ঘটে, কিন্তু সেলিনা বেগমের মা ডাক শুনতে পনেরো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু তার ছেলে এখনো ‘বাবা’ ডাকতে পারে না। এটা নিয়ে কালাম মিয়ার আফসোসের সীমা নেই। তবে তারচেয়েও বড় আফসোস ছেলে ‘আব্বা’ বলার আগেই ‘আক্কা’ বলা শিখেছে।
বিছানা ময়লা করে সে চ্যাঁচাতে থাকে, ‘মা, আক্কা! মা, আক্কা!’ তার সে ‘আক্কা’ পরিষ্কারে সেলিনার কোনো ক্লান্তি নেই। গত প্রায় আঠারো বছর ধরে ‘সেলিনা বেগম’ কিংবা ‘কালামের বউ’ পরিচয়টা হারিয়ে গেছে। ‘আলালের মা’ এখন তার প্রধান পরিচয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের সতেরো তারিখে আলালের বয়স আর দুলালের মৃত্যুর আঠারো বছর পূর্ণ হবে। দুলাল আলালের ছোট ভাই, সে জন্মের পর সাড়ে চার মিনিটেই পৃথিবীর ওপর রুষ্ট হয়ে বিদায় নিয়ে চলে যায়। কিন্তু আলাল বেঁচে যায় তার মায়ের আদর একাই দখল করার জন্য। সেলিনা আর কালামের সংসারে সবকিছুর অভাব আছে, শুধু আদরের অভাব নেই এবং সেই আদরের একমাত্র ভোক্তা আলাল।
জন্মের দুই বছর পরেও যখন আলাল বিছানা আর মায়ের কোল ছাড়া অচল হয়ে থাকল তখন কালাম মিয়ার মনে হলো কোনো সমস্যা আছে। নিজেদের জমানো টাকা নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার আলালকে টেনেটুনে যা বললেন তা কালাম মিয়া কিংবা সেলিনা কিছুই বুঝল না, শুধু বুঝল তাদের আলাল সাধারণ না। এই আঠারো বছর বয়সে এখনো বিছানায় ‘আক্কা’ করে আলাল প্রতিনিয়ত তার অসাধারণত্ব প্রকাশ করে যাচ্ছে।
যখন সন্তান অসাধারণ হয় তখন মাকেও অসাধারণ হতে হয়, সেলিনা বেগম অসাধারণের চেয়েও বেশি কিছু। ছেলের অথর্বতায় তার মাতৃত্বে বিন্দু পরিমাণ টান পড়েনি। পাশের বাসার বিউটি যখন তার দুই বছরের ছেলের কাণ্ডকারখানা নিয়ে গর্ব করে তখন সেলিনাও গর্ব করে বলেন তার ছেলে আজ স্পষ্ট করে ‘মা, আক্কা’ বলেছে। গত তিন বছর ধরে সে নিজের ছেলের এই একমাত্র কৃতিত্বটি ক্লান্তিহীনভাবে প্রচার করে যাচ্ছে।
সেলিনা কোনোদিন তার এবং তার আলালের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেনি, কিন্তু একসময় চিন্তা করতে বাধ্য হলো। একদিন তাদের ভাঙা ঘরে বস্তির প্রধানমন্ত্রী এলো। তার নাম কাদের সরকার, এলাকায় তার অনেক খ্যাতি, অবশ্য সে খ্যাতিকে সুখ্যাতি বলা যাবে না। এই এলাকার কাউন্সিলরের আশেপাশে যে কয়জন লোক দেখা যায় তাদের মধ্যে সে একজন। তো এই কাদেরকে নিজেদের ঘরে দেখে কালাম মিয়া আর সেলিনা খুব অবাক এবং ভীত হয়েছিল, কারণ সামনে কোনো নির্বাচন নেই। নির্বাচন ছাড়া এদের উপস্থিতি সবসময় সুখকর হয় না। তবুও হাসিমুখে তাদের ঘরের একমাত্র নড়বড়ে চেয়ারটিতে বসতে দিলো। কিন্তু কাদের সরকার চেয়ারে বসার রিস্ক না নিয়ে আলালের ময়লা বিছানায় বসে পড়ল। সে তার পানের কৌটা থেকে এক খিলি পান মুখে পুরে দিয়ে চাবাতে চাবাতে বলল, ‘কালাম মিয়া, তোমারে তো মিয়া দেখাই যায় না, বিপদে-আপদে তো যাইতে পারো নাকি?’
কালাম কৃত্রিম হাসি দিয়ে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘না মানে, হারাদিন গারমেন্টে থাহি তো…’
কাদের ঘরের চারদিকে নজর বুলিয়ে তাদের অভাবের প্রাচুর্য দেখে মুখটা করুণ করে বলল, ‘আহা রে, তোমাগো অভাব তো আমি বুঝি, ট্যাকা-পয়সার সমইস্যা হইলেও তো কইতে পারো।’
‘আপনের মেহেরবানি, তেমন কুনো সমইস্যা নাই।’
‘থাকলেও কী কইবা! আমাগো তো আর আপন ভাবো না।’
‘কী যে কন!’
কাদের সরকার এবার ঠিক বিছানার পাশেই পানের পিক ফেলে মেঝেটা লাল করে দিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, ভালো। এখন কুনো সমইস্যা নাই। বয়স আছে, গায়ে-গতরে খাটতে পারো। কিন্তুক বুইড়া হইলে কী করবা?’
তারপর আলালের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, ‘তোমাগো তো আর পুলা নাই যে কামাই কইরা খাওয়াইবো।’
কালাম মিয়া নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নিস্তব্ধতা ছাড়া তার প্রতিবাদের আর কোনো ভাষা নেই। সেলিনা বেগম পাশে আঁচলে মুখ ঢেকে সব শুনছিল, তার আলালের অথর্বতার কথা মনে করিয়ে দেওয়াতে তার মনটা বিষিয়ে ওঠে।
কাদের সরকার কালাম মিয়ার নিস্তব্ধতা দেখে ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘শোনো, তোমাগো কতা ভাবি বইলাই আসছি, আমি থাকতে এত চিন্তা করো ক্যান! তোমাগো এই পোলাই তোমাগো কামাই কইরা খাওয়াইবো।’
কালাম মিয়া অবাক হয়ে কাদের সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে, কাদের সরকার মাথা ঝুঁকিয়ে গলাটা একটু নিচু করে বলল, ‘কাউন্সিলর সাবের লগে আমার ভালো খাতির আছে, আমারে ছাড়া একবেলা ভাতও খায় না। আমি হেরে কইয়া ফার্মগেট ব্রিজে একটা জায়গা বুকিং কইরা দিমু নে আলালের লাইগা। সারাদিনের কামাইয়ের অর্ধেক পাইবা।’
সেলিনা আঁতকে উঠল, কালাম মিয়া কাদের সরকারের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘জ্বী?’
‘আরে মিয়া, ভালা কামাই হইবো, আলালের থেইক্যা কতো ভালা মানুষ হাজার ট্যাকা কামাই করতাছে, নিজের হাত-পাও কাইট্যাও ব্যাবসায় নামতাছে আর আলালের তো মাশাল্লাহ এমনেই হাত-পাও চলে না, ঈমানে কইলাম, ভালা ট্যাকা কামাইবা।’
কালাম মিয়া লক্ষ করল সেলিনা আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে, সে ভালোকরেই জানে তার বউ যখন রেগে যায় তখন তার চোখে পানি চলে আসে। কালাম মিয়া নিজের চোয়াল শক্ত করে কাদের সরকারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাদের ভাই, আমি যতদিন বাঁইচ্চা আছি, আমার পোলারে আমি খাওয়ামু, রক্ত বেইচ্চা পোলা পালমু, কিন্তুক আমার পোলারে দিয়া ভিক্কা করামু না।’
কাদের তার ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়েই বলল, ‘তোমাগো কতা চিন্তা করি দেইখাই কইলাম, ভাইবা দেইখো।’
কাদের সরকারের ঠোঁটগুলো পানের রসে লাল টকটকে হয়ে আছে, কোনো শিকারি পশুর রক্তমাখা মুখের মতো।
সেদিন থেকে সেলিনা ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে লাগল, নিজেদের জন্য নয়, আলালের জন্য। কালাম মিয়া আর সেলিনা বেগম ঠিক করল তারা দুজনেই কাজ করবে, এমনিতে আলালকে খাওয়ানো আর পরিষ্কার করা ছাড়া ঘরে আর কোনো কাজ থাকে না সেলিনার। অনেক তদবিরের পর কালাম মিয়ার কারখানাতেই কাজ মিলল সেলিনার। ভাগ্যক্রমে কিংবা দুর্ভাগ্যক্রমে তারা একই শিফটে কাজ করত, তাই আলালের দেখাশোনা করার মতো কেউ ছিল না। সেলিনা সারাদিন অন্যমনস্ক হয়ে কাজ করে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে না, গলায় কোথাও কিছু একটা আটকে থাকে। এই নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত সুইং মেশিনের শব্দ ছাপিয়ে তার কানে দুটি শব্দই বাজতে থাকে ‘মা, আক্কা’। কারখানার সবাই কাজে আসার সময় ছোট ছোট টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আসে, কিন্তু সেলিনা কিছু আনে না।
প্রথম প্রথম খালি পেটে বিকেলবেলা হাত-পা কাঁপত, আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেছে। সন্ধ্যার আগের সময়টা সবচেয়ে বিষণ্ণ সময়, কিন্তু সেলিনার কাছে সেই সময়টাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আনন্দের। এক প্লেটে ভাত নিয়ে ছেলেকে খাওয়ায় আর নিজেও খায়। আনন্দ আর ভাত ভাগাভাগির এই সুখের দৃশ্য দেখার জন্য একজনই দর্শক থাকে এবং সেই ভাগ্যবান দর্শক হয়ে কালাম মিয়ার মনটাও সুখে ভরে যায়।
বিন্দু বিন্দু করে আধাপেটে থেকে কয়েক বছরে প্রায় লাখ টাকা জমিয়ে ফেলল সেলিনা বেগম আর কালাম মিয়া। কেউ জানল না তাদের বস্তিতে এক লাখপতি দম্পতি বাস করছে। বুঝবেই বা কীভাবে, সেই যে রোজার ঈদে একটা সাড়ে তিনশ টাকার শাড়ি কিনেছে সেলিনা, সেটাই তার একমাত্র অক্ষত শাড়ি। কালাম মিয়ার লুঙ্গি আর কাজে যাওয়ার প্যান্টেও সুঁই-সুতা লেগেছে। কিন্তু তাদের কোনো আফসোস নেই, সারাদিন কারখানায় শার্ট-প্যান্টের পাশাপাশি স্বপ্নও বুনে তারা। কালাম মিয়া বানানো শার্ট আয়রন করে, কাপড়ের ভাঁজ মেটাতে মেটাতে তার কপালের ভাঁজও মিটে যায় সুখস্বপনে। আরো কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামে চলে যাবে তারা। একটা গাভী কিনবে, সেটা পালবে তার বউ, সে গরুর পেছনে সময় দিতে পারবে না। সে গরু নিয়ে ব্যস্ত থাকলে গঞ্জে দোকান সামলাবে কে? হ্যাঁ, গঞ্জে একটা দোকানও দিবে সে। সেই দোকানে আদা দিয়ে রং চা আর তাদের গাভীর দুধের চা বেচবে। লজেন্স, কলা, পাউরুটি, বিস্কুটও থাকবে তার দোকানে। গ্রামের মানুষ অবশ্য বাকি চাইবে, প্রথম প্রথম বাকি দিবে সে, কাস্টমার ধরতে হবে না! একবার কাস্টমার ধরতে পারলে আস্তে আস্তে জিনিসপত্র বাড়াবে। আলাল থাকবে নবাবের মতো, শুয়ে থাকা নবাব।
হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে কল্পনার চায়ের দোকান থেকে বাস্তবের আয়রন রুমে ফিরে এলো কালাম মিয়া। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে, সে বুঝতে পারছে না, আগুন লেগেছে নাকি? ভূমিকম্প হচ্ছে হয়তো, বিল্ডিংটা কাঁপছে। সেও দৌড় দিলো সিঁড়ির দিকে, সেলিনাকে দেখতে পেল তার দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে, তারপরই সব অন্ধকার।
কালাম মিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল, কিন্তু চোখ খোলার পরেও সব অন্ধকারই লাগছে। সে নড়াচড়া করতে পারছে না, মনে মনে ভাবছে সে বুঝি মারা গেছে। কবরে আছে, এখনই মুনকার-নাকির আসবে তিনটা প্রশ্ন করতে। মনে মনে তিনটি প্রশ্নের উত্তর আওড়ে নিলো, একটু ভালো লাগছে, তিনটা প্রশ্নের উত্তরই সে মনে রাখতে পেরেছে। একটু পরই সে অল্প অল্প শব্দ শুনতে পেল, তাকে কেউ ডাকছে। যে ডাকছে সে যে মুনকার কিংবা নাকিরের মধ্যে কেউ না সেটা সে ভালোই বুঝতে পারছে।
শব্দটা এবার স্পষ্ট শুনতে পেল কালাম মিয়া, ‘আলালের বাপ! আলালের বাপ!’
এটা তো আলালের মায়ের গলা, তাহলে কি সেও মরে গেছে? নাকি দুজনেই বেঁচে আছে? সেও ডাকতে চেষ্টা করল সেলিনাকে, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। একটু থেমে আবার ক্ষীণভাবে ডাকল, ‘আলালের মা!’
সেলিনা স্বামীর কণ্ঠ শুনতে পেল, তার মনে একটু বল ফিরে এলো, সে উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘আলালের বাপ, তুমি আছো? কী হইছে এইখানে?’
আলালের বাপও কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারছে তারা মরেনি, কারণ এখন সে চারপাশ থেকে গোঙানির মতো শব্দ পাচ্ছে। মাঝে মাঝে ক্ষীণ স্বরে কিছু আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
আলালের বাপ ঘোলা ঘোলা কণ্ঠে জবাব দিলো, ‘জানি না।’
সেলিনা নিজের শরীরটা নাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তার বাঁ হাতটাতে তীব্র একটা ব্যথার অনুভূতি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। ব্যথাটা সহ্য করতে না পেরে গুঙিয়ে উঠল সে। উপুড় হয়ে আছে সে, ঘাড় ছাড়া আর কিছুই নাড়াতে পারছে না। ব্যথাটা বাড়ার সাথে সাথে তার গোঙানিটা আর্তনাদে রূপ নিচ্ছে।
কালাম মিয়া সেলিনার আর্তনাদ শুনে উঠে পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। সে চিৎ হয়ে আছে, মাথাটা ওপরের দিকে ওঠাতেই একটা দেয়ালে আঘাত লাগল। তার ওপরে একটা দেয়াল আছে, তাই সে পাশে নিজের শরীরটা ঠেলতে লাগল, কিন্তু পাশেও কংক্রিটের কিছু একটা আছে, সম্ভবত পিলার হবে। পিলারটার ওপরেই দেয়ালটা পড়েছে, তাই তার তেমন কোনো আঘাত লাগেনি। কিন্তু তার পক্ষে দেয়াল আর পিলার সরিয়ে বের হওয়া অসম্ভব। অনেকক্ষণ এদিক-সেদিক ঠেলাঠেলি করে কালাম মিয়া বের হতে না পেরে অসহায়ভাবে চিৎকার করতে লাগল, ‘কেউ আমরারে বাঁচান, বাঁচান কেউ।’
তার নিজের চিৎকার তার কানে এসে বিঁধল, কেউ শুনছে বলে মনে হয় না।
সেলিনা আর্তনাদ করতে করতে মূর্ছা গেল। কালাম মিয়া আবার ডাকল সেলিনা বেগমকে, ‘আলালের মা! আলালের মা!’
কিন্তু কোনো সাড়া পেল না, কালামের মনে এবার প্রচণ্ড ভয় আঘাত করল, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আবার ডাকল, ‘আলালের মা, তোমার কী হইছে?’
কিন্তু আশেপাশের গোঙানির শব্দই শুধু শোনা যাচ্ছে, আলালের মার গলা শোনা যাচ্ছে না। কালাম মিয়া আবার সেই কংক্রিটের কবর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মুহূর্তেই সে তার শক্তির অপ্রতুলতা টের পেল। নিষ্ফল চেষ্টা শেষে তার চোখ ছাপিয়ে অশ্রু এলো, সে অশ্রু তার কানে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
কালাম মিয়ার চোখে যখনই পানি আসে, সে কোনো না কোনোভাবে তা লুকানোর চেষ্টা করে। তার বিয়ের দিন যখন সেলিনা তার সইয়ের গলা জড়িয়ে কাঁদছিল তখন তার চোখেও পানি চলে এসেছিল, লুকানোর অনেক চেষ্টা করেছিল সে, কিন্তু তার চাচা দেখে ফেলেছিল। সেদিনই তিনি তার মাকে দুঃসংবাদ দিলেন যে তার ছেলে হাতছাড়া হয়ে গেছে, সে সারাজীবন বউয়ের গোলাম হয়ে থাকবে বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।
সিনেমায় নায়ক-নায়িকার কষ্টেও কালাম মিয়ার চোখে পানি চলে আসে, অন্ধকার সিনেমা হলে সেলিনার চক্ষু এড়িয়ে নিজের চোখ মুছত সে, সেলিনা ঠিকই দেখতে পেত, কিন্তু কখনো বুঝতে দিত না।
আলালের জন্মের পরও কালাম মিয়া কেঁদেছে, দুলালের মৃত্যুতে কেঁদেছে নাকি আলালের বেঁচে যাওয়াতে কেঁদেছে তা জানা যায়নি। তবে ঘরের দরজার সামনে কাঁপা কাঁপা গলার আজান শুনেই সেলিনা বেগম বুঝেছিল তার স্বামী কাঁদতে কাঁদতে আজান দিচ্ছে।
আজ কালাম নিজের অশ্রু লুকাবার কোনো চেষ্টাই করছে না, সে চাইছে সেলিনা তার কান্না দেখুক।
কালাম মিয়ার পাশের পিলারটির নিচে কয়েক ইঞ্চি ফাঁকা জায়গা আছে, সে বহু চেষ্টা করে নিজের শরীরটাকে মুচড়ে তার বাম হাতটা সেই ফাঁকা জায়গা দিয়ে বের করল। এত ছোট ফাঁক দিয়ে হাতটা বের করতে গিয়ে হাতের বিভিন্ন জায়গায় ছিলে গেল, মেঝের ধুলোগুলো লাগার পর প্রচণ্ড জ্বালা করছে হাতে। হাতটাকে প্রসারিত করতেই কারো চুলে হাত লাগল তার, চুল হাতড়ে হাতটা মুখের কাছে আনতেই সে টের পেল এ মুখ সে এর আগে বহুবার স্পর্শ করেছে।
কালাম মিয়ার হাতের স্পর্শ লাগার পর আবার জ্ঞান ফিরে এলো সেলিনার। অতি পরিচিত হাতের অপরিচিত স্পর্শ পেয়ে সেলিনা যেন অকূল পাথারে ডুবতে ডুবতে পায়ে ডাঙার ছোঁয়া পেল। কালাম মিয়া সেই পরিচিত মুখটার নড়াচড়া অনুভব করল। তার চোখ বেয়ে আরো জল অবিরাম তার কানে যাচ্ছিল; এটা সুখের কান্না।
কালাম মিয়া এক মুহূর্তের জন্যও তার হাতটা সেলিনার মুখ থেকে সরাল না। এখানে আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে, বাতাসের সাথে ধূলি মিশে আছে। গলা শুকিয়ে খড় খড় করছে সেলিনা আর কালামের। সময়ের সাথে সাথে আর্তনাদ, গোঙানি, আকুতি সবকিছুই কমে আসছে। আস্তে আস্তে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে আসছে চারদিকে।
সেলিনা ব্যথাটাতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে, ঘুম কিংবা অচেতন হওয়ার মাঝের সময়টা সে শুধু আলালের কথাই ভাবছে। ছেলেটা কি এখনো না খেয়ে আছে? নিশ্চয়ই মাকে ডাকছে, ডেকে ডেকে তার গলাও হয়তো এমন শুকিয়ে আছে, কেউ কি একটু পানি খাওয়াচ্ছে তাকে? সে তো তার তৃষ্ণার কথা কাউকে জানাতেও পারে না। এসব ভাবতেই বুকের ভেতর হু হু করে ওঠা ব্যথা গলায় এসে দলা পাকিয়ে আটকে যাচ্ছে। সে ব্যথাটা তার হাতের ব্যথার চেয়েও অনেক বেশি।
আলালের বাপকে ডেকে অনেক কষ্টে বলল, ‘আলালের বাপ, বিউটি ভাবি আমাগো আলালরে খাওয়াইবো না কও?’
‘হ খাওয়াইবো।’
‘হ, একবার যে দেরি অইয়া গেছিল, হেদিন তো হে আলালরে গিয়া কলা আর পানি খাওয়াইছিল।’
‘কয়দিন খাওয়াইবো, আমরা তো মইরাই যামু, হেরপর কাদের-’
কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না কালাম মিয়া। এমনিতে কথা বলতে খুব কষ্ট হয়, কথা বললে তৃষ্ণা আরো বাড়ে, যদি কষ্ট না-ও হতো তবুও এই কথাটা সে শেষ করতে পারত না।
সেলিনা বেগমের বুকের ভেতর দলা পাকানো ব্যথাটা যেন বহুগুণে বেড়ে গেল। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আলালের উপ্রে আল্লা এত জুলুম করব না, আমাগো বাঁচাইতে লোক পাড়াইবো আল্লায়।’
কালাম মিয়া মৃদুভাবে ‘হু’ করে একটা শব্দ করল, কথা বলে নিজের বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিটা ক্ষয় করতে চায় না সে। তারপর তারা অপেক্ষা করতে লাগল, একটু আলোর অপেক্ষা।
মনে হচ্ছে অনন্তকাল পেরিয়ে গেছে, অধিকাংশ সময় তারা অচেতন ছিল, তাই সময়ের কোনো আন্দাজ নেই। চারদিকে উৎকট পচা গন্ধ ভাসছে, নিঃশ্বাস নেওয়া আগের চেয়ে বহু কঠিন হয়ে গেছে। আলালের চিন্তা না থাকলে মৃত্যুপ্রার্থনা করত সেলিনা। বাঁচার তীব্র আশা না থাকলে সেলিনা বেগম হয়তো এতক্ষণে মারা যেত, নিজের অসাড় শরীরটার ভেতরে নিঃশ্বাসের প্রবাহ বজায় রাখার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক সহজ মনে হচ্ছে তার। ক্ষুধা নিয়ে থাকার অভ্যাস সেলিনার আছে, কিন্তু পানির তেষ্টাটাকে কোনোভাবেই দমাতে পারছে না, মৃত্যুর আগে নাকি খুব তেষ্টা পায়।
কালাম মিয়াও এখন অধিকাংশ সময় অচেতন হয়ে থাকে, জ্ঞান থাকলেই কষ্টটা বাড়ে। তার পানির তৃষ্ণা এতটাই যে নিজের প্রস্রাবও খাওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। এখন তো প্রস্রাবও হচ্ছে না।
সেলিনা বেগম বুঝতে পারছে তার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও সে আজরাইলের প্রতিরূপ দেখতে পাচ্ছে। কালামকে ডেকে অবশিষ্ট শক্তিটুকু দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘আলালের বাপ, আমি মনে অয় মইরা যাইতাছি, হুমাস (নিঃশ্বাস) নিতে পারতাছি না।’
আলালের বাপ কোনো আশার বাণী শোনাতে পারল না, শোনালেও সেটা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য হবে না। তাই সে চুপ করে রইল।
মুখ হা করে সেলিনা বেগম আবার জোরে লাশের পচা গন্ধযুক্ত কিছু বাতাস বুকে ঢুকিয়ে কোঁকাতে কোঁকাতে বলল, ‘তুমি বাঁইচ্যা গেলে আমার আলালের খেয়াল রাইখো।’
কথা বলার সময় বুক ফেটে কান্না এলো, কিন্তু কাঁদতে পারল না, সে শক্তি তার নেই। কথা বলার সময় শুকনা জিহ্বার সাথে মুখের বিভিন্ন অংশ লেগে মুখের ভেতর জ্বালা করে, তবুও সে বলতে লাগল, ‘আলাল শক্ত ভাত খাইতে পারে না, তুমি এক্কেরে নরম কইরা ভাত মাইখ্যা খাওয়াইও। বিছনার নিচে পলিথিন দিয়া শোয়াইও আর ও মুইছ্যা পাউডার দিয়ো নাইলে ঘাও অইয়া যায়। রাইতে হাত দিয়া বুক ঘইস্যা দিলেই ঘুমাইয়া যাইবো, আর কুনু কিচ্ছু অইলেই তো খালি মা আক্কা কইয়া চিল্লায়, মা তো তহন থাকবো না, তুমি দেইখো।’
সেলিনা বেগম আর পারছে না, কালাম মিয়াও হয়তো আর শুনতে পারত না। মা ছাড়া আলালকে সে চিন্তাই করতে পারে না। আলালের কথা মনে হলেই তার শুধু একটা দৃশ্যই চোখে ভাসে, আলালের মা ভাত মেখে তার ছেলেকে খাওয়াচ্ছে। আলালের জন্য হলেও আলালের মায়ের বাঁচা বেশি দরকার, মা ছাড়া আলাল হয়তো এমনিতেও বাঁচবে না।
কালাম মিয়া আলালের মায়ের মুখে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিলো, মুখটা হা হয়ে আছে, কিন্তু মুখটা এখনো উষ্ণ, মনে হয় কথা বলতে বলতে অচেতন হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল, পানি না পেলে কিছুক্ষণের মধ্যে আলালের মা মারা যাবে। তার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কিছুই ঠিকমতো ভাবতে পারছে না, চিন্তাগুলো লাগামহীন ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে। তার চিন্তার ঘোড়া হঠাৎ করে থামল, নিজের চোয়াল শক্ত করে নিলো সে। ধারালো কিছু হাতড়ে বেড়াচ্ছে সে, সেলিনার মাথার ওপর দিকে হাত দিতেই একটা পিলারের থেকে বেরিয়ে থাকা রড হাতে লাগল তার। পিলারের রড এত চিকন হয় না, কিন্তু এটা চিকন আর আগাটা ভেঙে সুচালো হয়ে আছে। কালাম মিয়া বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে রডটার মাথা ধরে নিজের গায়ের অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে টান দিলো। রডটা নিজের জায়গায় অক্ষত অবস্থায় রইল, কিন্তু তার আঙুল কেটে গেল। সে হয়তো এটাই চাইছিল। কালাম মিয়ার আঙুল থেকে রক্ত বেয়ে পড়ছে, সে দেরি না করে আঙুলটা সেলিনার হা করা মুখে ঢুকিয়ে দিলো। মুখে গরম নোনতা তরল প্রবাহে সেলিনা জ্ঞান ফিরে পেল, কিছু না ভেবেই সে নিজের অজান্তেই আঙুলটা চুষে পিপাসা মেটাতে থাকল। কালাম মিয়া বুঝল সেলিনা জ্ঞান ফিরে পেয়েছে, শরীরটা দুর্বল লাগলেও মনে মনে সে কোথায় যেন প্রচণ্ড শক্তি অনুভব করল।
সেলিনার অনেকক্ষণ লাগল বুঝতে যে সে কালাম মিয়ার রক্ত চুষে খাচ্ছে। তার পিপাসা না মেটা সত্ত্বেও সে আঙুলটা মুখ থেকে বের করে দিলো, তখনো আঙুল বেয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। সেলিনা এখনো অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় আছে, আঠালো রক্তে গলাটা চট চট করছে। মনে খানিকটা অপরাধবোধও হচ্ছে তার, দুর্বল কণ্ঠে বলল, ‘এইডা তুমি কী করলা, আলালের বাপ?’
কালাম মিয়া সেলিনার কণ্ঠ শুনে খুব আশ্বস্ত হলো, মুখ দিয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস টেনে গলায় যথা সম্ভব জোর দিয়ে বলল, ‘কিছু অইত না আমার, আমি আবাজ (আওয়াজ) পাইছি, আরেকটু কষ্ট কইরা থাকো, লোকজন আইবো। তোমার গলা হুকায়া গেলে আঙুলে চোষণ দিয়ো, এদ্দুর রক্ত গেলে আমার কিচ্ছু অইতো না।’
সেলিনা চুপ করে গেল, মনটা তার স্বামীর জন্য গভীর মমতায় ভরে গেল। এক বুক ব্যথা আর মমতা নিয়ে সেলিনা ঘুমে ঢলে পড়ল। মাঝে মাঝে সেলিনা বেগমও শব্দ শুনতে পেয়েছে, কিন্তু সেটা বাস্তব না কল্পনা সে বুঝতে পারছে না, এর মধ্যে কয়বার যে সে কালাম মিয়ার আঙুল মুখে পুরেছে সেটা তার মনে নেই। প্রতিবার মনে অপরাধবোধ জেগেছে, কিন্তু নিজেকে আটকাতে পারেনি।
উৎকট গন্ধটা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। সেলিনার মনে আছে, ছোটবেলায় তাদের বাড়ির পাশে খালে একবার একটা মরা গরু ভেসে এসেছিল, তিন দিন ভাত খেতে পারেনি সে, সেই গন্ধটা এখনো মনে আছে, কিন্তু এই গন্ধটা সেই মরা গরুর গন্ধ থেকেও মনে হয় একশ গুণ বেশি। আলালও গন্ধ সহ্য করতে পারে না, বিছানায় প্রস্রাব করলেও নাক কুঁচকে মাকে ডাকে, ‘মা আক্কা।’
আলালের কথা মনে হতেই, গভীর নিঃশ্বাসগুলো আরো গভীর হয়ে গেল, গলাটা আবার শুকিয়ে গেছে। প্রয়োজন কোনো বাধা মানে না, কোনো সংকোচ মানে না, তাই সেলিনা আবার তার স্বামীর আঙুল মুখে নিয়ে চুষতে লাগল। কিন্তু একখণ্ড জমাটবাঁধা রক্ত তার গলায় গিয়ে আটকে থাকল আর কিছু বের হলো না।
সেলিনা আরো জোরে চুষতে লাগল, কিন্তু কোনো উষ্ণপ্রবাহ নেই, হাতটাও অতিরিক্ত রকম ঠাণ্ডা। সেলিনার ভেতরটা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠল, রক্তখণ্ডটি গিলে, কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকতে লাগল, ‘আলালের বাপ! আলালের বাপ!’
কিন্তু কোনো সাড়া পেল না, ঠান্ডা হাতটাই প্রমাণ দিচ্ছে তার আশঙ্কাটা সত্য। কালাম মিয়া মারা গেছে। স্বামীর মৃত্যুতে দুঃখ্যাপন করার মতো অবস্থাও নেই সেলিনার, এখনো কালাম মিয়ার হাতটা তার গাল ছুঁয়ে আছে, একটা শীতল অনুভূতিহীন স্পর্শ। সেলিনা আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
ফার্মগেটের ওভারব্রিজের ওপর ভিখারিদের সারি, সবার মাথাতেই টুপি, কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো দুটোই নেই। একজনের সবকিছুই আছে, কিন্তু পুরোপুরি অক্ষম। তার অক্ষমতা মানুষজন বুঝছে না, ভাবছে সুস্থ মানুষ শুয়ে আছে। তাকে কেউ ভিক্ষা দিচ্ছে না। প্রচণ্ড রোদে সে সূর্যের দিকে মুখ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, দরদর করে ঘামছে আর তার নিচের লুঙ্গি দিয়ে বানানো বিছানাটা একেবারে ভিজে গেছে। সে ভিক্ষা চাইতেও জানে না, শুধু চেঁচায়, ‘মা, আক্কা! মা, আক্কা!’
লোকজন তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, কেউ কেউ তার হাতের ওপর পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে, সে ব্যথা পেয়ে যত জোরেই চ্যাঁচাক, কেউ শুনছে না। হঠাৎ সে আর্তনাদ করে উঠল, ‘কেউ আছেন? কেউ আছেন?’
ঠিক তখনই সেলিনার ঘুম ভেঙে গেল, ঘুম ভাঙার পরেও সে শুনতে পেল শব্দটা, ‘কেউ আছেন? কেউ আছেন?’
একটু পরে মনে হলো কেউ যেন একটা জ্বলন্ত সূর্য তার চোখের সামনে ধরল, এত আলো সে আগে কখনো দেখেনি। চোখ খোলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। কেউ যেন বলে উঠল, ‘এইদিকে এইদিকে, একজন বাঁইচ্চা আছে।’
লোকগুলো যখন সেলিনাকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেলিনার মনপ্রাণ জুড়ে আলালের চিন্তা। সে সবসময় ভাবত আলালকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, কিন্তু আজ তার ভুল ভাঙল। কালাম মিয়া একবার কাদের সরকারকে বুক ফুলিয়ে বলেছিল, রক্ত দিয়ে হলেও তার ছেলেকে ভিক্ষা করতে দিবে না। সে আসলেই রক্ত দিয়ে তার ছেলেকে রক্ষা করল। সেলিনা বেগম ভাবল, কেউ জানবে না তার স্বামী তার ছেলের জন্য কী উপহার দিয়ে গেল। এত দামি উপহার বোধ হয় আর কেউ কোনোদিন দিয়ে যেতে পারেনি কাউকে। নিজের জীবন দিয়ে কালাম মিয়া তার ছেলেকে ‘মা’ উপহার দিয়ে গেল।
