একটি শাড়ি ও কামরাঙ্গা বোমা
হালিম মোল্লা তাঁর দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে গঞ্জে যাচ্ছেন। অবশ্য ছেলের বয়স দশ নাকি এগারো এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। ছেলের নাম রেখেছেন জয়নাল আবেদীন, বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর নামে নাম। পরে জেনেছিলেন নামটা আসলে জয়নুল আবেদীন। তাঁর ধারণা নামের ওপর মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রভাব পড়ে। কিন্তু ছেলের হাতের লেখা দেখার পর তাঁর এই ধারণার প্রতি খুব একটা আস্থা রইল না।
হালিম মোল্লা খুব নির্ভেজাল মানুষ, গ্রামের কারো সাথে তাঁর কোনোদিন বিবাদ হয়নি। শুধু তাই নয়, কেউ কোনোদিন তাঁকে উচ্চস্বরে কথা বলতেও শোনেনি। কেউ যদি সহজ-সরলের প্রকৃষ্ট উদাহরণ দিতে চায়, তাহলে হালিম মোল্লার নামই প্রথমে আসবে। তিনি পিতৃপ্রদত্ত সম্পত্তির অধিকাংশ বিক্রি করে দিয়ে গ্রামে একটি মসজিদ বানিয়েছেন আর সে মসজিদের তিনি নিজেই ইমাম, সকালবেলা গ্রামের বাচ্চাদের বিনে পয়সায় কুরআন পড়ান। তাই গ্রামের প্রায় সবাই তাঁকে উস্তাদজি ডাকে, এমনকি তাঁর বউও তাঁকে উস্তাদজি ডাকে, কিন্তু সেটা প্রায়শই ব্যঙ্গ করে।
হালিম মোল্লার বউয়ের নাম খুশি, কিন্তু তার বেলাতেও নামের সাথে স্বভাবটা মিলেনি। খুশিকে কেউ কোনোদিন খুশি দেখেছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। স্বামীর উদাসীনতা নিয়ে খুশি সবসময়ই বিরক্ত থাকে। যেখানে গ্রামের বধূরা স্বামীর ভয়ে তটস্থ থাকে, সেখানে খুশির ভয়ে তাঁর স্বামী রীতিমতো আতঙ্কে থাকে। সে ছাড়া আর কেউ এই হ্যাবলা লোকটার সাথে দিনযাপন করতে পারত না, এই ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ নেই এবং তা স্বামীকে তিন বেলা উচ্চস্বরে তীব্র তিরস্কারের সাথে মনে করিয়ে দেওয়াটা তিনি দায়িত্ব মনে করেন।
গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে। বর্ষাকালে তারা মাছ ধরে অথবা বাঁশের চাঁই বানায়, কিন্তু হালিম মোল্লা নামাজ পড়ানো আর বাচ্চাদের পড়ানো ছাড়া আর কিছু করেন না। জমিজমা যা কিছু আছে তা বর্গা দিয়েছেন, সেখান থেকে যা আসে তা দিয়ে কীভাবে সংসার চলে তা একটা রহস্য। বউ যতই বকাঝকা করুক, সে ছাড়া আর কেউই এভাবে সংসার চালাতে পারত না এটা হালিম মোল্লা ভালোই বুঝেন।
হালিম মোল্লার মনটা আজ বেশ ভালো, আজ প্রথম তিনি বউয়ের জন্য শাড়ি কিনবেন। মনে মনে ভাবছেন শাড়ি হাতে পাওয়ার পর বউয়ের মুখের ভাব কী হবে। তিনি জানেন শাড়িটা দেখামাত্রই বউ তাকে এই অতিরিক্ত টাকা খরচের জন্য অভিশাপ দেবে, শাড়ির রঙটা তার কাছে একেবারেই কাঁচা মনে হবে, দুই দিনে রং চলে যাবে বলে ভবিষ্যৎবাণী করবে, দোকানি তাঁকে ঠকিয়ে বেশি টাকা নিয়ে গেছে বলেও তিরস্কার করবে। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে শাড়িটার কী কী খুঁত আছে তা দেখার ছলে বারবার হাতে নেবে, তখন তার চোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, ঘোমটা টেনে সে উজ্জ্বলতা ঢাকার চেষ্টা করবে বারবার। হালিম মোল্লা বউয়ের চোখে সেই উজ্জ্বলতা দেখার জন্যই এতদিন ধরে বউকে না জানিয়ে টাকা জমাচ্ছেন।
জয়নালও আজ ভীষণ খুশি, বাবার সাথে যেদিন সে গঞ্জে যায় সেদিন তার খুব ভালো লাগে। এমন না যে বাবা তাকে লেবেঞ্চুস, হাওয়াই মিঠাই অথবা বাতাসা কিনে দেয়, তাও তার ভালো লাগে। তাদের গ্রাম থেকে প্রায় এক মাইল দূরে গোয়ালমারি বাজার, দুই ধারে ফসলি ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে আইল ধরে যেতে হয়। পাশের জমিতে ধানগাছগুলো বাতাসে নুয়ে নুয়ে পড়ে, মনে হয় যেন তাকে কুর্নিশ করছে। বর্ষাকালে এই জমিগুলো ডুবে যায়, গ্রামগুলোকে এক একটা দ্বীপ মনে হয়, তখন নৌকা ছাড়া গঞ্জে যাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। সেই নৌকার দুলুনি, পানিতে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দও জয়নালের খুব ভালো লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগে গঞ্জে নানারকম মানুষ দেখে।
দুপুরে গোসল করে খেয়েদেয়ে তেল চপচপে মাথায় সবাই গঞ্জে আসে, কেউ কিনতে আসে, কেউ বিক্রি করতে আসে। সবার মুখেই একটা সুখী সুখী ভাব থাকে, এইসব মানুষদের একমাত্র সমস্যা, তারা বেজায় দরিদ্র। কিন্তু সুখী হওয়ার জন্য তাদের ছোট ছোট হাজারটা উপলক্ষ আছে, কেউ হয়তো এক টাকা কম দিয়ে এক ভাগ মাছ কিনেছে, তাতেই হয়তো তার সারাটা দিন মন ভালো থাকবে। জয়নাল এই গঞ্জে এসে এখানে সুখের হাট দেখে। অনেক বাচ্চাই বাজারে আসে যারা জয়নাল থেকে কম বয়সি, তারা বাজারের খালি থলেটা হাতে নিয়ে বাবার পিছু পিছু হেঁটে যায়, শুধু বাবার লুঙ্গির দিকে নজর থাকে তাদের, যাতে হারিয়ে না যায়। অনেক সময় একরকম লুঙ্গির কারণে অনেক বাচ্চা নিজের বাবা মনে করে অন্য মানুষের পিছু নেয়। যখন ওপরে তাকিয়ে বুঝতে পারে তার বাবা পরিবর্তন হয়ে গেছে তখন ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকে, কিন্তু বেশিক্ষণ কাঁদতে হয় না তাকে। সবাই এখানে সবাইকে চিনে, কেউ হয়তো তার বাবাকে খুঁজে এনে দেয়, তখন বাচ্চাটির মুখে অভিমানের সাথে আনন্দের যেই অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে তা দুই টাকার কদমা কিনে দিলেও দেখা যাবে না। তারপর থেকে এই বাচ্চা আর বাবার কুর্তার কোনা ছাড়বে না। জয়নাল কুর্তা ধরা বাচ্চাদের দেখলেই বুঝে লুঙ্গি অনুসরণ পদ্ধতিতে এরা আগে একবার প্ররোচিত হয়েছে।
সপ্তাহে এক দিন হাট বসে এই গঞ্জে, কিন্তু আজকে গঞ্জের পরিবেশ একটু থমথমে। জয়নাল গঞ্জে ঢুকেই বুঝতে পারল অন্যান্য হাটবারের তুলনায় আজ মানুষ অনেক কম। কারো মুখেই সেই সুখের চিহ্ন নেই, শুধু তার বাবার মুখ ছাড়া। বায়োস্কোপের লোকটাকে আজ দেখা যাচ্ছে না, চিট-মিঠাইওয়ালাও মনখারাপ করে বসে আছে, মাছ ধরার চাঁই বিক্রি করতে আসা বোরহান চাচা চাই ফেলে দূরে কয়েকজন মানুষের সাথে কথা বলছেন। নেকবর পাগলার মনটা আজ মনে হয় বেশি খারাপ, আজ বাজারে তেমন বাচ্চা নেই, সে ভয় দেখিয়ে মজা পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর পর সে খালেক চাচার মুদি দোকানে বসে থাকা লোকগুলোর পাশে গিয়ে তাদের কথা শুনছে, আবার দূরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। নেকবর পাগলা জয়নালকে দেখেই চিৎকার করতে আরম্ভ করল, ‘লাশ খামু, ঢাকা যামু।’
জয়নাল বাবার হাতটা চেপে ধরে সামনে এগিয়ে গেল, আর নেকবর পাগলার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালো, নেকবরের চোখে একটা আতঙ্ক দেখতে পেল সে, যা আগে কোনোদিন দেখেনি। কল্পনার চেয়েও কম দামে খুব ভালো একটি শাড়ি কিনলেন হালিম মোল্লা, মাত্র সাত টাকা চার আনায় এত ভালো শাড়ি পাওয়া যাবে চিন্তাই করেননি তিনি। ছেলেকে আট আনায় বাতাসাও কিনে দিলেন। বাজারের বাতাসে শুধু ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে, ‘ঢাকা, মিলিটারি, লাশ, যুদ্ধ, মুজিব’ ইত্যাদি শব্দ ভাসছে। কিন্তু হালিম মোল্লা শুধু তাঁর বউয়ের চোখের উজ্জ্বলতার কথা ভাবছেন, অন্য কোনো কথাই তাঁর মাথায় ঢুকছে না।
বর্ষাকাল চলে এসেছে, বর্ষাকালে এখানে পাকা বাঁশের গন্ধে পুরো গ্রাম মৌ-মৌ করে, বাড়ির উঠানে বসে গ্রামের লোকেরা গল্প করতে করতে চাই, ঝুড়ি বানায়। বাড়ির মেয়েরাও কাঁথা সেলাই বাদ দিয়ে ঝুড়ি বানাতে বসে আর পাশের বাড়ির নতুন বউয়ের কত খুঁত আছে তা নিয়ে আলোচনা করে। গ্রামে নতুন কারো বিয়ে হলে তারা খুব খুশি হয়, কয়েকদিনের গল্প করার রসদ পাওয়া যায়। দিনে নতুন বউদের নিন্দা করলেও রাতে তাদের গল্পের কবলে পড়ে জিন-ভূতেরা। কুপির কাঁপা কাঁপা আলোয় তারা গল্প করে, এক গল্পই হয়তো আগে একাধিকবার বলা হয়েছে, কিন্তু কেউই শুনতে ক্লান্তিবোধ করে না, আগেরবারের চেয়ে এবারেরটা আরেকটু বেশি ভয়ানক হয়, আগেরবারের শিং ছাড়া ভূতের এবার শিংও গজায়, তবুও কেউ অবিশ্বাস করার দুঃসাহস করে না। ক্রমান্বয়ে একজনের ভূত থেকে আরেকজনের ভূত আরো বেশি হিংস্র হয়, যেন একটা প্রতিযোগিতা, সবচেয়ে যে বেশি ভয় দেখাতে পারে, সে মনে মনে একটা আত্মপ্রসাদ অনুভব করে। তারপর নিজেই ভয় পেতে পেতে শুতে যায়, রাতে ইঁদুরের নড়াচড়াকেও নিজের কল্পনার ভূতের কর্মকাণ্ড ভেবে স্বামীর পিঠে মুখ গুঁজে দেয় এবং এই ভূতের শরীরে লম্বা কালো লোম লাগিয়ে, আকারে চৌদ্দ গুণ বড় করে পরের দিন গল্প শুনিয়ে সবাইকে ভয় দেখায়। এর ফাঁকেই চলে চাঁই বানানো।
কিন্তু এবারের বর্ষার চিত্রটা আলাদা, এবার সবাই কল্পনার জিন-ভূত-রাক্ষস নয়, বাস্তবের রাক্ষস নিয়ে গল্প করছে, দিনের বেলার গল্পেও নতুন বউদের জায়গাটা নতুন রাক্ষসরা দখল করে নিয়েছে, তাদের নতুন রাক্ষসের নাম ‘পাঞ্জাবি মিলিটারি’।
গ্রামে একমাত্র শফিকুলের কাছে রেডিও ছিল, সবাই শফিকুলের কাছ থেকে দেশের খবর নিত, আসলে তাদের খবর নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পাঞ্জাবিরা তাদের কত কাছে আসছে, তা জানা। জয়নাল সারাদিন শফিকুলের ঘরের পাশে বসে থাকে, সবাই খবর শুনতে আগ্রহী, কিন্তু জয়নালের ভালো লাগে গান। গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে তার, অতিরিক্ত লাজুক হওয়ার জন্যই হোক আর গান গাওয়ার অক্ষমতার জন্যই হোক সে কারো সামনে গাইতো না। পুকুরপাড়ের গাবগাছের মধ্যে একটা বড় কোটর আছে, সেটার ভেতরে বসে থাকলে কেউ বাহির থেকে বুঝতে পারে না, সেই কোটরের মধ্যে বসেই জয়নাল গুনগুন করত, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে…’ শফিকুল ভাইয়ের রেডিওতে এই গান শুনেছে সে।
একদিন হঠাৎ করে শফিকুল উধাও হয়ে গেল, কেউ কেউ বলল সে ইন্ডিয়া চলে গেছে, কেউ বলল পাঞ্জাবিরা তাকে মেরে ফেলেছে, কেউ আবার বলল সে মুক্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়েছে। অবশ্য গ্রামের মানুষদের খুব একটা অসুবিধা হলো না, পাঞ্জাবিদের খবরের জন্য তাদের আর রেডিও শোনা লাগে না, কারণ পাঞ্জাবিরা আশেপাশের গ্রামে চলে এসেছে, বিভিন্ন গ্রাম থেকে নৌকা দিয়ে এসে মানুষজন তাদের গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে।
জয়নালদের বড় উঠানেই তাদের জায়গা করে দেওয়া হয়েছে, কত মানুষ যে এসেছে। একটা আট-নয় বছরের ছেলে তার লুঙ্গির কোঁচায় করে অনেকগুলো গুলির খোসা নিয়ে এসেছে, সেগুলো নিয়ে আরো কয়েকটা ছেলেমেয়ে রান্না রান্না খেলছে, গুলির খোসাগুলোকে তারা ভাত বানিয়েছে, একটা পাতায় কয়েকটা গুলির খোসা নিয়ে মুখের সামনে ধরে খাওয়ার মতো করে শব্দ করে। এক বৃদ্ধ উদাস চোখে বাচ্চাদের খেলা দেখছিল, অন্য সময় হলে হয়তো ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিত, গ্রামের বৃদ্ধরা কেন যেন বাচ্চাদের খেলতে দেখলে রেগে যায়, বোধ হয় হিংসায়।
ছেঁড়া শাড়ি পরা এক মা তার ছয় মাস বয়সি বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, তার গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর রেখা দেখা যায়। তার বয়সি কোনো মেয়ে এখানে নেই, সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে, কোলে বাচ্চা থাকলে সেই বাচ্চার কপালে যেখানে মা কারো খারাপ নজর থেকে বাঁচানোর জন্য কালো টিপ দিয়ে দিত, সেখানে হয়তো একটা বুলেট দিয়ে ফুটো করে দিয়েছে অথবা বুলেটও খরচ করেনি, সেই মায়ের ঠোঁট ছোঁয়ানো কপালে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিয়েছে, মা মা বলে বাচ্চার চিৎকার মাকে টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করার আগেই থেমে যেত। কিন্তু এই মেয়েটি বেঁচে গেছে, পাঞ্জাবিরা যখন তার স্বামীর চোখগুলো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে বের করছিল তখন সে প্রাণপণে কাদামাখা পানির ওপর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে এসেছে।
আরো কয়েকজন বৃদ্ধা আছেন, যারা বিলাপ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, আবার ভাতের মাড়টুকু খেয়ে বিলাপ করা শুরু করেন, তবুও তাদের দুঃখ শেষ হয় না। এখানে সবাইকে ভাত খাওয়ানোর মতো আর্থিক অবস্থা কারো নেই, প্রায় সময় ভাতের মাড় দিয়েই অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। গ্রামের ঘাটে সবসময় দুটো বড় নৌকা ভিড়ানো থাকে, যদি পাঞ্জাবিরা এসে পড়লে যেন তাড়াতাড়ি পালানো যায়; একটা মহিলা আর বাচ্চাদের জন্য, আরেকটা পুরুষদের জন্য। এমনিতে এই গ্রামটা একেবারে ছোটো, খুব বেশি মানুষ নেই, আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেকেই ইন্ডিয়ায় চলে গেছে, দুই নৌকায় অনায়াসেই সবার জায়গা হয়ে যাবে।
জয়নালের নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়, নিজের বয়সটাকে দোষারোপ করতে থাকে, এইসব মানুষগুলোর জন্য সে কিছু করতে পারছে না। এসব মানুষদের সামনে যেতে তার কেমন ভয় ভয় লাগে, তাদের চোখের আতঙ্ক জয়নালের চোখেও ছড়িয়ে পড়ে, তাছাড়া মানুষের কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না, গাবগাছের কোটরে গিয়ে নিজে নিজে কাঁদে, আর গুনগুন করে গান গায়, মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে। একই কারণে হালিম মোল্লা সারাদিন মসজিদে পড়ে থাকে।
বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে একদিন জয়নাল গাবগাছের কোটর থেকে তার গুনগুন সঙ্গীতচর্চা, আর অনিচ্ছাকৃত নিদ্রাযাপন শেষ করে উঠতে উঠতে সূর্যটা লাল রং ধারণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সবকিছু অন্যরকম লাগছিল, কেমন নীরব হয়ে গেছে সব। চোখ কচলাতে কচলাতে দেখল ঘাটে দুইটা নৌকা বাঁধা আছে, কিন্তু কোনো এক জাদুবলে সেগুলো আকারে আরো বড় হয়ে গেছে। জয়নাল গ্রামে ঢুকতেই নীরবতাটা যেন একটু প্রখর মনে হলো। ঘাট থেকে গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই প্রথম ঘরটা সুলেমান কাকার, সুলেমান কাকা হুঁকা টানতেন আর কাশতেন, তার কাশি শুনেই সবাই গ্রামে পদার্পণ করত। খৈয়াখালি গ্রামে ঢুকলে এভাবেই সবাই অভিবাধিত হতো। কিন্তু আজ কাকার কাশি শুনতে পেল না জয়নাল, সে নিশ্চিত বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়ে গেছে, কিন্তু এখন তার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে এটাই সবচেয়ে বড় ঘটনা মনে হচ্ছে। নিজের ঘরে এসে সে তার মাকে ডাকতে লাগল, ডেকেই তার নিজের গলার আওয়াজ তার কাছে প্রয়োজনের চেয়ে উঁচু মনে হলো, কিন্তু মায়ের কোনো সাড়া নেই। পাশের ঘরের ইসমাইল কাকার ঘরে উঁকি দিয়েও কাউকে পেল না সে। একটু পরেই জয়নাল বুঝল যে গ্রামে সে একা, আর কেউ নেই। ক্ষুধার্ত পেটে না থাকলে সে হয়তো আরও আগেই বুঝত যে গ্রামে এখন আর কেউ নেই। মুহূর্তেই একাকিত্বের ভয় তাকে গ্রাস করল। ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে রওনা দিল, হয়তো বাবাকে পাওয়া যাবে, এই আশায়। কিন্তু সাত্তার কাকার উঠোনে চোখ পড়তেই সে বুঝল যে গ্রামে সে একা নয়। খাকি পোশাক পরা, অনেক লম্বা আর স্বাস্থ্যবান কিছু লোককে দেখতে পেল। চুপচাপ থমকে দাঁড়ালো সে, হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, মায়ের কাছে শোনা বটগাছের ভূত থেকেও এদেরকে ভয়ানক লাগছে, সম্ভবত তাদের পিঠে ঝুলানো বন্দুকগুলোর কারণেই। বন্দুকের ভারে নুইয়ে পড়া দুইজন বাঙালি সাত্তার কাকার ছাগল দুটি টানতে টানতে ঘাটের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। জয়নাল সাত্তার কাকার ঘরের পিছন দিক দিয়ে গিয়ে মসজিদে পৌঁছালো, ফাঁকা মসজিদটা দেখে তার অন্তরটাও ফাঁকা হয়ে গেল, সাথে সাথে সেই ফাঁকা অন্তর ভয় আর অভিমানে পূর্ণ হয়ে গেল। ঘাটে বাঁধা নৌকা দুটি যে পাঞ্জাবিদের, সেটা বুঝতে আর বেশিক্ষণ লাগল না জয়নালের। তার মানে পাঞ্জাবিরা আসার আগেই গ্রামের সবাই নৌকায় করে অন্য কোথাও চলে গেছে। জয়নালের তার মায়ের ওপর খুব রাগ হলো, তাকে একা ফেলে চলে গেল! কেন যেন বাবার ওপর জয়নাল অভিমান করতে পারে না, বাবা তো এমনই। আসলে জয়নালের বয়সটাই দায়ী, সে না হয়েছে পুরুষ, না রয়েছে বাচ্চা। তাই তার বাবা ভেবেছে সে মায়ের সাথে আছে আর মা ভেবেছে বাবার সাথে আছে, কেউ চিন্তাও করেনি জয়নাল গাবগাছের কোটরে বসে পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠানোতে ব্যস্ত ছিল।
মসজিদের দরজা থেকেই পাঞ্জাবিদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, জয়নাল সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ মনে করল না। নিজের ক্ষুধার্ত শরীরটা নিয়ে লুকিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। পেটের ক্ষুধা ভয়কেও দমিয়ে দিল, রান্নাঘরে ঢুকেই দেখল ভাতের হাঁড়িটি ভেঙে উল্টো হয়ে আছে, ভাত ছড়িয়ে আছে চারপাশে। পাশে সানকিটি মাড়সহ অক্ষত অবস্থায় গর্বিত ভঙ্গিতে জয়নালের দিকে তাকিয়ে আছে। জয়নাল ভাত আর মাড় লবণ দিয়ে মিশিয়ে খাওয়া শেষ করল।
জয়নাল ঘরের লণ্ডভণ্ড অবস্থাটা এতক্ষণে খেয়াল করল, পাঞ্জাবিরা নেওয়ার মতো কিছুই পায়নি তাই ভেঙে দিয়ে গেছে, একটু পরেই হয়তো জ্বালিয়ে দেবে। তার আগে ঘরের মূল্যবান জিনিসগুলো সাথে নিতে হবে, কিন্তু কী নিতে হবে সেটা ঠিক করা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের ঘরে দামি কিছুই নেই। হয়তো তাকে সিদ্ধান্তহীনতা থেকে মুক্তি দিতেই তার চোখে পড়ল তার মায়ের নতুন শাড়ি। সেটাকেই বুকে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল জয়নাল।
ঘর থেকে বেরিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে ছুটল জয়নাল, হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলে উঠল, ‘এ বাচ্চা, ইধার আও।’
মেঘের ধমকের মতো শব্দ কয়টি শুনেই জয়নালের সারা শরীরে বোধহয় কোনো অসুর ভর করল, বিদ্যুৎগতিতে ছুটতে লাগল সে। গোল্লাছুট খেলায় যদি সে এভাবে দৌড়াতে পারত তাহলে হয়তো খেলায় তাকে কেউ ‘দুধভাত’ ডাকত না। অবশ্য গোল্লাছুট খেলায় যদি বন্দুক হাতে কোনো পাঞ্জাবি পিছনে থাকত, তাহলে সে হয়তো খেলাতেও এভাবে দৌড়াতে পারত।
চোখগুলো বন্ধ ছিল, ভাবল এই বুঝি পিছন থেকে গুলির শব্দ পাবে। কিন্তু গুলির শব্দ হওয়ার আগেই সে গাবগাছের কোটরে গিয়ে পৌঁছালো। এই গাবগাছ তার কাছে এখন মায়ের কোলের মতোই নিরাপদ।
সারারাত সেই গাছের কোটরেই কাটালো সে, নিজের গ্রামটাকে মৃত মনে হচ্ছে তার, অসহ্য রকম নীরব। একসময় ভোরের আলো ফুটে উঠল, কিন্তু খৈয়াখালি গ্রাম থেকে হালিম মোল্লার আজান শোনা গেল না। জয়নাল পায়ে হেঁটে ‘বোতল বাড়ির’ দিকে চলল।
তাদের গ্রামের পাশেই জমি ভরাট করে বাড়ি করা হয়েছে, সেটাকেই সবাই বোতল বাড়ি বলে। অবশ্য প্রথমে এই বাড়ির নাম বোতল বাড়ি ছিল না। এখানে একটা বটগাছ ছিল, তার নিচেই বাড়ি করা হয়েছে, তাই বটগাছের কল্যাণে বাড়ির নাম হল ‘বটতলা বাড়ি’। কিন্তু বটগাছের দুর্ভাগ্য, এত কষ্ট করে পুরো নাম কেউ বলত না, বলত ‘বতলা বাড়ি’। এই অভিমানেই বোধ হয় বটগাছটা শুকিয়ে মরে গেল। কালের বিবর্তনে সেই বাড়ি এখন আবার অর্থবোধক হয়ে বতলা থেকে বোতল হয়েছে।
বোতল বাড়ির পাশেই একটা খাল আছে, সেই খাল পার হলেই ওইপাশে উঁচু সড়ক, আর সড়ক দিয়ে হেঁটে পূর্ব দিকে যাওয়া যাবে, সেখানে হয়তো কোনো এক গ্রামে তার গ্রামের লোকেরা অন্য গ্রামের অনাকাঙ্ক্ষিত আতিথ্য বরণ করেছে।
খাল পার হয়ে সড়কে উঠে জয়নাল হাঁটা শুরু করল, দূর থেকে সর্দারকান্দি গ্রাম দেখা যাচ্ছে, সাথে দেখা যাচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলিও। গ্রামে ঢুকেই প্রথমে একটা প্রায় পুড়ে শেষ হয়ে যাওয়া ঘরের সামনে ভেজা কাপড় পরা এক মহিলাকে দেখতে পেল। মহিলাটি উদাস হয়ে তাকিয়ে ছিল, অনেকটা পাথুরে দৃষ্টিতে, মৃত মানুষের মতো। তার পাশেই জয়নাল তার জীবনের সবচেয়ে বীভৎস দৃশ্যটি দেখল, একটা ছোট বাচ্চার লাশ, যেটাকে দূর থেকে দেখতে একটা রক্তমাখা মাংসপিণ্ড মনে হচ্ছিল, বাচ্চাটার দুই পায়ের মাঝখান থেকে পেট পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আছে। জয়নাল আর এক মুহূর্তের জন্য সেখানে দাঁড়াতে পারল না, চিৎকার করে দৌড়াতে লাগল উঁচু সড়ক দিয়ে, জনশূন্য সড়কে তার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কাছে ফিরে আসছে।
পরে জানতে পেরেছিল, বাচ্চাটার বয়স ছিল তিন দিন, আঁতুড়ঘরের ধকল সামলে বাচ্চার মা যখন গোসল করতে গিয়েছিল, তখনই পাঞ্জাবিরা এসেছিল। বাচ্চাটার অপরাধ ছিল সে হিন্দুর ঘরে জন্ম নিয়েছে, আর তার সুন্দরী মাকে নিজেদের সেবায় লাগানোর জন্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
সূর্য যখন মাথার ওপরে, ঠিক তখন টিলি পৌঁছালো জয়নাল, সাধারণত এই এলাকার গ্রামগুলো ছোটো ছোটো হয়। গ্রামের মানুষেরা সবাই সবাইকে তো চিনেই, আত্মীয়স্বজনকেও চিনে। তাই অপরিচিত কাউকে দেখলেই তাদের কৌতূহল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, কার বাড়ি যাবে কার কী হয় এসব প্রশ্নের জবাব দিতে অতিথিরাও ক্লান্তিবোধ করেন না, কারণ প্রশ্নগুলোর ভেতর জেরা থাকে না, আন্তরিকতা থাকে। কিন্তু জয়নাল বেশ কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে এলেও কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করার আগ্রহবোধ করল না। এখন পাঞ্জাবি ছাড়া বাকি সবাই পরিচিত, আপনজন। ভয় তাদের গ্রাস করেছে, মনে আর কৌতূহল অবশিষ্ট নেই।
শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিল জয়নাল, দৌড়ানোর সুবিধার জন্য। এই দুই দিনে বেশ ভালো দৌড়বিদ হয়ে উঠেছে সে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা মেয়ে হিহি করে হেসে বলে উঠল, ‘এই ছ্যাড়া, তুই শাড়ি পরছস ক্যান?’
জয়নাল পেছনে তাকিয়ে দেখল পাঁচ-ছয় বছরের একটি মেয়ে তাকে দেখে হাসছে।
জয়নাল লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘আমার মার শাড়ি।’
‘মার শাড়ি তুই পরছস ক্যান? তুই কি ছেড়ি নাকি?’
নিজের থেকে অর্ধেক বয়সের একটি মেয়ে তাকে তুই করে বলছে, এই ব্যাপারটাতে জয়নালের একটু রাগ হলো, কিন্তু সে তার বাবার মতোই রাগটাকে প্রকাশ করতে পারে না। একটু গাল ফুলিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে চাইল মায়ের কথা।
‘মা… মা…’
এইটুকু বলতেই আবেগে, দুঃখে তার গলা বুজে এল।
মেয়েটার কেন যেন এই ছেলেটার জন্য মায়া লাগল। এই বয়সের এত আলাভোলা কাউকে দেখেনি সে, সে নিজে প্রচণ্ড দুষ্ট, কিন্তু মনটা মায়ায় ভরতি। মেয়েটা এবার মায়া মাখা কণ্ঠে বলল, ‘ভাত খাবি?’
এই কথা শুনে মেয়েটার প্রতি শুধু শুধুই রাগ করেছে ভেবে জয়নাল খুব লজ্জা পেল। মাথাটাকে একপাশে কাত করে সায় দিল সে।
জয়নাল মেয়েটার পিছনে হাঁটা শুরু করল, সে যে খুব কৃতজ্ঞ এটা প্রকাশ করার জন্যই হয়তো মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কী?’
মেয়েটা হড়বড় করে বলতে লাগল, ‘নাম ডলি, কিন্তু পথমে আমার দাদায় আমার নাম রাখছিল জেসমিন, আমার দাদি ডাকতে পারতো না, হের লাইগা দাদায় আবার নাম রাখছে ডলি।’
মেয়েটা খুব দ্রুত কথা বলে, জয়নাল বুঝল যে তার নাম ডলি, আর কিছুই বুঝল না, অবশ্য আর কিছু বোঝার দরকারও নেই।
ডলি তাকে তাদের আমগাছতলায় বসিয়ে নিজের খেলার হাঁড়ি থেকে কিছু কুচি-কুচি করে কাটা পাতা দিয়ে বলল, ‘নে ভাত খা।’
জয়নাল হতবিহ্বল হয়ে বসে রইল। ডলি তার ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে ‘ও আচ্ছা, বুজছি’ বলে কিছু হলুদ ফুল সেই পাতা কুচির ওপর ছিটিয়ে দিয়ে বলল, ‘নে তরকারিও দিলাম।’
কিন্তু তাতেও আগন্তুক বালক খুব উৎফুল্ল হয়েছে বলে মনে হলো না।
ডলির মা এসে জয়নালকে উদ্ধার করলেন, নয়তো তাকে আজ হলুদ ফুলের তরকারি দিয়ে পাতা কুচি খেতে হতো। শুধু উদ্ধারই না, ছেলেটাকে আসল ভাতও খেতে দিলেন, দুই দিন পর পেট পুরে খেয়েছে জয়নাল, অন্য কারো বাড়িতে গিয়ে এভাবে কখনোই খেতে পারেনি সে।
সূর্যটা যখন নিজের তেজ একটু কমাচ্ছে, জয়নাল ভাবল যাওয়া যাক। তার মায়ের কাছে যেতে হবে, শাড়িটা দিতে হবে, মা তো আর কোনো শাড়ি নেয়নি। কিন্তু তখনই একটা লোক কাঁদতে কাঁদতে ঢুকল ঘরে, লোকটার পরনে কাদামাখা লুঙ্গি আর একটা ছেঁড়া শার্ট, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটে গেছে, রক্ত চুইয়ে চুইয়ে বের হচ্ছে। লোকটার চোখে ভয়ানক একটা আতঙ্ক ভর করছে, আর বারবার আর্তনাদ করে বলছে, ‘আমার মাইয়া দুইটা কই, তাগো লাইগাই আমি বাঁইচ্চা আইছি।’
ডলি তার বাবাকে এরকম আর কখনোই দেখেনি, তার বাবাই তাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরল, মেয়েটার জামাতে কাদা লেগে যাচ্ছে তাতে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ডলির মা তার ছোট বোনটাকে নিয়ে বাবার হাতে তুলে দিল, বাবা তার ছোট মেয়েটাকেও আদরের কাদা মাখিয়ে দিলেন। আর নিজের বউয়ের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললেন, ‘কাদেররে ওরা মাইরা ফালাইছে।’ বলেই আবার কেঁদে উঠলেন।
কাদের তাঁদের গ্রামের ছেলে, কাদের আর ডলির বাবা মুক্তিবাহিনীর জন্য খাবার নিয়ে যেতেন পাশের গ্রামে, কিন্তু আজ সকাল থেকেই পাঞ্জাবিরা ওখানে চলে এসেছে, তাদেরকে দেখেই গুলি ছুড়েছিল, একটা গুলি কাদেরের ঘাড় ভেদ করে চলে যায় আর সাথে সাথেই সে লুটিয়ে পড়ে। আর ডলির বাবা বিলের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে এসেছেন। উনার বিশ্বাস মেয়েদের কারণেই উনি আজ প্রাণে বেঁচেছেন। কিন্তু তাঁর গায়ে গুলি না লাগাতে মেয়েদের কী কেরামতি, সেটার কোনো যুক্তি তাঁর কাছে নেই, কেউ জানতেও চাইল না।
সন্ধ্যা হতেই ডলিদের আশেপাশের বাড়ির সবাই তাদের উঠানে জড়ো হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা এবং অবাক করা ব্যাপার হলো, এতগুলো মহিলা একসাথে হলো তারপরও তারা চুপচাপ। যারা একেবারেই চুপচাপ থাকতে পারছে না, তারা ফিসফিস করে কথা বলছে। পাকিস্তানি ক্যাম্পের খুব কাছে থেকে কারো মন খুলে গল্প করার উপায় নেই। বৃদ্ধ মানুষদের কষ্টটা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, তারা প্রাণপণে কাশি আটকানোর চেষ্টা করছেন, আর কাশি আটকাতে না পারলে দুই হাত দিয়ে কাশির শব্দ দমন করছেন।
তাদের কর্মযজ্ঞ অবাক চোখে দেখছিল জয়নাল। স্বাধীনতা শব্দটা শফিকুলের রেডিওতে অনেকবার শুনেছে জয়নাল, শুধু একটা গালভরা শব্দ মনে হয়েছে তখন। এখন সে একটু একটু করে শব্দটার মানে বুঝছে। মন খুলে হাসা, উচ্চশব্দে কাশা এই ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোও এই মানুষগুলোর জন্য স্বাধীনতার অংশ।
ডলির বাবা আর চাচা সব মেয়েদের হাতে একটা করে কাগজের বলের মতো কী যেন দিয়ে দিলেন। কাগজে মোড়ানো বলের মতো জিনিসটাতে কী আছে জয়নালের জানার খুব কৌতূহল হলো। ডলিকে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো সবিস্তারে উত্তর পাওয়া যাবে, কিন্তু সে একবার কথা শুরু করলে তাকে থামানো মুশকিল।
নিজের কৌতূহলকে দমাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সাহস নিয়ে ডলিকে জিজ্ঞাসা করল জয়নাল। আশ্চর্যভাবে ডলি খুব নিচু গলায় বলল, ‘এডির ভিত্রে মরিচের গুঁড়া আর ছাই আছে, পাঞ্জাবিগো মুখ জ্বালানের লাইগ্যা, শুধু বড় মাইয়াগো দেয়, আমারে দেয় না।’ আর কিছু বলল না ডলি, হয়তো নিচু গলায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না সে।
ডলিদের উঠানে ছড়ানো আছে শুকনো কচুরিপানা। কচুরিপানা সরাতেই একটা কাঠের পাটাতন দেখল জয়নাল। সে অবাক হয়ে দেখল, পাটাতন সরাতেই একটা বিশাল গর্ত বেরিয়ে এল। গর্তটা দেখলেই বোঝা যায় এটা মানুষকে লুকিয়ে রাখার জন্যই বানানো হয়েছিল। গর্তের একপাশে সিঁড়ির মতো খাঁজ কাটা, সেটা বেয়ে সব মেয়েরা নিচে নামল, তারপর আবার কাঠের পাটাতন দিয়ে গর্তটা ঢেকে দেওয়া হলো আর শুকনো কচুরিপানাগুলো আবার ছড়িয়ে দেওয়া হলো পাটাতনের ওপর। ওপর থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কিছু আছে। কিন্তু শুধু বড় মেয়েরাই কেন এভাবে লুকিয়ে থাকে, কেন শুধু এসব মেয়েদের হাতেই মরিচের বল দেওয়া হলো, তা অনেক ভেবেও বের করতে পারল না জয়নাল। মায়ের শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে ডলিদের বৈঠকঘরেই শুয়ে পড়ল সে।
৪
টিলি থেকে জয়নাল চলে এসেছে দুই দিন হলো, এই দুই দিনে কপালে ভাত জোটেনি, কেউ ডলির মতো পাতার ভাত খাওয়ার নিমন্ত্রণও দেয়নি তাকে। জয়নাল গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছে, মাকে পায়নি এখনো। অনেক মানুষের অবাক চক্ষু উপেক্ষা করে শাড়িটি নিজের গায়ে জড়িয়ে মাকে খুঁজছে জয়নাল। মায়ের কাছে তার প্রিয় শাড়িটি পৌছে দেওয়াই এখন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
হাটবারের দিন গোয়ালমারি বাজারে চলে আসল জয়নাল, নিজেকে খুব পুরুষ পুরুষ মনে হচ্ছে তার। কিন্তু গঞ্জের অবস্থা খুব করুণ। দুয়েকটি দোকান ছাড়া সব দোকান বন্ধ। মানুষজন নেই বললেই চলে। হরিদাস কাকার মুদি দোকানটা খোলা, জয়নালের বাবা এই দোকান থেকেই সবসময় সদাই করে, তাই হরিদাস কাকাকে খুব ভালো করে চিনে সে। দোকানে ঢুকেই প্রথমে অবাক হলো হরিদাস কাকাকে দেখে, গালভরতি দাড়ি আর মাথায় গোল টুপি, চেনাই যাচ্ছে না তাকে। সবচেয়ে বেশি অবাক হলো শফিকুল ভাইকে দেখে, তাকে দেখেই জয়নালের চোখে পানি চলে আসল। অনেক দিন অপরিচিত মুখ দেখতে দেখতে একটা পরিচিত মুখ বালক-হৃদয়ের আবেগের বাঁধ ভেঙে দিল।
হরিদাস কাকার সুপার বিস্কুটের গুণেই হোক অথবা শফিকুল ভাইকে দেখেই হোক, জয়নালকে খুব চাঙ্গা দেখাচ্ছে। হরিদাস কাকা একটা কাপড়ের ব্যাগ খুব সাবধানে এগিয়ে দিলেন শফিকুল ভাইয়ের কাছে, জয়নাল আড়চোখে দেখল ব্যাগে পেঁয়াজ ভরতি। শফিকুল জয়নালকে গ্রামে চলে যেতে বলতেই, জয়নাল চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এতক্ষণে শফিকুলের দৃষ্টি জয়নালের গায়ে জড়ানো শাড়িটির দিকে পড়ল, একটু ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিরে, তুই শাড়ি পইরা আছস ক্যান?’
জয়নাল খুব লজ্জা পেল, মাথা নিচু করেই বলল, ‘পরি নাই, মার লাইগা লইয়া যাই।’
শফিকুল বালকের আবেগের জায়গায় আঘাত করে মনে মনে আহত হলো, একটু আদরের সুরে বলল, ‘ভাত খাবি?’
জয়নাল মাথা কাত করে সায় দিল।
শফিকুল কী যেন ভেবে বলল, ‘আইচ্ছা, চল।’
দূরে দাঁড়ানো একটা বেবিট্যাক্সিতে গিয়ে উঠল তারা, পেঁয়াজের ব্যাগটি খুব সাবধানে কোলে নিয়ে বসল শফিকুল। মাটির রাস্তায় এমনিতে এখানে বেবিট্যাক্সি কম চলে, আর চললেও ধীরে চলে। শফিকুল ড্রাইভারকে আরো ধীরে চালাতে বলল। জয়নাল পেঁয়াজের ব্যাগটার প্রতি শফিকুল ভাইয়ের গভীর মমত্ববোধ দেখে খুব অবাক হলো। শফিকুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তার স্বভাবমতো সরলতার সাথে জিজ্ঞাসা করল, ‘পেঁয়াজের কী অনেক দাম?’
শফিকুল ভাই জয়নালের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল, হাসি শুনেই জয়নাল বুঝল সে নিশ্চয়ই বোকার মতো কোনো প্রশ্ন করেছে। শফিকুল ভাই হেসে হেসেই বলল, ‘হ, এই পেঁয়াজের অনেক দাম, এই দেখ।’
বলেই ওপরের পেঁয়াজ সরিয়ে নিচ থেকে কামরাঙ্গার আকারের, কালচে-সবুজ রঙের, খাঁজকাটা একটা জিনিস বের করে দেখালেন, ওপরের দিকে আবার আংটার মতো কিছু একটা আছে। জয়নাল এরকম জিনিস আগে দেখেনি, কিন্তু এটা যে পেঁয়াজ না, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। জয়নাল সেই জিনিসটার দিকে তাকিয়েই শফিকুলকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এইডা কী, ভাই?’
শফিকুল গম্ভীর গলায় বলল, ‘এইডা পাঞ্জাবিগো যম, এইডা হইলো গ্রেনেড।’
গ্রেনেড শব্দটায় জয়নালের কৌতূহল মিটল না, এই শব্দ সে আগে কখনো শোনেনি। জয়নালের দ্বিধাগ্রস্ত চেহারা দেখে শফিকুল আবার বলল, ‘আরে, এইডা হইলো বোমা।’
জয়নাল মোটেই ভয় পেল না, জিজ্ঞাসার সুরে বলল, ‘কামরাঙ্গা বোমা?’
শফিকুল ভাই হেসে সায় দিয়ে বলল, ‘হ, কামরাঙ্গা বোমা।’
জয়নাল এবার জিজ্ঞাসা করল, ‘এইডা দিয়া পাঞ্জাবিগো মারবেন?’
‘হ।‘
‘আমারে দিবেন?’
‘তুই কী করবি?’
‘পাঞ্জাবি মারমু।’
‘তুই জানস কেমনে বোমা মারতে হয়?’
‘না, শিখায়া দেন।‘
‘আরো বড় হ, তাইলে দিমু।’
জয়নালের এবার খুব মনখারাপ হলো, আবারো রাগ হলো বয়সটার ওপর। শফিকুল মনখারাপ করা বালকের স্বেচ্ছায় বড় হওয়ার অক্ষমতার আক্ষেপটা হয়তো বুঝতে পারল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিল জয়নালের।
দাউদকান্দির শাহজাহান হোটেলে ভাত খেয়ে যে তৃপ্তি জয়নাল পেল, তা আগে কোনোদিন পায়নি, ভবিষ্যতেও পাবে বলে মনে হয় না। শফিকুল অন্য একটা লোকের সাথে পাশের টেবিলে বসে কথা বলছে, শফিকুল ভাইকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর শফিকুল ভাই জয়নালের কাছে এসে ঝুঁকে বলল, ‘তুই একটু বয়, আমি আইতাছি।’
জয়নাল একটু ভীত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কই যান?’
প্রশ্নটাতে জিজ্ঞাসার চেয়ে শফিকুল ভাই যাতে তাকে ফেলে না যায় সে আকুতি বেশি ছিল।
শফিকুল ভাই খুব শান্তভাবে বলল, ‘কয়েকটা পাঞ্জাবি মাইরা আইতাছি।’
তারপর একটু চুপ থেকে হোটেলের লোকটার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘যদি আমি না আই—’
এতটুকু বলেই আবার নিজের বাক্য সংশোধন করে বলল, ‘যদি আমার আইতে দেরি অয়, তাইলে শাহজাহান ভাই তোরে বাইত লইয়া যাইবো।’ এই বলে শফিকুল ভাই বেরিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে জয়নাল নিজের অজান্তেই টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেল। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে ধড়ফড়িয়ে উঠল সে এবং পর পর কয়েকটি শব্দে সবকিছু কেঁপে উঠল।
হোটেলের মালিক চিন্তিত মুখে বসে আছে, তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে জানে কী হচ্ছে। শব্দগুলো থেমে যাওয়ার পর হোটেলের মালিক বাইরে চলে গেল। জয়নাল শাড়িটা আরো গভীরভাবে গায়ে জড়িয়ে, আতঙ্কিত দৃষ্টিতে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, শফিকুল ভাই আসবে না।
সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে, চারপাশটা থমথমে হয়ে আছে, এই সময়টা জয়নালের সবচেয়ে অপছন্দের। এই সময়ে একা থাকার চেয়ে দুর্বিষহ পৃথিবীতে আর কিছু নেই।
জয়নাল হোটেলের দরজায় চোখ রেখে বসে আছে, আঁধারে ঢেকে দরজাটাও অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি মুহূর্ত জয়নাল শফিকুল ভাইয়ের চামড়ার চটির শব্দ শোনার অপেক্ষা করছে, যত সময় যাচ্ছে সেই শব্দ শুনতে পাওয়ার আশাও ক্ষীণ হচ্ছে। একটু পরেই একটা অবয়ব দরজায় দাঁড়ালো, জয়নাল যেন প্রাণ ফিরে পেল। কিন্তু যখন সে অবয়ব হারিকেন জ্বালালো, হারিকেনের আলোয় হোটেলের মালিক শাহজাহানকে দেখে জয়নাল তীব্রভাবে হতাশ হলো। শাহজাহান জয়নালের কাছে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘চলো যাই, তোমারে বাইত দিয়া আই।’
শাহজাহানের লাল হয়ে যাওয়া চোখে হতাশা আর শোকের ছায়া। জয়নাল চুপ করে বসে আছে, একটুও নড়ল না। শফিকুল ভাইয়ের সাথে সে একসঙ্গে গ্রামে যাবে, শফিকুল ভাই তাকে কামরাঙ্গা বোমা কীভাবে ছুড়তে হয় তা শিখাবে, তারপর সে নির্ভয়ে মাকে খুঁজতে যাবে, মা আবার এই লাল শাড়ি পরবে, এর ব্যতিক্রম হতে পারে না।
জয়নালের এই দৃঢ়তা দেখে শাহজাহান একটু দূরে সরে গিয়ে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইল। জয়নাল যখন মনোবল ভেঙে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় দাঁড়িয়ে শফিকুল ভাই বলল, ‘জয়নাল, চল, বাইত যাই।’
শাহজাহান প্রায় লাফ দিয়ে শফিকুল ভাইকে জড়িয়ে ‘শাব্বাস শাব্বাস’ বলে চিৎকার করতে লাগল আর জয়নাল জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু কাঁদছে, কাঁদতে এত ভালো আর কখনো লাগেনি, চোখের জল তার মায়ের শাড়িতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
শফিকুল আর জয়নাল যখন গ্রামে পৌঁছালো, তখন প্রায় মধ্যরাত। ঝিঁঝিপোকাদের আলো ছাড়া সবকিছু অন্ধকার। নিজের গ্রামকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে তাদের। শফিকুল নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল, জয়নালও তার পাশে শুয়ে পড়ল, অনেক দিন পর নিজের বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে গেল শফিকুল। জয়নালও আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
ভোরবেলা একটা দুঃস্বপ্ন দেখল জয়নাল, সে একটা মরিচের গোলা নিয়ে একটা পাঞ্জাবিকে তাড়া করছে, হঠাৎ তার মাকে দেখতে পেল, ছেঁড়া একটা শাড়ি পরে বাবার সাথে এলোমেলো দৌড়াচ্ছে। সে অনেক ডাকল, কিন্তু তার মা কিছুতেই শুনতে পাচ্ছে না। জয়নাল চিৎকার করছে, অনেকগুলো পাঞ্জাবি বন্দুক তাক করে তার দিকে এগিয়ে আসছে, কিন্তু তার মা তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, তার ডাক শুনতে পাচ্ছে না। যখনই পাঞ্জাবিরা তাকে গুলি করবে ঠিক তখনই জয়নালের ঘুম ভেঙে গেল।
শফিকুল এখনো ঘুমাচ্ছে।
জয়নাল সুলেমান কাকার ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে বিলের দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে দুইটা নৌকার মতো কী যেন দেখা যাচ্ছে, হয়তো তার মা আসছে, এটা ভেবে জয়নালের মনটা উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। আবার ভাবল হয়তো পাঞ্জাবিরা আসছে, এটা ভেবে ভয় পেল না জয়নাল, শুধু চোয়ালটা একটু শক্ত হলো তার। এখন সে শুধু অপেক্ষা করছে, হাতে শাড়ি আর বুকে কামরাঙ্গা বোমা নিয়ে।
