ভুল সাক্ষাৎ – ওবায়েদ হক

ভুল সাক্ষাৎ

নিষিদ্ধ পল্লিগুলো হচ্ছে নিশাচর প্রাণীদের মতো, রাত হলেই জেগে ওঠে। শিকারি আর শিকারের কোলাহলে মুখর হয়ে থাকে। নিষিদ্ধ কন্যারা সাজতে বসে, পুরুষদের লালসার শিকার হওয়ার জন্য।

ছোটোখাটো টং দোকানগুলো ধীরে ধীরে চোখ মেলতে থাকে, দোকানের টেপ-রেকর্ডারে বাজতে থাকে হাল আমলের হিন্দি গান। উৎকটভাবে সাজা কন্যারা ঘর থেকে বের হয়ে আসে খদ্দেরের আশায়। মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখে কম বয়সি মেয়েটি। শ্যামলা রঙের মেয়েটি কয়েক দফা পাউডার দিয়েও নিজের রং আড়াল করতে পারে না। সে খদ্দের আকর্ষণের জন্য কমদামি সিগারেট ধরায়, খুব কাশি আসে, কিন্তু কিছু করার নেই, তার রং যে ময়লা।

স্থূলকায় গতযৌবনা পতিতারা কমবয়সি মেয়েদের দেখলেই অভিশাপ দেয়, খদ্দের বিশেষ একটা জোটে না তাদের। তাদের কোনো স্বপ্ন নেই, তাদের তাড়া করে বেড়ায় বৃদ্ধ বয়সের চিন্তা।

বৃদ্ধাদের মধ্যে অনেকেই নিজের ঘর তুলে নতুন মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা করছে। এই পল্লিতে সবচেয়ে বেশি মেয়ে আছে মনোয়ারার ঘরে। তবে তার ‘মনোয়ারা’ নামটা এখন বিস্মৃতপ্রায়। এখানে আসার পর নাম হয়েছিল রত্না, আর এখন সবাই ডাকে ‘খালা’ বলে। কিন্তু কেউ জানে না, এই ব্যবসা মনোয়ারার নয়। এই পুরো পল্লির ব্যবসা একজনের দখলে, তার নাম মির্জা। ভদ্রলোকদের সমাজে তার অবশ্য একটি ভাল নাম আছে। রাজনীতির মাঠে উদীয়মান এই মির্জার অনেক ব্যবসা আছে, কিন্তু এই নারী ব্যবসাই তার আদি এবং আসল ব্যবসা।

মনোয়ারার সারাদিন খুব ব্যস্ততায় কাটে। এতগুলো মেয়েকে সামলানো সোজা কথা নয়। কেউ পালিয়ে যায় কি-না, কেউ অসুস্থ হলো কি-না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেউ গলায় দড়ি দেয় কি-না—এসব দিকে নজর রাখতে হয় তার। এখানে কেউ নিজের ইচ্ছায় বাঁচতে পারে না আর নিজের ইচ্ছায় মরা আরো দুরূহ। প্রথম প্রথম সবারই স্বপ্ন থাকে, একদিন মুক্তি মিলবে, একদিন বাঁচবে মানুষের মতো, ছোঁয়া পাবে ভালোবাসার, লালসাহীন ভালোবাসার। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো প্রতি রাতে ক্ষয় হতে হতে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু মনোয়ারা এখনো স্বপ্ন দেখে, বুকের গহীনে লুকানো একটা স্বপ্ন আছে তার।

মনোয়ারার মেয়েগুলো বাইরে যায় না, কিছু দালাল আছে, তারা খদ্দের নিয়ে আসে। শরীফুদ্দীন তেমনই এক দালাল। খুশিমনে একটা ছেলেকে নিয়ে ঢুকল। এই ঘরটা একটু বড়, বৈঠকঘর বলা যায়। এখান থেকেই সব ঠিক করে ভেতরে ছোট ঘরে পাঠানো হয়। মনোয়ারা সন্ধ্যার পরে এখানে বসে থাকে, টাকাপয়সার লেনদেন সব এখানেই হয়। ছেলেটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মনোয়ারা।

সমাজের সব স্তরের মিলনমেলা হয় এখানে। মাদ্রাসার বড় হুজুরের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসে অনেক এতিম ছাত্র, সত্তর বছরের বুড়ো আসে লাঠি ভর করে, রাস্তার মাতাল থেকে শুরু করে অফিসের বড় সাহেব—সবাই আসে। এখানে কারো ভেদাভেদ নেই, কারো মুখে মুখোশ থাকে না। সবাই নিজেদের কদর্য চেহারাটা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রথমবার যারা আসে তাদের দেখলেই বোঝা যায়, নিজের মুখোশটা প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, ঠিক যেমন পতিতা প্রথমবার নিজের সম্ভ্রম আঁকড়ে ধরে। এই ছেলেটি যে প্রথমবার এসেছে তা দেখেই বুঝে ফেলল মনোয়ারা, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এসেছে অথবা প্রেম করে ছ্যাঁকা খেয়েছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, মানুষের চোখে নিজের কদর্য চেহারা সহ্য করতে পারছে না। থুতনি বুকের সাথে মিলিয়ে যেন নিজের চেহারা ঢাকতে চাইছে, ডান গালের ওপর তিলটি প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। পুরো মুখে এই এক ফোঁটা কলঙ্ক ছেলেটার চেহারায় নিষ্পাপ ভাবটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শরীফুদ্দীন মনোয়ারার স্থির দৃষ্টি উপেক্ষা করে কাছে এসে গলা নিচু করে বলল, ‘পার্টি ভালা, মালদার বাপের পোলা। একবার হাত করতে পারলেই হইবো। খালা, আমার কমিশনডা কিন্তু একটু বাড়াইয়া দিতে হইবো।’

মনোয়ারা গলা উঁচু করেই বলল, ‘এই পোলারে বাইরে দিয়া আয়, এক্কেবারে এলাকার বাইরে।’

শরীফুদ্দীন অবাক হয়ে রইল, এরকম খদ্দের সবসময় পাওয়া যায় না, এরা খুব বেশি দামাদামিও করে না। এরকম ক্ষতি সে মানবে কেন? সে গলা আরো নিচু করে বলল, ‘খালা, করো কী! হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতাছো।’

কিন্তু খালা নির্বিকার। শরীফুদ্দিন বলল, ‘ঠিক আছে, আমি জ্যোৎস্না খালার ঘরে নিতাছি।’

মনোয়ারা ঠিক যেন জ্বলে উঠল, আহত বাঘিনীর মতো গর্জন করে বলে উঠল, ‘তোরে যা কইছি তা কর, এই পোলারে দুইটা থাপ্পড় দিয়ে এই এলাকা থেইক্কা বাইর করবি, আর কোনোদিন যাতে এই এলাকার আশেপাশে না দেখি। না পারলে তোরে দুইটা লাখি দিয়ে এলাকা ছাড়া করুম। আর আমার মর্জি ছাড়া তুই এইখানে আর ঢুকতে পারবি না, এইডা তুই জানোস। অহন যা আমার চোখের সামনে থেইক্যা।’

শরীফুদ্দীন এবার ভয় পেল, খালার ক্ষমতা সে ভালোকরেই জানে। কোনো শব্দ না করে ছেলেটাকে নিয়ে চলে গেল, দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটাকে সে সত্যি সত্যি থাপ্পড় দিবে।

মনোয়ারা বিষণ্ন মুখে ভেতরের ঘরে গিয়ে বসল। শূন্য দৃষ্টিতে বসে আছে সে, তাই সোমার উপস্থিতি টের পেল না। সোমা বলল, ‘খালা…’

মনোয়ারার ধ্যান ভঙ্গ হলো, বলল, ‘কী গো, তুই দেহি রেডি হছ নাই, যা এদিকে না ঘুইরা রেডি হ গিয়া, কাস্টমার আইবো।’

‘খালা, শইলডা বালা না।’

‘ও আইচ্ছা, শইল খারাপ? তাইলে কী আর করবি, যা এক সাপ্তার লাইগা ছুটি।’

‘না খালা, হেই খারাপ না, মনে হয়…’

‘কী হইছে, কী মনে হয়, জ্বর আইছে?’

মনোয়ারা কপালে হাত দিয়ে দেখল, জ্বর নেই। সোমা চুপ করে আছে। তখন মনোয়ারা বুঝল। বলল, ‘পেট বান্ধছস নাকি? অ্যাঁ?’

সোমা মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি জানি না, খালা, কেমনে অইলো। খালা, অহন কী করুম?’

‘কী আর করবি, হাসপাতালে যাইবি, ফালাইয়া আইবি।’

সোমা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কী কও, খালা! আমি পারুম না, মায়া লাগে।’

‘মায়া লাগলে হইবো? বাচ্চা দিয়া তুই কী করবি? না পারবি ব্যবসা করতে, না পারবি বাচ্চা পালতে। পোলা হইলে একটু বড় হইয়া তোরে গাইল দিয়া যাইবো গা, আর মাইয়া হইলে তোর মতো বেশ্যা হইবো। এরচেয়ে ভালা ফালাইয়া দে। দুনিয়ার ময়লা বাড়াইয়া লাভ নাই।’

সোমা কিছু বলতে পারছে না, তার চোখ ছলছল করছে। চোখ মুছতে মুছতে সে বেরিয়ে গেল। মনোয়ারা মনে মনে ভাবল, আহা রে, চোখে তো এখনো পানি আছে, কয়েকদিন পরে তাও থাকবে না।

প্রথম প্রথম সে যখন এসেছিল তখন সেও খুব কাঁদত। এখন আর কাঁদতে চাইলেও পারে না। আজ সোমাকে দেখে খুব মনে পড়ছে সে দিনগুলো।

পাশের গ্রামের আশরাফ মিয়া তাকে দহরকান্দি কাজি অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল। তারপর তার হাত ধরে কোনো এক বাসে উঠে পড়েছিল সে, কোথায় যাচ্ছে জানতে চায়নি। চলন্ত বাসের জানালায় চোখ রেখে একটার পর একটা স্বপ্ন বুনছিল। একটা ছোট্ট ঘরে সে রান্না করছে। তার স্বামী এসেছে কাজ থেকে, সে লুঙ্গি-গামছা এগিয়ে দিবে, লুঙ্গি নেওয়ার সময় তার স্বামী ইচ্ছে করে তার হাত ছুঁয়ে দিয়ে তাকে লজ্জা দিবে। একটা বাবু হবে তাদের, তাকে নিয়ে কতো আহ্লাদ। এরকম হাজার স্বপ্ন বুনে তার সদ্য স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। সেটাই বোধ হয় তার জীবনের শেষ সুখের ঘুম।

অনেক অলিগলি পেরিয়ে তার স্বামী তাকে একটা নরকে নিয়ে এলো। আশরাফ মিয়ার মুখোশও খসে পড়ল। মির্জার কাছ থেকে যখন টাকা গুনে নিচ্ছিল তখন তাকে লোভী পশুর মতো দেখাচ্ছিল। একটু অনুশোচনা কিংবা লজ্জা তার মুখে ছিল না। খুব সহজেই সে হাসতে হাসতে চোখ মেলাচ্ছিল মনোয়ারার সাথে। মনোয়ারা অনেক কেঁদেছিল সেদিন, প্রচুর কাকুতি-মিনতি করেছিল আশরাফ মিয়ার কাছে, কিন্তু আশরাফ মিয়া আর ফিরে তাকায়নি, মির্জার হাতে ছেড়ে দিয়ে সে চলে গেছে।

যে রাতে মনোয়ারার বাসর হওয়ার কথা ছিল, যে রাতে তার বউ হওয়ার কথা ছিল, সে রাতে মির্জার ধর্ষিতা হয়েছে মনোয়ারা। সপ্তাহখানেক পরে মনোয়ারা হয়ে গেল ‘রত্না’।

আর কোনোদিন সে কারো বউ হবার স্বপ্ন দেখেনি। কোনো সুখের স্বপ্ন তাকে বিভোর করেনি। কিন্তু একবার সুখ এসেছিল খসে পড়া তারার মতো। হঠাৎ এলো, হঠাৎ মিলিয়ে গেল। নিজের মধ্যে আরেকটা প্রাণের স্পন্দন টের পেয়েছিল সে, কাউকে বলেনি কিছু। প্রচণ্ড মায়ায় গভীর রাতে পেটে হাত বুলিয়ে দিত। মির্জা যখন জানল তখন কিছু করার ছিল না। এই পল্লিতেই কোনো ডাক্তার ছাড়াই জন্ম নিলো মনোয়ারার ছেলে। মনোয়ারা তার রত্না পরিচয় ভুলে গেল, তার নতুন পরিচয় ‘মা’। নিজের সন্তানকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে লাগল সে। সে স্বপ্নও বেশিদিন টিকল না।

আজ সোমাকে যে কথাগুলো বলেছে, মির্জাও সেদিন এই কথাগুলোই বলেছিল তাকে। বাবার পরিচয় ছাড়া মানুষের পরিচয় হয় না সমাজে। মনোয়ারা শেষবারের মতো আঁকড়ে ধরে মির্জার কাছে তুলে দিয়েছিল নিজের ছেলেকে। কিন্তু মায়া ছাড়তে পারেনি।

সে খোঁজ রেখেছিল, কোনো এক ধনী পরিবারের নিঃসন্তান দম্পতি তার ছেলেকে কিনে নিয়ে গেছে। পতিতার ছেলে জানলে নিশ্চয়ই নিত না। মনে মনে নিজের ছেলেকে ‘বাবুই’ বলে ডাকত সে। বাবুই যখন স্কুলে ভর্তি হলো, সে প্রায়ই আড়াল থেকে দেখত তাকে। কী সুন্দর হয়েছে তার বাবুই! খুব ইচ্ছা করত একবার বুকে নিয়ে জড়িয়ে ধরতে। বুকটা হু হু করে উঠত ছেলেটাকে দেখলে। সে ঠিক করে রেখেছিল একদিন সে যাবে তার বাবুইর সামনে। দুই হাতে জড়িয়ে ধরবে। ‘বাবুই’ বলে শুধু একবার ডাকবে। এই স্বপ্ন নিয়েই সে বাঁচছে।

সময়গুলো দ্রুত ফুরিয়ে যেতে লাগল, বাবুই প্রাইমারি স্কুল শেষ করে ফেলল। কিন্তু তারপর আর বাবুইয়ের খোঁজ পেল না মনোয়ারা। বুকে তীব্র যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিল সে। অনেক স্কুলে গিয়ে খুঁজেছে, বিভিন্ন স্কুলের সামনে গিয়ে বসে থাকত। একবার যদি বাবুইকে দেখা যায়। সে ঠিক করে রেখেছিল এবার যদি বাবুইকে দেখতে পায়, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। মায়া ভরা চোখে তাকাবে, জড়িয়ে ধরবে। নিশ্চয়ই খুব অবাক হবে তার বাবুই।

আজ খুব কান্না পাচ্ছে মনোয়ারার, কিন্তু চোখের পানি যে শুকিয়ে গেছে, চোখটা শুধু জ্বালা করছে, বুকের ভেতরটা মনে হচ্ছে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে, স্বপ্নটা নিহত হয়ে গেল। সে আর পারবে না তার বাবুইয়ের সামনে যেতে, তাকে জড়িয়ে ধরতে, তার গালের বড় তিলটাতে স্নেহের চুমু খেতে, যে তিলটা তার চেহারাটাকে আরো নিষ্পাপ করে দিয়েছে।

বড় ভুল সময়ে, ভুল জায়গায়, আজ ভুল মানুষটার সাথে দেখা হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *