ছোঁয়া
রতনের বউয়ের চ্যাঁচামেচিতে গত পনেরো বছর ধরে ঘুম ভাঙে মালতী দাসের। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে সেই চ্যাঁচামেচি না শুনলে ঘুমও ভাঙে না। রতনের চোলাই মদের ব্যবসা ছিল। রতন যখন লিভার পচে মারা গেল তখন তার বউ ব্যবসার হাল ধরল। সকাল সকাল ছোটোখাটো ভিড় জমে রতনের ঘরের সামনে, দেনাপাওনার হিসেব নিয়েই চলে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি। রতন একটু উদারমনা ছিল, সবাইকেই বাকিতে মদ খাওয়াত, কিন্তু তার বউয়ের কাছ থেকে বাকিতে কেউ এক গ্লাস মদ পেয়েছে এমন ইতিহাস নেই বললেই চলে।
এই কারণেই হরিজনপল্লিতে রতনের বউকে অভিশাপ দেয় না এমন লোকের সংখ্যাও খুব কম, সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে মালতী দাস একজন। মালতী দাস নিজের বৃদ্ধ শরীরটাকে কোনোমতে ঠেলে বিছানা থেকে উঠাল, প্রায় ভাঙা চৌকিটা আর্তনাদ করে উঠল। ঘরের আসবাবপত্র বলতে এই ভাঙা চৌকিটাই সম্বল। এপাশ থেকে ওপাশে টানানো দড়িতে কিছু ছেঁড়া ময়লা কাপড়চোপড় ঝুলছে, মেঝেতে একটা পানির কলসি আর কিছু হাঁড়িপাতিল, বাসনকোসন জড়ো করে রাখা আছে। তার পাশেই মরিচা ধরা একটা ট্রাঙ্ক। মালতী দাসের বিয়ের সময় তার মেসো এই ট্রাঙ্ক দিয়েছিল। মালতীর আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই, স্বামী মদ খেতে খেতে মরেছে কোলে বাচ্চা আসার পরপরই। এই পাড়াতে অধিকাংশ পুরুষ লিভার পচে মারা যায় মদের কারণে।
হরিজনপল্লির লোকজন হচ্ছে সমাজের কাক, নোংরা ময়লা সব তারাই পরিষ্কার করে, কিন্তু কাক যেমন পাখিদের মধ্যে নিকৃষ্ট, তারা তেমন মানুষদের মধ্যে নিকৃষ্ট। মদ না পেলে সুস্থ মানুষের পক্ষে মানবকাক হওয়া অসম্ভবের কাছাকাছি।
মালতী দাস তার ঘরের দাওয়ায় এসে বসে গলা উঁচু করে প্রশ্রয়ের সুরে বলল, ‘কী লো রতনের বউ, তোর গলায় কী ভগবান সব বিষ দিয়া দিছেনি? মরণের আগে মনে অয় আর শান্তিতে ঘুমাইতে পারতাম না।’
ওপাশ থেকে ভেসে এলো রতনের বউয়ের গলা, ‘পিসি, এই গলা না থাকলে দুইটা পুলাপাইন লইয়া টিকতে পারতাম না, চিল-কাউয়ায় কবেই ছিঁড়াবিঁড়া খাইয়া লাইতো।’
‘হ, চিল-কাউয়ার তো অভাব নাই।’ বলেই মালতী বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, হয়তো অতীত মনে করেই।
মালতী দাস সপ্তাহে ছয় দিন ভিক্ষা করে আর এক দিন ছুটি। যতদিন গায়ে শক্তি ছিল রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করত। সহায়-সম্বলহীন মালতীর ভিক্ষা ছাড়া আর উপায় ছিল না। কিন্তু শহরে হিন্দু ভিক্ষুক নেই বললেই চলে, আর ভগবানের ওয়াস্তে কেউ ভিক্ষাও দেয় না, হিন্দুরাও না, কেমন সন্দেহ মাখা দৃষ্টিতে তাকায়। তাই মালতী পেটের খাতিরে আল্লাহর আশ্রয় নিলো। এখন সে আল্লাহর ওয়াস্তে ভিক্ষা চায়। সাধারণত কোনো ভিক্ষুক শুক্রবারে ভিক্ষা করার সুযোগ ছাড়ে না, কিন্তু মালতী শুক্রবারে ভিক্ষা করতে যায় না, এই দিন তার খুব জরুরি একটা কাজ থাকে।
রোদের তেজ জানান দিচ্ছে যে বেলা বাড়ছে। মালতী দাস একটা পুঁটলি হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে হরিজনপল্লির পূর্ব দিকে হাঁটা ধরেছে। বয়সের সাথে সাথে মালতী দাস যত বৃদ্ধ হচ্ছে, হরিজনপল্লি যেন ততই যুবতী হচ্ছে। আগের সেই মায়া মাখা নিরীহ কুঁড়েঘরগুলো নেই, ইটের রাজত্ব এখানেও চলে এসেছে, সেই বাড়িগুলোকে দেখায় অতিরিক্ত লিপস্টিক, পাউডার দিয়ে সাজা নৈশকন্যাদের মতো।
তবে এই পল্লির মানুষগুলোও এখন স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, অনেকেই নিজেদের সন্তানদের নিজের ভবিষ্যৎ দিয়ে যেতে চায় না। সকাল-বিকাল চোলাই মদ গেলা বাবাও চায় তার ছেলে যেন তার মতো কাক হয়ে বেঁচে না থাকে। ঘরগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটলে টেলিভিশনে বাংলা সিনেমার নায়িকার গগনবিদারী চিৎকার, মাতাল স্বামীর সাথে স্ত্রীর উৎকট বাক্য বিনিময়, ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ ছাড়াও এখন মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কোমল কণ্ঠে ‘অ’ ‘আ’ শোনা যায়।
রাজুর দোকানে এসে থামল মালতী। রাজু তাকে দেখামাত্রই বয়াম থেকে চকচকে কাগজে মোড়ানো কিছু লজেন্স বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলো। প্রতি শুক্রবার ঠিক এই সময়ে মালতী রাজুর দোকান থেকে লজেন্স নিয়ে যায় আর প্রতিবারই মালতী টাকা দেওয়ার জন্য নিজের আঁচলের গিট খুলতে গেলেই রাজু বাধা দিয়ে বলে, ‘আহা পিসি, কী করতাছ, ট্যাকা লাগব না, ঠাকুরের কাছে আমার লাইগা আশীর্বাদ কইরো।’
সূর্যের দিকে তাকিয়ে মালতী আন্দাজ করার চেষ্টা করল কত বেলা হলো। না, দেরি করা যাবে না, নিখিলটা না আবার খেলতে বেরিয়ে যায়। নিখিল হচ্ছে মালতীর গুরু আর এই লজেন্সগুলো হচ্ছে গুরুদক্ষিণা। নিখিল পাশের সরকারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। তার কাছেই মালতী বাংলা পড়তে শিখছে। লজেন্সের মতো গুরুদক্ষিণা পেয়ে গুরু খুবই প্রীত হন, সেই প্রীতির আতিশয্যে মাঝে মাঝে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাংলার ‘অ’ ‘আ’-এর সাথে ইংলিশ এ বি সি ডি পড়ানো শুরু করে, কিন্তু তার শিষ্যার ইংলিশের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই, এমনকি লেখাতেও তার আগ্রহ নেই, তার সব আগ্রহ পড়াতেই।
নিখিলের বাবা নিজের ছেলের বুড়ি ছাত্রীকে দেখে খুব গর্ববোধ করে, আবার বুড়ির ভীমরতি দেখে মনে মনে হাসে।
রতনের বউ তার বুড়ি পিসির এই ছেলেমানুষির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায় না। মালতীকে শ্লেষমাখা কণ্ঠে বলে, ‘পিসি, দুই দিন পরে তো ভগবানের কাছে চইল্যা যাবা, এখন এই ‘অ’ ‘আ’ কইরা কী লাভ?’
মালতী উদাস হয়ে যায়, কেমন যেন প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চায়। রতনের বউয়ের দৃষ্টি এড়ায় না সেটা।
একটু ঠাট্টার ছলেই বলে, ‘আরে পিসি, ভগবানের কাছে পাপপুণ্যের বিচার হইব, পড়ালেখা না জানলেও সমস্যা হইব না।’
মালতী অতি কষ্টে একটা সৌহার্দ্যের হাসি দিয়ে ঘরে চলে এলো। পুরোনো জং ধরা ট্রাঙ্কটা যেন বারবার অতীতটা মালতীর সামনে এনে রেখে দেয়, বিচ্ছেদের অতীত। স্বামীর স্মৃতিগুলোতে জং ধরে গেছে, কিন্তু সন্তানের স্মৃতি যেন প্রতি বছর নতুন করে সবুজ হয়, বসন্তে গাছের নতুন পাতার মতো।
অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পর ছেলেটাই ছিল মালতীর বাঁচার উপলক্ষ। অনেক আদর করে নিজে নাম রেখেছিল মাণিক, মালতীর কাছে তার ছেলে আসলেই মাণিক ছিল। ট্রাঙ্কের ভেতর মাণিকের খেলনা ভরতি, অধিকাংশ মালতী রাস্তায় ময়লা পরিষ্কারের সময় কুড়িয়ে পেয়েছে। একটা ভাঁজ করা লাল শার্ট আছে ট্রাঙ্কের একপাশে, দুর্গাপূজায় মাণিককে দিবে বলে কিনে রেখেছিল মালতী, কিন্তু মাণিক জানত না, আর কোনোদিন জানবেও না।
মাণিককে হরিজনপল্লিতে রেখে মানুষ করতে পারত না মালতী। সে চায়নি তার মাণিক মানুষের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করুক, তাই দশ বছর বয়সেই নিজের মেসতুতো দাদার মুদি দোকানে পাঠিয়ে দিয়েছিল মাণিককে। সে-সময়টাতে কোনো বেলা পেট পুরে খেত না মালতী, ছেঁড়া শাড়িটাকে তালি দেওয়ার জন্যও আর কাপড় অবশিষ্ট ছিল না, এই দারিদ্র্য সে ইচ্ছে করেই বরণ করেছিল, নিজের মাণিকের ভবিষ্যতের জন্য, তার ছেলেকে নিজের দোকান করে দিবে বলে। কাক না হয়ে তার ছেলে হবে দোকানি। এক টাকা দু’টাকা করে মালতী সাতশ পয়তাল্লিশ টাকা জমিয়ে ফেলেছিল, সেই টাকা এখনো এই ট্রাঙ্কে আছে, বহু বছর কেটে গেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, ভিক্ষা করতে হচ্ছে মালতীকে, কিন্তু সেই টাকায় একবারও হাত দেয়নি মালতী, এই টাকা তার মাণিকের।
দেশ স্বাধীন হওয়ার বছরটা ঘোরে কেটেছিল মালতীর, কীভাবে কেটেছে সে মনে করতে পারে না, কিন্তু একটা রাত সে ভুলেনি, কোনোদিন ভুলবে না।
সেদিন রাতে প্রচণ্ড চিৎকার, মানুষের আর্তনাদ আর বন্দুকের হুংকারে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। অনেকক্ষণ পরে চারদিক শান্ত হলো, চিৎকারগুলো থেমে গেল, হঠাৎ তার দরজায় ঠক-ঠক আওয়াজ শুনে যেন সংবিত ফিরে পেল সে, রতনের গলা শোনা যাচ্ছে, ‘পিসি! পিসি!’ বলে ডাকছে।
মালতী ধীরে ধীরে দরজা খুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রতনের দিকে, সেই জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা রতনের নেই। বাহিরে তাকিয়ে মালতী দেখল, এ-পাড়ার অনেককেই জড়ো করা হয়েছে, একটা ভয়ার্ত চাপা গুঞ্জন হচ্ছে চারপাশে। সবার সামনে কিছু খাকি উর্দি পরা বিশালদেহী লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন নেতা-গোছের আরেকজনকে ডেকে কানে কানে কী যেন বলল। সেই লোকটি সামনে এসে গলা উঁচিয়ে বলল, ‘তোমলোগ হামারা সাথ আও, কুছ সাফাই কারনি হ্যায়।’
তারা তখনো জানত না, কী বিভীষিকা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মালতী রাস্তায় এসে দেখল সকালবেলা তারা যে রাস্তা পরিষ্কার করেছিল সে রাস্তাটা আর পরিষ্কার নেই, পিচ দিয়ে ঢাকা রাস্তাটা রক্তে লাল হয়ে গেছে, রক্তগুলো জমাট বাঁধতে শুরু করেছে, সেই জমাটবাঁধা রক্তে স্যান্ডেল, চুল, আঙুল আর মাংসখণ্ড দেখা যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কয়েকটা নিথর দেহ।
খাকি কাপড় পরা গোঁফওয়ালা লোকটি তাদের তাগাদা দিচ্ছে তাড়াতাড়ি লাশগুলোকে এক জায়গায় স্তূপ করে পানি দিয়ে রক্ত ধোয়ার জন্য। রতন আর মালতী ঢক-ঢক করে একটু মদ গিলে লাশগুলো স্তূপ করার কাজে নেমে গেল। দুইটা লাশ এনে মালতী আরো একটা লাশের কাছে গেল, দশ-এগারো বছরের একটা ছেলে, মুখটা দেখামাত্রই মালতীর শরীরে যেন রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। এ যে তার মাণিক, চেয়ে আছে তার মায়ের দিকে এক চোখ দিয়ে, অন্য চোখটায় জমাটবাঁধা রক্ত। সাথে সাথে মূর্ছা গেল মালতী।
চোখ খোলার পর এক সপ্তাহ শুধু চিৎকার করেছে মালতী, একবার নিজের মাণিকের শরীরটা ছোঁয়ার জন্য আকুতি জানিয়েছে। বিয়াল্লিশ বছর সে-আকুতি মনে বয়ে বেড়াচ্ছে সে।
হরিজনপল্লিতে পঁচিশ মার্চে যারা মারা গিয়েছিল তাদের জন্য একটা স্মৃতিস্তম্ভ হয়েছে। স্তম্ভ কী জিনিস মালতী বোঝে না। এলাকার কমিশনার স্তম্ভটি উদ্বোধন করে গেল, মাইক লাগিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কিছু লোক গলা ফাটাল। মালতীর কাছে মাইকের কথা সব একরকম লাগে, মনে হয় কিছু বেচতে এসেছে। কিন্তু যখন পরশদা বলল সেই স্তম্ভে তার মাণিকের নাম আছে, মালতী ছুটে গিয়েছিল, লম্বামতো একটা সিমেন্টের পিলারের নিচে, শ্বেতপাথরে কিছু কালো কুচকুচে অক্ষর। মালতী কালো পিঁপড়ার সারি আর এই কালো অক্ষরের মাঝে কোনো পার্থক্য করতে পারে না। নিজের ছেলের নামটা ছোঁয়ার জন্য মালতীর প্রাণটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
একটা কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে স্তম্ভটার সামনে এসে দাঁড়াল মালতী। আজ এই স্তম্ভ তার কাছে শুধু সিমেন্টের পিলার নয়, তার মাণিকের প্রতিরূপ। কাছে গিয়ে শ্বেতপাথরে লেখা নামগুলো পড়তে লাগল সে। ঝাপসা ঝাপসা দৃষ্টিতে পড়ছিল সেগুলো, বয়সের কারণে মালতীর দৃষ্টিতে কোনো প্রভাব পড়েনি, ঝাপসা দেখার কারণ তার চোখে অপেক্ষমাণ অশ্রু। সাতটা নাম পড়ার পর নিজের মাণিককে খুঁজে পেল মালতী। মাণিক চন্দ্র দাস, পড়ামাত্রই চোখের অশ্রুর অপেক্ষা শেষ হলো।
নামের ওপর নিজের বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছে মালতী। বহুদিনের আকুতি বুঝি শেষ হলো, বুকের মধ্যে একটা ঠান্ডা হাওয়া অনুভব করছে সে। নিজের ছেলেকেই যেন ছুঁয়ে দিচ্ছে। কাপড়ের পুঁটলিটা থেকে একটা ভাঁজ করা লাল শার্ট আর পলিথিনে মোড়ানো সাতশ পয়তাল্লিশ টাকা বের করল সে। সেই শ্বেতপাথরটার ওপর মাণিকের পূজার শার্ট আর সাতশ পয়তাল্লিশ টাকা রাখল। অশ্রু গড়িয়ে মালতীর শাড়িটা ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু চোখ মুছল না সে, বহু বছর পর নিজের অশ্রুগুলোতে আর বাঁধ দিচ্ছে না। খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে তার, বিয়াল্লিশ বছরের কান্না আজ কাঁদবে সে, নিজের মাণিককে ছোঁয়ার আনন্দে কাঁদবে।
