বুড়ো দাঁড়কাক মরেনি
আমি পাঁড় মধ্যবিত্ত হিসেবি মানুষ। অভিশাপ হিসেবে একটা মায়াবী চেহারা নিয়ে ঘুরছি। আমার চেহারাতেই বুঝি কোনো কিছু লেখা আছে। সেই মুখলিপি সবচেয়ে ভাল পড়তে পারে ভিক্ষুক আর প্রতারকেরা। বন্ধুদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া ভিক্ষুকটি আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়, একটি গ্রাহক পাওয়া গেছে ভেবে আমাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। সুনিপুণ অভিনয়ে তারা আমার মন তথা পকেট গলাতে কী চেষ্টাটাই না করে! তাদের মুখস্থ গল্পটা খুব একঘেয়ে, কিন্তু গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা দেখে মনে করুণা এবং বিরক্তি জাগে।
বেদেনি মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে না টাকার অভাবে, তার স্বজনেরা আলগা করে রঙিন শাড়ি পরে আমাকে ঘিরে ধরে, তাদের হাতগুলো লতাপাতার মতো ঢলে ঢলে পড়ে আমার গায়ে। সাপের খেলা দেখায় না তারা আর, নিজেরাই খেলে এখন। আমার মতো নিরীহদর্শন মানুষকে প্যাঁচিয়ে ধরে অজগরের মতো। পান খাওয়া ঠোঁটে সুরেলা কথার বিষ। তাদের বিষ ফুরায় না, অবিবাহিত মেয়েটার বিয়ে হয় না কোনোদিন।
ল্যামেনেটিং করা প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে ঘোরে ক্যান্সার রোগী মকবুল। তিন বছর হয়ে গেল, সে ক্যান্সারের কিছু করতে পারছে না, ক্যান্সারও তার কিছু করতে পারছে না। আমাকে দেখলেই তার আয়ু এবং বায়ু কমে যায়, শ্বাস নেয় টেনে টেনে।
অথচ আমার চেহারায় যতটুকু কোমলতা, মনে ততটুকু নেই। পকেট আমার একটিই, সেটিরও দৈন্যদশা, কারণ আমার পেট তিনটি। অতিরিক্ত এক কাপ চা খেলে আধা মাইল হেঁটে পাঁচ টাকা কমিয়ে রিকশায় চড়ি আমি। সূর্যোদয়ের কিছু সময় পর থেকে সূর্যাস্তের কিছু সময় পর পর্যন্ত আমাকে অফিসে মতান্তরে কারাগারে থাকতে হয়। এই আধুনিক দাসপ্রথা আমাকে মেকি সম্মান এবং খাঁটি দারিদ্র্য দিয়েছে। সম্মান টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আমাকে জুতা পরতে হয় চকচকে, জামা-প্যান্ট পরতে হয় ভাঁজ করা, পরিষ্কার। আমার বউকে শাড়ি-ফার্নিচারের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে হয়। আমার বাচ্চাকে স্কুলে যেতে হয় আমার মতো দাস হওয়ার জন্য। খালি-পকেট নিয়ে আমাকে আভিজাত্যের ভাব ধরতে হয়।
সদর রাস্তা থেকে গলি বের হয়েছে শাখার মতো, সেই গলির আবার অনেক উপগলি প্রশাখার মতো ছড়িয়ে আছে। তেমনই একটি স্বাস্থ্যহীন, ধ্বজভঙ্গ উপগলির শেষপ্রান্তে আমার আড়াই রুমের বাসা। সকালে টিফিনবক্সে গতকালের বাসি তরকারি ঢালে বউ এবং গতরাতের বাসি অভিযোগগুলো আবার নতুন করে শুনিয়ে দেয়। কোথাকার কোন পলা ভাবির দেবরের বিয়েতে কমদামি গ্লাসের সেট উপহার দিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে ভাবি-মহলে নিন্দার ঝড়, বউ নাকি মুখ দেখাতে পারছে না।
‘কয়েকদিন এই চন্দ্রমূখ ভাবিদের মুখ না দেখালে ক্ষতি কী?’
কথাটা শেষ করার আগেই দেখলাম, বউয়ের মুখে চন্দ্রগ্রহণ। দুই চোখে ঘন মেঘ জমা হয়ে গেল মুহূর্তে। আমাকে পালাতে হবে ঝড় বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই। বেতন পাওয়ার আগ পর্যন্ত দুর্যোগেই কাটবে কয়েকটা দিন। এছাড়াও পুত্রের নিত্যকার বজ্রপাত তো আছেই। তার জন্য হাল-ফ্যাশনের ব্যাগ, জামা, জুতা জোগাড় করতে করতে আমার বেহাল দশা। তার সহপাঠীদের কালোবাজারি বাবার সঙ্গে আমি ছাপোষা কেরানি পেরে উঠব কেন?
ঘর থেকে বের হতেই মূর্তিমান একটি আপদ চোখে পড়ল। ঘরে যেমন বউ আপদ, অফিসে বড় স্যারও তেমনই, আর রাস্তার আপদ হচ্ছে ভিখারির দল। বিশেষ করে যার চেহারায় লেখা থাকে সে দয়ালু, তার জন্য তো মহাআপদ। সদর রাস্তায় ভিখারিদের অঢেল বিচরণ। এখন দেখি বাসার সামনেও ব্রাঞ্চ খুলেছে। চটের বস্তা গায়ে শীর্ণ একটি শরীর হাত বাড়িয়ে রেখেছে, ধুলোর আস্তরণ পড়া ময়লা হাত। চটের বস্তা থেকে উৎকট গন্ধ আসছে। নাক ঢেকে ভিখারির চোখে না তাকিয়ে বেরিয়ে এলাম।
চোখে তাকালেই বিপদ, করুণার বাণ ছুড়ে মারে। সে বাণে একবার আহত হলে রক্ষা নেই, পকেট খসিয়ে ছাড়বে।
অফিসে বসে ইহজগতের কথা ভুলে যেতে হয়। সারাদিন ভুলে গেলাম আমার একটা বউ আছে, বাচ্চা আছে, এমনকি আমার প্রাণ আছে। এখানে শুধু আছে বড় স্যার। অফিস থেকে ফেরার পথে দেখলাম ভিখারিটি তখনো বাসার সামনে শুয়ে আছে। আমার ডিউটি শেষ, তার ডিউটি এখনো শেষ হলো না! রাস্তার ধুলোতেই শুয়ে আছে মহিলাটি। আমাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলো না, হয়তো ঘুমিয়ে আছে। আমি তার নিদ্রায় ব্যাঘাত না ঘটিয়ে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে গেলাম। বউ ছাড়া অন্য কারো ভয়ে এমন চোরের মতো ঘরে ঢুকিনি কোনোদিন।
পরদিন ঘর থেকে বেরোতেই চোখ চলে গেল রাস্তার পাশে, চটের বস্তায় ভিখারি মহিলাটি নিথর হয়ে পড়ে আছে। আমার বিপদ বাড়াতে মরল নাকি? কাছে যেতেই বিদ্যুতের মতো তার চোখ খুলে গেল, আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চাহনিতে কোনো আর্জি নেই, নিষ্পলক নিস্পৃহ দৃষ্টি। বহু বছরে ধুলোমাটির কুসঙ্গে থেকে অনেকটাই বদলে গেছে সে। তবুও আমি ঠিকই চিনলাম তাকে। আমাদের কৈশোরের বেলী পাগলি। এই চোখে আগুন ছিল, এখন শুধু ছাই দেখা যায়। আমি তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে চলে এলাম। ভয় হলো, যদি চিনে ফেলে!
বেলী পাগলি ছিল রতনের বড় বোন। একদিন তাকে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা হাত-পা বেঁধে রতনদের বাড়িতে রেখে গেল। কেন যেন পাগল হয়ে গিয়েছিল সে। গ্রামের মানুষ সব দোষ চাপালো বদ জিনের ওপর। জিনকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য ওঝা, কবিরাজ হলুদ-মরিচ পুড়িয়ে ঝাঁটা দিয়ে পেটালো বেলী আপাকে। জিনের সুশিক্ষায় ঘাটতি পড়ে গেল, সে বেলী আপাকে ছেড়ে গেল না।
রতনদের বাড়িতে গোয়ালঘরের পাশেই তাকে বেঁধে রাখা হতো। বেঁধে রাখা পাগল আমাদের কাছে তখন বিনোদনের বস্তু। বেলী পাগলির কাছে গিয়ে মুখ ভেঙচিয়ে ছড়া কাটতাম,
আয় রে আয় বেলী,
ডাঙ্গুলি খেলি।
বেলী পাগলি ক্ষেপে গালাগালি করে তেড়ে আসত, শেকলে আটকে গিয়ে আছড়ে পড়ত। এই দৃশ্য দেখে আমরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতাম। মাঝে মাঝে রতন এসে মাটির ঢেলা ছুড়ে তাড়িয়ে দিত আমাদের, আমরা যেন তার ক্ষেতের ধান খাচ্ছি। তার আক্রোশ দেখে আমরাও আনন্দ পেতাম।
নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে তাকে লক্ষ্য করে আবার ছড়া কাটতাম,
ছাগীর ভাই ছাগলা,
পাগলির ভাই পাগলা।
রতন আমাদের সাথে না পেরে কেঁদে দিত। তার কান্না দেখে আমরা বিজয়োল্লাসে ফেটে পড়তাম। এখন ভাবলে রতনের সুতীব্র যন্ত্রণাটা কিছু অনুভব করতে পারি। সে-বছর বর্ষাতেই ম্যালেরিয়া হয়ে মরল রতন। বেঁচে থাকলে হয়তো ক্ষমা চেয়ে আসতাম।
আমরা তখন সবে বখাটে হয়েছি। পাড়ার উদীয়মান পাণ্ডাবাবুর সাথে আমার গর্বিত মেলামেশা। বাবু স্কুল পালিয়ে ঘাটে গিয়ে গাঁয়ের বউদের গোসল দেখত। পরে আমাদের শোনাত অতিরঞ্জিত উগ্র স্নানের গল্প। আমাদের কিশোর মন সেসব অবিশ্বাস্য গল্প অবলীলায় ধ্রুব বাস্তব বলে মেনে নিত, ভালো লাগত বলেই মেনে নিতে কোনো সমস্যা হতো না। বাবু সিগারেটে টান দিয়ে ঊর্ধ্বমুখে ধোঁয়া ছাড়ত। আমাদের চোখে সে তখন পুরুষ, তাকে অনুসরণ করা আমরা কর্তব্য ধরে নিলাম। আমরাও ঊর্ধ্বমুখে সিগারেটে টান দিয়ে নিম্নমুখে কাশতাম।
বাবু একদিন আমাকে শপথ করিয়ে একটা গোপন খবর দিলো। বেলী পাগলিকে শাড়ি দিলে সব খুলে দেখায় সে। দুপুরবেলা যখন সবাই ভাতঘুম দেয় তখনই বাবু একটা শাড়ির বিনিময়ে বেলী পাগলিকে নগ্ন দেখে এসেছে। নারীদেহের যাবতীয় রহস্য এবং জল্পনা-কল্পনার অবসান করার এমন সম্ভাবনায় আমি রোমাঞ্চিত হলাম। বাবুর কাছে টাকা ছিল, দুপুরে শাড়ি নিয়ে ভাতঘুমের সময়টা কাটিয়ে আসত রতনদের গোয়ালঘরের পাশে। বেলী পাগলি তার সামনেই সব খুলে শাড়ি পরত। বলত, ‘ভালা লাগে আমারে? জামাই ঘরে নিবো?’
আমাকে কখনো নিয়ে যেত না বাবু। বলত, ‘এসব কাম করতে অয় একলা।’
দরিদ্র আমি আগেই ছিলাম, শুধু টের পাইনি। সেই প্রথম অনুভব করলাম দারিদ্র্য। মায়ের কেবল দুটি শাড়ি, নাহয় একটি চুরি করে কৈশোরের স্বপ্ন পূরণ করতাম। বাবার কোষাগার থেকে স্কুল বাবদ দুই টাকা ভাতা পেতাম অনিয়মিতভাবে। হিসাব করা শুরু করলাম তখন থেকেই।
আইসক্রিমওয়ালার লোভনীয় ঘণ্টা না শোনার ভান করতাম, সিগারেট খাওয়ার গোপন আসরে চাঁদা দেইনি বিভিন্ন বাহানায়। মেলার জন্য পাওয়া পাঁচ টাকার একটি টাকাও খরচ করিনি আমি। একটা টিনের বন্দুকের মালিক হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করলাম। আমি তখন একটি নির্জন দুপুরের কল্পনায় বিভোর।
অবশেষে মাসখানেকের কৃচ্ছ্রতাসাধনের পর বাজারে গিয়ে নিজের সব সঞ্চয় ব্যয় করে নিঃস্ব হয়ে সবচেয়ে কমদামি সবুজ রঙের একটা শাড়ি কিনলাম। শার্টের ভেতরে ঢুকিয়ে নিলাম শাড়িটি। মনে কেবল ভয় হচ্ছিল, সবাই যেন বুঝে গেছে বেলী পাগলিকে উলঙ্গ করার জন্য শাড়ি কিনেছি আমি।
সেদিন দুপুরে শার্টের ভেতর শাড়ি এবং মনে মধ্যে কু-বাসনা লুকিয়ে আমি চললাম রতনদের গোয়ালঘরে। মনে মনে ভয় হচ্ছিল কেউ বুঝি দেখছে আমাকে আড়াল থেকে। আমি রীতিমতো কাঁপছি। ভয় আর উত্তেজনা নিয়ে রতনদের বাড়ির সীমানায় পৌঁছাতে যেন অনন্তকাল লেগে গেল।
কিন্তু আমার কৈশোরের স্বপ্ন দীর্ঘশ্বাস হয়ে রইল যখন দেখলাম গোয়ালঘরের পাশে খুঁটিটি নিঃসঙ্গ পড়ে আছে। পরে শুনেছি, বেলী পাগলীকে দূরে কোনো এক বাজারে ছেড়ে এসেছে তার বাবা। বেলী খুব খুশি ছিল, সে ভেবেছে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে সে।
বেলী পাগলি আজ তার রূপ-যৌবন খুইয়ে কুৎসিত হয়ে ফিরে এসেছে। অফিস থেকে ফেরার পথে বাসার সামনে বেলী পাগলিকে দেখেই চমকে উঠলাম। যাকে নগ্ন দেখার জন্য মাসখানেক সাধনা করেছি, সেই বেলী পাগলি চটের বস্তার আচ্ছাদন ত্যাগ করে বসে আছে। তার চিমসানো শরীরে মোহনীয় ভাঁজ নেই, বুকে দুটি শুষ্ক-অপুষ্ট স্তন বাদুরের মতো ঝুলছে। কুকুরের পশমের মতো মাথায় চুল উঠে গেছে কয়েক জায়গায়। শরীরে ঘা আর পুঁজের সমাবেশ। তার পচে গলে যাওয়া শরীর আমার কৈশোরের বিগত স্বপ্নকে কী নির্মমভাবে যে খুন করল!
মাসের সুখীতম দিন আজ, মাইনে পাওয়ার দিন। আজ সব অভিমান ভাঙব, আজ কিছু দীর্ঘশ্বাসকে মুক্তি দিবো। ঘর থেকেই বের হতেই বেলী পাগলির বিগত যৌবন আমাকে অভ্যর্থনা জানাল। সে মূর্তির মতো বসে আছে নগ্ন হয়ে, চটের বস্তাটা কে যেন নিয়ে গেছে। আমার সকল আনন্দ বাসার সামনে প্রাণ ত্যাগ করল। মাথা হেট করে হেঁটে চললাম।
এক তাড়া নোট আমার হাতে, কাকের মতো উড়ে এলো এক ঝাঁক হিসাব। হিসাবের কাকগুলো সব টাকা খেয়ে যায়, দুই-একটা ফেলে যাওয়া খুচরো পয়সা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ঠিক তখন মনে পড়ল পুরোনো এক হিসাবের কথা, বুড়ো একটা দাঁড়কাক বুকের মধ্য থেকে কাঁ কাঁ করে উঠল। ভাবলাম, আজ দাঁড়কাকটার হিসেব মিটিয়ে দেবো।
একটা সবুজ শাড়ি কিনেছি, কম দামেই। একদিন শাড়ি কিনেছিলাম বেলী পাগলির শরীর দেখার জন্য। আজ আবার কিনলাম তার শরীর ঢাকার জন্য। গলির মুখে ঢুকলাম, বুকে কৈশোরের উত্তেজনা। ভয়ও আছে, ভিখারিকে শাড়ি কিনে দেওয়ার মতো মহত্ত্বের ইতিহাস আমার নেই। কেউ দেখে ফেললে কী মনে করবে?
আমার সব ভয়-উত্তেজনাকে দ্বিতীয়বার ব্যর্থ করে, আমার কৈশোরের দীর্ঘশ্বাসকে দীর্ঘায়িত করে, বুড়ো দাঁড়কাকের আয়ুবৃদ্ধি করে বেলী পাগলি কোথায় যেন চলে গেছে। হয়তো তার শ্বশুরবাড়ি খুঁজতে। বাসার সামনে শূন্যস্থান, যেন এক টুকরো মরুভূমি। শাড়িটি হাতে নিয়ে নিজেকে ধিক্কার দিলাম, কী ভয়ানক আবেগের অপচয়। বুড়ো দাঁড়কাকটা মরেনি, বুকের মধ্যে কাঁ কাঁ করছে।
