যমজ সূর্যমুখী – ওবায়েদ হক

যমজ সূর্যমুখী

সজলের নামটাই একটা জঘন্য উপহাস। সিনেমার কোনো নায়ক, অথবা বড়লোকের কোনো ছেলের নাম নকল করে হয়তো তার মা এই নাম রেখেছিল। তখন কী আর সে ভেবেছিল তার ছেলের শরীরে ঘটে যাবে এই অস্বাভাবিক বৈপরীত্য। যার চোখে জল নেই, তার নাম সজল! কালো মুখে শালিকের ঠোঁটের মতো হলুদ দুটি চোখ তার জলহীন। মা বলত, খুব ছোটবেলায় দুষ্ট কোনো জিন, খারাপ বাতাস অথবা কোনো ডাইনির কুদৃষ্টি তার চোখের সব জল শুষে নিয়ে গেছে। চোখের খরার জন্য জন্ডিসকে অপরাধী করা হয়েছিল প্রথমে, সেই হেতু কিছু তাবিজ যোগ হয়েছিল বালকের দেহে। গলায়, কোমরে কালো তাগায় ঝুলে থাকা তাবিজ, ফুটো পয়সা, বরইয়ের দানা ইত্যাদি মিলেও চোখে তার বর্ষা নামাতে পারেনি। সজল চোখ মেলে তাকালে মনে হয় যেন দুটি সূর্যমুখী ফুটেছে।

মায়ের কথা মনে হলে, বাপের লাথি খাওয়া মায়ের কুঞ্চিত মুখটাকেই মনে পড়ে সজলের। স্মৃতির গোপন অতল গুহায় নেমেও মায়ের একটা হাসিমুখ আবিষ্কার করতে পারে না সে। মায়ের জন্য বুকে তার উথালপাথাল ঝড় ওঠে প্রায়ই, গলার কাছে জমা হয় আবেগের জঞ্জাল। চোখের জ্বালার চেয়ে মনের জ্বালাটাই বেশি পোড়ায় তাকে, চাইলেও মায়ের জন্য দুটি অশ্রু ঝরাতে পারে না সে।

কিশোর বয়সেই কর্মজীবন শুরু হয়েছে তার, অপরাধজীবনও। প্রথমবার ধরা খেয়ে বুঝেছিল মানুষ কত হিংস্র। উন্মত্ত জনতা ছিঁড়ে নিয়েছিল মাতৃচিহ্ন তাবিজগুলো। হলুদ চোখ দেখে ক্ষেপে গিয়েছিল তারা। ‘এই বয়সেই নেশা, কয়দিন পরে তো মানুষ খুন করব।’ জনতা একটু অনুশোচনার অশ্রুর জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সজল অপরাগ, চোখ তার মরুভূমি।

‘বিলাইয়ের হাড্ডি শালার পুত, কোনো দুখ পায় না।’ জনতার ক্রোধ আরও বেড়েছিল, অশ্রুপাত যেহেতু হয়নি সেহেতু রক্তপাত হলো। রক্ত দেখলে অধিকাংশ মানুষ শান্ত হয়। অশ্রুর অভাবে অনেক রক্ত ঝরেছে সজলের।

জসিম মিয়ার অটোরিকশার গ্যারেজের সামনে এসে সজল সংকল্পটাতে শান দিল। শুষ্ক গালের ওপর অনাদরে বড় হওয়া খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোকে নখ দিয়ে নিড়িয়ে দিল সে। নখের আঁচড় গাল ভেদ করে তার মনের কোনো এক গভীর অংশে হালকা পরশ বুলিয়ে দিল। শোক রোমন্থন করার অবসর নেই তার, মৃত মাকে মনে পড়েছিল ক্ষণিকের জন্য, তাকে আবার কবর দিয়ে কর্মে মনোযোগ দিল সে। গ্যারেজের টিনের দরজায় একটি কিশোর তালা, একটু কান মলে দিলেই খুলে যাবে।

সজলের বিদ্যার কাছে তালাটা একটা উপহাসই বটে। টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা এই খোঁয়াড়ে প্রায় ত্রিশটার মতো অটোরিকশা নীরবে বিদ্যুৎ শুষে নিচ্ছিল। এই যানগুলো জাত-পরিচয়হীন, কাগজপত্র নেই, নম্বর নেই। পায়ে চালানো রিকশার পিঠে তাও একটু স্থান থাকে শিল্পের জন্য, সেই শিল্পে তাদের পরিচয় থাকে, বৈচিত্র্য থাকে। এই কুলাঙ্গারগুলোর রং কেমন যেন এক ধাঁচের, সে কীভাবে জানবে কোন জারজটার বাপ কে? বাছাই করার মতো অবসর তার নেই, সুবিধামতো একটাকে ধরে নাড়ি বিচ্ছিন্ন করল, গ্যারেজের পেট থেকে টিনের যোনি দিয়ে খুব নিঃশব্দে সে গাড়িটাকে প্রসব করালো। আধাপেটা গাড়িটাকে ঘাড় ধরে রাস্তায় টেনে নিয়ে এল অবলীলায়।

সজলের ভেতরের উত্তেজনাটা বাইরে থেকে দেখলে বিন্দুমাত্র আঁচ করা যাবে না। ভেতরের তুমুল আলোড়নকে চেপে নিতান্ত অবহেলায় দুই তারে জোড়া দিয়ে অটোরিকশাটাকে জাগিয়ে তুলল সে। একটুও অস্বাভাবিকতা নেই, চোরদের অভিনয় জানাটাও জরুরি। অভিনয়টা তার বৃথা গেল, কারণ কোনো দর্শক ছিল না। ভোর চারটা বাজে, এলাকার দারোয়ানটা পর্যন্ত সারারাত জেগে এখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

নির্জন রাস্তাটাও ঘুমিয়ে আছে, শুয়ে আছে মরা সাপের মতো। ভোঁতা একটা কোলাহল সৃষ্টি করে ছুটে চলেছে সজল, ভোরের নিস্তব্ধতায় খুব একটা ক্ষতি হচ্ছে না তাতে। তার শান্ত পুকুরের মতো মুখ, কিন্তু বুকে উথালপাথাল ঝড়। সেই ঝড়ের ঝাপটায় এক একবার তার শান্ত চেহারার মুখোশটা খসে পড়ে যায়, ঢেউ ওঠে মুখে, ভাঁজ পড়ে কপালে। বড় একটা নিঃশ্বাসে কপালের ভাঁজ মুছে ফেলে সে। ভেতরের ঝড়টা ঠেলে আবার বুকে বন্দি করে নেয়।

গন্তব্যে পৌছালে অন্তত এক মাসের স্বস্তির জোগান পেয়ে যাবে সে। তার অভাবী জীবনে দুঃখের বাড়াবাড়ি রকমের প্রাচুর্য। বাড়িতে তার আপদ আছে তিনটা, তার কুৎসিত বউ জুলেখা, আর দুটো মাংসবিহীন হাড়-চামড়ার ছেলে। বউটা তার বাড়ি বাড়ি খেটে ঘরে এসে চুলা জ্বালায়। প্রায়ই সজল জুলেখার ব্লাউজের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ঘামে ভেজা টাকা বের করে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে ব্লাউজের ভেতর চিমসানো স্তন ছাড়া আর কিছুই পায় না সে। বউ পেটানোর প্রবল ইচ্ছাটা তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একবিন্দু প্রেম কিংবা কাম অবশিষ্ট নেই জুলেখার মনে, তারপরও দুটি ছেলে জন্ম দিয়েছে সে। পেটে এক বস্তা কৃমি নিয়ে ছেলে দুটো বড় হচ্ছে। পেটে বসে কৃমিগুলো ছেলেগুলোকে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। ছেলেগুলোর কথা ভাবতেই দুঃখের লাভা উদগীরণ হয় সজলের মনে। সে কিছুতেই বুঝতে পারে না, তার মতো ভালোমানুষের জীবনেই কেন এত অভাব, এত কষ্ট! একটা রাজত্ব না রেখে যাওয়ার অপরাধে পূর্বপুরুষদের অবিরাম অভিশাপ দেয় সে।

এই কষ্টগুলোকেই মাঝে মাঝে খুব আপন মনে হয়, চেটে চেটে উপভোগ করে, লজেন্সের মতো। আগুনই যদি না জ্বলে, নেভানোর সুখ পাবে কোথায়? তাই সজল তার দুঃখগুলোকে উসকে দেয়। ছেলেগুলোর শুকনো মুখ, জুলেখার ফুলে ওঠা গলার শিরা আর চিমসানো স্তন, ঘরের জং ধরা টিন, ভদ্রলোকদের চোখের তিরস্কার জ্বালা ধরায় তার মনে আর চোখে। আসন্ন জ্বালা মেটানোর সম্ভাবনায় ভয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যেও তার মনে ঘন ঘন রোমাঞ্চ হয়।

ভোররাতের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের মূল্য সতেরো হাজার টাকা। টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে সে চলল নন্দপাড়ায়; নন্দপাড়া হচ্ছে মন্দ পাড়া। সারাটা দিন ধোঁয়া, তরল আর নরম মাংসে সজল তার কষ্টগুলো ভুলে ছিল। সন্ধ্যায় মাংসের ক্রেতা বাড়তে থাকায় অস্থায়ী সঙ্গিনী তাকে গালি সহযোগে একরকম ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দিল। গালিগুলো স্থূল, ভীষণ রকম অশ্লীল এবং অভিনব। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সজলের মাকে তিন হাজার পুরুষের সাথে শুইয়ে দিয়েছে তার সঙ্গিনী।

নেশার ঘোরটা একটু কমতেই সজলের বুক ফুঁড়ে এল শীর্ণ জুলেখা, রুগ্ন ছেলে আর ঘরভরতি দারিদ্র্য। অপরূপ স্বপ্ন ভাঙার পর কুৎসিত বাস্তবতা তার মনটা বিষিয়ে দিল। তবুও ঘরে ফিরতে হবে, পকেটে কিছু টাকা আছে, বাজার করে নিয়ে যাবে, অপুষ্ট ছেলে দুটোকে আজ মাংস খাওয়াবে।

সজলের ঘর যেন টিনের কবর। একটা মাত্র বাল্বের আলোয় কোনোমতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে ঘরটি। নারীকণ্ঠে কেউ তাজা বিলাপ করছে, যেন শোকসঙ্গীত। সজলের মনে একটা কালো কাক উড়ে গেল, শীতলতা অনুভব করল ঘর্মাক্ত শরীরে। দরজা ঠেলে দেখল জুলেখা চুলায় কাঠ ঠেলছে, ভাত ফুটছে ভটভট শব্দ করে। সজলের চোখের দৃষ্টি অতি প্রখর নয়, ছেলেগুলোকে খুঁজে পেতে তার কিছু সময় লাগল। বাজারের ব্যাগের ভারে তার ডান হাতের শিরা ভেসে উঠে চকচক করছে। বাজারের ব্যাগটা চুলার কাছে ফেলে সজল আবার কান পাতল বিলাপে।

‘ক্যাডা মরছে রে?’

গলায় যথাসম্ভব বিরক্তি এনে জুলেখাকে জিজ্ঞাসা করল সে। বউয়ের সাথে সকল আহ্লাদ শেষ হয়েছে তার, তারপরও আজকের বিরক্তিটা কৃত্রিম। জুলেখা বাজারের ব্যাগ খুলে আলু-পটলের মাঝে একটা ল্যাংটা মুরগি দেখে খুশি হলো কি-না বোঝা গেল না, তবে একবার ফিরে ছেলেদের দিকে চাইল। বলল, ‘মরে নাই, ইদ্রিস মিয়ার অটো চুরি গেছে।’

প্রতিবেশীর ওপর দুর্যোগ এলে নিজেদের দুশ্চিন্তা কমে যায়, বিলাপে হয় মনোরঞ্জন। বাজারের ব্যাগে ল্যাংটা মুরগি দেখে প্রতিবেশীর বিলাপ আরো মনোহর লাগে জুলেখার। চামড়ার নিষ্প্রভতা ঠেলে মুখে উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে। নিজের বেদনাহত চেহারাটা নিপুণভাবে লুকিয়ে রাখে সজল। ইদ্রিস মিয়ার ঘরে নতুন উদ্যমে বিলাপ শুরু হলো আবার।

ইদ্রিসের জনবহুল পরিবারের উপার্জনক্ষম বলতে এই অটোরিকশাটি। তার অপহরণে এই সমবেত করুণ কান্না। পুত্রশোকেও মানুষ এমন কাঁদতে পারে না। সকালে সবাই মিলে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করেছে, সারাদিন বিলাপ করেও তারা শোক ভুলতে পারছে না। এই সন্ধ্যায়ও ক্ষণে ক্ষণে আর্তনাদ উঠে আসছে তাদের ঘর থেকে। সেই আর্তনাদ চেপে ধরেছে সজলের বুক।

জুলেখা রাঁধছে, তার অর্ধনগ্ন ছেলে দুটো কোলের ওপর হাত রেখে বসে গভীর আগ্রহে মাংস রান্না দেখছে। সজল দেখছে তার লিকলিকে ছেলেগুলোকে, তাদের চেহারায় মনমরা ভাবটা স্থায়ী হয়ে গেছে, মায়া লাগে আবার বিরক্তিও লাগে। নেশাটা পুরোপুরি কাটেনি তার, প্রশান্তির রেশটুকু শেষ হয়ে এখন গ্লানিতে এসে ঠেকেছে। ইদ্রিস মিয়ার চেহারাটা অযাচিতভাবে চোখের সামনে ভেসে উঠছে কিছুক্ষণ পর পর। কিছুটা অপরাধবোধও কি তার হচ্ছে? নাকি সেটাও নেশা কেটে যাওয়ার গ্লানি?

সজল জীবনে অপরাধ কম করেনি, পাশের যাত্রীকে ওষুধ মেশানো পান খাইয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। দুইশ টাকার জন্য চোখে মলম ডলে এক যুবককে প্রায় অন্ধ করে দিয়েছিল সে। বাচ্চা মেয়ের গলার সোনার গয়না ছিঁড়ে নিয়েছে এক ঝটকায়, হাতে রামদা নিয়ে গামছায় মুখ ঢেকে ডাকাতি করেছে।

সেসব অপকর্মের টাকায় সে অবলীলায় ফুর্তি করেছে, নেশা করে পতিতার বুকে মুখ ডুবিয়েছে নির্বিকারভাবে। কোনোদিন সেই চোখ চেপে ধরা যুবকের চিৎকার তাকে উৎপীড়ন করেনি, বালিকার চোখের পানি তার মন ভিজায়নি, বৃদ্ধের ভয়ার্ত মুখ দেখে মায়া হয়নি, হাসির খোরাক জুগিয়েছে বরং।

অথচ আজ কেন ইদ্রিস মিয়ার কান্নায় তার বুক মোচড়ায়? ইদ্রিস মিয়া তার প্রতিবেশী, তাই? নাকি সজল তার স্বীকৃত দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী বলে?

ইদ্রিস মিয়ার জীবন হচ্ছে বিভিন্ন দুর্ঘটনা এবং দুর্ভাগ্যের অপরিমিত সমাহার। মনে হয় যেন স্বয়ং ঈশ্বর আদাজল খেয়ে লেগেছে তার বিরুদ্ধে। তার স্বাস্থ্য ভঙ্গুর, হাড়গুলো বেহায়ার মতো চামড়া ঠেলে বেরিয়ে থাকে। পেশায় সে ছিল রিকশাচালক, কিন্তু রিকশাটা ছিল তার গোঁয়ার স্বভাবের, সহজে নড়তে চাইত না। দুর্বল ইদ্রিসের অবাধ্য রিকশা চলত ধীরগতিতে। অপর্যাপ্ত গতির কারণেই একবার মোটরগাড়ির ধাক্কায় রিকশাটি তার প্রাণ এবং ইদ্রিস মিয়া তার একটি পা হারালো। পায়ের বদলে কিছু টাকা পেয়েছিল সে, তার শীর্ণ এক পায়ের মূল্য আর কতই-বা হয়! এক পায়ের টাকায় সে হলো পানের দোকানদার, ভাগ্য তার হাসতে শুরু করেছিল। ঘরে এনেছিল উর্বর বউ, যে বউ তাকে একটার পর একটা কন্যাসন্তান উপহার দিয়ে গেছে। পাঁচটা মেয়ে হওয়ার পর যেদিন ইদ্রিস মিয়ার ছেলে হলো সেদিন আগুন তার দোকান খেয়ে ফেলল। ভাগ্যের মুচকি হাসি প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই মিলিয়ে গেল। ছেলে জন্ম দেওয়ার গর্বে বুক ফোলানোর আগেই দোকানের শোকে বিলাপ করতে হলো তাকে। দোকানের চিতার ওপর গড়ে উঠল দালান, সেখানে তার পান-দোকানের ঠাঁই হয়নি। ছেলে তার হাঁটতে শেখার পর এক নির্জন দুপুরে সব ক’টা চোখ ফাঁকি দিয়ে ডুবে মরল পুকুরে। অভাবে একটা মেয়ে তার নষ্টা হলো, তার টাকায় কিছুদিন সংসার চলেছে। সে মেয়েটা মরল কী এক অজানা রোগে। এক চোখা একটা যুবতী মেয়ে আছে তার, পার্কে ভিক্ষা করে। নষ্ট চোখটার কারণে তাকে বেচা যাচ্ছে না আর ভালো চোখটার কারণে সে ভিক্ষা পায় না। একটা মেয়ে পালিয়েছে কোনো এক বখাটের সঙ্গে, তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পালিয়ে গিয়ে একজন মানুষের বোঝা কমানোর জন্য তাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করে ইদ্রিস।

এত অভাব-অনটনেও সন্তান উৎপাদন বন্ধ হয়নি ইদ্রিস মিয়ার। তার স্বাস্থ্য এবং সন্তান সংখ্যা দেখে মানুষ বিস্মিত হতো। বিভিন্ন রোগের আশ্রয়দাতা ইদ্রিস মিয়া অন্তত একদিক দিয়ে যে প্রচণ্ড সুস্থ তা নিয়ে লোকে ঠাট্টাও করত বেশ। পাঁচ বছর আগে যমজ দুটি মেয়ে হয় তার। তারপর তার স্ত্রী সন্তান উৎপাদনে ইস্তফা দিয়ে স্বামীর শয্যা ত্যাগ করেছে আর বিভিন্ন অসুখের প্রকোপে ইদ্রিস মিয়া হয়েছে শয্যাশায়ী। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটা অটোরিকশা কিনেছিল সে, দিনে চারশ টাকা ভাড়া পেত, সেই টাকায় আটজনের সংসার চলত কোনোমতে। অটোরিকশাটি তার কাছে রোজগেরে পুত্রসন্তানের মতোই ছিল, শোকটাও তাই মাত্রাহীন।

জুলেখা আর তার ছেলে দুটো পেট ভরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সজলের চোখে ঘুম নেই। ইদ্রিসের ঘর থেকে এখনো কান্না ভেসে আসছে। কত কাঁদতে পারে মানুষ! প্রতিটা আর্তনাদ যেন ধিক্কার জানাচ্ছে সজলকে। পকেটে অল্প কয়েকটা অবশিষ্ট নোট তাকে তিরস্কার করছে আর খরচ করে ফেলা নোটগুলো অবিরাম ছোবল দিচ্ছে, অসহনীয় লাগছে তার। একটা সিগারেট ধরিয়ে সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে চলে এল ইদ্রিস মিয়ার ঘরের সামনে। দরজাটা আটকানো নয়, ভিড়ানো। দরজার ওইপাশের সব দীর্ঘশ্বাসের কারণ সে।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ইদ্রিস শুকনো চোখে নতুন করে পানি এনে ঝিমিয়ে পড়া কান্নাটা আবার শুরু করতে যাচ্ছিল। ঘাড় উঠিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘কেডা?’

‘আমি, কাকা। খবর শুইন্যা আইলাম।’

‘অ, সজল?’

ইদ্রিস মিয়া হতাশ হয়ে ঘাড় নামায়, নেশাখোর সজলকে কেঁদে কেঁদে দুঃখের কাহিনি শুনিয়ে চোখের পানির অপচয় করতে চায় না ইদ্রিস। ইদ্রিসের ঘরটা অপরিচিত মনে হয় না সজলের। সব গরিব ঘরের চেহারা মোটামুটি একই রকম, নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, অপ্রতুল আলো, প্রাচীন দুই-একটি আসবাব এবং অনেকগুলো ক্লিষ্ট মুখ। ইদ্রিস মিয়া অনাগ্রহে ক্লান্ত স্বরে দুই-একটা কথা বলে।

আজ সারাদিন অনেক মান্য-গণ্য লোকের সমাগম হয়েছে তার ঘরে। মেম্বার, চেয়ারম্যান, সুদখোর, ঘুষখোর, কালোবাজারি—সবাই এসে সমারোহের সাথে হা-হুতাশ করে গেছে। ইদ্রিস যথেষ্ট দরদ মিশিয়ে কেঁদে তার দুঃখ বর্ণনা করেছে তাদের কাছে। কান্নাটা তার নিখুঁত হয়েছিল, অনেকের মন গলেছে। সারাদিন কেঁদে ইদ্রিস আয় করেছে তেইশ হাজার টাকা। এই টাকায় কী হয়? ঋণের আরো বহু কিস্তি পড়ে আছে সামনে, আরও কত নদী যে কাঁদতে হবে!

‘পুলিশে যাও নাই, কাকা?’

সজলের কথা শুনে বিরক্ত হয় ইদ্রিস। বলে, ‘পুলিশরে ট্যাহা দিমু কইত্তে? তাগো বড়ো প্যাট।’

সজল সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কথা খুঁজে পায় না আর। একটি পাঁচশ টাকার নোট গুঁজে দেয় সে ইদ্রিস মিয়ার মুঠোতে। বালিশের তলায় ময়লা ন্যাকড়ায় মোড়ানো মান্য-গণ্যের দানের সাথে সহাবস্থান নেয় সজলের অনুতাপ। বিনিময়ে ইদ্রিস মিয়া পাঁচশ টাকার পরিমাণমতো একটু ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে।

অনুশোচনা আর বিন্দুমাত্র নেই সজলের, পকেটের টাকাগুলোও আর গোলমাল করছে না, তারপরও ঘুমাতে পারছে না সে। চোখে জ্বলছে ইটের ভাটা, অবসাদ লাগছে ভীষণ। মনে হচ্ছে কয়েক যুগ ঘুমায়নি সে। পকেট হাতড়ে হিসাব করতে বসে সে, হিসাব মিলিয়ে দেখে সে অত্যন্ত গরিব, ইদ্রিস মিয়ার চেয়েও বেশি, তার চোখে জলও নেই।

ভোর হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়ে সজল, পুরো দুনিয়া ঘুমে নিঝুম। বালিশের নিচে সাড়ে তেইশ হাজার টাকা রেখে ইদ্রিস মিয়ার ঘুমটাও নিশ্চয়ই গভীর এখন। ক্ষোভ হয় তার, মনে হয় ঈশ্বর আসলে তারই বিরুদ্ধে, দারিদ্র্য দিয়েছে, কিন্তু অশ্রু দেয়নি।

ইদ্রিস মিয়াকে আবার নিঃস্ব করার একটা নিষ্ঠুর দুরভিসন্ধি পাক খেয়ে ওঠে সজলের মাথায়। থেমে থেমে তবুও একটা অস্বস্তি খোঁচা দেয় তার মনে, এতগুলো মানুষ না খেয়ে মরবে? সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে অস্বস্তিটাকে খুন করে সে। ভাবে, নাহ, যাদের চোখে এত জল তারা না খেয়ে মরবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *