মহাকাল – ২

দুই 

বিপদ যতক্ষণ সামনে এসে না দাঁড়ায় ততক্ষণই ভয়ঙ্কর। মায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম ঝাপটা কেটে যাওয়ার পরে মাতাপুত্রে শান্তভাবে গল্প করতে বসলো। 

নরেন্দ্রের স্ত্রী সুবর্ণলেখা পাথরের গ্লাসে সরবৎ এবং পাথরের রেকাবীতে খাবার এনে অদূরে মহেন্দ্রের জায়গা করে দিলে। 

কত দিন মায়ের সামনে সে খায়নি। 

বিরাজমোহিনী তাঁর কম্বলের বিছানায় জড়োসড়োভাবে বসে ছিলেন। কী চেহারা হয়েছে তাঁর! কোথায় বা সেই কাঁচা সোনার বর্ণ, কোথায় বা সেই চুলের রাশি! এই ক’টা বছরেই মনে হয় যেন তাঁর বয়স কুড়ি বৎসর বেড়ে গেছে। 

হঠাৎ বিরাজমোহিনী মহেন্দ্রকে লক্ষ্য করে বললেন, তোর চেহারা তো সারেনি বাছা! 

মহেন্দ্ৰ হেসে ফেললে। কারণ কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। তার দেহ স্থুল হয়নি সত্য, কিন্তু সে ছিপছিপে দেহও আর নেই। বেশ বলিষ্ঠ, হাড়ে-মাসে জড়ানো দোহারা চেহারা হয়েছে। কিন্তু তা সে বললে না। 

বললে, সারবে কি মা? তোমার সামনে বসে না খেলে এই বুড়ো বয়সেও আমার পেট ভরে না। 

বিরাজমোহিনী খুশি হলেন। কারণ কথাটা মিথ্যা নয়। ছেলেবেলা থেকেই মহেন্দ্রের খাওয়া ব্যাপারটা যুদ্ধের মতো। টালবাহানা ছলছুতা রাগারাগির আর অন্ত থাকতো না। কতদিন যে থালা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে না খেয়েই সে স্কুল গেছে তার ইয়ত্তা নেই। সেইজন্যে তার খাবার সময় শত কাজ ফেলেও বিরাজমোহিনীকে তার সামনে উপস্থিত থাকতেই হত। সেইটেই বোধ করি অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। 

সুবর্ণলেখা জিজ্ঞাসা করলে, তোমার সেই চণ্ডাল-রাগ এখনও আছে ঠাকুরপো? 

মহেন্দ্র সহাস্যে উত্তর দিলে, কি জানি বৌদি, পরীক্ষা করে দেখবার সুযোগ হয়নি। যাদের সঙ্গে এই ক’টা বছর কাটালাম, তাদের উপর ও বস্তুটা পরীক্ষা করে দেখা সর্বত্র নিরাপদ নয়। রণক্ষেত্রে রাগ-অনুরাগের চাষ নেই। 

—তাহলে আশা করি ওটা ভুলেই গেছ? 

—আজ সন্ধ্যায় তো সেই আশাই করা যাক বৌদি। তার পরে রইলে তুমি আর রইলাম আমি, আর রইল লম্বা ভবিষ্যৎ। 

ব’লেই মহেন্দ্ৰ অট্টহাস্য করে উঠলো। 

সুবর্ণ শাশুড়ীর দিকে চেয়ে সভয়ে বললে, দেখছেন মা, সেই ছাদ-ফাটানো হাসিটা এখনও আছে! 

কৃত্রিম বিস্ময়ে মহেন্দ্ৰ বললে, আশ্চর্য! ওটা যে এখনও আছে, সে আমি নিজেই জানতাম না। 

বিরাজমোহিনী হেসে ফেললেন। বললেন, তাহলে তোর সব রিপুই ঠিক ঠিক আছে বাছা। আবার বৌমার চোখের জলে নাকের জলে এক হবে দেখছি। 

—না মা, দেখো, মহেন্দ্ৰ সবিনয়ে বললে, এবার আর সে সব কিছু হবে না। বৌদি, কাল থেকে রান্নাঘরে তোমাতে আর আমাতে। এমন কতকগুলো নতুন রান্না তোমাকে শিখিয়ে দোব, যা জীবনে কখনও খাওনি। 

শাশুড়ীর দিকে অপাঙ্গে চেয়ে সুবর্ণ বললে, আচ্ছা দেখা যাবে। 

বিরাজমোহিনী জিজ্ঞাসা করলে, ওখানে তোরা কি খেতিস? 

—কি খেতাম না তাই জিজ্ঞাসা কর। বলেই তাড়াতাড়ি নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে বললে,—যুদ্ধের সময় খাওয়ার কি কিছু ঠিক থাকে মা! যখন যা জোটে। 

কিন্তু বিরাজমোহিনী তাতে ভুললেন না। জিজ্ঞাসা করলেন, যত সব অখাদ্য খেতিস, না? 

মহেন্দ্ৰ হেসে হাত জোড় করে বললে, ওসব জানতে চেও না মা। 

বিরাজমোহিনী নিজের মনেই জিজ্ঞাসা করলেন, রেঁধেও দিত নিশ্চয় যে-সে জাতের লোক, কি বলিস? 

—বললাম তো মা, ওসব জিজ্ঞাসা কোরো না।

বিরাজমোহিনী শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 

এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে নরেন্দ্র এল। 

—এই যে! ভালো ছিলে তো? 

—আজ্ঞে হ্যাঁ। 

মহেন্দ্র দাদার পায়ের ধূলো নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই নরেন্দ্র তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললে, আঃ! 

আরামের, স্বস্তির, তৃপ্তির এই একটি শব্দে যেন মহেন্দ্রের অশ্রু সাগর উদ্বেল হয়ে উঠলো। আর তাকে রোখা গেল না। মহেন্দ্র দাদার কাঁধে মাথা রেখে শিশুর মতো ফুলে ফুলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। 

নরেন্দ্র বাধা দিলে না। শুধু নিঃশব্দে, গভীর স্নেহে তার মাথার চুলে হাত বুলোতে লাগলো। 

.

মায়ের ঘর থেকে নরেন্দ্র ওকে নিয়ে গেল বাইরে। 

ওদের বাড়ী থেকে খানিকটা দূরেই একটা চমৎকার বাগান-বাড়ী আছে। সরকারী কর্মচারী অথবা কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির গ্রামে আবির্ভাব হলে সেইখানে স্থান দেওয়া হয়। 

বাগানবাড়ীটা চিন্তাহরণবাবুর আমলকার। সুতরাং মহেন্দ্রের অপরিচিত নয়। কিন্তু এবারে যেন জাঁকজমক আরও বেশি মনে হল। ঘরের আসবাবপত্র বেশ মূল্যবান এবং নতুন-নতুন। সেই পুরোনো আসবাবগুলো কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে। সব চেয়ে মহেন্দ্ৰ আশ্চর্য হল ইলেকট্রিক লাইট দেখে। 

বিস্মিতভাবে জিজ্ঞাসা করলে, এ সব কবে হল? 

—তা বছর চারেক হল। বাড়ীতেও তো হয়েছে দেখলে না? 

—না, অতটা খেয়াল করিনি। এ তো অনেক খরচ! বিশেষ পাড়াগাঁয়ে … 

—তা কি করবে ভাই। দু’টাকা আনতে গেলে চার আনা খরচের ভয় করলে তো চলবে না। 

কথাটার ভিতরের অর্থ মহেন্দ্র ঠিক বুঝতে পারলে না। কিন্তু তা নিয়ে আর কোনো প্রশ্নও করলে না। 

নরেন বললে, চলো তোমার শোবার ঘরটা দেখাই গে। 

বিস্মিতভাবে মহেন্দ্ৰ জিজ্ঞাসা করলে, আমি কি এ বাড়ীতে শোব না কি?

এতক্ষণ পরে নরেন একবার হা হা করে হাসলে। 

বললে, এই বাড়ীর পিছনে আমি দশ হাজার টাকা খরচ করেছি মহিন। এর শোবার ঘর থেকে বসবার ঘর, খাবার ঘর, মায় বাথরুম পর্যন্ত একটিও সেই পুরোনো জিনিস কোথাও দেখতে পাবে না। এই দুর্দিনেও দামী দামী জিনিস আনিয়ে সাজিয়েছি। বাবা ভাবতেন, আমি বুঝি দারোগা- ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্যে এত কাণ্ড করছি। প্রায়ই বলতেন, এত টাকা ওদের পিছনে খরচ করছ কেন? তার জবাব বাবাকে দিতে পারিনি, কিন্তু মাকে বলেছি। মা জানেন এসব কার জন্যে। 

—আমার জন্যে? 

নরেন সে প্রশ্নের জবাব দিলে না। আপন মনেই অস্ফুটস্বরে বলতে লাগলো : ভগবান মুখ রাখবেন কি না জানতাম না। ভয়ে তাই মুখ ফুটে কাউকে বলিনি যে, আমারও ভাই ইউরোপ থেকে ফিরে আসছে। জজ-ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়ে তারও মূল্য কম নয়। সে যদি ফিরে আসে, এই বাড়ীতে তাকে যদি রাখতে পারি, তবেই আমার খরচ সার্থক হবে। রাধাবল্লভ আমার মুখ রেখেছেন। কালকেই তাঁর ভোগের ব্যবস্থা হবে। 

মহেন্দ্ৰ কি সিনেমা দেখছে? 

শোবার ঘরে গিয়ে দেখে, বিলিতি কায়দায় অত্যন্ত মূল্যবান আসবাব দিয়ে ঘরখানি পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে। মশারি থেকে বিছানা এবং বিছানার চাদর পর্যন্ত সমস্ত নতুন। তার বুঝতে বিলম্ব হল না, এ সমস্তই দাদা তারই জন্যে কিনে এনেছে। 

তার উপর এই স্বল্পভাষী, শান্ত দাদার স্নেহ চিরদিনই অপরিসীম। তার অনুপস্থিতিতে সেই স্নেহ কোথায় পৌঁছেচে, ভাবতে তার চোখ ছলছল করে উঠলো। 

কিন্তু সেই অশ্রুবাষ্প মুহূর্তে উবে গেল, যখন ধোপ-দুরস্ত উর্দী পরে ইব্রাহিম সসম্ভ্রমে সেলাম করে জানালে ডিনার তৈরী। 

—এ সব কি দাদা? 

—কিছুই তো নয় ভাই। ছ’বছর ইউরোপে কাটিয়ে তুমি ডাঁটা-চচ্চড়ি খেতে চাইলেও আমি তো দিতে পারি না। 

—কিন্তু আমি তো সত্যিই সাহেব হইনি দাদা। 

উত্তরে নরেন শুধু তাকে একটা তাড়া দিয়ে বললে, নাও, ওঠো। খেয়ে নাও আগে।

মহেন্দ্র দাদার সঙ্গে কখনও তর্ক করেনি। আজও তর্ক করলে না। বস্তুত নরেন্দ্র এমনই নিরীহ এবং মিতভাষী যে তার সঙ্গে তর্ক কিংবা কলহ করাই যায় না। সে স্থির করলে সকালে উঠে বৌদির সঙ্গে এবিষয়ে মীমাংসা করবে। 

সে নিঃশব্দে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো। 

নরেন্দ্র বললে, রাত হয়ে যাচ্ছে। আমার এখনও সন্ধ্যাহ্নিক হয়নি। এবার আমি উঠি, কি বল? 

নরেন্দ্র চলে যেতে ইব্রাহিম একে একে খানা সাজিয়ে দিতে লাগলো। লোকটা পাশের গ্রামের খান বাহাদুরের বাড়ীতে অনেক দিন বাবুর্চিগিরি করেছে। রাঁধে ভালো। মহেন্দ্রের মনে যেটুকু উত্তাপ জমেছিল, ইব্রাহিমের হাতের রান্না খেয়ে তা শান্ত হল। দ্বিতীয় কোনো সঙ্গী না থাকায় সে ইব্রাহিমের সঙ্গেই গল্প আরম্ভ করলে : 

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলে, কেমন আছ ইব্রাহিম? যা সাজ করেছ, আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি। এ বাড়ীতে কদ্দিন থেকে? 

—তা বছর তিনেক হবে বাবু। কর্তাবাবুর আমল থেকেই। 

—বলো কি? কর্তাবাবুর আমল থেকে? 

—জি হাঁ। যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে বড়বাবু চালানি কারবার আরম্ভ করলেন। সাহেব-সুবোর আসা-যাওয়া বাড়তে লাগলো। বড়বাবু ডেকে বললেন, ইব্রাহিম, বুড়ো বয়সে কেন বিদেশে পড়ে থাকো। সাহেব-সুবোদের খানা পাকাবার জন্যে আমার তো একজন লোকের দরকার। তুমি ওখানে যা পাও, তাই দোব। 

—বড়বাবু চালানি কারবার আরম্ভ করেছেন বুঝি? 

—জি হাঁ। তা এ আমার ভালোই হয়েছে বাবু। রোজই আর সাহেব-সুবো আসে না, আমাকেও খানা পাকাতে হয় না। একবার করে এসে বাড়ীঘরের খবরদারী করি আর বাড়ীতে বসে চাষ-বাসও করি। খানা ভালো হয়েছে তো বাবু? 

—চমৎকার হয়েছে। বড়বাবু কিসের চালানি করেন ইব্রাহিম? 

—চাল-ধান আছে। গরু-ভেড়া-মুর্গিও মাঝে মাঝে করেন দেখতে পাই। ঠিকেদারীও আছে। সব আমি জানিনে বাবু। 

—হুঁ। সাহেব-সুবো প্রায়ই আসেন বুঝি? 

—প্রায়ই। তাছাড়া দারোগা বাবু, হাকিম বাবু, আরও সব অনেক বাবু প্রায়ই আসেন।

—তাঁরা কেন আসেন জানো? 

মহেন্দ্রের অজ্ঞতায় ইব্রাহিম পর্যন্ত হেসে ফেললে। বললে, তাঁদের সঙ্গেই তো কারবার ছোটবাবু। আপনি বাইরে ছিলেন, বেলাক-মার্কেটের ব্যাপার বুঝবেন না। 

—ও, ব্ল্যাক মার্কেট! —ব্যাপারটা এতক্ষণে মহেন্দ্র পরিষ্কার উপলব্ধি করলে। 

তার দাদা এতদিন ধরে চোরাকারবার করে এসেছে তাহলে। তাই এত ঐশ্বর্য! বিজলী আলো এবং বাগান বাড়ীতে সাহেব-সুবো নিয়ে এত সমারোহ! তাদের বাড়ী- ঘর-দোরের এবং চালচলনের উন্নতি এসে পর্যন্তই সে লক্ষ্য করছে। এত দাস-দাসী, আমলা কর্মচারী তাদের আগে ছিল না। বাইরের সেরেস্তায় রামলোচন এবং আর একজন মাত্র কর্মচারী ছিল। ভালো করে সে লক্ষ্য করেনি, তবু একবার মনে হয়েছিল, সমস্ত সদরটাই যেন কি রকম জমজমাট। 

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলে, দাদা বোধ হয় অনেক টাকা রোজগার করেছেন, না ইব্রাহিম? 

—টাকা?—ইব্রাহিম সগর্বে নিজের পাকা দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে বললে, এদিগরে এখন আপনাদের চেয়ে বেশি টাকা কারও নেই ছোটবাবু। 

—বলো কি হে? 

—সত্যি কথাই বলেছি ছোট বাবু। সর্বানন্দপুরে উড়োজাহাজের যে ঘাঁটি হল না, শুধু তাতেই তো বড়বাবু ছ’লাখ টাকা কামিয়েছেন শুনেছি। 

—সর্বানন্দপুরে আবার একটা ঘাঁটি হয়েছে নাকি? 

—হয়নি ছোটবাবু, শুধু একবার হওয়ার ব্যবস্থা হল আর একবার ভেস্তে গেল। আমাদের বড়বাবু শাঁখের করাতের মতো যেতেও কাটলেন, আসতেও কাটলেন। 

ইব্রাহিম হাসলে। 

মহেন্দ্রের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর কোন কথা না বলে সে হাত মুখ ধুয়ে শুতে চলে গেল। ট্রেনের ভ্রমণ, শোভাযাত্রার সঙ্গে পরিভ্রমণ প্রভৃতিতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আর বসে থাকতে পারলে না। 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *