সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
1 of 2

মনে পড়ার খেলা – অনীশ দেব

মনে পড়ার খেলা

পুকুরের জলের ওপিঠে কৃষ্ণচূড়ার পাতা বেয়ে রোজ যেমন সূর্য ওঠে তেমনি আজও উঠেছিল। ভোরবেলায় জানলার গ্রিল ঘেঁষে চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভালো লাগে, আজও লাগছিল। হঠাৎই পিছন থেকে রুবির গলা শুনতে পেলাম।

‘তোমাকে একটা দরকারি কথা বলব।’

না দেখেই বুঝলাম, ও বিছানায় উঠে বসেছে। মাথার চুল এলোমেলো। কপালের টিপটা বোধহয় ঠিকঠাক নেই।

আমি গাছের পাতার নড়াচড়া দেখছিলাম। ছোট-ছোট পাখি উড়ছিল কয়েকটা। শব্দ করে কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘বলো—।’

‘আমি তোমাকে আর ভালোবাসি না—।’

হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। কাপ-প্লেট শত টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ঘরের মেঝেতে। জানলার ফ্রেমে বাঁধানো আকাশটা পলকে ঘোলাটে হয়ে গেল। আর চনমনে সূর্যটা মুখ ভার করে গাছ বেয়ে আবার নেমে যেতে লাগল দিগন্তের ও-পিঠে।

আমি অসহায়ভাবে ঘুরে তাকালাম রুবির দিকে। ওর সুন্দর মুখটাকে অবাক চোখে দেখলাম। চার বছর ধরে ছন্নছাড়া পাগলের মতো ওকে ভালোবেসেছি। আর আজ, এখন, ভালোবাসা আর নেই! সব শেষ!

‘রুবি, কী বলছ তুমি! আমি—’ আমার গলা বুজে গেল। চোখ করকর করছিল।

রুবি এতটুকু বিচলিত হল না। বাঁ-হাত দিয়ে ওর মাথায় কী যেন খুঁজছিল। তারপর হাতটা এগিয়ে দিল আমার দিকে। বলল, ‘শান্তনু, এই নাও তোমার ভালোবাসা।’

আমি হাত পেতে আমার ভালোবাসা ফিরিয়ে নিলাম। আমার হাতের ফরসা তালুর ওপরে একটা সিলিকন মাইক্রোচিপ। তার গা থেকে বেরিয়ে রয়েছে চোদ্দোটা ধাতুর পিন। ভালোবাসায় কাঁটা আছে।

রুবি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছিল। এখন সাততাড়াতাড়ি নিজের জিনিসপত্র গোছগাছ করছে। সুটকেসে ভরে নিচ্ছে শাড়ি-জামাকাপড়। এইসব কাজের মধ্যেই ও কথা বলছিল।

‘আমার স্মৃতিকোশে আমাদের ভালোবাসার ব্যাপারে যা-কিছু স্মৃতি ছিল সবই জমা আছে ওই চিপের ভেতরে। তুমি অন্য কোনও রোবট-মেয়ে নিয়ে এলে তার মাথায় ওই চিপটা বসিয়ে দিয়ো। তা হলে সে তোমাকে আমার মতোই ভালোবাসবে।’

আমি কাঁদছিলাম। ভালোবাসা হারিয়ে গেলে এত কষ্ট হয় জানতাম না। রুবি পুরোপুরি রোবট নয়। অর্ধেক মানবী, অর্ধেক রোবট। ওরা রূপে গুণে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক উন্নত। ওরা ভালোবাসতে জানে অদ্ভুতভাবে। ওদের ভালোবাসার টান অলৌকিক। সেইজন্যেই রুবিকে নিয়ে এসেছিলাম ‘অ্যানড্রয়েড সেন্টার’ থেকে। ভালোবেসেছিলাম মন আর শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণু দিয়ে। ওকে ঘিরে আমার স্মৃতির সবটাই সুখের।

সেন্টারের ডিরেক্টর আমাকে ভয়ের কথাটাও শুনিয়েছিলেন। যে-কোনওদিন যে-কোনও মুহূর্তে এই অর্ধমানবীরা ভালোবাসাহীন হয়ে যেতে পারে। সেই আঘাত আমি সইতে পারব তো? মনে আছে, আমি বলেছিলাম, আমার ভালোবাসার ওপরে আমার আস্থা আছে। অথচ আজ, এই অপরূপ সকালে, আমাকে কাঁদিয়ে রুবি ভালোবাসাহীন হয়ে গেল।

রুবি আর কোনও কথা বলছিল না। শুধু যান্ত্রিক ঢঙে একটার পর একটা কাজ সারছিল। আর আমি বোকার মতো সিলিকন চিপটা মুঠো করে ধরে বসেছিলাম।

একটু পরে চোখ মুছে ধরা গলায় ওকে বললাম, ‘রুবি, মনে পড়ে, বোটানিক্যাল গার্ডেনে গিয়ে একটা গোটা দিন কীভাবে আমরা কাটিয়েছিলাম? গঙ্গায় ভেসে ছিলাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা—।’

রুবি কাজ থামিয়ে ভাবলেশহীন মুখে আমাকে দেখল। একটু থেমে বলল, ‘তুমি কি পুরোনো কোনও কথা বলছ? আমার কিচ্ছু মনে নেই। সব ধরা আছে ওই মাইক্রোচিপের ভেতরে। নতুন কাউকে এনে ওই চিপটা লাগিয়ে দিয়ো, তার সব মনে পড়ে যাবে।’ রুবি আবার গোছগাছে মন দিল। ব্যস্ত পায়ে এ-ঘর ও-ঘর করতে লাগল।

আমি মাথা নীচু করে বসে রইলাম। মাথার ভেতরে আলপিন ফোটাচ্ছে কেউ। এক কথায় চার বছরের ভালোবাসা শেষ! রুবি তো সব ভুলে গেল। কিন্তু আমি তো মানুষ! আমি এত সহজে সব ভুলে যাই কেমন করে? আমার মাথার ভেতরে তো আর মাইক্রোচিপ নেই!

একটু পরেই সাদামাটা ‘যাচ্ছি’ বলে রুবি চলে গেল। ওর পরনে নীল-সাদা ফুলকাটা সিল্কের শাড়ি। সাউথ ইন্ডিয়ায় বেড়াতে গিয়ে ওকে কিনে দিয়েছিলাম। রংটা ওর খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু জানি, এখন আর ওর কিছু মনে নেই। সেইসব ‘অপ্রয়োজনীয়’ স্মৃতি জমা রয়েছে আমার হাতের এই মাইক্রোচিপের ভেতরে।

আমি যে এখন কী করি!

সামনেই বিমূর্ত গ্রাফিক ঢঙের স্তম্ভের ওপরে বাসানো রয়েছে আমার আর রুবির রঙিন হলোগ্রাম। হাত মুঠো করে আমি সেই স্তম্ভ ঘিরে ঘুরতে লাগলাম। চারপাশ থেকে দেখতে থাকলাম রুবিকে। স্বপ্নের মতো চোখ, সবুজ টিপ, আর ঘন কালো চুলে নিয়ম-ছাড়া ঢেউ।

আমার বুকের ভেতরে পাগলের মতো কুড়ুল চালিয়ে কেউ কাঠ কাটছিল। হাহাকার ভরা চোখে হাতের মাইক্রোচিপটাকে দেখলাম। চার বছরের এত ভালোবাসা এইটুকু সিলিকন চিপের ভেতরে ধরে গেল! ভালোবাসা এতই নমনীয়!

সারাটা দিন ধরে অসহ্য যন্ত্রণা আর ছটফটানির পর ঠিক করলাম, বাঁচতে গেলে আমাকে ভুলতে হবে। যে-করেই হোক এই ভালোবাসার স্মৃতি আমাকে ভুলতে হবে। তখনই আমার ‘মেমোরি ম্যানেজমেন্ট সেন্টার’-এর কথা মনে পড়ল।

সেন্টারের রিসেপশান রুমে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটি সুবেশা তরুণী এসে আমার সামনে দাঁড়াল। মাথার ওপরে ডিজিটাল ডিসপ্লে প্যানেলে আমার নাম জ্বলে উঠেছে, তার পাশেই একটা কোড নম্বরঃ সি-ফোর।

মেয়েটি আমাকে হাসিমুখে ইশারা করল। ওর হাসির সঙ্গে রুবির কিছুটা মিল লক্ষ করলাম। ওরও জন্ম কি অ্যানড্রয়েড সেন্টারে?

শব্দ-হয়-না-এমন মেঝেতে পা ফেলে নানান করিডর ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। গোলকধাঁধার বহু জটিল পথ পেরিয়ে অবশেেষ একটা বিশাল কাচের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। সামান্য হেসে তরুণী আমাকে ভেতরে ঢোকার জন্য ইশারা করল। তারপর ঘুরে রওনা হল করিডর ধরে। আমি কয়েকসেকেন্ড ওর সুন্দর ঢঙে হেঁটে যাওয়া দেখলাম। তারপর কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এলাকায়।

সাদা পোশাক পরা জনাতিনেক মানুষের হাত ঘুরে শেষপর্যন্ত একটা ছোট মাপের ঘরে এসে হাজির হলাম। ঘরে সাদা আলখাল্লা পরা একজন মানুষ পারসোনাল কম্পিউটারের সামনে বসে কীসব কাজ করছিলেন। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেনঃ ‘আসুন, মিস্টার সরকার। আপনার কেসটা আমার হাতে পড়েছে। আমার নাম শ্যামল দত্ত। আশা করি আপনাকে সাহায্য করতে পারব—।’

ডক্টর দত্ত বয়স্ক মানুষ। গালের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। জুলপি নুন-মরিচ। চোখে চশমা। থুতনিতে ফ্রেঞ্চকাট। ওঁকে দেখে ভরসা পাওয়া যায়।

ডক্টর দত্তর নির্দেশমতো একটা এয়ার কুশনে বসলাম। বাতাসের চাপে ভেসে থাকা গদি-চেয়ারে বসলেই কেমন যেন ঘুম পায়। উনি আমার খুব কাছে এগিয়ে এলেন। কতকগুলো যন্ত্রের বোতাম নিয়ে নাড়াচড়া করলেন। তারপর আমার মাথাটা পিছনদিকে হেলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মিস্টার সরকার, এবারে গোটা গল্পটা ধীরে-ধীরে বলুন। আপনি কী ভুলতে চান, কেন ভুলতে চান…সব খুলে বলুন।’

আমি রুবির কথা বলতে শুরু করলাম। আমার চোখ বুজে এসেছিল। মাঝে-মাঝে ডক্টর দত্তের সহানুভূতি মাখা গলা শুনতে পাচ্ছি। যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে কথাগুলো। আমি সম্মোহিতের মতো চার বছরের প্রেমের উপন্যাস স্মৃতি থেকে পড়ে গেলাম। বললাম, আমি রুবিকে ভুলতে চাই। ওর ভালোবাসা ভুলতে চাই।

আমার কথা শেষ হলে ডক্টর দত্ত বললেন, ‘আপনি যেমন হেলান দিয়ে চোখ বুজে রয়েছেন সেরকমই থাকুন। তবে মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনবেন, আর দরকার মতো জবাব দেবেন।’

আমি রুবির কথা ভাবছিলাম। চোখ বুজে থাকা অবস্থাতেই ছোট্ট করে বললাম, ‘হুঁ—।’

‘মেমোরি ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে কয়েকটা দরকারি কথা আপনাকে বলে নিতে চাই, মিস্টার সরকার।’

‘বলুন—।’

ডক্টর দত্ত একটানা একঘেয়ে সুরে বলে চললেন। মনে হচ্ছিল, আমার মাথার চারপাশে একটা ভোমরা গুনগুন শব্দ তুলে উড়ছে…উড়ছে।

‘আমাদের স্মৃতি মানে হচ্ছে কোনও ঘটনায় অংশ নেওয়া—অর্থাৎ, সেই ঘটনার অভিজ্ঞতা হওয়া। তারপর সেই ঘটনাকে দীর্ঘদিন ধরে স্মৃতিকোশে ধরে রাখা, এবং প্রয়োজনমতো তা মনে করতে পারা। পরিভাষায় একেই বলা হয় লার্নিং, রিটেইনিং অ্যান্ড রিমেমবারিং। সব মিলিয়ে মেমোরি। অনেক বছর আগেই জানা গেছে, স্মৃতি ব্রেনের একটি বিশেষ অংশে রাসায়নিক গঠন নিয়ে সঞ্চিত থাকে…রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড…মানে, আর. এন. এ. অণুর মধ্যে। ঘটনার পর যত দিন যায় স্মৃতি ততই ক্ষয়ে যেতে থাকে, ঝাপসা হয়। প্রথমদিকে যত তাড়াতাড়ি ঝাপসা হয় পরের দিকে হয় অনেক ধীরে-ধীরে। এ ছাড়া অন্যান্য বহু নতুন ঘটনার স্মৃতিও এসে জমা হয় স্মৃতিকোশে। আর অনেকদিন ধরে ব্যবহার না করলে স্মৃতিকোশের ক্ষমতাও কমে আসে। ফলে আমরা যে-কোনও ঘটনা ভুলে যাই তা হল নতুন-নতুন ঘটনার স্মৃতির চাপে, অথবা, সেই বিশেষ ঘটনা যেসব স্মৃতিকোশে জমা আছে সেগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে।’

একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন ডক্টর দত্ত, ‘সুতরাং মিস্টার সরকার, রুবিকে ভুলতে গেলে স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে নতুন-নতুন নানারকমের কাজে মেতে ওঠা। আর রুবির কথা একবারও না ভাবা—অর্থাৎ, রুবির ভালোবাসা সংক্রান্ত স্মৃতিকোশগুলোকে একটুও ব্যবহার না করা। আপনি কি সেটা পারবেন?’

আমি রুবির সঙ্গে প্রথম আলাপচারিতার কথা ভাবছিলাম। ডক্টর দত্তের প্রশ্নটা তৃতীয়বারে আমার কানে ঢুকল। বললাম, ‘অসম্ভব—।’

শ্যামল দত্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমারও সে-কথাই মনে হয়েছে। তা হলে এখন আর. এন. এ. মলিকিউল এক্সাইটেশান ম্যাপিং ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’

আমি চোখ খুলে জিগ্যেস করলাম, ‘তার মানে?’

ডক্টর দত্ত কাশলেন। বললেন, ‘স্মৃতির ধরনের ওপরে নির্ভর করে বিভিন্ন আর. এন. এ. অণুতে বিভিন্ন অ্যামপ্লিচিউডের সিগনাল পাওয়া যায়। একে বলে মেমোরি ভ্যালু। আপনার ব্রেন-এ কয়েকটা ইলেকট্রোড লাগিয়ে দেব আমি। তারপর সেগুলোর আউটপুট জুড়ে দেব মেমোরি ম্যাপিং যন্ত্রের সঙ্গে—’ আঙুল তুলে একটা জটিল যন্ত্রের দিকে দেখালেন ডক্টর দত্ত, বললেন, ‘তা হলে ওই ভিডিয়ো পরদায় উঁচু-নীচু চাদরের মতো একটা ছবি দেখা যাবে। সেটাই মেমোরি ম্যাপ। সুখের স্মৃতি হলে চাদরটা সেই জায়গায় উঁচু হয়ে থাকবে। আর দুঃখের স্মৃতি হলে চারদটা টোল খেয়ে যাবে নীচের দিকে। সুখ বা দুঃখের তীব্রতা অনুযায়ী উঁচু-নীচু জায়গাগুলোর উচ্চতা বা গভীরতা কম-বেশি হয়, আবার চেহারাতেও ওগুলো চোখা কিংবা ভোঁতা হয়। আপনার মেমোরি ম্যাপ এঁকে নেওয়ার পর বাইরে থেকে ব্রেনের আর. এন. এ. মলিকিউলে এক্সাইটেশান সিগনাল পাঠিয়ে ম্যাপের উঁচু জায়গাগুলো আমি সমান করে দেব। তা হলেই আপনার সুখের স্মৃতি মোটামুটি মুছে যাবে। সেইসঙ্গে রুবিও।’ একটু থেমে ডক্টর দত্ত প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার আপত্তি নেই তো?’

আমি দু-হাতে মাথা টিপে ধরলাম, বললাম, ‘একটুও না, ডক্টর। রুবিকে আমি ভুলতে চাই।’

ডক্টর দত্ত কাজ শুরু করলেন। আমাকে চোখ বুজতে বললেন। আমি চোখ বুজলাম। একটু পরেই কেমন যেন ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম। টের পাচ্ছিলাম, আমার মাথায় ছুঁচের মতো কীসব ফোটানো হচ্ছে। তবে কোনও ব্যথা নেই। আমার চোখের সামনে আমার আর রুবির হলোগ্রামটা ভাসছিল।

‘মেমোরি ম্যানেজমেন্ট সেন্টার’ থেকেই গাড়ি করে আমাকে পৌঁছে দিল বাড়িতে। তারপর ওরাই বোধহয় আমাকে বিছানায় শুইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘুম যখন ভাঙল তখন এক অপরূপ দৃশ্য আমার মন ভরিয়ে দিল। কৃষ্ণচূড়ার পাতার ফাঁকে ভোরবেলায় সূর্য। নীচের পুকুরের জলে ওদের ছায়া। ভাসা-ভাসা মনে পড়ছিল, এরকম দৃশ্য আমি আগে কোথায় যেন দেখেছি, কোথায় যেন দেখেছি…।

হঠাৎ চোখ ফেরাতেই দেখি একটা রঙিন হলোগ্রাম। আমার সঙ্গে এক যুবতী। কপালে সবুজ টিপ। কোথায় যেন দেখেছি ওকে? কোথায় যেন…?

আমার বুকের মধ্যে ঢেউ উঠছিল। মাথার ভেতরে উড়ে বেড়াচ্ছিল দুর্জ্ঞেয় কুয়াশা। কত কী মনে পড়তে চাইছে, অথচ মনে পড়ছে না। কাকে যেন আমি পাগলের মতো ভালোবেসেছিলাম…কিন্তু কিছুতেই তার নাম অথবা মুখ মনে পড়ছে না।

গঙ্গার বুকে ভেসে পড়েছিলাম এক তীব্র সুখের দিনে। কিন্তু কে যেন ছিল আমার পাশে…?

একটা গোলকধাঁধার ভেতরে চোখ বাঁধা অবস্থায় হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম আমি। মনে পড়ছিল নানান কথা। স্কুলের খেলার মাঠে কী যেন একটা দারুণ ব্যাপার হয়েছিল। কিন্তু আর কিছু মনে করতে পারছি না। আমার মা কত ভালোবাসত আমায়—এই সত্যিটা বেশ মনে আছে। কিন্তু মায়ের মুখ? মায়ের নাম? আমি সাগরের নোনা জলে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। এরকম একটা, দুটো, তিনটে…অসংখ্য সুখের স্মৃতির টুঁটি টিপে ধরেছে কেউ। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

এ-কথা সত্যি যে, জীবনের যাবতীয় ভালোবাসার স্মৃতি আমি ভুলতে চেয়েছিলাম। তা নইলে কষ্টে যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যেতাম আমি। কিন্তু এখন? স্পষ্ট মনে পড়ছে, আমি কাউকে ভালোবেসেছি, কিন্তু কাকে তা জানি না। মনে পড়ছে, আমার সাধারণ জীবনে কত অসাধারণ সুখের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু একটা ঘটনাও মনে পড়ছে না আমার। হা ভগবান! আমার মায়ের নাম, মায়ের মুখ, স্কুলের হাসিখুশির দিনগুলো…সব মুছে গেছে স্মৃতির মানচিত্র থেকে। সুখের স্মৃতির ছিটেফোঁটাও আর নেই!

এ যন্ত্রণা যে আরও অসহ্য, আরও কষ্টের।

সামনেই টেবিলের ওপরে পড়ে রয়েছে একটা সিলিকন মাইক্রোচিপ। চিপটা হাতে তুলে নিলাম। প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরলাম মুঠোয়। ওটার সরু-সরু ধাতব পিনগুলো গেঁথে গেল হাতের তালুতে।

মাথার ভেতরে আমার তখন আর. এন. এ. অণুগুলো পাগলের মতো দাপাদাপি করছে। ফিরে পেতে চাইছে ওদের হারানো সুখের স্মৃতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *