জীবনের চাবিকাঠি
অফিসের কোলিগ বিনীতের কাছেই দোকানটার ঠিকানা পেয়েছিলাম।
নাম ‘রোবোটিক্স কর্পোরেশন’—হরেকরকমের রোবট পাওয়া যায় দোকানটাতে। শহরতলির কোন অঞ্চলে যেন ওদের নিজস্ব কারখানা আছে। সেখানে দক্ষ সব কারিগররা নিখুঁত কলকবজা আরও নিখুঁতভাবে জুড়ে-জুড়ে তৈরি করে অপূর্ব সব রোবট। সোজা কথায় ‘জীবন্ত’ খেলনা।
আমার কঠিন সমস্যার কথা শুনে বিনীত বলেছিল, দাদা, আপনি রোবোটিক্স কর্পোরেশনে যান, আপনার সব প্রবলেম ওরা সল্ভ করে দেবে।
বিনীতকে আমার সব কথা খুলে বলিনি। শুধু এটুকু বলেছিলাম, ভাই, সংসারের টানাপোড়েন আর সইতে পারছি না। এই জোয়াল যদি অন্য কারও গর্দানে জুতে দিতে পারতাম—!
খানিকটা হতাশা খানিকটা ঠাট্টা মিশিয়েই বলেছিলাম। কিন্তু ও ব্যাপারটা খুব সিরিয়াসলি নিয়ে রোবোটিক্স কর্পোরেশনের নাম-ঠিকানা আমাকে দিয়ে দিল।
আমার পাশের টেবিলে বিনীত কাজ করে। আমার ক্লান্ত ভঙ্গি, হতাশ ভাব, রোজই ওর নজরে পড়ে। দ্যাখে, আমি যন্ত্রের মতো পা চালিয়ে অফিসে আসি, কাজ করি, ছুটি হলে আবার বাড়ির দিকে রওনা হই। আমার ভেতরের মানুষটা ধীরে-ধীরে যেন লোহালক্কর হয়ে যাচ্ছে।
এইসব লক্ষ করেই সেদিন ও চেপে ধরেছিল আমাকেঃ দাদা, বলুন তো আপনার কী হয়েছে?
আর তারপরই রোবোটিক্স কর্পোরেশনের নাম-ঠিকানা।
রোবোটিক্স কর্পোরেশনের ঠিকানাটা খুব সাদামাটা হলেও রাস্তাটা ঘোরপ্যাঁচের। অফিস কামাই করে নাম-ঠিকানা লেখা চিরকুট হাতে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা এ-রাস্তায় সে-রাস্তায় চক্কর মেরে চললাম। কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দোকানটা। যাকেই জিগ্যেস করি সে-ই ধন্দে পড়ে যায়। মাথা চুলকোয়। ঠোঁট ওলটায়। কিংবা ইতস্তত করে বলে, অমুক রাস্তার শেষে দেখুন তো। তা না হলে তমুক গলির কাছাকাছি হবে।
এইভাবে হন্যে হয়ে ঘুরপাক খেয়ে চলেছি, হঠাৎই একটি লোককে দেখে মনে ধরল। বিনীতের মতোই খুশিতে টগবগ করছে সে। চোখে-মুখে জীবন উপভোগের ফুর্তির ছটা। তাকে ঠিকানাটা দেখাতেই সে বলে উঠল, ও, রোবোটিক্স কর্পোরেশন? এই তো, ওই রাস্তা দিয়ে খানিকটা এগিয়ে ডানদিকের গলিটা ধরুন। তারপর…।
এত সহজে ঠিকানাটা সে বলে দিল যেন দোকানটা তার কতদিনের চেনা। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে চিনিয়ে দেওয়া পথে রওনা হলাম। লোকটা কোমরের কাছে হাত দিয়ে কী একটা ঠিক করতে-করতে চলে গেল। একইসঙ্গে ঠোঁটে শিস বাজিয়ে গানের সুর তুলছিল সে।
রোবোটিক্স কর্পোরেশনের দরজায় হাজির হয়ে অবাক হলাম।
এ কী জরাজীর্ণ করুণ অবস্থা। দোকানের ফুটপাঁচেক চওড়া দরজা দুটো পুরোনো বাড়ির মাঝে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে আছে। দরজার মাথায় রংচটা তোবড়ানো কাত-হয়ে-থাকা সাইনবোর্ড। দোকানের নামের অর্ধেক অক্ষর মুছে গেছে। ভেতরে ঢোকার সিঁড়ির ধাপগুলোও ভাঙাচোরা। সব মিলিয়ে দোকানটা এখনও চালু, না পরিত্যক্ত, সেটা বোঝাই মুশকিল। কিন্তু এতদূর এসে তো ফিরে যাওয়া যায় না! অতএব হতাশ ভাবটা ঝেড়ে ফেলে দোকানে ঢুকলাম।
সদর পেরোতেই আধো-আঁধারি একটা গলিপথ। দু’পাশে নোনাধরা স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল। নীচের ঠান্ডা মেঝে যেন জুতোর সোল ভেদ করে পায়ের চেটোয় বরফের ছুঁচ বিধিয়ে দিচ্ছে।
কিছুটা এগিয়ে গলিপথটা বাঁ-দিকে বাঁক নিয়েছে। সেখানে আর-একটা দরজা। সেই খোলা দরজা পেরিয়েই রোবোটিক্স কর্পোরেশনের দোকান-ঘর।
কিন্তু ঘরে ঢুকেই আর-এক প্রস্ত অবাক হলাম।
কম করেও চল্লিশ ফুট বাই পঞ্চাশ ফুট একটা বিশাল ঘর। তার সিলিং অন্তত বিশ ফুট উঁচুতে। অপরূপ রঙিন নরম আলোয় দোকান-ঘরে একটা মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ঘরের একপাশের দেওয়ালে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে থরে-থরে পুতুল। মানুষের মাপে তৈরি। নিখুঁত। তাদের চেহারা এত জীবন্ত যে, মনে হয় এক্ষুনি হাত-পা নেড়ে শোকেসের বাইরে বেরিয়ে আসবে। হেসে জিগ্যেস করবে, কী খবর? ভালো আছেন?
তারপরই চোখ চলে গেল দোকানের দেওয়ালে, সিলিংয়ে। অপূর্ব সূক্ষ্ম সব প্রাচীন কারুকাজ। যেন দক্ষ শিল্পীর হাতে গড়া ঐতিহ্যমণ্ডিত কোনও মন্দিরের অভ্যন্তর। বারবার মুগ্ধ চোখে দেখেও আশ মেটে না।
মসৃণ মার্বেল পাথরের মেঝেতে পা ফেলে এগিয়ে গেলাম কাউন্টার লক্ষ্য করে। কাউন্টার বলতে একটা বেদি। কারুকাজ করা ভেলভেট কাপড়ে মোড়া। তার ঠিক পেছনে আর-একটা খাটো বেদিতে পদ্মাসনে বসে একজন মানুষ। ফরসা রং। মুণ্ডিত মস্তক। পরনে গেরুয়া বসন। কাউন্টারের একপাশে ধাতব ধূপদানিতে পাঁচটি মোটা-মোটা ধূপকাঠি জ্বলছে। তাদের সুবাসে দোকানের পবিত্র পরিবেশে যেন আরও পবিত্র কোনও ছোঁওয়া লেগেছে।
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এ কি রোবোটিক্স কর্পোরেশন, না কোনও তৃতীয় আশ্রম! বিনীত আমাকে ভুল ঠিকানা দেয়নি তো! কিন্তু কী করেই বা হবে? এত নিশ্চিত ভঙ্গিতে ঠিকানাটা ও আমাকে লিখে দিল…।
আরও কিছু ভেবে ওঠার আগেই কাউন্টারে বসা সন্ন্যাসী অথবা দোকানদার স্পষ্ট উচ্চারণে আমাকে বললেন, চিন্তা করবেন না। ঠিক দোকানেই আপনি এসেছেন। বলুন, কী ধরনের রোবট আপনার চাই?
বিশাল দোকান-ঘরের কারুকাজ করা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তাঁর কণ্ঠস্বর গমগম করতে লাগল।
আমি বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে মনে সাহস জোগালাম। তারপর বললাম, ঠিক আমার মতো একটা রোবট আমাকে দিতে পারেন?
সংসারধর্মে ক্লান্ত বুঝি?—স্মিত হেসে সন্ন্যাসী প্রশ্ন করলেন।
আমি থতমত খেয়ে গেলাম। কী করে উনি টের পেলেন মনের কথা? কোনওরকমে বললাম, হ্যাঁ, প্রভু, ভীষণ ক্লান্ত। এ-বোঝা আর বইতে পারছি না।
কী করে জানি না মুখ দিয়ে ‘প্রভু’ শব্দটা বেরিয়ে গেল। দোকান-ঘরের ওই অদ্ভুত পরিবেশ হয়তো আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
সন্ন্যাসী আবার হাসলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমার চোখে চোখ রাখলেন। কী তেজোদীপ্ত দৃষ্টি! আমি ক্রমশ সম্মোহিত হয়ে পড়ছিলাম। মানুষটা যেন আমার ভেতরটা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়ে নিচ্ছিল।
একটু পরে তিনি বললেন, আপনার সম্পর্কে যেটুকু জানার জেনে নিলাম। আপনার মতো রোবট তৈরি করতে এখন আর কোনও অসুবিধে নেই। দয়া করে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন।
কথা শেষ করে সন্ন্যাসী ভদ্রলোক বেদির আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন। পেছনে লাল রঙের ভেলভেটের একটা ভারী পরদা ঝুলছিল। সেটা সরিয়ে আমার চোখের আড়ালে চলে গেলেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি রীতিমতো হকচকিয়ে যাচ্ছিলাম। সন্ন্যাসী অদৃশ্য হতেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবতে চেষ্টা করলাম, এরপর কী ঘটতে পারে। কই, বিনীত তো আমাকে বলেনি যে, এঁরা সঙ্গে-সঙ্গেই রোবট দিয়ে দেয়! তা ছাড়া দাম কত তা ও জানি না। শেষকালে অপ্রস্তুতে পড়ব না তো?
একটু পরেই পেছনের পরদা সরিয়ে সন্ন্যাসী বেরিয়ে এলেন। হাতে হুবহু আমার মতো দেখতে প্রমাণ সাইজের একটি রোবট। আমার দিকে এগিয়ে আসতে-আসতে বললেন, মিছিমিছি দাম নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আমরা রোবটের জন্যে কোনও দাম নিই না।
দাম নেন না?—বিস্ময়ের ধাক্কায় প্রশ্নটা জিভে জড়িয়ে যেতে চাইল।
সন্ন্যাসী ঠোঁটে হাসলেনঃ না। কারণ মানুষের উপকার করাই আমাদের ব্রত।
রোবটটা এনে কাউন্টারের ওপরে শুইয়ে দিলেন তিনি। তারপর পুতুলটার কোমরের কাছে হাত নিয়ে কী যেন করতে লাগলেন। অনেকটা চাবি ঘোরানোর মতো কর্কর্ শব্দ হচ্ছিল।
কাজ শেষ হলে সন্ন্যাসী বললেন, ব্যস, দম দেওয়া হয়ে গেছে। নিন, আপনার রোবট তৈরি।
কিন্তু…কিন্তু দম ফুরিয়ে গেলে?
সন্ন্যাসী হাসলেন। বললেন, চিন্তার কোনও কারণ নেই। আমরা যে-দম দিয়ে দিই তাতে একটা পুতুলের গোটা জীবন চলে যায়। দম ফুরিয়ে গেলেই তার জীবনের খেলা শেষ। তবে মাঝে-মাঝে দম দেওয়ার চাবিটা গোলমাল করে, আটকে যায়। সেটা মাঝে-মাঝে দেখতে হয়, পরিষ্কার রাখতে হয়। সে-কাজ রোবট নিজে-নিজেই করে নেয়। তার পরেও কোনও অসুবিধে হলে আমরা তো রয়েছি—।
রোবটটা আমার সামনে মেঝেতে দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। আরে, কী আশ্চর্য! ওটা যে শুধু হুবহু আমার মতোই দেখতে তা নয়, ওর পরনের পোশাকও হুবহু আমার পোশাকের মতো! যাক, ভালোই হল। এই মুহূর্ত থেকেই আমার রোজকার জীবনের জোয়ালে রোবটটাকে জুতে দেওয়া যাবে।
বিচিত্র দোকানিকে ধন্যবাদ জানিয়ে রোবটটার হাত ধরে দোকান-ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। চৌকাঠ ডিঙোনোর সময়ে একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলাম, তিনি চোখ বুজে ধ্যানের ভঙ্গিতে পদ্মাসনে বসে। তাঁর মাথার চারপাশে রঙিন আলোময় এক অদ্ভুত দ্যুতি। আর একইসঙ্গে অতি মৃদুলয়ে ভেসে আসছে স্তোত্র পাঠের শব্দ। প্রতিধ্বনিময় মন্দ্র স্বরে কেউ স্তোত্র পাঠ করছে। আশ্চর্য! এই রোবোটিক্স কর্পোরেশনের প্রকৃত স্বরূপ কী!
আমি হয়তো আরও কিছু ভাবছিলাম, আমার পুতুল-প্রতিবিম্ব আমার কনুই ছুঁল। বলল, চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আমি চমকে পাশ ফিরে তাকালাম। পুতুল হাসছে। ভীষণ খুশি তার মেজাজ। কই, আমি তো এমন করে হাসতে পারি না! তবে আজ থেকে বোধহয় পারব।
আমরা দুজনে রোবোটিক্স কর্পোরেশন ছেড়ে বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে এলাম।
এখন আমি বেশ আনন্দে আছি। মনে কোনও দুঃখ নেই, কোনও কষ্ট নেই, কোনও ক্লান্তি নেই, কোনও হতাশা নেই। আমি আপনমনে পথে-পথে ঘুরে বেড়াই। কখনও নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখি।
আমার পুতুল দিব্যি কাজ করে চলেছে।
আমার বউ ওকে স্বামী বলে মেনে নিয়েছে। আমার ছেলেমেয়েরা ওকে বাবা বলে মেনে নিয়েছে। আমার অফিসের সবাই ওকে মেনে নিয়েছে সহকর্মী বলে। আমার বাড়িওয়ালাও পুতুলটাকে তার ভাড়াটে হিসেবে মেনে নিয়েছে। সোজা কথায়, মানুষ বদলের ব্যাপারটা কেউই টের পায়নি।
এদিকে পুতুলটার সঙ্গে আমার এক আশ্চর্য যোগাযোগ রয়ে গেছে। ওর কাছাকাছি আমি থাকি না। সম্ভবও নয়। কিন্তু ওর প্রতিটি কার্যকলাপ আমি মনের পরদায় স্পষ্ট দেখতে পাই। শুনতে পাই প্রতিটি কথা। সময়ে-সময়ে মনে হয় আমি যেন অশরীরী হয়ে ওর পাশে-পাশে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। কী করে এই ক্ষমতা আমার মধ্যে জন্ম নিল জানি না। একেই কি অতি-দৃষ্টি আর অতি-শ্রবণ বলে? নাকি এ-এক মন্ত্রশক্তি?
সেই মন্ত্রশক্তির জোরেই আমি দেখি অফিসে বিনীত ওকে জিগ্যেস করছেঃ কী দাদা, রোবোটিক্স কর্পোরেশনে গিয়েছিলেন?
তখন পুতুলটা জবাব দিয়েছে, হ্যাঁ, ভাই, গিয়েছিলাম। আর দারুণ উপকার পেয়েছি। তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।
বিনীত মুচকি হেসে বলেছে, হুম, সেইজন্যেই আপনাকে এত হাসিখুশি দেখাচ্ছে।
জীবনটা এভাবেই বেশ চলছিল। কিন্তু হঠাৎই একদিন গোলমাল বাধল।
ভোরবেলা পার্কে পায়চারি করছি, এমন সময় রোবটটা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। থমকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখে জল। মুখে বলিরেখা। আমাকে দেখে কাতর স্বরে বলল, আমি আর পারছি না।
আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। রোবট বলে কী! রোবট যে যন্ত্র! তাকে তো পারতেই হবে!
সে-কথাই ওকে বললাম। উত্তরে ও বলল, বিশ্বাস করো, এরকম যান্ত্রিক জীবন আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে।
যন্ত্রের আবার যান্ত্রিক জীবন! আমি যে কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। এখন উপায় কী? রোবটটাকে বললাম, আমাকে তুমি এর মধ্যে আর টানাটানি কোরো না। যেমন করে পারো চালিয়ে নাও।
রোবট অনেকক্ষণ গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পায়ের নখ দিয়ে পার্কের মাটি খুঁটল। তারপর মুখ কালো করে চোখ মুছতে-মুছতে চলে গেল।
লুকিয়ে লাভ নেই, ওর কষ্টের কথা শুনে আমার আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়ল। কিন্তু আমার তো আর কিছু করার নেই! অতএব আবার পায়চারি শুরু করলাম।
ক্রমে দিন কেটে যায়, মাস কেটে যায়, বছর কেটে যায়। রোবট মাঝে-মাঝেই লুকিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়। শুনিয়ে যায় ওর অসহনীয় জ্বালা-যন্ত্রণার কাহিনি। এক-একদিন তীব্র ক্ষোভে বলে ওঠে, আমি সুইসাইড করব।
কিন্তু আমি জানি, আত্মহত্যা অত সহজ নয়। সহজই যদি হবে তা হলে আমি আত্মহত্যা করতে পারি না কেন? সেই সময়ে হঠাৎ করে বউ-ছেলেমেয়েদের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে যে! সরল সাদামাটা বউ আর নিষ্পাপ বালক-বালিকার মুখ। ওঃ ভগবান!
রোবট আসে-যায়। কখনও দেখা করে নদীর ধারে, কখনও পার্কে, কখনও বা গ্রামের মেঠো পথে। ও ঠিক জানে কখন কোথায় গেলে আমার দেখা পাওয়া যাবে। কিন্তু দেখা করে ওর উপকার কিছু হয় না। তবে জানি না, ওর দুঃখ-কষ্টের কাহিনি আমাকে শুনিয়ে ওর মন কিছুটা হালকা হয় কি না।
একটা জিনিস আমি বেশ অবাক হয়ে লক্ষ করছি। রোবটের চোখে-মুখে ক্রমেই ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ পড়ছে। বউ-ছেলেমেয়েকে লুকিয়ে ও যখন-তখন কান্নাকাটি করে। রোবোটিক্স কর্পোরেশনে যাওয়ার আগে আমার যেরকম দশা হয়েছিল ঠিক সেইরকম। আশ্চর্য! যন্ত্রের কি অনুভূতি আছে? হয়তো আছে। নইলে একদিন ওর হাত কেটে গিয়ে রক্ত পড়েছিল কেমন করে? কেনই বা ওর চোখে-মুখে তখন ফুটে উঠেছিল যন্ত্রণার অভিব্যক্তি? মনে পড়ছে, বিনীত বলেছিল, রোবোটিক্স কর্পোরেশন একেবারে জীবন্ত রোবট তৈরি করে। হয়তো এও তাই।
একদিন শুনি আমার পুতুল অফিসে বিনীতকে বলছে, ভাই, সংসারের টানপোড়েন আর সইতে পারছি না। এই জোয়াল যদি অন্য কারও গর্দানে জুতে দিতে পারতাম!
শুনে আমি চমকে উঠলাম। বছরকয়েক আগে ঠিক এই কথা তো বিনীতকে আমি বলেছিলাম! বিনীত তখন রোবোটিক্স কর্পোরেশনের নাম-ঠিকানা পুতুলটাকে দিল। বলল, দাদা, আপনি রোবোটিক্স কর্পোরেশনে যান, আপনার সব প্রবলেম ওরা সল্ভ করে দেবে।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, এরপর কী-কী ঘটবে। এবং তাই ঘটল।
কয়েক বছরের পুরোনো দৃশ্যগুলো আমার চোখের সামনে আবার নতুন করে অভিনীত হতে লাগল। শুধু অবাক লাগল একটা কথা ভেবে। রোবোটিক্স কর্পোরেশনের নাম-ঠিকানা তো রোবটের অজানা ছিল না! তা হলে সেটা আবার বিনীতের থেকে নেওয়া কেন? অবশ্য এও হতে পারে, সংসারের ক্লান্তিকর জোয়াল টেনে-টেনে বেচারা নিজের জন্মদাতার নাম-ঠিকানাই ভুলে গেছে।
এর কিছুদিন পরে বিকেলে নদীর ধারে রোবটের সঙ্গে দেখা। ও আজ ভীষণ খোশমেজাজে রয়েছে। আমাকে দেখেই ও বলল, আজ থেকে আমি মুক্ত।
আমি সপ্রশ্নে তাকাতেই ও হাঁপ ছেড়ে বলে উঠলঃ রোবোটিক্স কর্পোরেশন থেকে একটা রোবট নিয়ে আমার জায়গায় ফিট করে দিয়ে এসেছি। কী মজা!
আমি অবাক হয়ে সংসারমুক্ত রোবটাটাকে দেখতে লাগলাম। ও তখন কোমরে হাত দিয়ে কী একটা জিনিস খুটখাট করতে লাগল।
আমি জিগ্যেস করলাম, কী করছ?
চাবিটা দেখছি। ওটা তো আর কোনও কাজে লাগবে না।
তারপরই আমাকে চমকে দিয়ে ও জিগ্যেস করলঃ তোমার চাবিটার কী অবস্থা?
আমি বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেলাম। যান্ত্রিকভাবে আমার ডানহাত চলে গেল কোমরের কাছে। চাবিটা হাতে ঠেকল।
চাবি! সত্যিই এটা চাবি? আমিও তা হলে একটা যন্ত্র। রোবোটিক্স কর্পোরেশনের তৈরি।
এতগুলো বছর আমি কার হয়ে প্রক্সি দিচ্ছিলাম? কার সংসারের জোয়াল ঘাড়ে করে ঘানির বলদের মতো পাক খাচ্ছিলাম?
আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। রোবট সেটা দেখে অবাক হল।
পশ্চিমের আকাশ লাল টকটকে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আমার মুখে, আমার পুতুলের মুখে লাল আলোর আভা। সেই আভা বহমান নদীর জলেও।
রোবট বলল, তুমি কাঁদছ কেন?
আমি জবাব দিলাম, কাঁদছি সেই আসল মানুষটার জন্যে। সে তা হলে কী কষ্টেই না ছিল বলো তো। কিন্তু সে গেল কোথায়?
আমার চেতনায় সব একে-একে ভেসে উঠছিল। মুণ্ডিত মস্তক সন্ন্যাসী, সুগন্ধী ধূপের সুবাস, অপরূপ রঙিন আলোর ছটা, মন্দ্র স্বরে স্তোত্র পাঠ—সব। আমি—আমরা তা হলে নিছকই অকিঞ্চিৎকর নকল মানুষ। নিজেদের ঘৃণা করা ছাড়া আর আমাদের আর কোনও উপায় নেই। হা ঈশ্বর!
সেদিন নদীর ধারে অস্তায়মান সূর্যের আলোয় দাঁড়িয়ে আমরা দুজনে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছিলাম।
