সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
1 of 2

মাদারি যখন খেলা দেখায় – অনীশ দেব

মাদারি যখন খেলা দেখায়

রোগা শরীরটাকে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে দয়াল মানিক ঢুকে পড়েছিল চিচিঙ্গে মাচার নীচে। বাখারির খুঁটির ডগায় তার বেঁধে তৈরি মাচা। বাইরে ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুর, কিন্তু মাচার নীচে পঞ্চমুখী পাতার ছায়ায়-ছায়ায় শরীর ঠান্ডা।

দয়াল কুঁজো হয়ে মাথা নীচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল প্রায় বুকসমান উঁচু মাচার তলায়। সুতলি দিয়ে থান ইটের টুকরো বেঁধে দিচ্ছিল চিচিঙ্গের ডগায়। ইটের টানে চিচিঙ্গেগুলো সোজা হয়ে ঝুলে পড়বে নীচের দিকে। লাঠির বাড়ি খাওয়া সাপের মতো তা হলে আর জট পাকিয়ে যাবে না। পঞ্চমুখী পাতার সঙ্গে লটকে যাবে না ফলের দেহগুলো।

আহা! ফলগুলোর চেহারা কী! যেন মোটাসোটা লাউডগা সাপ এক-একটা। শুধু গায়ে যা সাদা ডোরাকাটা দাগ। সেইসব সাপদের পাশ কাটিয়ে অদ্ভুতভাবে মাচার তলায় চলেফিরে বেড়াচ্ছিল দয়াল মানিক। ওর কালো কুষ্ঠি শরীরে শুধু হেঁটো ধুতি। আর শরীরটা ঝুঁকে পড়ায় এই আলোছায়াতেও স্পষ্ট দেখা যায় শিরদাঁড়ার গুটলির সার।

দয়াল যতই চলে-ফিরে বেড়ায় ততই খিদে পাক মারে ওর পেটে। জট পাকিয়ে যাওয়া চিচিঙ্গের মতোই পাকাতে থাকে, মোচড়াতে থাকে। সেই কোন সকালে পান্তাভাত কাঁচালঙ্কা ডলে নুন দিয়ে পাকিয়ে মুখে পুরেছে। আর সঙ্গে কাঁচকলা সেদ্ধ। নাঃ, মুখে রোচে না, তবু শিবু ডাক্তার বলেছে, কাঁচকলায় ভিটামিন, পান্তা ভাতে ভিটামিন, এমনকী শালা কাঁচালঙ্কা আর নিমকেও ভিটামিন। তুমি যা-ই খাও না কেন শালা তাতেই নাকি শুধু ভিটামিন আর ভিটামিন! এই যে দয়াল এখন চিচিঙ্গে চষে বেড়াচ্ছে তাতেও তো ভিটামিন!

কাছাকাছি সনাতন নায়কদের বাড়িতে রঙিন টিভি আছে। তাতে নাকি সরকার এসব ভিটামিনের বিজ্ঞাপন দেখায়। আলু-পেঁয়াজের খোসাতেও ভিটামিন, আবার ভাতের ফ্যান, হাতেগড়া রুটিতেও ভিটামিন।

হাঁপাতে-হাঁপাতে মাচার তলা থেকে বেরিয়ে আসে দয়াল। অতি কষ্টে শিরদাঁড়াটা সোজা করে ধীরে-ধীরে সিধে হয়ে দাঁড়ায়। শিরদাঁড়ার গুটলির সার সোজা হয়। মটমট শব্দ হয় তাতে। দয়াল ক্ষণিকের তরে ঝাপসা দ্যাখে চোখে। তারপর সরু-সরু শিরা বের করা কালো হাত দুটোর দিকে তাকায়। গরু খোঁজার মতো হন্যে হয়ে ভিটামিন খোঁজে। ওর নাভির চারপাশে খিদে পাক দেয়, হা-ডু-ডু খেলে বেপরোয়া।

সূর্য মাথার ওপরে গনগনে আগুন। কিন্তু তবুও চারপাশে দৃষ্টি দিলে সবুজের মেলা দেখে মনটা জুড়োয়।

চোখের সামনেই চিচিঙ্গের পঞ্চমুখী পাতার ঝাঁক। তার মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট সাদা ফুল। ফলন আরও বাড়বে, আরও বাড়বে।

নিজের খেত থেকে চোখ সরতেই কালু মণ্ডলের ধানখেতের দিকে নজর পড়ে দয়ালের। হাঁটু সমান ধানগাছের মেলায় খেত একেবারে সবুজ মাঠ। মাঠে বাতাস খেলা করে, রোদ্দুর খেলা করে। ধানখেতের পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে সরু নদী ঘিয়া। ঘোলা জলে টান তেমন নেই। বড়সড়ো একটা নালা যেন। তবে চাষের জল পাওয়া যায়। কখনও ঘিয়ার জল, কখনও আকাশের জল।

নদীর পাড় ঘেঁষে কাশের ঝোপ। কয়েকটা সাদা ফুল ফুটেছে। দুলছে বাতাসে। তার পিছনে আবার ধানখেত। সবুজের পর সবুজ। চলে গেছে বহুদূর।

ঠিক তখনই বস্তুটি নজরে পড়ল দয়ালের। এমনধারা বিচিত্র বস্তু কখনও দেখেনি ও। না, এমন নয় যে চোখের ধন্দ। তা ছাড়া এখন গনগনে গরমের মরশুমও নয় যে, গরম ভাপ উঠবে জমি থেকে, নজর হিজিবিজি খেলবে।

দয়াল হাতের চেটো দিয়ে চোখের ওপরে টুপি তৈরি করে। তীক্ষ্ণ নজর চালিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করে। হ্যাঁ, ঠিকই তো। কোনও ভ্রম নেই।

সবুজ আর সবুজের মাঝে হঠাৎই যেন মাথা ফুঁড়ে উঠেছে একটা রংবেরঙের ঘর। ঠিক একটা বাক্সের মতো বাক্সটার গায়ে রামধনুর মতো বর্ণের খেলা। দয়ালের মনে হল, সেই রঙের নকশা যেন বহুরূপীর মতো খেয়ালখুশি পালটাচ্ছে।

রঙিন বাক্সটার মাথায় বড়সড়ো একটা বাটি বসানো। বাটিটা এদিক-ওদিক ঘুরপাক খাচ্ছে। স্যাটেলাইট আপিসে এরকম বাটি দেখেছে দয়াল।

দয়াল আশেপাশে তাকাল। কেউ কোথাও নেই। সামনের কাঁচা সড়ক ধরে একটা ছোঁড়া সাইকেল প্যাডেল করে চলে গেল। বাক্সটার পানে ঘুরেও তাকাল না।

দয়াল মানিক রাস্তায় উঠে এল। চোখ ছোট করে দেখতে লাগল আজব রঙিন বাক্সটাকে।

ঠিক তখনই একটা প্রাণীকে দেখতে পেল। বাক্সটাকে ঘিরে লাফাচ্ছে, ঘুরে-ঘুরে নেচে বেড়াচ্ছে। ঠিক যেন একটা গঙ্গাফড়িং।

ধানখেতের ওপর দিয়ে দুটো ধবধবে সাদা বক উড়ে গেল। উড়ে যেতে-যেতে বাঁক নিল। তারপর এই আজব বাক্সটার পাশ দিয়ে চলে গেল দিগন্তরেখার দিকে।

হঠাৎই জোরে বাতাস বইতে লাগল। উড়তে লাগল দয়াল মানিকের কাঁচাপাকা চুল। আর তখনই ও ঠাহর করতে পারল অজানা প্রাণীটা হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে।

প্রথমটা দয়াল ঠিক বুঝতে পারেনি। কাকে ডাকছে? ও তাকাল চারপাশে। না, দয়াল ছাড়া আর তো কোনও জনপ্রাণী নেই!

দয়ালের পেটের ভেতরটা এমনিতেই ফাঁকা, সেটা আরও ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকতে লাগল। এবং অচেনা প্রাণীটার হাতছানির টানে ও ধীরে-ধীরে এগোতে লাগল আজব বাক্সটার দিকে।

সড়ক থেকে নামল ধানখেতে। খানিকটা আল ধরে, খানিকটা কাশঝোপের পাশ দিয়ে, নদীর পাড়ের লালচে নরম মাটি মাড়িয়ে এগিয়ে চলল। পায়ের তলায় কাঠি কাঁটা ফুটল কয়েকবার, কিন্তু দয়ালের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। ও এগোতেই থাকল।

ঘিয়ার পাড় ঘেঁষে যখন বাক্সটার পাশাপাশি পৌঁছল তখনও সেই প্রাণীটা বাক্স ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে, নাচছে, আর হাতছানি দিয়ে সুর করে ডাকছে দয়ালকে। এখন তার গলা শুনতে পাচ্ছে দয়াল মানিকঃ ‘এসো ভাই, আজব খেলা দ্যাখো ভাই। এসো ভাই…।’

দয়াল ধানখেতের মধ্যে দিয়ে বাক্সটার দিকে এগিয়ে চলল। একটা চুম্বক যেন ওকে টানছে। আর চলতে-চলতেই প্রাণীটাকে খুঁটিয়ে দেখল দয়াল।

বাক্সটার মতোই আজব প্রাণীটার পরনের পোশাক। গলা থেকে ঝুলে পড়েছে এক অদ্ভুত রকমের জোব্বা। হালকা হলুদ রং। তার ওপরে লাল নীল কালো আর সবুজ রঙের তারা। গনগনে রোদ্দুরে দপদপ করছে। জোব্বার কোমরের কাছ থেকে মানুষের মতোই দুটো হাত বেরিয়ে রয়েছে।

সেই হাত দুটো নাচছে তালে-তালে, আর ডাকছে দয়াল মানিককে।

লোকটার মাথায়—হ্যাঁ, কাছ থেকে দেখার পর প্রাণীটাকে লোক বলেই মনে হয়েছে দয়ালের—লোকটার মাথায় বেখাপ্পা এক টুপি। টুপির মাথা থেকে সরু-সরু লিকলিকে দুটো তার বেরিয়ে উঠে গেছে হাতখানেক ওপরে। তাদের ডগায় দুটো ছোট-ছোট লাল রঙের বল। ঠিক যেন প্রজাপতির শুঁড়। নাচের তালে-তালে সেই শুঁড় নড়ছে, দুলছে।

লোকটার মুখে মুখোশের মতো কী একটা আঁটা। সেখানেও নানা রঙের আঁকিবুকি। শুধু চোখ আর নাকের কাছে ফুটো। সেই ফুটো দিয়ে জ্বলজ্বলে চোখের মণি দেখা গেল বোধহয়। অন্তত দয়ালের তাই মনে হল।

দয়ালকে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে লোকটার হাত-পা ছোড়া আরও বেড়ে গেল যেন। সে গলা ফাটিয়ে তখন গাইছেঃ

‘ক্ষুধাহরণের খেলা গো ভাই

ক্ষুধাহরণের খেলা—

এ খেলাটি খেললে পরে

খিদে—থাকবে না দুইবেলা—’

দয়াল অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। চোখের ভ্রম নয় মোটেই। সবুজ ধানখেতের মাঝে রোদে ঝকঝক করছে রঙিন বাক্সটা। কিন্তু লোকটা বলে কী! ক্ষুধাহরণের খেলা! এ খেলা খেললে দু-বেলা খিদে থাকবে না!

সঙ্গে-সঙ্গে দয়ালের পেটের ভেতরটা মুচড়ে উঠল খিদের টানে। এখনই তো ওর বাড়ি ফেরার কথা। ফিরে যা পায় দুটি গুঁজে দেবে মুখে। পুন্যিটা কী রেঁধেছে তা নির্ভুল বলে দিতে পারে দয়াল। দুটি ভাত, চিচিঙ্গে সেদ্ধ আর শাপলার জোলো ঝোল। সঙ্গে কাঁচালঙ্কা।

পুণ্যির আর দোষ কী! এই একফালি জমি। তাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনরকম চাষ। চাষের খরচ জুগিয়ে আর থাকেটা কী! পুন্যি ইস্টিশানের কাছে ঝোপড়ি হোটেলগুলোয় রাঁধে, বাসনও মাজে। বছরের পর বছর ধরে এই কাজ করে-করে ওর হাতগুলো খোঁদল হয়ে গেছে। দেখে মনে হয় বুঝি বেটাছেলের হাত। হুঁঃ, বেটাছেলেই বটে! নইলে মা হতে পারে না! দয়াল অন্তরে ভাবে, পুন্যির মধ্যে কোথাও বুঝি পাপ আছে। ওর জন্যে কম জড়িবুটি করা হয়েছে! কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।

এ এক দিক দিয়ে বোধহয় ভালোই হয়েছে। এই দিনকালে দুটি পেট টেনেহিঁচড়ে চলাই যে দায়!

দয়াল মাথার ওপরে সূর্যের দিকে তাকায়। সামান্য বুঝি হেলে পড়েছে পশ্চিমে। একটু দূরেই দুটো বাচ্চা-বাচ্চা মেঘ। নরু লস্করের বাছুর দুটোর মতো। ওরা গুটিগুটি এগিয়ে আসছে সূর্যের দিকে। তখন যদি খানিক ছায়া নামে!

দয়াল ক্রমে-ক্রমে পৌঁছে গেল রঙিন বাক্সটার কাছে। বাজিকর লোকটা নাচতে-নাচতে গান গাইতে-গাইতে ঝপ করে একটা গোপন দরজা খুলে দিল। ঠিক যেন ম্যাজিক, ভোজবাজি।

এ-খেলার টিকিট লাগে না? দয়াল একবার ভাবল। তারপর নেশা করা মানুষের মতো ঢুকে পড়ল বাক্সের ভেতরে ভোজবাজির ভুলভুলাইয়ায়। নিঝুম দুপুরে লোকটার গান তখনও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

মিনিট পনেরো পরেই বেরিয়ে এল দয়াল। দুবার ঢেঁকুর তুলল। খাওয়াটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে। প্রথমে নটে শাক, শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে শুরু। তারপর একে-একে নারকোল দিয়ে মুগডাল, বেগুন ভাজা, মাছের মুড়ো দিয়ে অকালের বাঁধাকপির তরকারি, আর ভেটকির ঝাল। সবার শেষে দই আর মিঠে পাতা এলাচ দিয়ে পান। এ একেবারে বিয়ের নেমন্তন্ন।

জিভের ডগা দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল দয়াল। খাবারের কুচো মনে হয় আটকে আছে দাঁতের ফাঁকে। ডালে নুন একটু টান-টান হয়েছিল, আর বাঁধাকপির তরকারিতে হলুদটা সামান্য বাড়তি ছিল। তবে মাছের ঝালটা বেশ রান্না হয়েছে—একদম কটকটে ঝাল। দয়াল ঝাল খেতে খুব ভালোবাসে। তার জন্যে পেটও ব্যথা করে মাঝেমধ্যে। শিবু ডাক্তার দ্যাখে, ওষুধ দেয়।

ঘরে ফিরে পুন্যিকে যখন বলল যে, কিছু খাবে না, তখন পুন্যি খুশি হল, আবার অবাকও হল। খুশি এই কারণে যে, ও আজ একপেটা খেতে পারবে। আর অবাক হল স্বামীটার কথা শুনে। এই ঘোর দুপুরে কে পাত পেড়ে খাওয়াবে লোকটাকে! তাও আবার কতরকম পদ! মিছে কথা বলছে না তো?

দয়াল তখন বিশদভাবে ওর খাওয়ার গল্প করছিল, আর ঝালের চোটে মুখ সরু করে বারবার শব্দ করে বাতাস টানছিল।

খাওয়াদাওয়ার পর পুন্যি চেপে ধরল দয়ালকে।

‘বলো না গো, কে তোমায় অমন খাইয়েচে।’

দয়াল মাথা নাড়লঃ ‘সে বলতে পারব নারে—।’

দয়ালের মনে পড়ে গেল সেই আজব লোকটার কথাঃ ‘এই ক্ষুধাহরণের খেলার কথা কাউকে বোলো না হে। একদম গোপন রাখবে। বলে যদি দাও, তা হলে আর কোনওদিন তুমি আমার দেখা পাবে না—এ কথাটি নিশ্চয় জেনো।’

সুতরাং দয়াল ঠোঁট টিপে রইল। লোকটা কোথা থেকে এসেছে কে জানে! এ-গাঁয়ের তো নয়। তা হলে হয়তো ভিন-গাঁ কি ভিন-দেশ থেকে এসে পড়েছে এখানে। কিন্তু বিনিপয়সার খেলা দেখিয়ে তার কী লাভ? সে যাই হোক, মনে-মনে বাজিকরকে গড় করে দয়াল। আর তার গানের কলি কানে বাজতে থাকেঃ ‘ক্ষুধাহরণের খেলা গো ভাই, ক্ষুধাহরণের খেলা…।’

ঠিক একইরকম আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল নদু শেখের জীবনে।

সময়টা তখন ঝাঁ-ঝাঁ দুপুর। আকাশের দিকে তাকালে কে বলবে দশমিনিট আগেও ঝমাঝম বৃষ্টি নেমেছিল। এ বছরে বৃষ্টি ভালো হয়নি। অথচ আকাশ-বাতাস দেখলে মনে হয় বর্ষার বুঝি যাই-যাই ভাব। আর জল যদিও বা হয় তাও আলটপকা আচমকা। তাই নদুর রোজকার কাজ জোটে না ঠিকমতো। তিনদিন আগে আবহাওয়া অনুমান করে সরল মাইতির জমিতে ধান রুয়েছে। কিন্তু তারপরই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। মাইতির জমিতে জল দাঁড়িয়ে গেছে, ডুবে গেছে ধানচারা। আর দু-তিনদিনের মধ্যে যদি জল ছাড়িয়ে চারাগুলো মাথাচাড়া না দেয় তো সব শেষ। কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে।

কাল নদুর কাজ ছিল না। মাইতির আর-একফালি জমিতে লাঙল দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লাঙল গেল মেরামতিতে। তাই অন্য কোনও কাজ খুঁজতে বেরিয়েছিল নদু।

কাল কাজ জোটেনি, তবে আজ জুটেছে। পাট ছাড়ানোর কাজ। সুবল চৌধুরির পাট দু-সপ্তা ধরে ডোবায় পচছে। তারই আঁশ ছাড়াতে হবে। এ-ডোবায় আগে খেপলা জাল ফেলেছে নদু। তার জন্য পয়সাও পেয়েছে সুবল চৌধুরির কাছে।

অল্পসল্প বর্ষায় ডোবার জল কিছুটা বেড়েছে। সেই ডোবাতেই ঊরু-জলে দাঁড়িয়ে ছিল নদু। পাটের গোটাসাতেক লাট তখনও ভাসছে। একটা লাট নিয়ে তার গোড়ায় কাঠের মুগুর পিটল নদু। পরপর পিটুনি খেয়ে গোড়ার আঁশগুলো ছেড়ে গেল। তখন লাটের মাঝামাঝি জায়গায় হাতের চাপে লাটটা দু-টুকরো করে ফেলল। অমনি সাদা প্যাঁকাটির ডগা বেরিয়ে পড়ল, কিন্তু আঁশের জোড় থেকে গেল। হাত-পা ভেঙে হাড়ের ডগা যেমন উঁকি দেয়, অথচ মাসের জোড় টিকে থাকে—সেরকম।

নদু এবার অভ্যস্ত হাতে মুগুর পিটে-পিটে প্যাঁকাটির গোছ বের করে নিতে লাগল। যখন প্রায় বেরিয়ে এসেছে তখন মুগুর জলে ভাসিয়ে হাতের টান মেরে কাজ সারল। প্যাঁকাটির গোছা দুটো ছুড়ে দিল পাড়ে। তারপর পাটের লাছি থেকে টুকরো-টাকরা ভাঙা প্যাঁকাটি বের করে ফেলে দিল। পাটের লাছি জলে বারবার ডুবিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিংড়ে নিল গামছার মতো। তারপর প্যাঁচ দিয়ে গেঁট মেরে লাছিটা ছুড়ে দিল পাড়ে।

নদুর ডানা দুটো ব্যথা করছিল। গায়ে-পিঠে চড়চড়ে রোদ্দুর। অথচ ঊরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ঠান্ডা। দু-একটা মেনি মাছ আর জলপোকা নদুর পায়ে মাঝে-মাঝে ঠোকর মারছিল, ওর সেদিকে কোনও লক্ষ ছিল না। কারণ খিদের চোটে পেটের ভেতরে তখন ইঁদুরদের তাণ্ডব নৃত্য।

আর পারা যাচ্ছে না। জলের মধ্যে পাঁকের ওপর পা ফেলে-ফেলে শরীরটা পাড়ে টেনে তুলল নদু। পাটের অনেকগুলো লাছি পড়ে আছে পাড়ে। পেটটা শান্ত করে এসে তারপর সেগুলো ছড়িয়ে দেবে রাস্তার ধারের দড়িতে। প্যাঁকাটির গোছগুলোও শুকোতে দেবে।

নদু রাস্তায় উঠে এল। রাস্তার ধার ঘেঁষে ভিজে পাট শুকোচ্ছে দড়িতে। আর প্যাঁকাটির পাঁচ-ছ’টা গোছা টুপির মতো করে দাঁড় করানো সার দিয়ে।

নদু তাকাল চারপাশে। দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে দুটো ফিঙে বসে। পাশের মাঠে তিনটে গরু চরে বেড়াচ্ছে। ডাকছে মাঝে-মাঝে।

আকাশের দিকে তাকাল নদু। পরিষ্কার। দু-চারটে সাদা মেঘ। কিন্তু ধানজমির শেষ প্রান্তে একসার ঝাঁকড়া গাছের পিছনে আকাশের গায়ে কালো মেঘের পটি। বৃষ্টি আসতে পারে কিছুক্ষণের মধ্যে। তা হলেই মাইতির চারা শেষ। ওই চারাগুলোয় নদুর হাতের স্পর্শ ছিল।

রাস্তা ধরে কয়েক পা ফেলামাত্রই অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখতে পেল নদু শেখ। ঠিক যে-দৃশ্য দেখেছিল দয়াল মানিক।

সুতরাং নদু যেন নেশার টানে বাঁধা পড়ল। ওর পা ওকে টেনে নিয়ে চলল ধানখেতের মাঝে দাঁড়ানো ঝকমকে রঙিন বাক্সটার দিকে। রং পালটানো বাক্স ঘিরে রঙিন পোশাক পরা ভিন-দেশি মাদারি তখন নাচছে, গাইছে, ডাকছে গান গেয়েঃ

‘ক্ষুধাহরণের খেলা গো ভাই

ক্ষুধাহরণের খেলা

এ-খেলাটি খেললে পরে

খিদে—থাকবে না দুইবেলা—’

ক্রমে-ক্রমে নদু শেখ পৌঁছে গেল সেই রঙিন জগতের দরজায়। পেটের মোচড় নিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

ভেতরটা অন্ধকার, ছোট্ট একটা ঘরের মতো। সেই ঘরে নদু যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই একটা দেওয়ালে একটা ছবি ফুটে উঠল—বায়োস্কোপের ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা বড় স্টেইনলেস স্টিলের থালা, তার পাশে এক গ্লাস জল। থালার পাশেই একটা হাত—অপেক্ষা করছে। থালায় খাবার দেওয়ার অপেক্ষা। হাতের চেহারা কালো, শিরা ওঠা। নদু জানে, এই মুহূর্তে যদি ও নিজের হাতটা দেখতে পেত তা হলে ছবির হাতের সঙ্গে তফাত খুঁজে পেত না।

থালায় চার হাতা ভাত দিল কেউ। গরম-গরম ভাত। ভাপ উঠছে। গন্ধ ছড়াচ্ছে।

নদু শেখ গরম ভাতের তাপ টের পেল। ঘ্রাণও এল নাকে। আ—ঃ! নদুর জিভে জল এসে গেল। আর ঠিক তখনই কেউ দু-চামচ ঘি দিল পাতে। একটু নুন দিল। টিয়াপাখির মতো সবুজ দুটো কাঁচালঙ্কা দিল।

কালো হাতটা ঘি দিয়ে ভাত মাখতে শুরু করল। তারপর ভাতে নুন ও কাঁচালঙ্কা মেখে নিল কালো হাতটা। আর নদু শেখ ওর জিভে গরম-গরম ঘি-ভাতের স্বাদ পেল।

ঘিয়ের পরেই গরম গরম ডাল। তাতে পেঁয়াজ ভাজা আর ফোড়ন দিয়ে সম্ভার দেওয়া। আর ডালের সঙ্গে নারকোল দিয়ে মোচার ঘণ্ট—ঘণ্ট থেকে গরম মশলার গন্ধ বেরোচ্ছে।

নদু শেখ দেখছিল কালো হাতটা কেমন পাগলের মতো ডালভাত মেখে মোচার ঘণ্ট দিয়ে খেয়ে চলেছে। শব্দ শুনতে পাচ্ছে নদু, গন্ধ পাচ্ছে, টের পাচ্ছে রান্নার প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বাদের কণা। ওর মনে হচ্ছিল বুঝি ও নিজেই খেয়ে চলেছে গপগপ করে।

অন্ধকার ঘরে, এইভাবে, চলতে থাকল ক্ষুধাহরণের খেলা।

ডালের পর এল বড় পোনা মাছের কালিয়া আর সরষে বাটা দিয়ে ইলিশ। পাতে আরও দু-হাতা গরম ভাত পড়ল। কালো হাতটা খেতে লাগল আয়েস করে, আয়েস করে। এবং সবশেষে থালা চেটেপুটে আঙুল চুষে শেষ করল খাওয়ার পাট।

পরপর দু-গ্লাস জল খেল বায়োস্কোপের হাতটা। কিন্তু এমনই সে-ছবির চালাকি যেন মনে হল নদু শেখই ঢকঢক করে জল খাচ্ছে, ওরই গলা থেকে খাবারের দলা নেমে গেল পাকস্থলীর দিকে।

নদু শেখ তৃিপ্তর ঢেঁকুর তুলল অন্ধকার ঘরে। ওর কেমন যেন ঘুম-ঘুম পাচ্ছিল!

একটু পরেই রঙিন ঘরের ভেতরে পরদার বায়োস্কোপ মিলিয়ে গেল আর দরজা খুলে গেল। বাইরের ধানখেতে বেরিয়ে এল নদু। আর সঙ্গে-সঙ্গে দরজা বন্ধ হয়ে গেল আবার।

এপাশ-ওপাশ নজর চালিয়েও মাদারিকে আর দেখতে পেল না নদু। মাথার ওপরে মেঘ জেমেছে, হয়তো বৃষ্টি নামবে। হলদে ফড়িং-এর ঝাঁক উড়ছে এখানে ওখানে।

ধানখেত ধরে রাস্তার দিকে এগোল নদু। সারের বস্তা বোঝাই করে গরুর গাড়ি চলেছে রাস্তা দিয়ে। তার পিছনে দুটো সাইকেল। না, ওরা কেউই দেখছে না রঙিন জাদুঘরটার দিকে।

নদু একবার তাকাল ঘাড় ঘুরিয়ে। আশ্চর্য! ভোজবাজি যেন। কেউ নেই! না ওই রঙিন জাদুঘর, না তার রঙিন জাদুকর! হুস করে কোথায় মিলিয়ে গেছে। সে মিলিয়ে যাকগে। পরে আবার এরকম কোনও ঘোর দুপুরে তার দেখা পেলেই হল।

রাস্তায় উঠে এল নদু। বড় ঘুম পাচ্ছে ওর। চলতে-চলতে পুরোনো একটা ধানকল চোখে পড়ল। ধানকলটা এখন অচল। দরজায় জং ধরা তালা। বাইরের দাওয়ায় দুটো পুরোনো আমলের লোহার সিন্দুক। ডালা কাত হয়ে বেঁকে আছে।

ধানকলের দাওয়ায় উঠে পড়ল নদু শেখ। দাওয়ার মাথায় টিনের চাল। তার নানা জায়গায় ফুটো।

ফাটল ধরা ইট বের করা দাওয়াতে শুয়ে পড়ল নদু। আর তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। সামনের গাছপালা, খেত, খোড়ো কুঁড়েঘর সব ঝাপসা হয়ে গেল। কয়েকটা শকুনি-মুরগি রাস্তার ওপরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বৃষ্টি নামতেই সামনের সাইকেল সারাইয়ের দোকানের চালার নীচে ঢুকে পড়ল। কঁক-কঁক করে ডাকতে লাগল।

বৃষ্টি আরও জোরে ঝেঁপে এল। দুটো কালো ছাগল কোথা থেকে খোঁটা উপড়ে এসে দড়ি খোঁটা সব টানতে-টানতে ম্যা-ম্যা করে ডাকতে-ডাকতে ছুটে চলল রাস্তা দিয়ে।

বৃষ্টির সঙ্গে বেড়ে উঠল বাতাসের তেজ। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে তালগাছ দুলতে লাগল। বৃষ্টির ছাট নদুর গায়ে এসে লাগছিল। কিন্তু তারই মধ্যে ওর চোখে ঘুম নেমে এল। ঘুমের মধ্যে ও সুন্দর-সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগল।

ঠিক ঘণ্টাখানেক পরেই খিদের তীব্র মোচড়ে নদু শেখের ঘুম ভেঙে গেল।

ও কিছুতেই ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারল না। ক্ষুধাহরণের খেলা খেলার পর কী করে সেই পুরোনো খিদে সাতগুণ ভয়ংকর হয়ে আবার ফিরে আসে? এ তো বড় আশ্চর্য ব্যাপার! মোচার ঘণ্ট, পোনা মাছের কালিয়া, সরষে বাটা দিয়ে ইলিশ—ওগুলো সব গেল কোথায়? সবই কি তা হলে বায়োস্কোপের মায়া? ক্ষুধাহরণের খেলা তা হলে শুধুই খেলা!

ক্ষুধার্ত নদু শেখ তাজ্জব হয়ে ভাবতে থাকে। কোথায় যেন একটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাজিকর বলে দিয়েছিল বারবার করেঃ ‘এ-খেলার কথা কাকপক্ষীকেও বোলো না হে। এ বড় গোপন চতুরালি। যদি গোপন রাখো তবেই আবার আমার দেখা পাবে—এ কথাটি নিশ্চয় জেনো।’

ক্ষুধাহরণের খেলা খেলার পর, ঘণ্টাখানেক পর, দয়াল মানিকেরও তীব্র খিদে পেয়েছিল। কিন্তু লজ্জায় সে-কথা ও পুন্যিকে বলতে পারেনি। অবশ্য বলেও কোনও লাভ ছিল না। কারণ ততক্ষণে পুণ্যির খাওয়া শেষ, চেটেপুটে শেষ।

সুতরাং দয়াল মানিক আবার কাজের অজুহাতে পথে বেরিয়ে পড়েছে—যদি আবার সেই অদ্ভুত মাদারির দেখা পেয়ে যায়।

না, দেখা পায়নি।

তবে দিনের পর দিন অনেকেই সেই অদ্ভুত প্রাণীটার দেখা পেল। ঘোর দুপুরের গনগনে রোদে নির্জন ধানখেতের মাঝে। আর ক্রমে-ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল এই আশ্চর্য জাদুকরের কথা। গাঁয়ের প্রায় সকলেই জেনে গেল তার ক্ষুধাহরণের খেলার কথা। যারা এই খেলা খেলতে পারেনি তারা সন্নাটা দুপুরে খুঁজতে লাগল লোকটাকে।

প্রৌঢ় খালেক মিঞা তাকে খোঁজে।

বুড়ি মতিয়া তাকে খোঁজে।

বালক নির্মল পাইক খোঁজে তাকে।

কিশোরী সরিফাও খোঁজে।

খোঁজে জোয়ান মানুষের দল।

আর দয়াল মানিক কিংবা নদু শেখও খোঁজে তাকে। আরও একটিবার যদি ওই খেলা খেলার সুযোগটি মিলে যায়।

সেদিন বিকেলে এই বর্ণচোরা মাদারিকে নিয়েই জটলা চলছিল রতনের চায়ের দোকানে।

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। চায়ের দোকানের খড়ের চাল থেকে ছ’টা-আটটা সবুজ ধানগাছ বৃষ্টির জল পেয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে। দোকানের ভেতরে রেডিয়োতে গান চলছেঃ ‘আমার গরিব নওয়াজ…ও আমার গরিব নওয়াজ…’ আর বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে আছে চার-পাঁচজন মানুষ। তাদের হাতে চায়ের গ্লাস।

সলিল পাত্র এখানকার হাইস্কুলের মাস্টার। কলকাতায় গিয়ে পড়াশোনা করে এসেছে। সে কথা বললে আর সকলে মনোযোগ দিয়ে শোনে। এখনও শুনছিল। শ্রোতাদের মধ্যে রতনও ছিল। তক্তপোশে বসে ছেঁড়া ন্যাকড়া দিয়ে বিস্কুটের বোয়েম সাফ করছিল আর কান খাড়া করে শুনছিল সলিল মাস্টারের কথা।

সলিল পাত্রের বয়েস অল্প। চোখা নাক-মুখ। চোয়ালের হাড় উঁচু। গাল সামান্য বসা। মাথায় কোঁকড়া চুল। চোখ চকচকে। আর সবসময় চেঁচিয়ে কথা বলে।

কাল দুপুরে হাইস্কুলের একটা ছাত্র সামনের পুকুরে ডুবে মারা গেছে। সাঁতার জানত ছেলেটা, কিন্তু তা সত্ত্বেও যে কী করে ডুবে মারা গেল কেউ জানে না। এ নিয়ে সারাটা দিন ধরে অনেক জল্পনাকল্পনা হয়েছে রতনের দোকানে। আর সত্যি কথা বলতে কি, তাতে দোকানে ভিড় বেড়েছে, বিক্রিবাটাও হয়েছে অন্যদিনের তুলনায় বেশি।

আজ সকালে ছেলেটার লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে।

এই দুর্ঘটনার জন্য হাইস্কুল ছুটি দেওয়া হয়েছে আজ। সকাল থেকে একটু আগে পর্যন্ত ওই ছেলেটার মৃত্যু নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছিল রতনের দোকানে। হঠাৎই কে যেন তুলে দিয়েছে সেই বাজিকরের কথা। আর তারপরই একে-একে এসে গেছে দয়াল মানিক, নদু শেখ ও আরও অনেকের কথা।

সলিল মাস্টার চেঁচিয়ে কথা বলছিল, ‘…এসবে বিশ্বাস করার কোনও মানে নেই, নারানদা। ওসব ওদের চোখের ভ্রম, মরীচিকা। কী দেখতে কী দেখেছে সে ওরাই জানে! কই, আমি তো দেখতে পাইনি! আমি তো হাটে-মাঠে কত ঘুরি—।’

নারান মণ্ডল বাঁ-হাতে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল, ডানহাতে বিড়ি। ময়লা ধুতি টেনে কোলের কাছে জোট পাকানো। ফোকলা মুখ নেড়ে বলল, ‘তার মানে আপনে বলতি চান সক্কলে ভুল দেখেছে? ভুলই যদি দেখবে তা হলে ওদের খিদে তেষ্টা মরল কেমন করে, বলেন—।’

সলিল পাত্র চায়ের গ্লাস নামিয়ে রেখে হাত নাড়ল, বলল, ‘আঃ হা, আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। সত্যি-সত্যি ওদের খিদে তেষ্টা মরেছে কি? ওই কিছুক্ষণের জন্যে খিদের ব্যাপারটা শুধু ভুলিয়ে রেখেছে। ওভাবে কি খিদে চাপা দেওয়া যায়?’

আর-এক শ্রোতা হরিপদ সাহা বলে উঠল, ‘তা হলে কি মাস্টারমশায় ব্যাপারটা ভূত-প্রেতের কারসাজি? কিন্তু ভূত-প্রেত দিনদুপুরে দেখা যাবে এও কি বিশ্বেস করা যায়, বলুন—।’

বোতল সাফ করা থামিয়ে রতন বলল, ‘এর পেছনে কারও ফন্দি নাই তো?’

সলিল পাত্র দাঁত দিয়ে নখ কাটল। ভুরু কুঁচকে চোখ ছোট করে বলল, ‘এখন তো এইসবই চলছে। খিদের জ্বালা ভুলিয়ে রাখার কারসাজি। এভাবে জ্বালা কখনও কেউ ভোলে, নারানদা!’ রতনের দিকে তাকিয়ে সলিল বলল, ‘এসব যদি ওদের চোখের ভ্রম না হয় তা হলে নিশ্চয় জানবে এর পেছনে কারও মতলব আছে, কারসাজি আছে।’

সলিল পাত্রের জোরালো কথায় ঘাড় নাড়ে রতন। নারান মণ্ডল, হরিপদ সাহাও ঘাড় নাড়ে। মাস্টারমশায় ঠিকই বলেছে। কিন্তু কাল দুপুরে ওই কচি ছোঁড়াটা হঠাৎই বা অপঘাতে মারা গেল কেন? ঘোর দুপুরে কোনও জিন কি গাঁয়ের মাথায় ভর করেছে?

ওরা সকলে সলিল পাত্রের কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ওদের বুকের ভেতরে একটা লালসা চুপিসারে কাজ করছিল। ইস, একটিবার যদি ওই মাদারির দেখা পাওয়া যায়! যদি একটিবার ওরা খেলতে পারে ক্ষুধাহরণের খেলা!

বাইরে তখন বৃষ্টি ও অন্ধকার—দুয়েরই তেজ বেড়েছে।

সলিল পাত্র যখন দলবল নিয়ে গাঁয়ের মাঠে-ঘাটে বনেবাদাড়ে তন্নতন্ন করে সেই শয়তান বাজিকরের তল্লাশ করছে, সে তখন গাঁয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে—ঘিয়া নদী পেরিয়ে অশ্বত্থ, পাকুড়, ইউক্যালিপটাসের জঙ্গলে আলোছায়ার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। পরনে তার সেই অদ্ভুত রঙিন পোশাক। কিন্তু বহুবর্ণ গাড়িটা—অথবা ভোজবাজির সেই ঘর—কোথাও চোখে পড়ছে না।

ভিনগ্রহীর পোশাক পরা মানুষটা গাছের ছায়ার আধোআঁধারিতে দাঁড়িয়ে হঠাৎই কেমন ক্লান্ত ভঙ্গিতে তার পোশাক ছাড়তে শুরু করল। গায়ের জোব্বা, মাথার অদ্ভুত টুপি ইত্যাদি খুলে ফেলতেই মাদারির সারেগামা পাঁজর দেখা গেল। তার গায়ের রং, চামড়ার ভাঁজ আর কৃশকায় চেহারা দেখে মনে হয়, তার নাম দয়াল মানিক অথবা নদু শেখ হতে পারত খুব সহজেই।

আকাশের দিকে তাকিয়ে মাদারি হাঁপায়। মেঘ নেই একফোঁটা। সব যেন শুকনো কাঠ। শরীরের ভেতরটাও। খিদের নাগরদোলা ঘুরছে নাভিকে ঘিরে। এখন তাকে যেতে হবে আর-এক মাদারির খোঁজে—যে তাকে ভাতা দেয়, ভাত দেয়, ক্ষুধাহরণের খেলা দেখানোর গাড়ি দেয়, সাজসজ্জা দেয়।

এত খিদের মধ্যেও হাসি পায় মানুষটার। আশ্চর্য! যে আর-একজনের কথামতো ভোলাভালা মানুষগুলোকে ভরদুপুরে ধানখেতের মাঝে রোজ ক্ষুধাহরণের খেলা দেখিয়ে বেড়ায় সে খিদে ভুলে থাকতে পারছে না কিছুতেই!

মাটির দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে ক্লান্ত দেহে পথ চলতে থাকে লোকটা। মনে-মনে শপথ নিতে চায়, আর কখনও এই খেলা দেখাবে না সে। বরং ওই ভোলাভালা মানুষগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। তারপর ভরদুপুরে সবাই মিলে খুঁজে বেড়াবে আসল মাদারিকে—যে সবসময় আড়ালে থেকে সবাইকে পুতুলনাচের খেলা দেখায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *