আজ শেষ দিন
ডিজিটাল ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ চলে গেল। ৩১ ডিসেম্বর, ২০৯১। আজ শেষ দিন। আজই আমার শেষ দিন। আজ রাত ঠিক বারোটায়, কাঁটায়-কাঁটায় বারোটায়, আমার বুকের ভেতরে লোডশেডিং হয়ে যাবে। আর আলো জ্বলবে না।
আমি চলে যাব। তবে সুমি আর মিতা থেকে যাবে। ওদের হাতে এখনও সময় আছে। বাঁচার সময়।
চায়ের কাপ হাতে সুমি ঘরে এল। আমার হাতে কাপ তুলে দিল রোজকারের মতো। আমি কাপটা নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। স্বাভাবিক থাকার জন্যে চেষ্টা করলাম প্রাণপণে। কিন্তু তবুও হাত কেঁপে গেল। কাপ আর প্লেটে ছোট-ছোট কয়েকটা ঠোকাঠুকি হয়ে গেল।
সুমি জিগ্যেস করল, ‘চায়ে চিনি ঠিক আছে?’
আমি ঘাড় নাড়লামঃ ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’ চিনির সামান্য এদিক-ওদিক হলেও আমার কোনও অসুবিধে হয় না। সুমি এটা বরাবরই জানে, তবু এই অবান্তর প্রশ্নটা করল আজ।
সুমিকে দেখলাম ভালো করে। সিঁথির সিঁদুর আজ যেন বেশি স্পষ্ট। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই কি সিঁদুর লাগিয়েছে নাকি? কোনওদিন তো লাগায় না! ওর মুখটা খুব খুঁটিয়ে দেখতে-দেখতে মনে হচ্ছিল, ওর বয়েস বোধহয় আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। দেখে মনেই হয় না, বাহান্ন পেরিয়ে তিপ্পান্নয় পা দিয়েছে। আমার সঙ্গে ওর প্রায় আট বছরের তফাত। বিয়ের সময়ে ওর ছিল উনিশ, আর আমার সাতাশ। তখন ও বয়েসের ফারাক নিয়ে ঠাট্টা করত প্রায়ই। বলত, তুমি আমার অনেক আগে বুড়ো হয়ে যাবে। কথাটা মিথ্যে নয়।
দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সকাল প্রায় আটটা। তবুও রোদের তেজ তেমন বাড়েনি। বাতাসে ঠান্ডা ছুঁচ। গত ক’দিন ধরেই শীতটা জাঁকিয়ে বসেছে কলকাতায়। আমার চাদরে, গায়ে, হাতে রোদের আলতো রং এসে লেগেছে। সুমির কপালের বাঁ-পাশে, আটপৌরে ছাপা শাড়িতেও। ও মুখ নামিয়ে বারান্দার লাল সিমেন্ট দেখছে।
আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী হল, কী ভাবছ?’
ও কেঁদে ফেলল। মুখ নামানো থাকলেও কান্নার দু-একটা টুকরো শব্দ শোনা গেল।
অন্যসময় হলে বলতাম, ‘কী হচ্ছে, সুমি—চোখ মোছো। ছেলেমানুষি কোরো না—’ কিন্তু আজ সে-কথা বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, ‘কেঁদে লাভ কী!’
সত্যিই কেঁদে কোনও লাভ নেই। এখন প্রতিটি মানুষের জন্মের সময় যেমন মা-বাবার হাতে বার্থ সার্টিফিকেট ধরিয়ে দেওয়া হয়, তেমনই দেওয়া হয় একটা লাইফ সার্টিফিকেট। দুটো সার্টিফিকেটই মাপে ছোট। তাসের মতো দেখতে দুটো ম্যাগনেটিক কার্ড। প্রথম কার্ডে রয়েছে সিটিজেন কোড নম্বর, বাবার ও মায়ের সিটিজেন কোড নম্বর, জন্ম-সময়, তারিখ আর নার্সিংহোমের নাম ও সিরিয়াল নম্বর। দ্বিতীয় কার্ডটা অনেক সংক্ষিপ্ত। তাতে নবজাত শিশুর নাম, সিটিজেন কোড নম্বর আর—আর, তার মৃত্যুর তারিখ লেখা থাকে। হ্যাঁ, মৃত্যুর তারিখ! জন্মসালের সঙ্গে ষাটবছর যোগ করলে যে-সাল পাওয়া যায়, তার শেষ দিনই মৃত্যুর দিন। যেমন, আমার জন্মতারিখ ২২ অক্টোবর, ২০৩১। তাই আজই আমার মৃত্যুর দিন।
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়তে-বাড়তে ভারসাম্যের কাঁটা চলে গিয়েছিল শেষ সীমায়। তাই ২০১০ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পৃথিবীর সমস্ত দেশ বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তাঁরা বলেন, প্রতিটি মানুষের আয়ু কখনওই গড়ে ষাট বছরের বেশি হবে না। তাঁদের মতে, একটি জীবনের পক্ষে ষাট বছর যথেষ্ট। আর এই নিয়মের জন্যে সুবিধেও হবে অনেক। প্রত্যেকেই, তার মৃত্যুর দিন জানা থাকায়, পরিকল্পনামাফিক সমস্ত কাজ সেরে রাখতে পারবে। চলে যাওয়ার সময় কোনও কিছুই আর অগোছালো থাকবে না। বিষয়-সম্পত্তির হাতবদলের ব্যাপারে কোনওরকম জটিলতা আর থাকবে না। ফলে যন্ত্রসভ্যতার এই নিয়মের দুনিয়ায় সবকিছুই চলবে নিয়মমাফিক।
আমার হাতের মুঠোয় লাইফ সার্টিফিকেটটা ধরা ছিল। সারাজীবন এই ম্যাগনেটিক কার্ডটা আমার কত কাজে লেগেছে! ইলেকট্রনিক স্ক্যানারের নীচে ধরলেই কম্পিউটারের প্রিন্টারে এর যাবতীয় তথ্য ছাপা হয়ে যায়। স্কুল, কলেজ, চাকরি, বিদেশ যাওয়া—প্রায় সবকাজেই প্রথমে দরকার লাইফ সার্টিফিকেট।
বুকের বাঁ-দিকটায় কি একটু চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে? নাকি আমার মনের ভুল?
জন্মের পরই একটা ছোট্ট অপারেশান করে প্রতিটি শিশুর বুকে বসিয়ে দেওয়া হয় ইলেকট্রনিক ‘হার্ট স্টপার’, সঙ্গে একটা খুদে ডিজিটাল ঘড়ি। ওই ঘড়িতে নির্দিষ্ট সময় সেট করে দেওয়া থাকে। অনেকটা টাইম-বোমার মতো। ঠিক সময়ে পৌঁছলেই হার্ট স্টপার তার কাজ করে। সে থামিয়ে দেয় হৃৎপিণ্ডকে। আজ পর্যন্ত কখনও শোনা যায়নি, কোনও হার্ট স্টপার ঠিক সময়ে তার কাজ করতে পারেনি।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে সূর্যটাকে দেখছিলাম। কত কাল ধরে জ্বলছে আকাশে। কোনও হার্ট স্টপার ওকে নেভাতে পারেনি। আজ ওটাকে কী সুন্দরই না লাগছে!
রাস্তার ওপাশে একটা বাড়ির ছাদে কয়েকটা কাক বসে আছে। ওরা বুদ্ধিমান নয়, তাই কত স্বাধীন। আকাশে উড়ছে পায়রা আর চিল। শেষ দিন নিয়ে ওদেরও কোনও দুশ্চিন্তা নেই।
সুমিকে জিগ্যেস করলাম, ‘মিতা কোথায়? ওঠেনি এখনও?’
ও কাঁদতে-কাঁদতেই বলল, ‘না—।’
মিতা আমার মেয়ে। আমাদের মেয়ে। আমিই ওর নাম রেখেছিলাম মিতা। সুমিতার শরীর থেকেই ওর সৃষ্টি, তাই সুমিতার নামের মধ্যেই ওর নাম লুকিয়ে থাক। কিন্তু এসব কে ভাবে! আমাদের সরকারের কাছে আমরা শুধুই তিনটে কোড নম্বর।
প্রায় আটবছর হল মিতার বিয়ে হয়েছে, কিন্তু আমার কাছে ও এখনও সেই ছোট্টটি। ছোটবেলা থেকেই ঘুম থেকে ওঠে বেলা করে। খুব বকবক করে। পড়াশুনোয় ঝোঁক ছিল কম। ছোটবয়েস থেকে ওর চোখে মাইনাস পাওয়ারের চশমা। কথা বলত পাকা-পাকা। আমাকে বন্ধুর মতো দেখত। কত যে উপহার দিত আমাকে! মনে পড়ছে, ও যখন ক্লাস টু-তে পড়ত তখন স্কুল থেকেই হয়তো ছোট্ট একটুকরো চক নিয়ে এসেছিল। একটা চিঠি লিখে সেই চকটা চিঠিতে মুড়ে রেখে দিয়েছিল আমার টেবিলে। সেই চিঠিটা আমি আজও রেখে দিয়েছি। আর চিঠির কথাগুলো এখনও স্পষ্ট মনে আছেঃ
‘বাবা, এই চকটা তোমাকে দিলাম। তোমাকে নিতেই হবে। আমার এই ছোট্ট কথাটা রেখ কিন্তু। ইতি তোমার মিতা। ক্রশ।’
শেষের যোগ চিহ্নটা এঁকে ও ‘গড ক্রস’ বোঝাতে চেয়েছে। যাতে আমি ওর কথা অবশ্যই রাখি। চকটা নিয়েছিলাম আমি। শিশুর কাছ থেকে পাওয়া উপহার সবসময়েই পবিত্র। কিন্তু আজ?
আজকের দিনটার জন্যে সুমিই খবর দিয়ে মিতাকে দু-দিনের জন্যে ডেকে এনেছে। যাতে আমি চলে গেলে মা ও মেয়ে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরতে পারে। মিতা জানে না, আজ আমার শেষ দিন। কারণ, আমার জন্মসালটা ও সঠিকভাবে জানে না। ওর মায়েরটাও না। আমরাই কখনও জানাইনি।
প্রথম-প্রথম বছরের শেষদিনের এই চলে যাওয়া নিয়ে দেশে খুব হইচই হয়েছিল। আজকাল আর হয় না। সবই সয়ে গেছে। প্রতিবছরের শেষ দিনে রাত ঠিক বারোটায়, লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি হার্ট স্টপার নিখুঁতভাবে কাজ করে। আর পরদিনই জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগামী রেখাচিত্রটা ঝপ করে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়। এর ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে। পৃথিবী বাসযোগ্য থাকে, সুখী থাকে।
আমি জানি, আজ সারাটা দিন সুমি আমার যত্ন নেবে। বিয়ের প্রথম রাতের মধুর নজরে মুগ্ধ হয়ে দেখবে আমাকে। সুযোগ পেলে এই বুড়োটাকে এক-আধবার আদরও হয়তো করবে। তারপর…রাত ঠিক বারোটায়…ওর হাত ধরে, মিতার হাত ধরে আমি চলে যাব। বুকের ভেতরে আমার হৃৎপিণ্ড শেষবারের মতো বেজে উঠবে।
আর একইসঙ্গে শুরু হয়ে যাবে উৎসব। নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব। অথবা আমার মতো লক্ষ-লক্ষ ‘অকেজো’ বৃদ্ধকে বিদায় জানানোর উৎসব। তখন মিতার ছোটবেলার চিঠিতে লিখে দেওয়া যোগ চিহ্নটা পলকে বিয়োগ চিহ্ন হয়ে যাবে। কাক-চিল, এই মুহূর্তে পিঠে এসে পড়া রোদ, সুমির আটপৌরে ছাপা শাড়ি, কিংবা মিতার চশমা, কিছুই আমি আর দেখতে পাব না। সব বিয়োগের খাতায় নাম লেখাবে।
সুমি এখনও আমার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছে অকারণে। মুখে তেতো স্বাদ টের পেলাম। বিজ্ঞান এত এগিয়ে গেছে, তবু কেন যে ওরা ল্যাক্রিম্যাল গ্ল্যান্ডগুলো আমাদের শরীর থেকে বাদ দিয়ে দেয়নি! তা হলে আর কারণে-অকারণে চোখে জল আসত না। চলে যাওয়ার দিন ছেলেমানুষের মতো সুমির কাছে ধরা পড়ে যেতাম না আমি।
আশ্চর্য! মনে হল আমার চোখের কোণ থেকে দু-ফোঁটা জল বলে উঠল, ‘আজ তোমার শেষ দিন। তাই তো আমরা কাঁদছি!’
