অকালের ফুল
ফুঁলকাটা পলিথিন চাদরের ওপরে শুয়ে তুতু হাত-পা ছুড়ছিল আর হাসছিল।
রাগি পায়ে চটির ফটফট শব্দ তুলে ঘরে ঢুকেছিল লাবণি। তুতুর দিকে চোখ পড়তেই মনের ভেতরে কীসব যেন হয়ে গেল। রাগের বাষ্প যেন দামাল বাতাসে এলোমেলো ফিকে হয়ে উবে গেল। অথচ একটু আগেই তো ভীষণ রেগে গিয়েছিল ও।
কথায় বলে, শাশুড়ি আর বউ ঠাঁই-ঠাঁই হলেই শান্তি থাকে। কিন্তু লাবণির যে সে উপায় নেই। খোকন—মানে, তিমির—অফিসে বেরোনোর পরই তো গোটা ফ্ল্যাটে মাত্র তিনটি প্রাণী—লাবণি, শাশুড়ি রেণুবালা আর কাজের কিশোরী মেয়ে মঞ্জু। সুতরাং দেখা-সাক্ষাৎ উঠতে বসতে হবেই, আর ঠোকাঠুকিও লাগবেই।
সর্বকাজেই রেণুবালার ডাক দেওয়া অভ্যেস। কোনও কাজ করলে বলেন, কেন করলে? আবার না করলে বলেন, করলে না কেন? এ এক বিষম জ্বালা!
বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ির সঙ্গে লাবণির লাঠালাঠি। কেন যে রেণুবালা লাবণিকে সহ্য করতে পারেন না কে জানে! অথচ তিমির ওর ভালোবেসে বিয়ের কথা মা-কে জানিয়েছিল। আশীর্বাদও পেয়েছিল। বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান নিয়েও কোনও গোলমাল হয়নি। কিন্তু তার ক’দিন পর থেকেই লাবণি টের পাচ্ছিল, রেণুবালা ওকে মোটেই সুনজরে দেখছেন না। লাবণি প্রথম-প্রথম মুখ বুজে সব সহ্য করেছে। অকারণ কটু কথার কোনও জবাব দেয়নি। এমনকী তিমিরের কাছেও কোনও অভিযোগ বা অনুযোগ করেনি। কিন্তু যতই ও মুখ বুজে সব সয়ে যাচ্ছিল ততই যেন উগ্র এবং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিলেন রেণুবালা।
শেষ পর্যন্ত তিমিরকে বলেছে লাবণি। প্রথমে শুধুই সংক্ষেপে ঘটনা জানানো। তারপর অনুযোগ। আর সবশেষে অভিযোগ। লাবণি বুঝতে পারছিল, রেণুবালার তোলা ঝড়গুলো ওদের সংসারের ছিটেফোঁটা ভালোবাসার খড়কুটোগুলো নির্মম তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিমির বাড়িতে থাকলেও পরিবেশ যেন পালটাচ্ছে না। লাবণিও কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। অল্পেতেই রেগে উঠছে। এমনকী মঞ্জুর নানান কাজে যখন-তখন খুঁত ধরছে, বকাঝকা করছে।
কথা ছিল বিয়ের ঠিক পরেই ওরা দুজনে পুরী কিংবা দীঘা বেড়াতে যাবে। কিন্তু কেমন করে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। যেসব অজানা অচেনা সুর দেহে-মনে বাসা বেঁধেছিল সব মিলিয়ে গেল একে-একে। ছোট্ট পৃথিবীটা থমথমে হয়ে গেল লাবণির কাছে। ওর দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। তিমিরের সঙ্গে মিষ্টি সম্পর্কের সুতোটা টান পড়তে-পড়তে ছিঁড়ে গেল একসময়। কিন্তু তবুও লাবণি ছেঁড়া সুতোর মাথা দুটো হাতড়ে বেড়াতে লাগল। যদি এখনও খুঁজে পাওয়া যায়, জুড়ে দেওয়া যায় নিপুণভাবে।
ঠিক এমনই একটা সঙ্কটের সময়ে তুতুর খবর পাওয়া গেল। লাবণির দেহে মোলায়েম সুষমা ফুটে উঠল। সবকিছু ভুলে গিয়ে ও খুশি হয়ে উঠল। তিমিরকে খবরটা জানাল, জানাল রেণুবালাকেও। লাবণির মনে হল, এতদিন এই একটা অপূর্ণতার জন্যই কি ও ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠেছিল নিজের ওপরে, সবার ওপরে?
তুতুর খবরটা তিমির ভালোভাবে নিলেও রেণুবালা এতটুকু পালটালেন না নিজেকে। বরং ছেলের বউকে আরও খাটুনির দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে একেবারে নাজেহাল করে তুললেন। লাবণি মুখে ঘামের ফোঁটা নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর ছুটোছুটি করে কাজ করে। আগের মতো শাশুড়ির সব কথার পিঠে আর জবাব দেয় না। শুধু তুতুর কথা ভেবেই নিজেকে অন্যরকম করে রাখার চেষ্টা করে। আর ব্যাপার-স্যাপার যখন ভীষণরকম খারাপের দিকে চলে যায়, লাবণির সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন আঁচলে হাত মুছে সোজা তেতলার ছাদে চলে যায় ও।
ছাদে টবে বসানো দশ-বারোটা ফুল গাছ আছে। তাতে বেল, গোলাপ, নয়নতারা, জুঁই, লিলি ফুটে থাকে, গন্ধ ছড়ায়। ছাদে গেলে লাবণি ফুল গাছ দ্যাখে, আশপাশের বাড়ির ছাদে শুকোতে দেওয়া শাড়ি জামাকাপড় দ্যাখে, আর দ্যাখে কাক-পায়রা-চিল-চড়ুই।
রাতের বেলায় এই ছবিটা পালটে যায়। তখন দেখা যায় শুধুই চাঁদ আর ফুটফুটে তারা। আর একইসঙ্গে পাওয়া যায় ফুলের গন্ধ। লাবণির খুব ভালো লাগে।
বছরতিনেক আগের কথা। তুতু তখনও আসেনি। একদিন সন্ধেবেলা, লাবণির মনে আছে, ফুলগাছ নিয়ে কী একটা কথা হচ্ছিল রেণুবালার সঙ্গে। লাবণিদের বাড়ির সদরে একটা মাধবীলতা গাছ আছে। বহু বছরের গাছ হলেও তাতে কখনও কোনও ফুল আসেনি। রেণুবালা কথার পিঠে ফস করে বলে উঠেছিলেন, আমাদের বাড়িতে যত ফুল-না-ফোটা গাছের কারবার। খোকনটা গাছ চেনে না। গাছকানা।
শুনে লাবণির গা জ্বালা করে উঠেছিল। রেণুবালার কথার মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন খোঁচা ছিল সেটা বুঝতে ওর কষ্ট হয়নি। বিয়ের পর তিনটে বছর কেটে গেলেও লাবণির সন্তান হয়নি। প্রথম-প্রথম ওরা সন্তান চায়নি। আর পরে যখন চেয়েছে তখন পায়নি। দু-একজন ডাক্তার দেখানোর পর আরও হতাশ হয়ে পড়েছিল লাবণি। ও লুকিয়ে-লুকিয়ে আপনমনে একা-একা কাঁদত। তিমির কখনও ওকে সান্ত্বনা দিত, কিন্তু এক-এক সময় তিমিরের অসন্তোষটাও চাপা থাকত না।
এইসব দুঃখের মুহূর্তে ছোট্ট ছাদটাকে খুব প্রিয় মনে হতো লাবণির। গাছের পাতা, ফুলের ঘ্রাণ, রাতের আকাশ, উড়নচণ্ডী বাতাস ওকে টানত। ভগবানের চেয়েও আপন ছিল এই অ-মানুষগুলো। কখনও-কখনও ওদের সঙ্গে কথাও বলত লাবণি। ওর মনে হতো, ওরা যেন উত্তর দিচ্ছে ওর কথায়। ওর দুঃখের দিনে ওরাই একমাত্র বন্ধু।
এরকমই এক দুঃখের রাতে ছাদে চলে গিয়েছিল লাবণি। রেণুবালার হিংস্র আক্রমণ ওকে সারাটা দিন ধরে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। আর তিমিরও অফিস থেকে ফিরে কী যেন একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে কয়েকটা অভদ্র মন্তব্য করেছিল। লাবণি সারাদিন যতটা পেরেছে শাশুড়ির আক্রমণ ঠেকিয়েছে। নিজেও পালটা আক্রমণ করতে ছাড়েনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মঞ্জুর সামনে ওকে ‘বাঁজা’ বলে খোঁটা দেওয়ায় ওর কান্না পেয়ে গিয়েছিল। তারপর সন্ধেবেলা, তিমির বাড়ি ফেরার পর, আবার একই ধরনের আঘাত। লাবণি কোনও প্রতি-আঘাত করেনি। ওর কান্না বুকে চেপে মুখ বুজে থেকেছে। রান্না করা, তিমিরকে খেতে দেওয়া, এইসব কর্তব্য পালন করে গেছে।
তারপর রাত গাঢ় হলে, তিমির অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লে, ও ছাদে চলে গিয়েছিল। রাতের আকাশ ওর দুখী মনটাকে কাছে টেনে নিয়েছিল। তারাগুলো মিটমিট করছিল, চোখের পাতা ফেলছিল বারবার।
লাবণির নাকে ফুলের ফুরফুরে গন্ধ আসছিল। ও মাথা তুলে আকাশের তারা দেখছিল। তারাদের ও নামে চেনে না। তবে দু-একটা নাম যা শুনেছে সেগুলো ওর ভালো লাগে। শ্রবণা, শতভিষা, অরুন্ধতী, মৃগশিরা। লাবণি আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্রমশ সম্মোহিত হয়ে যাচ্ছিল যেন। ওর চোখে-মুখে-গায়ে তারার আলো এসে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল আকাশের মনোরম আলো ওকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে।
লাবণি হঠাৎই ছাদে শুয়ে পড়েছিল চিত হয়ে। কত দূরে আছে ওরা? আকাশের মতো বিশাল মনের মাঝে ভালোবাসার কুচিকুচি হিরের টুকরো।
এমনসময় একটা ছুটন্ত তারা দেখতে পেল লাবণি। আকাশের সেই শীর্ষ থেকে সাবলীল ভঙ্গিমায় বাতাসে সাঁতার কেটে যেন নেমে আসতে চাইছে ওর কাছে। কবিতার মতো ছন্দ তৈরি করে ছুটে আসছে এক আলোর হরিণ।
লাবণির মন থেকে সমস্ত দুঃখ কান্না মুছে গেল। ওর ঠোঁট কাপছিল। চোখের পালক কাঁপছিল। ওর চোখ বুজে গেল এক আদুরে আবেশে। কিন্তু তখনও ও যেন দেখতে পাচ্ছিল সেই খসে পড়া তারাটা ছুটে আসছে ওকে লক্ষ্য করে। আর অনুভব করতে পারছিল, অসংখ্য নক্ষত্রের মিষ্টি আলোয় ওর শরীর স্নান করছে…স্নান করছে…।
লাবণি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। যখন ঘুম ভাঙল তখন নিজেকে ছাদে শোওয়া অবস্থায় আবিষ্কার করে কিছুটা অবাকই হল ও। এখানে ও কখন এল? কেমন করে এল?
একটু পরেই ওর সবকিছু মনে পড়ে গেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুরোনো দুঃখগুলোকে ও যেন আর খুঁজে পাচ্ছিল না।
লাবণি ছাদ থেকে নেমে এল। শরীর ভারী লাগছে। কেমন এক অদ্ভুত অবসাদ ওকে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিতে চাইছে। পায়ে-পায়ে সিঁড়ি নেমে এসে ও মুখে-মাথায়-ঘাড়ে জলের ছিটে দিল। তারপর গিয়ে শুয়ে পড়ল ঘুমন্ত তিমিরের পাশে। ও তিমিরের নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
ওই সুন্দর রাতটা বড় বেশি করে মনে আছে লাবণির।
তারপর থেকে রাতের আকাশ, রাতের তারা, ওকে আরও বেশি করে টানে। এই আশ্চর্য টান ধীরে-ধীরে গড়িয়ে গেল মারাত্মক নেশায়। এ নিয়ে রেণুবালা অথবা তিমিরের কাছ থেকে মাঝে-মাঝেই কথা শুনতে হয়েছে লাবণিকে। কিন্তু সে-কথার জবাব দেওয়ার কোনও সাধ জাগেনি ওর। লাবণির নিজেরই কেমন অবাক লেগেছে। ও কি পালটে যাচ্ছে ক্রমশ?
লাবণি প্রায়ই ওই সুন্দর রাতটার কথা ভাবত। একদিন ও যখন মনে-মনে ওই খসে পড়া তারাটার ছবি দেখছিল তখন হঠাৎই তুতুর খবর যেন টের পেল ও। গত কয়েকটা দিন ওর আশা-আকাঙ্ক্ষায় কেটেছে। তারপর সেদিন নিশ্চিত ইশারাটা পাওয়ামাত্রই লাবণি খুকি হয়ে গিয়েছিল। ওর ইচ্ছে করছিল ছুটোছুটি করে, বারান্দায় যায়, এটা ভাঙে, সেটা ছোড়ে।
প্রথমে খবরটা ও জানিয়েছিল তিমিরকে, তারপর রেণুবালাকে।
তুতুর জন্মের ঠিক আগে, জন্মের সময়, অথবা জন্মের পরে লাবণি কোনও কষ্ট পায়নি। যে-প্রসব বেদনা জন্মের আসন্ন মুহূর্ত জানিয়ে দেয়, লাবণির বেলার তার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। শুধু ওর মন যেন বলে উঠেছিল, সময় হয়ে গেছে।
তুতুর জন্ম অনেককেই অবাক করে দিয়েছিল। আর ওর সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দিয়েছিল সকলকেই।
তুতু যতই বড় হয়ে উঠতে লাগল ঘটনাগুলো ততই নজর কাড়ল লাবণির।
তুতুকে দেখলে অকারণেই মন ভালো হয়ে যায়। বুকের গভীরে খুশির ফুল ফুটে যায় পলকে। এমনটা হয় শুধু কি লাবণির! তিমির আর রেণুবালারও যেন একই অবস্থা। তুতুর দিকে চোখ পড়লে, কি ওকে কোলে নিলেই ওরা হয়ে যায় অন্য জগতের মানুষ।
এইভাবে, লাবণি লক্ষ করছিল, সংসারের ছোট-বড় অশান্তিগুলো যেন ক্রমশ কমে আসছে। মনের মধ্যে ফুঁসে ওঠা রাগের বাষ্প সবসময় কেমন অলৌকিকভাবে যেন ফিকে হয়ে যায়। যেমন, এই মুহূর্তে।
লাবণি বিছানার কাছে এগিয়ে এসে তুতুকে আদর করে কোলে তুলে নিল। চুমোয়-চুমোয় ভরিয়ে দিল ওর সুন্দর মুখ।
তুতু, সোনামণি আমার। আমার সোনা ছেলে!
তুতু ওর সুন্দর হাত-পা এলোমেলোভাবে নাড়তে লাগল। মিষ্টি স্বরে দুর্বোধ্য সব শব্দ উচ্চারণ করতে লাগল।
এমনসময় পা দাপিয়ে রেণুবালা ঘরে এসে ঢুকলেন। রুক্ষ গলায় বলতে শুরু করেছিলেন, লাবণি, তোমাকে আমি—। কিন্তু ওই পর্যন্তই। গলার স্বর ও সুর পালটে গেল রেণুবালার। বললেন, তুতুর খাওয়া হয়েছে, লাবণি?
লাবণি বলল, এইবারে দেব।
তারপর শুরু হল ঠাকুমা আর নাতির খেলা। আর তারই ফাঁকে তুতুকে দুধ খাওয়াতে লাগল লাবণি।
এইভাবে সংসারের ছবিটা ধীরে-ধীরে পালটে যাচ্ছিল। আগে মন খারাপ হলে লাবণি একা ছাদে যেত। এখন তুতুকে কোলে নিয়ে ও প্রায়ই সেখানে যায়। অবাক হয়ে ও লক্ষ করেছে, ওইটুকু বাচ্চারও যেন তারার নেশা লেগেছে। অন্ধকার আকাশের উজ্জ্বল টিপগুলোর দিকে চকচকে চোখে তাকিয়ে দ্যাখে ও। অর্থহীন শব্দ তোলে মুখে। আর হাত নাড়ে। লাবণি মুগ্ধ চোখে ওর শিশুকে দ্যাখে। এক অদ্ভুত ভালোলাগা ওর বুকের ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, থিতু হয়ে বাসা বাঁধে।
তিমিরের মধ্যেও যে পালটে যাওয়ার ব্যাপারটা ঘটে যাচ্ছে সেটাও লাবণি ক্রমশ টের পাচ্ছিল। আগে অফিস থেকে ফেরার পর তিমিরের মেজাজ চড়া সুরে বাঁধা থাকত। কিন্তু এখন সেই সুর গভীর খাদে নেমে এসেছে। তিমির এখন বেশি কথা বলে। অকারণ বকবক করে লাবণির সঙ্গে, তুতুর সঙ্গে।
এইরকমই এক সন্ধেবেলা এক অবাক করা ঘটনা ঘটে গেল।
তিমিরের কাছে একটা রুবিক কিউব ছিল। অনেকগুলো চৌকোনা ছোট বাক্সের বিভিন্ন পিঠে বিভিন্ন রং। সেগুলো একসঙ্গে জুড়ে তৈরি হয়েছে রুবিক কিউব। তার ছ’পিঠের ছ’টা রং মেলানো খুব কঠিন—অন্তত তিমিরের কাছে। সেদিন সন্ধেবেলা রং-এলোমেলো হওয়া কিউবটা নিয়ে তিমির নানান কসরত করে রং মেলানোর চেষ্টা করছিল, আর একইসঙ্গে তুতুর সঙ্গে গল্প করছিল। তুতু ওর ওয়াকারে বসে ছিল। হঠাৎই ও হাত বাড়িয়ে দিল বাবার দিকে। রঙচঙে রুবিক কিউবটা আঁকড়ে ধরতে চাইল ওর কোমল হাতে। তিমির ওকে কিউবটা দিয়ে বলল, দ্যাখ তো, তুই পারিস কি না। আমি তো এতদিন ধরে চেষ্টা করে-করে নাজেহাল হয়ে গেছি।
তুতু কিউবটা নিয়ে খেলা করতে লাগল। একটু পরেই ওটা ও আবার ফিরিয়ে দিল বাবার দিকে। আর তখনই তিমির চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল।
রুবিক কিউবের ছ’পিঠের রং সুন্দরভাবে মিলে গেছে!
তিমির ওর চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও লাবণিকে কিউবটা দেখিয়ে বলল, ওইটুকু বাচ্চা কীভাবে রুবিক কিউব সল্ভ করে দিল!
লাবণি অবাক হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঘটনাটা ওর মন মেনে নিতে চাইছিল না। ও কিছুটা যেন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। হোঁচট খাওয়া গলায় ও বলল, আমার মনে হয় তুমি যখন চেষ্টা করেছিলে তখনই কোনওভাবে ওটার রং মিলে গেছে। তারপর তুমি খেয়াল না করে তুতুর হাতে ওটা দিয়েছ—।
তিমির লাবণির কথায় কর্ণপাত করল না। রুবিক কিউবটা একপাশে রেখে দু-হাতে ছেলেকে তুলে নিল কোলে। তারপর পাগলের মতো আদর করতে লাগল তুতুকে।
লাবণি চুপ করে তুতুকে দেখছিল। ওর বুকের ভেতরে এক অলৌকিক বাজনা বাজতে শুরু করেছিল।
এখনও সেই বাজনাটা অনুভব করল লাবণি।
শুধু কি বাজনা! মানুষগুলোর বুকের ভেতরে একশোটা করে টিউব লাইট জ্বলিয়ে দিয়েছে শিশুটা। তুতুকে দুধ খাওয়াতে-খাওয়াতে ওর পুরোনো আর নতুন, দুটো জীবনের কথা ভাবছিল লাবণি। ওর ভালো লাগছিল।
পরদিন ভোরবেলা লাবণির ঘুম ভাঙল শাশুড়ির চিৎকারে।
লাবণি, লাবণি,—ওঠো, দেখে যাও শিগগির। লাবণি—।
চিৎকারের মধ্যে খুশির ভাবটা চাপা ছিল না রেণুবালার। বেশবাস ঠিক করে দরজা খুলতেই রেণুবালা লাবণিকে প্রায় হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন দোতলার বারান্দায়। ঝুঁকে পড়লেন রেলিঙের কোণে। তারপর আঙুল তুলে মাধবীলতা গাছটা দেখিয়ে বললেন, দ্যাখো, দ্যাখো—কী আশ্চর্য ব্যাপার—।
লাবণি দেখল। মনটা সত্যিই খুশিতে ভরে গেল ওর। যে-মাধবীলতা গাছটায় গত দশ বছরে শত চেষ্টাতেও কোনও ফুল ফোটেনি, আজ সেই বন্ধ্যা তরুলতা নিজেকে বিয়ের সাজে সাজিয়ে বসে আছে। তার সারা অঙ্গে সাদা আর গোলাপি রঙের বেনারসি জড়ানো।
লাবণি বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল। ওর মনে পড়ল, কাল বিকেলে তুতুকে কোলে নিয়ে ও বাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। পাশেই ছিল মাধবীলতার সবুজ পাতার দল। তুতু ওর কোল থেকেই নানা দিকে হাত বাড়াচ্ছিল আর বিচিত্র অর্থহীন সব আদুরে শব্দ করছিল। তখন লাবণির কী মনে হয়েছিল, ও হঠাৎ বলেছিল, তুই তো আমাদের সবাইকে ভালো করে দিলি। এই গাছটাকেও ভালো করে দে তো দেখি—দশবছর ধরে গাছটার অসুখ…।
আর তার পরই কখন যেন গাছটার পাতা খামচে ধরেছিল তুতু। ওটার সরু-সরু ডালপালা বারবার আঁকড়ে ধরছিল। নানান শব্দ করছিল মুখে।
তারপর আজ—আজ এরকম একটা অপরূপ দৃশ্য!
রেণুবালাকে তুতুর কথা বলতে গিয়েও বলতে পারল না লাবণি। কে জানে এ ওর কল্পনা কি না। ও শুনেছে, অনেক সময় অনেক গাছ বহু বছর রুগ্ন থাকার পরে হঠাৎ করে নিজে থেকেই সেরে ওঠে। এই মাধবীলতা গাছটার বেলায় হয়তো সেরকমই কিছু হয়েছে। কে জানে!
কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজের ঘরে তুতুর কাছে ছুটে গেল লাবণি। ঘুমন্ত তুতুকে চুমু খেল দু-গালে। তারপর কী ভেবে ওর পাশে শোওয়া তিমিরের কপালেও একটা চুমু এঁকে দিল। তিমিরের ঘুম ভেঙে গেল সঙ্গে-সঙ্গেই। ও জড়ানো গলায় বলল, কী ব্যাপার?
লাবণি হেসে বলল, আজ মাধবীলতার বিয়ে। তোমাকে অফিস যেতে হবে না।—বলেই আবার হেসে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
তিমির অবাক চোখে বউয়ের চলে যাওয়া দেখল।
এইভাবে খুশি ও সুখের চাদরগুলো যখন অশরীরী কেউ ওদের সামনে একে-একে মেলে দিচ্ছে তখন হঠাৎ করেই তুতুর অসুখ করল।
এমনিতে যে-কোনও দেড় বছরের শিশুর অসুখ করতেই পারে। কিন্তু যে সকলের অসুখ সারায় তার অসুখ হওয়াটা লাবণি সহজভাবে মেনে নিতে পারল না। ও কেমন পাগলের মতো হয়ে উঠল।
তুতুর জন্য ডাক্তার-ওষুধ ইত্যাদি চলছিল। কিন্তু রোগটা যে ঠিক কী তা ডাক্তারবাবু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিমিরও কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। মা-কে দেখে, স্ত্রীকে দেখে ও ভেতরে-ভেতরে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
তুতুর সুন্দর মুখটা দিনের-পর-দিন মলিন, মলিনতর হয়ে যাচ্ছে। ওর হাসিখুশি ভাব, হাত-পা ছোড়া, সবটাই হয়ে উঠছে স্তিমিত। তিমিরের চোখের সামনে অনেকগুলো সূর্য ধীরে-ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। ওদের সকলের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যাচ্ছিল একইসঙ্গে। আর দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলতে চাইছিল।
বহুদিন চোখের জল নিয়ে ছাদে যায়নি লাবণি। কিন্তু তুতুর অসুখ ওকে দিশেহারা করে দিল। ডাক্তার বদল ওষুধ বদল করেও অবস্থার কোনও উন্নতি ওর চোখে পড়ছিল না। এইরকমই এক অসহায় শোকের রাতে লাবণি ছাদে গেল। আকাশের তারাদের দিকে তাকাল। শ্রবণা, শতভিষা, অরুন্ধতী, মৃগশিরা। লাবণির বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল। আগেও কষ্ট হতো, কিন্তু আজকের কষ্ট অন্যরকম।
ও গত আঠেরোটা মাসের কথা ভাবছিল। সুমধুর আঠেরোটা মাস। এই দিনগুলোর প্রতিটি পল-অনুপল ওকে ঠেলতে-ঠেলতে ক্রমে-ক্রমে নিমজ্জিত করেছে রূপকথার সুখী সরোবরে। এখন অসুখের তাপে সেই সরোবরের প্রতিটি বিন্দু কি বাষ্প হয়ে যাবে? একে-একে নিভে যাবে ওদের বুকের ভিতরের টিউব লাইটগুলো? লাবণি যেন কল্পনায় দেখছিল, তিমিরের রুবিক কিউবটা আবার এলেমেলো জটিল হয়ে যাচ্ছে। মাধবীলতা গাছটা আবার বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আর ওর বুকের ভেতরে সাদা আলোগুলো একে-একে নিভে গিয়ে জ্বলে উঠেছে পনেরো ওয়াটের এক মলিন নির্জীব বাতি। সেই আলোয় চোখে পড়ছে কতকগুলো পলেস্তারা খসা প্রাচীন দেওয়াল। দেওয়ালগুলোয় কোনও জানলা নেই। বাতাস বইতে পারে না, রোদ ঢোকে না, তারার আলো ফোটে না সেই ঘরে। শুধু অন্ধকার কতকগুলো ছায়া সেখানে বাস করে। পরস্পরকে ঘেন্না করে, ঈর্ষা করে, কষ্ট দিয়ে তারা বেঁচে থাকে—অথবা মরে থাকে।
লাবণি জোরে শ্বাস নিল। সেই উল্কাটা যেন কবে খসে পড়েছিল আকাশ থেকে? সেই অদ্ভুত রাতের তারাময় আকাশে কোন এক জ্যোতিষ্কের উজ্জ্বল এক অণুকণা চোখ টেনেছিল লাবণির। আর তার পরই তুতু এল। লাবণির চোখের কোণ বেয়ে জল পড়ছিল। রাতের বাতাসে ওর শীত করছিল। টবে বসানো গাছের পাতাগুলো নড়ছিল। ওরা যেন মাথা ঝাঁকাচ্ছে বারবার।
লাবণি তারাদের কাছে তুতুর জীবন প্রার্থনা করছিল। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হয়ে যে-পবিত্র শিশু ওর কোলে জন্ম নিয়েছিল সে ওর একার নয়—সে এসেছিল সকলের ভালো করতে। পৃথিবীর দূষিত পরিবেশ ওর নিশ্বাসে কি একটু-একটু করে নিষ্কলুষ হয়ে উঠতে পারত না?
রাতের তারাদের দিকে তাকিয়ে লাবণির নীরব অনুনয় যখন ক্রমশ নীরব হাহাকার হয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই নীচে থেকে কান্নার তীব্র চিৎকার ওর কানে এল।
পৃথিবী থেকে কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোনও একটি গ্রহে স্বচ্ছ স্ফটিকের চার দেওয়ালের মাঝে মৃদু গুঞ্জন তুলে কাজ করছিল একটি যন্ত্র। যেমনই বিচিত্র তেমনিই অতিকায় তার আকার। যন্ত্রটির মস্তিষ্ক জটিল কোনও অঙ্ক নিয়ে মগ্ন ছিল। মহাবিশ্বের যাবতীয় বাসযোগ্য গ্রহ এবং তাদের অধিবাসীদের নিয়ে গবেষণা করছে যন্ত্রটি। তার একমাত্র লক্ষ্য, যে-কোনওরকম সমস্যার সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধান খুঁজে বের করা। এই মুহূর্তে যে-গ্রহটি নিয়ে সে গবেষণা করছে তাকে সেখানকার অধিবাসীরা ‘পৃথিবী’ নামে ডাকে। সেই পৃথিবীবাসীদের সমাজ-জীবন সংক্রান্ত নানান সমস্যার সমাধান করতে সে দূর-নিয়ন্ত্রিত একটি অণুজীবের সৃষ্টি করেছিল। ভ্রূণাবস্থা থেকে শুরু করে আঠেরো মাস ধরে সেই অণুজীবটি বহু তথ্য সংগ্রহ করেছে, বহু পরীক্ষা চালিয়েছে। সেইসব তথ্য ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করেই নতুন অঙ্ক করছিল যন্ত্রটি। খুঁজে বের করছিল আরও নতুন-নতুন সমস্যা সমাধানের পথ। আপাতত সে দূর-নিয়ন্ত্রিত অণুজীবটিকে ফিরিয়ে নিয়েছে নিজের কাছে। তবে সময় হলে আবার সে পাঠাবে তাকে। একবার…দুবার…বারবার। যে-করে হোক সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধানগুলো তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। সেটাই তার একমাত্র লক্ষ্য।
